নব্বইয়ের দশকে আমরা যারা খুব হুড়মুর করে বেড়ে উঠছিলাম তাদের কাছে এক যুতসই ডাকের যে কি মর্ম তা এই হোয়াটসয়াপ জেনারেশনের ‘হাই’ ‘হুই’ লিখে মেসেজ ভেজনেওয়ালারা বুঝবে না ! তাদের না বোঝার দোষ যদিও সেই আমাদের ওপরেই বর্তায় , আমরা সেলফোন ব্যবহার না শুরু করলে এই হোয়াটসয়াপই বা তারা পেতো কোথায়? মোবাইলে স্নূজিং না থাকলেও, এলার্ম ঘড়ি তখনও আমরা ঘুমের ঘোরেই বন্ধ করে দিতাম, স্নূজ করা ক্যাঁ ক্যাঁ শুনে ঘুম ভাঙত কাকের ডাকে। আর তা না হলে খবর কাগজ দিতে এসে রানা কাকু সাইকেলের ঘন্টি তিনবার বাজিয়ে ডাকতেই বিছানা ছাড়তে হত। কাগজ হাতে পেতেই শেষের পাতায় ডেকে নিয়ে যেত সন্দীপ পাতিলের হরেক বলে চার মারার খবর কিম্বা কৃশানুর বল পায়ে ডিফেন্স কাটানোর ছবি। তখন সারাদিন স্কুলে বন্ধুদের কাছ থেকে কিব্বে,আব্বে ,ওই,শোননা গোছের নানারকমের ডাক গুলোর মধ্যে কোথাও যেন একটা আন্তরিকভাবে বেঁচে থাকার রসদ লুকিয়ে থাকতো। সেই সময় ওই ডাকগুলোর মূল্য টের না পেলেও আজ কিন্ত সেগুলোকে বেশ মিস করি, বেখেয়ালেই হয়ত এদিক সেদিক তারা নিজের মত করে ডেকে বেড়ায়। পড়ন্ত বিকেলের আলো পরতে না পরতেই মাঠ ডাকতো , ফিরতে দেরী হলে মা ডাকত , সে ডাক শুনে না ফিরলে বাবার অফিস থেকে ফেরার পরেই মনে কেমন করা একটা ‘কু’ ডাকতো। আবার কোনো শ্বব্দ না করেই দোতলার জানলায় উঁকি মারা জনৈক কৃষ্ণকলির চোখজোড়া যখন নিচে দাড়িয়ে থাকা সেন্টুদাকে নিরবে ডাকতো তখন আর আমাদের পায় কে , সাইলেন্ট ডাক পেয়েই সেন্টুদার দিল পুরো বোটানিক্যাল গার্ডেন হয়ে যেত ! বেশ বুঝতাম , না চাইলেও, দাদা বিকেলে সিওর গোটা ক্যাপস্টান খাওয়াবে ! অনেকদিন অব্দি ঘাবড়ে ছিলাম যে রাতের বেলায় নিশি ডাকলে কি করবো? প্ল্যান করেছিলাম নিশি ডাকলে কাঁচের জানলা দিয়ে তার ফটো তুলব প্রথমে, তারপর হবে নয় ওয়ান ইস্টু ওয়ান। ইনি মিনি করে ডেকে নিয়ে গেলেও ফটোতে প্রমাণ তো থাকবে। সন্তর্পনে রাতভর জেগে অপেক্ষা করলেও নিশির চেয়ে হিসির ডাকই আসত বেশি ! ওদিকে আবার দিনের শেষে যখন কোনো ডাকই আসলো না, postmanরা খানিক ফ্রাস্টু খেয়ে ফিকে পরে যাওয়া সেই ডাকবাক্সগুলোতে গুটখার পিক ফেলে ফেলে লোহার জং আর লাল রং সব এক করে দিল।

এখনকার মতন তখনও ডাকখানাকে পোস্টাপিস বলাটাই চল ছিল আর আমার মনে হত ওটা নিশ্চই অব্বুলিশের মতন উদ্ভট এক বাংলা শব্দ। আবার সেই নিল্ রঙের শুকনো আঠালাগানো চিঠি গুলোকে আমি অনেকদিন অব্দি ‘ইংল্যান্ড লেটার’ বলতাম ও ভাবতাম ইংরেজদের দেশে চিঠি পাঠাতে হলে এতে লেখা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। অদ্ভূত ভাবে ‘কেলেঙ্কারী’ আর ‘ফস্টিনস্টি’, এই শব্দ দুটি যতবার শুনতাম, মনে হত এরা দেশী নয়! এদের উত্পত্তি চেয়ার কিম্বা টেবিলের মতনই বিলেতি মুলুকে যা আমরা ধার নিয়ে বসে আছি। চিঠি লিখত বটে আমার ঠাকমা তার মেজদিকে, দেখলে পরে শর্টহ্যান্ড ফেল মেরে যাবে! দশ নয়ার পোস্টকার্ডে দুদিক মিলিয়ে মোটামুটি ৩ ছেলে, ৪ মেয়ে ও গোটা বিশেক নাতি নাতনিদের যাবতীয় খবরাখবর, মাথা পিছু এক লাইন বরাদ্দ – যেমন ‘বুবুর পেটটা ভালো যাচ্ছে না ‘, ‘বাচ্চু আবার ফেল করেছে ‘ ইত্যাদি। আবার গোপন কথাগুলো পেছনের দিকে খুদে খুদে হরফে আজব ভাবে লেখা থাকত – ‘সেই যারা ওইগুলো করে দেবেনা বলছিল তারা কি মত বদলেছে, যদি করে ফেলে তা তুমি আমাকে সত্তর জানালে আমি সেইভাবে বাকিগুলো করে ফেলতে পারি ‘, শালা কোথায় লাগে জার্মান সৈন্যদের সাঙ্কেতিক ভাষা। চিঠির শেষে ঠিকানাটাও খাস্তা – মেজদি , দারোগাবাড়ি , পোস্ট+টাউন+জেলা – মেদিনীপুর (তখন জেলাটা অবিভক্ত ছিলো )! পাড়ায় যে দোকানে গম ভাঙানো হত ঠিক সেই দোকানের বাইরেই টাঙানো থাকত লাল রঙের ডাক বাক্সটা। গম ভাঙিয়ে আটা বানানোর পরে দোকানের মালিক শম্ভুদা উপরি কালেকশন হিসেবে খুচরো পয়সা নেই বলে খদ্দেরদের এটা সেটা গছিয়ে দিতো, যেরকম আজ বড় শপিং মলের মুদি দোকানেরা আরো ব্যাপক ভাবে করে থাকে। আমিও ঠাকমার পোস্টকার্ড পোস্ট করার ফি বাবদ ৫ পয়সা বাগিয়ে শম্ভুদার দোকানের দুটো হজমি গুলি আর না হয় তিনটে মাছ লজেন্স কিনে বাড়ি ফিরতাম ।

মাল্টিমিডিয়ার হরেক মিডিয়া মানে টেক্সট, গ্রাফিক্স, অ্যানিমেশন, সাউন্ড ও মুভি, প্রত্যেকটাই তখনও সিঙ্গুলার ফর্মে বা ইচ্ছের বিন্যাসে একে অন্যের সাথে মিলেমিশে বহাল তবিয়তেই ছিলো। বৃষ্টি পড়লে এমনি দিনে এদের এক একটাই হয়ে উঠত ভীষণ ভাবে জীবনমুখী আবার পুজো পার্বনে এরাই জোট বেধে মন প্রাণ ছুঁয়ে মাতিয়ে যেত। কেউ আড্ডা মারত, কেউ শোনাত কবিতা। কারোর কাছে গান বা ছড়া, তো কারোর জন্য সেটা আর্ট এক্সিবিশন, সিনে ক্লাব কিম্বা মরশুম শেষে নাট্যমেলা ! টেক্সটে ফিরি, লেখালেখি বলতে প্রথমেই কেন কবিতার আগে চিঠি লিখেছিলাম, সেটা জানা নেই। চিঠি লেখালেখি যে কতটা সিরিয়াস হতে পারে ,তা ছোকরা ছোকরীদের মধ্যে চিঠি লিখে লিখে যোগাযোগ করার হিরিক দেখলেই বোঝা যেত। প্রসঙ্গত তখনও অলসেরা চির-অপেক্ষায় ছিল যে কবে এসেমেস আসবে, কবে হোয়াটসয়াপ হবে? চাপে পড়ে গেলে চিঠি লেখালেখির ফর্মাট ছিল তিন প্রকার – প্রথমটা দু পক্ষের জন্যেই বিরক্তিকর, কেননা সেটা ছিল নোটের খাতায় হরেকরকমের এপ্লিকেশন লিখে প্রাকটিস করা ও বর্ষশেষে পরীক্ষার পাতায় তা ওগরানো। এক কথায় ভাষা শিক্ষার দরুন না চাইলেও , ফাউতে মেলা পেশাদারী পানিশমেন্টর মতন। অবশ্য দ্বিতীয় দফায় দুই প্রান্তের লেখালিখিতে কিছু অনাবিল অপেশাদারী আনন্দও জড়ানো থাকত। ব্যক্তি বিশেষে উচ্চারণের দোষ থাকলে পরে তাকে বলা হত পেমপত্ত কিম্বা মাতৃভাষায় অরুচি ধরলে আমরা বলতাম ‘লব লেটার’। অমুকের হাতের লেখা ভালো তো তমুকের ভাষা জবরদস্ত , কোলাবরেটিভ এপ্রোচে কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা আনকোরা সেই প্রথম টেক্সট, ‘ তোকে স্বপ্নে দেখি, দেখতে পেয়েই আদিম ভোরে হাওড়া ব্রিজের ওপর থেকে লাফ মারলাম। ঝপাস করে পরলাম তবু মরলাম না! জ্ঞান ফিরল বাগবাজার ঘাটে, বুঝলাম আমায় টেনে তোলা হচ্ছে। ভিড়ের মাঝে আমি সেই সুধু তোকেই খুঁজছি, তুই ছিলি তো?’ এই ভাবে না জেনে, না শুনে, একে তাকে ধরে পাইকারী দরে চিত্তাকর্ষক চিঠি চালাচালি চলত ও সেই আলটপকা প্রতিযোগিতার পাস ফেলের খবর কোথাও ছাপানো হতনা। আর তৃতীয় কেসটি হচ্ছে দশ বারোটা চিঠি এদিক সেদিক বেছে পাঠানোর পরেও কাজ না হলে প্রেয়সীর বাপের নাম হাবি জাবি কাগজ ভরে বিয়ারিং চিঠি পাঠানো !

মনের কথা টেক্সট লিখে থুড়ি শব্দে জানাতে গেলে ডাইনোসররাও একসময়ে পাহাড়ের গায় আঁচর কেটে যেতো ! দুর্গম দেওয়ালে ডাইনো নখের আঁচররের দাগ এখনো জ্বল জ্বল করলেও , নাগরিক দেওয়ালে লেখা ঝাপসা লাল রঙের স্লোগান গুলোও বোধহয় ডাকবাক্সদের মতই অবসলিট হয়ে যাচ্ছে। হোয়াটসয়াপের জমানায় প্রাক পুরাতন টেক্সটগুলো বুঝি বেজায় অক্সিমরণ! মরণ বলতে মনে পড়ল, মরণদশা যেন হারুদার মতন না হয়। হারুদা আজকে সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকলেও থাকতে পারে কিন্ত খুঁজে পাই নি, নাম বদলে ফেলেছে হয়ত। এখনো ভাবি যে , সেই সময়ে ফেসবুক থাকলে পরে তার কীর্তিকলাপগুলো কেমন ভাইরাল হুল্লোড়টাই না মাচাতো! আপাতদৃষ্টিতে গোবেচারা ও ছাপোষা দেখতে হারুদা নামক এক বৈদ্যুতিন বিশারদের সাথে আমাদের অগ্রজপ্রতিম রূপকদার হাওড়া লাইনের লোকাল ট্রেনে সাক্ষাত হয়। যাত্রাপথে গায়ে পরে পরে সেই হারুদা দাদাকে জানায় যে তিনি ভিসিপি ও ভিসিআর সারিয়ে থাকেন ও হাঁক পারলেই লঞ্চ ধরে সে কিঞ্চিত সময়ের মধ্যেই সুদুর উত্তরপাড়া থেকে ব্যারাকপুরের যে কোনো প্রান্তে পৌছে যেতে পারেন। রূপকদা সব শুনে টুনে জানায় যে তার বাড়িতে ভিসিপি নেই। কিন্তু তা শুনে দমে না গিয়ে হারুদা ওই সাতটা স্টেশন কাটাতে কাটাতে রুপকদার গুষ্ঠী ও পরিচিতদের মধ্যে কার কার ভিসিপি ভিসিআর আছে তা জানার জন্য খামকা তুঘলকি আহ্লাদ করে যায় । ফিরে এসে, ট্রমা সামলানো সেই দাদা আমাদের ঘটনাটা জানিয়ে হারুদার ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিলেন যে কারো ভিসিপি ভিসিআর সারাতে হলে একে ফোন করিস, তবে জেনে রাখিস এ আমার মত শান্ত মানুষকেও আধ ঘন্টার যাত্রা পথে জেরবার করে ছেড়ে দিয়েছিল। সাবধান! এরকম চিন্টেগুড় মার্কা সাইকোর পাল্লায় পরা আর সুইসাইড করা কিন্তু একই ব্যাপার । ব্যাস আইস বাকেট চ্যালেঞ্জ কোথায় লাগে? হারুদার ভিসিপি ও ভিসিআর চ্যালেঞ্জ নিতে পরের দিন থেকেই অ্যাকশন শুরু। যাদের বাড়িতে ফোন আছে বা বাপের কোম্পানির দেওয়া বিনি পয়সার কানেকশন আছে , সবাই নিয়ম করে একবার ফোন করে ভুল ঠিকানায় হারুদাকে ভিসিপি সারাতে ডাকতে লাগলো । “হারুদা তুমি আসছে তো?” ছোকরা আবৃত্ত ছোকরী কণ্ঠে, উফ সে কি নিদারুন ডাক! জনৈক এক দাদাকে লোকাল ট্রেনে বসে দিমাগ চাটলে, উল্টোভাবে তত্কালীন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং যে কি নির্দয় ভাবে তার শোধ নিতে পারে তা হারুদা অবশ্য দু তিন দিনের মধ্যেই হাড়ে মজ্জায় টের পেলেন। আর পরবর্তীকালে সেই কিসসা শুনলে পরে যারা উদ্বুদ্ধ হতো তারা মস্তি লুটতে এক টাকা খরচ করে পাবলিক ফোন থেকে হারুদাকে জিগ্গেস করত , ” কি হারুদা , মেশিনটা ঠিক হলো?” প্রথম প্রথম ‘কোন মেশিন? কোন ঠিকানা?’ জাতীয় ভদ্র রেসপন্স এলেও পরে সেটা তীব্র রিঅ্যাকশনে পরিণত হয়েছিলো। ফোন লাগলেই শোনা যেত ‘ভিকিরির বাচ্চা, টিভি আছে বাড়িতে, যে ভিসিপি লাগাবি.. ‘ কিম্বা ‘ ওরে বাঙাল ,কাঙ্গাল মানে জানিস? তোর্ মেশিনতো ভেঙ্গে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছি, বাবাকে বল জলে নেমে পার্টস উদ্ধার করতে , তারপর নয় সারিয়ে দেবো । ‘

তারুণ্য ছাড়িয়ে যাওয়া বয়সন্ধিক্ষণে পড়তি বেলাতেও আমরা ‘ডাক ডাক কিসকো’ ডাক দিয়ে খেলার আগে নিজেদের দলভাগ করে নিতাম। একদিন বিকেলে ডাক শেষ হতেই , একটা প্যাকাটি মার্কা লোক এসে বলল , ‘সমানে সমানে দল ভাগ হলে , খেলাবেটা কে?”
আমরা বললাম ‘ স্যার আপনি খেলান না !’
” ঠিক আছে তাহলে আমিই রেফারি ?পকেটে বাঁশিটা নিয়েই এসেছিলুম আর স্যার ট্যার নয়, আমায় নবুদা বলেই ডাকিস ‘।

খেলার শেষে এক কোনে ডেকে, হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল একটা চটি বই, চে গুএভারার লেখা -’ডাক দিয়ে যাই’ । আজকাল নবুদাদেরও দেখিনা, চে গুএভারারাও আর ডাকে না। জঞ্জাল হাতরালে পরে পাই একদা সযত্নে লালিত ওই ডাকব্যাকের ব্যাগে রাখা হরেকরকমের ডাকটিকিটগুলো। ওদের রংগুলোও কিরকম ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

ডাক ডাক কিসকো
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments