আগের পর্ব প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্ব

 

(তৃতীয় পর্ব)

“অ্যাই ছেলে, শোন এদিকে !”

প্রসন্নবাবু স্কুল থেকে বেড়িয়ে ছাতাটা খুলতে যাবেন, এমন সময়ে পরিচিত গলার ডাকটা শুনতে পেলেন।

ভবা পাগলা !

ডাকটা অবশ্য তাঁর উদ্দেশ্যে নয়। তিনি নিবারন চন্দ্র সরকার বিদ্যালয়ে প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল শিক্ষকতা করছেন। পাড়ার লোকজন তাঁকে বেশ সম্মানের চোখেই দেখে।

ভবা স্কুলের গেটের বাইরে দাড়িয়ে ছিল। অন্য দিনের তুলনায় আজকে কিন্তু ভবাকে একটু হলেও পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন লাগছিল।

প্রসন্নবাবু দেখছিলেন, ডাক শুনে ক্লাস এইটের দুটো ছেলে ভবার দিকে এগিয়ে গেলো। পাড়ারই ছেলে, ভবাকে ভাল-মতন চেনে, দেখে মনে হোল বেশ মজা পেয়েছে।

কাছে যেতেই ভবা দুজনকে নিরীক্ষণ করে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলো, “ফাউনটেন পেন-এ লিখিস?”

ছেলেগুলো একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো, এরকম প্রশ্ন আশা করেনি। তাছাড়া ফাউনটেন পেন ব্যাপারটাই তো ওরা খুব কম চোখে দেখেছে। সেই কোন কালে ক্লাস ফাইভে বোধয় বাবা একটা কিনে দিয়েছিলো, হাতের লেখা ভালো হবে বলে। তারপর কবেই সেটার সঙ্গে সম্পর্ক চুকে-বুকে গেছে।

ছেলেগুলো ইতস্তত করছে দেখে ভবা হুংকার দিয়ে বলে উঠলো, “তারাপদদার দোকানে গিয়ে চকচকে প্যাকেটের জিনিসটা কিনিস না?”

ছেলেগুলো অবাক হয়ে চেয়ে আছে দেখে বলল, “হাতের লেখা ভালো না হলে মাস্টারমশাই পড়বেন কেন কষ্ট করে?”

শুনে প্রসন্নবাবুর হাসি পেয়ে গেলো। ভবার মুখে এরকম গুরুগম্ভীর কথা ! অবশ্য তাঁর মাঝে-মাঝে মনে হয়, ভবাকে দেখে যতটা পাগল লাগে, আসলে ভবা অতটা পাগল নয়।

ভবা আবার জিজ্ঞাসা করলো, “বল তো দেখি, এই যে এখন গরমকাল চলছে, এরপরে বৃষ্টি হবে, তারপর মা দুগগা আসবেন, তারপর ঠাণ্ডায় হি হি করে কাঁপবি…এরকম হয় কেন?”

একটু ভেবে একটা ছেলে বলল, “মানে ঋতু-পরিবর্তন হয় কেন সেটা বলছেন?”

“হু ?” ভবা বেশ মজা পেয়েছে মনে হোল।

একটু ভেবে ছেলেটা জবাব দিল, “পৃথিবী সূর্যের চারিপাশে ঘোরে তো, কাছে থাকলে গরমকাল, আর দূরে চলে গেলে শীতকাল…”

“দূর বোকা ! এখানে গরমকালের সময়ই তো সূর্যের সবচেয়ে দূরে থাকে পৃথিবী…” ভবা হেসে উঠলো, “ঋতু পরিবর্তন আসলে হয় পৃথিবী একটু হেলে আছে বলে…এই দ্যাখ এরকম…” বলে ভবা পাশের ফল-অলার ঝুড়ি থেকে একটা আপেল হাতে নিয়ে নিল।

আপেল-ওয়ালা ছোকরা হাঁ হাঁ করতে গিয়েও থেমে গেলো। বোধয় ভবার কথা মন দিয়ে শুনছিল।

ভবা আপেলটা ডান হাতে নিয়ে অদ্ভুত কায়দায় বলল, “এই দ্যাখ, এই আপেলটা ধর পৃথিবী, আর ওই আলোটা সুয্যিমামা, এই দেখ, আপেলটা ২৩ ডিগ্রি বেঁকে আছে বলে আলোটা কেমন সোজা-ভাবে পড়ছে দেখ !…” আপেলটার মসৃণ গায়ে তখন পরন্ত বিকেলের রোদ যেন পিছলে যাচ্ছে।

“আলো মানে কি? রোদ? আর রোদ মানে গরম…আর উলটো দিকটা দেখ, কেমন অন্ধকার হয়ে আছে, মানে কি? শীতকাল চলছে…”
এক দমে বলে পরিতৃপ্তির হাসি হাসল ভবা।

ছেলেগুলো কতটা বুঝল, বলা মুস্কিল, ওরা তো এসব নাটুকেপনা দেখেই হেসে ফেলেছে। প্রসন্নবাবু কিন্তু বেশ অবাক হলেন।

“কিস্যু পড়াশোনা করিস না তোরা…আমার বাপ একবার সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্ক পারিনি বলে আম-কাঠের লাঠি করে এমন উত্তম-মধ্যম দিয়েছিল না, এখনও দাগ আছে ! আর তোরা? সব আদরে বাঁদর তৈরি হচ্ছিস…হুহ…” বলে গজ গজ করে ভবা, “কি বলেন মাস্টারমশাই?”

প্রসন্নবাবু শুনে হাসলেন, কিছু বললেন না।

হাঁটা লাগাতে ভবা সঙ্গ নিল। প্রসন্নবাবুর মন্দ লাগছিল না, জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি এতো কিছু জানলে কি করে, ভবা?”

“ছোটবেলায় ইশকুলে পড়েছিলাম, মনে থেকে গেছে…”, আস্তে আস্তে জবাব দিল ভবা।

তারপর একটু থেমে কেমন আনমনা হয়ে বলল, “আসলে কি জানেন, ছোটবেলায় আমার এক মাস্টারমশাই ছিলেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন, কোন জিনিসই প্রমান ছাড়া মেনে নেবে না কখনো। দরকারে সারাজীবন ধরে তার প্রমান খুঁজবে…ছাড়বে না, পেলে সেটাই তোমার শিক্ষা হবে।“

তারপর একটু থেমে বলল, “শিক্ষা কি কখনও ওই দশ-বারো বছরে শেষ হয়, বলুন?”

প্রসন্নবাবু অবাক হয়ে চেয়ে থাকলেন। আধা-শিক্ষিত, টিমটিমে বাতি জ্বলা, সংকীর্ণ, গলি-ঘুঁজির এই বীরসিংহপুরে এরকম একটা মানুষ যে আছে, তাঁর জানা ছিল না।

অনেকদিন পর ভালো শ্রোতা পেলে যা হয়, ভবা উৎসাহের সাথে বলতে লাগলো, “জানেন ছোটবেলায়, আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল – আচ্ছা মোগলদের হটিয়েই যদি ইংরেজরা এসে থাকে এ দেশে, তবে মোগলদের সাথে লাল-মুখোদের একটাও বড় যুদ্ধু হোল না কেন?”

“দারুন প্রশ্ন !” ভাবলেন প্রসন্নবাবু।

ভবা বলে চলে, “যুদ্ধু তো যা করবার করলো মাইসোরের টিপু, আমাদের সিরাজ, অয্যোধ্যার ওয়াজেদ আলি শাহ আর মারাঠাদের পেশওয়া বাজি রাও…মোগলদের সাথে লড়াইটা হোল কোথায় বলুন তো???”

প্রসন্নবাবুর বিষয় বিজ্ঞান হলেও ওনার এই ব্যাপারটা জানা ছিল, মুচকি হেসে বললেন, 
“ইংরেজরা যতদিনে এদেশে গুছিয়ে বসতে শুরু করেছিল, ততদিনে মোগলদের শক্তি অনেকটাই কমে গেছে, প্রকারন্তরে বলা যায় মোগলদের শক্তি কমে গেছিলো বলেই ইংরেজরা সুবিধা করতে পেরেছিল। আসলে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক কৌশলটাই এমন ছিল যে শক্তিশালী রাজ্যের সাথে সরাসরি যুদ্ধ লাগবে না, বরং ধীরে ধীরে তাকে কমজোরি করে তারপর গ্রাস করবে…তাই মোগলদের হটিয়ে ইংরেজরা এসছে, এই কথাটা যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ভুল। ইংরেজদের সঙ্গে সবথেকে বড় যুদ্ধ হয় মারাঠাদের, তারপরের শক্ত গিঁট ছিল টিপু সুলতান…”

এক দমে অনেকটা বলে থামলেন তিনি।

হাঁটতে হাঁটতে তারা প্রসন্নবাবুর ফ্ল্যাটের কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। গতকাল সন্ধ্যায় এক পশলা বৃষ্টি হওয়াতে ছিটমহল আর হারানের চপের দোকানের মাঝখানে বেশ কিছুটা জল জমেছে। কাটিয়ে সাবধানে পার হতে গিয়ে ছিটমহলের ভেতরের কথোপকথন শুনতে পেলেন প্রসন্নবাবু…

“…আরে সে ছেলে এখন দৌড়ে বেড়াচ্ছে !! পারলে ফুটবল নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে !!!” উত্তেজিত গলায় বলছিলেন দোকানের মালিক অসিতবাবু।

রোজ সন্ধ্যায় এই দোকানটায় বুড়োদের একটা আড্ডা বসে, বিক্রি-বাট্টা বেশি না থাকলে যা হয় আর কি…

অসিতবাবুর কথায় নতুনপাড়ার যোগেন খুড়ো বলে উঠলো, “আমি আগেই বলেছিলুম, ওই মেয়ের খ্যামতা আচে… তোমরা সব আজকালকার ছোঁড়া, কিচু মানতে তো চাও না…” বলে এক চুমুকে চায়ের ভাঁড়টাকে ফাঁকা করে দিয়ে গুছিয়ে বসে বলল,

“সাহাগঞ্জের প্রণব মিত্তিরকে চেন? মস্ত বড় উকিল-ব্যারিস্টার, জলপানি নিয়ে বিলেতে পড়তে গেসলো, সেকি আজকের কতা…তো সে প্রণব মিত্তিরের ছিল হাঁপানির রোগ, কত ডাক্তার-বদ্যি করলো, সবাই ফেল মেরে গেলো… শেষে আমাদের এই শ্রীমার কাচে নিয়ে এলুম আমি। একটা তাবিজ দিলে আর দিনে দুটো করে বড়ি, গরম জলে গুলে খেতে। ছ মাস হয়ে গেলো, হাঁপানির বাপ ধারে-কাছে নেই কো !!!”

“বল কি গো !!!” দোকানের বাকি লোকেরা সমস্বরে বলে উঠলো।

প্রসন্নবাবু হাঁটা লাগালেন, এসব আলোচনা তাঁর ভালো লাগেনা। পেছনে দেখলেন ভবা পাগলাও হাঁ করে ওঁদের কথা শুনছে।

ওঁকে দেখতে পেয়ে ভবা অদ্ভুত গম্ভীর গলায় বলল, “আমাদের সমস্যা কি জানেন প্রসন্নবাবু, আমরা সবাই হয় অন্ধ, নয় চোখে ঠুলী পড়ে বসে আছি !!!”
(ক্রমশ)

ঠুলী (তৃতীয় পর্ব)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments