দান পারমিতা

 

সারিপুত্ত ও মৌদগল্যায়ণকে আসতে দেখে আলোকিত জন বললেন, “এই যে দুজন আসছেন, কালক্রমে  এঁরাই আমার সবচেয়ে বিখ্যাত শিষ্য হবেন, একজন জ্ঞানে অতুলনীয় (মৌদগল্যায়ণ) আর অপরজন অলৌকিক ক্রিয়াকর্মের কারণে বিখ্যাত হবেন (সারিপুত্র)! স্বাগতম!”

এই দুই সাধু পরবর্তীকালে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বিভিন্ন পর্ব লিখেছিলেন। তাঁরা সশিষ্য সংঘে যোগ দিলেন । 

মহাকশ্যপ এক ধনাঢ্য ব্রাহ্মণ। তার ওপর তিনি মানবপ্রেমিক, জ্ঞানী, তাঁর খ্যাতি দেশজোড়া । তিনি সেই সময়ে সদ্য তাঁর স্ত্রী, তাঁর বিপুল ঐশ্বর্য, অট্টালিকা, এ সমস্ত কিছু ত্যাগ করে মুক্তির পথ সন্ধান করছেন। যশ নামে সেই উন্মত্ত যুবকের মত তাঁর অবস্থা। ঘুরতে ঘুরতে একদিন মধ্যরাতে বুদ্ধের শিবিরে এসে হাজির। 

“আপনি পরম ধর্মের আনন্দ উপভোগ করেছেন, বিনম্রভাবে আপনি শুদ্ধচিত্তের প্রার্থনা করেছেন, আপনি নিদ্রাজয়ী, ও এখানে শ্রদ্ধাসহ আমার কাছে এসেছেন”, দয়ার্দ্রচিত্তে বুদ্ধ  বললেন, “শুধু আপনার জন্য আমি প্রথম সাক্ষাতে আমার যা করণীয় করব। ঔদার্য ও দানশীলতার কারণে আপনি লোকসমাজে সর্বজনবিদিত, আমার কাছ থেকে সম্যক বিশ্রামের দান গ্রহণ করুন, এবং বিশুদ্ধিতার নিয়মাবলী জেনে নিন। “

পরমজ্ঞানী বুদ্ধদেব মহাকশ্যপ নামে এই ধনবান মানুষটির অকারণ ও কিঞ্চিৎ বেয়াড়া রকমের দয়া দাক্ষিণ্যের প্রতি কিছুটা রাশ টানতে চাইছিলেন। এঁর সবচেয়ে আগে একটু শান্ত হওয়ার দরকার ছিল। বললেন, “জগতের এই যে অতিচাঞ্চল্য, মহাব্যস্ততা, একেই আমি মনে করি সমস্ত দুঃখের মূল।

“জন্ম মৃত্যুর এই ক্রমাগত টানাপোড়েন দেখে আমার মনে হয় আমাদের উচিৎ একটা অপ্রতিরোধী, নিষ্ক্রিয় বিগতস্পৃহ অবস্থা অবলম্বন করা; সম্মতা (সমতা)’র সুউচ্চ লক্ষ্য, মৃত্যুহীন পরম শান্তির স্থান। 

“সমস্তই শূন্য! এখানে না অহং, না আমিত্বের কোন জায়গা আছে, সমগ্র জগৎ মায়াময়; আমরা একেকজন নানাগুণের সমষ্টিগত আধারবই আর কিছু নই।”

মহাকশ্যপ উপলব্ধি করলেন দয়াদাক্ষিণ্যে অহং-এর কোন জায়গা নেই। 

“আপনিই প্রকৃত তত্ব উপলব্ধি করেছেন, আপনার সরল হৃদয় দানধ্যান করতে চায়; কারণ ধনসম্পদ অনিত্য; অন্যের কাছে বিলিয়ে দেওয়াই শ্রেয়; 

“যখন ধনদৌলত আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়, যা বাঁচল, জ্ঞানীজন সমস্ত কিছু অনিত্য জ্ঞানে অবলীলাক্রমে সেসবও দান করে অবাধে বিতরণ করে দেন, যা জমিয়েছিলেন তাই দিয়ে পরোপকার করেন। 

“কিন্তু মূর্খ মানুষ তাদের আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, পাছে হারিয়ে যায় সেই ভয়ে মরে, উদ্বেগে ক্ষয়ে যেতে থাকে দিনের পর দিন, কাল্পনিক কি এক ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, দুঃস্বপ্ন দেখে সব বুঝি হারিয়ে গেল, সব, এমনকি নিজেও;

“দানশীল মানুষের মনে কোন পরিতাপ নেই, কোন তাড়িয়ে বেড়ানোর ভীতি নেই; উন্মুক্ত পুষ্পের প্রায় তাঁর পুরস্কার, ফুল থেকে ফল জন্মে– কিন্তু তাকে প্রথমেই বুঝতে পারা যায় না। এই বোধ-ই স্থিতধী’র পথ, কোন কিছুর উপর নির্ভর করে নেই, অগণিত স্থিতধী। 

“শৃন্বন্তু!

“আমরা অমৃতপথ প্রাপ্ত হলেও ক্রমাগত দয়াশীল কাজের মাধ্যমে আমরা নিজেদের পরিপূর্ণ করি; অন্যত্র দয়া, করুণার পরিণামে আমাদের পরিপূর্ণতা প্রাপ্তি। 

“অতএব! দানশীল মানুষ পরমাগতির সন্ধান পেয়েছেন; যে মানুষ বৃক্ষের চারা রোপণ করে, সে শীতল ছায়ার বিশ্রাম পায়; পুষ্প চয়ন করে, গাছ যখন পরিপূর্ণ হয়, সেখান থেকে ফল লাভ করে, দানের ফলও তেমনি; আনন্দ ও পরম নির্বাণ!

“খাদ্য বিতরণ করে আমরা শক্তি সঞ্চয় করি; বস্ত্র বিতরণ করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে নিজেদের; ধর্মশালা স্থাপন করে সর্বোচ্চ দানের সুফল লাভ করি, নিজের স্বার্থসিদ্ধি বা কতটা লাভ করলাম না ভেবেই করি; তাই এতে পরম চিত্ত শান্তি!

বুদ্ধ এই যে শিঁঁক্ষা দিলেন পরবর্তীকালে এই শিক্ষা দান পারমিতা বলে গ্রথিত হয়েছিল। দানপরায়ণতা, ছটি গুণের অন্যতম, অষ্টাঙ্গমার্গের শেষ ছ’টি সোপানের অন্তর্গত: দান, শীল, ক্ষন্তি (ধৈর্য), বীর্য, ধ্যান, প্রজ্ঞা। মহাকশ্যপ এই শিক্ষা গ্রহণ করে দীক্ষিত হলেন, ও গেয়ে উঠলেন,

 

“এতদিনের ভারি বোঝা নামিয়ে রাখলাম,

পুনর্জন্মের কারণ আর আমার নেই,

কখনো ভাত কাপড়ের কথা ভাবি নি,

কখনো ভাবি নি মানসিক বিশ্রামের,

আমাদের গৌতম অনবধনেয়,

তাঁর গ্রীবায় চতুষ্কোণ তোরণ,

সেখানে বিরাজ করে একাগ্রতা; হ্যাঁ, সেই মহর্ষি,

যাঁর হাতে আছে নির্ভরতা আর বিশ্বাস,

তাঁর সুউচ্চ ললাটে অন্তর্দৃষ্টি,

মহৎ জ্ঞানীজন

শান্ত পদক্ষেপে পরমশান্তিতে তিনি সদা সঞ্চরমান”

 

বুদ্ধের মহাপ্রয়াণের পর, মহাকশ্যপ বৌদ্ধসংঘের প্রথম মহাগুরু হয়েছিলেন, ও ত্রিপিটক একত্রিত করে গ্রথিত করেছিলেন; এ যদি না করা হত, মহৎ জনের বাণি আজ ২৫০০ বছর পরে আমাদের কাছে পৌঁছত না। তবে জাগ্রত জন, বুদ্ধের, মানসচেতনায় ২৫০০ বছর পদ্মপত্রে বারিবিন্দুসম। ধর্মের সারণী অনন্ত, নিরবিচ্ছিন্ন। মহাবিশ্বের সর্বদিকে বুদ্ধগণ সদাবিরাজমান; গঙ্গার অযুত বালুকারাশির ন্যায়। এঁরা সতত বিশ্বের মঙ্গল-কামনায় তূরীয় বোধির জ্ঞানালোক বিতরণ করে চলেছেন। এখন আমিও সকল প্রাণীর মঙ্গলকামনায় অযুতসহস্রদিকে বুদ্ধালোক বিতরণ করে চলেছি; নানাপ্রকার প্রাণীর প্রতি আমি ধর্মের প্রকাশ করে চলেছি। যার যার ধারণ ক্ষমতামত আমি সতত বিভিন্ন ভাবে ধর্মের বিকাশ করি; তাই বুদ্ধের, বিশ্বগুরুর প্রহেলিকা অবধান করার চেষ্টা করি। সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব পরিত্যাজ্য; তোমরা সকলে বুদ্ধত্ব প্রাপ্ত হবে।”

মহাকশ্যপের দীঁঁক্ষান্তে শাক্যমুনি গৌতম ধরণীর পথ বেয়ে তাঁর জন্মস্থান, মহারাজ শুদ্ধোদনের রাজ্য গোরক্ষপুরে এলেন। মহাগজের দুর্জ্ঞেয় একাকীত্বে, বহু শিষ্যসহ ধীরে ধীরে বুদ্ধদেব কপিলাবস্তুর কয়েক ক্রোশের মধ্যে এলেন। সেখানে তাঁর কৈশোরের সুরম্য প্রাসাদ তখন, মায়াময়, আলোকিত মুকুরের অটল মহিমায় স্থির; সে যেন শিশুদের রূপকথার ছেলেভুলনো হর্ম্যতোরণ। তাঁর আগমনের সংবাদ পেয়ে মহারাজ শুদ্ধোদন ত্রস্তপদে সত্বর এলেন। 

বুদ্ধকে দেখে বড় দুঃখে বললেন, “এইতো আমি আমার পুত্রের দর্শন পেলাম; সে আগের মতই আছে, কিন্তু তার পুরনো হৃদয় যেন আর তার মধ্যে নেই, নেই সেই পুরনো আত্মার উষ্ণতার লেশমাত্র, সে যে শূন্য, শীতল। যেন কতদিনের পুরনো সখার কথা ভাবছেন, এইভাবে পিতাপুত্র পরস্পর পরস্পরের দিকে চেয়ে রইলেন। 

বুদ্ধ: “আমি জানি যে মহারাজের হৃদয় স্মৃতিমেদুর ভালবাসায় পূর্ণ, এও জানি যে পুত্রহেতু তিনি দুঃখের পর দুঃখ বরণ করেছেন, কিন্তু এখন! পুত্রপ্রেমের, পুত্রের কথা চিন্তায় যে বন্ধনে তিনি আবদ্ধ, সে বন্ধন ছিন্ন হোক!

“স্তব্ধ হোক প্রেমময় চিন্তাভাবনা, আপনার শান্ত মন আমার, আপনার পুত্রের কাছ থেকে গ্রহণ করুক ধর্মের পরিপোষণ, যে পরিপোষণ অদ্যাবধি কোন পুত্র তার পিতাকে দিতে পারে নি, সেই পরিপোষণ; হে রাজন, হে আমার পিতৃদেব, আমি আপনাকে সেই পরিপোষণ নিবেদন করি!”

“যে অমর অপার সিদ্ধি আপনার প্রতি নিবেদন করি মহারাজ, সেখানে কর্মের উপচিতিতে জন্মের উন্মেষ; কর্মের ফলগেতু প্রায়শ্চিত্ত; অতএব রথচক্র যেমন বৃষের পথ অনুসরণ করে চলে, কর্ম তেমন ফল বয়ে আনে, সকল কার্য উদ্ধারে আপনি কত না যত্নবান! আপনি কত না তৎপর যে জগতে আপনার কার্য কেবল সকলের মঙ্গলার্থে সাধিত হবে। 

“তবে শুধু এক ঐশ্বরিক পুনর্জন্মের কামনায় যেন সৎকার্য না করেন মহারাজ! দিবারাত্র অমঙ্গল চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে, সর্বজীবের প্রতি প্রেম ও সমদৃষ্টিপাত করে, আপনি যেন মনের যাবতীয় কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে নীরব ধ্যানমগ্ন হতে পারেন; এতেই সকলের মঙ্গল, এ ব্যতীত আর কোন সত্য নেই। 

“ মনে রাখবেন স্বর্গ, মর্ত্য পাতাল সবই সমুদ্রের ফেনা বই আর কিছু নয়। 

“নির্বাণ! এতেই সর্বোত্তম, পরম, শান্তি!

“স্থিতচেতনা, সকল প্রমোদের শ্রেষ্ঠ প্রমোদ!

“জ্ঞানীজন অনন্ত শান্তির মাঝে আপন নিবাস খুঁজে পান। সেখানে যুদ্ধের, দ্বন্দ্বের স্থান নেই; না অশ্ব, না রথ, না হস্তী, না সৈন্যসামন্ত!

“একযোগে তাবৎ জন্ম, জরা, মৃত্যুতে ছেদ টানুন!

“অজ্ঞানতা, লোলুপতা, ক্রোধের অবসানে পৃথিবীতে জয় করার আর কিইবা বাকী থাকতে পারে!”

 

পুত্রের কাছ থেকে এমন মমতায় ভীতি জয় করার, জন্মের তমসাচ্ছন্ন যাতনা থেকে উদ্ধার পাবার, এমন কথা শুনে, মহারাজ রাজত্ব পরিত্যাগ করে, এমনকি রাজ্য অবধি ত্যাগ করে চেতনার অবগাহনে ডুব দিলেন, অনন্ত মহদ্ধর্মের তোরণ উন্মুক্ত হল তাঁর সামনে! মহারাজ শুদ্ধোদন ধ্যানময় মধুর যেন আস্বাদ পেলেন । রাত্রে অনন্ত আকাশের পানে তাকিয়ে মহারাজ অপন মনে উপলব্ধি করলেন, “আকাশ ভরা এই সূর্য তারার মাঝে কি আনন্দ যে আমিও স্থান পেয়েছি। “, তারপর, “তবু শুধু বেঁচে থাকা তো নয়, নক্ষত্রখচিত এই মহাজগত মহাজগত মাত্র নয়!”, তখন বুদ্ধের শেখানো সকল চেনার মাঝে সকল অচেনার উপলব্ধি হল তাঁর।  

 

 

জেগে ওঠ ৭: দান পারমিতা ও কপিলাবস্তুতে পুনরাগমন
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments