জেগে ওঠ – ২০ – জল – শূন্যতা

আনন্দ জানতে চাইলেন, “প্রভু, জল উপাদান সম্বন্ধে বলুন ।”

পরম জন বললেন, “জল কেন স্বপ্ন, আনন্দ? প্রশ্ন করা যেতে পারে যে স্বপ্ন সত্যি না মিথ্যা?”

আনন্দ, এস জলের উপাদানের বিষয়টা বিচার করে দেখি। জল স্বভাবত অনিত্য, সে নদীর স্রোত বা সমুদ্রের ঢেউ, যাই হোক। ভোরবেলা সূর্য ওঠে, শিশির উত্তপ্ত হয়, পাত্রে বিন্দু বিন্দু জল জমে। কি মনে হয় আনন্দ? এই বারিবিন্দুর উৎপত্তি কি শিশিরে, না কি শূন্যে, না কি সূর্যে তার উৎপত্তি? সূর্য থেকে সে যদি আসত, তাহলে যেইমাত্র সূর্য উদিত হত, সর্বত্র জল দেখা যেত, কিন্তু এও আমরা দেখি যে জল জমতে গেলে শিশিরকে থাকতেই হবে। যদি ধর শিশির থেকেই জল আসত তাহলে আবার জল হতে গেলে সূর্য উঠে গরম হওয়া অবধি অপেক্ষাই বা করতে হবে কেন? আবার যদি কেবলই শিশির থাকত আর জল না হত, তাহলে বলা যেত জলের উৎপত্তি সূর্যে নয়। আবার জল যদি সূর্য আর শিশিরের মাঝে যে অপার শূন্যতা, সেখান থেকে আসত, তাহলে, শূন্যতা তো অপার, জলও যদি অপার হত, তাহলে কি পৃথিবীতে, কি আকাশে, সচেতন প্রাণীকূলের জলে ডুবে যাওয়ার একটা ব্যাপার থাকত। আবার তুমি যদি বল যে জল সূর্য, শিশির, আর শূন্যতা, তিন অবস্থা থেকেই উদ্ভুত, তবে তুমি হয়ত বলবে যে তার তিন তিনটে উৎস। জল তাহলে কোথা থেকে আসে? কোনখানেই নেই সে, এটাও তো হতে পারে না। আবার, মনে কর যেখানে যেখানে শিশির পড়বে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জল হয়ে যাবে, সারা পৃথিবীতে সর্বত্র শিশির পড়ে, সর্বত্র জলে জল, এর কি বা তাৎপর্য?

“আনন্দ! কেন তোমরা অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছ না বুঝে যে জলের অন্তর্নিহিত, যথাযথ স্বরূপ শূন্যতায়, আর মহাশূন্যের প্রকৃতি জল-মাত্রতা!

“উজ্জ্বল শূন্যতার স্বরূপে তন্মাত্র মন, জল আর শূন্যতা সেখানে পরম চিরনবীন রূপে সদা বিরাজমান, মহাবিশ্বের সর্বত্র তারা বিরাজিত, মুক্ত, চেতন প্রাণীর আপন কর্মবলে তারা সদা বিকশিত।

“তথাপি, ইহজগতের মানব, তারা এ বিষয়ে অজ্ঞ, জলকে তারা কার্য কারণ, উপাদান নিদান বলে ধরে নেয়, বিহ্বল হয়ে পড়ে। এই সব মিথ্যা ধারণা আর কুসংস্কার, সব মনের ভিতর, এদের কারো কোন সত্যিকারের ভিত্তি নেই।

“কোথা থেকে জল উৎপন্ন হয়, কোথায় সে থাকে, কোথায়ই বা সে যায়? জলের উৎপত্তি সর্বত্র, যেখানে যা দেখি সবেতে তার উৎপত্তি। অস্যার্থ, সূর্যোদয়ে শিশির গলে মিশে যে অবস্থা তাতে সে আছে, তবু কেবল এই অবস্থাই জলের একমাত্র উৎস নয়, জল নামের এই প্রপঞ্চের উৎস তন্মাত্র মন। “

আনন্দ বললেন, “প্রভু, অগ্নি নামক উপাদানটি সম্বন্ধে আমাদের বলুন।”

পরমকারুণিক বুদ্ধদেব বললেন, “অগ্নি কেন ধারণা, আনন্দ? চিন্তার উদয় হয়েছে না কি সে অন্তর্হিত, সে প্রশ্ন করা যাবে কি?

“আনন্দ, অগ্নি নামক উপাদানটির কথা বিচার করে দেখ। আগুনের নিজস্ব কোন প্রকৃতি নেই, সে অন্যান্য অবস্থার উপর নির্ভরশীল। শ্রাবস্তীনগরে দ্বিপ্রহরে মানুষ যখন রান্না প্রস্তুত করে, সেই সময় যদি তাদের দেখ, দেখবে ঘরে ঘরে মানুষ আতস কাঁচ দিয়ে সূর্যের আলো সোমরাজ গাছের শুকনো কাঠের ওপর ধরে তাতে আগুন জ্বালায়। আগুনের গুণ কিন্তু মধ্যাহ্ন, আতস কাঁচ, আর শুকনো কাঠের সমন্বয়ে উথ্থিত হয়নি। কেন? কারণ শুকনো সোমরাজ কাঠের ওপর দিবা দ্বিপ্রহরে কেউ যখন আতস কাঁচ ধরে আগুন জ্বালায়, সে আগুন আতস কাঁচ সঞ্জাত, না কি তার উৎস সোমরাজ কাঠে, না কি সূর্যে, আনন্দ? আগুন যদি কেবল সূর্য হতেই সঞ্জাত হত, তবে ঐ সোমরাজ বনে আগুন লাগে না কেন? যদি আতস কাঁচ থেকে আগুনের উৎস হত, তাহলে আতস কাঁচ নিজে পোড়ে না কেন, আনন্দ? এমনিতে, যতক্ষণ না তোমার হাত আতস কাঁচ সোমরাজ গাছের শুকনো ডালপালার ওপরে দিবা দ্বিপ্রহরে প্রখর রৌদ্রে না ধরবে, তদবধি তো আগুনের আবির্ভাব হবে না। ভাল করে ভেবে দেখ আনন্দ! কিছু কিছু অবস্থাবিশেষে আগুনের আবির্ভাব হয়। তুমি তো তোমার হাতে আতস কাঁচ ধরে আছ, সূর্যের আলো আসছে সূর্যের থেকে, সোমরাজ গাছের ডালপালা গজিয়েছে মাটি থেকে, আগুন তাহলে কোথা থেকে এল, সে থাকেই বা কি করে, যায়ই বা কোথায়? বলতে তো পারবে না সে কোথাও থেকে আসেনি।

“কেন তুমি জান না আনন্দ, যে, আগুনের একান্ত সত্তা শূন্যতা, আবার শূন্যের একান্ত সত্তাই অগ্নি। তথাগতের গর্ভে, আগুন ও শূন্যতা পরম সৎ অবস্থায় সহাবস্থান করে, মহাবিশ্বের সর্বত্র তাদের ব্যাপ্তি, সচেতন প্রাণীকূল আপনাপন কর্মবলে তাদের উপলব্ধি করে। অতএব একথা জেনো আনন্দ, এই পৃথিবীতে যখন যেখানেই মানুষ শুকনো কাঠের ওপর প্রখর সূর্যালোকে আতস কাঁচ ধরবে, তখনই সেখানে আগুনের উৎপত্তি হবে। আগুন সর্বত্র; তথাপি এই সব অবস্থা সাপেক্ষে তার প্রকাশ হয় নি। সে আপন নিয়মে নিজে নিজেও জ্বলে না। যদি তাই হত, তাহলে সদাসর্বদা সর্বত্র আগুন জ্বলত। আর যদি ধর সর্বত্র সদাসর্বদা আগুন জ্বলতে থাকত, আগুন ছাড়া কিছু না থাকত, তাহলেই বা কি বোঝা যেত? মনে হত না যে এই নিখিলব্যাপী আগুনই নিখিল মানস? বা, ধর যদি সর্বত্র শুধু জল থাকত, আর কিছু না থাকত, তাতেও কি মনে হত না যে জগদ্ব্যাপী জলই নিখিল মানস? কিন্তু কি দেখি? এখানে জল, ওখানে আগুন, কেননা তারা তাদের অবস্থা সাপেক্ষে উদ্ভুত, একে অপরকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে পরিবর্তিত করে চলেছে। যেমন জল দেখ টগবগ করে ফুটছে, তাকে আগুনের ওপর ঢাললে, আগুন নিভে গেল, আবার সেই জল বরফে পরিবর্তিত হল। এ চলতেই থাকে। মানুষ এ পৃথিবীতে এ বিষয়ে অজ্ঞানতিমিরে পড়ে আছে, আগুনকে কার্য কারণের প্রকাশ বলে ধরে নেয়, বা হয়ত ভাবে আগুন নিজে নিজেই জ্বলে ওঠে, ভাবে আর হতবাক হয়ে যায়। অথচ, ঠিকমত ভেবে দেখলে দেখ, এই যে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা, এই যে সব কুসংস্কারই ধর, এসবই তাদের চেতনায় যে সমস্ত এক থেকে অন্যতে পৃথক বোধ, বিভেদবোধ, তারই প্রকাশ, শব্দে বাক্যে তাদের সে প্রকাশ করে, এর কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই, এ বাস্তবিক অর্থহীন।

“আনন্দ, আগুনও যা, আবর্জনাও তাই। আবর্জনার সৎ, পরম, মূল চরিত্রগত দিক থেকে বিবেচনা করলে তাকে দেখে ঘৃণা করারও কিছু নেই, আবার ঘৃণা না করারও কিছু নেই, কিন্তু সেই পরম সত্তাকে কেই বা আর ভেবে দেখে?”

আনন্দ বললেন, “প্রভু, বায়ু-উপাদান নিয়ে বলুন। “

পরমশ্রদ্ধেয়জন উত্তর দিলেন, “বায়ু কেন প্রতিফলন আনন্দ? এই প্রশ্ন করা যেতে পারে কি যে প্রতিফলন নিত্য না কি অনিত্য?”

“বায়ুর চরিত্র বিবেচনা করে দেখি। সে যখন সচল কি স্থির, তাকে দেখাও যায় না, তার কোন নিত্য অবস্থাও নেই। একটা উদাহরণ দিই, আমি যদি তোমার মুখের সামনে হাত নাড়াই, তোমার মুখের ওপর মৃদু হাওয়া বয়ে যায়, কেমন? তোমার কি মনে হয় আনন্দ, এই যেই হাত নাড়ালাম অমনি হাওয়া বইতে শুরু করল তোমার মুখের ওপর, এ কি আয়নায় প্রতিফলনের মতন আমার হাতে তার উৎস, না কি তোমার মুখ আর আমার হাতের মধ্যবর্তী হাওয়ায় তার উৎপত্তি? যদি আমার হাত থেকে তার উৎপত্তি হত, তবে এই যে আমার দুই হাত এখন আমার দুই জানুর ওপর রেখেছি, কই হাওয়া বইছে না তো! যদি মাঝের শূন্য স্থানে তার উৎপত্তি হত, তবে তুমি যে গলবস্ত্র পরে আছ, তা স্থির থাকে কি বলে? শুধু তাই নয়, যদি ধর আমার হাত আর তোমার মুখের মাঝের শূন্যতা থেকে সে আসত, তবে এই নিত্য শূন্যতায় সারাক্ষণ বায়ু প্রবাহিত হত। তা যখন হচ্ছে না, তার মানে কি শূন্যতা নেই? তা তো নয়। এই যে হাওয়া বয়, আসে যায়, কে যায়? কি প্রবাহিত হয়? কি এর রূপ? এই যে যাওয়া আসা, শূন্যতার অপ্রকাশ প্রকাশ, মৃত্যু, পুনর্জন্ম, শূন্যতা আর বলা যাবে না। আবার যদি শূন্যতা বলতে, তবে এই মহাশূন্যতা থেকে বায়ু আসে কিভাবে? এই যে মুখে মৃদু সমীরণের স্পর্শ, তা যদি মুখ থেকে উদিত হত, তবে সদাসর্বদা মুখে হাওয়ার স্পর্শ লেগে থাকত। বায়ুপ্রবাহের উৎস কোথায়, সে আসে কোথা থেকে? বায়ুপ্রবাহ শূন্যে যেন গভীর নিদ্রায় মগ্ন, আমার হাতের দোলায় তাকে জাগালাম, তবু হাওয়ার জন্ম আমার হাতের মুদ্রার দোলানিতে নেই, কারণ আমার হাত যখন স্থির, তখন সেই মৃদুমন্দ বায়ু তো আর সেখানে ফিরে আসে না? আমার হাত শূন্যে, আবার সমীরণ সর্বত্র। বায়ু যদি সর্বত্র হতে আসত,কোথায়ই বা তার উৎস খুঁজে পেতাম?

“আনন্দ! কেন তোমরা এই অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন, যে, তূষিতের জগতে, যে কিনা তাবৎ অস্তিত্ব কি অনস্তিত্বের ধারণার অতীত, বায়ুর তন্মাত্র চরিত্রে সে সতত শূন্য, আর শূন্যতার সতত চরিত্রে সে বায়ু।

“শূন্যতাকে নিয়েও তাই, সে পঞ্চম মহা উপাদান। আনন্দ, শূন্য, তার তন্মাত্রিক অবস্থায়, শূন্যের কোন রূপ নেই, সে অরূপ, কারণ এ এক স্ফটিকতূল্য স্বচ্ছ শূন্যতা যাকে আমরা আমাদের মনে এমন করে মেনে নিয়েছি যে সে যেন আমাদের চেন জানা কিছু কিছুর মাঝে রয়েছে, যেমন দুটি তারার মাঝে, এক কাল্পনিক বিভাজন। রঙের মাধ্যমে আমাদের ইন্দ্রিয়ে শূন্যের প্রকাশ, যেমন আকাশে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ধূলিকণায় সূর্যালোক ঠিককরে নীলাকাশ দেখায় চোখে। তবু আর সকলের মতই শূন্যতাও একটা ধারণা, কেননা শূন্যতা বলেও, যেন গ্রহ হতে গ্রহান্তরে, কি প্রাকারের মধ্যে শূন্যস্থানে কিছু আছে, আসলে কিছুই নেই।

“ধর একটা কূয়ো খুঁড়ছ। খুঁড়তে খুঁড়তে মাটির ওপরে ধুলোর স্তুপ করলে, আরযে মাটির নীচে শূন্যতা। যেমন ধর আনন্দ, যখন একটা কূয়ো খনন করা হল, তখন একটিমাত্র কূয়োর সূত্র ধরে শূন্যতার বহিঃপ্রকাশ দেখলে। আবার যখন মহাবিশ্বের দশদিকে সর্বত্র শূন্য, সর্বত্রই সেই শূন্যতার প্রকাশ। শূন্যতা যখন সর্বত্রগামী, তখন তাকে কোথায়ইবা আলাদা করে খুঁজে পাবে? কিন্তু পৃথিবীতে সকলে অজ্ঞানতিমিরে আচ্ছন্ন হয়ে অবাক হয়ে পড়ে আছে, কেননা তারা সতত শূন্যতাকে কার্যকারণহেতু প্রকাশিত বলে ভেবে এসেছে, যেমন মাটি খুঁড়ে গর্ত করলে সেখানে যা থাকে না, তাই শূন্য। অথচ, শূন্যের প্রকৃত রূপ তার সদাসর্বদা উপস্থিতিতেই, তার ‘অ’-শূন্যতায়, একে উপলন্ধি করাই প্রকৃত বোধ, আলোকপ্রাপ্তি। স্তপ করে রাখা ধুলোর রাশি শূন্যতাকে আড়াল করতে পারে না, আবার শূন্যতার শূন্যময়তাও ধুলোর রাশিকেও নিশ্চিহ্ন করে দেয় না। খেয়াল করে দেখ শূন্য কোন অদেখা জায়গা থেকে আসে না, আবার কে বা কিই বা দেখা, কিই বা অদেখা? সে কি বহিরঙ্গে কিছু দেখা বা না দেখার বোধ থেকে উদিত, কেননা আমরা তো জানি যে দৃষ্টির অবলোকন মায়া, মিথ্যা! না কি সে না আসে, না যায়?

“আনন্দ, তুমি জান না যে, তথাগতের গর্ভে শূন্যতা আর বোধির তন্মাত্রতা সদাসর্বদা পবিত্র হয়ে প্রস্ফুটিত, তারা মরজগতের সর্বত্রগামী, সর্বব্যাপী, অযাচিতভাবে তাঁরা সজীব প্রাণীকূলের আপনাপন কর্মানুযায়ী প্রকাশিত।

“পৃথ্বী, জল, অগ্নি, আর বায়ুর সঙ্গে শূন্যকে পঞ্চ মহা উপাদান বলে ধরা হয়, যাদের তন্মাত্র প্রকৃতি পরিপূর্ণ, এরা একভাবে তথাগতের গর্ভে বিচরণ করেন, এরা একমেবাদ্বিতীয়ম, এদের মৃত্যু কি পুনর্জন্ম বলে কিছু নেই।

(চলবে)

জেগে ওঠ – ২০ – জল ও শূন্যতা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments