ধর্মচক্রপ্রবর্তনসূত্র

বুদ্ধ বারাণসী চললেন 

পথে যেতে যেতে জনৈক পূর্বপরিচিত দিগম্বর জৈন সাধু উপকের সঙ্গে দেখা। উপক দেখলেন তাঁকে, যিনি একাকী বিশ্বের জন্মরহস্য প্রণিধান করেছেন, ভুলে যাওয়া পথ বেয়ে পুনর্বার গ্রহণ করেছেন সেই প্রাকৃত প্রতিজ্ঞা, যে প্রতিজ্ঞা মণিপদ্মের মতন এতদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল । উপক শুধোলেন, “কে আপনার গুরুদেব যাঁর দীক্ষাবলে জগৎসংসার ত্যাগ করলেন?”


“আমার কোন দীক্ষাগুরু নেই,” আলোকিতজন বললেন, “নেই কোন মান্যবর সম্প্রদায়; কোন ঝলমলে চমৎকারিত্ব নেই আমার; থাকার মধ্যে আছে স্বাধ্যায়-সূত্রে প্রাপ্ত গভীর এক তত্ত্ব, যে তত্ত্বে অতিমানবিক প্রজ্ঞাবলে উপনীত হয়েছি ।


“বারাণসীর সর্বত্র খুব শিগগির অদম্য এক জীবনের দামামা বাজতে চলেছে – তবে সেখানেও বসে থাকা চলবে না – আমার কোন নাম নেই – আমার কোন চাহিদাও নেই – নাম চাইনা, যশ চাই না, কিচ্ছু না।


“জগতের একটা শিক্ষার প্রয়োজন, কিন্তু শিখবে যে, এমন ছাত্র ভূভারতে নেই, আমি নিজে নিজে তাকে সম্পূর্ণরূপে শিখেছি, তাই আমি তাকে বলি পূর্ণজ্ঞান |


“জ্ঞান-তরবারী দুঃখকে ধ্বংস করেছে, একে তাই জগৎ ঘোষণা করেছে চূড়ান্ত বিজয়।”


তিনি বললেন, “আমার কোন গুরু নেই। আমার সমকক্ষও কেউ নেই। আমি স্বয়ংসিদ্ধ বুদ্ধ । আমি অপার শান্তিলাভ করেছি, নির্বাণপ্রাপ্ত হয়েছি। ধর্মরাজ্যপ্রতিষ্ঠা নিমিত্ত আমি বারাণসী চললাম, সেখানে জীবন-মরণে যারা তমসাচ্ছন্ন হয়ে আছে, তাদের মঙ্গলকামনায় আমি এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের প্রজ্জলন করব। “


“আপনি কি বলতে চান জগৎ জয় করেছেন?” উপক জানতে চাইলেন।


জাগ্রতজন বললেন, “যাঁরা নিজেকে জয় করেছেন, তাঁরাই জগৎ জয়ী, আপন কামনাকে যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, যাঁরা অন্যায় থেকে বিরত থাকতে জানেন, কেবল তাঁরাই এ জগতের জয়লাভের অধিকারী। আমি নিজেকে জয় করেছি, আমি পাপকে প্রতিহত করেছি, তাই আমি জগতজয়ী।


“অন্ধকারে প্রদীপ যেমন জ্বলে, নিজস্ব কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই সে জ্বলে, সে তার নিজের জ্যোতিতেই আলোকিত, ঠিক সেইরকম তথাগতের দীপক জ্বলমান, তাতে ব্যক্তিগত কোন অনুভূতি নেই, আপন জ্যোতিতে সে দীপ্যমান।”


বুদ্ধ বেনারসে গেলেন।


সেখানে ঈশিপত্তনের মৃগদাবে সেই পাঁচজন তাপস বসেছিলেন, যাদের সঙ্গে তিনি একসময় তপোবনে বৃথা তপস্যায় ছ’বছর কাটিয়েছিলেন । তারা বুদ্ধকে আসতে দেখল। বুদ্ধ ধীর পায়ে চলে যাচ্ছেন, নম্রভাবে, দুচোখ মাটির দিকে সাবধানী দৃষ্টি মেলে, লাঙ্গলের ফলার মাপে মেপে মেপে পথ চলা, যেন ধর্মের প্রসাদী ফসল তিনি বুনতে বুনতে চলেছেন। দেখে ওরা ব্যঙ্গ করল।
“এই যে গৌতম এসেছে। সেই গৌতম, যে কৃচ্ছসাধনের তপস্যার প্রথম শপথ ভেঙ্গেছিল। ওকে দেখে প্রণাম কোর না, পাত্তা দিও না, এলে খাবার দাবার দেবারও দরকার নেই।”


কিন্তু, সম্ভ্রম আভিজাত্য নিয়ে গৌতম যেই তাদের কাছে গেলেন, অনিচ্ছাসত্তেও তারা আসন থেকে উঠে দাঁড়াল, যদিও আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিল যে গৌতমকে কোন রকম শ্রদ্ধাপ্রদান করবে না, তবু সম্ভাষণ করল, পা ধুইয়ে দিল, যা যা বুদ্ধ আশা করতে পারেন সে সব তারা করল। বুদ্ধকে দেখে কেমন যেন বিহ্বল হয়ে গেল, যদিও তারা গৌতম বলেই তাঁকে সম্বোধন করল। ভগবান বললেন, “আমাকে আমার ডাকনামে আর ডেকো না, যিনি অর্হতত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁকে নাম ধরে ডাকাডাকি করাটা অসম্মানজনক । ব্যাপারটা আমাকে নিয়ে নয়। আমার নিজের দিক থেকে কিছু আসে যায় না যে কে আমাকে মানল না মানল, আমাকে শ্রদ্ধা করল কি করল না। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে, যিনি করুণাঘন হয়েছেন যিনি সর্বজীবের প্রতি সমদর্শী, তাদের ক্ষেত্রে, সেইজনকে নাম ধরে ডাকাটা ঠিক শোভা পায় না। বুদ্ধগণ জগৎ উদ্ধার করেন, তাই সন্তানগণ পিতার প্রতি যেরূপ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, তাঁদেরও সেইরকম শ্রদ্ধা নিবেদন করবে। “


এই বলে তিনি তাদের তাঁর প্রথম ধর্মোপদেশ দিলেন।


এই ধর্মোপদেশ “বারাণসীতে ধর্মোপদেশ”, বা ধর্মচক্রপ্রবর্তনসূত্র নামে প্রসিদ্ধ। এতে তিনি চতুরার্য সত্য ও অষ্টাঙ্গমার্গ সম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করে তাদের দীক্ষিত করলেন। পূর্ণসত্যজ্ঞানী, সর্বব্যাপী ধীশক্তির অধিকারী বুদ্ধ সংক্ষেপে তাদের মধ্যপন্থা, বা সৎমার্গ সম্বন্ধে উপদেশ দিলেন।

“হে ভিক্ষুগণ, চরম ভাব দুপ্রকার। যে মানুষ সংসার পরিত্যাগ করেছে, তাকে এই দুইপ্রকারের চরম ভাবই পরিহার করে চলতে হবে । একদিকে লোভী, ভোগপরায়ণ, বৈষয়িক মানুষের বিষয়বিলাস, আর অন্যদিকে অর্থহীন কৃচ্ছসাধন, প্রায় আত্মহননের মতন যাতে কোন লাভ নেই।


“মাছমাংস পরিহার করে, উলঙ্গ হয়ে, মাথা কামিয়ে, চুলে জট পাকিয়ে, কষায় বস্ত্র পরিধান করে, সর্বাঙ্গে ধুলো মেখে যাগযজ্ঞ করে, এসব করেও কিন্তু , মানুষ যতক্ষণ মায়ামোহ থেকে মুক্তি না পাচ্ছে, তার মধ্যে পবিত্রতা আসবে না।


“ক্রোধ, মদমত্ততা, অকারণ জেদ, ধর্মান্ধতা, লোকঠকানো, হিংসা, অহংকার, আত্মপ্রশংসা, অন্যদের ছোট করা, নাক উঁচু স্বভাব, দুর্মতি, এইগুলোই যাবতীয় কলুষতা, মাছমাংস খাওয়া নয়।


“হে ভিক্ষুগণ, এই দুই চরম পথ পরিহার করে বুদ্ধ একটি মধ্যপন্থা আবিষ্কার করেছেন – যে পথ চক্ষু উন্মীলিত করে, যে পথে সম্বোধি প্রাপ্তি হয়, যাতে মনে শান্তি আসে, একটা উচ্চতর প্রজ্ঞার পথ, পরিপূর্ণ জ্ঞানের পথ, নির্বাণের পথ।


“মরুভূমিতে শুকনো ঘাস, রোদে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে, তায় হাওয়া লেগেছে – এবার তাতে আগুন লাগিয়ে ছড়িয়ে দিলে – সে আগুন নেভায় কার সাধ্যি? লোভ লালসা সেই প্রকার আগুন, অতএব চরমপন্থা ছেড়ে আমি আমার হৃদয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছি।
“প্রদীপে জল দিয়ে জ্বালালে অন্ধকার দূর হয় না, নষ্ট হয়ে গেছে এমন কাঠে আগুন জ্বালাতে গেলে সে আগুন জ্বলে না।


“ যাঁর আত্মা রহিত হয়েছে, তিনি লোভ লালসা মুক্ত; অসংযমী মানুষ লোভের বশবর্তী হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়, কামনা বাসনার টান নিম্নগামী, মানুষকে অপবিত্র করে।


“অবশ্য জীবনের যা প্রয়োজন তা মেটানোতে তো কোন অন্যায় নেই। শরীর সুস্থ রাখা কর্তব্য, নাহলে জ্ঞানের প্রদীপের সলতে ঠিক রাখতে পারব না, মনকে পরিষ্কার ও দৃঢ় রাখা চাই।


অতঃপর সর্বজ্ঞজন যন্ত্রণা কি তা ও যন্ত্রণাকে নষ্ট করার যে আনন্দ, সেই আনন্দময় সংবাদের বিস্তারিত আলোচনা করলেন। কৌণ্ডিন্যের নেতৃত্বে পাঁচ সাধু, দুঃখকে ঠিকমত পর্যবেক্ষণ করতে পারলে যে আনন্দের বোধ, এই তত্ত্ব উপলব্ধি করে, অবাক হয়ে গেলেন। তারপর তিনি তাঁদের অষ্টাঙ্গমার্গ চেনালেন, যে পথে চলার আলোকবর্তিকা, পথ চেনানোর সঙ্গী, যথার্থ আস্পৃহা, ঠিকমতন মর্মস্পর্শী বাক্যকথন, সে পথে বাসগৃহ, যথার্থ আচার আচরণ, ঋজু চলন, কারো ক্ষতি না করে, কাউকে না ঠকিয়ে জীবিকা নির্বাহের যথাযথ পন্থা – একজন ভাল মানুষের, একজন সুখী মানুষের, এতেই নবশক্তিবিধান। ঠিক ঠিক উদ্যোগ নিয়ে সৎপথে চলার প্রতিজ্ঞা, যে পথ মাঝে মধ্যেই হারিয়ে যায় আবার তাকে খুঁজে বেরও করতে হয়। প্রকৃতির স্বরূপে (স্বপ্ন মায়াবৎ), তাতে মনোনিবেশ করে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে সৎচিন্তা করা (“হে মোর ভিক্ষুগণ, প্রকৃতপক্ষে সবই একরকমের শূন্যতা, কিন্তু আপনারা কি তাতে মুক্তকচ্ছ হয়ে বিরাজ করতে পারেন?”)। আর যথাযথ ধ্যান, ধুলিমলিন পদচিহ্নের পিছনে চলতে থাকা পরিষ্কার চেতনার অপার শান্তি।
তো এই মুক্তির মন্ত্র, আনন্দসংবাদ, মধুর সত্য। “তারপর যখন দিব্যজন সত্যরূপ রাজরথের চাকা এগিয়ে নিয়ে চললেন, দ্যাবাপৃথিবী জুড়ে সে এক পরমানন্দ অনুভূত হল”


“হে বুদ্ধ, আপনি যথার্থই পরম সত্যে উপনীত হয়েছেন”, কৌণ্ডিন্য বলে উঠলেন, মানসচক্ষে সহসা তাঁর সত্যের উপলব্ধি হল, তারপর অন্যান্য ভিক্ষুগণও তাঁর সঙ্গে একজোট হয়ে বলে উথলেন, “আপনি সত্যই বুদ্ধ, আপনি পরমসত্যকে উপলব্ধি করেছেন!”
পাঁচ ভিক্ষু তখন দীক্ষা গ্রহণ করলেন ও সংঘের কেন্দ্রবিন্দু হলেন। এর পর সেই সংঘে শত সহস্র মানুষ শরণ নেবেন।

সংঘ ও প্রচার

বুদ্ধ বারাণসী গিয়ে ঘরে ঘরে দ্বারে দ্বারে অন্নভিক্ষা করলেন । নীর নিম্নগতি, তাই সে জগতের সমস্ত উপত্যকা জয় করতে পারে, বুদ্ধও তেমনি সকলের চেয়ে নম্র, তাই তিনি জগৎ জয় করলেন। এই শিক্ষাটি অবিশ্যি সবচেয়ে দামী, যে, কোন কথা না বলে শিক্ষাদান (বিনাবাক্যে শিক্ষাদান)। বিশেষ করে গৃহস্থদের কাছে নম্রতা আর দানমাহাত্মের শিক্ষা। বুদ্ধের মতন মানুষ, যিনি মানবজাতির রাজাধিরাজ, দীর্ঘকায়, সুপুরুষ এক ব্যক্তি, তিনি সামান্য ভিক্ষাপাত্র হাতে তাদের খিড়কির দরজায় নতজানু হয়ে আসছেন, এই ব্যাপারটাতেই সাধারণ মানুষ নিজের চোখে দেখল, দেখে তাঁর শিশুসুলভ সারল্য অথচ মানুষকে বিশ্বাস করার এক অমোঘ শিক্ষা পেল। ভিক্ষান্তে ব্যস্ত রাজপথের ধারে শহরের বাইরে কোন একটা জায়গায় বুদ্ধ চলে যেতেন, সেখানে পাত্র নামিয়ে রেখে, পায়ের পাতার ওপর বসে ভাবসমাধি অবস্থায় ধ্যান করতেন।

যশ নামে বারাণসীর জনৈক ধনী ব্যবসায়ীর যুবক সন্তান পৃথিবীর দুঃখে কাতর, হারেমের নারীদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। এই অবস্থায় পাগলের মত পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। শুধু সে একা নয়, তার সঙ্গে ৫৪ জন সঙ্গীও ছিল, এমনই যশের প্রতিপত্তি। যশ বুদ্ধের কাছে এসে কান্নাকাটি জুড়ে দিল, “হায় হায়, কি বিপদ!” বুদ্ধ তাকে শান্ত করলেন, পরিচ্ছন্ন কাপড় যেমন রঙ শুষে নেয়, বুদ্ধের কাছ থেকে সেইরকম যশ শুষে নিল জ্ঞান, যে, যে বা যা জাত হয়েছে, তার মৃত্যুও অবশ্যম্ভাবী। বুদ্ধ তাকে শিষ্যত্বে বরণ করে নিয়ে নির্বাণের পথ প্রদর্শন করলেন। যশকে ভিক্ষু হতে দেখে বাকী ৫৪ জন সঙ্গীও সংঘে যোগ দিল। আলোকিত জন তখন প্রথম পাঁচ আর এই ৫৪ জন মিলিয়ে ৬০ জন শিষ্যকে মহৎ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দিকে পাঠিয়ে দিলেন।


“যাও, যে পথে মানুষের মঙ্গল ও আনন্দ বিধান হবে, তার উদ্দেশে রওনা দাও ।”
“যাও, যে পথে সর্বমানবের কল্যাণ ও জগতের প্রতি করুণা বিকশিত হবে, সে পথে এগিয়ে চল ।”

জেগে ওঠ: ৫ – বুদ্ধ ও বারাণসী
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments