নদী তুমি কার? কবি হলে উত্তর দেবেন, ‘আমি প্রকৃতির’। কিন্তু আজকের দুনিয়াতে প্রকৃতিও রাজনীতির জালে আটকে। ঠিক যেমনভাবে ভারত বাংলাদেশ রাজনীতির ঝটিকাকেন্দ্র আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে তিস্তা। তার পাওনাদার অনেক, উৎসে সিকিম, উজানে পশ্চিমবঙ্গ, ভাটিতে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বরাবরই জনগণমন অধিনায়ক জাতীয়, তাই ভোটব্যাঙ্ক পলিটিক্সের হাত থেকেই নদীরও রেহাই নেই। তার ওপর বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নদীরই মধ্যপ্রবাহ ভারতে, সুতরাং টানাপোড়েন যে অন্য মাত্রা পাবে, তা বলাই বাহুল্য।

ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (ফাও) ডেটা অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার ৭০ ভাগ মানুষই নদীর ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নদীগুলির ওপর (যে নদীর প্রবাহ একাধিক দেশে)। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটা হয়ে দাঁড়ায় পঁচাশি ভাগ। পাকিস্তানের সাথে ভারতের সিন্ধু ও অন্যান্য নদী নিয়ে ১৯৬০ সালেই চুক্তি হয়ে গেছে, কিন্তু তাও ড্যাম ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ঠোকাঠুকি লেগেই আছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি চরমে উঠেছে, বিশেষ করে তিস্তা ও গঙ্গার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে। কারণ বাংলাদেশ ব্যুরোর সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশের প্রায় দু’কোটি মানুষ তিস্তার ওপর নির্ভরশীল। এদিকে তিস্তা জাতে বরফগলা জলে পুষ্ট হলেও তার জল শুখা মরসুমে প্রায় থাকেই না, টেনেটুনে পাঁচশো কিউসেকের বেশি বাংলাদেশের উত্তরের গাইবাঁধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর ইত্যাদি জেলাগুলির কপালে জুটছে না। চাষিদের মাথায় হাত। কারণ, অবশ্যই ভারত।

ভারত সরকার ইতিমধ্যে হেঁকে জানিয়েছে, তারা ‘পূবে তাকাও’ নীতির আওতায় উত্তর পূর্বের পাহাড়ি রাজ্যগুলিকে ফিউচার পাওয়ারহাউস বানাবে। সিকিমের প্রায় পুরো শক্তিই আসে জলবিদ্যুৎ থেকে, তিস্তার প্রবল খরস্রোতকে সদ্ব্যবহার করতে সিকিম সরকার প্রায় তিরিশটি জলবিদ্যুৎ প্রোজেক্টে হাত দিয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ছ’টি প্রকল্প শেষের মুখে। তার মধ্যে প্রায় বারশো মেগাওয়াটের একটি বিশাল প্রকল্পও আছে। আমাদের বিশ্ববাংলাও পিছিয়ে নেই, প্রায় নয় লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্য নিয়ে লক্ষ্যভেদে নেমেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, বিখ্যাত ‘তিস্তা ব্যারেজ প্রোজেক্ট নিয়ে’, তার আওতায় জলপাইগুড়ির গজলডোবায় বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দার্জিলিং জেলাতেও দুটি ড্যাম তৈরি হয়েছে। তৈরি হয়েছে অনেক খাল, যার ফলে জল কমে যাচ্ছে মূল নদীর। তাই এত পাওনাদারের ঠেলা মিটিয়ে তিস্তা যখন বাংলাদেশে ঢুকছে, তখন তার শেলির কবিতার চতুর্থীর চাঁদের মত অবস্থা, রুগ্ন, শীর্ণ।

অথচ আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে এমনটি হবার কথা না। নদী কখোনোই যে দেশে উৎপত্তি লাভ করছে, তার সম্পত্তি নয়, তাহলে নীল মিশরের না হয়ে তানজানিয়ার হত, ড্যানিউব হত জার্মানির। বাংলাদেশের অভিযোগ, ‘পানি’ নিয়ে ভারত ’৯৬ সালের হেলসিঙ্কি আর ২০০৪ এর বার্লিন আইন ভেঙেছে। এদিকে ভারতের যুক্তিও উড়িয়ে দেবার নয়, প্রবাহ কমার কারণে উত্তরবঙ্গের চাষের ক্ষতি হয় অনেক, খাল না কাটলে সেচের জোগান দেওয়া যাবে না। বিদ্যুৎঘাটতিও একটা সমস্যা। আবার বন্যাও আছে, ’৯৬ সালেই ভয়ানক জলের তোড়ে বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তারপর থেকেই প্রবাহের স্বল্পতা বাংলাদেশের ডালিয়া ব্যারেজকে কার্যত অকেজো করে দিয়েছে। ২০১৩ র ইউপিএ প্রস্তাব কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছিল, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ মুহুর্তের আপত্তিতে তা ভেস্তে যায়।

তিস্তা নিয়ে দর কষাকষির শুরু সেই ষাটের দশকে, যখন পূর্ব পাকিস্তান আর ভারত তিস্তা নিয়ে আলোচনায় বসে। কোনও সিদ্ধান্ত হতে পারেনি, তবে একাত্তরের পরে এই নিয়ে দুই দেশের একটি জয়েন্ট কমিশন গঠিত হয়। ’৮৩ সালে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, তিস্তার ৩৯% ভারত ও ৩৬% বাংলাদেশ ব্যবহার করবে, বাকি ২৫ ভাগ জল প্রবাহের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তারপরেই ক্রমাগত বাঁধ নির্মান আর খাল কাটার পরে তিস্তার হাল ঘুরতে থাকে, ফলে গঙ্গা নিয়ে একটি চুক্তি হলেও তিস্তার ব্যাপারটা ঝুলেই থেকে যায়।

তবে তিস্তার প্রায় সাড়ে দশটাই বাজিয়েছে সিকিম, এই ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্যের পুরো অর্থনীতিই চাষ ও সেই হিসেবে তিস্তার ওপর নির্ভরশীল। এর ওপরে তিস্তার ওপরে বানানো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোই সিকিমের সিংহভাগ বিদ্যুৎ জোগানদার, তার থেকে সিকিমের আয়ও হয় অনেক। এদিকে পরিবেশবিদদের কপালের ভাঁজ ক্রমশ চওড়া হচ্ছে, কারণ সিকিমের তিস্তা উপত্যকার অনেকটাই ভূকম্পপ্রবণ, তার ওপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি বাস্তুতন্ত্র ও জনজাতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে, দূষণও বাড়ছে। ভারতে বরাবরই পরিবেশ ব্যাপারটিকে রিজার্ভ বেঞ্চে রাখা হয়, তাই পবন চামলিং বহাল তবিয়তে একের পর এক ছাড়পত্র দিয়ে গেছেন, কেন্দ্রও মাথা ঘামাচ্ছে না। হ্যাঁ, কেদার বদ্রীর বিধ্বংসী বন্যার পরেও এখনও কোনও পক্ষেরই হেলদোল নেই। কালীঘাটের পক্ষে বাকি জলটুকুকে ছেড়ে দেওয়া মুশকিল, কারণ দিদির নবান্নে জায়গাই হয়েছে কৃষক আন্দোলনের কারণে। উত্তরবঙ্গে জমি তৈরি করতে গেলে চাষের উন্নতি জরুরি। তালেগোলে বাংলাদেশ পড়েছে সমস্যায়। সবচেয়ে আশঙ্কার, বাংলাদেশের ক্ষোভ কিন্তু ধূমায়িত হচ্ছে। আওয়ামী লিগের সমঝোতায় আসতে ব্যর্থতা বিএনপির জমি শক্ত করছে, জোটের অংশ হিসেবে জমি শক্ত হচ্ছে জামাতেরও। এই ভারত বিরোধী বিক্ষোভ বাড়লে কিন্তু ক্ষতি আখেরে ভারতেরই, কারণ সন্ত্রাসের প্রশ্নটি ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের দিকে লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার আরেক মহাশক্তিধরের। খাল কেটে চিনা কুমীর ঢোকানো কি ঠিক হবে?

উত্তরবঙ্গ দরিদ্র এলাকা বলেই পরিচিত, চাষের জন্য সেখানে সেচের ব্যবস্থা একটা প্রধান ইস্যু। চা বাগান বাড়ছে, তিন ফসলা জমিও অনেক, ফলে বাড়ছে সেচের চাহিদাও। প্রশ্ন করা যায়, এইভাবে হিমালয়ের অস্থির অঞ্চলে কি বিশাল ড্যাম তৈরি আদৌ বিজ্ঞানসম্মত? আছে ভাঙনের প্রশ্নটিও। উত্তরবঙ্গ বহুকাল ধরেই অবহেলিত। শিল্প-টিল্প তো নেইই, উলটে বলা যায়, এত জলবিদ্যুতের পরেও বিদ্যুৎ সমস্যা আছে, কারণ তৈরি হওয়া বিদ্যুতের বেশিরভাগটাই গ্রিড দিয়ে চলে যায় অন্য রাজ্যে। প্রবাহিত পলি আর জল কমে গিয়ে প্রচুর চর তৈরি হয়েছে তিস্তায়, যার ফলে উত্তরবঙ্গে বর্ষায় বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে। শুধু চাষি নন, ক্ষতির মুখে মৎস্যজীবীরাও, কারণ জল কমার ফলে মাছের জোগানও কম। বাংলাদেশেও একই সমস্যা, তবে আরও বেশি। সেখানে মৎস্যজীবী আর মাঝিরা রীতিমত কারখানার কাজের দিকে ঝুঁকছেন। সমস্যার মুখে স্থানীয় অর্থনীতি। অবিলম্বে ভারত বাংলাদেশ দু’পক্ষকেই এগোতে হবে এইদিকে। পুরো অববাহিকার স্বার্থে একটা দ্বিপাক্ষিক প্ল্যান ছকা একান্তই দরকার। সেইভাবে জলের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রন করতে হবে, দরকার হলে সিকিমের অতগুলো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হোক। তাতে সিকিমের হয়ত আয় কমবে, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের জীবিকা হারানোর চেয়ে তাই ভাল। নইলে সম্ভবত দুই দেশের মধ্যে একটা ভয়ঙ্করতম বিদ্বেষের মুখোমুখি হতে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস।

তাল ঠুকছে চিনও। ইতিমধ্যেই খবর এসেছে তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের উচ্চপ্রবাহে একের পর এক বাঁধ বানানো হচ্ছে।

তিস্তার রাজনীতিঃ জল থেকে কাঁটাতার [একটি অবলোকন]
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments