কোলাহলটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। অন্তত: ত্রিশ চল্লিশ জন উত্তেজিত লোক ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে হাতে জ্বলন্ত মশাল, লাঠি, সোঁটা, বল্লম ইত্যাদি নিয়ে চিৎকার করতে করতে সিংহদরজা অতিক্রম করে দালানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জানালা দিয়ে ওদের দেখতে দেখতে আমি ভাবছিলাম, কি দুঃসাহস ওদের। কিছুদিন আগেও ওরা আমার ভয়ে থরথর করে কাঁপত। ওদের বাঁচা, মরা, ওঠা, বসা সবই আমার অঙ্গুলিহেলনে নিয়ন্ত্রিত হত। অথচ আজ অদৃষ্টের কি পরিহাস। আমার পা এর তলায় এতদিন যারা পচে মরত, তারাই আজ আমায় মারতে উদ্যত। হ্যাঁ, আমি আমার পরিণতি চোখের সামনে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। আজ এদের হাতেই আমাকে মরতে হবে। এদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করার জন্যে কেউই আর বেঁচে নেই। একটু আগেই আমার শেষ সহায়, আমার বিশ্বস্ত লেঠেল গগণকে আমার চোখের সামনে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে ওরা। জানালা দিয়ে অসহায় ভাবে দেখা ছাড়া আমি আর কিছুই করতে পারিনি। ওদের বাধা দেবার মত কোনও শক্তিই আজ আমার অবশিষ্ট নেই।

আমার হাতে আর বেশী সময় নেই। ওরা আমার ঘরের সামনে এসে বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করেছে। এই সামান্য দরজাটা ওদের আর বেশীক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা দরজা ভেঙ্গে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পরবে। একদিন যাঁর দাপটে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত, তাঁকে অসহায় ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে।

তবে এখানেই এর শেষ হবে না। এর প্রতিশোধ আমি নেবই। যাদের জন্যে আজ আমার এই অবস্থা তাদের আমি কখনই ছেড়ে দেব না। কোনওকালেই ছেড়ে দেব না।

                     

 

বহুদিন বাদে কোলকাতার কোলাহলমুখর সদাব্যস্ত পরিবেশের থেকে বহুদূরে, এই ছোট্ট মফস্বল শহরটাতে এসে সত্যিই ভীষণ ভাল লাগছে। সেই বিয়ের ঠিক পরে একবার বউকে নিয়ে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলাম। তারপর দেখতে দেখতে আড়াইটা বছর কেটে গেছে। কোলকাতার বাইরে আর কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি। খালি বাড়ি থেকে ক্লিনিক, ক্লিনিক থেকে হাসপাতাল আর হাসপাতাল থেকে বাড়ি, এই সাইক্লিক মোশন-এ ঘুরতে ঘুরতেই এতগুলো দিন কেটে গেছে। আসলে মাত্র বত্রিশ বছর বয়সেই কোলকাতার এক অন্যতম বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট হয়ে যাবার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যবশতঃ নতুন গাড়ী বা নিউটাউনে তিন বেডরুমের ফ্ল্যাট কিনে দিতে পারলেও, সুন্দরী বউকে সময় এতদিন একেবারেই দিতে পারিনি। অদিতি অবশ্য এটা নিয়ে আমাকে কোনও দিন কোনও রকম অভিযোগ করেনি। কিন্তু আমি-ই মনে মনে অনেক দিন ধরে ভাবছিলাম যদি কয়েকদিনের জন্যে ওকে নিয়ে বাইরে কোথাও একটা ঘুরে আসা যেত, তাহলে বেশ ভাল হত।

তাই পরশু বাবা যখন ব্রেকফাস্টের সময় বলল যে দেশের বাড়ি থেকে জ্যেঠু ফোন করে বলেছে যে পৈত্রিক আমবাগানটা বিক্রির ব্যাপারে বাবাকে একবার যেতে হবে, তখন আমি-ই প্রস্তাবটা দিলাম যে বাবা এখানেই থাকুক, বাবার বদলে আমি-ই বরং অদিতিকে নিয়ে একবার দিন তিনেকের জন্যে দেশের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। তবে প্রস্তাবটা দিয়েই একবার মনে হয়েছিল যে অদিতি কি পারবে কোলকাতা ছেড়ে ওখানে গিয়ে থাকতে? যে মেয়ে কোলকাতার পশ এলাকায় বড় হয়েছে, ছোটবেলা থেকে কনভেন্ট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করেছে, তার পক্ষে নিশ্চয়ই হঠাৎ করে কোলকাতার বাইরে এরকম একটা অজ পাড়াগাঁয়ে গিয়ে থাকতে ভীষণ অসুবিধা হবে। কিন্তু অবাক হয়ে গেলাম ওর উৎসাহ দেখে। অফুরন্ত এনার্জি নিয়ে সুটকেস গোছানো, কাজের মাসীদের ইন্সট্রাকশন দেওয়া, বাবাকে একলা থাকাকালীন যে যে ওষুধগুলো খেতে হবে, সেগুলো লিস্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া, দেশের বাড়িতে প্রথমবার যাচ্ছে বলে ওখানে জ্যেঠু, জ্যেঠীমনি, বড়দা, বৌদি আর ওদের পাঁচ বছরের ছেলে বুবুনের জন্যে একগাদা গিফ্ট কেনা এইসব কাজগুলো করল দুদিন ধরে। তারপরে আজ সকালে চা খেয়েই দুজনে নতুন কেনা অল্টোটায় করে বেরিয়ে পড়লাম।

ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে কোলকাতা থেকে প্রায় আড়াইশ কিমি দূরে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে সময় লাগলো চার ঘণ্টার একটু বেশী। এখানে পৌঁছতে না পৌঁছতে সবার আদর আপ্যায়ন, এতদিন না আসার জন্যে অভিযোগ, সামান্য জলখাবারের নামে ভুরিভোজ এসবের পাট চোকাতে চোকাতেই বেজে গেল সাড়ে বারটা। বুঝলাম আমি, ডঃ অর্ণব সেনগুপ্ত, কোলকাতায় যতই বিখ্যাত হয়ে যাই না কেন, এঁদের কাছে এখনও সেই ছোট্ট বাবাই-ই রয়ে গেছি। আর বিশ্বায়নের যুগে এই ছোট্ট মফস্বল শহরটা যতই আধুনিক হয়ে ওঠার চেষ্টা করুক না কেন, এখানকার মানুষগুলোর আন্তরিকতা রয়ে গেছে সেই আগেরই মত।

আশ্চর্য মেয়ে এই অদিতি। প্রথমবার এখানে এসেই এমনভাবে সবার সাথে মিশে গেল, যেন এঁদের সাথে ওর কতদিনের পরিচয়। একবার জ্যেঠীমনির জন্যে কেনা হারটা জ্যেঠীমনির গলায় পরিয়ে দিচ্ছে, পরক্ষণেই বৌদির সাথে কোলকাতার নতুন শপিং মলগুলোর গল্প জুড়ে দিচ্ছে। এই বুবুনের হাত ধরে দৌড়ে পুকুরপাড় থেকে ঘুরে আসছে, পরমুহূর্তেই জ্যেঠু আর বড়দার সাথে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নিজের সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করছে। সত্যিই এখানে এসে অদিতি যেন আবার নিজের কলেজের দিনগুলোতে ফিরে গেছে।

দুপুরে খেতে বসে বড়দার কাছে একটা খারাপ খবর শুনলাম। ছোটবেলায় যখন এখানে আসতাম, তখন আমি আর বড়দা পাশের বাড়ির মহিমজ্যেঠুর তিন ছেলের সাথে খুব খেলে বেড়াতাম। মহিমজ্যেঠুর ছোটছেলে পিনাকীদা ছিল আমার থেকে দুই বছরের বড়। সেই পিনাকীদা পড়াশোনার পর দিল্লীতে সেটল্ করেছিল। ওখানকারই এক বাঙ্গালী মেয়েকে সে বিয়ে করে। বিয়ের পর বউকে মানে অনন্যাবৌদিকে নিয়ে সে প্রথমবার এসেছিল নিজের বাড়িতে বেড়াতে। কিন্তু এখানে এসে প্রথমদিনেই বৌদি হঠাৎ করে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রায় সেন্সলেস অবস্থায় তাঁকে ভর্তি করানো হয় স্থানীয় হাসপাতালে। রাত হয়ে যাওয়ায় ঠিক করা হয় পরেরদিন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে কোলকাতায়। কিন্তু আশ্চর্য কাণ্ড। পরেরদিন সকালে দেখা যায় বেড খালি, পেশেন্ট উধাও। যদিও সরকারী হাসপাতাল, তবুও এতগুলো লোকের চোখের সামনে দিয়ে একজন কোমায় থাকা পেশেন্ট এর এরকম নিরুদ্দেশ হওয়াটা, এই শহরের নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রায় একটা তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার পরে প্রায় দুবছর কেটে গেছে, এখনও পর্যন্ত অনন্যাবৌদির কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পুলিশ বহুকাল আগেই হাল ছেড়ে দিয়েছে। এতদিন কেটে যাবার পরেও এখনও ছোট এই শহরটার অন্যতম আলোচ্য বিষয় হিসেবে থেকে গেছে এই ঘটনাটা।

মনে পড়ে গেল আগে পিনাকীদার সাথে আমার কি ভাবই না ছিল। দুজনের বয়সটা কাছাকাছি হওয়ায়, মনের মিলটাও ছিল সবথেকে বেশী। আজ যদিও বহুদিন হল পিনাকীদার সাথে কোনও যোগাযোগ নেই, তাও খবরটা শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ঠিক করলাম, সন্ধ্যেবেলা অদিতিকে নিয়ে একবার ঘুরে আসব মহিমজ্যেঠুদের বাড়ি থেকে।

 

 

বিয়ের পর আড়াইটা বছর ধরে খালি নিউটাউনে শ্বশুরবাড়ি থেকে সল্টলেকে বাপের বাড়ি আর উল্টোটা করে করে ভীষণ হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। ইচ্ছে থাকলেও ওর সাথে কোথাও বেড়াতে যাবার সুযোগ হয়ে উঠছিল না। সবথেকে মন খারাপ হত যখন ফেসবুকে অন্যান্য বান্ধবীদের, তাদের বরেদের সাথে আন্দামান, রাজস্থান, কেরল এমনকি বিদেশেও ঘুরে আসার ছবিগুলো দেখতাম। বন্ধুত্বের খাতিরে লাইক করতে বাধ্য হলেও, মনে মনে একটু হিংসে যে হত না, একথা বলাটা ঠিক হবে না। কিন্তু কিই বা করা যাবে? মনে মনে ভাবতাম সবার তো আর আমার মত কোলকাতার বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট ডঃ অর্ণব সেনগুপ্তর স্ত্রী হবার সৌভাগ্য হয় না। আমাকে তো এটুকু মানিয়ে নিতেই হবে। এরকম সময় ও যখন হঠাৎ করে ওদের দেশের বাড়িতে যাবার প্রস্তাবটা দিল, মনটা আনন্দে নেচে উঠেছিল। একবার অবশ্য মনে হয়েছিল, ঈশ, অন্য বান্ধবীদের কপালে আন্দামান, কেরল আর আমার বেলায় কিনা দেশের বাড়ি? কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, এটাই বা কম কিসে? ক’জনের আর পল্লিবাংলায় বেড়াতে যাবার সুযোগ হয়? ওখানে গিয়েই নাহয় কয়েকটা সেলফি তুলে পোস্ট করে দেব আমার ফেসবুক ওয়ালে। সাথে রবীন্দ্রনাথকে কোট করে “ধানের শীষে” “শিশির বিন্দু” এরকম জাতীয় কিছু একটা লিখে দিলেই অদিতি সেনগুপ্তের প্রোফাইলটা সুপারহিট হয়ে যাবে।

কিন্তু এখানে এসে দেখলাম না এলে সত্যিই ভীষণ ভুল করতাম। এত সুন্দর এই জায়গাটা। কোলকাতার দমবন্ধ করা পরিবেশের বাইরে স্নিগ্ধ ছিমছাম ছোট্ট এই শহরটায় এসে আমার সত্যিই মনটা ভরে গেল। এখানকার আকাশ যেন আমাকে বুকে জড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাল। বুক ভরে শ্বাস নিলাম এখানকার দূষণমুক্ত বাতাসে। শরীর মন জুড়িয়ে গেল। আর এখানকার লোকেরাও সবাই কত আন্তরিক। কত আদর করে এঁরা আমাকে কাছে টেনে নিল। জ্যেঠু, জ্যেঠীমনি যেন আমারই আরেক বাবা, মা। বৌদি যেন আমার নিজেরই দিদি। বড়দা তো আমরা আসছি বলে ছুটিই নিয়ে নিল। আর ছোট্ট বুবুনটা সেই যে আমার কোলে এসে বসলো, নামার আর নামই করছে না। এখানে এসে আমি যতটা আনন্দ পেলাম, আমার মনে হয় না, আন্দামান বা কেরলে গিয়ে এর থেকে বেশী আনন্দ হত।

Déjà vu বলে একটা শব্দ এতদিন বইতেই খালি পড়েছি। কিন্তু এখানে এসে যেন শব্দটা বাস্তবে ফিল করলাম। কেন জানি না, সর্বক্ষনই মনে হচ্ছে এই জায়গাটা যেন আমার কত পরিচিত। আমি আগেও যেন এসেছি এখানে। এখানকার আকাশ, বাতাস, গাছপালা, পশুপাখি সবই যেন কতদিন ধরে আমার আসার অপেক্ষা করে বসে ছিল। এই বাতাসে যেন আমি আগেও শ্বাস নিয়েছি। এখানকার মাটিতে আমি আগেও পা ফেলে হেঁটেছি। এখানকার গাছের তলায় বিশ্রাম করেছি। এই জায়গাটার প্রতিটা ইঞ্চিই যেন আমার চেনা। অথচ মজার ব্যাপার হল, আগে এখানে আসা তো দূরের কথা, এরকম যে একটা জায়গা আছে, সেটা আমি বিয়ের আগে জানতামই না।

হঠাৎ করে কেন জানি মনে হল, এত সুন্দর একটা শহর। এখানে একটা নদী থাকা উচিত। বৌদিকে জিজ্ঞেস করলাম কথাটা। বৌদি প্রথমে অবাক হয়ে গেল। বলল, “ও মা! তুমি জানলে কি করে?” তারপরে বলল যে সত্যিই নাকি এককালে এখানে একটা নদী ছিল। গঙ্গারই একটা উপনদী। কিন্তু বহুদিন হল নদীটা শুকিয়ে গেছে। এখন সেই জায়গায় পড়ে আছে মস্ত একটা চড়া। বর্ষাকালে তার মাঝখান দিয়ে একচিলতে জলের ধারা বয়ে যায়। লোকেরা শীতকালে সেখানে পিকনিক করতে যায়। আমার খুব ইচ্ছে হল একবার সেখান থেকে ঘুরে আসতে। বৌদিকে বলায় সেও এককথায় রাজী হয়ে গেল। ঠিক হল, কাল দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়া সেরে আমরা একবার নদীর চড়াটা থেকে ঘুরে আসব।

সন্ধ্যেবেলা গেলাম পাশের বাড়িতে মহিমজ্যেঠুদের ওখানে। সেখানে গিয়ে দুঃখের খবরটা শুনলাম। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। মহিমজ্যেঠুর স্ত্রী, পূর্ণিমাজ্যেঠীমনি ওঁদের ফ্যামিলি অ্যালবাম থেকে পিনাকীদা আর অনন্যাবৌদির ছবি দেখালেন। আহা রে! বৌদিকে কি মিষ্টিই না দেখতে। খুব চেনা চেনা লাগল বৌদিকে। মনে হল আগে নিশ্চয়ই কোথাও একটা দেখেছি। কিন্তু পরে শুনলাম যে বৌদি নাকি ছোটবেলা থেকে দিল্লীতেই বড় হয়েছে। বিয়ের পরেই প্রথম পশ্চিমবাংলায় এসেছিল, আর তখনই এই কাণ্ড। সত্যিই কখন যে কার জীবনে কি হয়ে যায়, কেউই তা বলতে পারে না।

রাতে শোবার আগে অর্ণব হঠাৎ বলল আমাকে নাকি খুব অন্যমনস্ক লাগছে। আমি নাকি মাঝে মাঝেই উদাস হয়ে কি সব ভাবছি। ডাকলে একবারে সাড়া দিচ্ছি না। একটু আগে নাকি আমি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গান গাইছিলাম। ও নাকি দু তিনবার আমাকে ডেকেছে, কিন্তু আমি কোনও সাড়া দিইনি। আমি শুনে বললাম, “ক্ষেপেছো নাকি তুমি! আজ অব্দি ঠিকঠাক সুরে সা রে গা মা টাই গেয়ে উঠতে পারলাম না! আর আমি নাকি গান গাইছিলাম”। শুনে অর্ণবও হা হা করে হেসে উঠল। সত্যি সত্যিই আমি গান গাইছিলাম কিনা জানি না, কিন্তু একটা কথা অর্ণবকে বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। সন্ধ্যেবেলা মহিমজ্যেঠুদের বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকেই আমার কেন জানি একটু ভয় ভয় করছে। খালি কিছুক্ষণ পর পর চোখের সামনে অনন্যাবৌদির মুখটা ভেসে উঠছে। বৌদি যেন আমাকে ডেকে বলছে, “বোন, চলে যা এখান থেকে! যত তাড়াতাড়ি পারিস চলে যা! তোর ভীষণ বিপদ”।

 

 

কাল সন্ধ্যেবেলা থেকেই অদিতিকে বেশ অন্যমনস্ক লাগছে। সারাক্ষণই একটা ঘোরের মধ্যে থাকছে। কি সব জানি ভেবে চলেছে। রাত্রিবেলা আবার জানলা ধরে কি একটা সুর গুনগুন করছিল। একটা গ্রাম্য সুর। টেনে টেনে বেশ সুরেই ও গুনগুন করছিল। আমি তো একটু অবাকই হয়ে গেলাম। কারণ আমার সুন্দরী স্ত্রীর আরও অনেক গুন থাকলেও, গুনগুন করার গুনটা আগে কোনদিনই লক্ষ করিনি। আর ওর গান গাইবার ক্ষমতা সম্বন্ধে ও নিজেও বেশ ওয়াকিবহাল। তাই বিয়ের পর এতদিনে আমি কখনই ওকে কোনও গান গাইবার চেষ্টা করতে দেখিনি। ওকে একথাটা বলতে ও যদিও হেসেই উড়িয়ে দিল। তবুও আমার কেন জানি একবার মনে হল যে ও আমাকে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। আমিও আর জোর করলাম না।

সকালবেলা আবার আরেক কাণ্ড। এমনিতে রোজ সকালে আটটার সময় আমাকে ক্লিনিকে বসতে হয় বলে আমি রোজ ছটায় ঘুম থেকে উঠে পড়ি। তারপরে স্নান টান সেরে সাতটার সময় আমিই ম্যাডামকে ডেকে তুলি। এখানে ক্লিনিকে যাবার তাড়া নেই, তাছাড়া এখানে ঠাণ্ডাটাও কোলকাতার থেকে বেশী। তাই ভেবেছিলাম আজ একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠবো। কিন্তু অ্যালার্ম না দেওয়া সত্ত্বেও রোজকার অভ্যেসবশতঃ আজও সেই ছটা দশেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। পাশ ফিরে দেখি অবাক কাণ্ড, অদিতি বিছানায় নেই। ভাবলাম নতুন জায়গা, হয়ত ঘুম ভাল হয়নি বলে তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছে। আমিও উঠে পড়লাম। বাইরে এসে দেখি বাড়িতে কেউই তখনও ওঠেনি। কিন্তু অদিতিকে কোথাও দেখতে পেলাম না। মেন গেট দিয়ে বাইরে এসে দেখি অদিতি বেশ দূরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে কোথায় যাচ্ছে। হাঁটার ধরণটা ভারী অদ্ভুত। খুব ধীরে ধীরে দুলে দুলে হাঁটছে। আমি পিছনে পিছনে এসে বেশ কয়েকবার ডাকলাম, কিন্তু ও কোনও সাড়া দিল না। কাছে এসে ওর হাতটা ধরতেই ও চমকে ফিরে তাকাল। আমি বললাম, “কোথায় যাচ্ছ?”। ও কেমন অবাক হয়ে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। যেন ও নিজেও বুঝতে পারছে না যে ও বিছানা ছেড়ে এখানে কি করে চলে এল। আমার মনে হল, ও যেন স্লিপওয়াক করছিল। এটা অবশ্য আশ্চর্যের কিছু না। অনেক সময় আচমকা পরিবেশের পরিবর্তনে অনেকের মধ্যেই কিছু কিছু অস্বাভাবিক সিম্পটম লক্ষ করা যায়। হয়ত ওর ক্ষেত্রেও এরকমই কিছু একটা হয়েছে।

দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়া সেরে আমি, অদিতি, বড়দা, বৌদি আর বুবুন, আমার গাড়ীতে করে বেরলাম নদীর চড়ের দিকে। আমি ছোটবেলা থেকে এতবার এখানে এসেছি, কিন্তু আগে কখনও শুনিনি যে এখানে একটা নদী ছিল। বাড়ি থেকে প্রায় তের কিমি দূরে নদীর চড়ায় সেই পিকনিক স্পটটায় এসে পৌঁছতে মিনিট পঁচিশ সময় লাগলো। বেরিয়েছিলাম যখন তখন আকাশ ছিল ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার। কিন্তু এখানে এসেই দেখি কালো মেঘে পুরো আকাশটা ছেয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সন্ধ্যে হলেই তেড়ে বৃষ্টি নামবে। ‘নভেম্বর রেন’ তাহলে খালি বিদেশে নয়, আমাদের গ্রামবাংলাতেও হয়।

উল্টোদিকে নদীর চড়াটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে একটা ছোটোখাটো জঙ্গল। বড়দা বলল সেই জঙ্গলে নাকি একটা পুরনো গড় রয়েছে। শুনেই আমার ইচ্ছে করল একবার গড়টা দেখে আসতে। অদিতিও দেখলাম রাজী। কিন্তু বৌদি একদম বেঁকে বসল। বড়দা হেসে বলল, “বাবাই, আসলে কি জানিস তো, এখানকার লোকেরা মনে করে যে ওই গড়ে নাকি অপদেবতা বাস করে। তাই তোর বৌদি যেতে চাইছে না”। শুনে আমি হো হো করে হেসে উঠে বললাম, “তাহলে তো এই সুযোগে অপদেবতাটার সাথে একবার দেখা করে আসা যাক, কি বল? কোলকাতায় থেকে তো এই সুযোগটা আর কোনদিনই পাব না”। বৌদি বলল, “না গো! আমি মোটেও সে জন্যে বারণ করছি না, আসলে এসব জায়গায় ভীষণ সাপের উপদ্রব কিনা, তাই”। আমি বললাম, “বৌদি, তুমি কিছু চিন্তা কর না, এখন শীতকাল, সাপেরা সবাই নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে। চল না, একবার চট করে দেখেই চলে আসব”। আমাদের সবার উৎসাহের কাছে বৌদির আপত্তি আর ধোপে টিকলো না। আমরা সবাই পা বাড়ালাম গড়ের দিকে।

নামেই গড়। আসলে একটা বড় বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই না। ভাঙ্গাচোরা একটা সিংহদরজা, ধ্বসে পড়া দেওয়াল, ভেঙ্গে পড়া কড়িবরগা, চতুর্দিকে আগাছা সব দেখে মনে হচ্ছিল কমসে কম একশ বছর ধরে বাড়িটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। চারিদিকে একটা অদ্ভুত থমথমে ভাব। আকাশ মেঘে ঢাকা থাকার জন্যে এই সাড়ে চারটের সময়ও একটা আলো আঁধারি পরিবেশ। মাঝে মাঝে কোথাও থেকে একটা তক্ষক ডেকে উঠছে। সবমিলিয়ে এই গড়টার সামনে দাঁড়িয়ে আমারও গা টা একটু ছমছম করছিল। সেই ভাবটা কাটানোর জন্যে আমি বললাম, “চল, একটু ভিতরে ঢুকে ঘরগুলো দেখে আসি”। দেখলাম কারোরই খুব একটা ইচ্ছে নেই, তবু আমি জোর করে সবাইকে নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। 

বেশীরভাগ ঘরগুলোরই দেওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে। আমরা মূল বারান্দাটা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগোচ্ছিলাম। একটা ঘর দেখে মনে হল যে সেটাই সবচেয়ে বড় ঘর। অথচ এই ঘরটাই সবচেয়ে অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। ঘরের ভিতরটা ভীষণ অন্ধকার। আমি বললাম, “এটা হয়ত সভাঘর টর জাতীয় কিছু হবে”। কড়িকাঠ থেকে একটা ঝাড়লন্ঠনের অবশিষ্টাংশ ঝুলছে। দেওয়ালগুলোতে এখনও কয়েকটা পোর্ট্রেট রয়েছে, যদিও সেগুলোতে একশ বছরের ধুলো জমে আছে। আশ্চর্য, এই ঘরটা এতটা অক্ষত, অথচ এর আশেপাশের সবকটা ঘরেরই ছাদ, দেওয়াল একদম ধ্বসে পড়েছে। আরও কিছুটা এগিয়ে দেখলাম দোতলায় ওঠার একটা ভাঙ্গাচোরা সিঁড়ি। ভাবছিলাম একবার দোতলায় ওঠার চেষ্টা করব নাকি, এমন সময় হঠাৎ বৌদি বলল, “আরে! অদিতি কোথায়? ওকে তো দেখতে পাচ্ছি না!”

চমকে তাকিয়ে দেখি অদিতি আমাদের সাথে নেই। আমার বুকের ভিতরটা কেন জানি হঠাৎ করে কেঁপে উঠল। ওকে ডাকতে ডাকতে কিছুটা পিছনে গিয়ে দেখি সভাঘরটার এক কোণে অদিতি স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়ে আছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একটা ছবির দিকে। কাছে গিয়ে ডাকলাম ওকে। কোনও সাড়া না পেয়ে কাঁধে একটা হাত রাখলাম। ও আস্তে আস্তে আমার দিকে ফিরে তাকাল। ওর মুখের দিকে তাকাতেই আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। দেখলাম ওর মুখটা একদম রক্তশূন্য, ফ্যাঁকাসে, চোখদুটো বিস্ফারিত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে, অদিতি, কি হয়েছে?” ও কোনও উত্তর না দিয়ে হাত বাড়িয়ে ছবিটার দিকে দেখাল। দেখে পুরনো কোনও রাজা বা জমিদারের পোর্ট্রেট বলে মনে হল। মনে হল অদিতি যেন কি বিড়বিড় করছে। ওর মুখের কাছে কানটা নিয়ে গিয়ে শুনলাম ও বলছে, “ভীষণ অন্ধকার এখানে। আমার খুব ভয় করছে। দরজাটা খুলছে না কেন? আমি বাইরে যাব, আমার ভীষণ ভয় করছে”। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

(আগামী পর্বে সমাপ্য)

পরের পর্ব

ডাক (শুরু)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments