জেগে ওঠ – ২২ – অবলোকন

“আনন্দ, যখন ঐ বিশাল মহাশূন্যের পানে দেখ, ঐ যে চরাচর ব্যাপী অসীম শূন্যতা, তার যে প্রকৃতি, আর দর্শণ অবলোকনের যে প্রকৃতি, তাদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই, এমনকি তাদের আপনতা, তাদের নিজস্বতার মধ্যে কোন সীমারেখাও নেই । মহাকাশ যদি কেবলই শূন্য হত, তাতে যদি সূর্য বা গ্রহ তারা না থাকত, সে মহাশূন্যের সারগর্ভতা বলে কিছু থাকত না। কোন বস্তুর না থাকার অর্থ মহাশূন্যের কোন ধারণাও না থাকা। আবার দৃষ্টি, শূন্যে তাকিয়ে আছ, অথচ কিছু দেখার নেই, এই কথারও কোন মানে হয় না। যেহেতু এখানে দুটি অবাধ মিথ্যা ধারণা প্রসূত ব্যাপার ঘটছে – সূর্য-গ্রহেরা মহাশূন্যে বিচরণ করছেন, আবর্তন করছেন, দৃষ্টির বোধটিও একটি অলীক বোধ, এই ভাবে বিচার করে দেখলে চরাচর জুড়ে কেবলই অনন্ত অলীক আপাত দৃশ্যের সমভিব্যাহার।

“যেহেতু তোমরা উপলব্ধি কর না, যে, এ সবই মনের মায়া, সবটাই ব্যক্তিগত অনুভূতি, তোমরা ব্যক্তিত্ববোধের কলুষতার কবলে পড়, এই যে সবটাই নিজের মত করে দেখা, এই হচ্ছে প্রথম কলুষতার বুনিয়াদ।

“এই হচ্ছে প্রথম কলুষতা, প্রথম মালিন্য, ভেদবোধের কলুষতা।

“এরপর, প্রপঞ্চময় জগতের সমস্ত বিষয়কে একে অপরের থেকে পৃথক জ্ঞান করতে করতে এক সময় তোমাদের শরীর আর মনের প্রক্রিয়াগত ভাবে একে অপরের অলীক অবলোকনের সঙ্গে এমনভাবে মিলেমিশে যায় যে তোমরা খুব সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো খেয়াল কর, অবয়বের একে অপরের থেকে পার্থক্য সম্বন্ধ নানাপ্রকার ভ্রান্ত ধারণা থাকে, এইভাবে ক্রমশ ভুলে যাও যে অবয়বে অবয়বের গভীরে কেউ কারো থেকে পৃথক নয়। আলোর বস্তু আর আঁধারের বস্তু, সত্যিই কি এরা একে অপরের থেকে আলাদা?

“এ হল দ্বিতীয় কলুষতা, অবয়বের কলুষতা।

“তারপর, চেতনার প্রক্রিয়া হেতু অবয়বের নানা রকমের ধারণা জন্মেছে, এই অবস্থায় এই নানাপ্রকার অবয়বের এক থেকে অপরকে পৃথক করতে করতে এই নানান রকমের অবয়বের মধ্যে কাউকে একান্তভাবে চাও, কাউকে তীব্র ঘৃণা কর।

“তৃতীয় কলুষতা, কামনা-বাসনার কলুষতা।

“আবার, অবয়বের ভেদবোধ থেকে কামনা-বাসনা জন্মেছে, দেখ কেমন করে একটি থেকে অপরটির ধারণা জন্মে, বস্তুকে মানুষ আঁকড়ে ধরতে চায়, আঁকড়ে ধরতে চেয়ে বোঝে না তাদের স্বরূপ, যে, এ সমস্তই মায়া। দিবারাত্র তোমাদের মন পরিবর্তিত হয়, আর যেইমাত্র মনের, চিন্তার পরিবর্তন হয়, তাকে তোমরা কিছু একটা সৃষ্টি কর, করে, সৃষ্টির মাধ্যমে স্থির ধরে রাখতে চাও। যেইমাত্র তোমাদের কাজ, তোমাদের প্রারব্ধ কর্মের হেতু আকার ধারণ করে, তারা অন্যান্য সচেতন প্রাণকেও পরিবর্তিত করে দেয়। মিথ্যা মায়ার কল্পনাজালে একে অপরকে আবদ্ধ করে রাখে,চেতন প্রাণীকূল তাদের কাঙ্খিত বস্তুকে আঁকড়ে ধরতে চায়। কামনা-বাসনা জানবে বন্ধুর বেশে শত্রু।

“এই আঁকড়ে ধরে থাকা চতুর্থ কলুষতা, আঁকড়ে ধরার কলুষতা।

“সব শেষে, তন্মাত্র মনের পরম চেতনায় তোমাদের দেখা, শোনা, ছোঁওয়া, চিন্তা, ঘ্রাণে, আস্বাদনে কোন তারতম্য নেই, এরা সকলে একে অপরের সঙ্গে পরিপূরক, অথচ যেই তারা একের বিরুদ্ধে অপরে মুখোমুখি হয়, তখনই তারা একের বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে। এই ভাবে অন্তরে বাহিরে দ্বিধাদ্বন্দের সৃষ্টি হয়, কালক্রমে, জরা বার্ধক্য আসে। এ হল পঞ্চম কলুষতা, দৌর্বল্যের, জরার, অসুখের, মৃত্যুর কলুষতা।

“কেন আনন্দ? কেন তোমরা বস্তুর কামনায় তাকে আঁকড়ে ধরতে চেয়ে, সেই অনিত্য অবয়ব, যার নাকি থাকার কথাই ছিল না, তার জন্য জরায়, দৌর্বল্যে নিমজ্জিত হও?

“আনন্দ! তুমি যখন ধ্যান কর, তোমার ধ্যানমগ্ন অবস্থায় শান্ত সমাহিত মনে যখনই এলোমেলো চিন্তার উদয় হবে, তখনি তাকে এই পাঁচ কলুষতার পেষন যন্ত্রে একে একে পিছিয়ে নিয়ে যেও, তাদেরকে সম্যকরূপে পরীক্ষা করে দেখো যে তারা কিভাবে তোমার মনের প্রশান্তিকে তছনছ করার উপক্রম করছে; দেখবে কোথাও কিছু একটাকে আঁকড়ে ধরা, কাউকে চাওয়ার কারণে, কোন অবয়বের কারণে, ভেদবুদ্ধিজনিত অজ্ঞানতার কারণে এ সব ঘটে। একই রকম ভাবে কাজের চাপে পড়ে মনে যখন কুচিন্তার,আবেগের, আসক্তির, কামনা-বাসনার উদয় হয়, সেই আবেগকেও পঞ্চ-কলুষতার নিষ্পেষণী-যন্ত্রে পাঠিয়ে নিজেকে জিজ্ঞাসা কর, “আনন্দ, যে মূর্ততা কেবল একটি ভেদবুদ্ধিগত কল্পনা বই আর কিছু নয়, তাকে চেয়ে কেন তুমি নিজেকে দুঃখভোগ আর দৌর্বল্যের পঙ্কে নিমজ্জিত হতে দিচ্ছ?”

“আনন্দ! তুমি যদি তোমার ইন্দ্রিয়ানুভূতি আর সচেতন বোধকে তথাগতের চিরন্তন পরমানন্দ বোধির সুরধুনীর সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চাও, তাহলে সর্বাগ্রে তোমাকে মৃত্যু ও পুনর্জন্মের যে শিকড় পঞ্চ-কলুষতা, অর্থাৎ – ভেদবুদ্ধির অজ্ঞানতা, অবয়ব, কামনা-বাসনা, আঁকড়ে ধরা না ত্যাগ করতে শেখা আর দৌর্বল্যের – কলুষতা, প্রোথিত করেছে, তাকে উপড়ে ফেলতে হবে। তারপর না-মৃত্যু, না-পুনর্জন্মের যে তন্মাত্র মন, তাতে পূর্ণ ধ্যান ও মনোনিবেশের নিয়ত অভ্যাস শুরু করতে হবে।

“হ্যাঁ আনন্দ, প্রশান্ত মনে, একটি গাছের তলায় বা অন্যত্র উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে উপবেশন কর। তারপর চোখ বন্ধ কর। ধীরে ধীরে, শান্ত মনে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে থাক, শরীরটাকে শিথিল করে দাও, রিল্যাক্স কর, বিশ্রাম নাও, মনে মনে মহা আলোকের কথা স্মরণে আন, আর চিন্তা করতে থাক: ‘এ মন অমৃত, এ মন অ-পুনর্জাত, এ মন পরম পবিত্র তন্মাত্র মন, এই উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কই পরম সত্য, এ ব্যতীত আর সবকিছু শুধু স্বপ্ন, শুধু মায়া।’

“তারপর যখন বোধ হবে যে কোন কিছু, বা কেউ, না জন্মায়, না মরে, তখন না অস্তিত্ব, না অনস্তিত্বের বোধ থাকবে, তখন শান্ত হবে মন । সেই শান্ত মনের পথ বেয়ে তুমি তোমার ঐ মৃত্যু আর পুনর্জন্মের মিথ্যা ধারণাপূর্ণ মায়া মনকে পালটে দেবে পরম সৎ, স্বচ্ছ পরমবোধি মনে; আর এই করতে করতে তোমার উজ্জ্বল, আদি, অবচেতন তন্মাত্র মনের নাগাল পাবে।

এভাবেই শুরু কর।

“তুমি যদি মনকে স্বচ্ছ, তুমি যদি মনকে তার আদি অকৃত্রিম তন্মাত্রতায় নিয়ে যেতে চাও, সেই প্রয়াস এমনভাবে চালিয়ে যাও যেন একটা ঘড়া ভর্তি ঘোলাটে জলকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করছ। জলের পাত্রটিকে খানিকক্ষণ এক জায়গায় রেখে দিতে হবে, জলের মধ্যে মিশে থাকা বালি-ময়লা নীচে থিতিয়ে গেলে তবে না সে জল পরিষ্কার হবে; মনের অবস্থাও তদ্রূপ; যত রকমের কুচিন্তা, কলুষতা, যা মনকে বিব্রত করে, তাদের থিতিয়ে যেতে দাও। তারপর স্বচ্ছ জল ছেঁকে বার কর; যখন অজ্ঞানতা, অবয়ব, বাসনা, আঁকড়ানো, দৌর্বল্য মন থেকে মুছে যাবে। মন যখন স্বচ্ছ, মন যখন সেই একমেবাদ্বিতীয়ম একমাত্রায় নিবেশিত হবে, সে তখন আর কোন বস্তুকে আলাদা করে দেখবে না, তাদের এমন করে দেখতে পাবে তারা যেন সব এক হয়ে গেছে, সেখানে কুচিন্তার, দুরাবেগের প্রবেশ করার কোন স্থান নেই, নির্বাণের অনির্বচনীয়, অপার্থিব পবিত্রতায় সব মিলে মিশে এক হয়ে আছে।

“আনন্দ! তাই বলে ক্ষণমাত্রের জন্যও ভেব না যে ক্ষণে ক্ষণে উথ্থিত চিন্তাতরঙ্গকে রুখেছ মানে মনও স্তব্ধ হয়েছে।

“ঠিক যেমন হঠাৎ করে ঘন্টা বাজালে মুহুর্তমাত্র শব্দ হয়, তারপর তার শব্দ ক্রমে ক্রমে মিলিয়ে যায়, আর তারপর আবার নৈঃশব্দ, তার মানে কি তোমার শ্রবণশক্তিও মিলিয়ে গেল?

“আনন্দ, এ কথা বোল না যে তোমার মন, তাবৎ জগতের আবির্ভাব অন্তর্ধান, মৃত্যু-পুনর্জন্ম, এইরকম সব নানান রকমের অবস্থা থেকে এতটাই পৃথক যে, চিন্তার যে অবলোকন, তার নিজের কোন তন্মাত্র অবস্থাই নেই। ওরকম হয় না।

“সকল সচেতন প্রাণী, অনাদি অনন্তকাল থেকে সুন্দর দৃশ্য,মধুর সঙ্গীত, সুখের অনুভূতি, আশ্চর্য আস্বাদ, সুগন্ধ,এসবের জন্য আকুল; মনে একের পর এক চিন্তা, চিন্তা থেকে ক্রমাগত কাজ, সদাসর্বদা ভাবে মনকে কাজে লাগাতে হবে, বোঝে না যে মন “কাজে লাগানোর” উর্দ্ধে, মানুষ কখনো উপলব্ধি করে না যে মনের চরিত্র পরম পবিত্র, মন তন্মাত্র, মন অপার্থিব; মানুষ ভাবে না বলে সে চিরন্তন পথে না চলে, সে পঞ্চশর, পঞ্চ-কলুষতার ফাঁদে পড়ে ক্ষণমাত্র, অনিত্যতা, মৃত্যু-পুনর্জন্মের পাকে পড়ে। যার ফলে জন্ম-জন্মান্তর ধরে কেবল কলুষতা, অনিত্য জীবনের সংগ্রাম, আর দুঃখভোগ।

“জেতবনের মাটিতে পড়ে থাকা শত শত মৃত পাখির শবের মতন আনন্দ, এই জীবন। এ প্রশ্নটা করা যাবে কি যাবে না, যে অবয়বে কি সুখ?

“আনন্দ, জন্ম-মৃত্যুর দাসত্ব শৃঙ্খল আর অনিত্য জীবনের ভীতি থেকে যদি মুক্তির পথ তুমি জানতে, যদি জানতে যে অক্ষয় অমরত্বে, যা কিনা অতীন্দ্রিয়, যার সঙ্গে সময় কি ত্বরিত জীবনের কোন সম্পর্ক নেই কেননা সে সুগত (সে-যে-সতত-সদাসর্বদা-সু), তাতে যদি যথাযথ মনোনিবেশ করতে পারতে, তাহলে সেই চীর-ঔজ্জ্বল্য তোমাকে আলোকমণ্ডিত করে রাখত, আর সেই অমল আলোয় ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভেদবুদ্ধিগত ঘটনার অবলোকন, মিথ্যা কল্পনা আমি না-আমি, সব অপসৃয়মান, কেননা চিন্তন মস্তিষ্ক-মনের তাবৎ ধারণা মিথ্যা, সাময়িক, তোমার ভেদবোধগত মরজাগতিক চেতনা শুধু সাময়িক চলমান চিন্তা, আর কিছু নয়। তুমি যদি মৃত্যু-পুনর্জন্ম আর অনিত্যতার ভীতি – এই দুটিকে জয় করতে পারতে — আর ধর্মচক্ষু যে অমরত্বকে অবলোকন করেন, তাতে নিবেশিত হতে পারতে, সেই অমরত্ব, যাকে এতকাল ধরে তুচ্ছজ্ঞান করে এসেছ, যাকে এতকাল ধরে ভেবে এসেছ অবাস্তব, হাস্যকর, তোমাদের সদাব্যস্ত জীবনে যার কোন জায়গা নেই, অথচ যাকে এই এখন উপলব্ধি করছ যে, এ-ই সত্য, বাকী সমস্ত কিছু পুতুল-নাচ, বুদ্ধ-পর্বতে শুধু ওঠা আর নামা, তখন দেখতে আনন্দ, কোথাও কোন ব্যর্থতার ভয় থাকত না, হেরে যাবার প্রশ্ন উঠত না, পরম সৎ আলোকপ্রাপ্তিতে সত্যিই কোন আর ভয়, কোন দ্বিধা থাকত না আনন্দ।”

সহসা সকলের মনে হল জেতবনে সমস্ত বৃক্ষরাজি, জেতবনের সরোবর তটে সকল তরঙ্গ হতে যেন ধর্মের সঙ্গীত উদ্গীত হল, কে যেন তাদের ওপর যেন উজ্জ্বল আলোর জালিকা বিছিয়ে দিলেন। এমন অপার্থিব সৌন্দর্য ভক্তগণ এর পূর্বে কখনো প্রত্যক্ষ করেন নি। সকলে নীরব শ্রদ্ধায় চেয়ে রইলেন। কিছু না বুঝতে পেরেই তাঁরা রত্ন-সমাধির তূরীয় অবস্থায় প্রবেশ করলেন, অস্যার্থ, সকলের অন্তরে একযোগে অতীন্দ্রিয় তীব্র এক নীরবতার “গর্জন” যেন ধ্বনিত হল, সেই বারোশ’ তেত্রিশজন মানুষের উপরে লাল নীল, হলুদ শ্বেত – নীরব ধারায় যেন অযুত পুষ্পদলের ধারাস্নান হল, সে শতদল স্বর্গীয় শূন্যতায় রঙে রঙে মিলে মিশে একাকার। শুধু তাই নয়, তাঁদের মনে স্বহা-বিধৃত পৃথিবীর যে পর্বত, সমুদ্র, নদী-জঙ্গলের ভিন্নতার প্রকারভেদী ধারণা ছিল, সব যেন কোথায় মিলে মিশে এক হয়ে, কোথায় তারা লীন হয়ে গেল, পড়ে রইল শুধু আদি মহাবিশ্বের পুষ্পখচিত একমাত্রিকতা। আর তার গহ্বরের মাঝখানে তাঁরা পদ্মাসনে উপবিষ্ট ভগবান তথাগতের রূপ প্রত্যক্ষ করলেন, তথাগত, যিনি তথতা, যিনি এ জগতের মণি, এ জগতের স্তম্ভ!

তখন মঞ্জুশ্রী ভগবান বুদ্ধদেবকে সম্বোধন করে বললেন, “পরমারাধ্য ভগবন! প্রভু যখনই স্বর্গ হতে জন্ম-জন্মান্তরের দুঃখী মর্ত্যজগতে অবতরণ করেছেন, তখনই তিনি আমাদের তাঁর আশ্চর্য আলোকোজ্জ্বল শিক্ষায় আমাদের ধন্য করেছেন। তাঁর এই শিক্ষা আমরা সর্বাগ্রে আমাদের কর্ণে শ্রবণ করি, তথাপি যখন সেই শিক্ষা আমরা সর্বান্তকরণে উপলব্ধি করতে সক্ষম হই, তখনি তাকে আমরা তূরীয় শ্রবণক্ষমতাবলে আত্তীকৃত করতে পারি। অতএব নব্য সাধকদের কাছে অতীন্দ্রিয় শ্রবণবোধকে জাগ্রত করার বিশেষ তাৎপর্য আছে। সাধকের মনে সমাধি অবস্থা প্রাপ্তির যাচ্ঞা যখন গভীর হবে, তখন সে তাকে তার শ্রবণের অতীন্দ্রিয় ক্ষমতাবলে আয়ত্ত করতে সক্ষম হবে। প্রথমদিকে, কখনো কখনো, কোন বদ্ধ কক্ষে, কি বায়ুস্তব্ধ মধ্যরাতে যখন চরাচর নিদ্রামগ্ন, যখন চারিদিকের নৈঃশব্দে কান ঢেকেছে, তখন নব্য সাধক পরম সৎ-এর একান্ত শব্দে মনোনিবেশ করতে পারবেন, সেই শব্দ, যা সমস্ত শব্দের অনুপস্থিতি, অতীন্দ্রিয় পরম শূন্যতার শ্রুতি। আর তৎক্ষণাৎ তিনি এই অক্ষয় শ্রুতিকে উপলব্ধি করবেন যা তাঁর আপন অমৃত, অ-পুনর্জন্মিত, সৎচিতে অনাদি অনন্তকাল ধরে হয়ে চলেছে । হে ভগবন, সেই অপার স্তব্ধতায় তিনি বয়ে চলা শিক্ষাকে শ্রবণ করবেন। অতঃপর, তাকে তিনি সর্বত্র অবলোকন করবেন।

“অগণিত কল্প-ধরে – গঙ্গানদীর অযুত বালুকারাশির নয় অগণিত কল্প ধরে – অবলোকিতেশ্বর বুদ্ধ, যিনি সকলের প্রার্থনা শোনেন ও ইচ্ছাপূরণকরেন, সেই পরম কারুণিক বোধিসত্ত্ব, মহাবিশ্বের দশদিকে সর্ব বুদ্ধ-জগতে তাঁর নির্বাক পুণ্য শিক্ষার প্রকাশ করেছেন ও মুক্ত, নির্ভীক অনন্ত তূরীয় ক্ষমতাবলে সকল চেতন প্রাণীগণকে দাসত্ব ও দুঃখভোগ হতে নিবৃত্তি দানের শপথ গ্রহণ করেছেন। অবলোকিতেশ্বরের সেই তূরীয় শব্দ কি অপার্থিব সুমধুর ! সে এক ঐশ্বরিক শব্দ! সেই শব্দ অন্তর্মুখী সমুদ্রের ঢেউ-এর শব্দ। সকল চেতন প্রাণী যাঁরা আকুল হয়ে সাহায্যের প্রার্থনা করছে, তাদের কাছে এ নাদ শান্তি ও মুক্তি বয়ে আনে; নির্বাণের শান্তির যাঁরা প্রার্থনা করেন, তাঁদের কাছে এ এক অক্ষয় বোধ নিয়ে আসে।

“এই এখন, যখন ভগবান তথাগতের কাছে আমার আহ্বান নিবেদন করছি, তিনি, এই একই সময়ে, অবলোকিতেশ্বরের তূরীয় সংগীত শ্রবণ করছেন।

ঠিক যেমন, আমরা যখন একাকী ধ্যানমগ্ন হয়ে বসি, আমাদের কানে ঢাকের দ্রিমি দ্রিমি ভেসে আসে, আর তখন মন যদি সে শব্দ শুনে, অবিচল শান্ত থাকে, সেই হল যথার্থ, সম্যক সহন।

“শরীর কোন কিছুর সংস্পর্শে এলে ধারণার উদয় হয়, চোখের দৃষ্টি বস্তুর অস্বচ্ছতা দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়, ঘ্রাণ ও স্বাদেরও ওই, কিন্তু মস্তিষ্ক-মনের ব্যাপারটি অন্যরকম। চিন্তার উদয় হয়, চিন্তা একে অপরের সঙ্গে মেশে, বয়ে চলে। দূর থেকে যে শব্দ ভেসে আসে, আর পাশের ঘর থেকে যে শব্দ ভেসে আসে সে উভয়কেই শোনে। অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের সেই সূক্ষ্ম ক্ষমতা নেই, শ্রবণ চরিত্রগত দিক থেকে দেখলে মাধ্যম হিসেবে সৎচিৎ।

“শব্দের চেতনা, সে কি নিঃশব্দে, কি জঙ্গম অবস্থায়, উপলব্ধি করা যায়। সে অস্তিত্ব থেকে অনস্তিত্বে বিচরণ করে। যখন কোন শব্দ থাকে না, বলা হয় শ্রবণ নেই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে শ্রবণ হারিয়ে গেছে। সত্যি! যখন কোন শব্দ নেই কোথাও, তখন শ্রুতি প্রখর, আর যখন চারিদিক সশব্দ, শ্রবণের ক্ষমতা সবচেয়ে কম। যে সাধক আবির্ভাব আর অন্তর্ধানের এই মায়ার খেলা থেকে মুক্ত হয়েছেন, যথা, মৃত্যু আর পুনর্জন্মের থেকেও মুক্ত, তিনি যথার্থ অমরত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন।

“স্বপ্নেও, যখন সমস্ত চিন্তা স্তব্ধ হয়ে যায়, তখনো শোনার ক্ষমতা সদাজাগ্রত থাকে। এ যেন সম্বোধির আরশি, যে চিন্তন মনেরও তূরীয়, কেননা সে শরীর ও মনের চেতনেরও উর্দ্ধে বিচরণ করে। এই স্বহা জগতে, অন্তর্নিহিত, তূরীয় নাদ হয়ত সর্বত্রব্যাপী, তথাপি চেতন প্রাণীকূল তাঁদের অন্তর্নিহিত শ্রুতি বিষয়ে সচরাচর অচেতন। শব্দ যখন শ্রুতিমধুর কি কটু হয়, তখনই তাঁরা সংবেদনা জ্ঞাপন করেন।

“আনন্দের স্মৃতি যদিচ প্রখর, তবু সে কুপথে পড়া থেকে নিজেকে এড়াতে পারেনি। সে বেচারী যেন এক নিষ্ঠুর সমুদ্রে ভেসে গেছে। যদি সে চিন্তার স্রোতে ভাসা থেকে মন নিবৃত্ত করতে পারে, তবে সে শীঘ্রই তন্মাত্র মনের প্রজ্ঞা ফিরে পাবে। আনন্দ! আমার কথা শোন! আমি সদা সর্বদা ভগবান বুদ্ধের বাণীর শরণ নিয়েছি, যেন তিনি আমার কাছে অনির্বচনীয় রত্ন-সমাধির ধর্ম তত্ত্বের প্রকাশ করেন। আনন্দ! তুমি কামনা-বাসনা রহিত না হয়ে, তোমার হৃদয়-দৌর্বল্য-কলুষতা-মত্ততা থেকে মুক্ত না হয়ে তুমি বুদ্ধ-জগতের গুপ্ত-রহস্যের সন্ধান করেছিলে। যার ফলে তোমার স্মৃতিতে বৈষয়িক জগতের অগাধ জ্ঞান অর্জন করেছ আর ভুলভ্রান্তির এক মিনার গড়ে তুলেছ।

(চলবে)

জেগে ওঠ – ২২ – আনন্দ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments