জাপানে যে ভাবে সমুদ্রের মধ্যেই কিছু সুবিধাজনক স্থানে ভাসমান ঘেরাটোপ তৈরি করে এবং তার ভিতরে কৃত্রিম স্রোত চারিয়ে শক্তিশালী এবং শক্তপোক্ত ব্লু ফিন টুনার চাষ করা হয়, ঠিক তেমন ভাবে না হলেও ওর কাছাকাছি একরকম কনসেপ্ট কে কাজে লাগিয়ে, খানিক স্কেল ডাউন করে পশ্চিমবঙ্গেও অচিরেই কোবিয়া মাছের চাষ করা হবে শুনছিলাম। এখন ঘটনাটা হল জাপানে উক্ত পদ্ধতিতে ব্লু ফিন টুনা মাছ চাষের কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে । প্রথমতঃ এই যে খাঁচার ভিতরে অথচ সমুদ্রের নোনাজলে পালিত পপুলেশনটি , এটি শুধুই "বাড়ির পোষা মুরগী" নয় ! এতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর পূর্ব নির্ধারিত মাত্রায় সীমিত সংখ্যক ওয়াইল্ড স্টক যোগ করা হতে থাকে। নিদেনপক্ষে ডিম নিষিক্ত করার জন্যে শক্তিশালী মেল স্পারম বা কখনো স্ত্রী মাছের ডিম স্ট্রিপ অফ করে সংগ্রহে নিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিটি ব্যাচকে আলাদা ভাবে ট্যাগ করা হয় । নির্দিষ্ট আকার আয়তনে পৌছলে যখন বেশ কিছু মাছকে মেরে তুলে নেওয়া হয় বাণিজ্যিক প্রয়োজনে, তখন খেয়াল রাখা হয় যাতে করে পরের ব্যাচটি সাপ্লাই লাইন হিসেবে পিছনে তৈরি থাকে। নির্দিষ্ট সময় পরে আবারো একই রকম ভাবে মাছ মেরে ফেলা এবং পপুলেশন অগ্মেন্ট করবার কাজ চলতে থাকে। বুনো মাছের থেকে সংগৃহীত ডিম এবং স্পারম বিজ্ঞানসম্মত ভাবে অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয় । কেজ ব্রেড জেনারেশনের মধ্যেও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মাছ গুলির জেনেটিক মেটেরিয়ালকেও যথাসম্ভব ধরে রাখবার চেষ্টা করা হয় । সবটাই শেলফ লাইফের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখেই । উদ্দেশ্য মূলতঃ দুটি – (১) খাবারের পাতের বিভিন্ন মুখরোচক পদের ( সুশি ইত্যাদি এবং পুরু ফিশ স্টেক / কেক রূপে) জন্যে বন্য ব্লু ফিন টুনার ওপরে হান্টিং প্রেশার ( জংলী মাছ ধরার ক্ষেত্রে "হারভেস্টিং" বলা হয় না) কমানো ।
(২) পালিত ব্লু ফিন টুনার জিন কোয়ালিটি যথেষ্ট উঁচু তারে বেঁধে রাখা, যাতে কখনো বন্য ব্লু ফিন টুনার সংখ্যা আশঙ্কাজনক ভাবে কমে গেলে ব্রিডিং স্টক রিলিজ করে পরিস্থিতির আপদকালীন সামাল দেওয়া যায় ।

কোবিয়া পশ্চিমবঙ্গের আশেপাশে প্রাকৃতিক ভাবে কোথাও হয়না। এখানকার বাস্তুতন্ত্রের পক্ষেও খুব একটা মানানসই নয়। শুধুমাত্র অল্পদিনে গায়ে গতরে বেড়ে বেঢপ চেহারার হবে এবং ফিশারি ডিপার্টমেন্টকে লক্ষ্মীলাভের পথ দেখাবে এই আশাতেই মাছটিকে চাষের অভিলাষে নিয়ে আসা এবং উপরোক্ত পদ্ধতিতে চাষের চিন্তাভাবনা। ভাবনাটি অভিনব সন্দেহ নেই , কিন্তু কোনও বৃহত্তর মোটিভেশন ছাড়া এবং যথেষ্ট পড়াশুনা এবং তাত্ত্বিক -ব্যবহারিক সমন্বয় ছাড়া এই ব্যয়বহুল প্রকল্প শুরু করলে শুধু ব্যয়টাই ব্যাল্যান্স শিটে জ্বলজ্বল করবে এমন সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না । উপরন্তু বাঙালী জিভে বিদেশি কোবিয়া কতখানি ছাপ ফেলে যাবে সে নিয়েও সামান্য প্রশ্ন আছে, যদিও সেটা খুব বড় সমস্যা হবে না। বহিরাগত তেলাপিয়া এখানে এসে সুপারহিট হয়েছে, ভিয়েতনামের কইমাছ ব্লক বাস্টার না হলেও হাততালি পেয়েছে বিভিন্ন জনপদে , সাবেকী পদে । মাছ পেলে বাঙালি খেয়ে নেবে ঠিকই , কিন্তু ওই যে ! তৃপ্তিতে সামান্য ঘাটতি হলেই  নির্দ্বিধায় দুয়োরানী করে রেখে দিতে পারে । সেক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় আয়োজন অকারণে দামোদর শেঠ এর ভোজের আয়োজনের সমতুল্য হবে বলেই মনে হয়।

টুনার ধাঁচে কোবিয়া মাছ চাষ সম্পর্কে দু’কথা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments