ছাদে উঠে দূরের দিকে দৃষ্টি দিতেই প্রসন্ন বাবুর মনটা ভালো হয়ে গেলো ।

সূর্যাস্তের এই সময়টায় রোজ তিনি তাঁর চার-তলার ফ্ল্যাটের ছাদে ওঠেন। কলরব-মুখরিত পাখিদের ঘরে ফেরা, দূর দিগন্তে ছোট-ছোট বাড়ি আর লম্বা-লম্বা তাল গাছগুলোর ফাঁকে যেখানটায় আকাশের অপূর্ব নানা রঙের মেলা বসে, সেখানটার দিকে চেয়ে থেকে কিভাবে তাঁর সময়টা কেটে যায়, তিনি বুঝতেই পারেন না।

আজকেও তিনি দেখছিলেন – বুড়ো তারাপদ তার মুদির দোকানটা খুলে সামনেটায় জল ছেটাচ্ছে, ভদ্রকালী সুইটসের সামনে রাধাবল্লভী কেনার লাইন পড়েছে, ভবা-পাগলা একটা আধ-ময়লা জামা পড়ে, টলমল করতে করতে লক্ষ্মণ ডাক্তারের চেম্বারের সামনে এসে হাঁক দিচ্ছে, “অ্যাঁই লখা,আমাকে একটু ওষুধ দে না !” ভবার ধারণা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার লক্ষ্মণ ওর ছোটবেলার বন্ধু !

দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে হিন্দুস্তানিদের দেহাতী গান। ওদের কোন পরব আছে বোধয়। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে হাওয়ায় ভেসে কোথায় চলে যাচ্ছে ।

 

এসব শব্দ-দৃশ্য উপভোগ করতে করতেই প্রসন্নবাবুর চোখ গেলো রাস্তার ওপারের দোতলা বাড়িটার দিকে। হাল্কা কমলা রঙের বাড়িটা, গাঢ় সবুজ বর্ডার দেওয়া । আগে রঙ ছিল সাদা, হালে নতুন করে রঙ করায় দেখতে বেশ খোলতাই হয়েছে ।

আধা-শহর, আধা-গ্রাম এই বীরসিংহপুরে এখনও ফ্ল্যাটের থেকে বাড়ির সংখ্যাই বেশি। বাড়িটা শ্রীমন্ত হাজরার। শ্রীমন্তবাবু বয়সে প্রসন্নবাবুর থেকে বছর চারেকের ছোট হবেন, কলকাতায় সরকারী অফিসে কেরানীগিরি করেন।

আজকে শ্রীমন্তবাবুর বাড়ির দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে যাওয়ার কারণ হোল দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরটায় একটা লাল আলো জ্বলছে।

দেখেই প্রসন্ন বাবুর মনটা বিরক্তিতে তেঁতো হয়ে গেলো।

“তার মানে আজকেও বসেছে ! আগে তো ছিল সোম-বুধ-শুক্র, এখন কি রোজই বসছে ??” ভাবলেন তিনি।

কারণ আর কিছুই নয়- মিসেস হাজরা, শ্রীমন্ত বাবুর স্ত্রী !

বছর পনেরো আগে যখন শ্রীমন্ত বাবুরা এখানে চলে আসেন, তখন থেকেই প্রসন্নবাবুর মহিলাকে ভালো লাগেনি। কালো, খর্বাকৃতি, স্থুলকায় এই মহিলার চোখ যেন সবসময়ে ঘুরছে।কারুর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই চোখ দিয়ে তাকে মাপতে শুরু করেন। সাধারন আলাপচারিতার ফাঁকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন – তার পারিবারিক আয় কত, স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ভাব আছে কিনা, ছেলে-মেয়ে পড়াশোনায় ভালো কিনা এবং সর্বোপরি বাড়িতে কোন বড় সমস্যা চলছে কিনা…

সরাসরি কোন প্রশ্ন কিন্তু করেন না, কিন্তু এই সব ব্যাক্তিগত ব্যাপারের খুঁটিনাটি খবর জোগাড় করে মনে রেখে দেন। তারপর বাঘ যেভাবে শিকারের জন্য ওঁত পেতে বসে থাকে, সেই ভাবে তিনিও কোন পরিবারের খারাপ সময়ের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন।

খারাপ সময় এলো তো খেলা শুরু !
(ক্রমশ)

 

পরের পর্ব দ্বিতীয় পর্ব

ঠুলী (প্রথম পর্ব)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments