বুদ্ধ মানে যিনি জেগেছেন।

সেদিন অবধি, আমাদের এই পশ্চিমের দেশগুলোতে, বুদ্ধ বলতে লোকে ভাবত, সেই যে, টুরিস্টদের জন্যে দোকানের জানলায় সাজিয়ে রাখা, সস্তার দোকানের মিষ্টি মিষ্টি হাসি হাসি মুখের নাদুস নুদুস গোলগাল আদুরে ভুঁড়ি বের করা আহ্লাদী এক “বুডা”। জানতই না যে সত্যিকারের বুদ্ধ আদতে ছিল এক অসামান্য রূপবান যুবক রাজকুমার। বাপ-পিতামহের রাজপ্রাসাদে একদিন হঠাৎ গভীর চিন্তায় সে নিমজ্জিত, চোখের সামনে সুবেশা নর্তকীর দল, অথচ তাদের সে দেখেও দেখে না, যেন তারা কেউ নেই কোথাও; দৃষ্টি ভেদ করে অনন্তে প্রসারিত, তার পর …
শেষে মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সে সংসার থেকে হাতটাত তুলে দিয়ে দৃপ্ত যুদ্ধাশ্বে সওয়ার হয়ে সেই যে সে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পাড়ি দিল অরণ্যের নির্নিমেষ গভীরতায়; সেখানে খাপখোলা শাণিত তরবারীর এক কোপে ছিন্ন করে দিল তার সযত্নলালিত আজানুলম্বিত কাঞ্চণবর্ণ কেশদাম, তারপর ধ্যানমগ্ন হল সমকালীন ভারতের সাধকদের সঙ্গে; ৮০ বছর বয়সে অনন্ত সনাতন পথের, অনন্ত অরণ্যের পরিযায়ি পরম শ্রদ্ধেয় এক ছিপছিপে সন্ন্যাসীরূপে জীবনের ছেদ টেনে দিল চীরতরে। অপিচ, মানুষটা মোটেই থলথলে গোলগাল হাসিখুশি নাদুস নুদুস তো নয়ই, বরং বলা চলে সাংঘাতিক রকমের গুরুগম্ভীর, মহাদুঃখী এক তাপস। ভারতের, প্রায় তাবৎ এশিয়ার, যীশু ।

আর যে ধর্মের প্রবর্তন তিনি করে গেলেন, বৌদ্ধধর্ম, অস্তিত্বের স্বপ্নে যার মহাজাগরণ, তাতে আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ শরণ নিয়েছে। প্রাচ্যদেশের ধর্মের গভীরতা বা ব্যাপ্তির আন্দাজ আমেরিকা বা পশ্চিমের খুব অল্প মানুষেরই অবশ্য আছে। কজন লোকে জানে যে যেমন আমেরিকা, ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স, ইটালি, মেক্সিকোতে খ্রীস্টধর্ম, তেমনই কোরিয়া, বর্মা (এই বই লেখার সময় বর্মা মায়নমার নামে প্রচলিত ছিল না), শ্যামদেশ (থাইল্যাণ্ড), তিব্বত, জাপান, লাল-পূর্ব চীন এই দেশগুলোতে বৌদ্ধধর্মের আধিপত্য।
তো এই যে তরুণ যুবরাজ, যিনি এতটাই পরমদুঃখের প্রজ্ঞায় নিবেশিত এক প্রাণ, যে, তাঁকে হারেম-ভর্তি সুন্দরীরা অবধি টলাতে পারল না, এই তিনিই গৌতম, ৫৬৩ খ্রীস্টপূর্বাব্দে সিদ্ধার্থ নাম নিয়ে ভারতের গোরক্ষপুরে শাক্যরাজবংশে রাজকুমার হয়ে জন্মেছিলেন। তাঁর মায়ের নাম, কি আশ্চর্য, মায়াদেবী (মায়া কথার অর্থ ইন্দ্রজাল); মায়াদেবী সিদ্ধার্থের জন্মের সময় মারা গিয়েছিলেন, তাই সম্পরর্কে মাসি প্রজাপতি গোতমীর কোলে সিদ্ধার্থ বড় হয়েছিলেন। ক্ষত্রিয়দের যেমনটি হওয়া উচিত, সিদ্ধার্থ যুবক বয়স থেকেই চৌকস খেলোয়াড়, ওস্তাদ ঘোড়সওয়ার; কথিত আছে যে দুরন্ত এক প্রতিযোগিতায় আর সব রাজপুত্রদের হারিয়ে সিদ্ধার্থ যশোধরার পাণিগ্রহণ করেন।

তাঁর যখন ষোল বছর বয়স, সেই সময় তাঁর যশোধরার সঙ্গে বিবাহ হয়। রাহুল নামে একটি পুত্র সন্তানও জন্মায় তাঁদের । তাঁর পিতৃদেব মহারাজ শুদ্ধোদন তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, ও অমাত্যদের সঙ্গে মন্ত্রণা করতেন কিভাবে বছর তিরিশের সিদ্ধার্থকে এতটাই হর্ষোল্লাসে রাখা যায় যাতে ক্রমবর্ধমান গভীর দুঃখবোধ থেকে মনটাকে দূরে রাখা যায়।
কি সেই দুঃখ?
একদা, রাজউদ্যানের মধ্যে রথে চড়ে যেতে যেতে রাজপুত্র দেখতে পেলেন এক বৃদ্ধ মানুষ রাস্তা দিয়ে ধীরপদে হেঁটে যাচ্ছেন।
“এ কেমন মানুষ? শ্বেত মস্তক, স্খলিত স্কন্ধ, ঘোলাটে চোখ, শীর্ণ শরীর, যষ্টির ওপর ভর করে চলেছেন এনার শরীর কি কেবল রৌদ্রে তপ্ত ও শীর্ণ, নাকি এই অবস্থাতেই এনার জন্ম হয়েছিল? দ্রুত ঘোরাও শকট সারথি, ফিরে চল । বৃদ্ধ বয়সের কথা ভেবে দেখলে, এ কাননের শোভায় কি বা আসে যায়, জীবনের দিনগুলো যেন ঝড়ের মত বয়ে চলে, চল, চল, দ্রুত শকট ফিরিয়ে নিয়ে প্রাসাদে নিয়ে চল আমায়। “
তারপর আরেকদিন, চতুর্দোলায় মৃত মানুষকে বয়ে নিয়ে যাওয়া দেখে রাজপুত্রের রোদন, “হে নশ্বর মানব! পশ্ব! অনুসরণকারীগণ শোকে বিহ্বল, দেখ কেমন অঝোরে কেশকর্ষণপূর্বক রোরুদ্যমান … ইনিই কি কেবল একমাত্র মৃত মানুষ, নাকি এমন আরো আছে? দেখ! শরীর ধূলায় বিলীন হবেই, অথচ দেখ সর্বত্র মানুষ কেমন অবিবেচকের মত জীবন কাটাচ্ছে; এ হৃদয় তো জড়বৎ কাষ্ঠ নয়, সে নয় পাষাণ, তবু কেন এ হৃদয় বুঝেও বোঝে না সমস্ত নশ্বর, সব বিলীয়মান …”
সেই রাতে, মহারাজের কানে এই সমস্ত কথা গেল। মহারাজ রাজমন্ত্রী উদায়ীর সঙ্গে পরামর্শ করলেন। রাজার নির্দেশে উদায়ী পুরনারীদের আদেশ করলেন তারা যেন তাদের মোহিনী মায়ায় রাজপুত্রের মন ভোলায় । কত রকম অঙ্গভঙ্গিই না তারা করলে, কাঁধের আলতো রেশমী চাদর খসিয়ে ফেলে, সর্পিল বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে, ভ্রূ নাচিয়ে, কেউ কেউ আবার ব্রীড়াবনত অবস্থায় বক্ষস্থল থেকে গোলাপ ফুল চ্যুত করে ছদ্মরোদনে বলে উঠল, “ওগো রাজকুমার, এ শরীর কি আমার নাকি তোমার?” তবু, দুঃখের মেত্তায় রাজপুত্র অটল রইলেন। রাত গড়াল মধ্যরাত্রে। নারীগণ শ্রান্ত , অবসন্ন, কেউ দিভানে, কেউ বালিশে, ঘুমিয়ে পড়লেন। জেগে রইলেন রাজপুত্র। আর একরাশ কৌতুহল নিয়ে জেগে রইলেন মন্ত্রী উদায়ী।

“এমন তো নয় আমি সৌন্দর্যের মর্যাদা দিই নে”, গভীর অন্ধকারে কৌতুহলী মন্ত্রীর উদ্দেশে ঘোষণা করলেন তিনি, “এমনও নয় যে মানুষের আনন্দের যে কি ক্ষমতা তা আমি বুঝি না, তবু; তবু, সর্বত্র আমি যে দেখি সমস্ত পরিবর্তনশীল, তাইতো আমার হৃদয় বেদনায় ভারাক্রান্ত; এমন যদি হত, সবকিছু একই রকম ভাবে চলতে থাকত চিরটাকাল, প্রবহমান সময়ের, আসন্ন অসুখের, মৃত্যুর যন্ত্রণা থাকত না, থাকত না ঘৃণা, থাকত না কোন কষ্ট! ধরুন আপনি দায়িত্ব নিলেন যে এই নারীদেহের সৌন্দর্য চিরকাল একই রকম থেকে যাবে, এদের ক্ষয় হবে না, তবু, প্রেমোচ্ছাসের উল্লাসের দোষত্রুটি ধরে নিয়েও, মনকে সে তবু আটকে রাখতে পারে। তাতেই বা কি? এও তো জানি অপরাপর মানুষ বৃদ্ধ হবে, তারপর জরাগ্রস্ত হবে, তারপর তার মৃত্যু হবে, এইটুকু চিন্তা পরিতৃপ্তির যাবতীয় আনন্দ যেন কেড়ে নেয়; এইটুকু বোধ হলেই মন কেমন খারাপ হয়ে যায়, যে যাবতীয় সম্ভোগ শরীরের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে একদিন; এসব জেনে বুঝেও যে মানুষ কামিনী শক্তিতে আত্মসমর্পণ করে, তার জীবন কী পশুর জীবন। ভুলভাল, ফাঁকা, সারশূন্য, মিথ্যের লালসা!
হায় হায় উদায়ী!
এইটাই যে সব শেষে মনে হয়; জন্মের বেদনা, বার্ধক্যের বেদনা, মৃত্যুর বেদনা; এই যে দুঃখ, এই যে শোক, সবচেয়ে বড় ভয় তো একেই করা উচিৎ। চোখের সামনে দেখছি সব শেষ হয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অথচ মন তাদেরই পিছে ধাওয়া করে কি আনন্দই যে পায়।
হায় এ জগৎ! কি অন্ধকার, কি অজ্ঞানতা, কেউ বোঝে না!”
এবং প্রতিজ্ঞা করলেন, “এক মহতী ধর্মের সন্ধান আমি করব এইবার। সে এমনই এক পথ, লোকজন জাগতিক যে সব পন্থা অবলম্বন করে তার থেকে স্বতন্ত্র! আমি ব্যাধি, জরা, মৃত্যুকে প্রতিহত করব, ব্যাধি, জরা, মৃত্যু মানুষের জীবনে যে দুঃখ বয়ে আনে তার বিরুদ্ধে যুঝব!”
সেই কাজ করার উদ্দেশ্যে তিনি স্থির করলেন, সে কালের সাধারণ ধর্মের প্রথা অনুযায়ী, প্রাসাদ থেকে চিরতরে নিষ্ক্রান্ত হবেন, তারপর অরণ্যের একাকিত্বে তপস্যা করবেন।

জেগে ওঠ – ২
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments