জেগে ওঠ – ২৪ – লিচ্ছবি, বুদ্ধদেবের মহাপরিনির্বাণ

“অহংকার আর উপেক্ষা আমাদের হৃদয়কেও ঢেকে রাখে, পুঞ্জীভূত মেঘমালা যেমন সূর্যকে আড়াল করে রাখে; অহংকার মনের বিনয়বোধকে নষ্ট করে সমূলে উৎপাটিত করে, অত্যন্ত দৃঢ়চেতা মানুষকেও দুঃখ গ্রাস করে।

“আমি বিজয়ীগণের মধ্যে বিজয়ী, তাই যে নিজেকে জয় করেছে, তার সঙ্গে আমার আত্মার মিলন।

“যার কাছে নিজেকে জয় করার বিষয়টি নেহাতই তুচ্ছ, মালিক হিসেবে সে নেহাতই অল্পবুদ্ধি। পার্থিব সৌন্দর্য, পারিবারিক সমৃদ্ধি, সুনাম, এসব তো চীরকাল থাকে না, থাকে না বলেই, যা জঙ্গম, তাতে কারো শান্তি হয় না।

“এই বোধ জন্মালেই “আমিত্বের” কামনা-বাসনা থেকে মুক্তিলাভ হয়, কেননা “আমিই শ্রেষ্ঠ”, এইরকম মিথ্যা ধারণা থেকে আরো চাই জাতীয় লোভের উৎপত্তি হয়, তারপর ত্রুটির মিথ্যা ধারণা থেকেও ক্রোধ আর হাহুতাশ, অথচ চরম উৎকর্ষতা আর নিজেকে ছোট করার বোধ যেদিন ধ্বংস হবে, সেদিন ক্রোধের বাসনারও নিবৃত্তি হবে।

“ক্রোধ! দেখ কেমন করে সে মানুষের সরল মুখচ্ছবিকে পালটে দেয়, কেমন করে সে সৌন্দর্যকে নষ্ট করে!”

সাপুড়ের বাঁশিতে মোহিত উজ্জ্বল-চর্ম সর্প যেমন ঝকমক করতে থাকে, পরমজনের কথা শুনে লিচ্ছবির যোদ্ধাদেরও ভারি উজ্জ্বল বোধ হল, অতঃপর তাঁরা তাঁদের নয়নাভিরাম উপত্যকায় সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলেন। একান্তে থেকে, শান্তিতে থেকেই তাঁদের আনন্দ, তাঁরা পারমার্থিক ধ্যান করতেন।

“সাধুগণ, বলুন দেখি, কোন সাধু গোসিংহম বনের শৌর্যবৃদ্ধি করেছেন?” গোসিংহম অরণ্যে সেদিন নির্মেঘ এক রাত, স্বর্গীয় পুষ্পশোভিত সে উদ্যানে সুগন্ধে চারিদিক ম’ম’, এমন সময় সারিপুত্র, মৌদ্গল্যায়ন, আনন্দ, অনুরুদ্ধ, রেবত, কশ্যপদের বুদ্ধদেব এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন। “জানেন? সেই সাধু, যিনি মাধুকরী-অন্তে, খাদ্যগ্রহণ করে, শরীর ঋজু রেখে হাঁটু মুড়ে ধ্যানে বসে প্রতিজ্ঞা করেন, “যতক্ষণ না কামনা-বাসনা থেকে মুক্তি হচ্ছে আমার, যতক্ষণ না আমার মন তামসিক বোধ থেকে না মুক্তি পাচ্ছে, ততক্ষণ এ স্থান থেকে উঠব না।” এই হল সেই সাচ্চা সাধু যে গোসিংহম বনের শৌর্য!”

সত্য — সে যে ধরিত্রী অপেক্ষা প্রাচীন, ইতিহাসের চেয়ে তার ওজন ভারী, রক্তপাতের চেয়ে ভয়ংকর তার নির্গমন, উপহাররূপে সে অন্নদানের চেয়ে মূল্যবান।

নির্মাণকায় বুদ্ধরূপে,অথচ আর পাঁচজন আত্মার মতই ঐশ্বরীয় ধরিত্রীতে, এই পৃথিবীর বুকে পথ হাঁটেন তিনি, তাঁর সেই পথ হাঁটার যখন অষ্টতিতম বছর, তখন একদিন তিনি বললেন, “আমার মুক্তির সময় সমাসন্ন, তিন মাস অতিক্রান্ত হলে, আমি নির্বাণলাভ করব।”

বৃক্ষতলে উপবেশিত তথাগত, তিনি তূরীয়বোধে ধ্যানস্থ, আপন ইচ্ছায় তাঁর প্রারব্ধ সময় পরিত্যাগ করতঃ অধ্যাত্ম যোগে জীবনের বাকী কয়েকটি দিন স্থির করলেন।

বুদ্ধদেব তাঁর তূরীয় ধ্যান থেকে উঠে জগতে একথা ঘোষণা করলেন,

“আমি সময় পরিত্যাগ করব স্থির করেছি:অতঃপর আমি বিশ্বাসের শক্তির ওপর নির্ভর করে বাকী জীবন অতিবাহিত করব; ভগ্নরথের প্রায় আমার দেহ স্থিত রবে, না-আসা, না-যাওয়া, স্বর্গ-মর্ত্য-নরক ত্রিভুবন হতে আমি মুক্ত, পক্ষীশাবক যেমন অণ্ড হতে নির্গত হয়, তদ্রূপ, আমি স্বাধীনভাবে চলে যাব, একাকী।

“আনন্দ! আমার জীবনান্তের আমি তিন মাস স্থির করেছি । বাকী জীবন আমি পরিত্যাগ করলাম। তাই ধরিত্রী কম্পমান।

আনন্দ রোদন করলেন, “রক্ষা করুন প্রভু! আমাদের করুণা করুন। এত শীঘ্র বিদায় নেবেন না”

পরমজন উত্তর দিলেন, “মানুষ যদি আপন প্রকৃতি জানত, তাহলে সে দুঃখে নিমজ্জিত হত না। সকল জীবিত বস্তুই ধ্বংসের নিয়মের অধীন; তোমাকে তো সহজ করে বলেইছি আনন্দ, সমস্ত “সংযুক্ত” বস্তুই কালের নিয়মে “বিযুক্ত” হবে।”

গহন অরণ্যে একাকী আনন্দ রোরুদ্যমান, পরম জন তাঁকে ডেকে মরমী সত্য শুধোলেন,

“আমাদের চারপাশে যা আছে, সব যদি রাখতে পারতুম, তাদের যদি বিচ্ছেদ না হত, তাদের যদি পরিবর্তন না হত, তাহলে তাই হত মুক্তি! সে কোথায় পাবে?

“সেই অনির্বচনীয়, যার নাগাল তোমরা পাবে, তার কথা আমি আগেও তোমাদের বলেছি, শেষ পর্যন্ত তার কথাই বলে যাব।

“প্রেম জেগে থাকে সমস্ত বস্তুর অন্তঃস্থলে, সমস্ত বস্তুই এক বস্তু। স্বহা! আমার দিন শেষ হয়ে এসেছে, আমি এবার বিশ্রাম নেব। যা করার ছিল,বহুকাল আগে করা হয়ে গেছে।

“পূর্ণজ্ঞানী পূর্ণকারুণিক সকল তথাগত, সুগত, বুদ্ধ, যাঁরা এই অলৌকিক বাক্যে বোধিপ্রাপ্ত হয়েছেন, হয়ে চলেছেন, ও হবেন, তাঁদের প্রণাম।

“আনন্দ, শান্ত চিত্তে একটি নির্জন স্থানে আসন বিছাও, অন্যের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ো না, অন্যের অজ্ঞানতাবশতঃ চিন্তাধারায় তাল মিলিও না, একলা চল, একাকীত্বকেই তোমার স্বর্গ মেনো, শুভ চেতনার, শান্ত আঁখির সংঘ তোমার সাথে সাথী হবে।

“মন সতত বস্তুর আবির্ভাব, স্থিতি, আর লয়ের সঙ্গেই পরিচিত, বোঝে যে বস্তু একে অপরকে অনুসরণ করে, জানে যে কারো কোন স্থিতি নেই। জ্ঞানীজন বোঝেন যে আমিত্বের কোন ভিত্তি নেই তাই।

“জন্মের পূর্বকালে জ্ঞানী মানুষের অবয়ব নিয়ে কিছুই করার নেই, অবয়ব নিয়ে এখনও তার কিছুই করার নেই, মৃত্যুর পরেও কিছুই করার থাকবে না। অবয়বের অস্তিত্ব অনস্তিত্বের কোন তফাত নেই, এই জ্ঞান হবার পরে সে কিরূপে মারা যায়?

“আনন্দ, দুঃখ কোর না। দেহের জন্মের পুনঃপৌনিকতার অবসান করাই আমার উদ্দেশ্য । সকল বস্তুই অস্থাবর, অলাভজনক, কণ্টকাকীর্ণ, সতত পরিবর্তনশীল, অথচ মানুষ নিয়ন্ত্রণবিমুখ, সকলেই তাদের দেহের, তাদের অবয়বের কারণে সতত দুঃখভোগ করে।

“সকল বস্তু, যা জাত, অপ্রবোধিত, তা একদিন না একদিন শেষ হবেই।”

“এ ধর্মকে গ্রহণ করতে শেখ, কেননা এ সত্য, এ আত্মবিকশিত।

বুদ্ধদেবের মরণেচ্ছার সংবাদ পেয়ে বৈশালীর লিচ্ছবিরা পরম আর্ত মনে দুঃখীত মুখে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। বুদ্ধদেব তাঁদের বললেন, “প্রাচীন যুগের ঋষিরাজগণ, বশিষ্ঠমুনি, মান্ধাত্রি, চক্রবর্তী রাজন্যবর্গ, অন্যান্যরা, তাঁদের মতন আরো সব, যাঁরা ঐশ্বরিক শক্তিতে বিরাজ করতেন, তাঁরা সবাই বহুকাল হল একে একে গত হয়েছেন, কেউ আজ আর বেঁচে নেই। চন্দ্র, সূর্য, শক্র স্বয়ং, তাঁর শত শত পরিচারকগণ, তাঁরাও সবাই গত। এমন কেউ নেই যে যুগ যুগান্ত ধরে বেঁচে থাকবে। পুরাকালের সকল বুদ্ধগণ, সংখ্যায় যাঁরা গঙ্গার বালুকারাশির ন্যায় অযুত, যাঁরা তাঁদের প্রজ্ঞায় জগৎ আলোকিত করেছেন, তাঁরাও সকলে প্রদীপের নির্বাপিত শিখার ন্যায় অস্তগত। সকল বুদ্ধগণ, যাঁরা অনাগত, তাঁরাও একই পথে গত হবেন; তবে আমার বেলা কেন শুধু অন্যথা?

“আমিও নির্বাণে অস্তমিত হব; অন্যদের যেমন মুক্তির পথে প্রস্তুত করা হয়েছে, তোমরাও পথ ধরে এগিয়ে যাবে, তোমরা বিশ্রামের পথ দেখালে বৈশালীর সকলে সুখী হবে।

“সত্যি কথা বলতে কি, পৃথিবীতে কোথাও প্রকৃত সাহায্য নেই, আমোদ করার জন্য ত্রিভুবনও যথেষ্ট নয়, কামনা বাসনাহীন হৃদয় গড়, দুঃখের পথ আটকাও।

“জীবনের দীর্ঘ এলোমেলো পথ চলা ছাড়ো এবার, উত্তর পথে চল, পায়ে পায়ে ক্রমশ উপরে উঠে যাওয়া পথ বেয়ে যে পথে পশ্চিম পাহাড়ে সূর্যের বাঁকে পথ বেঁকে গেছে, সে পথে চল যাই।“

মহাশিক্ষক তাঁর শেষ দীক্ষা-ভ্রমণে পাভা শহরে এলেন। সেখানে চুণ্ড নামে লৌহকারের গৃহে তিনি তাঁর শেষ আহার করলেন। পরমজন বুঝতে পেরেছিলেন যে চুণ্ড তাঁকে যে শূকরমাধ্ব নামে যে ছত্রাক-মিশ্রিত শূকর মাংস খেতে দিয়েছিল, তা খাবার উপযোগী ছিল না, তাঁর অনুগামীদের নিষেধ করলেন, বললেন স্পর্শ না করতে। বৌদ্ধ নিয়মানুসারে কোন ভক্ত কিছু ভিক্ষা দিলে, সেই ভক্ত যত দরিদ্রই হন না কেন, যত নিম্নশ্রেণীর মানুষই হন না কেন, সমস্ত দান গ্রহণ করতে হবে, তাই বুদ্ধদেব নিজে খাবার খেলেন। এর পরেই বুদ্ধদেব মারণ আন্ত্রিক রোগে আক্রান্ত হলেন ও তরাইয়ের পূর্বপারে কুশীনগরে চলে গেলেন ।

আনন্দকে বললেন, “ঐ দুই বলাবৃক্ষের মাঝে যে জায়গাটি দেখছ, ঐখানে ঝাঁট দিয়ে, জল দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে আমার আসন বিছাও। আজ মধ্যরাত্রে আমার মৃত্যু হবে।

“যাও! মানুষকে জানাও যে আমার মৃত্যুক্ষণ আসন্ন। এখানে যে মল্লরা থাকেন, তাঁরা আমাকে না দেখতে পেলে খুব দুঃখ পাবেন।

শিষ্যদের সাবধান করলেন তারা যেন চুণ্ডকে তাঁর মৃত্যুর নিমিত্ত দোষারোপ না করে, বরং বললেন চুণ্ড ছিলে বলেই না তাঁর নির্বাণের দিন আরো এগিয়ে এল, চুণ্ডকে বরং ধন্যবাদ দিতে হয়।

মল্লরা চোখের জলে বিদায় দিতে এলে বললেন, “দুঃখ কোর না! এ সময় আনন্দ করার সময়। দুঃখের কি ক্রোধের কোন কারণ নেই এখন। যুগ যুগান্ত ধরে যার সন্ধান করেছি, তাকে এখন অর্জন করব; চেতনার কৃশ পরিসর থেকে মুক্ত হয়ে চললাম, ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু, সব কিছু পেছনে ফেলে রেখে চিরশান্তিতে যেখানে না আছে জন্ম, না আছে মৃত্যু।

“সেখানে অনন্তকালে শোক হতে মুক্তি! বল, বল, কেন আমি দুঃখ করব?”

“আমি শরীর ছাড়তে চেয়েছিলাম ঐ শীর্ষের চূড়ায়, কিন্তু আমার বিধির বিধান পূর্ণ করতে অদ্যাবধি ইহজগতে মানুষের সঙ্গে রয়েছি: বিষধর সর্পের সঙ্গে সহবাসের মতন আমার এই ভঙ্গুর, অসুস্থ শরীর আজ অবধি বয়ে চলেছি, কিন্তু এখন আমি পরম-শান্তির ধামে চললাম, সমস্ত দুঃখের বারিধারা এবার স্তব্ধ হবে।

“আর কখনো দেহধারণ করব না, ভবিষ্যতের সমস্ত শোক এই এখন চিরকালের মতন শেষ হয়ে যাবে। আর কখনো আশঙ্কায় ভীত হয়ো না।

অসুস্থ মানুষ ওষুধের রোগ সারানোর ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তার বৈদ্যকে না দেখলেও চলে।

আমি যা বলি তা যদি কেউ না পালন করে তবে আমাকে দেখা তার বৃথা, ওতে কোন লাভ নেই; আবার যে বহু দূরে থেকেও সৎপথে চলে, সে সদাসর্বদা আমার কাছেই থাকে।

“হৃদয়ের যত্ন নিও — সেখানে অশান্তিকে কোন জায়গা দিও না। মন দিয়ে ভাল কাজ করে যেও। বায়ু যেমন ক্রমাগত প্রদীপের শিখাকে উত্যক্ত করে, জন্ম থেকে মানুষেরও সেই এক অবস্থা — দুঃখ তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, এক মুহুর্তের বিরাম নেই।

শেষ মুহুর্তে পরমজন সুভদ্র নামে এক ব্যতিক্রমী সাধুকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁকে দেখিয়েছিলেন যে এই পৃথিবী কার্যকারণ সম্ভূত, দেখিয়েছিলেন যে কার্যের নিবৃত্তিতে সব শেষ, তাঁকে অষ্টাঙ্গমার্গের শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁকে সংঘে গ্রহণ করেছিলেন, এই বলে যে, “এ আমার শেষ শিষ্য যে নির্বাণ লাভ করল, একে তোমরা দেখ

ঠিকমতন।“

পরমজন গাছের তলায় উপবিষ্ট হয়ে শেষ নির্দেশ দিলেন, কারণ আনন্দ চাইছিলেন যে প্রভু যেন তাঁর কোলে মাথা রাখেন, মৃত্যুর এই ক্ষণে তিনি যেন তাঁর গুরুদেবের যন্ত্রণা লাঘব করতে পারেন।

বুদ্ধদেব বললেন, “শরীরের যত্ন নিও, সময়মত খাওয়া দাওয়া কোর; সালিশী করতে হবে এমন কোন দায়িত্ব নিও না, নেশার ঘোরে কি মাদকতা করে অলৌকিকত্ব কি চমৎকারিত্ব দেখিও না, সমস্ত রকম কুটিলতাকে, ও কুটিল মনোভাব পরিহার কোর; সদ্ধর্ম পালন কোর; সর্বপ্রাণীর প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ো, দয়া কোর, করুণা কোর, যেটুকু জীবনে পাবে তাতে সন্তুষ্ট হয়ে সংযমী জীবন যাপন কোর; গ্রহণ কোর, কিন্তু অহেতুক জমিয়ে রেখো না; সংক্ষেপে, এইটুকুই আমার বিধান।

“শুভ-চিন্তাকে শ্রদ্ধা কোর, যারা ভাল কাজ করে, মানুষের প্রতি দয়ার্দ্র কাজ করে তারাই আমার সবচেয়ে প্রিয়;

“শরতের বৃষ্টি শেষে, যখন পরিষ্কার আকাশ, মেঘ নেই, সূর্যদেব যেমন স্বর্গারোহণ করতঃ সর্বত্র তাঁর কিরণমহিমা বিস্তার করেন, তেমনি শুভ-চিন্তা অন্য সমস্ত গুণের উর্দ্ধে বিচরণ করে; প্রভাতের শুক্রগ্রহের ন্যায় সে উজ্জ্বল।

“প্রভাতে জাগ্রত মানুষ তার হৃদয়ে যে অন্ধকার পথ, তাকে সতত পরিহার করে।

“যাঁরা ক্ষমতাবান, তাঁদের প্রতি উষ্মা, ক্রোধ, কুকথাকে প্রশ্রয় দিও না। ক্রোধ ও ঘৃণা সদ্ধর্মকে ধ্বংস করে; শরীরের আভিজাত্য ও সৌন্দর্যকেও সে নষ্ট করে দেয়।

“নেউল যেমন সাপের বিষে প্রভাবিত হয় না, তেমনি যে সাধু দয়ার্দ্র চিত্তে বিচরণ করেন, সংসারের ক্রোধ আর ঘৃণার পরিবেশে থেকেও তাঁর চিত্ত বিকৃত হয় না।

“‘অল্প-বাসনা’ হতে আমরা প্রকৃত মুক্তির পথ দেখি। সত্যিকারের মুক্তি চাই বলে ‘যথেষ্ট জেনেছি’ এই বোধে সন্তুষ্ট থাকা চাই। ধনী কি দরিদ্র, যাঁরা সন্তুষ্ট, তাঁরাই সতত বিশ্রাম পান।

“চাহিদায় অতৃপ্ত হয়ো না, হলে জীবনের দীর্ঘ রাত্রিতে শুধুই দুঃখ জমতে থাকবে। যত বেশী নির্ভরশীলতা, তত বেশী বন্ধন; এই জ্ঞান না হলে মন দরিদ্র ও কপট হয়।

“বার বার বেচারা ভীত মানুষ মৃত্যুর গ্রাসে পড়ে, অলৌকিকভাবে তাদের স্বপ্ন বদলে যায়, তারা আবার ফিরে আসে সেই অজ্ঞান শিশুর নতুন শরীরে: গাছের মতন, – বাহুডোর, ভার, ক্ষীণতনু।

“সাধারণ মানুষ যেন হতভাগ্যের দল, না আছে তাদের বোধবুদ্ধি, না জানে উপায়, জাঁতাকলের নিষ্পেষণে পড়ে, অনাদিকাল ধরে চক্রাকারে আবর্তিত হয়ে চলেছে। চমরী গাই যেমন তার লেজে বাঁধা, এরাও তেমন তাদের কামনা-বাসনার জালে আবদ্ধ, দেহসম্ভোগে অন্ধ, বুদ্ধের খোঁজ আর রাখে না, সদ্ধর্মের, যাতে যন্ত্রণা হতে মুক্তি, তারও খবর রাখে না।

“এসব শুনলে হয়ত, কিন্তু মন দিয়ে মানলে না, তাতে বক্তার কোন দোষ নেই।

মাঝরাত হয়ে এল, গুরুভাইরা শান্ত দুঃখী মনে উপবিষ্ট, দেখে বুদ্ধদেব বললেন, “কে জানে হয়ত গুরুর প্রতি শ্রদ্ধাবশত তোমরা সকলে চুপ করে আছ: এস সকলে বন্ধুর মতন করে কথা বলি।”

অনুরুদ্ধ এগিয়ে এসে বললেন, “প্রভু, জন্ম মৃত্যুর সমুদ্র পেরিয়ে কামনা বাসনা রহিত, কিছু চাইবার নেই, আমরা শুধু জানি আমরা কতটা ভালোবাসি, কতটা দুঃখ পাই, তাই শুধাই বুদ্ধদেব কেন এত শীঘ্র চলে যাবেন?”

পিঙ্গিয়া বললেন, “ও আমারও হৃদয়ের কথা বলেছে।”

মানবের শ্রদ্ধেয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বললেন, “কি মনে হয় ভিক্ষুগণ? কোনটা বেশী? এই যে কেঁদে কেঁদে চোখের জলের বন্যা বইয়ে দিলে, বারংবার নতুন করে জন্ম, নতুন করে মৃত্যুর পানে ছুটে যাওয়া,একবার মিলন, তারপর যা চাই না, কাঙ্খিত জনের থেকে বিচ্ছেদ, এই বন্যার জল বেশী, না কি চার মহাসাগরের মিলিত তাবৎ জলরাশির পরিমাণ বেশী?

“বহু দিন ধরে তোমরা মাতার মৃত্যু সয়েছ, বহু দিন ধরে তোমরা পিতার মৃত্যু সয়েছ, বহু দিন ধরে সন্তানের মৃত্যু, কন্যার মৃত্যু, ভ্রাতা-ভগিনীর মৃত্যু, জিনিসপত্র হারিয়ে গেছে, ব্যধির যন্ত্রণা সয়েছ।

“কারো কারো চোখে সামান্য একটু ধুলো পড়েছে, তাদের সত্যদর্শণ হবে।

“সমুদ্রে নাবিক যখন যায়, সে একটা পাখি ছেড়ে দেয় আকাশে, সে পাখি যদি ডাঙা খুঁজে না পায় সে নাবিকের কাছে ফেরত আসে। তোমরাও তেমন, আমার কাছে ফেরত এসেছ।

“মা যেমন নিজের কথা ভাবেন না, একমাত্র সন্তানের জন্য তাঁর সকল ভালোবাসা আগলে রাখে, ঠিকক তেমন করে, তোমাদের অনুকম্পা, তোমাদের ভালোবাসা যেন সারা বিশ্বের জন্যে ছড়িয়ে পড়ে।

“এমনকি ডাকাতদেরও, তাদেরও প্রেমের তরঙ্গ বইয়ে দাও জগতজুড়ে; সর্বক্ষণ ঈশ্বরীয় প্রেম করুণাধারায় ধুইয়ে দাও চরাচর, পরমানন্দে, কোন ভীতি যেন না থাকে, কারো প্রতি কোন শত্রুভাব যেন না থাকে। হ্যাঁ মোর শিষ্যগণ, এইভাবেই তোমরা তোমাদের পরম্পরাকে তৈরী কোর।

“এতদূর এসে, নির্বাণলাভ করে, তোমরা কি অন্যদেরকে তীরে পৌঁছতে সাহায্য করবে না?”

আনন্দ উঠে বিষাদের গান ধরলেন,

“ পাঁচ আর কুড়ি বছর ধরে

আমি মহৎজনের সেবা করে গেছি, প্রেমভাবে তাঁর সেবা করেছি,

ছায়ার মতন তাঁর সঙ্গে ঘুরেছি।

বুদ্ধদেব যখন হাঁটতেন, তাঁর পায়ে পায়ে আমিও হেঁটেছি,

যখন ধর্মের বাণী শেখানো হত,

আমার মধ্যে জ্ঞান সঞ্চারিত হত, বুঝতাম।

হায়, আজ তিনি চলে যাবেন।

আমি পড়ে রইলাম কত কাজ বাকী,

আমি এক শিক্ষানবিশ,

এখনো যে বড় হলেম না,

আমার করুণার ফুল যে ফুটলো না,

আর আমার প্রভু আমার

হৃদয় বিদীর্ণ করে চললেন,

সেই মহাত্মা, জাগ্রতজন,

বোধি ও করুণা যাঁর পূর্ণ,

মানবের সেই অনুপম গুরু,

তিনি ভোরের শুকতারা,

তিনি প্রেমের পারাবত,

মৃগশিশু,

তিনি দুগ্ধবারিধারা,

অতীন্দ্রিয় করুণাময়,

শ্বেতরথে, বিরাট শিশু, পদ্ম-রাজ,

আমাদের মনের ঠাকুর,

চললেন, তিনি চললেন,

আমাদের শূন্যতার অদ্ভুত উজ্জ্বল আঁধারে ফেলে

তিনি চললেন!

শালবনের চারপাশে নবীন সাধুগণ ও সাধারণ গৃহীরা, তাঁরা উপলব্ধি করছেন এই মানুষটি যা শিখিয়ে গেছেন সে শুধু সত্য নয়, এতেই তাঁদের মুক্তির সম্ভাবনা, কারণ জীবনে এই প্রথমবার তাঁরা উপলব্ধি করলেন তাঁর বাণী, তাঁর আবিষ্কারের আলোয় উদ্ভাসিত, সেই সত্য, যাতে দাসত্ব শৃঙ্খল ছিন্ন করে মানুষ স্বাধীন হতে পারে, জাতপাতের বন্ধন ছিন্ন করে সবাই এক হয়ে মিলতে পারে। কিন্তু এখন, এই নশ্বর দেহের আসন্ন মৃত্যুতে তাঁরাও কম্পিত, যেন প্রজ্ঞাবান মেষগণ মৃত্যুরূপী অজ্ঞ সিংহের আগমনী বার্তা পেয়ে সন্ত্রস্ত।

আনন্দ ও সমবেত ভক্তমণ্ডলীর মন শান্ত করার নিমিত্ত বুদ্ধদেব বললেন, “আদিতে সকল বস্তু পরস্পরে আবদ্ধ ছিল, শেষে তারা আবার ছিন্ন হয়ে গেল; নানান রকমের অবস্থার মিলনে কার্য কারণ উৎপন্ন হয়, প্রকৃতিতে এক নিয়ম বলে কিছু তো নেই। কিন্তু যখন পারস্পরিক উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে, যখন তাদের প্রশ্নের উত্তর মিলবে, তখন এই জগৎ জুড়ে সৃষ্টির যে তাণ্ডব লীলা চলেছে, তার কি হবে বল তো? সেদিন ঈশ্বর আর মানুষে এক রকম ভাবে পরিত্রাণ পাবে! তাই হোক!

হে মোর ভক্তগণ, যারা সদ্ধর্ম সম্বন্ধে অবহিত আছো, মনে রেখো! একদিন সব শেষ হবে, দুঃখে বিগলিত হয়ো না।

“নিষ্ঠাভরে কাজ করে যেও; লক্ষ্য স্থির কোর সেই গৃহে পৌঁছতে যেখানে বিচ্ছেদের প্রবেশ নিষিদ্ধ; আমি জ্ঞানের প্রদীপ প্রজ্জোলিত করে গেলাম, একমাত্র এরই আলো যে বিষাদ জগতকে ছেয়ে আছে, তাকে দূর করতে সক্ষম। এ পৃথিবী তো চিরদিনের মত

ঠিক হবার নয়। তাই আনন্দ কর। ভাব, তোমাদের একটি বন্ধু আছে, যে ভারি অসুস্থ, তার আজকে রোগমুক্তি ঘটল, সে যন্ত্রণা থেকে উদ্ধার পেল। আমি যে এই যন্ত্রণাময় অবয়বটিকে ফেলে দিলাম, আমি যে ক্রমাগত জন্ম আর মৃত্যুর সমুদ্রতরঙ্গকে রুখে দিলাম, যন্ত্রণা থেকে চিরকালের জন্যে মুক্ত করে দিলাম। তাই আনন্দ কর!

“সাবধানে থেকো! স্খলিত হয়ো না, যা আছে, তা শূন্যতায় ফিরে যাবেই যাবে!

“এবার আমি চললাম

“আমার কথা ফুরোল, এই আমার শেষ শিক্ষা।”

প্রথম তূরীয় ধ্যানের সমাধিতে প্রবেশ করে বুদ্ধদেব পরপর ন’টি ধ্যানের স্তর অতিক্রম করলেন; তারপর আবার ফিরে এলেন বিপরীতমুখে প্রথম ধ্যানে; তারপর প্রথম ধ্যান থেকে নিজেকে উত্তোলিত করে চতুর্থ ধ্যানে বসলেন, না-আনন্দ না-দুঃখের ধ্যানে, যা পরমপবিত্র আদি অকৃত্রিম তন্মাত্রিক মানসের রূপ। সমাধির তূরীয় রূপ ত্যাগ করে, তাঁর আত্মা আর কোথাও না থেমে পরিনির্বাণে পৌঁছলেন, মৃত্যুর পরে যখন সমস্ত রূপ অবলুপ্ত হয়ে গেল।

চাঁদের আলো ঝাপসা হয়ে এলো, তরঙ্গিনী রোরুদ্যমানা হলেন, মানসের সমীরণে বৃক্ষরাজি হলেন নতমুখ।

মহাগজ দন্তহীন হলে যেরূপ বোধ হয়, মহাষণ্ডের শৃঙ্গবিচ্ছেদ হলে যে অবস্থা হয়, স্বর্গপুরে চন্দ্র-সূর্য-বিলোপ পেলে যে অবস্থা, ঝঞ্ঝাবাতে আহত পঙ্কজের ন্যায়, বুদ্ধদেবের প্রয়াণে পৃথিবী বিলাপ করলেন।

নির্বাণেই একমাত্র আনন্দ, সে চীরকালের মতন অব্যাহতি দেয়; কারাগার যে কারাগার থেকে উদ্ধার পাবার নিমিত্ত তৈরী করা হয়েছে।

চঞ্চলতার রত্নখচিত মহাদণ্ড চাঁদের পাহাড়কে উল্টে দিতে সক্ষম, কেবল তথাগতের রত্ন-পরদা, রত্ন-আবরণ, মনের লৌহ-আবরণ তাকে জয় করতে পারে। সাধুর, বীরের, সর্বোত্তম পুরস্কার দিনশেষের মহানিদ্রার প্রশান্তি।

নিজে থেকে অগুন্তি জন্ম মৃত্যুর পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাতে তিনি মানবজাতিকে সর্বপ্রাণকে মুক্তি দিতে পারেন, নির্বাণে প্রবেশ করতে না চেয়ে, শুধু দুঃখভোগ আর যাতনা হতে মুক্তির পথ দেখানোর শিক্ষার নিমিত্ত জগতসংসারে নিজেকে যিনি অনায়াসে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারেন, তিনিই বুদ্ধদেব, যিনি একাধারে সব হয়েছেন, সকলে হয়েছেন, অমিতাভ (অরিমিদাইয়া), যিনি জগতের আলো, তথাগত, অনাগত বীর মৈত্রেয়, জগতের শীর্ষদেশে যিনি পথ চলেছেন, যিনি বৃক্ষতলে বসেছেন, যিনি সদসৎ, যিনি অমিত শক্তিধর, আবার তীব্রভাবে যিনি মানুষ, যিনি পরমকারুণিক।

ভগবান বুদ্ধদেবের মহতী সদ্ধর্ম যেন জগতের সকলের শ্রদ্ধা গ্রহণ করে।

(শেষ)

 

জেগে ওঠ – ২৪ – বুদ্ধদেবের মহাপরিনির্বাণ (সমাপ্ত)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments