তিনি বলেন। বলে থাকেন। অকাতরে দান করেন নিজস্ব কথামৃত । কণ্ঠে কোন জড়তা বা কুণ্ঠা নেই । শুধু কখনো সখনো মিথ্যে অথবা বাড়িয়ে বলার সময় স্বভাব দোষে দুটো হাত একটু কচলে নেন । আর বেশি উত্তেজিত হলে জিভের দুর্বলতায় সেটা টাকরায় আটকে যায় অর্থাৎ তিনি তোতলাতে থাকেন । নারায়ণ গাঙ্গুলি মহাশয়ের “কম্বল নিরুদ্দেশ” গল্পে হারিয়ে যাওয়া কম্বলের যেমন ন্যাক ছিল চাঁদে যাওয়ার তেমনি তারও ন্যাপি যুগ থেকেই সখ ছিল সোনালী, রুপোলী পর্দায় মুখ দেখানোর । যা কিনা চিরাচরিত বিখ্যাত বা কুখ্যাত হবার সবচেয়ে সহজ পথ । কিন্তু প্রতিভা বা দক্ষতায় দমক অথবা চেহারায় সেই মাপের চমক না থাকায় সৌখিন সাফল্য করায়ত্ত হয় নি যৌবনে। আর দেখুন এখন। অনেক দিশি বিদেশী খবরাখবরদের ডজ করে তিনি এবং তার সতীর্থরা খবরের চ্যানেলগুলোর সমস্ত সন্ধ্যা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছেন। তিনি বগল বাজিয়ে হাই তুললেও সেটা তোলা হচ্ছে , রেগে মেগে সেট থেকে বেরিয়ে গেলেও সেটা বিজ্ঞাপন বিরতিতে ইস্যু হচ্ছে আবার স্থান কাল ভুলে খিলখিলিয়ে হেসে দিলে সেটাও ক্যামেরাবন্দী হচ্ছে।
কিন্তু কাজের রহস্যটা তো কৃষ্ণগহ্বরের তিমিরেই… । “এত কেওড়া কিসের মশাই” ? সব প্রশ্নের উত্তর সবসময় টু দি পয়েন্ট হয় না। বলেছি তো , সেই দুটো শব্দেই যাবতীয় শুরু, সেই দুটো শব্দেই যাত্রাপালার দি এন্ড – “তিনি বলেন” ।
কখনো গোসা ফুটিয়ে নীরব হন ; কখনো বিপক্ষের ছুঁড়ে দেওয়া গোলা বারুদের সামনে কলুর বলদের মত ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে থাকেন , আবার কখনো বা চরম ডেসিবেলে সবার কথার একশো আট করে দিয়ে নিজের বাক্যের রেলগাড়িটি চালিয়ে দেন। কোন ইয়ে চাপা পড়লে কি মহাভারত অশুদ্ধ হবে ? চড়িয়ে কইতে পারলে যে অনলাইন একটা ক্যামেরার মুখ ঘুরে বোঁ করে তার চাঁদপানা মুখের দিকে তাক করবে সেটা তিনি ভালোই জানেন । অবস্থা সামলানোর অজুহাতে ফিক করে মুচকি হেসে ফেলেন অনুষ্ঠান পরিচালক । মুখে মুখে মুখোমুখি এই চূড়ান্ত সহবাসের ক্লাইম্যাক্স যে চ্যানেলের টি আর পি বাড়াতে ওস্তাদ।
এবার প্রশ্ন, যার কথা বলছি এতক্ষন তিনি আদতে কে ? তিনি বেকার রাজনীতিবিদ হতে পারেন (না হলে রোজ রোজ হাজিরা দেবার সময় তার থাকার কথা নয় ) , স্বঘোষিত সমাজ সংস্কারক হতে পারেন (প্রোমোশন বলে একটা কথা আছে না ! ), একটা সিনেমায় মুখ দেখানো কোন সেলিব্রিটি হতে পারেন (ছোট পর্দায় যদি ভুল করে কেউ নিয়ে নেয় ) , এ্যালবাম বিক্রি না হওয়া গায়ক হতে পারেন , এমনকি ক্লাসে হালে পানি না পাওয়া অধ্যাপক পর্যন্ত হতে পারেন। কোন নির্দিষ্ট পরিচয় বেঁধে নাই বা দিলাম। চোখে দেখে ইচ্ছেমত চেখে নিতে পারা যাবে।
সংস্কৃতি , দুর্নীতির পালে হাওয়া লাগিয়ে রোজ ঘটে যাওয়া সুন্দর , অসুন্দর যত ঘটনার থেকে ছেঁকে বের করা নির্যাসে ইতিহাস, রাজনীতি এবং অর্থনীতির প্রলেপ লাগিয়ে সেই অদৃশ্য চ্যবনপ্রাশ মানুষকে যে তক্কের চামচে করে গিলিয়ে দেওয়া যায় সেটা প্রতি সন্ধ্যাবেলায় রিমোট ঘোরালেই দৃশ্যমান। বুড়ো, জোয়ান তথাকথিত বিশেষ অজ্ঞরা যখন ধুতি , প্যান্ট , শাড়ি ইত্যাদির কোমর সাপটে বেঁধে কোন্দল করেন সেটা সত্যি বাঁধিয়ে রাখবার মত এক একটি খণ্ড মুহূর্ত । ঝগড়া নয় , তর্ক নয় , কোন্দল কথাটাই বেশি ফিট করে । কারন তখন আর নিজেকে যুক্তিবাদী , জ্ঞানী বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রকাশ করে হাততালি মেলে না । সবাই পা বাজিয়ে ধন্য ধন্য করবে তখনই , যখন তিনি গলার কাছে বকলসে লটকানো মাইকটিকে সামলে সুমলে গলার স্বর জিৎ গাঙ্গুলির মত বেসুরে মনো থেকে চূড়ান্ত ডলবিতে নিয়ে আসতে পারবেন । একা একা কথা বলতে পারলে তো সোনায় পিৎজা টপিংস ; কারো টিপ্পনী বা পরামর্শ কানে নেওয়ার অপশনটাই গোঁড়া থেকে ছেঁটে ফেলা গেল । ছবিতে অভিনয় করবার আগে চরিত্রর সাথে এক হয়ে যাওয়ার জন্য অভিনেতারা যেমন বাস্তব দেখে তৈরি হন তেমনি এরাও মনে হয় স্টুডিওতে আসা যাওয়ার পথে রেল লাইনের আসে পাশের বস্তীগুলোতে নিয়মিত স্টপ মেরে এসেছেন বা বাড়ির পুরনো কাজের মাসির থেকে ঝগড়ার ক্র্যাশ কোর্স নিয়ে এসেছেন । ঘরে ফিরে রিপিট টেলিকাস্টে নিজেকে দেখে দেখে এতদিনে শিখেও নিয়েছেন কোন পোশাকে তাকে ক্যামেরার সামনে ঝাক্কাস দেখায় , মুখের ওপর নায়িকাদের মত আলো কিভাবে টেনে নিলে বদন বেশি খোলতাই হয় অথবা ঠিক কিভাবে দাঁত কেলিয়ে বা খিচিয়ে উঠলে তাকে বেশি ম্যাডলি এবং ডেডলি লাগে। সাধু প্রচেষ্টা । নিজেকে বাজারের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য এই আত্মদান যথার্থই প্রশংসনীয় । সুস্থ মস্তিষ্কের এবং যুক্তিবাদী সুবক্তারা এই সব অনুষ্ঠানে আসেন না তা তো নয়। নিশ্চয়ই আসেন। তবে সেই সময়টুকু নেহাত বেতিক্রমি। কারন তারা তো ঝগড়া বা কোন্দল করেন না । যা করেন তা হল সুকৌশলে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করবার চেষ্টা । চ্যানেল বা চ্যানেলগুলিতে শব্দের দিনমজুরী করার তুচ্ছ সময় তাদের আদৌ নেই । তাই চ্যানেলেরও তাদের প্রয়োজন নেই। ডোডো পাখীর মতই বিরল এই বক্তারা । চ্যানেল থেকে চ্যানেলে লাফিয়ে বেরোনোর ডেইলি প্যাসেঞ্জারি না করে প্রয়োজনীয় বক্তব্যগুলিকে তুলে ধরে অন্তরালে চলে যান ।
কতোটুকু প্রয়োজন রয়েছে এই ধরনের অনুষ্ঠানের ? পরিস্থিতির বিচার করলে অনেকখানি । বিশ্লেষণের ছাঁকনি এবং তর্কের মাধ্যমে কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা বিষয়ের অন্তরমহলে পৌছনোর অস্ত্র হিসেবে অসাধারন । কিন্তু অস্ত্র যতই ধারালো হোক বেশি ব্যবহারে তাতে মরচে পড়াতে কোন শালা আটকাতে পারে না। এবার মুশকিল হল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তো রোজ ঘটে না । এখানেই চ্যানেলের হাতযশ। কিভাবে পেঁয়াজি আর নেতাজিকে রোজ সন্ধ্যায় এক কড়াইতে ভাজা যায় তার নিত্যনতুন রেসিপি আবিষ্কারে । আমাদের দর্শকদের মেগাসিরিয়াল দেখবার ধৈর্য আছে , রোগা মোটা বাবাদের বুকনি শোনবার স্থৈর্য আছে, রিয়েলিটি শো তে সেলিব্রিটিদের অন-ক্যামেরা স্নান দেখবার জন্য গামলা পেতে বসে থাকা আছে । তার মানে এটা পরীক্ষিত সত্যি যে একই মুখ আর ঘটনা বারবার দেখেও দর্শক ক্লান্ত হন না। তাহলে খবরের চ্যানেলগুলো কি দোষ করল ? তারাও তো দর্শকদের একই রকম গর্দভ ভাবেন। যতক্ষণ বাজার খাচ্ছে চলুক খ্যামটা। এবং হচ্ছেও তাই । চ্যানেল শক্ত করে ট্রেপিজের তার বেঁধে দিয়েছে । রঙচঙে দোলনা ঝুলছে । তাই বলে তাতে ঝুলে ঝুলে রোজ লাইভ লাফানোটার ইচ্ছে অনিচ্ছে তো বক্তার নিজের হাতেই !
তাহলে অদ্ভুতভাবে একই মুখ ঘুরে ফিরে আসে কেন ? রোজ রোজ খাবি খেয়ে সবার সামনে নিজেকে জোকার প্রতিপন্ন করবার দিব্যি তাদের কে দিয়েছে ? তারা কি বুঝেও বোঝেন না যে শুধু সময় ভরিয়ে রাখবার জন্য এবং বাজারের টি আর পি টেনে নেওয়ার উদ্দেশে শুধু দাবার বোড়ে হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের। কে জানে হয়তো বোকা বাক্সর কেরিক্যাচার এদের রোজ কালীপূজোর পতঙ্গের মত আলোর দিকে টেনে নিয়ে আসে ! হয়তো সাত তাড়াতাড়ি সেলেব হওয়ার মোহ ছাড়তে পারছেন না কেউ ! এটাও হতে পারে যে এতদিন কাউকে নিজের কথা শোনাবার লোক পান নি ; তাই এই সুবর্ণ সুযোগ হেলায় ঠেলে দিতে তিনি অপারগ । আর টিভিতে মুখ দেখানোর দৌলতে পাড়া পড়শি , বাজারের চেনা মেছুরে , বাড়িতে বৌ সন্তান এমনকি পোষা কেঁদো কুকুর ছানাটাও তার আলোকিত দেঁতো হাসির তোড়ে পুলকিত হচ্ছে । কে জানে হয়তো জীবন থেকে এতদিনে কিছুই না পেয়ে পেয়ে ধেবড়ে গিয়ে এই আত্মহত্যা । যে দলের জন্য অনেক ভেবেছেন , ডাই হার্ট ডুবসাঁতার দিয়েছেন তারাই মুখে এক চিমটে শুকনো হাড়ের টুকরো গুঁজে দিয়ে বেপাত্তা হয়ে গেছে । চ্যানেলের নাম লেখা খামে ভরা আমন্ত্রন পত্র দেখে নিজেকে হঠাৎ করেই তার কেউকেটা মনে হচ্ছে। হতে পারে সবই।
কিন্তু লোক ঠকানোরও তো একটা সীমা আছে । রোজ রোজ একই মুখ টেনে এনে একতা কাপুর মার্কা সিরিয়াল বানিয়ে ফেলেছেন চ্যানেলের বুদ্ধিমানরা । মুড়ি মিছরি সমস্ত ঘটনা এক করে যেখানে হচ্ছে। বলুন তো একই লোক কিভাবে সবকিছুই জানতে পারেন ? কবিগুরু স্বয়ং নিজের শেষ জীবনে আক্ষেপ রেখে গেছেন অনেক কিছু তার অজানা বলে । তিনি দেহ রেখেছেন বহুদিন হল। দেখে যেতে পারলেন না তার প্রিয় ভাষায় কুশলী কত সর্বজ্ঞ মানুষ এখন বিবর্তনের উল্টোদিকে হাঁটছেন এবং এই মহান ধর্ষণসর্বস্ব দেশে হুপহাপ করে লাফিয়ে বেড়াচ্ছেন। সেই চরিত্ররা যারা রোজ কলুর বলদের মত কথা পিষতে পিষতে এখন কমন নাউনে রোজ একই ভাবে একই কথা বলেন , একই ভাবে হাত , লেজ নাড়েন ; রাগ দুঃখ সব নিখাদ এক। মাঝখান থেকে কথার গুরুত্ব আরও হারিয়ে যাচ্ছে । যে জিনিসটা দুটো লাইনে বলা যেতে পারত এবং মানুষ সহজেই ধরে নিতে পারত ; তাকে রচনাবলীর আকার দিয়ে দেওয়া হচ্ছে । দুর্লঙ্ঘ্য পথ বানিয়ে গুচ্ছের সত্যি মিথ্যে বসানো কাঁচ বিছিয়ে ল্যাজেগোবরে করে দেওয়া হচ্ছে ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদা বাড়ে। নিজের বক্তব্য বলবার জন্য , যুক্তি প্রতিষ্ঠা করবার জন্য মাধ্যম দরকার হয়। কিন্তু মাধ্যমের অত্যধিক এবং বোকাবোকা প্রয়োগ আসল বিষয়কে ক্লিশে করে দেয়, পেছনে সরিয়ে দেয় । ঝিনচ্যাক মেক আপে সাজানো অ্যাঙ্কর টক-ব্যাকে আদেশ পেয়ে বিজ্ঞাপন বিরতি দিলে জল বা সিগারেটের অবসর মেলে। সেই অবসরটা আরও দীর্ঘমেয়াদি হওয়া দরকার। অন্তত বেশ কয়েক মাস বা বছরের ।

তিনি বলেন… present continuous এ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments