পূর্ব প্রকাশিতের পর

বুদ্ধদেব ও মহারাজ প্রসেনজিৎ

জেগে ওঠার কথা যেমনি প্রচারিত হতে থাকল, নারীগণ কেশ কর্তন করে, কাষায় পরিধান করে, ভিক্ষাপাত্র হাতে বুদ্ধের সঙ্গে দেখা করতে এলেন।

বুদ্ধদেব নিষেধ করলেন, বললেন, “দৃঢ় বাঁধ যেমন নদীকে বেঁধে রাখে, সেইরকম আমিও কিছু নিয়মের বন্ধন করেছি, তাকে অতিক্রম করতে পারিনা।” এই নির্ভীক, আন্তরিক নারীদের মধ্যে রাজকুমারী যশোধরা, বুদ্ধের মায়ের সম্পর্কে বোন প্রজাপতি গোতমী, এঁরা ছিলেন। তার ওপরে আনন্দ, গোতমীর অনুনয়ে, এমন জেদ ধরে অনুরোধ করতে লাগলেন, যে বুদ্ধ শেষ অবধি টলে গেলেন। এইভাবে ভিক্ষুণীদের সংঘ সৃষ্টি হল। বুদ্ধ আদেশ করলেন, “এঁদের ভ্রাতাদের পরে স্থান দিতে হবে”
“তাহলেও”, পরম পুণ্যজন বললেন, “এই যে এঁদের স্থান দেওয়া হল, এতে করে সদ্ধর্ম আর সহস্র বৎসর বাঁচবে না, পাঁচশো বছর তার আয়ু। ধানক্ষেতে ছত্রাক পড়লে যেমন ধানক্ষেতের নাশ হয়, তেমনি, যখন ঘরকন্না ছেড়ে নারীগণ সংঘে যোগদান করবেন, সংঘও দীর্ঘকাল জীবিত থাকবে না।” এই এক অশনি সংকেত, আর তার পাশাপাশি দেবদত্তের উথ্থানের দিনগুলোয় দেবদত্ত সংঘের কিছু ভিক্ষুণীকে ব্যবহার করেছিলেন।

মহারাজ প্রসেনজিৎ, তাঁর রাজত্বে সতত শান্তি বিরাজমান, অথচ মহারাজ নিজে মহারাণীর সঙ্গে বিবাদ বিসম্বাদ করে দ্বিধাদ্বন্দে ভুগছিলেন। মহারাজ সেই সময় পরম পূজ্যের কাছ থেকে ধর্ম-অধর্মের কথা শুনতে ইচ্ছা করে, বুদ্ধ-সমীপে শ্রদ্ধাবনত হয়ে উপনীত হলেন, প্রণাম করে ডান পাশে সসম্ভ্রমে বসলেন।
তখন মহারাজ প্রসেনজিৎকে, ধর্মব্যাঘ্র এই কথা বললেন।
“যারা অসৎ কর্মের হেতু নীচকূলে জন্মেছে, তারাও, সচ্চরিত্র মানুষ দেখলে, তাঁর সম্বন্ধে শ্রদ্ধাশীল হয়, আপনার ন্যায় রাজন, যিনি পূর্বজীবনের কর্মহেতু এমন যোগ্যতা অর্জন করেছেন, তিনি যখন বুদ্ধের দর্শনলাভ করেন, না জানি আরো কতই না শ্রদ্ধাশীল।
“যে দেশে বুদ্ধ অবস্থান করেন না, তার তুলনায় যেখানে তিনি অধিষ্ঠিত, সেখানে যে শান্তি-সমৃদ্ধি বিরাজ করবে, তাতে অসুবিধে কি।
“এখন মহারাজের কাছে সংক্ষেপে ধর্মাধর্মের অবতারণা করব।
“সবচেয়ে বড় প্রেমময় হৃদয়। সকল প্রজাকে একমাত্র সন্তানতুল্য জ্ঞান করা; নিজেকে কোন মিথ্যা তত্বে না জড়ানো; রাজকীয় অহমিকা নিয়ে মাথা না ঘামানো; কপট পরামর্শদাতাদের মিথ্যা মিষ্ট বাক্যে না কান দেওয়া।
“শলাকার শয়নসজ্জায় শুয়ে নিজেকে কষ্ট দেবারও কিছু নেই; বরং ইহজগতের অসারতাকে গভীর ধ্যানে উপলব্ধি করা; সদাসর্বদা জীবনের চাঞ্চল্যকে স্মরণে রাখা ।
“কাউকে তুচ্ছ করে নিজেকে মহিমান্বিত করা নয়, বরং আপন অন্তরে সজাত আনন্দ অনুভব করা, আরো আনন্দময় জীবনের দিকে ক্রমাগত এগিয়ে চলা;
“শুনুন মহারাজ! আপনি নিজেই আপনার লণ্ঠন, নিজেই আপনার শরণ, এ ব্যতীত অন্য শরণ আর কোথাও নেই। প্রতিষ্ঠিত ধর্মই হোক আপনার লণ্ঠন, ধর্মই হোক আপনার শরণ।
“কুকথা বহুলোক বার বার করে বলে, কিন্তু সৎপথ দেখানোর লোক এ জগতে কমই আছে।
“চতুষ্কোণ পর্বতের অভ্যন্তরে আটকা পড়া মানুষ যেমন না পারে বেরোতে, না পারে থাকতে, তেমনি জরা, জন্ম, ব্যাধি, মৃত্যুর দূঃখময় পর্বতগাত্র থেকে আপন অন্তরে সদ্ধর্ম ব্যতীত মুক্তির অন্য পন্থা নেই।
“সকল প্রাচীন দিগ্বিজয়ী রাজচক্রবর্তীগণ, যাঁরা জগতে ঈশ্বরের ন্যায় বিরজ করতেন, তাঁরা মনে করতেন আপন শক্তিবলে ক্ষয় রোধ করবেন, ক্ষণকালের জীবনযাপনের পর তাঁরাও গত হয়েছেন।
“আপনার রাজকীয় শকটের দিকে তাকিয়ে দেখুন, দেখবেন এতেও ব্যবহারাদি জনিত ক্ষয় ধরেছে;
“কালাগ্নি সুমেরু পর্বতকে দ্রবীভূত করবে একদিন, এমনকি মহাসমুদ্রও শুষ্ক হবে, সে তুলনায় এই নশ্বর শরীর কতই না তুচ্ছ। বুদ্বুদতুল্য অনিত্য এ শরীর, সম্পদের আদর গায়ে মেখে জীবনের দীর্ঘ রাত্রির যাতনা সয়ে চলেছে, উদাসীন অলস জীবন, এ শরীর কতদিনই বা পৃথিবীতে থাকবে । হঠাৎ করে মৃত্যু আসে, নষ্ট হওয়া কাঠের নদীতে ভেসে যাওয়ার মতন করে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
“ভিজে যাওয়া জমি থেকে ঘন বাষ্প উদিত হয়, ঝোড়ো হাওয়া তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়, সূর্যের আলোকছটা সুমেরু পর্বতের চারপাশ ঘিরে থাকে, দাবাগ্নির লোলজিহ্বা শুষে নেয় ভিজে যাওয়া জমিকে, তাবৎ সঞ্জাত বস্তুনিচয় বারংবার বিনাশের নিমিত্ত জন্মগ্রহণ করে।
“যিনি শিহিভূত, ধর্মপথে যিনি পিছপা নন, পরিবর্তনশীলতার এই প্রত্যাশায় তিনি তাবৎ প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করেন, তিনি আত্ম-প্রমোদে রত নন, জীবনে জটিলতায় তাঁর জীবন বাঁধা নেই, কোন বন্ধন নেই জীবনে, বন্ধুত্ব চান না, পাণ্ডিত্যের ধার ধারেন না, অথচ এর থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়েও রাখেন না; কেননা তাঁর প্রজ্ঞা অন-উপলব্ধির প্রজ্ঞা; অথচ জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বকে উপলব্ধি করেন।
“জ্ঞানীজন জানেন যে স্বর্গে জন্মেও আত্মা ও সময়ের চঞ্চলতা হতে, অস্তিত্বের বিনাশ হতে কারো নিস্তার নেই। তাঁরা তাই অপরিবর্তনীয় মানসের পাঠ নেন, কেননা, যা অপরিবর্তনীয়, তাতেই পরম শান্তি।
“অমৃতময় জীবনের অপরিবর্তনীয় কায়া সকলেই প্রাপ্ত হয়, একেই মনোমায়াকায়া বলা হয়; সর্ব জীব সমাগত বুদ্ধ, কারণ সকল জীবই ন-শ্বর; আবার সকল জীবই বিগত বুদ্ধ কেননা সকল জীবই গতকালে ন-শ্বর; অতএব সত্যি বলতে কি, সমস্ত জীবই বুদ্ধ কারণ, সমস্ত জীবই ন-শ্বর।
“এই নিয়ত পরিবর্তনশীল দেহধারণই সকল দুঃখের মূল।
“হৃদয়ের চিন্তা করুন মহারাজ, লালসাকে দূর করুন; আর দুঃখ থাকবে না। লালসা সতত পরিবর্তনশীল, লালসাই কামনা, যেন ত্রস্তপদে চলমান দুই বৃষ, যেখানে লালসা, সেখানে প্রেম নেই।
“যে গাছে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে, সেখানে পাখিরা ফিরে আসে কোনদিন?
“জ্ঞানবান মানুষ, যিনি আলোকপ্রাপ্ত সাধু, তিনি যদি এই কথা না জানেন তো তিনি সাধু হবার যোগ্য নন।
“এই জ্ঞান উপেক্ষা করা জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
“ একে কেন্দ্র করেই হোক সকল সম্প্রদায়ের শিক্ষা; একে বাদ দিয়ে সত্যিকারের কারণ বলে আর কিছু থাকে না।

এই কথা শুনে মহারাজ প্রসেনজিৎ প্রাসাদে ফিরে গেলেন, ও মহারাণীর সঙ্গে বিসম্বাদ মিটমাট করে ফেললেন। মহারাজের মন শান্ত হল, তিনি প্রসন্ন বোধ করলেন। তাঁর শিক্ষা হল যে যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানেই অজ্ঞানতার পারাবার। আবার উল্টোপাল্টা বিশ্বাস হল লালসার ধেয়ে আসা বাণের জল; কিন্তু বোধি একটি তরী, সচেতন প্রতিফলন অনুধ্যান সেখানে যেন শক্ত করে বাঁধা কাছি যাকে ধরে তরী বেয়ে তরণীর ওপারে নির্মল প্রশান্তিতে যাওয়া যায়। কিন্তু এত করেও মহারাজ প্রসেনজিৎ না আলোকপ্রাপ্ত , না তিনি বুদ্ধদেবকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন। কারণ এই আহ্লাদে আর ধর্মবিশ্বাসের উৎসাহে, ধর্মোপদেশে যা পুণ্যার্জন করেছেন তার চেয়েও বেশী পুণ্যের প্রাপ্তি আশায় তিনি এক পশুনিধন মহাযজ্ঞের হুকুম দিয়ে বসলেন।
চলবে

জেগে ওঠ – ৯ – বুদ্ধদেব ও প্রসেনজিৎ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments