<১>

তেজেনবাবুর মনমেজাজটা একদম-ই ভালো নেই আজ, এই শীতের সকালে গিন্নির তাড়া খেয়ে যাও বা বাজারে গেলেন, দু-একপিস রোগা ফুলকপির বাচ্চা আর জলডোবা পটল ছাড়া কিছুই পেলেন না, মাছের বাজারে ঢুকে মনে হলো সেদিন বেশী দূরে নেই যে মানুষ ব্যাগভর্তি পয়সা নিয়ে বেরুবে আর পকেটে ভরে বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরবে, সামনের মাসে আবার বাবার বাৎসরিক, ভেবেই পেটটা একটু বকমবকম করে উঠলো যেন ! পৌনে একঘন্টা অকারণ দর-দাম করে একজোড়া বিষণ্ণ মাগুরমাছ আর পেয়াঁজকলি নিয়ে বাড়ির চৌকাঠ ডিঙ্গোতেই টের পেলেন টুবাই-টিকলু আবার পড়াশোনা থামিয়ে টিভিটা চালিয়েছে, আর পাশের বাড়ির অবিনাশবাবুও এই সক্কালবেলাই দাঁত মেজে দাদু-গেঞ্জি পরে চলে এসেছেন – চা খেয়ে, টেলিগ্রাফ পড়ে তারপর কালকের ম্যাচ আর কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার বেত্তান্ত নিয়ে ঝাড়া একটি ঘন্টা এখন বরবাদ … নাঃ, সকালগুলো বড্ড বিরক্তিকর লাগে আজকাল …

গতকাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা একটা করে ঝুলপি থেকে পাকা চুল কুচকুচ করে কাটছিলেন তেজেনবাবু, হঠাৎ খেয়াল করলেন আয়নার লোকটার দিকে – মনে হলো যেন ভুরু কুঁচকে থাকতে থাকতে কপালের মাঝখানটায় অল্প ভাঁজ-ই পড়ে গেছে, আর যাওয়ার নয় … আয়না দিয়ে বসার ঘরের দেওয়ালে ঝোলা বাবার সেপিয়া-কালারের ছবিটাও ভালো করে ঠাহর করে দেখে নিলেন একবার। হ্যাঁ, সেই অব্যর্থ কূঞ্চন, কপালের মাঝখান বরাবর যেন ইন্ডিয়ানা আর গন্ডোয়ানাল্যান্ডের ঠোকাঠুকি লেগে একটা আস্ত হিমালয় উঠছে, ঠিক তলায় এক জোড়া চোখ, ভিসুভিয়াসের থেকেও ভয়ঙ্কর… চোখগুলোর দিকে চেয়ে এই এগারো মাস পরেও বুকটা অল্প কেঁপে গেলো তেজেন্দ্রনারায়ণ বাবুর – কাঁচি-ঝুলপিতেই মন দিলেন আবার।

টুবাইটা ঘর থেকে উঁকি মারলো একবার, খবরের কাগজটা নেওয়ার লোভে, আজকেই সিনেমার পাতাটা দেয় – বাবার থমথমে মুখ দেখেই আবার সুড়সুড় করে লেজ গুটিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো। মাঝে মাঝে নিজের ছেলেদের দেখলে নিজের-ই অল্প আফশোস হয় আজকাল, চেয়েছিলেন কড়া ডিসিপ্লিনে ছেলেদুটো মানুষের মত মানুষ হবে, অঙ্ক করবে তো রামানুজন, ব্যাট হাতে নামবে তো সেওয়াগ … হলো তো ঘোড়ার ডিম, এ দুটোয় অঙ্ক করে সেওয়াগ আর ব্যাট করে যেন চোখ বুজে ত্রৈরাশিক কষছে। মাঝখান থেকে বাবার সাথে বন্ধুত্বটা হলো না কোনোদিন-ই … এক-একদিন অফিস থেকে বেরুতে বেরুতে মনে হয় যাই বাড়ি ফিরে গল্প-গাছা করি, তারপর সেই সার্কুলার রেলের ভিড় আর মেট্রোর সামনে হনুমানের ল্যাজের মতো লম্বা লাইন পেরোতে পেরোতে কোথায় যে ইচ্ছেটা উবে যায় …

অফিসের নেতাইবাবু রোজ-ই আসেন টিফিন-টাইমে, রেলে কাজ করেও ভদ্রলোক সাইড বিজনেস চালিয়ে যাচ্ছেন এই বয়সেও। সেই অ্যামওয়ের পিরামিড স্কিম, কে যে কার মাথায় ইঁট চাপাচ্ছে কেউ জানে না  - কেউ ডাকেও না তাকে, তাও এসে এই চেয়ার, ওই চেয়ার ঘুরে নিজেই খানিক বকবক করে যান রোজ … আজও তেজেনবাবু চেয়ারটায় দোল খেতে খেতে ঝুলপিটায় হাত বোলাচ্ছিলেন লাঞ্চের পর, হঠাৎ দিগন্তে বত্রিশ পাটি ঝকঝক করে উঠলো দেখে বুঝলেন নেতাইবাবু … ধপ করে চেয়ারটার নিজেকে ফেলে দিয়ে নেতাই বললেন,

" বুইলেন না মহায়, আপনার নামটাই কালপ্রিট ! তেজেন্দ্রনারায়ণ ! শুনলেই কেমন একটা ইয়ে হয় না?"
"আপনার তো কিছুই হয় বলে বোধ হচ্ছে না"
"আহা, আমি তো সাতঘাটের জল খাওয়া মানুষ, কিন্তু এই যে ডেঁপো বাচ্চারা, সারাক্ষণ তাস পিটছে, একবার আপনি করিডরটায় হেঁটে দেখুন গে, ওমনি আড্ডা থামিয়ে টকাটক এক্সেল খুলে বসবে"
"ভয় পায়, পেতেই পারে"
"ভয় না ভায়া, টেরর টেরর, লিফটে ওঠা-নামার সময় কাউকে দেখেছো কোনোদিন? দ্যাখোনি! তুমি ভায়া লিফটের দিকে হেঁটে গেলে আনকোরা জুনিয়র-রাও সাততলা সিঁড়ি বেয়ে নামে, জানো?"
"ধুর! যত্তসব … ওরা চেনেই না আমাকে!"
"সে আর চিনতে কি লাগে, তুমিই ভেবে বলো দিকি যার নাম তেজেন্দ্রনারায়ণ – সে লোকটা কোনোদিন তুড়ি মেরে শিস দিয়ে গান গেয়ে উঠবে, বা খুব আড্ডা মারবে রকে বসে?"

তেজেনবাবুর মনটা বড়োই খারাপ হয়ে গেলো – সবাই ভয় পায়, সব্বাই? কয়লাঘাটের রেলের অফিসের পাশেই মিলেনিয়াম পার্ক, জানলা দিয়ে অনেকক্ষণ সেইদিকেই তাকিয়ে থাকলেন – বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েরা স্কুল কেটে হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কি মজা ওদের ! তেজেন-ও কি ওইরকম-ই ছিলেন এককালে?

ছোটো ছেলে তিনি, চার ভাইবোনের মধ্যে – মা একটু বেশীই স্নেহ করতেন, আর বাবা পুষিয়ে দিতেন পিঠে কঞ্চির বাড়ি মেরে … আর ভাইবোনগুলো বেশ প্রতিভাবান – বড়-দা ডাক্তার, মেজ-দাও দারুণ অঙ্ক কষতেন, এখন বাইরে, আর বড়দি-ও সেকালের ডাবল এম-এ, চাট্টিখানি কথা নয়, একটা নাকি গানের ক্যাসেটও ছিলো, তিনি যদিও পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন বাবার-ও আগেই। বাবা বলতেন "মেন্ডেলিয়ান জেনেটিকস, পেডিগ্রি, পেডিগ্রি, সবটাই পেডিগ্রি !" … তিনি ছিলেনও এক মহাপুরুষ – ছেলেবেলায় ফুটবল খেলেছেন তো এক্কেবারে ফার্স্ট ডিভিশান, পাহাড় চড়েছেন তো সিধে বেস ক্যাম্প, আবার নাকি নিজের লেখা বই-ও ছিলো একটা … ছেলে হিসেবে তেজেন এক্কেবারেই ডাহা ফেল! গোদের ওপর বিষফোঁড়া – বাৎসরিকে বাবার উপর দুচার লাইন বলার জোয়াল-টাও তার কাঁধে ফেলে বড়দা গেছেন, মেজদার কাছে বেড়াতে …

তেজেন-এর সত্যি বলতে পড়াশুনোয় একটুও মন ছিল না। দুপুরে সবাই ঘুমোলেই পকেটে গামছা নিয়ে পাশের পুকুর, বা কোনোদিন বাবার লুঙ্গি চুরি করে জামরুল গাছের ডগায় … প্রেমে পড়ার পরে একটা ডায়রিতে কয়েক লাইন চেষ্টা করেছিলো সে, ভালো কিছু নামেনি, বাপের বাজখাঁই গলার আওয়াজে বোধহয় কাব্যলক্ষ্মী তাদের পাড়া দিয়ে যাননি খুব বেশীদিন … তবে ফেল-ও সে করেনি কোনোদিন, সকাল নটার বনগাঁ লোকালে যেমন প্রত্যেক স্টেশানেই ঝুলতে ঝুলতেও ঠিক আরেকটা লোক উঠেই যায়, তেজেনও তেমনি বেতের বাড়ি খেতে খেতেই বছর বছর ডিঙিয়ে যেতো ক্লাসের গন্ডি …

ট্যালেন্ট অবিশ্যি তার-ও একটা ছিলো বটে, সেটা হচ্ছে অনর্গল ঢপ মারা – কাজে এবং অকাজে। পরীক্ষায় পঁচিশ পেলে বাড়ি এসে বলতো হায়েস্ট উঠেছে সাতাশ, ছাতা হারিয়ে গেলে সটান বলে দিতো চোখের সামনে চুরি হয়ে গেলো ধরতে পারলাম না  … এমনকি পাড়ার বুড়িপিসি যেই জিগ্যেস করতেন, 'তেজেন, মুদির দোকান চললি?' … তেজেন না ভেবেই বেমালুম বলে দিতো, 'না পিসি, রেশনে লাইন দিতে' …

যেখানে বাপের ভয়, সেখানে সন্দ হয় … বাবাও ছিলেন একেবারে সত্যবাদী চরকা, থেকে থেকেই ধরা পড়ে যেতো মিথ্যে আর কপালে জুটতো বেধড়ক পিটুনি … ভেবেই এই শীতের দুপুরে এসি ঘরে বসেও গেঞ্জির ভেতর হালকা ঘেমে উঠলেন তিনি, ফাইলটা বন্ধ করে বার দুয়েক পায়চারি করলেন গোটা অফিসটা – তারপর চারটে বাজতেই ফোন করলেন স্কুলের বন্ধু খ্যাঁদা-কে ! আজকে আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হলো না ছ'টার ভিড়ে মারামারি করে, একটু গল্পগাছা করে-ই ফিরবেন আজকে …                            

                                                                    <২>

"কনস্টিপেশান, বুঝলি, কন্সটিপেশান", সিগারেট থেকে ছাইটাকে টোকা মেরে গঙ্গার হাওয়ার উড়িয়ে দিয়ে বললো খ্যাঁদা !
"রাক্ষসদেরও হয়? জানতাম না"
"না না, আমার না – এমনি বাঙালী জাতির … ওই কনস্টিপেশানে ভুগেই গেলো, এই তুই যেমন"
"বাজে বকিস না তো… আমার আজ –"
"আঃ শোন না, এটা মেন্টাল … এই যে তোর ভেতর যে আরেকটা তেজেন, তারও তো ইচ্ছে করে, একটু বাইরে বেরুই, একটু আড়মোড়া ভেঙ্গে সন্ধ্যের হাওয়া খেয়ে বাড়ি ফিরি? তাকে যে গত চল্লিশটা বছর আটকেই রাখলি খাঁচায়, কিছু লাভ হলো? … ভেবে দ্যাখ একবার !"

                                                                  <৩>

ফিরতে ফিরতে ন-টাই বেজে গেলো তেজেন্দ্রনারায়ণের । কয়েক-কাপ চা সিগারেট পেয়ে মনটা আজকে বেশ ফুরফুরা শরীফ বোধ হচ্ছে - গিন্নির নাক পুরো ব্লাডহাউন্ড, ঢুকতেই  হাত থেকে টিফিন বাক্স নিতে নিতে বললেন,
"এই যে বললে ছেড়ে দিয়েছো?"
"আর বলো না, লালগোলা লোকাল তো, কোনটা প্যাসেঞ্জার – কোনটা ভেন্ডার বোঝা যায় না, পাশের একটা দিলখুস-ওয়ালা যাচ্ছিলো, গোটা রাস্তাটা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে গেলো"

গিন্নিও জেরা থামিয়ে টুবাই-টিকলুকে পড়া ধরতে চলে গেলেন। তেজেন-বাবুর মনে হলো শোয়েব আখতারের বলে আলতো খোঁচা দিয়ে উইকেট-কিপার, স্লিপ গলে যেন একটা বাউন্ডারি মারলেন তিনি … বসার ঘরে ঢুকেই দেখলেন আবার অবিনাশবাবু, সকালের পড়া কাগজটাই পড়ছেন আরেক রাউন্ড চা ধ্বংস করতে করতেঃ

"হেঁ হেঁ, খুব লেট যে আজকে, খুব খাটাচ্ছে না রেল কোম্পানি? তা আর নতুন লাইন তো আর পাতছে না বাবা, খাটায় কেনো কে জানে? … আচ্ছা আমার ওই রিজার্ভেশানটা? পারলেন নাকি একটা ম্যানেজ করতে … দাদা- বৌদিকে কিন্তু কথা দিয়েছি"
"নাঃ মশাই, টিকিটটা এবার হলো না আর বুঝলেন? আসল খবর তো আর পড়েন না, এদিকে আন্দামানে ভলক্যানো-টা জেগে উঠেছে আর পুরীর সমুদ্রে নাকি হাঙর বেরিয়েছে ! তা-ই এবার পুজোয় ঝেঁটিয়ে সব বাঙালী ডাল-লেক … এতো আগে থেকে কেটে ফেলেছে যে এবার বাথরুমে আপার-বার্থ -লোয়ার বার্থ লাগাতে হবে, আপনি বরং মুকুটমণিপুরটা ট্রাই করে ফেলুন "

অবিনাশবাবুর চুপসে যাওয়া মুখটাকে দেখতে দেখতে এবার সত্যি তেজেনবাবুর মনে হলো একটু হাততালি দিয়ে নেচে নেবেন, যেন স্টেপ আউট করে স্টুয়ার্ট ব্রডকে ছয় মারলেন গাঙ্গুলী … অনেকদিন পরে একটা হিন্দি গানের লাইন-ও মাথায় কোন কুঠরি থেকে বেরিয়ে পড়লো, তেজেনবাবু ঠিক করলেন, নাঃ টুবাই-টিকলুকে আজকে আর অ্য্যালজেব্রা না করিয়ে গল্পই শোনাবেন বরং … বাৎসরিকের স্পিচটারও আইডিয়া আসছে মাথায় !

                                                                        <৪>

"থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ … অবিনাশবাবু এবারে একটু বসুন, এই টুবাই দেখতো কলিংবেল বাজালো কে? টিকলু মা-কে দেখো তো কি লাগবে? …

আপনারা যে এতোসবের মধ্যেও এসেছেন … কি বলবো, খুব-ই একটা আনন্দের ব্যাপার, বাবা বেঁচে থাকলে … অবশ্য তিনি থাকলে কি আর বাৎসরিক করতাম … যাই হোক, বাবাকে যাঁরা চেনেন অনেকদিন – তাঁরা তো সব-ই জানেন, তা-ও দু-চারটে কথা বলবো আজকে…

আমার বাবা, রাজেন্দ্রনারায়ণ, সারা জীবন ইস্কুলে পড়িয়েছেন, কিন্তু শুধুই মাস্টার ভাবলে ভুল হবে! আমার বাবা ছিলেন একাধারে অনেক, তিনি ছিলেন ফুটবলার, পর্বতারোহী, আবার রীতিমতো প্রকাশিত হওয়া লেখক-ও …এক-ই অঙ্গে এতো রূপ যাকে বলে !

যখন ফুটবল খেলতে নেমেছেন, ভারতবর্ষ তখনও পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ, বাবা বললেন, নেটিভ রেফারী না দিলে টিম মাঠেই নামবে না – তার সাহস ছিলো, ইংরেজ শাসক মেনে নিলো, আবার যখন পাহাড়ে চড়েছেন, মাইনাস টেন-এ পাহাড় চড়ে পৌঁছেছেন অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্পে – সেখানে কত দেশের লোকের সাথে আলাপ ছিলো, পেন ফ্রেন্ড ছিলেন অনেক ফরেনারের … সেসব চিঠি আছে এই বাড়ির-ই কোথাও !

ফিরে এসে বই-ও লিখেছেন, তাও চাকরি করতে করতে, কিন্তু লজ্জার কথা, সে বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি … জন্মের আগেই লাস্ট কপিটাও হারিয়ে গেছে কোথায় কেউ জানেনা …

আমি সে তুলনায় নিতান্তই সাদামাটা ছাপোষা একজন কেরানী, কোনো দাগ-ই কাটতে পারিনি … কিন্তু আশা রাখি বাবা, তার কাজের দৌলতে … আপনাদের মনে তিনি চিরজাগরূক থাকুন"


                                                                       <৫>

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি-ই হলো একটু তেজেনবাবুর, বড্ড ধকল এক-একটা ফাংশান ! উঠে দেখলেন সকাল দশটা দশ, গিন্নি টুবাই-টিকলুকে নিয়ে কোচিং ক্লাসে চলে গেছেন – সত্যি বাচ্চাগুলোর রোববার বলেও কিছু নেই ! কিচেনে একটা উলটে রাখা প্লেট, চ্যাঙ্গারিতে জিলিপি রাখা, আর কাগজের ঠোঙ্গায় কচুরি … এখনও একটু গরম আছে। প্লেটটা নিজের দিকে টানতেই দেখলেন, তলায় একটা ভাঁজ করা কাগজ – ফুলস্ক্যাপ পায়োনীয়ার খাতা, ধারটা একটু এবড়ো-খেবড়ো  হয়ে গেছে টেনে ছিঁড়তে গিয়ে …

বাবা, 

গতকাল তুমি ক্লান্ত ছিলে, মা-ও… তাই চিঠিটা আজকে দিচ্ছি, নিশ্চয়ই কোচিং থেকে ফেরার আগে তোমার পড়া হয়ে যাবে, তা-ই এসেই বকুনি বা মার খাবো এটা জেনেই আজকে আর মন বসবে না পড়ায় … 

দাদুভাইয়ের হাত কাঁপতো খুব জানো তো? তাই দুপুরে বাড়ি থাকলেই আমাদের ডেকে ডিক্টেশান দিতো, ডায়রি লেখার জন্য, এক ঘন্টা টানা লিখে দিলে দশ দশটা টাকা! বলতো আত্মজীবনী লিখছিস, তাই বানান-গ্রামার যেন একটুও ভুল না হয় … তা-ও একটা দুটো হয়েই যেতো, কি করবো !

ডায়রিটা এখন সবসময় আমাদের স্কুল ব্যাগেই ঘোরে, আমরা টিফিন টাইমে আর ছুটির পরে ছোটবাড়ির ঠাকুরদালানে বসে পড়ি মাঝেমাঝেই, যেদিন খুব মনে পড়ে … এখন প্রায় সবকটা পাতাই মুখস্ত হয়ে গেছে … তাই তোমাকে না দেখেই বলতে পারি কবে কি হয়েছিলো !

ছোটোবেলায় খুব হাঁপানির টান ছিলো দাদুভাইয়ের, তাই টানা খেলতে পারতো না … তবে পায়ে নাকি দারুণ কাটাতে পারতো এদিক ওদিক, তাই রিজার্ভ বেঞ্চে বসতে হতো সব ম্যাচেই … একটা বড় ম্যাচের ফাইনালে ডাক পেয়েছিলো, তবে খেলতে নয়, রেফারি আসেনি বলে দাদুভাই বাঁশি নিয়ে নেমে পড়েছিলো মাঠে, ভাবতে পারো? 

টিকলুরও হাঁপানির টান, ওর-ও বেশী হাইটে যাওয়া কষ্ট, তবে ওর-ও খুব ইচ্ছে একদিন যাবে । দাদুভাইয়ের সকালের সেই গানটা আছে না, "পঙ্কে বদ্ধ করো করী, পঙ্গুরে লঙ্ঘাও গিরি"। আমাদের বলতো পাহাড়ের মাথায় আজকাল নাকি সোজা হেলিকপ্টারেই যাওয়া যায়, একদিন নিশ্চয়ই সবাই মিলে গিয়ে দেখবো ,তাই না বলো?

বইটা সত্যি ছিলো কিনা সেটা কিন্তু আমরা জানিনা, হয়তো ছিলো, সে গল্পটা আর ডিক্টেশানের সময় পাইনি… তবে ডায়রিটা র ভেতরে লেখা তোমাকে উৎসর্গ করে গেছে দাদু, আর মলাটের উপর নামটা কাঁপা কাঁপা হাতে লিখেও গেছে নিজেই । 


আগে পড়তে পারিনি, কাল সন্ধ্যেয় গানটা শুনে চিনতে পারলামঃ 
"আমার শেষ পারানির কড়ি কন্ঠে নিলেম " … 

ইতি,
টুবাই ও টিকলু 

তেজেনবাবুর গল্প
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments