বুদ্ধির গোড়ার কথা

আজকাল ফেসবুকে দেখি একদল নানান ছবি দেখে "Awwww! So innocent!" বলে ন্যাকামো করেন। আবার পরক্ষণেই বলেন ইন্টেলিজেন্স নাকি তাঁদের সবচেয়ে বড় টার্ন অন। আসলে ইনোসেন্স আর ইনটেলিজেন্স, এই দুটো পরস্পরবিরোধী ব্যাপার। যাঁদের বুদ্ধি জিনিসটা বেশি ম্যাচিওর করেনি তাঁরাই ইনোসেন্ট হয়ে থাকেন। তাই জন্তু জানোয়াররা মানুষের তুলনায় ইনোসেন্ট, তাই শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় ইনোসেন্ট। সেটা খারাপ কিছুই নয়। কিন্তু দুটো একসাথে পাওয়া মুশকিল আছে। বোকা লোকেরা মানুষ হিসেবে বেশি ভাল হন, এই প্রচলিত ধারণাটা তাই অনেক ক্ষেত্রেই খেটে যায়। ঠিক একই রকমভাবে যিনি প্রচণ্ড সৎ, তাঁর পক্ষে খুব "স্মার্ট" হওয়া একটু মুশকিল, কারণ "স্মার্ট" হতে গেলে যে নিজের দুর্বলতা গুলো লুকিয়ে রাখতে শিখতে হয়।

 

যৌনবস্তু, না যৌনদাসী?

চারপাশে মেয়েদের অবজেক্টিফিকেশন নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু সত্যিই কি একদল পুরুষ নারীকে যৌনবস্তু হিসেবেই চান? যৌনবস্তু মানে হল গিয়ে এইরকম…


এর চেয়ে একটা গোটা জ্যান্ত মেয়ে প্রেফার করবেন বোধহয় প্রায় সবাই। মৃতদেহ ধর্ষণ করার মত চরম পার্ভার্শনের নমুনাও আছে বটে, তবু যে স্তনের দিকে তাকিয়ে আপনি গোটা মেয়েটাকে ভুলে গিয়ে শুধু শয়নে স্বপনে ওই স্তনের কথা ভেবেই জিভের ঝোল ফেলেছেন, সেই স্তনদুটি কেটে ধুয়ে টুয়ে আপনার বাড়ি এনে দিলে আপনার হয়তো আর তত ভাল লাগবেনা। সঙ্গমের সময় নারী ঠাণ্ডা হয়ে থাকলে ভাল লাগে, না রেসিপ্রোকেট করলে? তাহলেই ভেবে দেখুন, আপনি আসলে যৌনবস্তু হিসেবে মেয়েদের চাইছেননা, চাইছেন যৌনদাসী হিসেবে। অর্থাৎ একটা জীবন্ত নারীদেহই চাই আপনার, যে নড়বে, চড়বে, শীৎকার করবে, তবে আপনার খেয়াল খুশি মত। তার নিজের ইচ্ছে বলে কিছু ততক্ষণই থাকা চলবে যতক্ষণ তা আপনার ইচ্ছের সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে। তাই না? দুর্ভাগ্যবশত বেশিরভাগ মেয়েই আপনার যৌনদাসী হয়ে থাকতে অনিচ্ছুক। তার থেকেই আসে "হবিনা মানে? না হলে জোর করে ধর্ষণ করব!" টাইপ ব্যাপার। "ফোকটে কেউ কিছু দেয়না, অধিকার করে নিতে হয়, সেটাই মর্দাঙ্গির লক্ষণ" – এই শিক্ষা যদ্দিন দেওয়া চলতে থাকবে, তদ্দিন এহেন আচরণের কমার কোনো কারণ দেখি না।

 

অভিনয় আর অতি-অভিনয়

সম্প্রতি দুটো ফিল্ম দেখলাম। দাওয়াত-এ-ইশক আর বুনোহাঁস। দুটোই খাজা, কাউকে দেখতে পরামর্শ দেবনা। খুব ভাল হবে এমন ভেবে দেখতে বসিওনি। স্রেফ সময় কাটানোর ধান্দা আর কি। যে কথা বলার, দুজন অসম্ভব বাজে অভিনেতা (অভিনেত্রী বলে আর কোনো শব্দ হয়না এখন) পরিনীতি চোপড়া আর দেব কে কিন্তু এই দুটো ফিল্মে বেশ মানিয়ে গেছে। হয়তো লোকে বলবে বেশ ভালই অভিনয় করেছেন এঁরা। আসল কথা হল এঁরা আদৌ অভিনয় করেননি, করার বিশেষ চেষ্টাও করেননি। একটা টিপ্পনি শুনেছিলাম – একটা বন্ধ ঘড়ি একটা পাঁচ মিনিট ফাস্ট ঘড়ির চেয়ে বেশি ভাল, কারণ সেটা অন্তত দিনে দুবার ঠিক সময় দেয়। এঁদের দেখে সেই কথা মনে পড়ে গেল, আর মনে হল অভিনয় করতে না জানা বোধহয় ওভার-অ্যাক্টিং করার চেয়ে ঢের ভাল। বুনোহাঁসে দেব অভিনয় করেছেন একটি আদ্যন্ত ক্যালানে ছোকরার ভূমিকায়। তাঁর বাস্তব সত্তার সঙ্গে সেটা দিব্যি মিল খেয়ে গেছে। তাই অভিনয় না করতেই বেশ ভাল লাগছে তাঁকে এই ভূমিকায়। দাওয়াত-এ-ইশকের পরিনীতিও সেরকম দুষ্টু দুষ্টু চটর পটর কথা বলা এক চরিত্র। তাঁকেও বিশেষ অভিনয় করতে হয়নি।
অনেকের দ্বারাই অভিনয়টা হবার নয়। কামনা করব তাঁরা যেন সেটা চটজলদি বুঝতে পেরে ওভার-অ্যাক্টিং করার বাসনা ত্যাগ করেন, এবং ডিরেক্টররা তাঁদেরকে তাঁদের বাস্তব সত্তার সাথে মিল থাকা চরিত্রে ব্যবহার করেন। বন্ধ ঘড়িও যে ফেলনা নয়…

 

রে কবীরা, মান জা…

ফেসবুকে হইচই পড়ে গেছে কবীর সুমনকে নিয়ে। তা বিখ্যাত লোকেদের নিয়ে তো হইচই হয়েই থাকে। তবে এবার একটু অন্যরকম। এক ব্যক্তির লেখা বেশ নিরামিষ ভদ্রভাষার খোলা চিঠি পড়ে সুমন গেছেন খেপে। খেপে গিয়ে মাথা গরম করে তিনি যা নয় তাই বলছেন, এমন কি রাস্তার কুকুর টুকুর বলেও গালাগাল করছেন। তাই দেখে একদল ভক্তর মোহভঙ্গ হয়েছে, তাঁরা নিদারুণ মনোকষ্টে ভুগছেন – "এ সুমন আমার সুমন নয়" বলে। আরেকদল পা-চাটা স্তাবকের মোহভঙ্গ হবার নয়। তাঁরা তাঁদের প্রিয় কাজ, অর্থাৎ পদলেহন করে চলেছেন। অন্যদিকে অ্যান্টি-সুমন ক্যাম্পের মূলত গেরুয়া-পন্থীরা হেবি খুশি, ভাবটা এমন "বলেছিলাম না কবীর সুমন দুষ্টু লোক?" আর খোলা-চিঠি যিনি লিখেছিলেন তাঁর মধ্যেও একটা "কেমন দিলাম!" ভাব। সুমনের থেকে গালাগাল খেয়ে আর অ্যান্টি-সুমন ক্যাম্পের থেকে প্রবল সমর্থন পেয়ে তিনি বেশ গর্বিত, এটা বোঝা যাচ্ছে।

আসল কথা সুমন একজন মানুষ, ভগবান টগবান নয়। সবরকম রিপুই আছে তাঁর, বাকিদের মতই। দিনের পর দিন বদলোকের খিস্তি খেতে খেতে তিনি মেজাজ হারিয়েছেন। তার ওপর বয়েস হবার সাথে সাথে মানসিক দিক থেকেও তিনি খুব স্টেবল না। খানকতক বাছাই করা দিয়ে দিয়েছেন তাই বিনা কারণেই। দিয়েছেন তো দিয়েছেন, সারাক্ষণই ফেসবুকে হাজার হাজার লোকে এর চেয়ে দশগুণ বাজে খিস্তি করেই চলেছে অবিরাম। সুমনের বেলায় এত হইচই কেন? কারণ কিছু লোক তাঁকে ভগবানের আসনে বসিয়েছে। যাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে ভগবানে আস্থা হারাবেননা, তাঁরা এখনও ভক্তিরসে নিমজ্জিত। আর কারো কারো চোখে কবীর বাবু ভগবান থেকে মানুষে নেমে আসায় তাঁরা মর্মাহত। মূল প্রশ্নটা এইখানে – এই ভগবানের লেভেলে তোলার কি কোনো প্রয়োজন ছিল? তাঁর গান যুগান্তকারী, অনেকদিন টিকে থাকার মত। সেইটুকু নিয়ে থাকলেই হত। তাঁর পলিটিকাল স্টেটমেন্টগুলোকে কেউই বিশেষ সিরিয়াসলি নেয়না, যদি নেয়ও তার বিরুদ্ধমত দেবার মত লোকেরও অভাব নেই। তাই তাঁর বাজে বকা গুলোকে "তিনি বৃদ্ধ হলেন" ভেবে ইগনোর করলেই ভাল। দুর্ভাগ্যবশত অনেকের কাছেই কবীর সুমনের সবচেয়ে বড় পরিচয় "তিনি মোল্লা হলেন"…
 

(আর স্বয়ং কবীর সুমনের উদ্দেশ্যে – দাদা, অনেক ছড়িয়েছেন, এবার চেপে যান।)

 

টুকরো কথা ২
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments