কোলাহলটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। অন্তত: ত্রিশ চল্লিশ জন উত্তেজিত লোক ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে হাতে জ্বলন্ত মশাল, লাঠি, সোঁটা, বল্লম ইত্যাদি নিয়ে চিৎকার করতে করতে সিংহদরজা অতিক্রম করে দালানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জানালা দিয়ে ওদের দেখতে দেখতে আমি ভাবছিলাম, কি দুঃসাহস ওদের। কিছুদিন আগেও ওরা আমার ভয়ে থরথর করে কাঁপত। ওদের বাঁচা, মরা, ওঠা, বসা সবই আমার অঙ্গুলিহেলনে নিয়ন্ত্রিত হত। অথচ আজ অদৃষ্টের কি পরিহাস। আমার পা এর তলায় এতদিন যারা পচে মরত, তারাই আজ আমায় মারতে উদ্যত। হ্যাঁ, আমি আমার পরিণতি চোখের সামনে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। আজ এদের হাতেই আমাকে মরতে হবে। এদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করার জন্যে কেউই আর বেঁচে নেই। একটু আগেই আমার শেষ সহায়, আমার বিশ্বস্ত লেঠেল গগণকে আমার চোখের সামনে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে ওরা। জানালা দিয়ে অসহায় ভাবে দেখা ছাড়া আমি আর কিছুই করতে পারিনি। ওদের বাধা দেবার মত কোনও শক্তিই আজ আমার অবশিষ্ট নেই।

আমার হাতে আর বেশী সময় নেই। ওরা আমার ঘরের সামনে এসে বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করেছে। এই সামান্য দরজাটা ওদের আর বেশীক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা দরজা ভেঙ্গে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পরবে। একদিন যাঁর দাপটে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত, তাঁকে অসহায় ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে।

তবে এখানেই এর শেষ হবে না। এর প্রতিশোধ আমি নেবই। যাদের জন্যে আজ আমার এই অবস্থা তাদের আমি কখনই ছেড়ে দেব না। কোনওকালেই ছেড়ে দেব না।

                     

 

বহুদিন বাদে কোলকাতার কোলাহলমুখর সদাব্যস্ত পরিবেশের থেকে বহুদূরে, এই ছোট্ট মফস্বল শহরটাতে এসে সত্যিই ভীষণ ভাল লাগছে। সেই বিয়ের ঠিক পরে একবার বউকে নিয়ে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলাম। তারপর দেখতে দেখতে আড়াইটা বছর কেটে গেছে। কোলকাতার বাইরে আর কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি। খালি বাড়ি থেকে ক্লিনিক, ক্লিনিক থেকে হাসপাতাল আর হাসপাতাল থেকে বাড়ি, এই সাইক্লিক মোশন-এ ঘুরতে ঘুরতেই এতগুলো দিন কেটে গেছে। আসলে মাত্র বত্রিশ বছর বয়সেই কোলকাতার এক অন্যতম বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট হয়ে যাবার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যবশতঃ নতুন গাড়ী বা নিউটাউনে তিন বেডরুমের ফ্ল্যাট কিনে দিতে পারলেও, সুন্দরী বউকে সময় এতদিন একেবারেই দিতে পারিনি। অদিতি অবশ্য এটা নিয়ে আমাকে কোনও দিন কোনও রকম অভিযোগ করেনি। কিন্তু আমি-ই মনে মনে অনেক দিন ধরে ভাবছিলাম যদি কয়েকদিনের জন্যে ওকে নিয়ে বাইরে কোথাও একটা ঘুরে আসা যেত, তাহলে বেশ ভাল হত।

তাই পরশু বাবা যখন ব্রেকফাস্টের সময় বলল যে দেশের বাড়ি থেকে জ্যেঠু ফোন করে বলেছে যে পৈত্রিক আমবাগানটা বিক্রির ব্যাপারে বাবাকে একবার যেতে হবে, তখন আমি-ই প্রস্তাবটা দিলাম যে বাবা এখানেই থাকুক, বাবার বদলে আমি-ই বরং অদিতিকে নিয়ে একবার দিন তিনেকের জন্যে দেশের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। তবে প্রস্তাবটা দিয়েই একবার মনে হয়েছিল যে অদিতি কি পারবে কোলকাতা ছেড়ে ওখানে গিয়ে থাকতে? যে মেয়ে কোলকাতার পশ এলাকায় বড় হয়েছে, ছোটবেলা থেকে কনভেন্ট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করেছে, তার পক্ষে নিশ্চয়ই হঠাৎ করে কোলকাতার বাইরে এরকম একটা অজ পাড়াগাঁয়ে গিয়ে থাকতে ভীষণ অসুবিধা হবে। কিন্তু অবাক হয়ে গেলাম ওর উৎসাহ দেখে। অফুরন্ত এনার্জি নিয়ে সুটকেস গোছানো, কাজের মাসীদের ইন্সট্রাকশন দেওয়া, বাবাকে একলা থাকাকালীন যে যে ওষুধগুলো খেতে হবে, সেগুলো লিস্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া, দেশের বাড়িতে প্রথমবার যাচ্ছে বলে ওখানে জ্যেঠু, জ্যেঠীমনি, বড়দা, বৌদি আর ওদের পাঁচ বছরের ছেলে বুবুনের জন্যে একগাদা গিফ্ট কেনা এইসব কাজগুলো করল দুদিন ধরে। তারপরে আজ সকালে চা খেয়েই দুজনে নতুন কেনা অল্টোটায় করে বেরিয়ে পড়লাম।

ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে কোলকাতা থেকে প্রায় আড়াইশ কিমি দূরে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে সময় লাগলো চার ঘণ্টার একটু বেশী। এখানে পৌঁছতে না পৌঁছতে সবার আদর আপ্যায়ন, এতদিন না আসার জন্যে অভিযোগ, সামান্য জলখাবারের নামে ভুরিভোজ এসবের পাট চোকাতে চোকাতেই বেজে গেল সাড়ে বারটা। বুঝলাম আমি, ডঃ অর্ণব সেনগুপ্ত, কোলকাতায় যতই বিখ্যাত হয়ে যাই না কেন, এঁদের কাছে এখনও সেই ছোট্ট বাবাই-ই রয়ে গেছি। আর বিশ্বায়নের যুগে এই ছোট্ট মফস্বল শহরটা যতই আধুনিক হয়ে ওঠার চেষ্টা করুক না কেন, এখানকার মানুষগুলোর আন্তরিকতা রয়ে গেছে সেই আগেরই মত।

আশ্চর্য মেয়ে এই অদিতি। প্রথমবার এখানে এসেই এমনভাবে সবার সাথে মিশে গেল, যেন এঁদের সাথে ওর কতদিনের পরিচয়। একবার জ্যেঠীমনির জন্যে কেনা হারটা জ্যেঠীমনির গলায় পরিয়ে দিচ্ছে, পরক্ষণেই বৌদির সাথে কোলকাতার নতুন শপিং মলগুলোর গল্প জুড়ে দিচ্ছে। এই বুবুনের হাত ধরে দৌড়ে পুকুরপাড় থেকে ঘুরে আসছে, পরমুহূর্তেই জ্যেঠু আর বড়দার সাথে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নিজের সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করছে। সত্যিই এখানে এসে অদিতি যেন আবার নিজের কলেজের দিনগুলোতে ফিরে গেছে।

দুপুরে খেতে বসে বড়দার কাছে একটা খারাপ খবর শুনলাম। ছোটবেলায় যখন এখানে আসতাম, তখন আমি আর বড়দা পাশের বাড়ির মহিমজ্যেঠুর তিন ছেলের সাথে খুব খেলে বেড়াতাম। মহিমজ্যেঠুর ছোটছেলে পিনাকীদা ছিল আমার থেকে দুই বছরের বড়। সেই পিনাকীদা পড়াশোনার পর দিল্লীতে সেটল্ করেছিল। ওখানকারই এক বাঙ্গালী মেয়েকে সে বিয়ে করে। বিয়ের পর বউকে মানে অনন্যাবৌদিকে নিয়ে সে প্রথমবার এসেছিল নিজের বাড়িতে বেড়াতে। কিন্তু এখানে এসে প্রথমদিনেই বৌদি হঠাৎ করে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রায় সেন্সলেস অবস্থায় তাঁকে ভর্তি করানো হয় স্থানীয় হাসপাতালে। রাত হয়ে যাওয়ায় ঠিক করা হয় পরেরদিন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে কোলকাতায়। কিন্তু আশ্চর্য কাণ্ড। পরেরদিন সকালে দেখা যায় বেড খালি, পেশেন্ট উধাও। যদিও সরকারী হাসপাতাল, তবুও এতগুলো লোকের চোখের সামনে দিয়ে একজন কোমায় থাকা পেশেন্ট এর এরকম নিরুদ্দেশ হওয়াটা, এই শহরের নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রায় একটা তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার পরে প্রায় দুবছর কেটে গেছে, এখনও পর্যন্ত অনন্যাবৌদির কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পুলিশ বহুকাল আগেই হাল ছেড়ে দিয়েছে। এতদিন কেটে যাবার পরেও এখনও ছোট এই শহরটার অন্যতম আলোচ্য বিষয় হিসেবে থেকে গেছে এই ঘটনাটা।

মনে পড়ে গেল আগে পিনাকীদার সাথে আমার কি ভাবই না ছিল। দুজনের বয়সটা কাছাকাছি হওয়ায়, মনের মিলটাও ছিল সবথেকে বেশী। আজ যদিও বহুদিন হল পিনাকীদার সাথে কোনও যোগাযোগ নেই, তাও খবরটা শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ঠিক করলাম, সন্ধ্যেবেলা অদিতিকে নিয়ে একবার ঘুরে আসব মহিমজ্যেঠুদের বাড়ি থেকে।

 

 

বিয়ের পর আড়াইটা বছর ধরে খালি নিউটাউনে শ্বশুরবাড়ি থেকে সল্টলেকে বাপের বাড়ি আর উল্টোটা করে করে ভীষণ হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। ইচ্ছে থাকলেও ওর সাথে কোথাও বেড়াতে যাবার সুযোগ হয়ে উঠছিল না। সবথেকে মন খারাপ হত যখন ফেসবুকে অন্যান্য বান্ধবীদের, তাদের বরেদের সাথে আন্দামান, রাজস্থান, কেরল এমনকি বিদেশেও ঘুরে আসার ছবিগুলো দেখতাম। বন্ধুত্বের খাতিরে লাইক করতে বাধ্য হলেও, মনে মনে একটু হিংসে যে হত না, একথা বলাটা ঠিক হবে না। কিন্তু কিই বা করা যাবে? মনে মনে ভাবতাম সবার তো আর আমার মত কোলকাতার বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট ডঃ অর্ণব সেনগুপ্তর স্ত্রী হবার সৌভাগ্য হয় না। আমাকে তো এটুকু মানিয়ে নিতেই হবে। এরকম সময় ও যখন হঠাৎ করে ওদের দেশের বাড়িতে যাবার প্রস্তাবটা দিল, মনটা আনন্দে নেচে উঠেছিল। একবার অবশ্য মনে হয়েছিল, ঈশ, অন্য বান্ধবীদের কপালে আন্দামান, কেরল আর আমার বেলায় কিনা দেশের বাড়ি? কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, এটাই বা কম কিসে? ক’জনের আর পল্লিবাংলায় বেড়াতে যাবার সুযোগ হয়? ওখানে গিয়েই নাহয় কয়েকটা সেলফি তুলে পোস্ট করে দেব আমার ফেসবুক ওয়ালে। সাথে রবীন্দ্রনাথকে কোট করে “ধানের শীষে” “শিশির বিন্দু” এরকম জাতীয় কিছু একটা লিখে দিলেই অদিতি সেনগুপ্তের প্রোফাইলটা সুপারহিট হয়ে যাবে।

কিন্তু এখানে এসে দেখলাম না এলে সত্যিই ভীষণ ভুল করতাম। এত সুন্দর এই জায়গাটা। কোলকাতার দমবন্ধ করা পরিবেশের বাইরে স্নিগ্ধ ছিমছাম ছোট্ট এই শহরটায় এসে আমার সত্যিই মনটা ভরে গেল। এখানকার আকাশ যেন আমাকে বুকে জড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাল। বুক ভরে শ্বাস নিলাম এখানকার দূষণমুক্ত বাতাসে। শরীর মন জুড়িয়ে গেল। আর এখানকার লোকেরাও সবাই কত আন্তরিক। কত আদর করে এঁরা আমাকে কাছে টেনে নিল। জ্যেঠু, জ্যেঠীমনি যেন আমারই আরেক বাবা, মা। বৌদি যেন আমার নিজেরই দিদি। বড়দা তো আমরা আসছি বলে ছুটিই নিয়ে নিল। আর ছোট্ট বুবুনটা সেই যে আমার কোলে এসে বসলো, নামার আর নামই করছে না। এখানে এসে আমি যতটা আনন্দ পেলাম, আমার মনে হয় না, আন্দামান বা কেরলে গিয়ে এর থেকে বেশী আনন্দ হত।

Déjà vu বলে একটা শব্দ এতদিন বইতেই খালি পড়েছি। কিন্তু এখানে এসে যেন শব্দটা বাস্তবে ফিল করলাম। কেন জানি না, সর্বক্ষনই মনে হচ্ছে এই জায়গাটা যেন আমার কত পরিচিত। আমি আগেও যেন এসেছি এখানে। এখানকার আকাশ, বাতাস, গাছপালা, পশুপাখি সবই যেন কতদিন ধরে আমার আসার অপেক্ষা করে বসে ছিল। এই বাতাসে যেন আমি আগেও শ্বাস নিয়েছি। এখানকার মাটিতে আমি আগেও পা ফেলে হেঁটেছি। এখানকার গাছের তলায় বিশ্রাম করেছি। এই জায়গাটার প্রতিটা ইঞ্চিই যেন আমার চেনা। অথচ মজার ব্যাপার হল, আগে এখানে আসা তো দূরের কথা, এরকম যে একটা জায়গা আছে, সেটা আমি বিয়ের আগে জানতামই না।

হঠাৎ করে কেন জানি মনে হল, এত সুন্দর একটা শহর। এখানে একটা নদী থাকা উচিত। বৌদিকে জিজ্ঞেস করলাম কথাটা। বৌদি প্রথমে অবাক হয়ে গেল। বলল, “ও মা! তুমি জানলে কি করে?” তারপরে বলল যে সত্যিই নাকি এককালে এখানে একটা নদী ছিল। গঙ্গারই একটা উপনদী। কিন্তু বহুদিন হল নদীটা শুকিয়ে গেছে। এখন সেই জায়গায় পড়ে আছে মস্ত একটা চড়া। বর্ষাকালে তার মাঝখান দিয়ে একচিলতে জলের ধারা বয়ে যায়। লোকেরা শীতকালে সেখানে পিকনিক করতে যায়। আমার খুব ইচ্ছে হল একবার সেখান থেকে ঘুরে আসতে। বৌদিকে বলায় সেও এককথায় রাজী হয়ে গেল। ঠিক হল, কাল দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়া সেরে আমরা একবার নদীর চড়াটা থেকে ঘুরে আসব।

সন্ধ্যেবেলা গেলাম পাশের বাড়িতে মহিমজ্যেঠুদের ওখানে। সেখানে গিয়ে দুঃখের খবরটা শুনলাম। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। মহিমজ্যেঠুর স্ত্রী, পূর্ণিমাজ্যেঠীমনি ওঁদের ফ্যামিলি অ্যালবাম থেকে পিনাকীদা আর অনন্যাবৌদির ছবি দেখালেন। আহা রে! বৌদিকে কি মিষ্টিই না দেখতে। খুব চেনা চেনা লাগল বৌদিকে। মনে হল আগে নিশ্চয়ই কোথাও একটা দেখেছি। কিন্তু পরে শুনলাম যে বৌদি নাকি ছোটবেলা থেকে দিল্লীতেই বড় হয়েছে। বিয়ের পরেই প্রথম পশ্চিমবাংলায় এসেছিল, আর তখনই এই কাণ্ড। সত্যিই কখন যে কার জীবনে কি হয়ে যায়, কেউই তা বলতে পারে না।

রাতে শোবার আগে অর্ণব হঠাৎ বলল আমাকে নাকি খুব অন্যমনস্ক লাগছে। আমি নাকি মাঝে মাঝেই উদাস হয়ে কি সব ভাবছি। ডাকলে একবারে সাড়া দিচ্ছি না। একটু আগে নাকি আমি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গান গাইছিলাম। ও নাকি দু তিনবার আমাকে ডেকেছে, কিন্তু আমি কোনও সাড়া দিইনি। আমি শুনে বললাম, “ক্ষেপেছো নাকি তুমি! আজ অব্দি ঠিকঠাক সুরে সা রে গা মা টাই গেয়ে উঠতে পারলাম না! আর আমি নাকি গান গাইছিলাম”। শুনে অর্ণবও হা হা করে হেসে উঠল। সত্যি সত্যিই আমি গান গাইছিলাম কিনা জানি না, কিন্তু একটা কথা অর্ণবকে বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। সন্ধ্যেবেলা মহিমজ্যেঠুদের বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকেই আমার কেন জানি একটু ভয় ভয় করছে। খালি কিছুক্ষণ পর পর চোখের সামনে অনন্যাবৌদির মুখটা ভেসে উঠছে। বৌদি যেন আমাকে ডেকে বলছে, “বোন, চলে যা এখান থেকে! যত তাড়াতাড়ি পারিস চলে যা! তোর ভীষণ বিপদ”।

 

 

কাল সন্ধ্যেবেলা থেকেই অদিতিকে বেশ অন্যমনস্ক লাগছে। সারাক্ষণই একটা ঘোরের মধ্যে থাকছে। কি সব জানি ভেবে চলেছে। রাত্রিবেলা আবার জানলা ধরে কি একটা সুর গুনগুন করছিল। একটা গ্রাম্য সুর। টেনে টেনে বেশ সুরেই ও গুনগুন করছিল। আমি তো একটু অবাকই হয়ে গেলাম। কারণ আমার সুন্দরী স্ত্রীর আরও অনেক গুন থাকলেও, গুনগুন করার গুনটা আগে কোনদিনই লক্ষ করিনি। আর ওর গান গাইবার ক্ষমতা সম্বন্ধে ও নিজেও বেশ ওয়াকিবহাল। তাই বিয়ের পর এতদিনে আমি কখনই ওকে কোনও গান গাইবার চেষ্টা করতে দেখিনি। ওকে একথাটা বলতে ও যদিও হেসেই উড়িয়ে দিল। তবুও আমার কেন জানি একবার মনে হল যে ও আমাকে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। আমিও আর জোর করলাম না।

সকালবেলা আবার আরেক কাণ্ড। এমনিতে রোজ সকালে আটটার সময় আমাকে ক্লিনিকে বসতে হয় বলে আমি রোজ ছটায় ঘুম থেকে উঠে পড়ি। তারপরে স্নান টান সেরে সাতটার সময় আমিই ম্যাডামকে ডেকে তুলি। এখানে ক্লিনিকে যাবার তাড়া নেই, তাছাড়া এখানে ঠাণ্ডাটাও কোলকাতার থেকে বেশী। তাই ভেবেছিলাম আজ একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠবো। কিন্তু অ্যালার্ম না দেওয়া সত্ত্বেও রোজকার অভ্যেসবশতঃ আজও সেই ছটা দশেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। পাশ ফিরে দেখি অবাক কাণ্ড, অদিতি বিছানায় নেই। ভাবলাম নতুন জায়গা, হয়ত ঘুম ভাল হয়নি বলে তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছে। আমিও উঠে পড়লাম। বাইরে এসে দেখি বাড়িতে কেউই তখনও ওঠেনি। কিন্তু অদিতিকে কোথাও দেখতে পেলাম না। মেন গেট দিয়ে বাইরে এসে দেখি অদিতি বেশ দূরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে কোথায় যাচ্ছে। হাঁটার ধরণটা ভারী অদ্ভুত। খুব ধীরে ধীরে দুলে দুলে হাঁটছে। আমি পিছনে পিছনে এসে বেশ কয়েকবার ডাকলাম, কিন্তু ও কোনও সাড়া দিল না। কাছে এসে ওর হাতটা ধরতেই ও চমকে ফিরে তাকাল। আমি বললাম, “কোথায় যাচ্ছ?”। ও কেমন অবাক হয়ে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। যেন ও নিজেও বুঝতে পারছে না যে ও বিছানা ছেড়ে এখানে কি করে চলে এল। আমার মনে হল, ও যেন স্লিপওয়াক করছিল। এটা অবশ্য আশ্চর্যের কিছু না। অনেক সময় আচমকা পরিবেশের পরিবর্তনে অনেকের মধ্যেই কিছু কিছু অস্বাভাবিক সিম্পটম লক্ষ করা যায়। হয়ত ওর ক্ষেত্রেও এরকমই কিছু একটা হয়েছে।

দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়া সেরে আমি, অদিতি, বড়দা, বৌদি আর বুবুন, আমার গাড়ীতে করে বেরলাম নদীর চড়ের দিকে। আমি ছোটবেলা থেকে এতবার এখানে এসেছি, কিন্তু আগে কখনও শুনিনি যে এখানে একটা নদী ছিল। বাড়ি থেকে প্রায় তের কিমি দূরে নদীর চড়ায় সেই পিকনিক স্পটটায় এসে পৌঁছতে মিনিট পঁচিশ সময় লাগলো। বেরিয়েছিলাম যখন তখন আকাশ ছিল ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার। কিন্তু এখানে এসেই দেখি কালো মেঘে পুরো আকাশটা ছেয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সন্ধ্যে হলেই তেড়ে বৃষ্টি নামবে। ‘নভেম্বর রেন’ তাহলে খালি বিদেশে নয়, আমাদের গ্রামবাংলাতেও হয়।

উল্টোদিকে নদীর চড়াটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে একটা ছোটোখাটো জঙ্গল। বড়দা বলল সেই জঙ্গলে নাকি একটা পুরনো গড় রয়েছে। শুনেই আমার ইচ্ছে করল একবার গড়টা দেখে আসতে। অদিতিও দেখলাম রাজী। কিন্তু বৌদি একদম বেঁকে বসল। বড়দা হেসে বলল, “বাবাই, আসলে কি জানিস তো, এখানকার লোকেরা মনে করে যে ওই গড়ে নাকি অপদেবতা বাস করে। তাই তোর বৌদি যেতে চাইছে না”। শুনে আমি হো হো করে হেসে উঠে বললাম, “তাহলে তো এই সুযোগে অপদেবতাটার সাথে একবার দেখা করে আসা যাক, কি বল? কোলকাতায় থেকে তো এই সুযোগটা আর কোনদিনই পাব না”। বৌদি বলল, “না গো! আমি মোটেও সে জন্যে বারণ করছি না, আসলে এসব জায়গায় ভীষণ সাপের উপদ্রব কিনা, তাই”। আমি বললাম, “বৌদি, তুমি কিছু চিন্তা কর না, এখন শীতকাল, সাপেরা সবাই নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে। চল না, একবার চট করে দেখেই চলে আসব”। আমাদের সবার উৎসাহের কাছে বৌদির আপত্তি আর ধোপে টিকলো না। আমরা সবাই পা বাড়ালাম গড়ের দিকে।

নামেই গড়। আসলে একটা বড় বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই না। ভাঙ্গাচোরা একটা সিংহদরজা, ধ্বসে পড়া দেওয়াল, ভেঙ্গে পড়া কড়িবরগা, চতুর্দিকে আগাছা সব দেখে মনে হচ্ছিল কমসে কম একশ বছর ধরে বাড়িটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। চারিদিকে একটা অদ্ভুত থমথমে ভাব। আকাশ মেঘে ঢাকা থাকার জন্যে এই সাড়ে চারটের সময়ও একটা আলো আঁধারি পরিবেশ। মাঝে মাঝে কোথাও থেকে একটা তক্ষক ডেকে উঠছে। সবমিলিয়ে এই গড়টার সামনে দাঁড়িয়ে আমারও গা টা একটু ছমছম করছিল। সেই ভাবটা কাটানোর জন্যে আমি বললাম, “চল, একটু ভিতরে ঢুকে ঘরগুলো দেখে আসি”। দেখলাম কারোরই খুব একটা ইচ্ছে নেই, তবু আমি জোর করে সবাইকে নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। 

বেশীরভাগ ঘরগুলোরই দেওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে। আমরা মূল বারান্দাটা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগোচ্ছিলাম। একটা ঘর দেখে মনে হল যে সেটাই সবচেয়ে বড় ঘর। অথচ এই ঘরটাই সবচেয়ে অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। ঘরের ভিতরটা ভীষণ অন্ধকার। আমি বললাম, “এটা হয়ত সভাঘর টর জাতীয় কিছু হবে”। কড়িকাঠ থেকে একটা ঝাড়লন্ঠনের অবশিষ্টাংশ ঝুলছে। দেওয়ালগুলোতে এখনও কয়েকটা পোর্ট্রেট রয়েছে, যদিও সেগুলোতে একশ বছরের ধুলো জমে আছে। আশ্চর্য, এই ঘরটা এতটা অক্ষত, অথচ এর আশেপাশের সবকটা ঘরেরই ছাদ, দেওয়াল একদম ধ্বসে পড়েছে। আরও কিছুটা এগিয়ে দেখলাম দোতলায় ওঠার একটা ভাঙ্গাচোরা সিঁড়ি। ভাবছিলাম একবার দোতলায় ওঠার চেষ্টা করব নাকি, এমন সময় হঠাৎ বৌদি বলল, “আরে! অদিতি কোথায়? ওকে তো দেখতে পাচ্ছি না!”

চমকে তাকিয়ে দেখি অদিতি আমাদের সাথে নেই। আমার বুকের ভিতরটা কেন জানি হঠাৎ করে কেঁপে উঠল। ওকে ডাকতে ডাকতে কিছুটা পিছনে গিয়ে দেখি সভাঘরটার এক কোণে অদিতি স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়ে আছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একটা ছবির দিকে। কাছে গিয়ে ডাকলাম ওকে। কোনও সাড়া না পেয়ে কাঁধে একটা হাত রাখলাম। ও আস্তে আস্তে আমার দিকে ফিরে তাকাল। ওর মুখের দিকে তাকাতেই আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। দেখলাম ওর মুখটা একদম রক্তশূন্য, ফ্যাঁকাসে, চোখদুটো বিস্ফারিত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে, অদিতি, কি হয়েছে?” ও কোনও উত্তর না দিয়ে হাত বাড়িয়ে ছবিটার দিকে দেখাল। দেখে পুরনো কোনও রাজা বা জমিদারের পোর্ট্রেট বলে মনে হল। মনে হল অদিতি যেন কি বিড়বিড় করছে। ওর মুখের কাছে কানটা নিয়ে গিয়ে শুনলাম ও বলছে, “ভীষণ অন্ধকার এখানে। আমার খুব ভয় করছে। দরজাটা খুলছে না কেন? আমি বাইরে যাব, আমার ভীষণ ভয় করছে”। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

 

 

– “শ্যামলী, ও শ্যামলী! বলি তোর হ’ল?”

দিদি ডাকচে। বললুম, “হ্যাঁ রে দিদি, এই হ’ল বলে, চুলটা বেঁধেই আসচি”।

দিদি বললে, “তাড়াতাড়ি কর বোন, গগণজ্যেঠু এসেচে। আমাদের নিয়ে যাবে বলে অপেক্ষা করচে”।

গগণজ্যেঠুকে রাজাবাবু পাঠিয়েচেন। রাজাবাবু হলেন আমাদের গেরামের জমিদার। খুব ভালোমানুষ। আমার বাবা তাঁর বাড়িতে নিত্যিপূজা করেন। তাঁর আর কেউই বেঁচে নাই। সবাই মারা গিয়েচে। আমাকে আর আমার দিদিকে তিনি বড় ভালবাসেন। আমাদের মা বলে ডাকেন। আমরা তাঁকে গান শুনাই। তিনি আমাদের গান শুনতে খুব পছন্দ করেন। তিনি আমাদের বাবাকেও বড় স্নেহ করেন। আমরা গরিব বলে আমাদের তিনি অনেক সাহায্য করেন। আমার বাবাও তাঁকে খুব ভক্তি করেন। বাবা বলেন কোম্পানির আমলে এই গোটা দেশে তাঁর মত ভালোমানুষ আর দুটো নাই। তবুও লোকে কেন জানি তাঁর সমন্ধে মন্দ কথা বলে। বাবা এতে ভারী কষ্ট পান।

আজ কালীপূজা। বাবা তাই পাশের গেরামে গেচেন পূজা করতে। আজ রাতে আর ফিরবেন না। তাই জন্যে রাজাবাবু আজ রাতে তাঁর বাড়িতে আমাদের থাকতে বলেচেন। তিনি বলেচেন আজ সারা রাত তিনি আমাদের সাথে গল্প করবেন আর আমাদের গান শুনবেন। গগণজ্যেঠু আমাদের তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাবে বলে এসেচে।

চুল বেঁধে একটা ছোট টিপ লাগিয়ে বাইরে আসতেই দিদি বললে, “বাঃ রে বোন, তোকে তো আজ ভারী মিষ্টি লাগচে। আয় তোকে একটা কাজলের ফোঁটা দিয়ে দিই, যাতে কারোর নজর না লেগে যায়।” সবাই বলে আমাকে নাকি দেখতে খুব সুন্দর। কিন্তু আমি জানি, আমার দিদি আমার চেয়েও বেশী ভালো দেখতে। আমার বাবা গরিব ব্রাহ্মণ। লোকের বাড়ি পূজাআচ্চা করে যা পান তাই দিয়ে কোনওমতে আমাদের তিনজনের দিন চলে। মাকে আমার একেবারেই মনে নাই। আমি যখন খুব ছোট, তখন মা মারা যান। সেই থেকে আমরা দুটি বোন বাবার সাথে থাকি। আমার দিদির বয়স আঠার আর আমার ষোল। আমাদের এখনও বিয়ে হয়নি। লোকে বাবাকে এই নিয়ে নানা কথা বলে। বাবা বলেন তিনি গরিব, বিয়েতে কিছু দেবার সামর্থ্য তাঁর নাই। তাই নাকি আমাদের বিয়ে হয় না। কিন্তু আমরা জানি আসলে বাবা আমাদের এত ভালবাসেন যে আমাদের ছাড়া একদণ্ডও থাকতে পারেন না। তাই তিনি আমাদের বিয়ে দেবার তত চেষ্টাও করেন না।

আমরা এই গেরামে নতুন এসেচি। আমরা আগে পাশের গেরামে থাকতাম। গেল মাসেই রাজাবাবু বাবাকে তাঁর বাড়িতে নিত্যিপূজা করার জন্যে ডেকে পাঠান। তিনিই তাঁর বাড়ির কাছে নদীর ধারে আমাদের জন্যে একটা ঘর বেঁধে দেন। সেই থেকে আমরা এই গেরামেই থাকি।

আমি আর দিদি গগণজ্যেঠুর সাথে রাজাবাবুর বাড়িতে এলুম। রাজাবাবু আমাদের জন্যে দরবার ঘরে অপেক্ষা করচিলেন। আমাদের দেখেই বললেন, “আয় আয় মা! তোদের জন্যেই বসে আছি। আজ কিন্তু এই বুড়োমানুষটাকে অনেকগুলো গান শোনাতে হবে।” দিদি বললে, “ঠিক আছে, শুনাব ‘খন”। রাজাবাবু আমাদের মিষ্টি আর শরবত খেতে দিলেন। মিষ্টি আর শরবত খেয়ে যেন শরীর মন সব জুড়িয়ে গেল। খাওয়ার পর রাজাবাবু বললেন, “মা, আমি ছোট করে কালীপূজার আয়োজন করেছি। তোদের আজ মা-এর সামনে শ্যামাসঙ্গীত গাইতে হবে, পারবি তো?” আমরা হেসে বললুম, “পারব”। তিনি তখন বললেন, “চল তবে, মা-এর কাছে যাই।” আমার চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসচিল। কোনও মতে তাঁর সাথে চললুম। তিনি তাঁর বড় ছবিটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ছবিটাকে একটু সরিয়ে তার পিছনে একটা কল ঘোরাতেই পাশের দেওয়ালটা ঘড়ঘড় শব্দ করে সরে গেল। অবাক হয়ে দেখলুম, দেওয়ালের পিছন থেকে কয়েক ধাপ সিঁড়ি নীচে নেমে গেছে। সিঁড়ির শেষে একটা ছোট মতন ঘর। সেখানে একটা কালীমূর্তি। মূর্তির সামনে একটা পিদিম জ্বলছে। উনি বললেন, "আয় মা! আমার পিছনে পিছনে সাবধানে আয়!”। বলে তিনি সিঁড়ি দিয়ে নেমে মূর্তির সামনে গিয়ে বসলেন। আমরাও তাঁর পিছনে এসে বসলুম। তিনি বললেন গান শুরু করতে। আমি আর দিদি শ্যামাসঙ্গীত গাইতে শুরু করলুম।

দুটো গান শেষ হতে না হতেই আমার খুব ঘুম পেতে লাগল। এমন সময় রাজাবাবু বললেন, “একটু বস তোরা, আমি নৈবিদ্যর থালিটা নিয়ে আসি। এই যাব আর আসব”। বলে তিনি পিদিমটা নিয়ে বাইরে গেলেন। ঘরের ভিতরটা ভীষণ অন্ধকার হয়ে গেল। দরজার বাইরে থেকে যেটুকু আলো আসচে তাতে যতটুকু যা দেখা যায়। হঠাৎ ঘড়ঘড় শব্দ শুনে চমকে তাকিয়ে দেখি দেওয়ালটা বন্ধ হয়ে যাচ্চে। আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলুম। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলুম, কিন্তু মাথাটা ঘুরে গেল। তাকিয়ে দেখি দিদিও ওঠার চেষ্টা করচে, কিন্তু পারচে না। দেখতে দেখতে আমাদের চোখের সামনে দেওয়ালটা বন্ধ হয়ে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমরা নিজেদেরই দেখতে পারচিলুম না। ভয়ে আমি আর দিদি চিৎকার করে কেঁদে উঠলুম। বারবার ডাকলুম রাজাবাবুকে, কিন্তু তাঁর কোনও সাড়া পেলুম না। আমার চোখ বুজে আসতে লাগল ঘুমে। কিছুতেই আমি চোখ খুলে রাখতে পারচি না। কেন আমার এত ঘুম পাচ্চে? কেঁদে কেঁদে দিদিকে বললুম, “দিদি, ভীষণ অন্ধকার এখানে। আমার খুব ভয় করচে। দরজাটা খুলচে না কেন? আমি বাইরে যাব, আমার ভীষণ ভয় করচে”।

 

 

নিজের গোঁয়ার্তুমির জন্যে আমার নিজেরই নিজের ওপরে প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। আমিই শুধু শুধু জিদ করে সবাইকে নিয়ে গড় দেখতে ঢুকেছিলাম বলে আজ অদিতির এই অবস্থা। কোনওমতে অদিতিকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই গোঁদের ওপর বিষফোঁড়ার মত শুরু হয়েছে মুষলধারে বৃষ্টি। ভেবেছিলাম ওকে নিয়ে আজ রাতেই রওয়ানা দেব কোলকাতায়। কিন্তু এরকম বৃষ্টিতে এতটা রাস্তা ড্রাইভ করে যাওয়াটাও রিস্কি হয়ে যাবে। তার ওপরে আজ নাকি আবার অমাবস্যা। তাই সবাই বলল আজ রাতটা কোনও ভাবে এখানে কাটিয়ে কাল ভোরে বেড়িয়ে পড়তে। আমার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু সবার চাপে থেকে যেতে বাধ্য হলাম।

অদিতিকে প্রাইমারি চেকআপ করে দেখলাম যে এমনিতে সব ঠিকই আছে, খালি প্রেশারটা খুব ফল করে গেছে। মনে হয় কোনও কারণে ওর ভীষণ বড় একটা প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে। খুব খারাপ লাগছিল ওর জন্যে। বেচারি, আমার জন্যেই কোলকাতার স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে এই অজ পাড়াগাঁয়ে বেড়াতে এসে এরকম একটা বিপদে পড়ল। কেন যে ওকে নিয়ে আসতে গেলাম এখানে।

রাতে যা হোক করে দুটো ভাত মুখে দিয়ে এসে দেখি অদিতি অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ভাবলাম আজ রাতটা আর না ঘুমিয়ে জেগেই কাটিয়ে দেব। রাতে যদি কোনও দরকার পড়ে। রাত জাগার জন্যে সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে থ্রিলার জাতীয় কিছু পড়া। তাই একটা অগাথা ক্রিস্টি খুলে বসলাম। পড়ায় মন বসছিল না, তবুও চেষ্টা চালিয়ে গেলাম পড়ার।

পড়তে পড়তে কখন যে চোখ লেগে গেছিল টের পাইনি। হঠাৎ একটা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখলাম অদিতি বিছানায় উঠে বসেছে। হাতঘড়িটায় তাকিয়ে দেখলাম তিনটে কুড়ি বাজে। আমি বললাম, “অদিতি, কেমন আছ এখন?”। ও তখন আমার দিকে ফিরে তাকাল। চোখের দৃষ্টিটা ঘোলাটে। যেন আমাকে চিনতেই পারছে না। আমি আবার বললাম, “তোমার কি কিছু লাগবে?”। কিন্তু ও কোনও জবাব না দিয়ে আপন মনে বলল, “আমাকে এখন যেতে হবে, গগণজ্যেঠু এসে গেছে, রাজাবাবু অপেক্ষা করছেন”। আমি বললাম, “অদিতি, কি বলছ তুমি? কে রাজাবাবু? গগণজ্যেঠুই বা কে?” বলে ওর কপালে হাত রেখে দেখতে গেলাম জ্বর টর এল নাকি? কিন্তু ও আমার হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলল, “কে আপনি? আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন কোন সাহসে?”। আমি অবাক হয়ে গেলাম। নির্ঘাত জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে। আমাকেও চিনতে পারছে না। আমি কিছু বলার আগেই দেখি ও বিছানা ছেড়ে নেমে পড়েছে। মুখে বলল, “আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে। দিদি, একটু দাঁড়া, আমি এখুনি আসছি”।  বলেই খালি পায়ে বাইরে বেরতে গেল। আমি বেগতিক দেখে ওর হাতটা ধরে ওকে আটকাতে গেলাম। কিন্তু তাতে ও ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে প্রচণ্ড জোরে একটা ধাক্কা দিল। অমানুষিক জোরে ওই ধাক্কাটা খেয়ে আমি ছিটকে পরলাম ঘরের মাঝখানে। আট দশ সেকেন্ড লাগলো আমার ধাতস্থ হতে। তারই মধ্যে দেখলাম অদিতি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।

ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে আমার মাথায় আর হাঁটুতে একটু চোট লেগেছিল। সেই চোট নিয়েই বাইরে এসে দেখি, প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেই অদিতি দিগ্বিদিক-জ্ঞানশূন্যের মত দৌড়ে দৌড়ে গেটের বাইরে বেরিয়ে গেল। আমি অদিতিকে ডাকতে ডাকতে পিছনে পিছনে গেলাম। কিন্তু কিছুটা এগিয়েই আর পারলাম না। এই ভয়ানক দুর্যোগে কোথাও যাওয়াটা একেবারেই অসম্ভব। এরই মধ্যে দেখি অদিতি উদভ্রান্তের মত রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে। আমি চিৎকার করে ডাকলাম অদিতিকে। ও কোনও উত্তর না দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে মিলিয়ে গেল রাস্তার বাঁকে।

ততক্ষণে আওয়াজ পেয়ে সবাই উঠে পড়েছে। আমি বললাম কি হয়েছে। সবাই শুনে খুব আশ্চর্য হয়ে গেল। জ্যেঠু দেখলাম আমার আর অদিতির কথোপকথন সব শুনে খুব গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। আমি আর বড়দা ছাতা নিয়ে বড়দার বাইকটা করে বেরলাম অদিতিকে খুঁজতে। কিন্তু কি আশ্চর্য! মেয়েটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হন্যে হয়ে সারা শহর অলিতে গলিতে অদিতিকে খুঁজে বিফলমনোরথ হয়ে পাগলের মত অবস্থায় যখন বাড়ি ফিরলাম তখন ভোর হয়ে গেছে। বৃষ্টিও ততক্ষণে অনেকটা কমেছে। অবসন্ন দেহে বাড়িতে ফিরে দেখি ইতিমধ্যেই খবর পেয়ে প্রচুর মানুষ এসে জড় হয়েছে।

ভিজে জামাকাপড় চেঞ্জ করে আসতে না আসতেই জ্যেঠু ডাকল। পরিচয় করিয়ে দিল আরেকজন ভদ্রলোকের সাথে। তাঁর নাম রথীন ভট্টাচার্য। বয়স প্রায় আশির কাছাকাছি। কিন্তু খুব টানটান শরীর। উনি এই শহরের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি। রথীনজ্যেঠু আমাকে ডেকে বললেন, “শোন বাবা, তোমার মনের অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি। তোমার জ্যেঠুর কাছে সবকথা শুনে আমি না এসে আর থাকতে পারলাম না। আজ তোমাকে কয়েকটা কথা বলব। অনেক পুরনো একটা ঘটনা। আমার বাবা কাকাদের মুখে শোনা। তখন বিশ্বাস করিনি, কিন্তু আজ আমার কেন জানি মনে হচ্ছে যা ঘটছে তার সাথে হয়ত ওই ঘটনাটার কোনও না কোনও যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে”।

আমি বুঝতে পারছিলাম না, পুরনো ইতিহাস শুনে এখন আমার কি লাভ হবে, এর থেকে তো থানায় একটা রিপোর্ট করাটা অনেক বেশী জরুরী। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে শুনতে হল রথীনজ্যেঠুর কাহিনী।

 

 

কি হয়েছে আমার? এই প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে খালি পায়ে আমি কোথায় যাচ্ছি? অর্ণব কোথায়? আমার কিছুই মনে পড়ছে না। আমি চারপাশটা কিছুই চিনতে পারছি না। চারিদিকে ভীষণ অন্ধকার। তার ওপরে এই মুষলধারে বৃষ্টি। আমার খুব ভয় করছে।

কিন্তু আমাকে যেতেই হবে। কোথায় যাচ্ছি, আমি তা জানি না, কিন্তু এইটুকু বুঝতে পারছি যে কেউ একজন আমাকে ডাকছেন। তাঁর ডাক অমান্য করার মত শক্তি আমার নেই। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতন তাঁর ডাক শুনে হেঁটে চলেছি। আমার সামনে কয়েক পা দূরে ওই যে ছায়ার মত লোকটা হেঁটে যাচ্ছে, সে আমাকে নিয়ে যেতে এসেছে। আমাকে তার পিছনে পিছনে যেতে হবে। যত দুর্যোগ, যত ঝড়বৃষ্টিই হোক না কেন, আমাকে যিনি ডাকছেন তাঁর কাছে আমাকে পৌঁছতেই হবে। অনেকদিন ধরে তিনি আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছেন।

– “বোন ফিরে যা! আর এগোস না, সামনে তোর ভীষণ বিপদ। ফিরে যা লক্ষ্মীটি!”

আরে একি! আমি অনন্যাবৌদিকে দেখতে পাচ্ছি। অনন্যাবৌদি এখানে কোথা থেকে এল? বৌদি আমাকে কাতর ভাবে অনুরোধ করছে যাতে আমি ফিরে যাই। আমি হঠাৎ করে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। আমি একা একা কোথায় যাচ্ছি? অর্ণব কেন আমায় একা ছেড়ে দিল? ও তো আমাকে একা কোথাও যেতে দেয় না। নিউটাউন থেকে সল্টলেক যেতে হলেও আমাকে আমাদের গাড়ীতে ড্রাইভারের এর সাথেই পাঠায়। সে কিনা এভাবে অজানা অচেনা একটা লোকের সাথে আমাকে একা ছেড়ে দিল। আমাকে এখুনি বাড়িতে ফিরতে হবে, কিন্তু বাড়িতে ফেরার রাস্তাটা যেন কোন দিকে?

কিন্তু না। আমার তো এখন বাড়িতে গেলে চলবে না। আমার তো এখন তাঁর সাথে দেখা করতে যেতে হবে। ওই তো ওঁর ডাক আমি পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি। উনি ডাকছেন, “আয় মা শ্যামলী, আয়। কতদিন ধরে তোর জন্যে বসে আছি মা, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আয়”। এই ডাক আমি অগ্রাহ্য করব কি করে? আমার সব মনে পড়ে গেছে। উনি আমাদের রাজাবাবু। রাজাবাবু আমার গান শুনবেন বলে আমাকে ডাকছেন। সামনে গগণজ্যেঠু আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমার দিদি নিশ্চয়ই আগে আগেই পৌঁছে গেছে। রাজাবাবু এখন আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন। এই তো নদীটার পাশে এসে গেছি। এবার নদীটা পার করলেই রাজাবাবুর প্রাসাদ। এতদিন ধরে উনি ওখানে অপেক্ষা করছেন আমার জন্যে।

– “বোন, তোর পায়ে পড়ি! যাস না! ফিরে যা, তুই ফিরে যা!”

আবার অনন্যাবৌদির গলা। অনন্যাবৌদিকে ঠিক আমার দিদির মত লাগছে। ও আমাকে রাজাবাবুর কাছে যেতে বারণ করছে। কিন্তু কেন? রাজাবাবু তো আমাকে আর আমার দিদিকে দুজনকেই কত ভালবাসেন। আমাদের সাথে কত গল্প করেন। আমাদের কত কিছু খেতে দেন। আমাদের গান শোনেন।

এই তো তাঁর প্রাসাদে এসে গেছি। রাজাবাবু নিশ্চয়ই দরবার ঘরে আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখেই বলবেন, “আয় মা আয়! কতদিন ধরে তোর পথ চেয়ে বসে আছি। কি ভালো যে লাগছে তোকে দেখে।”। সত্যিই, এতদিন বাদে ওঁকে দেখে আমারও খুব ভালো লাগবে।

হঠাৎ আমাকে পিছন থেকে কে যেন টেনে ধরল। চমকে তাকিয়ে দেখি অনন্যাবৌদি আমার ওড়না ধরে টানছে। বলছে, “বোন, এখনও সময় আছে, বাঁচতে চাস তো ফিরে যা”। শুনে আবার হঠাৎ করে একটা অজানা ভয়ে আমার হাত পাটা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। অবাক হয়ে দেখলাম একটা পোড়ো বাড়িতে আমি একা দাঁড়িয়ে রয়েছি। আরে! এটা তো জঙ্গলের মধ্যেকার সেই পুরনো গড়টা, যেখানে আমরা বিকেলবেলা বেড়াতে এসেছিলাম। এখানে আমি একা একা কি করছি? আমি ভয়ে চিৎকার করে অর্ণবকে ডাকলাম। কিন্তু বাইরে ঝড়ের ভীষণ আওয়াজে আমার ডাকটা চাপা পড়ে গেল।

সামনে চোখ পড়তেই দেখি অন্ধকারে একজন বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে দেখেই আবার ধীরে ধীরে আমার ভয় কেটে গেল। আমি চিনতে পারলাম রাজাবাবুকে। আমি ছুটে গেলাম তাঁর কাছে। উনি ইশারায় আমাকে তাঁর পিছনে আসতে বললেন। আমি দেখলাম দেওয়ালের মাঝখান দিয়ে কয়েকটা সিঁড়ি নেমে গেছে। রাজাবাবু সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলেন। আমি যন্ত্রের মত তাঁকে অনুসরণ করলাম।

পিছন থেকে আবার অনন্যাবৌদির ডাক শুনতে পেলাম, “বোন, যাস না! ফিরে আয়।”

কিন্তু রাজাবাবু আমাকে ডাকছেন। আমি মরে গেলেও তাঁকে অমান্য করতে পারব না।

আমি পা বাড়ালাম সিঁড়ির দিকে।

 

 

 

রথীনজ্যেঠু বলতে শুরু করলেন –

আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগের কথা। সেই সময় এই অঞ্চলের জমিদার ছিলেন রাজা দিগ্বিজয় সিংহ। প্রচণ্ড নিষ্ঠুর এবং অত্যাচারী শাসক ছিলেন তিনি। তাঁর প্রজাদের ওপর তিনি অমানুষিক অত্যাচার করতেন। আজ এর বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিতেন, তো কাল ওকে তুলে এনে গুম খুন করিয়ে দিতেন। তাঁর প্রজারা তাঁকে যমের মত ভয় করত।

কিন্তু সব অত্যাচারী শাসকেরই অত্যাচারের ঘড়া একদিন পূর্ণ হয়। এঁর ক্ষেত্রেও এমনটাই হল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রজাদের ওপর থেকে ওঁর কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে লাগল। তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠতে লাগল। এর ওপরে বৃদ্ধ বয়সে বিপত্নীক জমিদার হঠাৎ করে পুত্রহারা হলেন। তাঁর একমাত্র ছেলে, যে অত্যাচার ও দাপটে কালে কালে তাঁর বাবাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি হঠাৎ করে একদিন মারা গেলেন ডাকাতের আক্রমণে। হয়ত এই আক্রমণের পিছনে কিছু বিদ্রোহী প্রজাদেরই হাত ছিল। সে যাই হোক, আচমকা ছেলেকে হারিয়ে বৃদ্ধ জমিদার একেবারে ভেঙ্গে পড়লেন। তাঁর এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছু কিছু বিদ্রোহী প্রজা ধীরে ধীরে তাঁর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে লাগল। কিন্তু জমিদারের বয়স হয়ে গিয়েছিল বলে চুপচাপ সব সহ্য করা ছাড়া তাঁর আর কোনও উপায় ছিল না।

এরকম অবস্থায় একদিন সেই জমিদার এক তান্ত্রিকের সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর কাছে মন্ত্র-দীক্ষা নেন। সেই তান্ত্রিকের পরামর্শে তিনি নবযৌবন লাভের জন্যে মা কালীর উদ্দেশ্যে একটি যজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই যজ্ঞে মা কালীকে দুটি কুমারী সহোদরা কন্যা উৎসর্গ করতে হবে। তাহলেই তিনি পুনর্যৌবন লাভ করবেন। পুনর্যৌবন লাভ করলে তিনি আবার তাঁর পুরনো দাপট ফিরে পাবেন এবং বিদ্রোহী প্রজাগুলোকে কড়া হাতে দমন করে আবার তিনি আগের মতন রাজ্যশাসন করবেন, এই ছিল তাঁর আশা। তাছাড়া আবার বিবাহ করে পুত্রসন্তান লাভ করলে বংশরক্ষাও হবে। এই উদ্দেশ্যে তিনি সন্ধান চালিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে এক দরিদ্র পুরোহিত আর তাঁর দুই কুমারী কন্যাকে নিজের গ্রামে নিয়ে আসেন এবং নিজের বাড়ির নিত্যপূজার দায়িত্ব দেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের সাহায্য করে চতুর জমিদার এই পরিবারটির বিশ্বাস অর্জন করেন। এরপরে কালীপূজার দিন সেই জমিদার কৌশলে এই গরিব ব্রাহ্মনটির দুই কন্যাকে অপহরণ করেন এবং মাকালীর উদ্দেশ্যে বলী দেন।         

তিনি ভেবেছিলেন একরকম, কিন্তু আসলে হল আরেকরকম। তাঁর নবযৌবন লাভ করার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। উল্টে সব শুনে প্রজারা গেল ক্ষেপে। এমনিতেই প্রজারা তাঁর ওপর কোনওকালেই খুব একটা সন্তুষ্ট ছিল না। এই ঘটনাটা যেন আগুনের ওপর ঘি ছড়িয়ে দিল। সব প্রজারা একসাথে বিদ্রোহ করল। তারা জমিদারবাড়ি আক্রমণ করে জমিদার আর তাঁর বাকি লোকেদের নৃশংস ভাবে হত্যা করল। কিন্তু ওই দুই হতভাগিনী বোনের মৃতদেহ কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। তাই রাগে উন্মত্ত জনতা জমিদার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল। সেদিন থেকে এই জমিদার বংশটি ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে লোপ পেল।

 

 

দু সপ্তাহ হল আমরা কলকাতায় ফিরেছি। এতদিনে অদিতি অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছে। সেদিন যেভাবে ওকে উদ্ধার করা হল সেটা ভাবলে আজও আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সায়েন্সের স্টুডেন্ট আমি। চিরটাকাল ভগবান, ভূতপ্রেত ইত্যাদিকে আমার সিলেবাসের বাইরেই গণ্য করে এসেছি। কিন্তু এই কটা দিনে যা অভিজ্ঞতা হল, তাতে আমার এতদিনের বিশ্বাসের ভিত্তিটা যে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে গেল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

সেদিন রথীনজ্যেঠুর গল্পটা শোনার পর সবাই সিদ্ধান্ত নিল একবার জঙ্গলের মধ্যে পুরনো গড়টাতে অদিতিকে খুঁজতে যাবে। ওই পুরনো গড়টাই নাকি ছিল রাজা দিগ্বিজয় সিংহের প্রাসাদ। আমি যদিও মন থেকে কিছুতেই এসব মেনে নিতে পারছিলাম না, তবুও কিছুটা সবার চাপে পড়ে আর কিছুটা “একবার দেখেই আসা যাক না কেন?” এরকম মনোভাব নিয়ে সবার সাথে গেলাম। কিন্তু এখানে এসে সবচেয়ে বড় ঘরটায় অদিতির পরনের ওড়নাটা পড়ে থাকতে দেখে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেলাম। তার মানে অদিতি কাল রাতে এখানে এসেছিল। যদিও তন্ন তন্ন করে খুঁজেও অদিতিকে কোথাও পেলাম না। হঠাৎ আমার মনে হল অদিতি জ্বরের ঘোরে কোনও একটা দরজা খোলার কথা বলছিল। বলছিল খুব অন্ধকার, ওর খুব ভয় করছে। তার মানে কি এখানে কোনও গুপ্ত দরজা রয়েছে? সঙ্গে যারা গিয়েছিল তাদের এই কথাটা বলায় সবাই ঠিক করল এই ঘরের দেওয়াল ভেঙ্গে ফেলবে। দেওয়ালে ধাক্কা দিতে দিতে এক জায়গায় ফাঁপা আওয়াজ পাওয়া গেল। ওই জায়গাটার দেওয়ালটা ভেঙ্গে ফেলতেই আমরা অবাক হয়ে দেখলাম দেওয়ালের পিছনে একটা গুপ্ত কুঠুরি। সেই কুঠুরি থেকে অচৈতন্য অবস্থায় অদিতিকে উদ্ধার করলাম। অদিতির শ্বাসপ্রশ্বাস ভীষণ ক্ষীণ হলেও তখনও চলছিল। আর কিছুক্ষণ দেরী হলেই হয়ত ওকে আর বাঁচান যেত না। সবার পরামর্শে আমি সঙ্গে সঙ্গেই আর দেরি না করে ওকে নিয়ে কোলকাতা রওয়ানা দিলাম। এখানে এসেই হাসপাতালে ভর্তি করলাম। সাতদিন হাসপাতালে থাকার পরে ওকে ডিসচার্জ করা হয়। এখনও ওর দুর্বলতা পুরোপুরি কাটেনি, যদিও বেশ তাড়াতাড়ি সেরে উঠছে, এটাই ভরসা। এই কদিনে ওর ওপর দিয়ে যা গেল, তাতে স্বাভাবিকভাবেই এত বড় ধাক্কাটা সামলাতে একটু সময় ওর লাগবে। তবে অদ্ভুত ব্যাপার, সেই রাতে কি ঘটেছিল একথা জিজ্ঞেস করলে ও কোনও উত্তর দিতে পারে না। আশ্চর্যজনক ভাবে সেই রাতের সব স্মৃতি ওর মেমরি থেকে চিরদিনের জন্যে মুছে গেছে।

পরে বড়দার কাছে ফোনে খবর পাই যে আমি অদিতিকে নিয়ে চলে আসার পরে, ওই গুপ্ত কুঠুরি থেকে একটা নরকঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। সেই কঙ্কালটা ডিএনএ টেস্টের জন্যে ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছিল। কাল সেই টেস্টের রিপোর্ট এসেছে। যদিও সেই রিপোর্টের কোনও প্রয়োজন ছিল না, কারণ তার আগেই কঙ্কালটার পরনের সব গয়নাগাটি দেখে পিনাকীদার বউ অনন্যাবৌদিকে সনাক্ত করা হয়ে গিয়েছিল।

 

সমাপ্ত

 

শারদীয়া "আলোর ফুলকি" ২০১৭ তে প্রকাশিত

ডাক (দুটি পর্ব একত্রে)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments