আবার পুজো চলে এল। আমার মত বাঙালির নিজস্ব একাকিত্বটুকু কেড়ে নেবে বাকিরা সদলবলে। সাধে কি মা বলেন "সকাল থেকে কানের কাছে মাইক বাজছে গাঁক গাঁক করে! একটু শান্তিতে পুজো করতে পারেনা লোকগুলো?" কথাটার মধ্যে অবশ্য একটা ভুল রয়েছে। এ ভুলটা অনেকেই করে থাকেন। কানের কাছে যা বাজছে তার মধ্যে মাইকের কোনো ভূমিকাই নেই। যা বাজছে তা নেহাতই গান, রেকর্ডেড গান, বাজছে লাউডস্পীকারে। লাউডস্পীকারের চোঙাগুলোকে "মাইক" নামেই চেনেন অনেকে। কেন কে জানে…

মনে আছে ছোটো থেকে বড় হয়ে ওঠার পথে ব্যোমকেশ পড়ে দারুণ লেগেছিল। ফেলুদার চাইল্ডিশ ভাব কাটিয়ে সদ্য পাওয়া একজন কমপ্লীট গোয়েন্দা, সেইসঙ্গে শরদিন্দুর অপূর্ব কলমের টান। আহা! সম্প্রতি নহুদিন পর আবার পড়ে কেন জানি ভাল লাগলনা তেমন। বেশ কিছু গল্পে নিতান্ত অবাস্তব প্লট, তার ওপর ক্রমাগত নারীবিরোধী মন্তব্য বিরক্তির সৃষ্টি করছিল মাঝেমাঝেই। গল্পের নায়ককে পারফেক্ট হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, তবু তার মুখ দিয়ে বারবার সেক্সিস্ট কমেন্ট বেরিয়ে এলে সেটা খুব একটা ভাল লাগেনা। নারী পুরুষের অবৈধ সম্পর্কের মূলে সব ক্ষেত্রেই নারীদের দোষ – এই গোছের মনোভাবে বিশ্বাস করতেন বোধহয় লেখক। সেই সময়ের সমাজব্যবস্থার ভিত্তিতে তাঁকে হয়তো লোকে সেক্সিস্ট বলবেনা, কিন্তু এখন পড়ে দেখলে মন্তব্যগুলো ভাল ঠেকেনা।

সম্প্রতি প্রথমবার অর্গাজমের অভিজ্ঞতা নিয়ে এক বন্ধু আমায় দুঃখ করে বললে – "এ যেন সেই খ্যাপার পরশপাথর খুঁজে বেড়ানোর মত হল… সেই কবে থেকে খুঁজে আসছি, যখন পেলাম তখন সেরকমভাবে বুঝতে পারলাম না, শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে গেল… সেই 'স্পর্শ লভেছিল যার এক পল ভর' টাইপ হল…" আমি বললুম "কেন, অভিজ্ঞতাটা ভাল লাগেনি?" সে বললে – "তা লেগেছে, কিন্তু বহু অপেক্ষা করে করে শেষ মেশ এরকমভাবে মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল… তাই সেই কাব্যিটার কথা মনে পড়ে গেল…" বললুম – "রবি ঠাকুরের আরেকটা কাব্যি আছে, পড়ে দেখিস – 'পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়…' ইত্যাদি।"

নন্দিতা দাস উঠে পড়ে লেগেছেন ডার্ক ইজ বিউটিফুল ক্যাম্পেন নিয়ে। অর্থাৎ ভারতীয়দের ফরসা চামড়ার প্রতি বিশেষ প্রেম এবং তার বেসিসে মানুষের বিচার করার প্রবণতা নিয়ে তাঁর আপত্তি। এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি দেখে মনে হল এত ইয়ে কিসের? আমার যদি কালো চামড়ার থেকে ফরসা চামড়ার মানুষ বেশি ভাল লাগে সেইটে আমার পার্সোনাল ব্যাপার। তুমি ঠিক করে দেবার কে হে? কিন্তু সত্যিই কি ব্যাপারটা এতটা পার্সোনাল লেভেলে থাকে? এই ভাল লাগাটা কি সত্যিই আমার পার্সোনাল চয়েস, নাকি সমাজ ধীরে ধীরে আমার মধ্যে এই  স্টিরিওটিপিক ভাল লাগাটা চাপিয়ে দিয়েছে? সারাক্ষণ ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির বিজ্ঞাপন দেখে দেখে আর মা মাসিদের মুখে "আহা কি সুন্দর ফর্সা সুন্দর চেহারা" শুনে শুনে প্রভাবিত হয়েই আমার আজকের এই চয়েস তৈরি হয়নি তো? ফেয়ারনেস ক্রীমের এই রমরমার ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল হয়তো এইভাবে… কোনো কারণে (হয়তো কালোর সঙ্গে ময়লাকে মনে মনে অনেকে এক করে ফেলেন, সেই জন্যে) সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের পার্সোনাল চয়েস ঝুঁকে ছিল ফর্সার দিকে। তাই দেখে ডিমান্ড সাপ্লাই এর নিয়ম মেনেই রিসেপশনিস্ট এর চাকরিতে, বিয়ের বিজ্ঞাপনে লোকে খুঁজতে শুরু করল ফরসা চেহারার মেয়ে (লক্ষ করুন, ছেলেদের ক্ষেত্রে কালো হলে অতটাও চাপ নেই কিন্তু)। এর ফলে মানুষের ধারণা হতে থাকল ফরসা হতে পারলে তবেই বাজারে দাম বেশি, সে বিয়ের বাজারই হোক, বা এয়ার হোস্টেসের চাকরি। ফলে বিক্রি বাড়তে লাগল এইসব ক্রীমের, আর লোকের মনে এই ধারণাই গেঁড়ে বসে গেল যে সাকসেসফুল হতে গেলে ফরসা হওয়াটা জরুরি। তাই আজ শাহরুখ খান যখন বিজ্ঞাপনে এই কথাটাই বলেন, কারোর মনে অ্যালার্ম বেজে ওঠেনা, অথচ একই কথা কোনো উন্নত দেশের একজন পাবলিক ফিগার বললে তাঁকে রেসিস্ট বলে সিধা জেলে ঢুকিয়ে দিত!
ভাবতে ভাবতে মনে হল বড্ড সিমপ্লিফাই করে ফেলললাম ব্যাপারটাকে… এতটাও সহজ বোধহয় না আমাদের ফরসা-প্রীতির গোড়ার কথাটা। আপনারা সাহায্য করতে পারেন কি?

 

 

 

 

টুকরো কথা
  • 3.00 / 5 5
1 vote, 3.00 avg. rating (71% score)

Comments

comments