ঝরাপাতার কথা
সুব্রত চৌধুরী

প্রিয় এথেল,
বছরের শেষদিনে আমার তোমার শহর যখন বর্ষবরনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, আমি তখন এই রাজ্য ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতির মাঝে লিখছি তোমায়। আমার এক সহযোদ্ধার হাতে দেব চিঠিটা।জানি না সে কি করে তোমার কাছে পৌঁছে দেবে, অদৌ তুমি পাবে কি না! তোমার সাথে শেষ দেখা হয়েছিল দু’মাস আগে কালীপুজোর রাতে। পুলিশের নজর এড়িয়ে তোমার পাড়ায় পৌঁছনোটা খুবই কঠিন আর বিপজ্জনক ব্যাপার ছিল।পরে তার জন্য আমার কমরেডদের কাছ থেকে হঠকারী আখ্যাও পেয়েছি। কিন্তু কি করব বল এথেল আমার। হয়ত আমাদের আর দেখা হবে না কখনো, সমাজ বদলানোর যুদ্ধে হয়ত আমরা দুজনেই শহীদ হব।

তোমার মনে পড়ে সেই দিনটার কথা? কলেজের গেট মিটিংয়ে আমি ভিয়েতনামে আমেরিকার নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলছিলাম, তুমি মন্ত্রমুগ্ধের মত আমার কথা শুনছিলে। মিটিংয়ের পরে তোমার বন্ধু চিত্রা আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। তুমি আমায় বলেছিলে, কথা তো বেশ ভালোই বলেন। কিন্তু আমেরিকার উপর আপনার রাগ তো ওটা বড়লোকের দেশ বলে, আমাদের মত গরীব নয় তাই। আমি তোমায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাস বুঝিয়েছিলাম। এরপর যখনই তোমাদের কলেজে যেতাম কোন মিটিংয়ে, তুমিও হাজির হতে। পরে তোমায় অনুরোধ করেছিলাম জগু মিস্ত্রী লেনে আমাদের সংগঠনের অফিসে আসতে।
মনে পড়ে এথেল, খালধারের বস্তিতে সেই পার্টি ক্লাসের কথা! সেই রমেনদা, লুংগী আর পানজাবী পরে ঘন্টার পর ঘন্টা মার্কসীয় অর্থনীতি বুঝিয়ে যেত। আমার সাথে ভারতের রাষ্ট্রচরিত্র বিশ্লেষনে কত ঝগড়াই না হয়েছে। আমরা নতুন দলে এলেও রমেনদা পুরনো পার্টিতেই রয়ে গেল। শুনেছিলাম অজয়বাবুর মন্ত্রীসভায় রমেনদা নাকি জায়গা পাবে, শেষ পর্যন্ত তা হয় নি। এই জংগলে সব খবর সময়ে পাই না। আমরা এখানে আসার আগে নকশালবাড়ী কি কম্যুনিষ্ট পার্টির নাম এখানকার লোকে জানতই না। এখানে ভারতরাষ্ট্রের শাসনব্যাবস্থা পৌছেছে কিনা সন্দেহ হয়। উঁচুজাতের জোতদারেরাই এখানে রাজার মত শাসন চালায়। খালপাড়ের বস্তির মানুষদের অবস্থা দেখে তোমার চোখে জল এসে গিয়েছিল, এখানে এলে তুমি কি করতে তাই ভাবি। তবে এখানকার মানুষদের সংগঠিত করেছি। জমির লড়াই শুরু হয়েছে, জোতদাররা ভয় পেয়েছে। এখানে আমার কাজ শেষ, স্থানীয় কমরেডরা দায়িত্ব নেবেন। আমি চলে যাব অন্য প্রদেশে। আমায় নিয়ে চিন্তা কোরো না, আমরা বিপ্লবের জন্য বলিপ্রদত্ত। আমি তো নিজের দেশেই থাকব। চে গিয়েছিলেন অন্য দেশে, রেজি দ্য ব্রে অন্য মহাদেশে। বিপ্লব রপ্তানি করা যায় না জানি। বিপ্লবের জ্বালানিটা স্থানীয় হতে হবে, কিন্তু দেশলাইয়ের কাজটা তো আমরা করতেই পারি।

আমার এথেল, দলবেঁধে শান্তিনিকেতন বেড়াতে যাওয়ার কথাগুলো মাঝেমাঝেই মনে পড়ে যায়। কোপাইয়ের ধারে বসে একের পর এক কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলাম তোমায়। সবই তোমার জন্য লেখা, আমার কবিতা তো তুমিই। কতদিন কোন কবিতা লিখি নি, পড়িও নি। বিপ্লব ডাক দিয়েছে, কবিতা নিয়ে খেলা করে সময় নষ্ট করার দিন হাতে নেই। আমার কলম আঁচড় কাটবে ভারতবর্ষ নামের এই দেশটার বুকে। রচিত হবে এক শোষনহীন সমাজের আখ্যান।
এথেল, এথেল আমার, যখনই আমার কথা মনে আসবে, কান্না নেমে আসবে তোমার চোখে, মনে কোরো রোজেনবার্গ দম্পতির কথা। ওরা আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রান দিয়েছিল। ওদের মতই আমাদেরও লক্ষ্য শ্রমিকশ্রেনীর একনায়কতন্ত্র। হয়তো প্রানও দেব আমরা।
এবার বেরোতে হবে এক অজানা জায়গার উদ্দেশ্যে, এক অজানা পথে। তাই শেষ করছি। ভালো থেকো এথেল আমার।

তোমার জুলিয়াস।

১৯৭২ সালে এই চিঠিটা কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার হাতে আসে। ডেবরার কাছে নকশালদের কোন ঘাঁটিতে নাকি পাওয়া যায়। যেহেতু কেউ ধরা পড়েনি, পুলিশের ঘাড়ে দায়িত্ব আসে এথেল আর জুলিয়াসকে খুজে বের করার। তখনো মধ্য কলকাতার একটি এলাকায় অনেক অ্যাংলো ভারতীয়ের বাস ছিল। সেখানে খোজ নিয়ে কোনো জুলিয়াস না পাওয়া গেলেও, দুই এথেলকে পাওয়া গেল। তাদেরকে তুলে আনা হল ভবানী ভবনে। হাজার জেরাতেও কোনও জুলিয়াস কিংবা নকশালবাড়ীর নামগন্ধ পাওয়া গেল না। তার উপরে তারা কেউই স্কুলের গন্ডী ছাড়ায় নি। অ্যাংলো সমাজের কর্তারা হট্টগোল শুরু করল। তাদেরকে ছেড়ে দিতে হল। দু চারমাসের পর দুই এথেলের পরিবারই তাদের নিরাপদ গন্তব্য অষ্ট্রেলিয়া পাড়ি দেয়।

দুই এথেল তো মুক্তি পেল, কিন্তু পুলিশের মাথায় চিন্তা। গোয়েন্দাকর্তা রায়সাহেব এই চিঠি নিয়ে হাজির হলেন সবরকম সরকারের সংগে থাকা কমিউনিষ্ট পার্টির এক বুদ্ধিজীবি নেতার কাছে। তিনি ওই চিঠি একবার পড়েই বললেন, এ তো এথেল রোজেনবার্গ আর জুলিয়াস রোজেনবার্গের নাম। আমেরিকার কম্যুনিষ্ট ছিলেন ওনারা। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ এনে ওদের ফাঁসি দেওয়া হয়। সুভাষবাবুর লেখা রোজেনবার্গ পত্রগুচ্ছ পড়তে পারো। এই বিদ্যে নিয়ে কি করে যে গোয়েন্দাগিরি কর জানিনা! মানুবাবু শুধুশুধু তোমাদের মাইনে দেয়। এথেল-জুলিয়াসের সন্ধান এখানেই ধামাচাপা পড়ে।

বছরদশেক পরে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলমে পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত গৌরীআম্মার ব্যাগ থেকে এক খাতা পাওয়া যায়; তাতে লেখা ছিল: জুলিয়াস তুমি নেই, তোমার এথেল কিন্তু তোমার দেখানো স্বপ্নের পিছনে আজো ছুটে চলেছে।

ঝরাপাতার কথা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments