আগস্টস্য তৃতীয় দিনে উনি দেহ রেখেছিলেন। অবশ্য সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের সম্পর্কে দেহ রাখা কথাটা না খাটলেও উনি কিন্তু সে অর্থে কমিউনিস্ট ছিলেন না, ধর্মকর্মে তাঁর ঘোষিত মতি ছিল। তিনি প্রাক্তন পরিবহণ-ক্রীড়ামন্ত্রী, তাঁর ডাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ মুহূর্তে ব্রিগেড ভরিয়ে দিত। তো তাঁর মৃত্যুদিনে তাঁর ভক্তকূল তাঁকে স্মরণ করবেন এ আর এমন কি নতুন কথা – সব মহাপুরুষেরই একই গতি হয়। ইতিউতি চোখে পড়ল সেই বিখ্যাত উক্তি – মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা ছাড়া আমি সব কিছুই করতে পারি – র ঐতিহাসিক মূল্যায়নে। তবে ভক্তের দল এই উক্তিটি কি কারণে করা হয়েছিল তা বেমালুম বিস্মৃত হয়েছেন, না হওয়ারও কোনও কারণ আপাতদৃষ্টিতে অনুপস্থিত। এই সদম্ভ উক্তিটি যে প্রয়াত কমরেডের চরিত্রের একটি অন্যতম দিক এবং এই শব্দবন্ধ যে একমাত্র তাঁর মুখেই মানায় সেই বিষয়ে দেখা গেল ভক্তগণ একমত হয়েছেন।

এবারে সেই প্রসঙ্গে আসি। এই উক্তি সৃষ্টির প্রেক্ষাপট। অনেকেরই খানিকটা মনে আছে। তবু আরেকবার বলি।

১৯৯৩ সালের মে মাসের ছয় তারিখ সংবাদমাধ্যম মারফত জানা গেল একজন ধর্মীয় গুরুদেব নির্বিকল্প সমাধিতে চলে গেছেন এবং তাঁর ইচ্ছাধীন সময়ে আবার সমাধি ত্যাগ করে দেশের আকাশ থেকে বাজপাখী তাড়িয়ে দিয়ে নেতাজীকে ফিরিয়ে এনে কড়া চাবুক হাতে বৈদিক সভ্যতা পুনর্স্থাপন করতে আত্মনিয়োগ করবেন। এই নির্বিকল্প সমাধিটি দ্বারভাঙ্গা না রোলার কোস্টার সেটি বুঝতে ব্যর্থ একদল মূর্খ চিল চিৎকার জুড়ে দেয় গুরুদেব পৃথিবী ত্যাগ করে গেছেন, তাঁর ফিরে আসার কোনও সম্ভাবনাই নেই, অন্তত বিজ্ঞান তাই বলে। বিজ্ঞানে বিশ্বাসীরা আসলে সব বিষয়েই চূড়ান্ত অবিশ্বাসী, কোনও কিছুতে, কোনও ভাবেই তাদের আর বিশ্বাস জন্মানো যায় না। অতএব এদের ধর্তব্যের মধ্যে না এনে গুরুদেবকে স্বধাম মানে হেড আশ্রমে নিয়ে এসে বিছানা-বালিশ পেতে শুইয়ে দেওয়া হল। এই হেড আশ্রমটি অতি মনোরম স্থান। আক্ষরিক অর্থেই আশ্রমের পশ্চিম দেওয়াল ঘেঁসে পতিতোদ্ধারিনী গঙ্গা বয়ে চলেছেন। নির্বিকল্প সমাধি ধারণের আদর্শ জায়গা বললেও কম বলা হয়। আজকের মত মিডিয়া সর্বগ্রাসী না হলেও গুরুদেব সমাধি ধারণ করেছেন এই বার্তা অচিরেই রটে গেল। দলে দলে ভক্ত হাজির হল এই অপার্থিব দৃশ্য স্বচক্ষে দেখে ক্ষুদ্র মানবজীবন ধন্য করার উদ্দেশ্যে। দেখতে দেখতে বিটি রোড থেকে হেড আশ্রম পর্যন্ত প্রায় পাঁচ-সাত কিলোমিটার রাস্তার দুইধারে কচুরি-তরকারি, মুড়ি-তেলেভাজা, জিলিপি-জিভেগজা, খেলনাবাটি বিক্রির ডাউনস্ট্রিম ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ কিছু কর্মসংস্থান হয়ে গেল। শিশুদের খেলার মাঠ দখল করে লাইনের সর্পিল গতি, লাইনের একধারে প্রয়োজনে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা সঙ্গে তারস্বরে সুরে-বেসুরে প্রার্থনাসঙ্গীত, এক এলাহি কর্মকান্ড শুরু হয়ে গেল গোটা এলাকা জুড়ে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে আগত দর্শনার্থীরা যত্রতত্র পথঘাট বেছে নেওয়ার ফলে সামান্য কিছু অসুবিধে হলেও কষ্ট না করে কবে আর কে কেষ্ট পেয়েছে। সুতরাং দামী পারফিউম এবং বোটকা গন্ধের ককটেলসমৃদ্ধ সমাধি এবং সমাধি দর্শন চলতে লাগল। চলল পঞ্চান্ন দিন যাবৎ।

কেন পঞ্চান্ন দিন ধরে চলল ? আটচল্লিশ বা ঊনষাটে কি ক্ষতি ছিল ? তৎকালীন রাজ্যসভার গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন আমাদের পূর্বোক্ত প্রয়াত কমরেড, কেন প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেননি ? ‘মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা ছাড়া আমি সব কিছুই করতে পারি’ – ডায়ালগ দেওয়া ছাড়া আর কোনও কিছুই কেন করলেন না এই পঞ্চান্ন দিন ধরে ? পানিহাটি, সুখচর, খড়দার একাংশ – এই বিস্তীর্ণ এলাকার নাগরিককে এক অসহনীয় অবস্থার মধ্যে ফেলে কেন প্রশাসন হিরণ্ময় নীরবতা অবলম্বন করে রইল ?

এবারে আগের পঙক্তিতে করা প্রশ্নের উত্তর দিই। অবিশ্যি উত্তর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। একটি মাত্র শব্দ – রাজনীতি। শুধুমাত্র রাজনীতির কারণেই এই বেলেল্লাপনা চলার সাহস পেয়েছিল। সালটা ছিল ১৯৯৩ সাল। সেই বছরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুরসভার ভোট। ভোটটা পানিহাটিতেও ছিল। কিন্তু গোটা পানিহাটি পুরসভা তো আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। কয়েকটি ওয়ার্ডমাত্র। তখনও খাস আর ঘাস কংগ্রেস একসাথেই আছে, এছাড়া পানিহাটিতে সেভাবে আর কারও অস্ত্বিত্বও নেই। একটু দেখেশুনে খেললে হাতের পানিহাটি হাতেই থাকবে। কিন্তু সারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে যেসব বিশ্বাসী সুখচরে ভিড় জমিয়েছে তাদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে বের করতে গেলে পুলিশের লাঠিই একমাত্র গতি। এবং স্বভাবতই এরা যেসব পুরসভা বা লাগোয়া অঞ্চলের বাসিন্দা সেসব জায়গায় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে যা ভোটবাক্সকে প্রভাবিত করবেই। আর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ধর্মই হল সবসময় তিলকে তাল বানায়। কি দরকার এতসব ঝামেলায় গিয়ে।

শেষ অবধি রাতের অন্ধকারে পুলিশের লাঠির ঘায়েই এলাকা খালি করা হল। পুরভোট মিটে যাওয়ার ঠিক একদিন পরেই

তোমার সমাধি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments