সাধারণ ভাবে একজন মানুষের দুই হাতে নখের সংখ্যা কত? অনেকেই ইতিমধ্যেই ভাবতে শুরু করেছেন এত বোকা বোকা প্রশ্নের অর্থ কি? দশটি সুস্থ আঙুলে দশটা নখ থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক! হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। এই প্রশ্নে বিন্দুমাত্র বুদ্ধিমত্তার ছাপ নেই। আসলে কি জানেন আমার হাতে এই প্রশ্নটার উত্তর হল নয়। অনুগ্রহ করে ভুল বুঝবেন না। যদ্দূর জানি এবং ঠিকই জানি, আমি ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় যদি কথা বলতে পারতাম তাহলে কিন্তু জবাব দিতাম ‘দশ’। তারপর থেকে আজ প্রায় আটত্রিশ বছরেরও বেশি সময় হয়ে গেল আমার ডানহাতের মধ্যমাটিকে দেখলে এক বিরলকেশ শ্মশ্রুগুম্ফহীন অতিবৃদ্ধের কথাই শুধু মনে পড়ে, মনে হয় কোনোকালেই যেন ও জানতে পারেনি যৌবন কাকে বলে।

কোনও এক দুর্ঘটনায় এই নখটি হারানোর সময় আমার নিশ্চয় খুব ব্যথা লেগেছিল, এবং এই কথাও বিনা দ্বিধায় বলা যায় যে পুরো প্রক্রিয়াটি মিনিট, ঘণ্টা পেরিয়ে দিনের হিসেবে তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল, নিশ্চয় মাঝরাতে আধো ঘুমে আমার কান্না শুনে আমার বাবা কিংবা মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চেয়েছিলেন ব্যথা লাগছে কিনা। তারপর অবশ্যই চেষ্টা করেছিলেন আমাকে ঘুম পাড়াতে। আবার এইরকমও হতে পারে ঘটেনি এসব কিছুই। হয়ত ক্ষত এতটাই গভীর ছিল যে সে পর্যন্ত আমার শারীরিক অনুভূতি পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছিল। ঘটনা যাই ঘটে থাকুক না কেন আঘাত এবং তদ্দজনিত ক্ষত দুইই যথেষ্ট গভীর ছিল। আর আজ? আজ আমার মনে সেই আঘাতের কোনও স্মৃতি এমনকি তার তলানিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। শুধু এক নখবিহীন মধ্যমা। ক্ষত মিলিয়ে গেলেও অমলিন চিহ্ন।

অর্থাৎ সময় এগোনোর সাথে সাথে ক্ষত মিলিয়ে গেলেও যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে কাটাতে হবে সারা জীবনটাই। এর বাইরেও থেকে যায় এমন কিছু আঘাত যা মনের গহীন গহ্বরে ঘাপটি মেরে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে যায়, টের পেতে দেয় না যে সে আছে আর অপেক্ষা করে আত্মপ্রকাশের মাহেন্দ্রক্ষণের জন্যে। শুধু মাঝে মধ্যে নিজের কোনও অঙ্গকে সুকৌশলে একবার ভাসিয়ে আবার ডুবিয়ে দিয়ে নিজের অস্ত্বিত্ব জানিয়ে যায়। তবু ভুলে যাই।

এই মনে পড়া-ভুলে যাওয়া চলতে থাকা এই চক্রে হঠাৎ যখন একদিন পাকাপাকি ভাবে ‘মনে পড়া’ অনিবার্য জয় লাভ করে, তখন ‘মানুষ সেই জিনিস ভুলে যায় যা সে মনে রাখতে চায় না’ এই কথাটির প্রতি অবিশ্বাস জন্মাতে থাকে। শেষ অবধি সৃষ্টি করে অক্ষত এক ক্ষত, মিলিয়ে যেতে দেয় না, স্মৃতি বিশ্বাসঘাতক হয়ে ওঠে অন্য অর্থে।

বাবার হাত ধরে অফিস পিকনিকে যাওয়া শিশুটি অন্তত সেই সময় ভাবেনি সে কোনওদিন এই রকমই এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে পড়বে। বাবার গলায় বক্স ক্যামেরা, তারও কিছু একটা থাকতে হয়, অতএব বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে তার বড় প্রিয় বায়নোকুলারটি গলায় ঝুলিয়েছিল। সেবার গন্তব্য ডায়মন্ডহারবার। এর আগেও সে বাবার অফিস পিকনিকে গেছে, প্রতিবার খোলা মাঠে আশেপাশের স্থানীয় সমবয়স্ক বাচ্চাদের সাথে খেলেছে, কাকুদের হাত ধরে হেঁটেছে ধানক্ষেতের আল ধরে, আদ্যন্ত শহুরে তার কাছে সেসব হত বড় নতুন পাওনা। কিন্তু এবারের মত খাওয়া দাওয়া শেষে একটা বাড়িতে ঢুকে কোলাপিসবল গেট বন্ধ করে দেওয়ার মত ঘটনা কখনও ঘটেনি। গঙ্গা একদম সামনে হওয়াতেই কি এই ব্যবস্থা? কি লাভ হল তবে বায়নোকুলারটা নিয়ে এসে। সকাল থেকে যদিও যোজন দূরের অনেক বস্তুই এসে পড়েছে একেবারে সামনে তবু কোথাও যেন রয়ে গেছে এক অপূর্ণতা। গঙ্গাপারের ছেলে সে তবু ওপার দেখা যায় না, এরকমটা তো চোখে পড়েনি! ‘গঙ্গা এখানে অনেক চওড়া’ – বড়দের কথার উত্তরে সে জিজ্ঞেস করতে পারত – ‘কত চওড়া যে আমার বায়নোকুলারে দেখা যায় না?’ কিন্তু তর্ক করেনি সে। বেশ কয়েকবার ব্যর্থ হয়েও আশাহত হয়নি, এখনও তো সময় পড়ে আছে, দেখা যাবে, নিশ্চয় দেখা যাবে। অনেক দূরের জিনিস কত বড় হয়ে একেবারে সামনে চলে আসে!!

অতএব বন্ধ কোলাপসিবলের সামনে দাঁড়িয়ে ভেতর থেকেই চোখ রাখে বায়নোকুলারে।

না। গঙ্গার ওপার সামনে আসার বদলে দৃষ্টি হঠাৎ উল্টোদিকে অচেনা কিছুতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এ তো ঠিক অত দূরের বলে মনে হচ্ছে না। সরিয়ে নেয় বায়নোকুলার। চোখে পড়ে বন্ধ দরজার ওপারে তার প্রায় সমবয়সী কয়েকটি ছেলেমেয়ে। কোথায় ছিল এরা!! সকাল থেকে দেখতে পেলে একটু খেলতে পারত।

-       তোমার হাতে কি?

উত্তর দেবে কি দেবে না ভাবতে ভাবতেই উত্তর দিয়ে ফেলল। কে জানে কি বুঝল ওরা। আবার প্রশ্ন – কি হয় ওটাতে?

-       অনেক দূরের জিনিস দেখা যায়

-       দেবে একবার?

বলা বাহুল্য অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব। গেটটা যদি খোলা থাকত, হয়ত এটা দ্বিধাগ্রস্ত হতে হত না। এমন সময় আকস্মিক ভাবেই পরিত্রাতা নাকি পরিত্রাত্রী হিসেবেই হল আবির্ভূত হল ঐ দলেরই একটি মেয়ে।

-       না, দেবে না। কেন দেবে?

কিছু একটা বলে সে তার সঙ্গীসাথীদের না দেওয়ার কারণ হিসেবে। শুনতে পেলেও বোধগম্য হয় না ঠিক কি বলল। কিন্তু এটুকু বোঝে মেয়েটির যুক্তি অকাট্য, সঙ্গীদের মুখে ভেসে ওঠা অন্ধকার তাকে আশ্বস্ত করে। কাজেই কি কারণ সেটা আর জানার দরকারই বা কি? তাকে দিতে বারণ করেছে প্রত্যাশীদের একজন, অন্যেরা মেনে নিয়েছে, এটাই তো যথেষ্ট!

-       তোমার নাম কি ভাই?

নাম বলে সে

-       তবে? আমি দেখেই বুঝতে পেরেছ

মেয়েটির অর্থপূর্ণ এক দৃষ্টির সামনে ভীষণ বোকার মত তাকায় ছেলেটি। কি বুঝতে পেরেছে? তাকে দেখলেই কি বোঝা যায় নাকি তার নাম, সে কাউকে কিছু দিতে চায় না? এ তো মহা মিথ্যা অপবাদ!! তার স্কুলের বন্ধুদের তো ডেকে ডেকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া টিফিনের ভাগ দেয়!! সম্মান বাঁচানোর তাগিদে আমতা আমতা করে বেশ অনিচ্ছে সহকারে বলতে চাইল – ‘নেবে এটা? দেখবে?’

এবারও তাকে প্রায় থামিয়ে দিয়ে মুখ খোলে মেয়েটি – ‘তোমরা কি……?’ কিন্তু শেষের শব্দটি বুঝতে না পেরে জানতে চায় সে। আবার জিজ্ঞেস করে মেয়েটি। নাঃ এবারেও বুঝতে পারেনা। আবার জানতে চাওয়ার আগেই ভেতর থেকে কানে আসে বাবার গলা – কি করছিস ওখানে?

-       বাবা ডাকছে

-       তুমি যাও

আর দাঁড়ায় না কেউই। মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে যায় বাইরেটা।

-       কি করছিস এখানে?

-       দেখছিলাম

পুরো ঘটনাটাই চেপে যায়। পাছে বাবা বলে বসেন – তুমি অন্যায় করেছ। একবার দিতে পারতে ওদের। ওরা তো তোমার জিনিস আবার তোমায় ফিরিয়ে দিত।

ফলে অজানাই থেকে যায় মনের ভেতরে ঘুরপাক খেতে থাকা প্রশ্নক’টার উত্তর। সত্যিই কি তাকে দেখলে তার নাম জানা যায়? সত্যিই কি তাকে দেখে মনে হয় সে কাউকে কিছু দিতে চায় না?

আসলে সেসব কিছুই নয়। বহুদিন পর বোঝার বয়সে পৌঁছে খুঁজে পায় মেয়েটির শেষ প্রশ্নের বুঝতে না পারা শেষ শব্দটি। আমার ডানহাতের পঙ্গু মধ্যমার মতই জেগে থাকে সে শব্দ। তারপর বহুবার শুনেছে সেই শব্দ, কিন্তু বারে বারেই মনের মধ্যে ঘুরে ফিরে আসে সেই সময়ে শোনার অভিঘাত, আজ এতদিন পরেও, চাইলে হয়ত মনেও করতে পারে সেই মেয়েটির মুখ। একদম নিঃসংশয় সে। শব্দটি ছিল – হিন্দু

তুমি বিষ ঢেলেছ কোন সকালে
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments