জেলাসি


কর্নফ্লেক্স দুধ খেতে খেতে ঘুমচোখে সামনের টেবিলগুলোর দিকে দেখছিল মাধ্বী। হাওয়াই দ্বীপের এই হোটেলের সব টেবিলেই যুগলদের দেখা যাচ্ছে, মাধ্বীর মত একা কেউ না। আমেরিকার এই হানিমুন ডেস্টিনেশনে এ ছাড়া আর কি আশা করা যায়! দু’একজনকে দেখে ভারত-পাকিস্তানের থেকে আসা মনে হল। মাধ্বীর দিকেও যে লোকজন ঘুরে দেখছে তা সে বুঝছিল; কারনটাও তার জানা, পরনের শাড়ী। হনলুলু মুলুকে শাড়ী পরিহিতা মহিলা কখনো কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। মাধ্বী অনেক বেছেকুচে প্রচুর খাবারের মধ্যে থেকে দু’একটা নিরামিষ খাবার পেয়েছিল, তাতে মন দিল। এসব দেশে এলে এটাই সমস্যা, পাঁউরুটি বা চকোলেটেরও মালমশলা কি জেনে নিতে হয়, তাতেও অনেক সময় ডিম ব্যবহার করে এরা। ধীরেসুস্থেই খাচ্ছিল, তাড়া বিশেষ নেই, ঘন্টাদেড়েক পর বেরোবে, কনফারেন্সে তার প্রেজেন্টেশন তো দুপুরে। তার আগে শুধু লোকের বক্তৃতা শোনা; এইসব কনফারেন্সে লোকজন আসে নেটওয়ার্কিংএর জন্য, মাধ্বীর দ্বারা ওসব হয় না। মাধ্বী এরকম কনফারেন্স এড়িয়ে চলতেই ভালবাসে। ওর হয়ে কোন ছাত্রীকে পাঠিয়ে দেয় পেপার পড়তে। কিন্তু এবার প্রফেসর মার্শাল বারবার অনুরোধ করায় বিশেষ আমন্ত্রিত বক্তা হিসাবে ওর ব্রেষ্ট ক্যানসারের পেপারটা পড়তে এসেছে। এই সম্মান কম লোকেরই ভাগ্যে জোটে, ফলে দেশে সহকর্মী বা কিছু সিনিয়রও ওর শত্রুতে পরিনত হবে সেটা সে বুঝে গিয়েছিল। এসবই ভাবছিল, হঠাৎ এক্সকিউজ মি শুনে সামনে মুখ তুলে তাকালো।
-তুমি কি মাধ্বী? ইংরাজীতেই প্রশ্নটা এলো টেবিলের সামনে দাড়ানো এক মহিলার কাছ থেকে। মাধ্বী মনে করতে পারছিল না ওই মহিলা ভারতের কোন গবেষণা কেন্দ্রের কিনা।
উত্তরটা হাঁ শুনেই ওই মহিলা উচ্ছসিত হয়ে বললেন, চিনতে পারছিস না! আমি নন্দিতা। সেই যে কানপুরে হস্টেলে..
হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল মাধ্বী, কানপুরে তার পি এইচ ডি কালের সাথী ছিল শামলা, গোলগাল এক নন্দিতা; তার সাথে এই হাফ প্যান্ট পরা মহিলাকে মেলাতে অনেক কল্পনার দরকার হয়। ঝকঝকে স্লিম ট্রিম এই প্রায় আমেরিকান মহিলার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল সে।
- আরে হা করে দেখছিস কি, আমি সেই নন্দিতা; আজকাল লোকে চিনতে পারে না। তুই অবশ্য গোল হয়েছিস, তাছাডা আর সব একই রকম, দুর থেকেও চেনা যায়।
মাধ্বী তখন ফিরে গিয়েছে পঁচিশ বছর আগে, কানপুরের সেই দিনগুলোয়, প্রফেসর ভরদ্বাজের ল্যাব, হস্টেল, ক্যাফেটরিয়া, সে, নন্দিতা আর সোম। সোম ভরদ্বাজ, মেকানিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং, এম টেকের ঝকঝকে ছাত্র, টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম। আই আই টি থেকে বি টেক করে বছর খানেক চাকরী করেছে। তারপর আবার নিজের ইন্সটিট্যুটেই এম টেক করতে এসেছিল, নন্দিতার মাসতুতো ভাইয়ের বন্ধু। সেইসুত্রে ওদের সাথে চেনাজানা, বন্ধুত্ব।
-কবে এসেছিস? কদিনের জন্য এসেছিস? একসাথে বিচে গিয়ে বেশ মজা করা যাবে।
নন্দিতার কথায় বর্তমানে ফিরে এল মাধ্বী।
- কাল রাতে এসেছি রে, আজ রাত এগারোটার ফ্লাইটে ফিরব।
- সে কি রে, হাওয়াই বেড়াতে এসে একটা রাত মাত্র। আমি তো ভাই প্রতি বছরই প্রায় আসি, তবু তিন চার রাতের কমে থাকি না।
- না বেড়াতে নয়, একটা কনফারেন্সে এসেছি, পেপার পড়ে আজ রাতেই ফিরে যাব।
- ও বাবা, তুই এখনো বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্ক রেখেছিল! আমার তো ভাই কবে ওসব চুকে গেছে। আমি পুরোদস্তুর সংসারী মানুষ।কুড়ি বছর পর দেখা। কত কি ঘটে গেছে, তুই একই রকম রয়ে গেছিস। পুরনো কারোর সাথে আর যোগাযোগ নেই। বাবা মা মারা যাওয়ার পর দেশে যাওয়াও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আজ সব গল্প করব, তোদের কথাও শুনব। কত কথা জমা আছে।
হঠাৎ দুরে দাঁডিয়ে থাকা একজনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার সাহেব ডাক দিয়েছে রে, বোধ হয় গাড়ী এসে গেছে। শোন আমার রুম নাম্বার ৫১৩, সন্ধ্যের আগেই ঘরে ফিরব, তুই আমাদের ঘরে চলে আসিস। ওর সাথে আলাপ হবে তোর। সব কথা হবে, রাতে আমাদের সাথে ডিনার করে এয়ারপোর্ট যাবি।
দরজার দিকে অপসৃয়মান নন্দিতার দিকে তাকিয়ে থাকল মাধ্বী, মনটা হাওয়াই ছেড়ে পৌঁছে গিয়েছিল কানপুরের দিনগুলোয়। মনটা খুশিতে ভরে উঠেছিল পুরনো বন্ধুকে ফিরে পেয়ে; কত কথা হবে আজ। হঠাৎ মনে পড়ল বেরনোর আগে নিজের প্রেজেন্টেশনটা একবার দেখে নিতে হবে। ঘরের দিকে হাঁটা দিল মাধ্বী।

হোটেল থেকে বেরনোর পর দশ মিনিটের রাস্তায় মাধ্বী শুধু পুরনো কথাই ভাবতে থাকল। কনফারেন্স, পেপার, লেকচার কোন কিছুই মাথায় ছিল না। না দেখলো পথঘাট, না দেখলো দুদিকের দৃশ্য। পি এইচ ডির দুটো বছর পার হয়েছে, কাজ প্রায় অর্দ্ধেক সাড়া। প্রফেসর ভরদ্বাজ মাঝেমধ্যে বলেন বছরখানেক পরই লেখা শুরু করবে। সেই সময় এম টেক করতে এলো সোম। নন্দিতা আর মাধ্বী দুজনের সাথেই বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় লাগল না। ক্যাফেটরিয়ায় আড্ডা দিত তিনজনে মিলে ঘন্টার পর ঘন্টা। রিসার্চের কাজকর্ম ডকে ওঠার জোগাড়। হোস্টেলের গেটে সোম হাজির হলেই ছাগলছানার মত তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে পড়ত ওরা দুজন। হোস্টেলের মেয়েরা বলত, শ্যামের বাঁশি বেজেছে, গোপিনীরা চলে অভিসারে।
ব্যাপারটা প্রফেসারেরও নজর এড়ায় নি। উনি একদিন দুই ছাত্রীকেই একসাথে বসিয়ে কড়া ধমক দিলেন, আগে কাজ তারপর অন্যকিছু। তাতে আড্ডায় ভাঁটা পড়লেও বন্ধ হল না। তবে একবছরের মধ্যে দুই বন্ধুই পি এইচ ডির কাজ শেষ করে লেখা শুরু করল। সোমের সাথে গল্পের সময় তার কিছুকিছু কথা অদ্ভুত মনে হত কখনোসখনো। কিন্তু নন্দিতার কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে মাধ্বী নিজের বোঝার ভুল ভাবত।
কনফারেন্স হলে পৌঁছে প্রথমেই দেখা করল প্রফেসর মার্শালের সাথে, উনি অনুযোগ করলেন মাত্র একদিনের জন্য আসায়। পাশে দাঁড়ানো জন হপকিন্সের প্রফেসর ব্রাউন বললেন, এইসব কনফারেন্সেই তো দেখাসাক্ষাত হয়, নিজেদের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা করতে পারি।
মাধ্বী মিষ্টি হেসে এসব কথা এড়িয়ে গেল। মনে মনে বলল, আমার কি ইচ্ছে যায় না! উপায় নেই। একজন অপেক্ষায় আছে আমার জন্য।
পরের দুটো ঘন্টা নানা লোকের পেপার পড়া শুনেই কেটে গেল। বারবার ভাবতে থাকল, এইসব দেশে লোকেরা কত গভীরভাবে কাজ করে। বারোটার সময় বিশিষ্ট আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে মাধ্বী তার গবেষণাপত্র উপস্থাপন করতে উঠল। একঘন্টার এই পর্বটা দিনের সেরা আকর্ষন ছিল। শেষে নানা দেশের শ্রোতাদের চোখাচোখা প্রশ্নবান সামলাতে হল আরো পনের মিনিট।
এরপরই মধ্যাহ্নভোজের পালা একদল দিকপালের সাথে, ব্রাউন নিজে খুঁজেপেতে মাধ্বীর জন্য নিরামিষ খাবার নিয়ে এলেন। মেলবোর্নের প্রফেসর জনসন ওকে এই কাজের জন্য অনেক সাবাশী দিয়ে বললেন, চারমাস পর আমার ওয়ার্কশপে দুদিনের জন্য তোমায় আসতেই হবে। কোন না শুনব না।
তারপর কয়েকজনের বক্তৃতায় বসে থাকল মাধ্বী। কিন্তু মন চাইছিল হোটেলে ফিরতে, যেখানে আছে নন্দিতা। বারবার মনে ভাসছিল কুড়ি বছরব্যাপী চলচ্চিত্র।
ছয়মাসের মধ্যেই থিসিস লেখা শেষ। সোমও পোস্ট গ্রাজুয়েশন শেষ করে চাকরী করতে গেছে নিজের শহর দিল্লীতেই। যাওয়ার আগেই মাধ্বীকে বিয়ে করতে চাইল। মাধ্বী তাই শুনে তো সপ্তম স্বর্গে। সপ্তাহের শেষে বাবাকে বলতেই বাবা এক কথায় রাজী। মাধ্বী অনেক লড়াই, প্রতিরোধ আশংকা করেছিল। তা না হওয়ায় অবাকই হয়েছিল। বাবা পরের সপ্তাহেই সোমের বাড়ী গিয়ে কথা পাকা করে এল।
নন্দিতাকে এই খবর দিতেই মুখে নেমে এল কালো মেঘের ছায়া। সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল, পরদিন কারোকে না জানিয়েই হোস্টেল থেকে বাড়ী এসেছিল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিয়ে হয়ে গেল। বিয়েতে নন্দিতা আসে নি, শুধু অভিনন্দন জানিয়ে একটা কার্ড পাঠিয়েছিল। বিয়ের পর্ব চুকতেই নিজের ইন্সটিট্যুটে গিয়ে কয়েকদিন থেকে থিসিস জমা করল। প্রফেসর ভরদ্বাজের কাছে জানল নন্দিতাও নিজের থিসিস জমা করে গেছে।
তারপর শুরু হল নতুন জীবন, মাধ্বীর শ্বশুরবাড়ীর জীবন। এই জীবনের স্বপ্ন অনেকদিন ধরে দেখে আসছে। আর কোন ল্যাব, ইউনিভারসিটি, ইনস্টিট্যুট এ সময় কাটানো না; শুধু সে আর তার সংসার। দু একদিনের মধ্যেই নতুন লোকজনদের কেমন যেন অন্যরকম লাগতে লাগলো। এ ধরনের মানুষ ও কখনো দেখে নি। সোম ও যেন কিরকম অন্য মানুষ। কোথায় যেন অন্য সুর।

মাধ্বীর শ্বশুরবাড়ীতে সবাই খুব জ্ঞানী লোক। যেকোনো বিষয়েই সবার জ্ঞান অগাধ আর দুনিয়ায় কেউ কিছু জানে না। বাড়ীর বাইরের কোন লোকের উপর তাদের বিশ্বাস নেই। বাড়ীর সর্বোচ্চ বিধানদাত্রী আমেরিকানিবাসী ননদ, যিনি বিয়েতে আসতে না পারলেও, পরে এসে মাসখানেক কাটিয়ে গেলেন। সোম সকালে অফিস যেত, সন্ধ্যেতে ফিরে অফিসের মুখখু বড়সাহেবদের গালাগালি করত, কেউই ইনজিনিয়ারিং কিছু বোঝে না। তাদের বিচারসভা বসত প্রায় প্রতিদিন, বড় ননদের রায়ে তারা নিকর্মা ঘোষিত হত।
এ ইভাবেই চলতে থাকে, মাসদুয়েক পর সোম অফিস যাওয়া বন্ধ করে দিল, ওর নাকি অশিক্ষিত লোকেদের সাথে কাজ করতে আত্মমর্যাদায় লাগছে। শাশুড়ীর কাছে জানলো এটা নাকি তৃতীয় চাকরী ছাড়া সোমের।
- চল, কফি পান করে আসি; হঠাৎ প্রফেসর মার্শালের ডাকে বর্তমানে ফিরে এল মাধ্বী। কফির সাথে কাজ নিয়ে কথা চলতে থাকল। আরো কয়েকজন সিনিয়র বিজ্ঞানীও যেগ দিলেন। দুর থেকে বম্বের নাগরাজন বারবার ওদের দেখছিল। মাধ্বী জানে যে নাগরাজনের একটা গোষ্ঠী আছে যারা পিছনে ওকে গালাগালি করে, দেশের কোন কনফারেন্সে মাধ্বী বা ওর কোন ছাত্রছাত্রীর ডাক পড়ে না ওর দলবলের জন্য। তা সত্বেও নাগরাজনকে ডেকে নিল তাদের দলে।
কফি শেষ করে মাধ্বী বলল, থ্যাংক ইউ প্রফেসার। এবার হোটেলে ফিরব। রাতে আবার ত্রিশ ঘন্টার যাত্রা।
- ঠিক আছে, তোমার গাড়ীর ব্যাবস্থা করা আছে, রাত ন’টায় এয়ারপোর্টেও ছেড়ে আসবে। পরের বছর এই কনফারেন্সটা মিলানোয় হবে। তোমায় এখন থেকে বলে রাখলাম, আসবে যেন। আর যোগাযোগ রেখো। নাগরাজনের মুখে নেমে আসা ছায়াটা মাধ্বীর নজর এড়াল না।
গাড়ীতে বসে অনেকদিন পর মাধ্বীর মনে পড়ল ড: মোহনকে। দক্ষিন দিল্লীর বিশ্ববিখ্যাত এক গবেষনাকেন্রে সিনিয়র বিজ্ঞানী ছিলেন উনি। সোমের বারবার চাকরি ছেড়ে বসে থাকায় ভয় পেয়ে মাধ্বী ওনার কাছে গিয়েছিল চাকরীর সন্ধানে। ওই বৃদ্ধ পিতৃতুল্য মানুষটা নিজের ল্যাবে নিয়েছিলেন ওকে। ওনার সাথে বছর দুয়েক কাজ করে মাধ্বী, তারপর উনি অবসর নেন।
মাধ্বীর চাকরী করার সিদ্ধান্তে শাশুড়ী খুশী হয়ে বলেছিলেন, ঠিক করেছ মা, সোমের উপর কোন ভরষা নেই। আর সারাদিন এই বাড়ীতে কাটালে তুমি পাগল হয়ে যাবে। আমার তো অভ্যাস হয়ে গেছে। সোম কিন্তু বারবার তার অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিল। নিজে অফিস যাওয়ার পথে বৌকে অফিসে ছেড়ে যেত, ফেরার পথে অফিস থেকে নিয়ে যেত। অবশ্য আরো বারদুয়েক চাকরী ছাড়ার পর সোমের নিজের অফিস বলে কিছু থাকল না। সোমের কথাবার্তা শুনে বোঝা যেত যে সবকিছু স্বাভাবিক না। মাধ্বীর রোজগারের টাকাতেই সংসার চলতে থাকল। এর মধ্যে জন্ম নিল মেয়ে মন্দিরা।
ড: মোহন চলে যাওয়ার পর নিজের ইন্সটিট্যুটেও মাধ্বীর জীবন আর সহজ রইল না। কাজকর্মে প্রতিনিয়ত বাধা আসতে থাকল। ওকে বাধ্য করা হত সন্ধ্যে পর্যন্ত কাজ করতে, ওকে করে যেতে হত অন্যের গবেষনার কাজও। এই নিয়ে সোমের সাথে সড়াই লাগতে থাকল। সোমের বক্তব্য সকাল ন’টায় বেরিয়ে ছ’টায় বাড়ী ঢুকতে হবে। মাধ্বী সাধারনত সালওয়ার স্যুট পরে অফিস যেত, কখনো সখনো কোন বিশেষ অনুষ্ঠান থাকলে শাড়ী। তাতেও সোমের আপত্তি। শাড়ী পরে যাওয়া চলবে না, কোন সাজগোজ চলবে না। মাধ্বী নাকি চাকরীটা পেয়েছে নিজের রূপ দেখিয়ে। এসব কথাবার্তায় সোমের বাবা মা কিন্তু কিছু বলতেন না। তবে গোটা পৃথিবীর চাকরীদাতারা খারাপ সেটা তারা জানতেন। তাই তাদের ছেলে চাকরী করতে পারে না, আর বৌ সুখে চাকরী করছে।
মাঝেমধ্যে বাবার বাড়ী গিয়ে শান্তি পেত, বাবা মাকে এবাড়ীর কোন কথা বলে নি। কিন্তু, তিন চার বছরের মন্দিরা ওখানে পৌঁছেই ঘোষনা করত আর দিল্লী যাব না। ওখানে দিনরাত ঝগড়া হয়। মামার বাড়ী থেকে ফিরতেও চাইত না। কান্নাকাটি করত ।
মন্দিরা স্কুলে যাওয়াও শুরু করেছে। স্কুলের ক্লাস টীচার একদিন মাধ্বীকে ডেকে বললেন, ওর সামনে বেশী ঝগড়া করবেন না। মাথা নিচু করে বাড়ী ফিরেছিল মাধ্বী।
হোটেলে পৌঁছল, রিসেপসনে খোঁজ নিয়ে জানল নন্দিতারা ঘরে ফিরেছে। না একটু পরে ওদের ঘরে যাবে, হবে আড্ডা। কত বছর পর।কত কি বলার আছে। কত কি শোনার আছে। ও শুধু প্রফেসর ভরদ্বাজের কাছে শুনেছিল ডিগ্রী পেয়েই নন্দিতা আমেরিকা চলে গেছে পোস্ট ডক্টরেট করতে। হোস্টেলে কারো কাছে শুনেছিল নন্দিতা নাকি মাধ্বীর বিয়ের দিন অনেক কান্নাকাটি করেছিল।
আজ নন্দিতা ফিরিয়ে আনলো সেই অতীত, যা মাধ্বী ভুলে গিয়েছিল সেই ভয়ংকর বিকেলটার পর।


যতদিন যাচ্ছিল মাধ্বীর সাংসারিক আর পেশাগত জীবন দুটোই জটিল হচ্ছিল, কঠিনও। বাড়ীতে সোম বৌকে সামনে পেলেই চিৎকার চেঁচামেচি করত। শ্বশুর শাশুড়ী চুপ থেকে ছেলেকে সাপোর্টই দিয়ে যাচ্ছিল। কানপুরে সোমের কথাবার্তা মাঝেমাঝে অদ্ভুত লাগত, আজকাল সবসময়ই অদ্ভুত লাগে। একদিন মাধ্বী সোমকে কোন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতেই শ্বশুর- শাশুড়ী ও তার সাথে লড়াইয়ে নামল। মেয়ে মন্দিরা প্রতি সন্ধ্যেয় মা অফিস থেকে ফেরার পর মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, মামার বাড়ী চলো।
অফিসে নতুন বস মাধ্বীর উপর কাজের চাপ বাড়িয়ে যাচ্ছিল। শুধু গবেষনা নয়, প্রশাসনিক কাজকর্মও করতে হচ্ছিল। একের পর এক প্রজেক্ট লিখে যেত মাধ্বী। প্রজেক্ট লেখা, তার প্রেজেন্টেশন দেওয়া ছিল মাধ্বীর কাজ, কিন্তু টাকা এলেই ডিপার্টমেন্টের সম্পত্তি। এই সবের জন্য তাকে অফিস বন্ধ হওয়ার পরও কাজ করতে হত। অনেক সময় শনিবার ছুটির দিনেও অফিস যেত। বাড়ী থেকে দুরে সে শান্তিতে থাকত, শুধু চিন্তা থাকত মেয়েকে নিয়ে। মেয়ে স্কুল থেকে ফিরে মায়ের অপেক্ষায় বসে থাকত।
এক শনিবার দুপুরে নিজের ল্যাবে কাজ করছিল, হঠাৎ বসের ডাক। মাধ্বী পৌঁছতেই উনি বললেন, বাড়ী যাও।
মাধ্বী উদগ্রীব হয়ে জিগগেস করল, কেন? কি হয়েছে?
- তোমার স্বামী ফোন করে জিগগেস করল তুমি শনিবারেও কেন আস?
মাধ্বী ওনার অফিস থেকে বেরোনর সময় শুনল – শোনো, এরকম ফোন যেন আর না আসে।
বাসের বদলে আজ অটো নিয়ে বাড়ী ফিরল, ফিরেই নিজের ও মেয়ের জিনিষপত্র গুছিয়ে নিল দুটো ব্যাগে, শাশুড়ীর দিকে বলল, আমরা বাবার বাড়ী যাচ্ছি। পথে নামল মাধ্বী মন্দিরার হাত আঁকড়ে। মন্দিরা শুধু বলল, মাম্মী, এখানে আর ফিরে আসব না।
হোটেলে ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিল মাধ্বী।নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে নিল, মিনিটখানেকের ব্যাপার। এ’তো এক রাতের হোটেল বাসের কাপড়চোপড়, গোছাতে কতক্ষন আর লাগে! যে বাড়ীটাকে নিজের বলে ভাবতে চেয়েছিল, যে সংসারটা তার উপার্জনের টাকায় সে টেনে নিয়ে যেত, সেখান থেকে বেরোনোর আগে গেছগাছ করতে দশ মিনিট ও লাগে নি; নিজের কাপড়চোপড়, ডিগ্রীর কাগজ নিয়ে সোজা বাবা মায়ের কাছে উঠেছিল। কয়েকদিন পর কাছেই একটা বাড়ী ভাড়া নিয়ে মাধ্বী শুরু করেছিল মেয়েকে নিয়ে বাঁচার লড়াই। মাধ্বীর ছয় বছরের সন্চয় যা জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে রাখাছিল তা আর সে পায় নি, ওরা সব তুলে নিয়েছিল।
অফিসের কাছে সরকারী কোয়ার্টার পেয়ে সেখানে আসতে চাইলো, তাহলে প্রতিদিন যাওয়া আসায় ষাট কিলোমিটারের যাতায়াতের হাত থেকে বেঁচে যাবে। সমস্যা হল মন্দিরার স্কুল পাল্টানো নিয়ে, বাবা যদি বাগড়া দেয় তবে সমস্যা। মন্দিরা পাসপোর্ট করাতে চেয়েও পারে নি বাবার সইয়ের অভাবে। মাঝেমধ্যে সেই আমেরিকা প্রবাসী ননদ মেল করত মন্দিরার দখল চেয়ে। মহিলা মাধ্বীর কলিগদের কাছেও তার নামে গালাগালি করে মেল করত। মাধ্বী জবাব দেয় নি। এমনকি মন্দিরার স্কুলের প্রিন্সিপ্যালের কাছেও মেল করেছিল।
সোমকে সে ভুলতে পারে নি, বারবার মন চাইত ফিরে যেতে, মেয়ে কিন্তু বলত ওখানে সে যাবে না। মেয়ের জন্য বেঁচে থাকা মাধ্বীর, মেয়ে যা চেয়েছে তাই হয়েছে।
লোকে ডিভোর্সের পরামর্শ দিলেও মাধ্বী তা নাকচ করে দিয়েছে, বলেছে -তাতে কি লাভ! আমি মেয়ের জন্য বাঁচছি। আজ মেয়ে আঠারো বছর বয়স পার করেছে, মাধ্বীও নিজের কোয়ার্টারে চলে গেছে মেয়েকে নিয়ে। আজ আর কারো পরোয়া করে না সে। আইনত তার মেয়ের অধিকার নিয়ে আর কেউ টানাটানি করতে পারবে না। মেয়ের আঠার বছর বয়স হওয়ায় আজ মাধ্বী সিনহা ও সাবালিকা।
এরকম কনফারেন্সে যাওয়ার সুযোগ অনেক জোটে, কিন্তু মেয়েকে একা ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না সে। সিংগাপুর, অ্যাডিলেড, প্যারিস সব কনফারেন্সেই একদিনের উপস্থিতি তার, তাও বছরে একবারই। দেশের মধ্যেও এরকমই কম যাতায়াত অন্য কোন ইন্সটিট্যুট বা মিটিংয়ে। গেলেও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়ের কাছে ফিরে আসে। আজও মেয়েকে মেসেজ পাঠাল সে, আর একটা রাত মাকে ছেড়ে থাক, আমি তোর কাছে ফিরে আসছি মন্দিরা মা আমার। কাল রাতের ডিনার একসাথেই করব। ডিনারের কথা মনে হতেই নন্দিতার নিমন্ত্রন মাথায় এল।
হোটেল রিসেপসনে ফোন করে বলল, পনের মিনিটে চেক আউট করার কথা, আর এয়ারপোর্ট ড্রপের জন্য গাড়ীটা ন’টার বদলে সাতটায় ব্যবস্থা করতে। এয়ারপোর্টে ভেজ বার্গার চিবোতে চিবোতে নন্দিতার উদ্দেশ্যে মনে মনে বলল, গোটা পৃথিবী আমার ভাগ্যকে করুনা করে। একমাত্র তুই অনেক কিছুই না জেনে আমায় হিংসা করিস, সেটা চলতে থাকুক। আমায় ক্ষমা করিস নন্দিতা, আজকের জন্য।

জেলাসি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments