আগের পর্ব প্রথম পর্ব

 

ঘরটা দক্ষিণের হলেও জানলাটা বন্ধ করা। ঘরের মধ্যে হালকা একটা লাল আলো জ্বলছে। জানলায় ভারী কালো পর্দা, সুগন্ধী ধূপের কড়া গন্ধ – সব মিলিয়ে একটা ঝিম-ধরানো পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
"খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি – লোকে বলে বটে, কিন্তু এই লাইনে তো বাজনাটাই আসল", ভাবছিলেন শ্রীময়ী হাজরা। পরনে লাল রঙের পোশাক, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে একটা বড় কালো টিপ। চুলগুলো এলো করে রেখেছেন, চোখে পড়েছেন এক বিশেষ ধরনের Contact Lens, যাতে চোখদুটো আরও জ্বলজ্বল করে। মফঃস্বলের দুর্বল মনের মানুষকে ভেবলে দিতে এইটুকুই যথেষ্ট !
"লোকে ম্যাজিক দেখতে যায়না? সেখানেও তো হাতসাফাই, টুপি থেকে পায়রা বার করা, আর মেয়ে কেটে দু-আধখানা করা। সব যন্ত্রের কারসাজি।
তার চেয়ে এই লাইনটা তো ঢের কঠিন। লোককে শুধুমাত্র নজর করে তার স্বভাব-চরিত্র আঁচ করে নিতে হয়, তারপর এটা -ওটা-সেটা প্রশ্ন করে, প্রয়োজনে ‘স্পাই’ লাগিয়ে ভেতরের খবরের নাগাল পেতে হয়, তারপর ছিপ ফেলে মাছের অপেক্ষায় বসে থাকা – হ্যাপা কি কম নাকি !
তাও লোকজন একে বাঁকা চোখে দেখে ! একটু শিক্ষিত হলে তো কথাই নেই। চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে চলে আসবে – সব বিদ্যেসাগর কিনা !" মনে মনে গজ-গজ করে উঠলেন শ্রীময়ী।
"আরে, মানুষ তো বোকা হতেই চায় রে বাবা ! নাহলে ভগবান তৈরি করল কেন মানুষে ? যে কাজটা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, বুদ্ধি খাটিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে চেষ্টা করেও নামছে না, সেটা কি করে একটা পাথরের মূর্তির সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে নামবে ? 
অথচ বলতে যাও ! খেঁকিয়ে উঠবে ! বোঝাতে যাও, লাঠি-সোটা, খড়গ-ত্রিশূল-চপার যে যা পারবে নিয়ে তেড়ে আসবে !!! তার চেয়ে বাবা যার যা আফিম, তাই-ই ভালো, যার যাতে নেশা হয়…" ভাবছিলেন শ্রীময়ী।
নয় নয় করে তাঁর পসার আজ খারাপ নয়। শুধু হাত দেখাই দেড় হাজার, তার উপর কষ্টি বিচার, তাবিজ-কবচ-মাদুলি, গ্রহের ফের কাটানো, রত্ন ধারণ – সব আলাদা আলাদা রেট !
অথচ মনে পড়ে, বছর তিনেক আগে এর শুরু হয়েছিল একটা আন্দাজে ঢিল মারার ঝুঁকি নিয়ে ।
শ্রীময়ীদের বাড়ির দুটো বাড়ি পরে থাকেন হালদাররা। মিসেস হালদার তখন ওদের মহিলা-মহলের নিয়মিত সদস্য। একদিন গল্পের ছলে হঠাৎ বলে বসলেন, “এই তুমি নাকি হাত দেখতে পারো শুনলাম,আমারটা একটু দেখে দাও না !”
একেবারে যাকে বলে “স্ট্যান্ডার্ড রিকোয়েস্ট”। যারা হাত দেখতে পারে বলে দাবি করে, তাদেরকে হামেশাই শুনতে হয়, যত দিন না তারা বিরক্ত হয়ে না করছে।
শ্রীময়ী দেবী কিন্তু সুযোগটা দুহাতে লুফে নিলেন। কিছুক্ষণ এটা-ওটা-সেটা বলে হঠাৎ করে বললেন,
“তোমার তো ঠিকই আছে দিদি, তোমার মেয়ের একটা পোখরাজ ধারণ করলে ভাল হয়…”
হালদার বাবুর মেয়ে স্বাগতার বিয়ের দেখাশোনা চলছে খবর ছিল শ্রীময়ীর কাছে। কিন্তু রঙ কালো এবং সাধারণ গ্র্যাজুয়েট হওয়ার দরুন কাজটা কঠিন হচ্ছে।
এই ঘটনার পরে বেশ কিছুদিন মিসেস হালদার মুখে কালবৈশাখী মেঘ নিয়ে শ্রীময়ীর সাথে কথা বলেন নি।
শ্রীময়ী কিন্তু আড়ালে মুচকি মুচকি হেসেছেন। ভেবেছেন, “ওষুধ ধরেছে…”। মানুষের মনস্তত্বে ঠিক কোন জায়গাটায় ঘা দিতে হয়, তিনি জানতেন !
হোল-ও তাই । একজন করে পাত্রপক্ষ নাকচ করে দিয়ে যায়, আর এদিকে হালদার বাড়িতে, বিশেষ করে মিসেস হালদারের মনে চাপ বাড়তে থাকে। সাওদাগরি অফিসে চাকরি করা নিজের স্বামীকে তিনি পোখরাজের ব্যাপারটা বলেন নি, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার পরিচয়ক হয়ে যাবে বলে। কিন্তু সেই কুসংস্কার-ই যে তাঁর মনে শেকড় গেঁড়ে ডালপালা বিস্তার করে বসবে, তা কে জানত !!
মাস গেলো না, হালদার গিন্নি শ্রীময়ীর-ই শরণাপন্ন হলেন। শ্রীময়ী অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে বললেন, “হেঁ হেঁ, আমি আর কি করতে পারি বলুন, সবই ওনার ইচ্ছা !” বলে আঙ্গুল তুলে উপর দিকে দেখালেন।
সে যাই হোক, পোখরাজের আংটি ধারণ করার তিন সপ্তাহের মধ্যে স্বাগতার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো, এবং হালদার গিন্নি মুক্ত কণ্ঠে শ্রীময়ীর প্রশংসা করে বেড়াতে লাগলেন। শ্রীময়ীকে আর বেশি কিছু করতে হোল না, শুধু সন্ধেবেলার পুজার তাঁর মন্ত্রোচ্চারণের তীব্রতা বাড়ানো ছাড়া।
ধীরে ধীরে পাশের সদগোপ পাড়ার নিমাই ঘোষের ছেলের চাকরি হয়ে গেলো মন্ত্রপূত তাবিজ ধারণ করে, কানাইপুরের হারাধন সাঁপুইের বিশ বছরের হাঁটুর ব্যাথা সেরে গেলো শ্রীময়ীর দেওয়া চন্নমেত্ত পান করে, আর কত ছেলেমেয়ে যে পরীক্ষায় আর প্রেমে পাশ করে গেলো তার ইয়ত্তা নেই !!!
কেউই কিন্তু খেয়াল করলো না যে – মেয়ে কালো হলেও হালদার বাবুর পয়সা কিছু কম ছিল না, আর নিমাই ঘোষের ছেলে যে কোম্পানিতে চাকরি পেল, তার মালিক শ্রীময়ীর পিসতুতো দাদা নগেন্দ্র !
আর হাঁটুর ব্যাথা কমাতে “steroid”-এর বিকল্প কিছু হয় কি ? (ক্রমশ)

পরের পর্ব তৃতীয় পর্ব

 

ঠুলী (দ্বিতীয় পর্ব)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments