জেগে ওঠ – ২৩ – দেবদত্ত প্রভৃতি

“তুমি ভগবান বুদ্ধের বাণী মুখস্ত করে ধর্মের শিক্ষালাভ করেছ। তোমার আপন মনে অন্তর্নিহিত যে ধর্মের বাণী, কেন তার প্রতি মনোযোগ দিয়ে সেই বাণীকে নিজের জীবনে প্রতিফলিত করে শেখ নি? তূরীয় শ্রবণের যে অবলোকন তা তোমার আপন ইচ্ছাধীন কোন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয় নি যে। হয়ত কখনো তুমি যখন তূরীয় শ্রবণের বিষয়টি চিন্তা করে দেখছিলে, তখন বাইরে থেকে অন্য আরেকটি কোন শব্দ হল, অমনি তোমার মন অন্যদিকে চলে গেল, তোমার মন বিব্রত হল, দ্বিধাবিভক্ত হল। যেইমাত্র তুমি আর সমস্ত শব্দ অগ্রাহ্য করতে পারবে, এমনকি তূরীয় নাদের যে ধারণা, তাও তোমার কাছে নিঃশেষিত হবে, তুমি তোমার অন্তর্নিহিত শ্রবণক্ষমতাকে বুঝতে শিখবে।

“যেই মুহুর্তে তোমার এই শ্রবণের সংবেদনা তার মূল সূত্রে ফিরে যাবে, যে মুহুর্তে তুমি তার অসারতা অনুধাবন করতে পারবে, মন তৎক্ষণাৎ সমস্ত সংবেদী ইন্দ্রিয়ের অসারতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে। সঙ্গে সঙ্গে দেখার, শোনার, আঘ্রাণের, স্বাদের, স্পর্শের, চিন্তার দাসত্ব থেকে তোমার মুক্তি হবে। মুক্তি হবেই, কেননা এরা সব একই রকমের মায়াবী, অসার। অস্তিত্বের তিন মহাজগৎকে দেখবে তারা যেমন, তেমন ভাবে, যেন আকাশে পুষ্পনিচয়।

“তারপর তোমার যে মুহুর্তে শ্রবণের মিথ্যা মায়া হতে মুক্তি হবে, তখন সমস্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যাপারও অপসৃত হবে, তোমার সহজাত তন্মাত্র মন হয়ে উঠবে সদসৎ। আপন হতে তার অন্তর্নিহিত ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পাবে সর্বত্র, ও তুমি যখন ধ্যানের প্রশান্তিতে বসবে, তোমার মন পরম আকাশে স্থির হয়ে মিলবে।

“আনন্দ! তুমি পুনরায় যখন এই মরজগতে ফেরত আসবে, তখন তোমার মনে হবে সমস্ত কিছু স্বপ্নবৎ। চিতি নামে নারীর সঙ্গে তোমার অভিজ্ঞতা মনে হবে স্বপ্নের মতন, তোমার শরীরীবোধ হারিয়ে যাবে। সকল মানুষ নারী কি পুরুষকে দেখে মনে হবে এরা যেন কোন এক অদৃশ্য জাদুকরের হাতের পুতুল, কিসের ইশারায় তাদের জীবন চলছে। প্রতিটি মানুষকে মনে হবে যেন একেকটি কলের পুতুল, আপন খেয়ালে নিজে নিজেই বেজে চলছে, আর তারপর কলের পুতুল যেমন, এরাও তেমন। যেইমাত্র দম ফুরিয়ে যাবে, শুধু যে সে থেমে যাবে তাই নয়, তার অস্তিত্বও বিলীন হবে।

“তো এই হল ষড়েন্দ্রিয়ের খেলা, এরা মূলত এক অভিন্ন শক্তির ওপর নির্ভরশীল, অথচ অজ্ঞানতাবশত ছ’টি প্রায়-স্বাধীন অংশে বিভক্ত হয়ে আছে। যেদিন একটি অঙ্গ তার উৎসে ফিরে যাবে, সেদিন আর পাঁচটা অঙ্গও একইভাবে তাদের কাজ সমাপ্ত করে ফিরে যাবে। জগতের সকল কলুষতা দূর করতে একটিমাত্র সৎচিন্তাই যথেষ্ট, তাতেই তোমার সম্যক বোধি অর্জন হবে। তার পরেও যদি মনে কলুষতা রয়ে যায়, মনে প্রাণে তথাগতের সম্যক আলোকপ্রাপ্তির ধ্যান কোর।

“এই মহাসভার সমস্ত ভ্রাতাদের বলছি, আর হ্যাঁ আনন্দ তোমাকেও, তোমরা তোমাদের বহির্জাগতিক চেতনাকে অন্তর্মুখী করে তোল; তোমাদের পরমানন্দ মনকে অনুধাবন কর, কেননা যেইমাত্র তাকে উপলব্ধি করবে, তৎক্ষণাৎ তোমাদের পরমানন্দ আলোক প্রাপ্ত হবে।

“নির্বাণের এই একমাত্র পথ; আদিকাল হতে সকল তথাগতগণ এই পথই অবলম্বন করেছেন। তদুপরি, ইহকাল ও ভাবীকালের সমস্ত বোধিসত্ত্ব-মহাসত্ত্বগণ পরম আলোকত্বলাভ করার অভিপ্রায়ে এই পথই অবলম্বন করেন। বহুকাল পূর্বে এই স্বর্ণপথে অবলোকিতেশ্বর অগ্রসর হয়েছিলেন, আবার এযুগে আমিও তাঁদেরই একজন।

“প্রভু জানতে চেয়েছেন কি প্রকারে নির্বাণলাভের এই মহৎ দ্রুতগামী পন্থা আমরা অবলম্বন করেছি। আমি নিজে জানি অবলোকিতেশ্বর কি উপায়ে এ পথ ধরেছিলেন ও এই মার্গই সবচেয়ে দ্রুতগামী, কেননা আর সব পন্থা অবলম্বন করতে গেলে ভগবান বুদ্ধের তূরীয় শক্তিবল ও তাঁর সাহায্য প্রয়োজন। এমনকি কেউ যদি তার সমস্ত পার্থিব যোগাযোগ ছিন্ন করে, তাহলেও তার পক্ষে সব রকম আচার আচরণ পালন করা হয়ত সম্ভব হবে না। বয়োজ্যেষ্ঠ, কনিষ্ঠ সাধকদের জন্য নানান পন্থা বিদ্যমান, তবে সর্বসাধারণের জন্য এইটিই সবচেয়ে সহজ উপায় — মনকে শ্রবণেন্দ্রিয়ে স্থিত ও নিবেশিত করে এই ধর্মদ্বারপথে অন্তর্মুখী করে তোলা, যাতে তন্মাত্র মনের তূরীয় নাদ সে শ্রবণ করতে সক্ষম হয়। এ পথ অবলম্বন করাই সবচেয়ে সহজ ও বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

“হে প্রভু! ভগবান তথাগতের অন্তর্নিহিত গর্ভের সুমুখে আমি প্রণিপাত করি, যিনি অনির্বচনীয়, যিনি অনুপম, যিনি সর্বংসিদ্ধ, যিনি সর্ব প্রকার কলুষতামুক্ত, আমি সেই ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করি তিনি যেন ভবিষ্যতের সর্বমানবের হিতার্থে তাঁর অপার করুণা প্রদান করেন, আমি যেন ইহকল্পে আনন্দ ও আর সকল চেতন প্রাণীগণকে কিভাবে এই আশ্চর্য ধর্মদ্বার অতিক্রম করে আপন মনের অভ্যন্তরে রচিত তূরীয় নিনাদ উপলব্ধি করতে হয় তার শিক্ষা প্রদান করতে পারি। যদি কোন সাধক সহজবোধ্য উপায়ে তূরীয় শ্রবণলাভের উদ্দেশ্যে কেবলমাত্র ধ্যানে তার মন সংযোগ করতে পারে, তার অন্যান্য ইন্দ্রিয়ও কালক্রমে ঐকতানে সমবেত হবে। এইভাবে, অন্তরনিহিত শ্রবণবলে সে তার পরম তন্মাত্র মনকে উপলব্ধি করতে পারবে।“

তখন আনন্দ ও সেই মহাসভায় অন্যান্য যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা কায়-মনে পবিত্র হলেন, তাঁদের এই বোধ হল। তাঁরা ভগবান বুদ্ধের বোধির স্বরূপ গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন, এ বিষয়ে তাঁদের স্বচ্ছ জ্ঞান অর্জন হল। তারা চূড়ান্ত সমাধি ধ্যানের পরমানন্দ অনুভব করলেন। অভিজ্ঞ বণিক যেমন ব্যবসার উদ্দেশ্যে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দূরদেশ পাড়ি দেয়, তাঁদেরও তেমন ধর্মের পথে প্রত্যয় দৃঢ় হল। তাঁরা ধর্মপথে যাতায়াতের মার্গ-নির্দেশিকা পেলেন। এই মহাসভার সকল ভক্তশিষ্যরা তাঁদের আপন আপন তন্মাত্র মন উপলব্ধি করলেন, এবং প্রতিজ্ঞা করলেন অতঃপর, তাঁরা ইহজগতের সাংসারিক জটিলতা, সাংসারিক মলিনতা থেকে মুক্ত হয়ে সদাসর্বদা ধর্ম-চক্ষুর পরম ঔজ্জ্বল্যে নিত্যদিন অতিবাহিত করবেন।

তখন ভগবান বুদ্ধদেব, যাঁরা ইহজীবনে বোধিসত্ত্ব-মহাসত্ত্বের স্তর অর্জন করতে চান, তাঁদের জন্য নিম্নলিখিত তিনটি আদেশ প্রদান করে সভা সমাপ্ত করলেন:

১। মন নিবেশ করতে হবে

২। উপদেশ পালন করতে হবে

৩। ধ্যানাভ্যাস করতে হবে

“মন নিবেশ করতে হবে” অর্থে সদাসর্বদা সদবুদ্ধি পালন করতে হবে, যে যেমন তাকে তেমন করেই দেখতে হবে, “কে কি” তার চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যেন না ঠকে যেতে হয়, ও কোন কিছুকে যেন আঁকড়ে থাকতে না হয়। এ যেন একজন মানুষ হঠাৎ করে মধ্যরাত্রে পরম সত্য দর্শণ করে জেগে উঠলেন, তখন তাঁর ভারি ভাল লাগল, মাথা নাড়িয়ে বলে উঠলেন, “সবকিছুই সেই এক”। স্বপ্নহীন নিদ্রা থেকে তিনি অকলঙ্ক একত্রিত এক জগতে জেগে উঠলেন,যে জগতে আগে “নির্ভুল একত্রীকরণ” বলে কিছুই ছিল না, আর যেন তিনি তাবৎ সৃষ্ট বস্তুকে এক মহাশূন্যতায় অবলোকন করলেন, এক পরম আদি সত্যের শূন্যতার মহাসমুদ্রে তাদের আপাত প্রকাশ ঘটেছে, তারা কেউ আলাদা কিছু নয়, তারা সবাই এক হয়ে গেছে, এক বৃহৎত্বে।

“উপদেশ পালন করতে হবে” অর্থে সৎ জীবন যাপনের চারটি নিয়ম কঠোরভাবে পালন করতে হবে। এ করতে পারলে সাধক মাদকতা থেকে মুক্ত হবেন, দুঃখভোগ থেকে তাঁর মুক্তি ঘটবে, অতএব সংসার থেকে তিনি মুক্ত হবেন, এবং তাবৎ সাংসারিক ভুয়োদর্শণ, মৃত্যু-পুনর্জন্মবোধ থেকেও তাঁর মুক্তি হবে। এই উপদেশাবলী সমগ্র জীবজগতের প্রতি করুণাবশত, আত্মশুদ্ধ, “হে সাধুগণ! এই তরীকে ভারমুক্ত করুন। যেইমাত্র এ তরী ভারমুক্ত হবে, সে দ্রুতগমন করতে সক্ষম হবে, আসক্তি-ঘৃণা উভয়কেই পরিহার করে আপনারাও নির্বাণ লাভ করবেন।”

এই চারটি নিয়ম হল:

১। জেগে ওঠ, কামভাব নিবৃত্ত কর, কামভাব, কামোন্মত্ততা, কামাসক্তি থেকে যুদ্ধংদেহি ভাব জেগে ওঠে, আর সেখানেই দুঃখবোধের উৎপত্তি

২। জেগে ওঠ, অপরের প্রতি নিষ্ঠুরতা পরিহার কর, নিষ্ঠুরতা জ্ঞানীজীবনের হন্তারক

৩। জেগে ওঠ, কামনা-বাসনা আর তস্করবৃত্তির নিবৃত্তি কর, তোমার শরীরকে কেবল তোমার নিজের শরীর জ্ঞান না করে অন্য সমস্ত চেতন প্রাণের সঙ্গে একাত্ম কর

৪। জেগে ওঠ, শঠতা, কোপনতা, মিথ্যা আচরণ বন্ধ কর, জীবনে যেন কোন মিথ্যা কিছু না থাকে, ফেটে যাওয়া শিশিরবিন্দুতে কি কিছু গোপন থাকে?

“ধ্যান অভ্যাস কর” অর্থে প্রতিদিন নিয়ম করে ধ্যান করা যাতে সমাধি ধ্যানের অবস্থা ও সমাপত্তির আধ্যাত্মিক ক্ষমতা অর্জন করতে পার, পুরাকাল ও ভাবীকালের মহৎ জ্ঞানীজনেরা যে কথা বলে গেছেন ও বলবেন, এতে সাংসারিক জীবন হতে উদ্ধারের অবস্থাপ্রাপ্ত হবে।

ভগবান বুদ্ধদেব যখন সুরঙ্গমা সূত্রে লিখিত এই উপদেশ সমাপ্ত করলেন, তখন সমবেত ভিক্ষু-ভিক্ষুণী, স্ত্রী-পুরুষ-নির্বিশেষে সকল গৃহী ভক্তগণ, মহাপণ্ডিত যাঁরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, অপরাপর বুদ্ধগণ, সাধুগণ, অর্হৎগণ, সদ্য-শিষ্যত্ব-গ্রহণকারী মহাশক্তিধর রাজন্যবর্গ – এঁদের সকলের হৃদয়ে অপার আনন্দ বোধ হল। হৃষ্টচিত্তে সকলে ভগবান বুদ্ধদেবকে আন্তরিক বিনম্র শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে প্রস্থান করলেন।

দেবদত্ত পরবর্তীকালে কুখ্যাত হয়েছিল। সে নিজের মত করে অপর একটি সম্প্রদায় তৈরী করার চেষ্টা করে; সে সম্প্রদায়ের নিয়ম কানুন বুদ্ধদেব যা নিয়মের কথা বলতেন তার থেকে আরো কড়া। দেবদত্ত নানান রকমের জাদুবিদ্যা, বিশেষ করে সম্মোহনী বিদ্যা, আয়ত্ত করেছিল। এসব সে মহারাজ বিম্বিসারের পুত্র যুবরাজ অজাতশত্রুর ওপর প্রয়োগ করে, এই করে অজাতশত্রু বিম্বিসারকে হত্যা করার সংকল্প করেছিলেন। মগধের রাজা হয়ে অজাতশত্রু দেবদত্তের জন্য একটি মঠ তৈরী করে দিয়েছিলেন। দেবদত্ত নতুন রাজার ওপর প্রভাব খাটিয়ে রাজাকে প্ররোচিত করেছিল যে গৌতমকে সংঘের অধ্যক্ষ পদ থেকে সরিয়ে দিতে, এই বলে যে মহৎ জনকে বার্ধক্য গ্রাস করেছে।

বুদ্ধদেব দেবদত্তের এই সমস্ত অনাচার উপেক্ষা করে বললেন, “ও মহাসমুদ্রে এক ঘড়া বিষ ঢেলে ভাবছে সমস্ত সাগর বুঝি বিষিয়ে দেবে।”

দেবদত্ত দেখলে যে পরমারাধ্যের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেবার যে ফন্দি সে এঁটেছিল, তাতে বিশেষ কাজ হল না। সে উপলব্ধিও করেনি যে পরমারাধ্য জন ক্ষমতা কি দৌর্বল্য, এই নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। তখন দেবদত্ত স্থির করল তাঁকে হত্যা করবে। এই মনে করে একদল দস্যুকে পাঠাল ভগবনকে হত্যা করতে, কিন্তু তারা তাঁর দর্শণ পাওয়ামাত্র, তাঁর প্রেমময় রূপ, তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী শুনে এমনই মোহিত হয়ে গেল যে উল্টে তাঁর শরণ নিল। গৃধ্রকূট পাহাড় থেকে একটা মস্ত পাথর গুরুদেবের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হল, কিন্তু তা নিমেষে দুটুকরো হয়ে গেল, তাতেও তাঁর কোন ক্ষতি হল না। একবার মহৎ জন যে সময় রাজপথ ধরে যাবেন, ঠিকক সেই সময়ে একটি মত্ত হস্তীকে রাজপথে ছেড়ে দেওয়া হল । বুদ্ধদেবের দর্শণ মাত্রই প্রকাণ্ড ভয়ঙ্কর প্রাণীটি তাঁর সামনে শান্ত হয়ে বসে রইল। এ যেন আসিসির সেন্ট ফ্রান্সিসের মতন, বুদ্ধদেবেরও পশুদের ওপর আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। ভগবন সেই প্রকাণ্ড পশুটির মস্তকে তাঁর পদ্ম-মুদ্রা রাখলেন, চাঁদ যেমন চলন্ত মেঘের ওপর আলোক বর্ষণ করে, সেই রকম বুদ্ধদেব স্নেহভরে তাকে বললেন,

“ছোট্ট হাতি কাঁটাবন ভেঙে ফেলে, তাকে আদর করলে জানি যে সে মানুষের উপকারে লাগে। কিন্তু যে মেঘ এই হস্তীর বার্ধক্যের যন্ত্রণা দূর করে, তার ভার কেউ সইতে পারে না। ওগো তুমি! দুঃখের পাঁকে নিমজ্জিত। এখনও যদি না ত্যাগ কর, লোভ, ক্রোধ, মায়া যে ক্রমশ বাড়তেই থাকবে।”

“ধনপালক নামে হাতিটি, দুর্গন্ধে কাদায় ভেসে যাচ্ছে তার কপাল, তাকে ধরে রাখা দায, আবদ্ধ অবস্থায় সে একটি দানাও মুখে তুলল না, হাতিটি হস্তীবনে যেতে চায়” (ধম্মপদ)

শিষ্যদের বুদ্ধদেব বললেন, “যুদ্ধে হস্তী যেমন শর সহ্য করে, সেই রকম আমিও নীরবে বহু অত্যাচার সহ্য করেছি। এ পৃথিবীর স্বভাব অতি কুটিল। মানুষ হাতী পুষে তাকে যুদ্ধে নিয়ে যায়; রাজা পোষ মানানো হাতীর পিঠে চড়েন; অথচ দেখ পোষ মেনেছে যে, সবথেকে শক্তি তারই বেশী; সে নীরবে কত না অত্যাচার সহ্য করে। পোষ মানলে অশ্বতরেরাও কাজে আসে, সিন্ধু প্রদেশের সুদর্শন অশ্বেরাও, এমনকি বৃহৎ দন্তবিশিষ্ট হস্তীদলও তাই; তবে যে মানুষ নিজেকে পোষ মানাতে পারে সে সকলের চেয়ে বড়।

কুচক্রী দেবদত্ত আর তাঁর সুপুত্র রাহুল, এই দুজনের প্রতি বুদ্ধদেব সম-মনস্ক ছিলেন। সংঘের অন্যান্য সদস্যরা দেবদত্তকে নিতান্ত “মূর্খ” বলে জ্ঞান করতেন। প্রতিটি আলোকপ্রাপ্ত ভিক্ষু জানতেন যে একদিন দেবদত্তও বুদ্ধরূপে অবতীর্ণ হবে, কেননা অনুত্তর-সম্যক-সম্বোধিতে তাবৎ বস্তই যে এক অভিন্ন!

রাজা অজাতশত্রু যখন দেখলেন যে দেবদত্ত নামে এই মূর্খ বীরপুরুষটিকে দিয়ে আর কোন কাজ হবার নয়, তখন তাঁর ভারি অনুতাপ হল। তখন তিনি পরমারাধ্য জনের কাছে গিয়ে পরিতাপ করলেন, মুক্তির উপায় জানতে চাইলেন।

বুদ্ধদেবের বিশাল জনপ্রিয়তা ও সাধারণ মানুষ বুদ্ধদেবের শিষ্যদের কত রকম যে উপঢৌকন দিতেন তার ইয়ত্তা নেই, এই সব দেখে দেখে কিছু মাতব্বর শ্রেণীর মানুষের মনে ভারি হিংসা হত। এই মাতব্বররা নানারকম ভাবে চেষ্টা করত কি করে পরমজনকে কালিমালিপ্ত করা যায়। কিভাবে বুদ্ধদেবকে লোকের চোখে ছোট করা যায়। একবার চিন্চা নামে এক নকল সাধ্বী সভার সকলের সামনে পরমারাধ্য জনের নামে ব্যভিচারের অভিযোগ আনবে মনস্থ করল। তবে তার এই মিথ্যা ফন্দি কারো কাছে গোপন রইল না। আরেকবার, কতিপয় বিক্ষুব্ধ লোক স্থির করল বুদ্ধদেবের নামে অপবাদ দেবে। সুন্দরী নামে এক মহিলাকে জোগাড় করে তাকে বলল কানাঘুষো ছড়াতে যে সে নাকি রাতে বুদ্ধদেবের শয়ন কক্ষে যায়। সেই অপবাদও কোন কাজে এল না, ইতিমধ্যে কুচক্রীরা একদল মাতালের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সুন্দরীকে মেরে তার লাশ জেতবনের কাছে একটি ঝোপের মধ্যে ফেলে দিল। বিক্ষুব্ধরা ব্যাপারটাকে সাজাতে চাইল যেন বুদ্ধদেবের শিষ্যরা এই কীর্তি করেছে, কিন্তু সাজাতে গিয়ে গোলমাল করে বসল। যাই হোক, বুদ্ধদেবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, এই রকম একটা কলরোল শোনা গেল। এদিকে মত্ত অবস্থায় হত্যাকারীরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে এমন মারামারি শুরু করল যে অচিরেই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি জানাজানি হয়ে গেল। তাদের রাজার কাছে ধরে আনা হলে নিজেরাই কবুল করল আসল ঘটনা আর তাদের মালিকদের নামধাম ফাঁস করে দিল। আরেকবারের কথা। নরাসু লিখছেন, “বিক্ষুব্ধরা শ্রীগুপ্তকে খুব করে উসকাতে লাগল প্রভুর খাবারে বিষ মিশিয়ে বিপথে নিয়ে গিয়ে আগুনে ছুঁড়ে ফেলে তাঁর প্রাণহরণ করার জন্য। কিন্তু উলটে পরম করুনাঘন বুদ্ধদেবই শ্রীগুপ্তকে বাঁচালেন। “

প্রভুর আন্তরিকতায়, সহজ সারল্যে অভিভূত হয়ে আরো বহু শিষ্য সংঘে যোগ দিলেন। যীশুখ্রিস্টের যেমন ১২ জন, তেমনি খ্রীস্টের জন্মের ৫০০ বছর আগে বুদ্ধদেবেরও ১২ জন শিষ্য ছিলেন। তাঁদের সম্বন্ধে বুদ্ধদেব বলতেন, “আমার এই ধর্মে ১২ জন শিষ্য, যাঁরা নিজেরা এতটাই ভাল যে, এঁদের আপন শক্তিতে এঁরা এ জগৎকে ত্রাণ করবেন, এঁদের মতন আর কাকেও পাওয়া যাবে না।”

একবার দক্ষিণ দেশে অবস্থানকালীন বুদ্ধদেব একনলা গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে এক ধনী কৃষক ব্রাহ্মণ লাঠি হাতে তাঁর মাঠের শ্রমিকদের তদারকি করছিলেন, সে বেচারারা বলদদের সঙ্গে একযোগে খাটছিল। বুদ্ধদেব ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে কাছে এসে দাঁড়ালেন। কয়েকজন মজুরও,যারা মাঠে খাটছিল, বুদ্ধদেবকে দেখতে পেয়ে হাত জোড় করে এসে প্রণাম করল। ব্রাহ্মণ ভদ্রলোক বুদ্ধদেব কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খেঁকিয়ে উঠলেন, “এই যে, হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছেন কি? দেখুন আমি হাল চাষ করাই, করিয়ে তবে ভাত খাই। ভাল হত আপনিও যদি চাষ বাস করতে শিখতেন, জানতেন, খেটে খেতেন!”

“হে ব্রাহ্মণ”, বুদ্ধদেব বললেন,”আমিও তো হলকর্ষণ করি, বীজ বপন করি, বীজ বপন, হলকর্ষণ করা হলে, তবেই অন্ন গ্রহণ করি।”

“কিন্তু” ব্রাহ্মণ বললেন, “আপনি যে কৃষক, তার প্রমাণ কি? কোথায় আপনার বলদ, কোথায়ই বা আপনার বীজ, আর কোথায়ই বা আপনার লাঙল?”

তখন মহাশিক্ষক উত্তর দিলেন, “যে বীজ আমি বপন করি তার নাম বিশ্বাস; ভক্তি সেই বারিধারা যা তাকে জলসিঞ্চন করে উর্বর করে; নম্রতা হল আমার হল; মন সে জোয়ালের বন্ধন, মনোনিবেশতা সে লাঙলের ফলা, সত্যকথন তাকে বেঁধে রাখে, নম্রতা তাকে বন্ধন থেকে মুক্ত করে। শক্তি আমার বলদ, আমার শ্রমিকের দল। এইভাবে কৃষিকাজ করি, ভ্রান্তি নামে আগাছা উপড়ে ফেলি। আমি নির্বাণরূপ পারমার্থিক ফল ফলাই, এই পরিশ্রমে জগতে দুঃখের অবসান হবে।

এই কথা শুনে ব্রাহ্মণ ভদ্রলোক নিজে হাতে একটি সোনার বাটিতে পায়েস ঢেলে বুদ্ধদেবকে অর্ঘ্য দিলেন, দিয়ে বললেন, “এই পায়সান্ন গ্রহণ করুন হে গৌতম। আপনি যথার্থই একজন কৃষক; কেননা আপনি যে কৃষিকাজ করেন তাতে অমরত্বের ফসল ফলে।”

লিচ্ছবির রাজকন্যাদের পরমজন বলেছিলেন, “প্রজ্ঞাবান হতে হলে “আমিত্ব” দূর করে দাও; “আমিত্বের চিন্তা সমস্ত সৎ উদ্দেশ্যকে কালিমালিপ্ত করে, ছাই যেমন আগুন ঢেকে রাখে, অথচ তার ওপরে হাঁটলে পা পুড়ে যায়।

(চলবে)

জেগে ওঠ – ২৩ – আনন্দ, দেবদত্ত, লিচ্ছবি রাজকন্যা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments