ভাগ্যিস অঞ্জন দত্তের প্ররোচনা সত্তেও শংকোরের সঙ্গে বুনিপের ক্যালাকেলি দেখতে না গিয়ে ধুম ৩ দেখতে গেসলুম। সেই বোল রাধা বোলের পর এরকম কমপ্লিট ফিল্ম বহুদিন পর দেখলাম। বাবা-ছেলে, বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড, ভাই-ভাই, চোর-পুলিশ, পুলিশ-পুলিশ, বন্ধু-দোস্ত (যা কিনা ইটা বাই বিটার হোল স্কোয়ারও বলা চলে)… এরকম বিভিন্ন সম্পর্কের টানাপোড়েন গোটা ফিল্ম জুড়ে। সেই সঙ্গে বিশ্বমানের সব টুইস্ট যা আব্বাস মস্তানের অমর কীর্তিগুলোকে মনে করায়। আর সেইরকমের টেকনোলজি! বলতে বলতে প্লেয়ার্স সিনেমাটার কথা মনে পড়ে চোখে জল চলে এল। ওখানেও অভিষেক বচ্চন, এখানেও তাই। ওখানেও টুইস্ট, টেকনোলজি, এখানেও তাই… যাক গে, প্রসঙ্গান্তরে না গিয়ে শুধু এটুকু বলি প্লেয়ার্স ফিল্মটা না দেখে থাকলে দেখে নেবেন বন্ধুরা।

ফিরে আসি ধুম তিনে। ছবিটি সার্থকনামা, কারণ গোটা ফিল্ম জুড়েই শুধু ধুমধাড়াক্কা। শুরুতেই আমরা দেখি গোঁওওওও শব্দ তুলে বাইকে করে আমির খানের পলায়ন এবং শিকাগো পুলিশের পশ্চাদ্ধাবন। সে কি বাইক রে ভাই! জলে স্থলে আকাশে সর্বত্র তার সমান বিচরণ। এমনকি সাবমেরিনের মত জলের তলাতেও চলতে পারে সে বাইক। এহ্যানো বাইকিং দেখে কি সিটি না দিয়ে থাকা যায়, আপনিই বলুন? তা এই সিটি তে যখন সিটি সেন্টার আইনক্স সরগরম, তখনই জাম্প কাট করে ডিরেক্টর চলে যান শিকাগো থেকে মুম্বাই। সেখানে আমরা দেখি সেই চিরপরিচিত দাঁত-ক্যালা উদয় চোপড়াকে। দুষ্কৃতিদের ঠাণ্ডা করতে তিনি হিমশিম খেলে উড়ন্ত পক্ষীরাজ অটোয় চেপে রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব হয় ছোটা বচ্চনের! সে এক অটো বটে। রাস্তা থেকে শুরু করে বাড়ির ছাদ এবং সর্বোপরি আকাশপথেও সমান দক্ষতায় চলতে পারে এই কনভার্টিবল অটো। যা হোক, সেই অটোর সাহায্যে বদমায়েসদের উদুম কেলিয়ে নিজেদের দক্ষ পুলিশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা এবং ফলস্বরূপ শিকাগো থেকে চোর ধরতে ডাক পড়ে তাঁদের।

চোর যে স্বয়ং আমির খান সেটা বলে দিলে আশা করি স্পয়লার দেবার অভিযোগ করবেন না কেউ। ভদ্রলোক শুধু চোর নন, তিনি একাধারে ম্যাজিশিয়ান, সার্কাস খেলুড়ে, ইঞ্জিনিয়ার এবং অসাধারণ বুদ্ধিমান একজন মানুষ। দুর্ভাগ্যবশত বাল্যের এক ট্র্যাজেডির পর থেকে তাঁর মুখটি চির জন্মের মত বেঁকে গেছিল। শুনেছি শুটিং চলাকালীন টানা কয়েক মাস ধরে মুখটি এরকম বাঁকিয়ে রাখার অনুশীলন করেছিলেন আমির সাহেব। কি অধ্যবসায়, ভাবতে পারেন?!!

মুখ বাঁকা হলেও চুরি টুরি বিশেষ বাঁকা পথে করেননা তিনি। যদিও এক্স্যাক্টলি কি পথে করেন সেটা শেষপর্যন্ত রহস্যই থেকে গেল, তবে যাই করেন বুক চিতিয়েই করেন তাতে সন্দেহ নেই। চুরির টাকা পুষ্পবৃষ্টির মত বহুতলের ছাত থেকে ফেলতে ফেলতে তিনি মাকড়-ম্যানের স্টাইলে নেমে আসেন দেওয়াল বেয়ে। ওহ বলতে ভুলে গেছি, আমির খানের আরেকটি গুণ হল স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান, ব্যাটম্যান ইত্যাদি সমস্ত সুপারহিরোর গুণাবলী তাঁর এক দেহে লীন হয়েছে। উপরন্তু তাঁর ম্যাজিকের প্রধান বৈশিষ্ট হুডিনির মতই পলায়নপটুতা, যদিও এঁর এস্কেপ অ্যাক্ট দেখলে হুডিনি লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতেন। ফলস্বরূপ লালমুখো শিকাগো পুলিশ কেবল পশ্চাদ্ধাবনই করে, আর ধড়াদ্ধড় নিজেদের মধ্যেই ধাক্কাধাক্কি করে মরে।

ইতিমধ্যে আবির্ভাব হয় ছোটো জামাকাপড় পরিহিত ক্যাট্রিনা কাইফের। একটু ভুল বল্লুম, এসছিলেন তিনি ঢাকাঢুকি করেই, কিন্তু নিজেই আমির খান কে দিয়ে দুঃশাসনের স্টাইলে বস্ত্রহরণ করালেন। দুর্ভাগ্য (বা সৌভাগ্য) বশত এখানে কেষ্ট ঠাকুর ছিলেন না, তাই অচিরেই হলের জনতাকে খুশি করে দিয়ে ক্যাটরিনা আধ-ল্যাংটো হলেন। তারপর ধুন্ধুমার নাচ। ঝলক দিখলা জা টাইপের নাচের অনুষ্ঠান দেখে সেখানে নাচের বদলে সার্কাস বেশি হয় বলে মনে হয়েছিল আমার। আমির খানের গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস তারই প্রতিশোধ নিতে বোধহয় সার্কাসের শোতে সারাক্ষণ বলিউডি নাচ দেখায়। অসম্ভব রদ্দিমার্কা কিছু গানের সঙ্গে সেই নাচ দেখে সার্কাস দেখতে আসা শিকাগোর জনতা স্ট্যান্ডিং ওভেশন দেন। আমারও ইচ্ছে করছিল উঠে দাঁড়িয়ে সিটি বাজাই, কিন্তু আইনক্সের লোকজন আবার ভদ্দরলোক বলে কথা। তাঁরা তো আর রিকশাওলা না যে সলমন খানের ফিলিম দেখেন, তাঁরা আমির-ভক্ত, সেমি-ইন্টেলেকচুয়াল মানুষ। তাই ওরম অভদ্রতা করা উচিত হবেনা মনে হল।

ততক্ষণে অভিষেক আর উদয় পুরোদমে তদন্ত শুরু করে দিয়েছেন। সঙ্গে সেক্সি বাইকে চেপে সেক্সি মহিলা পুলিশ। কাজের জোশই গেছে তিনগুণ বেড়ে। অভিষেক ১মিনিট অন্তর অন্তর সানগ্লাস খুলছেন, পরছেন কিংবা অ্যাডজাস্ট করে নিচ্ছেন একটু। উদয় চোপড়া তো চির-ক্যালানে, এই ছবি অভিষেকও তাঁকে ভালই টেক্কা দিয়েছেন। বরং উদয় বেশ কিছু সময়োচিত ইন্সপিরেশনাল স্পীচ দিয়ে অভিষেকের "টুটা হুয়া হওসলা" পুনরুদ্ধার করেছেন। কিন্তু চিকাগোর রাস্তায় অটো চালাতে না দেবার ফলে বারবার আমিরকে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছেন অভিষেক। এইরকম আরও কিছু জগঝম্পের পর শেষ হয় ছবির প্রথমার্ধ…

অতঃপর কিঞ্চিত দেড়শো টাকা দামের পপকর্ন, ভিকো টার্মারিকের অ্যাড এবং পরবর্তী হাফের জন্যে হাপিত্যেশ করে মিনিট ১৫ বসে থাকা।

আপনি বোধহয় ভাবছেন এত বকর বকর করে এতক্ষণে হাফ-টাইম অব্দি এল? চাপ নেবেন না, ফিলিম হাফ টাইমে এলেও আমার লেখা শেষপ্রান্তে। কারণ এরপর কিছু বলতে গেলেই স্পয়লার দেওয়া হয়ে যাবে। এরপর থেকে পুরো ফিল্ম জুড়ে কেবলই টুইস্ট আর টুইস্ট। অঙ্কের ভাষায় বলতে গেলে এরপরের অংশটি টুইস্ট দ্বারা "ডেন্স"। আমি ভদ্দরলোকের ছেলে, অপরের ফিল্ম দেখার আনন্দ মাটি করবনা। তাই স্পয়লার না দিয়ে আর দুয়েকটি কতা বলেই ইতি টানব।

দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে ইমোশনাল ব্যাপার স্যাপার দেখে মস্তির সূচক একটু নেমে এলেও আমির খানের জন্য ওই অংশটা দারুণ। প্রথমার্ধে তাঁর অ্যাপিয়ারেন্স সত্যি কথা বলতে খুব কম ছিল, পুরোটাই তো স্টান্টম্যানের খেলা। দ্বিতীয়ার্ধে তিনি পেলেন জমিয়ে ওভার-অ্যাক্টিং করার সুযোগ। ফাটিয়ে দিয়েছেন! বলিরেখাঙ্কিত মুখের প্রতিটি রেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন ওভার অ্যাক্টিং। শাহ রুখ আর সলমনকে টেক্কা দেবার জন্যেই নাকি তাঁর এই ফিল্ম করা। বক্স অফিসে সলমন কে আর ওভার অ্যাক্টিং এ শাহ রুখকে ভালই টেক্কা দিয়েছেন বটে।

মাঝে মাঝে ফিসিক্সের ল ট গুলোর প্রতি একটু সন্দেহ জাগছিল বটে, তবে শেষকালে যখন ভরবেগের সংরক্ষণ সূত্র মেনে বাইককে রকেটে পরিণত করা হল, তাই দেখে প্রাণ ভরে গেল। এরকম সায়েন্টিফিকালি সাউন্ড অ্যাকশন ফিল্ম বানানোর উদ্যোগকে সেলাম!

সবই ভাল চলছিল। চোখের জল আর আগুনে দৃষ্টি – দুইয়ের কম্বিনেশনে যখন সব জমে ক্ষীর, তখনই… ওই… নারী যে নরকের দ্বার সেটা আবারও প্রমাণ হয়ে গেল। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার জন্য ধুম ৩ কে ধন্যবাদ। আরও ধন্যবাদ টেকনোলজির অসাধারণ অগ্রগতি দেখাবার জন্যে, বাচ্চাদের ভরবেগের সংরক্ষণ শেখাবার জন্যে, আমিরের এক্স-প্যাক (এক্স > ৮) পেট এবং ক্যাটরিনার তেল চুকচুকে থাই দেখার সুযোগ করে দেবার জন্যে এবং মার্কিন পুলিশের অপদার্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার জন্যে। সারা দেশ যখন দেভইয়ানী কাণ্ড নিয়ে তোলপাড়, তখন এই ছবি দেখিয়ে দিল মার্কিন পুলিশের দৌড় ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দে সাইরেন বাজিয়ে চোর কে তাড়া করা অবধি, এমনকি অপরাধীকে হাতের নাগালে পেয়েও গুলি টুলি চালাতে ভুলে যায় তারা। বাস্তবে যতই আমেরিকা ভারতকে সাম্প্রতিক ইশ্যুতে বেপাত্তা করুক না কেন, আমির সাহেবের হাতে পর্যুদস্ত হয়ে তারা তাদের আসল স্বরূপ দেখিয়ে দিল। এই ছবি আসলে মার্কিন পুলিশি ব্যবস্থার প্রতি এক সজোরে থাপ্পড়। এহ্যানো অসাধারণ রাজনৈতিক মেসেজ দিয়ে যখন শেষ হয় ধুম ৩, তার কয়েক ঘন্টা পরও ঘোর কাটতে চায় না…

হল থেকে বেরোনোর পর এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল – "কেমন লাগল ধুম ৩"?
বললুম – "টোটাআআআল !!!"

 

 

টোটাআআআল !!!
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments