ট্রাম্প নির্বাচনোত্তর অ্যামেরিকা – কিছু কল্পকথা – কিছু বাস্তব
****************************************************************
But there is trouble in store for anyone who surrenders to the temptation of mistaking an elegant hypothesis for a certainty. —Primo Levi

লেখাটা একটু বড় হয়ে গেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম ফাঁকিবাজী দিয়ে অল্পেতেই সেরে দেবো কিন্তু লিখতে গিয়ে বুঝলাম কথার পরে কথা এসে যাচ্ছে, সেগুলো এড়ানো যাচ্ছে না। যাঁরা পড়বেন তাঁদের আগে থেকেই বলে দেওয়া হচ্ছে এটা রম্যরচনা, সাহিত্য, অণূগল্প, রাজনৈতিক বা দার্শনিক আলোচনা কিছুই নয় – নেহাতই নিজের সাধারণ জীবনের সীমিতঅভিজ্ঞতাসঞ্জাত আত্মকথন ধরা আছে কয়েকটি অনুচ্ছেদে – কাজেই হতাশ হলে আমাকে দোষ দেবেন না।

ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হবার পর প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক কল্পকথার জন্ম হয়েছে – চাকরী হারানোর শংকা, ভিসা সমস্যা, এথনিক হেট ক্রাইম; তালিকাটি দীর্ঘ। এখানে ভারতীয়দের ওপর আক্রমণ বেড়ে গেছে কিনা, ভারতীয় কর্মীরা ভিসা পাবেন কি নাকি দেশ ছাড়তে হবে ইত্যাদি নিয়েও প্রচুর মানুষ আশংকায় ভুগতে শুরু করেছেন। ঘটনা হচ্ছে ভারতীয়দের ওপর আক্রমণ হঠাৎ করে শুরু হয়েছে এমন নয়। এরকম দুয়েকটা ঘটনা সবসময়ই ঘটে চলেছে। বেশ কয়েকবছর আগের কথা – নর্থ ক্যারোলাইনায় এক ভারতীয় ছাত্রকে বাড়িতে ঢুকে হত্যা করে দুষ্কৃতিরা; সে ঘটনার বিচার এখনো হয়নি। নিউজার্সীতে রাতে পার্কে হাঁটতে বেরোনো এক ইঞ্জিনীয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে তিনজন কিশোর – সেটাও খবরে বেরিয়ে ছিল। গতবছর লুইসিয়ানায় এক বৃদ্ধকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সাইড ওয়াকে হাঁটতে দেখে পড়শিরা পুলিশে খবর দেয় , দুজন অফিসার এসে ভদ্রলোককে প্রিসিংক্টে তুলে নিয়ে যায়। গ্রেপ্তারের সময় ঘাড় আর শিরদাঁড়ায় মারাত্বক আঘাত পান ভদ্রলোক। এই ঘটনাগুলো কিন্ত ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হবার অনেক আগেই হয়েছে, হঠাৎ বেড়ে গেছে এমন নয়। খেয়াল করে দেখবেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারতীয়দের “ভারতীয়” বলে মারা হয়নি – এঁরা মিসটেকেন আইডেন্টিটির শিকার, যে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী নিওনাজীরা এই অপকর্মটি করেছে তারা ভেবেছে ভিক্টিমরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে! এই একই ঘটনা ৯/১১ এর পরেও হয়েছিল। কেয়ার ( কাউন্সিল অন অ্যামেরিকান-ইস্লামিক রিলেশান্স) এখানে হেটক্রাইমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে খুবই সক্রিয় , আশা করা যায় ক্যানসাসে যে দুইজন ভারতীয় ইঞ্জিনীয়ারকে গুলি করা হয়েছে তাঁদের পরিবারকে কেয়ার সমবেদনা জানাবে। যদিও এখনো পর্যন্ত তাঁরা কোন স্টেটমেন্ট দিয়েছেন বলে জানা নেই। তথ্য বলছে মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্রে একজন কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান–অ্যামেরিকানের হেট ক্রাইমের শিকার হবার সম্ভাবনা একজন ভারতীয়র থেকে বেশ কয়েকগুণ বেশী – গত বছর শুধু শিকাগোতেই প্রায় চারশোরও বেশী আফ্রিকান-অ্যামেরিকান মারা গেছেন! একজন ভারতীয় হিসেবে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন নেহাত দৈবদোষে না হলে আপনার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা খুবই কম।

এরকম আরেকটা সমস্যার জায়গা ইমিগ্রেশান। সমস্যাটার শুরু আইনি বনাম বেআইনি অভিবাসননীতির সংস্কার নিয়ে। হিস্প্যানিকদের নিজস্ব সংগঠন “লা-রেজা” রয়েছে যারা বেআইনি অভিবাসীদের জন্য ভীষণভাবে সক্রিয়। একাধিকবার মার্কিন কংগ্রেসে বৈধ অভিবাসীদের জন্য আনা সংশোধনী প্রস্তাব কংগ্রেসে হাইজ্যাক হয়ে গিয়েছে কারণ এদের দাবী বৈধ অভিবাসীদের সাথে সাথে সমস্ত অবৈধ অভিবাসীদেরও নাগরিকত্ব পাওয়া সুনিশ্চিত করতে হবে নইলে কোন প্রস্তাব সমর্থন করা হবে না। ভারতীয়দের ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক দরকষাকষির জায়গাটাই অনুপস্থিত ফলে ভারতীয়দের অভিবাসনঘটিত সমস্যা বা জাতিবিদ্বেষজনিত মৃত্যুর ট্র্যাজেডি জাস্ট সাউন্ড বাইট হিসেবেই থেকে যায়; সেটা নিয়ে কোন রাজনীতি হয়না । ট্রেভন মার্টিন, ফ্রেডি গ্রে যে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন সেজায়গাটা ভারতীয়দের জন্য তৈরি করা যায়নি। আর একটা প্রশ্ন: এতকিছুর পরেও কতজন ভারতীয় ফিরে যাবেন / যাচ্ছেন / গেছেন? প্রত্যকেরই হয়ত নিজস্ব কারণ রয়েছে কিন্তু তারমধ্যে লেক্সাস, বিএমডাব্লু, ইনফিনিটি, অ্যাকুরা, ৩৭০০ স্কোয়ার ফিট এই হিসেবগুলোও অজান্তেই ঢুকে পড়েছে। এটাও জীবন। অভিবাসনসংক্রান্ত আরেকটি সমস্যার জায়গা হচ্ছে আউটসোর্সিং এবং এইচওয়ানবি। ভারতের সংগঠিত এবং অসংগঠিত কর্মীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ আইটি সার্ভিস সেক্টারে কর্মরত – এঁদের মধ্যে এক ন্যূনতম শতাংশ এইচওয়ানবি গোত্রে পড়েন। এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশটির ভবিষ্যতে ভিসার সুবিধে থেকে বঞ্চিত হবার সম্ভাবনা তৈরী হলে যদি ভারতের অর্থনীতি সমস্যায় পড়ে তাহলে স্বীকার করেই নিতে হবে ভারতীয় অর্থনীতির গোড়ায় গলদ ছিল! সুব্বুস্বামী যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলে এত হাঁকডাক করেছিল সেটাও যে ফাঁকা আওয়াজ এটা প্রমাণিত হয়ে গেল । আউটসোর্সিং-এর ভবিষ্যত সবসময় খরিদ্দার আর পাড়ার পানের দোকানীর মতো; এখানে ক্রেতার(ক্লায়েন্টের) মর্জিই সব, যেখানে সস্তায় পাবে সেখানেই পাড়ি জমাবে – ফিলিপাইন্স, তাইওয়ান, কেনিয়া, চিন, ভিয়েননাম; সস্তার শ্রমিকের তো অভাব নেই। এটা একবিংশ শতাব্দীর পুঁজিবাদের সমস্যা, ট্রাম্প নিমিত্ত মাত্র। বরং এটা একদিক থেকে মন্দের ভালো – এতে পরনির্ভরশীলতা কমবে, ভারতের নিজস্ব আভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা সেক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। ভিসার ক্ষেত্রেও হরির লুটের মতো ভিসা দেওয়া বন্ধ করে মেরিট বেসড ভিসা (পয়েন্টভিত্তিক) যত তাড়াতাড়ি চালু করা যায় ততই মঙ্গল – অভিবাসনের মূল লক্ষ্য যদি হয় নিজের দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন, এরফলে সেটা নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে সুখবর। যেসমস্ত ভারতীয় যথার্থই মেধাবী এবং পরিশ্রমী তাঁদের এতে অসুবিধে হবার কথা নয়। তবে রাজনীতির গতি অতীব জটিল। হয়ত এটাও আরেকটা পাশা খেলার দান।

অ্যামেরিকার হেটক্রাইম বা ডিস্ক্রিমিনেশান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের কিছু নেই – পৃথিবীর এমন কোন দেশ নেই যেখানে এই সমস্যা নেই। ভারতে দিল্লীতে “চিংকি”-দের কি চোখে দেখা হয় সেটা ভাবুন; অরুণাচল বা মিজোরামে আপনি বিহার থেকে এসেছেন বললে কিরকম ব্যবহার পেতে পারেন? এমনকি খোদ পশ্চিমবঙ্গে মফঃস্বল থেকে কলকাতার কোন একটি কলেজে পড়তে আসা এক ছাত্রীর সাথে কিরকম ব্যবহার করা হয়েছিল সেটাও মনে করুন , মেয়েটি সম্ভবত আত্মহত্যা করে। এখুনি ফুটবল ম্যাচ শুরু হলে রেসিজমের হাতেগরম প্রমাণ পেয়ে যাবেন। কাজেই “কালচারাল-লিঙ্গুইস্টিক বা এথনিক রেসিজম” সেটা কি এবং কেন প্রায় সবাই জানেন এবং আমাদের প্রত্যেকের সে অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর সাথেই আসবে – বর্ণবাদ, ধর্মনির্বিষেশে যার শিকার হাজার হাজার ভারতীয়। অ্যামেরিকার রেসিজম এরথেকে বেশী কিছু নয় বরং অনেক কিছুটা কমই। এ প্রসঙ্গে দুটো ঘটনা বলে শেষ করব। কয়েকদিন আগে একটি থ্রেড চোখে পড়েছিল – একজন রাজনৈতিক দলের সমর্থক এবং আরেকজনের মধ্যে বাদানুবাদের অংশবিশেষ। রাজনৈতিকদলটির সমর্থক একটি জায়গায় বলছেন (প্যারাফ্রেজিং) “বাংলায় ভূমি সংস্কার না করলে এইসব নিচু জাতের (বিবাদী পক্ষ) লোকেদের মানুষ্যপদবাচ্য বলে ধরা হত না – এমনকি এদের সাথে একসময় বিয়ে দেওয়াও নিষিদ্ধ ছিল – এখন এদের মুখে খই ফুটেছে”! স্বভাবতই সোশ্যাল মিডিয়া এই মন্তব্যটিকে টার্গেট করে। কিন্তু আপাতভাবে শুনতে আপত্তিকর মনে হলেও এই কথাগুলি বলবার জন্য যে সৎসাহস লাগে যেটা অনেকেরই নেই কারণ জাস্ট এটাই আমাদের সমাজ, চোখ বুজে নিলেই সেটা মিথ্যে হয়ে মিলিয়ে যাবে না। আজথেকে শ-দুশো বছর আগে নয় এখানেই ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগেও এটাকে নির্জলা “স্বাভাবিক” , “স্বতঃসিদ্ধ” এবং “সামাজিক” বলেই ধরা হত। এরকম সত্যবাচনের জন্য উনার ধন্যবাদ প্রাপ্য। আবার গতকাল একজন পরিচিতার সাথে কথা হচ্ছিল – বাবা ইরানিয়ান, মা নিকারাগুয়ান; বেড়ে ওঠা জর্জিয়ায়, ডেট করছিল এক কানাডিয়ানকে, শিন্টোইজম নিয়ে গবেষণা করছে (ক্যানাডিয়ান ডেটের সাথে ফিলসফি গবেষণার কিছু সম্পর্ক আছে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করিনি)। অদ্ভুত সমস্ত জীবনের অভিজ্ঞতা। সাউথেই একসময় ইন্টার-রেসিয়াল ডেটিং একরকম নিষিদ্ধ ছিল – এধরনের কাপলকে সেখানে পাব্লিক লিঞ্চিং করা হতো। সেই সমাজটাই পালটে গেছে। সেটা সম্ভব হয়েছে কারণ কাউকে না কাউকে এই পরিবর্তনটা ঘটাতে হয়েছে। সেটা করতে সাহস লাগে। সত্যিটাকে স্বীকার করা পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।

তারমানে কি রেসিজম নেই? আছে। কিন্তু মূলস্রোতের বাইরে থাকা এইধরনের ফ্রিঞ্জ এলিমেন্টসকে আটকানো আর ভারতে পণের দাবী পুরোপুরি বন্ধ করা একই গোত্রে পড়বে। অ্যামেরিকা প্রায় পুরোটাই অভিবাসীদের দেশ; আইরিশ-জার্মান-ইহুদী-ইটালিয়ান প্রত্যেকটি জনগোষ্ঠীকে এধরনের হেজিং, স্টিরিওটাইপিং-এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। রেসিজম আর ডাইভার্সিটি অদ্ভুতভাবে এখানে পরস্পরের পরিপূরক হয়ে গেছে। বিয়ার কোম্পানি বাড-ওয়াইজার দূর্দান্ত একটা অ্যাড বানিয়েছে এই কালেক্টিভ ইমিগ্রেশান এক্সপিরিয়েন্স নিয়ে সেটা নিচের লিঙ্কে দেখতে পারেন (https://www.youtube.com/watch?v=HtBZvl7dIu4 )। অ্যামেরিকার ডিএনএ কোন একজন প্রেসিডেন্টের পক্ষে পাল্টানো অসম্ভব – কেউ সেটা চাইছেও না। কাজেই এখানে ভারতীয় বলে দুমদাম গুলি করে দিচ্ছে ব্যাপারটা এরকম নয়। যারা এইসব করেছে তারা অন্ততঃ কোন এন্ডোর্সমেন্ট পাচ্ছে না। প্রায় দেড় বছর আগের মনে হয়েছিল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া অসম্ভব নয়। সেটাই সত্যি প্রমাণিত হল। জিংগোইজম বা জেনোফোবিয়া নয় মূলতঃ আর্থ-সামাজিক অনিশ্চয়তাই সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে – ২০২৪ সালের ডেমোক্র্যাটিক নমিনি হচ্ছেন তুলসী গ্যাবার্ড। দ্বিতীয় প্রজন্মের আধা-ভারতীয় আধা-মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসউম্যান ফ্রম হাওয়াই। শেষ হাসিটি হাসছেন বার্নি স্যান্ডার্স – যাঁকে সুকৌশলে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে হিলারীর আসার রাস্তা করে দিয়েছিলেন তাঁদের হাতে পড়ে আধ-ভাঙ্গা পেন্সিল। যে হাওয়া বইতে শুরু করেছে তাতে এটাই হবে পেনাল্টিমেট পয়েন্ট অফ পপুলিস্ট মুভমেন্ট এগেইনস্ট দ্য এস্টাব্লিশমেন্ট – জয়তু বার্নি!

ট্রাম্প নির্বাচনোত্তর অ্যামেরিকা – কিছু কল্পকথা – কিছু বাস্তব
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments