ডুয়ার্স আসিয়াছি। এ যেন এক অন্য জগৎ। সেবক ছাড়াইয়া সামান্য কিছুদূর আসিলেই বোধ হয় মনুষ্যজগৎ ছাড়াইয়া কতদূর আসিয়া পড়িয়াছি। যতদূর দৃষ্টি চলিতে পারে, শুধুই বিস্তীর্ণ প্রান্তর। মধ্যে মধ্যে দু-একটি নদী। কত ছোট ছোট নদী যে পার করিয়া আসিলাম! কি চমৎকার তাহাদের নাম – লীশ, ঘিস, চেল – এরূপ নাম তো আর কোথাও শুনি নাই। ছোট ছোট পাথরে ভরা বিস্তীর্ণ নদীখাত, তাহার মধ্য দিয়া সরু সরু ধারায় ছুটিয়া চলিয়াছে স্বচ্ছতোয়া নদী। স্রোত যেস্থানে খুব বেশি নহে, সেখানে মাছের দেখা যাওয়া যায়। বরোলি মাছ। স্থানীয় লোকেরা খাপলা জাল ফেলিয়া ধরে, কাল দেখিয়াছি।

কাল চালসা পার করিয়া আসিবার সময় দেখিলাম মঙ্গলবাড়ি নামের এক গ্রামে হাট বসিয়াছে, নিতান্তই গ্রাম্য হাট। পথের দুইধারে প্রায় মাইলখানেক জুড়িয়া পসরা সাজাইয়া বসিয়াছে ব্যাপারিরা। শোরগোল হাঁক-ডাকে সারা পড়িয়া গিয়াছে সেস্থানে। চাল-ডাল, আনাজপাতি, তেল-মশলা হইতে শুরু করিয়া জামাকাপড়, গামছা, প্রসাধনী সবই বিক্রয় হইতেছে হাটে। রঙিন কাঁচের চুড়ির দোকানে ভিড় করিয়াছে মদেশীয় মেয়েদের দল। কটূ গন্ধযুক্ত তামাকপাতার ব্যাপারিরা বসিয়াছে এক স্থানে। দোক্তা দেওয়া পান চিবাইতে চিবাইতে আড্ডা জমিয়াছে দেদার। শূকরের মাংস বিক্রি হইতেছে শালপাতার চাঙারি করিয়া। তারই পিছনের দিকে একটি তেরপল টাঙাইয়া হাঁড়িয়ার ঠেক বসিয়াছে। শালপাতার ঠোঙায় করিয়া হাঁড়িয়া পান করিতে করিতে ইতস্তত গড়াগড়ি যাইতেছে জনা পাঁচেক মদেশীয়। বাসওয়ালারা হাঁক পাড়িতেছে – তিলাবারি, লাটাগুড়ি, চালসা, নাগরাকাটা, বানারহাট, ফালাকাটা। হাওয়ায় ঘুরপাক খাওয়া ধুলা আর শুকনো পাতাদের সহিত উড়িতেছে হাটের পাঁচমিশালী গন্ধ – মেয়ে মরদের গায়ের ঘামের গন্ধ, হাঁস-মুরগীর গায়ের ওম্ ধরা গন্ধ, তাহাদের ডিমের আঁশটে গন্ধ, তেলেভাজা, বিড়ি আর তামাকপাতার গন্ধ। এই সমস্তকিছুর উপর শেষ অপরাহ্নের সূর্যালোক আসিয়া পড়িয়া কমলা রঙের এক রূপকথা রচনা করিয়াছে বলিয়া ভ্রম হয়। এ এক অন্য জগৎ। এরূপ পূর্বে কখনো দেখি নাই, শুনিও নাই।

কাল রাত্রে এক বনবাংলোয় রাত্রি কাটাইয়াছি। বাংলোখানা মূর্তি নদীর ঠিক উপরে। টিনের চালওয়ালা ছোট্ট দোতালা একটি বাংলো, ইংরাজ আমলের ন্যায় নির্মিত। নদীর ওপারে চাপড়ামারির জঙ্গল। মূর্তি হইতে একটি পথ ওই চাপরামাড়ির জঙ্গলের বক্ষস্থল ভেদ করিয়া চলিয়া গিয়াছে খুনিয়া মোড় পর্যন্ত। ওই পথে গিয়াছিলাম কাল। অরণ্য যেন গিলিয়া খাইবে বলিয়া মনস্থির করিয়াছে বোধ হয়। গাছের পাতায় বৃষ্টির জল পড়িবার শব্দ, আর ঝিল্লিরব। আর কিছুমাত্র নহে। কোন কোন স্থানে তাহাও নাই। সেস্থলে কানে তালা লাগিয়া যাবার উপক্রম হয় নিস্তব্ধতার চোটে। বৃষ্টির জল জমিয়া জঙ্গলের মধ্যে কোন কোন স্থানে ছোট ছোট জলাশয় তৈয়ারি হইয়াছে। সেখানে সময় বুঝিবা থমকিয়া দাঁড়াইয়াছে।

ভোরবেলা টিনের চালে বৃষ্টির আওয়াজে ঘুম ভাঙিয়া যায়। বাইরে আসিয়া দেখি, আলো তখনো ঠিক স্পষ্ট করিয়া ফোটে নাই, অথচ অন্ধকারও নিজের জেল্লা হারাইয়াছে। নদীর ওপারের জঙ্গল ভোরের কুয়াশায় বিমূর্ত রূপ ধারণ করিয়াছে। ঝুপঝুপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছে। নদীবক্ষ দিয়া উড়িয়া যাইতেছে দুটি পানকৌড়ি। কত প্রকারের শব্দ। পাখির দল বৃষ্টিতে ভিজিয়া শীতে কাঁপিতে কাঁপিতে মেলা শোরগোল বাঁধাইয়াছে। ঝিঁঝিঁ ডাকিতেছে অনবরত। দূরে জঙ্গল হইতে ময়ূর ডাকিতেছে। সাথে অবিরাম নদীর বয়ে চলার শব্দ। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ে, টুপটাপ টুপটাপ। নদীর ওপারে তিনটি বক হঠাৎ ওড়ে, দিকভ্রান্ত হাওয়ার মত। বামদিকে যায়, তারপর হঠাৎ পাক খাইয়া ডাঁয়ে ফিরিয়া আসে। নদীর জলকে ছুঁয়ে দেখিবার সাধ হয় বুঝিবা, নামিয়া আসে নদীর উপর। তারপরেই আবার ওড়ে তারা – উপরে, অনেক উপরে। আষাঢ়ের কৃষ্ণকালো মেঘের পার্শে নিজেদের ধলো রঙ জাহির করিবার জন্যই যেন উপরে ওঠে। তারপর আবার পাক খাইয়া এলোমেলোভাবে উড়িয়া বেড়ায় খানিকক্ষণ, তারপর ময়লা আকাশের মাঝে অদৃশ্য হইয়া যায় কোথায়। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ে, টুপটাপ টুপটাপ।

ডুয়ার্সের দিনলিপি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments