ঠুলী

পর্ব ১

ছাদে উঠে দূরের দিকে দৃষ্টি দিতেই প্রসন্ন বাবুর মনটা ভালো হয়ে গেলো ।

সূর্যাস্তের এই সময়টায় রোজ তিনি তাঁর চার-তলার ফ্ল্যাটের ছাদে ওঠেন। কলরব-মুখরিত পাখিদের ঘরে ফেরা, দূর দিগন্তে ছোট-ছোট বাড়ি আর লম্বা-লম্বা তাল গাছগুলোর ফাঁকে যেখানটায় আকাশের অপূর্ব নানা রঙের মেলা বসে, সেখানটার দিকে চেয়ে থেকে কিভাবে তাঁর সময়টা কেটে যায়, তিনি বুঝতেই পারেন না।

আজকেও তিনি দেখছিলেন – বুড়ো তারাপদ তার মুদির দোকানটা খুলে সামনেটায় জল ছেটাচ্ছে, ভদ্রকালী সুইটসের সামনে রাধাবল্লভী কেনার লাইন পড়েছে, ভবা-পাগলা একটা আধ-ময়লা জামা পড়ে, টলমল করতে করতে লক্ষ্মণ ডাক্তারের চেম্বারের সামনে এসে হাঁক দিচ্ছে, “অ্যাঁই লখা,আমাকে একটু ওষুধ দে না !” ভবার ধারণা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার লক্ষ্মণ ওর ছোটবেলার বন্ধু !

দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে হিন্দুস্তানিদের দেহাতী গান। ওদের কোন পরব আছে বোধয়। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে হাওয়ায় ভেসে কোথায় চলে যাচ্ছে ।

এসব শব্দ-দৃশ্য উপভোগ করতে করতেই প্রসন্নবাবুর চোখ গেলো রাস্তার ওপারের দোতলা বাড়িটার দিকে। হাল্কা কমলা রঙের বাড়িটা, গাঢ় সবুজ বর্ডার দেওয়া । আগে রঙ ছিল সাদা, হালে নতুন করে রঙ করায় দেখতে বেশ খোলতাই হয়েছে ।

আধা-শহর, আধা-গ্রাম এই বীরসিংহপুরে এখনও ফ্ল্যাটের থেকে বাড়ির সংখ্যাই বেশি। বাড়িটা শ্রীমন্ত হাজরার। শ্রীমন্তবাবু বয়সে প্রসন্নবাবুর থেকে বছর চারেকের ছোট হবেন, কলকাতায় সরকারী অফিসে কেরানীগিরি করেন।

 

আজকে শ্রীমন্তবাবুর বাড়ির দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে যাওয়ার কারণ হোল দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরটায় একটা লাল আলো জ্বলছে।

দেখেই প্রসন্ন বাবুর মনটা বিরক্তিতে তেঁতো হয়ে গেলো।

“তার মানে আজকেও বসেছে ! আগে তো ছিল সোম-বুধ-শুক্র, এখন কি রোজই বসছে ??” ভাবলেন তিনি।

কারণ আর কিছুই নয়- মিসেস হাজরা, শ্রীমন্ত বাবুর স্ত্রী !

বছর পনেরো আগে যখন শ্রীমন্ত বাবুরা এখানে চলে আসেন, তখন থেকেই প্রসন্নবাবুর মহিলাকে ভালো লাগেনি। কালো, খর্বাকৃতি, স্থুলকায় এই মহিলার চোখ যেন সবসময়ে ঘুরছে।কারুর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই চোখ দিয়ে তাকে মাপতে শুরু করেন। সাধারন আলাপচারিতার ফাঁকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন – তার পারিবারিক আয় কত, স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ভাব আছে কিনা, ছেলে-মেয়ে পড়াশোনায় ভালো কিনা এবং সর্বোপরি বাড়িতে কোন বড় সমস্যা চলছে কিনা…

সরাসরি কোন প্রশ্ন কিন্তু করেন না, কিন্তু এই সব ব্যাক্তিগত ব্যাপারের খুঁটিনাটি খবর জোগাড় করে মনে রেখে দেন। তারপর বাঘ যেভাবে শিকারের জন্য ওঁত পেতে বসে থাকে, সেই ভাবে তিনিও কোন পরিবারের খারাপ সময়ের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন।

খারাপ সময় এলো তো খেলা শুরু !

 

পর্ব ২

ঘরটা দক্ষিণের হলেও জানলাটা বন্ধ করা। ঘরের মধ্যে হালকা একটা লাল আলো জ্বলছে। জানলায় ভারী কালো পর্দা, সুগন্ধী ধূপের কড়া গন্ধ – সব মিলিয়ে একটা ঝিম-ধরানো পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

"খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি – লোকে বলে বটে, কিন্তু এই লাইনে তো বাজনাটাই আসল", ভাবছিলেন শ্রীময়ী হাজরা। পরনে লাল রঙের পোশাক, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে একটা বড় কালো টিপ। চুলগুলো এলো করে রেখেছেন, চোখে পড়েছেন এক বিশেষ ধরনের Contact Lens, যাতে চোখদুটো আরও জ্বলজ্বল করে। মফঃস্বলের দুর্বল মনের মানুষকে ভেবলে দিতে এইটুকুই যথেষ্ট !

"লোকে ম্যাজিক দেখতে যায়না? সেখানেও তো হাতসাফাই, টুপি থেকে পায়রা বার করা, আর মেয়ে কেটে দু-আধখানা করা। সব যন্ত্রের কারসাজি।

তার চেয়ে এই লাইনটা তো ঢের কঠিন। লোককে শুধুমাত্র নজর করে তার স্বভাব-চরিত্র আঁচ করে নিতে হয়, তারপর এটা -ওটা-সেটা প্রশ্ন করে, প্রয়োজনে ‘স্পাই’ লাগিয়ে ভেতরের খবরের নাগাল পেতে হয়, তারপর ছিপ ফেলে মাছের অপেক্ষায় বসে থাকা – হ্যাপা কি কম নাকি !

তাও লোকজন একে বাঁকা চোখে দেখে ! একটু শিক্ষিত হলে তো কথাই নেই। চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে চলে আসবে – সব বিদ্যেসাগর কিনা !" মনে মনে গজ-গজ করে উঠলেন শ্রীময়ী।

"আরে, মানুষ তো বোকা হতেই চায় রে বাবা ! নাহলে ভগবান তৈরি করল কেন মানুষে ? যে কাজটা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, বুদ্ধি খাটিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে চেষ্টা করেও নামছে না, সেটা কি করে একটা পাথরের মূর্তির সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে নামবে ?

অথচ বলতে যাও ! খেঁকিয়ে উঠবে ! বোঝাতে যাও, লাঠি-সোটা, খড়গ-ত্রিশূল-চপার যে যা পারবে নিয়ে তেড়ে আসবে !!! তার চেয়ে বাবা যার যা আফিম, তাই-ই ভালো, যার যাতে নেশা হয়…" ভাবছিলেন শ্রীময়ী।

 

নয় নয় করে তাঁর পসার আজ খারাপ নয়। শুধু হাত দেখাই দেড় হাজার, তার উপর কষ্টি বিচার, তাবিজ-কবচ-মাদুলি, গ্রহের ফের কাটানো, রত্ন ধারণ – সব আলাদা আলাদা রেট !

অথচ মনে পড়ে, বছর তিনেক আগে এর শুরু হয়েছিল একটা আন্দাজে ঢিল মারার ঝুঁকি নিয়ে ।

শ্রীময়ীদের বাড়ির দুটো বাড়ি পরে থাকেন হালদাররা। মিসেস হালদার তখন ওদের মহিলা-মহলের নিয়মিত সদস্য। একদিন গল্পের ছলে হঠাৎ বলে বসলেন, “এই তুমি নাকি হাত দেখতে পারো শুনলাম,আমারটা একটু দেখে দাও না !”

একেবারে যাকে বলে “স্ট্যান্ডার্ড রিকোয়েস্ট”। যারা হাত দেখতে পারে বলে দাবি করে, তাদেরকে হামেশাই শুনতে হয়, যত দিন না তারা বিরক্ত হয়ে না করছে।

 শ্রীময়ী দেবী কিন্তু সুযোগটা দুহাতে লুফে নিলেন। কিছুক্ষণ এটা-ওটা-সেটা বলে হঠাৎ করে বললেন,

“তোমার তো ঠিকই আছে দিদি, তোমার মেয়ের একটা পোখরাজ ধারণ করলে ভাল হয়…”

হালদার বাবুর মেয়ে স্বাগতার বিয়ের দেখাশোনা চলছে খবর ছিল শ্রীময়ীর কাছে। কিন্তু রঙ কালো এবং সাধারণ গ্র্যাজুয়েট হওয়ার দরুন কাজটা কঠিন হচ্ছে।

এই ঘটনার পরে বেশ কিছুদিন মিসেস হালদার মুখে কালবৈশাখী মেঘ নিয়ে শ্রীময়ীর সাথে কথা বলেন নি।

শ্রীময়ী কিন্তু আড়ালে মুচকি মুচকি হেসেছেন। ভেবেছেন, “ওষুধ ধরেছে…”। মানুষের মনস্তত্বে ঠিক কোন জায়গাটায় ঘা দিতে হয়, তিনি জানতেন !

হোল-ও তাই । একজন করে পাত্রপক্ষ নাকচ করে দিয়ে যায়, আর এদিকে হালদার বাড়িতে, বিশেষ করে মিসেস হালদারের মনে চাপ বাড়তে থাকে। সাওদাগরি অফিসে চাকরি করা নিজের স্বামীকে তিনি পোখরাজের ব্যাপারটা বলেন নি, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার পরিচয়ক হয়ে যাবে বলে। কিন্তু সেই কুসংস্কার-ই যে তাঁর মনে শেকড় গেঁড়ে ডালপালা বিস্তার করে বসবে, তা কে জানত !!

মাস গেলো না, হালদার গিন্নি শ্রীময়ীর-ই শরণাপন্ন হলেন। শ্রীময়ী অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে বললেন, “হেঁ হেঁ, আমি আর কি করতে পারি বলুন, সবই ওনার ইচ্ছা !” বলে আঙ্গুল তুলে উপর দিকে দেখালেন।

সে যাই হোক, পোখরাজের আংটি ধারণ করার তিন সপ্তাহের মধ্যে স্বাগতার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো, এবং হালদার গিন্নি মুক্ত কণ্ঠে শ্রীময়ীর প্রশংসা করে বেড়াতে লাগলেন। শ্রীময়ীকে আর বেশি কিছু করতে হোল না, শুধু সন্ধেবেলার পুজার তাঁর মন্ত্রোচ্চারণের তীব্রতা বাড়ানো ছাড়া।

ধীরে ধীরে পাশের সদগোপ পাড়ার নিমাই ঘোষের ছেলের চাকরি হয়ে গেলো মন্ত্রপূত তাবিজ ধারণ করে, কানাইপুরের হারাধন সাঁপুইের বিশ বছরের হাঁটুর ব্যাথা সেরে গেলো শ্রীময়ীর দেওয়া চন্নমেত্ত পান করে, আর কত ছেলেমেয়ে যে পরীক্ষায় আর প্রেমে পাশ করে গেলো তার ইয়ত্তা নেই !!!

কেউই কিন্তু খেয়াল করলো না যে – মেয়ে কালো হলেও হালদার বাবুর পয়সা কিছু কম ছিল না, আর নিমাই ঘোষের ছেলে যে কোম্পানিতে চাকরি পেল, তার মালিক শ্রীময়ীর পিসতুতো দাদা নগেন্দ্র !

আর হাঁটুর ব্যাথা কমাতে “steroid”-এর বিকল্প কিছু হয় কি ?

 

পর্ব ৩

“অ্যাই ছেলে, শোন এদিকে !”

প্রসন্নবাবু স্কুল থেকে বেড়িয়ে ছাতাটা খুলতে যাবেন, এমন সময়ে পরিচিত গলার ডাকটা শুনতে পেলেন।

ভবা পাগলা !

ডাকটা অবশ্য তাঁর উদ্দেশ্যে নয়। তিনি নিবারন চন্দ্র সরকার বিদ্যালয়ে প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল শিক্ষকতা করছেন। পাড়ার লোকজন তাঁকে বেশ সম্মানের চোখেই দেখে।

ভবা স্কুলের গেটের বাইরে দাড়িয়ে ছিল। অন্য দিনের তুলনায় আজকে কিন্তু ভবাকে একটু হলেও পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন লাগছিল।

প্রসন্নবাবু দেখছিলেন, ডাক শুনে ক্লাস এইটের দুটো ছেলে ভবার দিকে এগিয়ে গেলো। পাড়ারই ছেলে, ভবাকে ভাল-মতন চেনে, দেখে মনে হোল বেশ মজা পেয়েছে।

কাছে যেতেই ভবা দুজনকে নিরীক্ষণ করে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলো, “ফাউনটেন পেন-এ লিখিস?”

ছেলেগুলো একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো, এরকম প্রশ্ন আশা করেনি। তাছাড়া ফাউনটেন পেন ব্যাপারটাই তো ওরা খুব কম চোখে দেখেছে। সেই কোন কালে ক্লাস ফাইভে বোধয় বাবা একটা কিনে দিয়েছিলো, হাতের লেখা ভালো হবে বলে। তারপর কবেই সেটার সঙ্গে সম্পর্ক চুকে-বুকে গেছে।

ছেলেগুলো ইতস্তত করছে দেখে ভবা হুংকার দিয়ে বলে উঠলো, “তারাপদদার দোকানে গিয়ে চকচকে প্যাকেটের জিনিসটা কিনিস না?”

ছেলেগুলো অবাক হয়ে চেয়ে আছে দেখে বলল, “হাতের লেখা ভালো না হলে মাস্টারমশাই পড়বেন কেন কষ্ট করে?”

শুনে প্রসন্নবাবুর হাসি পেয়ে গেলো। ভবার মুখে এরকম গুরুগম্ভীর কথা ! অবশ্য তাঁর মাঝে-মাঝে মনে হয়, ভবাকে দেখে যতটা পাগল লাগে, আসলে ভবা অতটা পাগল নয়।

ভবা আবার জিজ্ঞাসা করলো, “বল তো দেখি, এই যে এখন গরমকাল চলছে, এরপরে বৃষ্টি হবে, তারপর মা দুগগা আসবেন, তারপর ঠাণ্ডায় হি হি করে কাঁপবি…এরকম হয় কেন?”

একটু ভেবে একটা ছেলে বলল, “মানে ঋতু-পরিবর্তন হয় কেন সেটা বলছেন?”

“হু ?” ভবা বেশ মজা পেয়েছে মনে হোল।

একটু ভেবে ছেলেটা জবাব দিল, “পৃথিবী সূর্যের চারিপাশে ঘোরে তো, কাছে থাকলে গরমকাল, আর দূরে চলে গেলে শীতকাল…”

“দূর বোকা ! এখানে গরমকালের সময়ই তো সূর্যের সবচেয়ে দূরে থাকে পৃথিবী…” ভবা হেসে উঠলো, “ঋতু পরিবর্তন আসলে হয় পৃথিবী একটু হেলে আছে বলে…এই দ্যাখ এরকম…” বলে ভবা পাশের ফল-অলার ঝুড়ি থেকে একটা আপেল হাতে নিয়ে নিল।

আপেল-ওয়ালা ছোকরা হাঁ হাঁ করতে গিয়েও থেমে গেলো। বোধয় ভবার কথা মন দিয়ে শুনছিল।

ভবা আপেলটা ডান হাতে নিয়ে অদ্ভুত কায়দায় বলল, “এই দ্যাখ, এই আপেলটা ধর পৃথিবী, আর ওই আলোটা সুয্যিমামা, এই দেখ, আপেলটা ২৩ ডিগ্রি বেঁকে আছে বলে আলোটা কেমন সোজা-ভাবে পড়ছে দেখ !…” আপেলটার মসৃণ গায়ে তখন পরন্ত বিকেলের রোদ যেন পিছলে যাচ্ছে।

“আলো মানে কি? রোদ? আর রোদ মানে গরম…আর উলটো দিকটা দেখ, কেমন অন্ধকার হয়ে আছে, মানে কি? শীতকাল চলছে…”

এক দমে বলে পরিতৃপ্তির হাসি হাসল ভবা।

ছেলেগুলো কতটা বুঝল, বলা মুস্কিল, ওরা তো এসব নাটুকেপনা দেখেই হেসে ফেলেছে। প্রসন্নবাবু কিন্তু বেশ অবাক হলেন।

“কিস্যু পড়াশোনা করিস না তোরা…আমার বাপ একবার সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্ক পারিনি বলে আম-কাঠের লাঠি করে এমন উত্তম-মধ্যম দিয়েছিল না, এখনও দাগ আছে ! আর তোরা? সব আদরে বাঁদর তৈরি হচ্ছিস…হুহ…” বলে গজ গজ করে ভবা, “কি বলেন মাস্টারমশাই?”

প্রসন্নবাবু শুনে হাসলেন, কিছু বললেন না।

হাঁটা লাগাতে ভবা সঙ্গ নিল। প্রসন্নবাবুর মন্দ লাগছিল না, জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি এতো কিছু জানলে কি করে, ভবা?”

“ছোটবেলায় ইশকুলে পড়েছিলাম, মনে থেকে গেছে…”, আস্তে আস্তে জবাব দিল ভবা।

তারপর একটু থেমে কেমন আনমনা হয়ে বলল, “আসলে কি জানেন, ছোটবেলায় আমার এক মাস্টারমশাই ছিলেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন, কোন জিনিসই প্রমান ছাড়া মেনে নেবে না কখনো। দরকারে সারাজীবন ধরে তার প্রমান খুঁজবে…ছাড়বে না, পেলে সেটাই তোমার শিক্ষা হবে।“

তারপর একটু থেমে বলল, “শিক্ষা কি কখনও ওই দশ-বারো বছরে শেষ হয়, বলুন?”

প্রসন্নবাবু অবাক হয়ে চেয়ে থাকলেন। আধা-শিক্ষিত, টিমটিমে বাতি জ্বলা, সংকীর্ণ, গলি-ঘুঁজির এই বীরসিংহপুরে এরকম একটা মানুষ যে আছে, তাঁর জানা ছিল না।

অনেকদিন পর ভালো শ্রোতা পেলে যা হয়, ভবা উৎসাহের সাথে বলতে লাগলো, “জানেন ছোটবেলায়, আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল – আচ্ছা মোগলদের হটিয়েই যদি ইংরেজরা এসে থাকে এ দেশে, তবে মোগলদের সাথে লাল-মুখোদের একটাও বড় যুদ্ধু হোল না কেন?”

“দারুন প্রশ্ন !” ভাবলেন প্রসন্নবাবু।

ভবা বলে চলে, “যুদ্ধু তো যা করবার করলো মাইসোরের টিপু, আমাদের সিরাজ, অয্যোধ্যার ওয়াজেদ আলি শাহ আর মারাঠাদের পেশওয়া বাজি রাও…মোগলদের সাথে লড়াইটা হোল কোথায় বলুন তো???”

প্রসন্নবাবুর বিষয় বিজ্ঞান হলেও ওনার এই ব্যাপারটা জানা ছিল, মুচকি হেসে বললেন,

“ইংরেজরা যতদিনে এদেশে গুছিয়ে বসতে শুরু করেছিল, ততদিনে মোগলদের শক্তি অনেকটাই কমে গেছে, প্রকারন্তরে বলা যায় মোগলদের শক্তি কমে গেছিলো বলেই ইংরেজরা সুবিধা করতে পেরেছিল। আসলে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক কৌশলটাই এমন ছিল যে শক্তিশালী রাজ্যের সাথে সরাসরি যুদ্ধ লাগবে না, বরং ধীরে ধীরে তাকে কমজোরি করে তারপর গ্রাস করবে…তাই মোগলদের হটিয়ে ইংরেজরা এসছে, এই কথাটা যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ভুল। ইংরেজদের সঙ্গে সবথেকে বড় যুদ্ধ হয় মারাঠাদের, তারপরের শক্ত গিঁট ছিল টিপু সুলতান…”

এক দমে অনেকটা বলে থামলেন তিনি।

হাঁটতে হাঁটতে তারা প্রসন্নবাবুর ফ্ল্যাটের কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। গতকাল সন্ধ্যায় এক পশলা বৃষ্টি হওয়াতে ছিটমহল আর হারানের চপের দোকানের মাঝখানে বেশ কিছুটা জল জমেছে। কাটিয়ে সাবধানে পার হতে গিয়ে ছিটমহলের ভেতরের কথোপকথন শুনতে পেলেন প্রসন্নবাবু…

“…আরে সে ছেলে এখন দৌড়ে বেড়াচ্ছে !! পারলে ফুটবল নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে !!!” উত্তেজিত গলায় বলছিলেন দোকানের মালিক অসিতবাবু।

রোজ সন্ধ্যায় এই দোকানটায় বুড়োদের একটা আড্ডা বসে, বিক্রি-বাট্টা বেশি না থাকলে যা হয় আর কি…

অসিতবাবুর কথায় নতুনপাড়ার যোগেন খুড়ো বলে উঠলো, “আমি আগেই বলেছিলুম, ওই মেয়ের খ্যামতা আচে… তোমরা সব আজকালকার ছোঁড়া, কিচু মানতে তো চাও না…” বলে এক চুমুকে চায়ের ভাঁড়টাকে ফাঁকা করে দিয়ে গুছিয়ে বসে বলল,

“সাহাগঞ্জের প্রণব মিত্তিরকে চেন? মস্ত বড় উকিল-ব্যারিস্টার, জলপানি নিয়ে বিলেতে পড়তে গেসলো, সেকি আজকের কতা…তো সে প্রণব মিত্তিরের ছিল হাঁপানির রোগ, কত ডাক্তার-বদ্যি করলো, সবাই ফেল মেরে গেলো… শেষে আমাদের এই শ্রীমার কাচে নিয়ে এলুম আমি। একটা তাবিজ দিলে আর দিনে দুটো করে বড়ি, গরম জলে গুলে খেতে। ছ মাস হয়ে গেলো, হাঁপানির বাপ ধারে-কাছে নেই কো !!!”

“বল কি গো !!!” দোকানের বাকি লোকেরা সমস্বরে বলে উঠলো।

প্রসন্নবাবু হাঁটা লাগালেন, এসব আলোচনা তাঁর ভালো লাগেনা। পেছনে দেখলেন ভবা পাগলাও হাঁ করে ওঁদের কথা শুনছে।

ওঁকে দেখতে পেয়ে ভবা অদ্ভুত গম্ভীর গলায় বলল, “আমাদের সমস্যা কি জানেন প্রসন্নবাবু, আমরা সবাই হয় অন্ধ, নয় চোখে ঠুলী পড়ে বসে আছি !!!”

 

পর্ব ৪

রাত নটা বাজে। এখনও মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে চলেছে, সেই সঙ্গে শোঁ-শোঁ করে হাওয়া। মাঝে মাঝে চতুর্দিক সাদা করে দেওয়া বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বাজ পড়ার আওয়াজে বুক কেঁপে উঠছে !!

বীরসিংহপুর মেন রোডে ঘণ্টা দুই হয়ে গেলো কারেন্ট নেই…কোথাও লাইন-এর উপর গাছ পড়েছে কিনা কে জানে। মাঝে মাঝে রাস্তায় এক-একজনকে দেখা যাচ্ছে, বৃষ্টির জন্য চেনা যাচ্ছে না…

মেন রোডের দোকানগুলোয় টিম টিম করে বাতি জ্বলছে, দোকানিরা এখনই ঝাঁপি বন্ধ করে যে যার বাড়ি চলে যাবে বলে তোড়জোড় করছ। সন্ধেবেলা থেকে বিশেষ বিক্রি হয়নি আর এই বৃষ্টির মধ্যে কেই বা আসবে !

শ্রীময়ীও আজকে ঘন ঘন ঘড়ি দেখছিলেন। সন্ধ্যেবেলার পসারটা ঠিক জমেনি। পাকা খবর ছিল সমর পল্লীর নিকুঞ্জ খাসনবীশ আজকে আসবেন, জমি-সংক্রান্ত মামলার বিষয়টা নিয়ে। খবরটা দিয়েছিল মিসেস খাসনবীশের খাস দাসী – মনীষা। মালদার পার্টি নিকুঞ্জবাবুকে বেশ খেলিয়ে খেলিয়ে তুলবেন ভেবেছিলেন শ্রীময়ী।

কিন্তু পার্টি এলো কই?

“তাহলে খবর কি ভুল ছিল? হওয়ার তো কথা নয়…” ভাবতে ভাবতেই বাড়ির কলিং বেলটা বেজে উঠলো।

মক্কেল এলো নাকি?

আরেকবার বেল বাজাল মক্কেল। উফ, পম্পিটা গেলো কোথায় ! নির্ঘাত পাশের ঘরে বসে টিভি দেখছে…বাড়ির ইনভার্টারের কি অপচয় !

“ভেতরে আসুন…” যতটা সম্ভব গম্ভীর গলায় বললেন শ্রীময়ী।

গায়ে বর্ষাতি পড়া রোগা, লম্বা এক আগন্তুক ঘরে ঢুকল। সামনেটা অন্ধকার থাকায় শ্রীময়ী মুখটা দেখতে পেলেন না।

নিয়ম হচ্ছে, মক্কেলের দিকে বেশি তাকাতে নেই, তাতে আগ্রহ প্রকাশ পায়। তাই শ্রীময়ী যতটা সম্ভব দেখেও না দেখার ভান করছিলেন, কিন্তু কি কারণে কে জানে, আগন্তুক ঘরে ঢুকতেই তাঁর গা টা কেমন শিরশির করে উঠলো…

হাল্কা লাল আলো জ্বলা ঘরের মধ্যে ঢুকে এসে আগন্তুক শ্রীময়ীর উলটো দিকের চেয়ারটায় বসলো। শ্রীময়ী খেয়াল করলেন লোকটা এখনও মাথায় হুডটা নামায়নি। হঠাৎ বিনা ভূমিকায় লোকটা তার ডান হাতটা শ্রীময়ীর দিকে প্রসারিত করে ধরল! শক্ত, রোগা, কড়া পড়া একটা হাত…

একটু অপ্রস্তুতে পড়লেও শ্রীময়ী বুঝলেন যে ইনি হাত দেখাতে এসেছেন।

কিন্তু হাত দেখলেই তো আর হবে না, এনার সম্বন্ধে জানতে হবে…নাহলে “নিদান” দেবেন কি করে?

খুব মনোযোগ দিয়ে যেন হাত দেখছেন, এরকম ভান করে শ্রীময়ী জিজ্ঞাসা করলেন,

“আপনার নাম কি?”

“শ্রীকুমার” একটা অদ্ভুত ঠাণ্ডা গলায় জবাব ভেসে এলো।

“পদবী?” যতটা সম্ভব গলা না কাঁপিয়ে শ্রীময়ী জিজ্ঞাসা করলেন।

“সরকার…”

শ্রীময়ী বুঝতে পারছেন তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে, শিরদাঁড়া বেয়ে কি একটা অদ্ভুত অস্বস্তি যেন উঠে আসছে…তাও কোনভাবে গলাটা স্বাভাবিক রেখে জিজ্ঞাসা করলেন,

“বাড়ি কোথায় আপনার?”

“শরৎ ভিলা, বিষ্ণুপুর…” যেন ফিসফিস করে এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস শ্রীময়ীর কানে বলে গেলো…

কাঁপতে কাঁপতে শ্রীময়ীর চোখ আগন্তুকের হাত বেয়ে মুখের দিকে চলে গেল। সেই কনুইয়ের কাছে জড়ুল, সেই চেনা নাক, চেনা ভাঙ্গা গাল, শুধু চোখ গুলো…বাদামি চোখগুলো স্থির হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে আছে !!!

অস্ফুটে তাঁর গলা দিয়ে বেরোল, “দাদা !!! তুমি !!! কিন্তু এ কি করে সম্ভব !!! তুমি তো অনেকদিন আগেই পুলিশের গুলিতে…”

“কি ভেবেছিস তুই মিনু? ভুত-ভগবানের খেলা দেখাচ্ছিস?” হিসহিসে একটা কণ্ঠস্বর শ্রীময়ীর সারা শরীর কাঁপিয়ে দিল।

“না না…” কোনমতে তিনি বললেন।

আগন্তুকের কপালে তখন একটা বিন্দু দেখা দিয়েছে…গোল, লাল একটা বিন্দু…

“গরীব মানুষকে বোকা বানিয়ে পয়সা নিস তুই ! জানিস মৃত্যু কাকে বলে?”

শ্রীময়ীর গলা দিয়ে আর আওয়াজ বেরোচ্ছে না…সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে…ঘরের ধূপের গন্ধে যেন দম আটকে আসছে…

আগন্তুকের কপালের লাল বিন্দুটা এখন গড়াচ্ছে…চোখের দিকে নেমে আসছে…ঘন লাল রক্ত !!

 

রাত দশটায় অনেক ডাকাডাকির পরও যখন কোন সারা পাওয়া গেলো না, তখন পম্পি ঘরে ঢুকতে বাধ্য হোল। তারপর ওর চিৎকারে সারা পাড়ার লোক এসে আবিষ্কার করলো শ্রীময়ী অজ্ঞান হয়ে তাঁর চেয়ারে পড়ে রয়েছেন ! ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে…

পর্ব ৫

গঙ্গার ঘাটে ভোর হোল।

কালকের রাত্রের ভয়ঙ্কর বৃষ্টির পর আকাশের গায়ে সব কালো মেঘ ধুয়ে মুছে গেছে। এখন এক অপূর্ব সুন্দর লাল-কমলা আভা ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে,পাখিরা জেগে উঠছে, দূরে দেখা যাচ্ছে ছিপ নৌকাগুলো মাছ ধরতে বেড়িয়েছে, খেয়া পারাপার শুরু হোল বলে…

রাত্রি যতই অন্ধকার হোক না কেন, ভোর সব সময়েই নতুন করে শুরু করার অনুপ্রেরণা যোগায়…

আমার নাম শ্রীকুমার সরকার। আমার জন্ম গঙ্গার ওপারে – বিষ্ণুপুরে। শ্রীময়ী আমার একমাত্র বোন।

ছোটবেলায় পড়াশোনায় ভালো ছিলাম, প্রেসিডেন্সিতে ফিসিক্স অনার্স পড়তাম। সেটা ছিল সত্তরের দশক, দেশ জুড়ে টালমাটাল অবস্থা ! আর আমাদের, কাঁচা বয়স তো তখন, চোখে ছিল রঙ্গিন স্বপ্ন !

এখন ভাবলে হাসি পায়, অবাকও লাগে, মাত্র ২ দিনের নোটিশে বাড়ি ছেড়েছিলাম…উত্তরবঙ্গে গিয়ে দলের কাজ করতে হবে বলে !!!

আর কোনদিন ফিরতে পারিনি…

পাড়ার বন্ধু ও কমরেড নীলাঞ্জনের কাছে শুনেছিলাম, আমার জন্য মা খুব কেঁদেছিল। আমারও যে কত রাত চিলাপাতার জঙ্গলে আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে কেটেছে, সেটা আমিই জানি…

বাবা অবশ্য কড়া ধাতের মানুষ ছিলেন, ভগবান মানতেন না, কিছুটা ওনার প্রেরণাতেই আমার নকশাল হওয়া। আর দলের কাজও ছিল অত্যন্ত কঠিন, গরীব, না-খেতে-পাওয়া মানুষকে রাষ্ট্রযন্ত্রের অত্যাচার থেকে মুক্ত করতে হবে যে!

দু-দুবার একচুলের জন্য বেঁচেছি পুলিশের হাত থেকে, টানা তিন দিন-তিন রাত জঙ্গলে গাছের ডালে কাটাতে হয়েছে, জল-খাবার ছাড়া…

কিন্তু শেষমেশ আমরা ধরা পড়ে গেলাম। দলের মধ্যে খোঁচরটা যে কে ছিল, আজও নিশ্চিত নই।

বীরপাড়া গ্রাম থেকে পুলিশ আমাদের তুলে নিয়ে গিয়ে লকআপে পুরল। তারপর শুরু হোল অত্যাচার। পুলিশি অত্যাচার যে কাকে বলে সেটা এতদিন শুধু শুনেই আসছিলাম, এবার প্রত্যক্ষ করলাম। লকআপেই আমার সামনে দুজন কমরেড মারা গেলো, একজন রাজসাক্ষী হবে বলে কবুল করলো।

আমি কিন্তু ভাঙ্গিনি। হয়ত আমার বয়স কম ছিল বলে ওরা ভাবতে পারেনি, কিন্তু আমিই একমাত্র জানতাম চারুবাবু কোথায় লুকিয়ে আছেন…ওদের জানতে দিয়নি !

কিন্তু এতকিছু করে কি হোল?

হঠাৎ একদিন রাত্রে আমাদের চারজনকে ওরা তিস্তার পাড়ে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিলো। বলল আমাদের নাকি ছুটি হয়ে গেছে।

আমি বুঝতে পেরেছিলাম কি ঘটতে চলেছে ! তাই ওরা ছেড়ে দেওয়া মাত্র আমি সোজা নদী লক্ষ্য করে দৌড় লাগালাম। হকচকিয়ে গিয়ে ওদের বোধয় এক মুহূর্ত সময় বেশি লেগেছিল গুলিটা ছুঁড়তে, আর তাই হয়ত টিপটা ঠিকঠাক হয়নি ! তিস্তায় ঝাঁপ দেওয়ার আগের মুহূর্তে টের পেলাম গুলিটা আমার পেটের বাঁ-দিকটা ফুঁড়ে বেড়িয়ে চলে গেছে।

রক্তক্ষরণ, অতিরিক্ত দুর্বলতা সব মিলিয়ে তিস্তার হিমশীতল জলে পড়ে জ্ঞান হারালাম। ডুবে যেতে যেতে মনে হোল আর কোন আশা নেই…

 

পৃথিবীতে এমন অনেক অত্যাশ্চর্য কাণ্ড ঘটে, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না। সারাটা জীবন ভাগ্যের হাতে মার খেয়েছে এমন মানুষের কপালেও এরকম এক একটা “মিরাকেল” ঘটে যায়।

আমারও তাই ঘটলো। আমি বেঁচে গেলাম !

তিস্তার কনকনে বরফ-ঠাণ্ডা জলে বোধয় আমার রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেছিল। আর আমাকে ডুবতে দেখে নদীতীরবর্তী গ্রামের দুই বাহে যুবক আমাকে জল থেকে টেনে তুলল।

সত্যি,আজকে আরেক নদীর পাড়ে বসে তাদের কথা খুব মনে পড়ছে। এক নদী আরেক নদীর কথা মনে পড়ায় কিনা কে জানে !

ওদের নাম ছিল মনু আর প্রদীপ। মনুর ভালো নাম মনোরঞ্জন, পদবী বর্মণ। আর প্রদীপ, রায়।

বাহেরা বেশিরভাগই হিন্দু, তাই ওদের নামগুলো আমাদেরই মতো। ওরাই তো এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা। শোনা যায়, খ্রিস্টেরও জন্মের আগে বর্তমান চিন দেশ থেকে তিব্বত-বর্মা হয়ে এদেশে এসে ওরা বসতি স্থাপন করেছিল।

বাহেদের ছোট্ট গ্রামটায় খুব বেশি হলে গোটা পনেরো-কুড়ি পরিবারের বাস। ওখানে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতেই মাস ছয়েক লেগে গেলো। তারপর ওদের মধ্যেই কিছুদিন রয়ে গেলাম, ওদের পড়াশোনা শেখাতাম, অঙ্ক করাতাম, নাম সই করা শেখাতাম…আমার নাম হয়ে গেছিল “ম্যাসটর বাবু”। মনে মনে ভাবতাম, এটাই তো সত্যিকারের মানুষের জন্য কাজ করা, কোন রাজনৈতিক ঝাণ্ডার তলায় না থেকে।

ভেবেছিলাম ওদের মধ্যেই থেকে যাবো…

কিন্তু এক-এক সময়ে ফাঁকা ফাঁকা লাগতো, বাড়ির জন্য মন-কেমন করত। আসলে বহির্জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার জন্য যে উদাসীনতার প্রয়োজন হয়, তা আমদের, সুসভ্য মানুষদের, বোধয় কোনোদিনই নাগালে আসবে না…

 

অবশেষে, দীর্ঘ সাত বছর পর, একদিন বিষ্ণুপুরে ফিরে এলাম।

ততদিনে রাজনৈতিক পটভূমিকায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমাদের অজ-পাড়া গাঁ বিষ্ণুপুরেও শহরের হাওয়া লাগতে শুরু করেছে।

দেখলাম শরৎ ভিলা আর আমার বাড়ি নেই। অন্য একটি পরিবার সেখানে বসবাস করছে। তাদের মুখেই শুনলাম আমি গ্রেফতার হওয়ার পর বাবা বেশীদিন বাঁচেন নি। গম্ভীর, কঠিন মানুষটার ভেতরটা হয়তো কোমল ছিল, কে জানে। তারপর, মায়ের শেষ জীবনটা খুব কষ্টে কেটেছে। কোনভাবে বোনের বিয়েটা দিতে পেরেছিলেন আর বাড়িটা বিক্রির বন্দোবস্ত করতে পেরেছিলেন, তারপর আমার “মৃত্যুর” খবর পেয়ে সব শেষ।

এরপর যে আমি কি কি করেছিলাম, আমার ঠিক মনে নেই। অনেক রকম কাজ করে বেড়াতাম – কখনো ট্যাক্সি চালানো, কখনো ইনস্যুরেন্সের দালালি, কখনো রেস্তরাঁয় রান্না করার কাজ…অদ্ভুত একটা শিকড়হীনতায় ভুগতাম। বিয়ে করার কথাও ভেবেছিলাম, কিন্তু মেয়েটার কি ভবিষ্যৎ হবে – এটা ভেবে আর করা হয়নি।

একদিন সন্ধ্যায় চৌরঙ্গির রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম, তখন একজন ম্যাজিশিয়ানের সহকারীর কাজ করি।

চৌরঙ্গির ঝলমলে দোকানগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার মনে পড়ল অনেকদিন আগে আমরা চারজন যখন প্রথমবার কলকাতায় বেড়াতে আসি তখন এখানেও ঘুরে গেছিলাম মিনু বায়না করেছিল, তাই মা ওকে কি একটা কিনেও দিয়েছিল।

সেদিন রাতেই ঠিক করে ফেললাম, মিনুকে দেখতে যাবো। আমার একমাত্র রক্তের সম্পর্কের বোন, সে কেমন আছে, দেখতে হবে না !

মিনুর কোথায় বিয়ে হয়েছে, সেই ঠিকানা আগেই জোগাড় করেছিলাম, এবার দরকার হোল ছদ্মবেশের !!!

এতদিনের অভিজ্ঞতায় একটা জিনিস খেয়াল করেছি – মানুষ কখনো ড্রাইভার, পাগল কিম্বা ভিখিরিদের মুখ মনে রাখে না। ড্রাইভারি করেছি, ভিখিরি হওয়ার ইচ্ছা নেই, অতএব…

আমার নাম ছিল শ্রীকুমার, হলাম ভবা পাগলা…মানুষই সোৎসাহে আমার নামকরণ করে দিলো।

বীরসিংহপুরে এসে দেখলাম মিনু দিব্বি আছে, শ্রীমন্ত লোকটা ভালো। ওদের ছেলেটাও খারাপ হয়নি, ক্লাস এইটে পড়ছে, তবে পড়াশোনায় আরও ভালো হতে হবে।

কিন্তু মিনু একি কাজ করছে?এতো লোক-ঠকানো কাজ ! সহজ সরল মানুষগুলোকে পেয়ে এরকম ভাবে বোকা বানাচ্ছে !!

তাই ঠিক করলাম ওকে একটু শিক্ষা দিতে হবে। ম্যাজিশিয়ানের সহকারী থাকা-কালিন শেখা কিছু বিদ্যা কাজে এসে গেলো।

আশাকরি, এবার মিনু ঠিক পথে চলে আসবে, ছেলের পড়াশোনা, সংসারের দিকে মন দেবে।

আমার এখানে কাজ শেষ…এরা ভালো থাকবে, জানি।

এবার দেখা যাক, কোন দেশে যাওয়া যায়, কি কাজ করা যায়…কাজ শেখার কোন শেষ আছে নাকি?

ইচ্ছা আছে মুর্শিদাবাদ গিয়ে মিস্ত্রিদের দলে ভিড়ে পড়বো, বাড়ি বানানোর কাজ করতে। কিংবা খালাসীটোলায় গিয়ে পছন্দমত জাহাজে উঠে দেশ-বিদেশ যেতেই বা আটকাচ্ছে কে…

 

রোগা, লম্বা লোকটা উঠে পড়ল। বন্দরে ফেরা শেকড়হীন জাহাজটা আবার মহাসমুদ্রে ভেসে পড়লো।

 

উপসংহার

প্রসন্নবাবু সকাল সাড়ে-আটটায় বাজার করতে বেরচ্ছিলেন। ইশকুলের তাড়া আছে, তার উপর কাল রাতে পাড়ায় কি একটা কাণ্ড ঘটে গেছে, সেটার খবর নিতে হবে।

এমন সময়ে কোত্থেকে একটা বাচ্চা ছেলে ছুটে এসে তাঁর হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়েই পালাল।

খামটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা ছোট্ট চিরকুট বেরোল। তাতে সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা -

“মাস্টারমশাই, আপনার দৃষ্টিশক্তি ভালো, দয়া করে কোনদিন ঠুলী পড়বেন না।“

 

                                                            —————–

ঠুলী (পুরো গল্পটি এক জায়গায় !)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments