ইতিহাসের আজীব মাইফেলে গড়পরতা আম্রজনতার খুব একটা ভ্রূক্ষেপ নেই। সে চলে তার মত বাদুড়ঝোলা ধ্বস্তাধস্তি টালমাটাল, আর ইতিহাস চলে ইতিহাসের মত সাজানো পরিপাটি রূপকথা। কখনো কদাচিৎ যদি বা মুখোমুখি, আইদার সে চিনতেই পারেনা, নতুবা ইয়া পেল্লায় লাফে একদম পগার পার। সেই জন্যেই দেখবেন পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশেই পাবলিকে ও তার ইতিহাসে যাকে বলে এক্কেরে গঙ্গা গঙ্গা ফাঁক। আমাদের দেশেও এই ট্র্যাডিশানের কোন ব্যত্যয় নেই। ছাত্রাবস্থা থেকেই যে ইতিহাস পড়ানোর নাম করে অপাপবিদ্ধ কচি মনগুলির উপর নারকীয় টেররিসম্‌ চালানো হয় তার অধিকাংশটাই আসলে গপ্পকথা, যার সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার কোন যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। বা থাকলেও সেই সত্যের পারসেন্টেজ এতই কম যে তার সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় মহাভারতের “অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ” এপিসোডের। 

তো এহ্যানো সিচুয়েশানে আজ আমারা চর্চা করবো ভারতবর্ষের কলোনিয়াল যুগের একদম গোড়ার দিকের বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং ইভেন্ট নিয়ে। যেসব অলিখিত ইতিহাস বাঙলা তথা ভারতবর্ষ সহ সমগ্র পৃথিবীর মানবেতিহাসের ধারাকে এক ঝটকায় অনেকটা বদলে দিয়ে গেছিল।

***

সপ্তদশ শতাব্দী হল ভারতীয় সাবকন্টিনেন্টের ইতিহাসের ক্ষেত্রে অন্ত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা শতক। কারণ এই সেই সময় যখন বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশগুলির কাছে আমাদের দেশের অফুরন্ত স্বর্ণ ভাণ্ডারের সিংহদুয়ার আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে এবং তারাও সাত সমুদ্দুর ত্যারো নদী পেরিয়ে এই পোড়া দেশের উপকূলে এসে একে একে জাহাজ ভেড়াতে শুরু করছে। এর আগে হুন শক পাঠান মুঘলরা এসে প্রায় সাত-আটশ বছর ধরে লুঠপাট করে, চেটে চুষে চিবিয়ে গিলেও যে বিপুল ঐশ্বর্য পুরোপুরি হজম করে উঠতে পারেনি এবং আগামী মাত্র দু’শ বছরের মধ্যেই তার যাবতীয় সুলুক সন্ধানের ঠিকানা লাগিয়ে দেবে যারা সেই প্রবল পরাক্রমশালী ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (তৎকালীন নাম ‘Governor and Company of Merchants of London trading with the East Indies’) ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল বাদশাহ নুরউদ্দিন সেলিম জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ভারতবর্ষে বাণিজ্য করবার সনদ নিয়ে এসে হাজির হলেন ভারত মহাসাগরের উপকূলে। প্রথম কয়েকটা বছর নির্বিঘ্নেই কেটে গেল। সুরাট (১৬১২) ও মাদ্রাজে (১৬৩৯) গড়ে উঠলো দু’টি ট্রেড সেন্টার এবং ধুরন্ধর বেণিয়া বুদ্ধিবলেই হোক বা মা লক্ষ্মীর কৃপাদৃষ্টির প্রভাবেই হোক, তাঁদের ব্যাবসা ক্রমে ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগলো। এবং অচিরেই তাঁদের নজর গিয়ে পড়লো বঙ্গভূমির উপর।   

গাঙ্গেয় দক্ষিন বঙ্গের হুগলি তখন সমস্ত বিদেশীদের কাছে যাকে বলে একেবারে মেল্টিং পট। ব্যান্ডেল থেকে শ্রীরামপুর পর্যন্ত বাঙালী ছাড়াও সাতটি বিদেশি জাত (পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, ফরাসী, ব্রিটিশ, ডেনিশ, আর্মানিয়ান ও মুঘল) একসঙ্গে ওঠবোস করছে এবং একই ঘাটের জল খাচ্ছে। যদিও সে সময় বাংলায় একচেটিয়া ব্যাবসাকারি প্রধান ইউরোপীয় শক্তি ছিল পর্তুগীজ। তাদের তখন রমরমা অবস্থা। সপ্তগ্রাম আর কাশিমবাজারের দুই ট্রেড সেন্টার থেকে হুলিয়ে ব্যাবসা করে আর গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল থেকে মুঘল হারেমের জন্যে দেদার মাগী সাপ্লাই করে তাদের গতরে তখন কিলো কিলো চর্বি জমেছে। তার সঙ্গে আছে ব্যান্ডেল থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জলপথ এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চল জুড়ে ব্যাপক লুঠতরাজ ও জলদস্যুবৃত্তি। সবমিলিয়ে তারাই তখন বাংলার শের। কিন্তু বাপেরও যে বাপ থাকে এই সহজ সত্য টা তাদের বোধহয় জানা ছিলনা। তাই দোর্দণ্ডপ্রতাপ মোঘলের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে গিয়ে অচিরেই তাদের সোনার তরী সখাত সলিলে সমাধিপ্রাপ্ত হল। আসল গপ্পোটা কিঞ্চিৎ অপ্রাসঙ্গিক হলেও এতই মজাদার যে না বলে পারছিনা।

মুঘলাই ট্র্যাডিশান মাফিক বিদ্রোহী যুবরাজ খুররম্‌ তখন নিজের বাপ জাহাঙ্গীর কে খেঁদিয়ে দিল্লীর মসনদ দখল করবার তালে হন্নে হয়ে ঘুরছেন। বিভিন্ন অ্যান্টি-স্টেট রেজিম গুলোতে ঘুরে ঘুরে শক্তি সঞ্চয় করতে করতে যখন তাঁর জুতোর সুকতলা ক্ষয়ে যাওয়ার যোগার সেই সময় ১৬২১ সালের কোনও এক সন্ধায় হঠাৎ তাঁর সঙ্গে দেখা হল হুগলীর তৎকালীন পর্তুগীজ গভর্নর মাইকেল রডরিগেজ-এর। এবং তিনি এই পর্তুগীজ রাজপুরুষের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। কিন্তু গভর্নর রডরিগেজ এই ত্রিশ বর্ষীয় মুঘল যুবরাজকে একটু বেশীই আন্ডার-এস্টিমেট করেছিলেন। তাই তিনি সাহায্য তো করলেনই না, উপরন্তু পাবলিক প্লেসে খুররম্‌ কে নিয়ে বেদম খিল্লি-বটকেরা করে যাচ্ছেতাই কান্ড ঘটালেন। যুবরাজ খুররম্‌ পুরো অপমানটা চুপচাপ হজম করে নিয়ে দিল্লী ফিরে এলেন, এবং সাত বছর পরে জাহাঙ্গীরের মৃত্যর পর ১৬২৮ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি ‘শাহ জাহান’ নাম নিয়ে দিল্লীর সিংহাসনে বসলেন। কিন্তু সাত বছর আগের সেই অপমানের দগদগে ঘা তাঁর মন থেকে তখনো শুকোয়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হল। শাহজাহান দিল্লীর মসনদে বসেই কাশিম খান নামে এক খতরনাক যুদ্ধবাগীশ কে হুগলীর গভর্নর মনোনীত করে পাঠালেন এবং তিনি হুগলীতে পদার্পণ করে মাত্র চার বছরের মধ্যেই পর্তুগীজদের কেলিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দিলেন। ১৬৩২ সালে মুঘলদের সঙ্গে যুদ্ধে এক লপ্তে প্রায় এক হাজার পর্তুগীজ মারা পড়লো এবং আরও প্রায় সাড়ে চার হাজার কে বন্দী করে দিল্লী নিয়ে যাওয়া হল, গুঁড়িয়ে দেওয়া হল শতবর্ষ প্রাচীন পর্তুগীজ দুর্গ ও ব্যান্ডেল-হুগলী সন্নিকটস্থ যাবতীয় পর্তুগীজ ট্রেড সেন্টারগুলি। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই সাড়ে চার হাজার যুদ্ধবন্দীর মধ্যে অসংখ্য নারী ছিলেন যাঁদের কে পরম দয়াশীল শাহজাহান নিজ গুণে ক্ষমা করে দিলেন এবং আশ্রয় দিলেন নিজস্ব বাদশাহি হারেমে।)

আর ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকা ধূর্ত ইংরেজ এসে পর্তুগীজদের সাজানো বাগানে গেঁড়ে বসলেন। শাহজাহানের কাছ থেকে ১৬৩৮ সালে তাঁরা বাগিয়ে নিলেন বাংলায় ব্যাবসা করবার সনদ এবং ১৬৫১ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলার বুকে প্রথম ব্রিটিশ কুঠি গড়ে উঠলো হুগলীর ঘোলা ঘাটের কাছে (বর্তমান হুগলী জিলা সংশোধনাগার ও পুরনো হুগলীঘাট রেল ষ্টেশন সংলগ্ন অঞ্চল), ঠিক যেখানে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ছিল পর্তুগীজদের দুর্গ (গুগল ম্যাপে জায়গাটা দেখুন)। পৃথিবীতে কলকাতা বলে তখনো কিছু এক্সিস্ট করেনা। সুতানটী গোবিন্দপুর ইত্যাদি কয়েকটা পুঁচকে পুঁচকে অখ্যাত গ্রাম যদিও আছে, তবে সে থাকা না থাকায় কারুরই কিছু যায় আসে না। 

***

কথায় বলে, ‘স্বভাব যায় না মলে আর ইজ্জৎ যায়না ধুলে।’ তাই বাইরে শান্ত শিষ্ট ভদ্দোরলোক সেজে থাকলেও সুবিধাবাদী ইংরেজের প্রকৃত রূপ প্রকাশ পেতে খুব বেশী দিন লাগলো না। অচিরেই ব্যাবসায়ীর বেনিয়ান ছুঁড়ে ফেলে তার অঙ্গে উঠে এলো সেনা নায়কের খাঁকি উর্দি। উদ্ধত ইংরেজ সমগ্র মুঘল ভারত জুড়ে বাণিজ্য করবার জন্য একটি সনদ চেয়ে ১৬৮২ সালে বাংলার দেওয়ান শায়েস্তা খাঁ-এর কাছে বায়না জুড়লেন। কিন্তু এই সনদের পক্ষে তৎকালীন বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের সায় না থাকায় সেই বায়নায় সীলমোহর পড়ল না। ফলে লন্ডনে ভারতবর্ষের প্রথম ব্রিটিশ গভর্নর-জেনারেল স্যার জোসিয়া চাইল্ড খচে গিয়ে একটি চাইল্ডিশ ডিশিসান নিয়ে বসলেন। তিনি মুঘল বাদশাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। ইতিহাসে এই যুদ্ধ child’s war নামে খ্যাত।

১৬৮৫ সাল নাগাদ প্রায় ২০০ টি কামান এবং ৬০০ সেপাই-সান্ত্রী নিয়ে ব্রিটিশ বাহিনী হুগলীর রয়্যাল পোর্ট ও তৎসংলগ্ন মুঘল দুর্গ ঘেরাও করলো। ইংরেজ বাহিনীর পক্ষে অতিশয় খচ্চর, মাতাল এবং ভয়ানক মাগিবাজ এক ব্রিটিশ কম্যান্ডার এই যুদ্ধে একদম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁর নাম জোব চার্নক। এর কয়েক বছর আগেই ভদ্রলোক চট্টগ্রামে একটি হিন্দু (মতান্তরে মুসলমান) বিধবা মহিলা কে বিয়ে করতে গিয়ে বামাল ধরা পড়েন এবং কোনোক্রমে পালিয়ে বাঁচেন। বিপর্যস্ত ইংরেজ হাইকম্যান্ড তাঁকে একচোট ধমক ধামক দিয়ে হুগলীতে পাঠিয়ে দিলেন, এবং তিনিও প্রভুদের সামনে নিজের ইমেজ ভালো করবার লক্ষে মুঘলের সঙ্গে তুমুল ঝারপিটে লিপ্ত হলেন।

কিন্তু ব্যাপারটা ঔরঙ্গজেবের মোটেই পছন্দ হলনা।

ফলে অচিরেই ফুল মুঘল ব্যাটেলিয়ন হুগলীর উপকণ্ঠে এসে হাজির হল এবং হোগলা বনের ধারে (‘হুগলী’ নামকরণের একটি সাম্ভাব্য কারণ) তাঁবু ফেলবার ফলে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া আক্রান্ত ব্রিটিশ বাহিনীর পেছন খলখলে করে ছেড়ে দিল। মোগলের গোলায় জোবের জোব্বা ফুটো হয়ে গেল। অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটের তাড়া খাওয়া জেব্রা-শাবকের মত তিনি হুগলী থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার ভাঁটিতে গঙ্গার পুব পাড়ের একটি ছোট্ট গ্রাম সুতানটীতে পালিয়ে গিয়ে কোনোমতে প্রাণ বাঁচালেন।

কিন্তু ঔরঙ্গজেবের রাগ এত সহজে কমবার নয়। কোথাকার কোন বিটকেল গায়ে-গন্ধ লালমুখোদের এত সাহস হয় কি করে যে তারা মুঘল বাদশার কথার অমান্যি করে? আগুনের চুল্লিতে একতাল গব্যঘৃত ফেলে দিলে যেমন আগুন দপ্‌ করে জ্বলে ওঠে তেমনি এক পেল্লায় হুঙ্কারে তিনি হুগলীর ইংরেজ কুঠি দখল করবার পর বোম্বের কুঠিও দখল করে নিলেন এবং ক্লান্ত হতোদ্যম ইংরেজকে নাকে খত দিইয়ে, নগদ ছ’লক্ষ টাকা জরিমানা নিয়ে, তাঁকে দিয়ে সৎ পথে ব্যাবসা করবার ও তাঁদের ওই নোংরা লাল নাক টি অন্যের কারবারে না গলাবার চুক্তি তে দস্তখৎ করিয়ে তবে ছাড়লেন।

কিন্তু ইংরেজ ইংরেজই। তাই ১৭০৬ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যর পর তাঁরা কি করলেন? তাঁরা সিম্প্‌লি সেই চুক্তি লঙ্ঘন করলেন।

[ব্রিটিশ জেনারেল ঔরংজেবের সামনে নাকখত দিচ্ছেন]

***

ভারতবর্ষীয় পাবলিকের চরিত্র বোঝবার জন্য ধুরন্ধর ইংরেজ কে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। (বস্তুত, ১৭ শতকের গোড়ার দিকে তাঁরা ইংল্যান্ড থেকে রীতিমত লোকজন আনিয়ে গন্ডা গন্ডা পাউন্ড খরচা করে এদেশি জনগনের মানসিক ও চারিত্রিক গঠনের ওপর একাধিক সার্ভে করান। এইসব সার্ভের অজস্র মজাদার এবং অব্যর্থ রিপোর্ট নিয়ে পরে কখনো কিছু লেখবার ইচ্ছে রইল।) তাই বিবিধ ছল-চাতুরির দ্বারা ছোট ছোট রাজা বাদশাদের একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে ক্রমে তাঁরা নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে শুরু করলেন।

ইতিমধ্যে ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো, এবং ইঙ্গ-ফ্রেঞ্চ কলহের আঁচ এসে লাগলো এদেশের রাজনীতিতেও। ভারতে ব্যাবসাকারী দুই যুযুধান প্রতিপক্ষ ইংরেজ ও ফ্রেঞ্চ শিবিরের দলাদলিতে এবার যুক্ত হল বিভিন্ন ভারতীয় আঞ্চলিক শক্তিগুলিও। আর যুক্ত না হয়ে উপায়ও ছিলোনা। কারণ দিল্লীর বাদশাহি রাশ যত দিন যাচ্ছিল ক্রমে আলগা হয়ে আসছিল, এবং ইংরেজের মানদণ্ডও ক্রমে পুলিশের ডান্ডায় রূপান্তরিত হতে যাচ্ছিল।

বাংলা হয়ত এই জটিল পলিটিক্স থেকে নিস্তার পেতে পারতো। কিন্তু কিছুর মধ্যে কিছু নেই, ঠিক সেই সময়তেই কোত্থেকে একপাল বর্গি এসে সারা বাঙলা জুড়ে ব্যাপক ম্যাসাকার আরম্ভ করলো। আর এই ম্যাসাকার চলল একটানা প্রায় দশ বছর ধরে। ফলে বাংলার তৎকালীন মোঘল নবাব আলিবর্দি খান কে একরকম বাধ্য হয়েই ইংরেজের সঙ্গে হাত মেলাতে হল। বদলে সেয়ানা ইংরেজ সমগ্র বাংলা জুড়ে ব্যাবসা করবার এবং কোলকাতায় পাকাপাকি ভাবে একটি কুঠি নির্মাণ করবার অধিকার লাভ করল। তবে আলিবর্দি সমঝদার আদমি ছিলেন। তিনি জানতেন যে ব্রিটিশরা সুযোগ পেলেই তাঁকেও তাদের ফ্রেঞ্চ বিরোধী যুদ্ধে শামিল করবার চেষ্টা করবে। তাই তিনি ইংরেজ ও ফ্রেঞ্চ উভয়পক্ষের থেকেই যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন এবং কখনোই তাঁদের সঙ্গে প্রয়োজনাতিরিক্ত মাখামাখি করেননি।        

কিন্তু ১৭৫৬ সালে আলিবর্দি খানের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এই সমঝদারি সাড়ে তিন হাত মাটির নীচে চলে গেল। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলার মসনদে বসলেন আলিবর্দিরই উনিশ বছর বয়েসি চূড়ান্ত বদমেজাজি ও আখাম্বা গাম্বাট নাতি সিরাজদৌল্লা। ঠিক এই সময়তেই ইউরোপে ইঙ্গ-ফরাসি বিবাদ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও এদেশে তখনো তা প্রকৃত যুদ্ধের রূপ নেয়নি। কিন্তু নাকের ডগায় ফরাসডাঙ্গার বিটলে ফ্রেঞ্চগুলো যে কি সলতে পাকাচ্ছে কেউ জানেনা। তাই সাবধানের মার নেই এই ভেবে সতর্ক ইংরেজ কোলকাতায় একটা পেল্লায় দুর্গ (অধুনা কলকাতা জিপিও ভবন) নির্মাণ করতে শুরু করলেন। আর এদিকে বিনা অনুমতিতে ইংরেজের দুর্গ নির্মানের এই খবর কানে যাওয়া মাত্র নব্যাভিষিক্ত নবাব একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ এই দুর্গ নির্মানের কাজ থামাবার হুকুম জারি করে আদেশনামা পাঠালেন। কিন্তু অভিজ্ঞ ইংরেজ সেই হুকুম কে পাত্তাই দিলেন না। ফলস্বরূপ, একজন উনিশ বর্ষীয় উঠতি গাম্বাটের হাতে একটা সত্যিকারের সৈন্যবাহিনী ও বিপুল পরিমাণে গোলা বারুদ থাকলে সে যা করতে পারে, সিরাজও ঠিক তাই করলেন।

তিনি সশরীরে কলকাতা আক্রমণ করলেন।

এবং সিরাজের বিশাল বাহিনীর কাছে কলকাতাস্থিত ছোট্ট ইংরেজ সেনাবাহিনী একেবারে ন্যাজে-গোবরে হয়ে গেল। মোট ১৪৬ জন ব্রিটিশ সৈন্য ও নাগরিক নবাবি সেপাইদের হাতে বন্দী হলেন। ব্যাপারটায় সিরাজ ভারী আমোদ পেলেন। আর এই আমোদের চোটে তিনি যে কাজটি করলেন সেটি কে নিঃসন্দেহে ভারতীয় ইতিহাসের একটি গাঁড়লতম পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচনা করা যায়।

উনিশ বছরের চ্যাংড়া ছোঁড়ার পক্ষে এই জয়ের আনন্দ হজম করা এতোটাই ডিফিকাল্ট ছিল যে তিনি আনন্দে সব ক’টা বন্দী কে ইংরেজ দুর্গের একটা ছোট্ট ঘুপচি অন্ধকার কামরার মধ্যে বন্দী করে রেখে মদ-মেয়েছেলে নিয়ে সারা রাত্তির দেদার মস্তি লুটলেন। ফলে ১৪ ফুট বাই ১৮ ফুটের একটি দরজা-জানলাহীন ছোট্ট কামরা, যেখানে কোনোক্রমে ৩-৪ জন বসতে পারে এমন একটি অন্ধকূপের মধ্যে ১৪৬ জন কে সারারাত্রি আটকে রেখে দিলে যা হতে পারে তাই হল! পরের দিন সেই অন্ধকূপের দরজা খুলে ১২৭ টি মৃত ও ১৯ টি অর্ধমৃত ইংরেজ কে পাওয়া গেল।  ইতিহাসে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ‘কলকাতার অন্ধকূপ’ নামে পরিচিত।

বলা বাহুল্য, এই ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই ইংরেজের ঝাঁট জ্বলে মাঠ হয়ে গেল।

ফলত এই উনিশ বর্ষীয় ছোঁড়াকে যোগ্য দাওয়াই দেওয়ার উদ্দেশ্যে ৬০০ গোরা সৈন্য ও আড়াই হাজার নেটিভ সেপাই বাহিনী নিয়ে রবার্ট ক্লাইভ নামে এক দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ জেনারেল সুদূর মাদ্রাজ থেকে বাংলায় এসে ল্যান্ড করলেন। এবং কলকাতা পৌঁছেই তিনি প্রথমে কলকাতার দুর্গ পুনরুদ্ধার করলেন। ইতিমধ্যে রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে একটি আফগান আক্রমণের খবর পেয়ে বিচলিত ও বিভ্রান্ত সিরাজ তাড়াহুড়োয় কলকাতার ইংরেজদের সঙ্গে সন্ধি চুক্তি করে ফিরে গেলেন।

এর আগে কলকাতা আক্রমণ করতে যাওয়ার পথে সিরাজ চুঁচুড়ার ওলন্দাজ এবং চন্দননগরের ফরাসিদের কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠান। উত্তরে ডাচরা মৌনী ধারণ করলেও ফ্রেঞ্চরা তাঁকে সাদরে অভ্যর্থনা করেন ও ২৫০ ব্যারেল বারুদ উপহার পাঠান। ফলে ফিরতি পথে সিরাজ চন্দননগরে নেমে ফরাসীদের সঙ্গে দু’পাত্তর রেড ওয়াইন খেয়ে এবং প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা কর ছাড় দিয়ে তাঁদের সঙ্গে মিত্রতার বন্ধন দৃঢ় করলেন এবং চুঁচুড়ার ওলন্দাজ কুঠি থেকে কর এবং জরিমানা বাবদ সর্বসাকুল্যে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা আদায় করে নিয়ে মুর্শিদাবাদ ফিরে গেলেন।

কিন্তু সিরাজ পেছন ফিরতে না ফিরতেই ক্লাইভ আবার রণং দেহি মূর্তি ধারণ করলেন এবং চন্দননগরের ফ্রেঞ্চ সেট্‌লমেন্ট আক্রমণ করে ফরাসীদের ফোর্ট অঁরল্যা গুঁড়িয়ে দিলেন। ফলে নব-অঙ্কুরিত ফরাসী পীরিতির পরম আবেগ ধরে রাখতে না পেরে সিরাজ পুনরায় যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হলেন এবং ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন কলকাতা থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে পলাশী নামক একটি অখ্যাত গ্রামের একটি বিশাল আমবাগানের মধ্যে তিনি ইংরেজ বাহিনীর মুখোমুখি হলেন।

৩৫ হাজার পদাতিক সৈন্য, সাত হাজার অশ্বারোহী এবং ৫৩ টি কামান (যার মধ্যে ৮ টির নীচে ‘Made in France’ লেখা) নিয়ে সিরাজদৌল্লা পলাশীর ময়দানে অবতীর্ণ হলেন। আর এই বিশাল সেনাবাহিনীর বিপক্ষে ছিল ৭৫০ মত গোরা সৈন্য, ২১০০ নেটিভ সেপাই, ৮ টি কামান এবং একজন রবার্ট ক্লাইভ! দৃশ্যটা কল্পনা করলে অনেকটা নিচের এই ছবির মতো লাগতে পারে।

কিন্তু এক্ষেত্রে ক্লাইভের হাতে একটা লুকোনো টেক্কা ছিল। নিশ্চয়ই ভাবছেন ‘মীরজাফর’? কিন্তু না, মীরজাফর নয়, এমনকি কোনও জীবিত প্রাণীই নয়। ক্লাইভের অস্তিনের নীচে যে মোক্ষম অস্তরটি সেদিন লুকোনো ছিল তা হল একটা নিতান্ত মামুলী ক্যাম্বিসের তেরপল!

আগেই বলা হয়েছে যে ব্রিটিশরা তাঁদের এই ভাবী কলোনিটি কে নিয়ে যথেষ্ট সিরিয়াস ছিলেন, এবং এদেশের সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে তাঁরা বিস্তর রিসার্চ করেছিলেন। ফলে তাঁরা জানতেন যে জুন মাসের মাঝামাঝি সময়টিতে ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষত বাংলায়, বর্ষাকাল আরম্ভ হয়। তাই প্রকৃতির এই অমোঘ নির্দেশটি কে উপলব্ধি করে বিচক্ষণ ক্লাইভ কলকাতা থেকে আসবার পথে একটি তেরপল সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন, এবং বলা বাহুল্য, সিরাজদৌল্লার মোটা মাথায় এই সাধারণ বুদ্ধি টা গজায়নি। এবং সেদিন দুপুরের দিকে প্রায় ঘন্টা দুয়েকের জন্যে আকাশ কালো করে ঝেঁপে বৃষ্টি নেমেছিল।

ফলে সিরাজ সারা দুপুর বসে বসে মোহম্মদ রসুল আল্লার গুষ্টির ষষ্টিপুজো করলেন। আর ওদিকে বৃষ্টি নামবার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিটিশরা তাঁদের সমস্ত গোলা-বারুদ তেরপল চাপা দিয়ে রাখলেন এবং সিরাজের আশু বিপর্যয়ের সম্ভাবনা কল্পনা করে ফুর্তিতে আমবাগানে গড়াগড়ি খেলেন।

যাইহোক, বৃষ্টি থামবার পর তেড়ে ক্যালাকেলি শুরু হল এবং সিরাজের প্রধান সেনাপতি মীর মদনের প্রবল বিক্রমে ইংরেজের প্যান্টালুন ইয়োলো হয়ে যাওয়ার যোগার হল। অতঃপর নাস্তানাবুদ ব্রিটিশ বাঁচবার আর কোনও রাস্তা না দেখে মীর মদনের দিকে কামান তাক করলেন এবং প্রথম বলেই ওভার বাউন্ডারি! শত্রুর কামানের গোলায় মীর মদন কে ভূপতিত হতে দেখে ক্রুদ্ধ সিরাজ নিজের গোলন্দাজ বাহিনীকে আক্রমণের আদেশ দিলেন।

এ প্রসঙ্গে নবীন চন্দ্র সেন মশাই তাঁর বিখ্যাত ‘পলাশীর যুদ্ধ’ কাব্যে লিখেছেন-

“অকস্মাত একেবারে শতেক কামান

করিল অনলবৃষ্টি

ভীষণ সংহার দৃষ্টি।

কত শ্বেত যোদ্ধা তাহে হল তিরোধান।”

কিন্তু অগ্রজ নবীন চন্দ্রের কাছে বোধহয় এই বৃষ্টি এবং তেরপল সংক্রান্ত তামাশাটির ইনফরমেশানটি ছিলোনা। অথবা হতে পারে যে তিনি সব জেনে শুনেই মুসলমানদের সঙ্গে এট্টু কাব্যিক মশকরা করে তাদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারেননি।

কিন্তু কেস যাই হোক না কেন, সিরাজের গোলন্দাজ বাহিনীর অধিনায়ক আক্রমণের আদেশ পেয়েই কামান দাগতে গেলেন এবং গিয়ে দেখেলেন হা হতোস্মি! কামান যে জগদ্দল পাথরের মত, এক্কেরে স্পিকটি নট। দুপুরের দু’ঘন্টা বৃষ্টিতে বারুদ ফারুদ সব ভিজে একেবারে গোবর হয়ে গেছে। আর ভিজে জ্যাবজ্যাবে বারুদ যে মানুষের কোনও কাজেই লাগেনা সেটা যখন সিরাজ রিয়ালাইজ করলেন তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। মাঝমাঠ অলরেডি বেদখল হয়ে গেছে, প্রধান সেনাপতি মীর মদন নিহত হয়েছেন, এবং শত্রুপক্ষ প্রায় ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে। এমত অবস্থায় তিনি তাঁর শেষ অস্ত্র অর্থাৎ সামরিক পরিভাষায় তাঁর right flank -টি কে অ্যাকটিভেট করলেন এবং আমবাগানের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ সীমান্তে ১০০০০ সৈন্যসহ অপেক্ষমাণ দ্বিতীয় সেনা-প্রধান মীরজাফর কে আক্রমণের আদেশ দিলেন।

এবং ঠিক এই মুহূর্তে হারামখোর মীরজাফর সিরাজ কে নিজের তিন ইঞ্চি দীর্ঘ মধ্যমা অঙ্গুলি টি প্রদর্শন করে সসৈন্যে ইংরেজ বাহিনীতে যোগ দিলেন।

***

অতঃপর পলাশীর যুদ্ধ শেষ হল। বিজিত হতোদ্যম সিরাজদৌল্লা পালিয়ে গেলেন এবং মীর জাফর বাংলার নবাব পদে অভিষিক্ত হলেন। এবং পদাভিষিক্ত হয়েই তিনি ইংরেজ কে বাঙলা থেকে কর আদায়ের ছাড়পত্র দিয়ে দিলেন এবং গতবছরে সিরাজের কলকাতা আক্রমণের খেসারত স্বরূপ ইংরেজকে সবমিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিলেন। এছাড়াও তিনি ক্লাইভ এবং ওয়াটস্‌ সাহেব কে এককালীন চার লক্ষাধিক টাকা ঘুষ দিলেন এবং তাঁদের জন্য নিষ্কর জমি এবং মোটা টাকা মাসোহারার বন্দোবস্ত করেলন। কিন্তু এতো কিছু করেও তিনি অর্থগৃধ্নু ব্রিটিশের জঠরানল নির্বাপণে সমর্থ হলেন না।

অতএব তিনি চুঁচুড়ার ডাচদের সঙ্গে নিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন এবং দু’বছরের মধ্যেই ঘটি বাটি চাঁটি হয়ে পথে বসলেন। ইতিমধ্যে গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে গ্যালন গ্যালন জল। প্রথমে মীরজাফর, তারপর মীরকাশেম এবং পুনরায় মীরজাফর কে বাংলার গদি তে বসিয়ে এবং আলটিমেটলি ১৭৬৪ সালে মুঘল সম্রাট শাহ আলম এবং সুজাদৌল্লার যৌথ বাহিনী কে বক্সার যুদ্ধে পরাস্থ করে ইংরেজ বাহিনী বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যার প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক শাসক হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়ালেন এবং বিপুল ক্ষমতা ও অর্থবলে বলীয়ান হয়ে ফাইনালি ভারত বর্ষের একচ্ছত্র অধিপতি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেন। বাকিটা ইতিহাস।

***

 

পরিশিষ্ট

আচ্ছা ধরুন যদি মাথা-পাগলা সিরাজের মাথায় পলাশীর যুদ্ধের আগেরদিন হঠাৎ একটা বাল্ব জ্বলে উঠতো এবং তিনি এই তেরপল মাহাত্ম টি বুঝতে পারতেন। কিম্বা ধরুন তাঁর পরলোকগত স্নেহশীল পিতামহ আলীবর্দি খাঁ সিরাজ কে স্বপ্ন দিয়ে বলতেন যে, “বেটা, আঙ্গরেজো কি জঙ্গ কে ম্যয়দান মে যানে সে পহেলে একঠো তিরপল লে যানা মত ভুলনা।” সেক্ষেত্রে? কি ঘটতে পারতো সে ক্ষেত্রে? বাঙলা তথা ভারতবর্ষের ভাগ্যাকাশে কি এমন আকস্মিক পরিবর্তন টি আসতে পারতো যদি সিরাজ সেদিনের সেই সিলি মিসটেক টি না করতেন?

না, তফাৎ বিশেষ কিছুই হত না, কেবল ব্রিটিশের বদলে আজ আমাদের দেশ একটি ফ্রেঞ্চ কলোনি হিসাবে গড়ে উঠত মাত্র। ইকুয়েশান টা ধরা গেলনা তো? না, এই সামান্য রহস্যটি বোঝবার জন্য ব্যোমকেশ বা শার্লক হবার প্রয়োজন নেই। একটু চোখ-কান খোলা রাখলে সহজেই ব্যাপারটা বোধগম্য হবে। পলাশীর প্রান্তরে সিরাজের সেই ৫৩ টি কামানের মধ্যে ৮ টি ‘মেড ইন ফ্রান্স’ লেখা কামানের কথা মনে আছে? হ্যাঁ, ওর মধ্যেই এই রহস্যের সূত্রটি লুকিয়ে আছে।

ইংরেজের বিরুদ্ধে সিরাজের পলাশীর যুদ্ধে নামবার অন্যতম প্রধান কারণ ছিলেন ফ্রেঞ্চরা, কারণ সিরাজ এবং চন্দননগরের ফরাসী গভর্নর জোসেফ ফ্রান্সিস ডুপ্লের মধ্যে একটি গোপন মৈত্রী চুক্তি হয়েছিল এবং এরই ফলশ্রুতি হিসাবে ডুপ্লে সাহেব সিরাজ কে ওই ৮ টি কামান পাঠিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল জলের মত পরিষ্কার। পলাশীর যুদ্ধে নবাব বাহিনীর কাছে ইংরেজ বাহিনী পর্যুদস্ত হওয়া মাত্রই তিনি চন্দননগর থেকে কলকাতা আক্রমণ করবার তালে ছিলেন। এবং বলা বাহুল্য পলাশিতে ব্রিটিশ বাহিনীর পরাজয় হলে ফরাসী বাহিনীর পক্ষে কলকাতা দখল করা ছিল জাস্ট ছেলের হাতের মোয়া। এবং এই নাটকের পরবর্তী অঙ্কগুলি মোটামুটি সবই আমাদের জানা, শুধু এর কুশীলবদের বদলে দিয়ে ইংরেজের পরিবর্তে সেই স্থানে ফরাসীদের ভেবে নিলেই হয়। অতএব অচিরেই ভারতবর্ষ একটি ফরাসী কলোনিতে পরিণত হত। অষ্টাদশ শতকীয় ইউরোপের একচ্ছত্র অধিপতি হতেন ফরাসীরা। ইংল্যান্ডের বদলে শিল্পবিপ্লব হত ফ্রান্সে। কারণ ভারতবর্ষ থেকে কোটি কোটি টাকা ড্রেইনেজ হয়ে ইংল্যান্ডে গিয়ে না পৌঁছলে থার্মোডায়নামিক্সও হত না, আর কাঁড়ি কাঁড়ি কলকব্জা বানিয়ে নিত্য নতুন গবেষণার যে বিপুল ব্যায়ভার তাও বহন করা সম্ভব হতনা।

কথাটা একটু অত্যুক্তি মনে হলেও পরিসংখ্যান কিন্তু তাই বলে। উইলিয়াম ডিগবি সাহেবের হিসাব অনুযায়ী পলাশী যুদ্ধ থেকে ওয়াটারলু যুদ্ধের মধ্যবর্তী (১৭৫৭ থেকে ১৮১৫) এই ৫৮ বছরে ভারতবর্ষ থেকে ইংল্যান্ডে কম করে একশ কোটি টাকা ড্রেইনেজ হয়ে গেছে। ১৮৮১ সালে কার্ল মার্ক্স দেখিয়েছিলেন কীভাবে ব্রিটিশ ভারতের কৃষি ও শিল্প-শ্রমিকদের ন্যায্য আয়ের একটা মোটা অংশ (প্রায় ৬ কোটি টাকা) তাঁদের হাতের ফাঁক গলে ইংল্যান্ডে চলে যেত। এই হাত গলে চলে যাওয়া অর্থের পরিমাণ যে কি বিপুল ছিল একটা ছোট্ট নমুনা দিলেই স্পষ্ট বুঝতে পারবেন। ১৭৮৩-৮৪ থেকে ১৭৯২-৯৩ সালের মধ্যে ভারত থেকে ড্রেইন হয়ে চলে যাওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ইংল্যান্ডের গ্রস ন্যাশানাল প্রোডাক্টের (GNP) প্রায় ৯ শতাংশ, অর্থাৎ যা কিনা ইংল্যান্ডের সামগ্রিক জাতীয় আয়ের ২ শতাংশেরও বেশী, যার আর্থিক মূল্য ১৮০১ সালে গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৩২ মিলিয়ান পাউন্ড!

এবং আপনি যদি উইকিপিডিয়াতে ‘ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব’, ‘থার্মো ডায়নামিকস্‌’, ‘কোয়ান্টাম মেকানিকস’ প্রভৃতি পেজ গুলি খুলে চোখ বোলান এবং এগুলির ইতিহাস সংক্রান্ত সাল গুলির দিকে নজর রাখেন তাহলে দুইয়ে দুইয়ে চার করতে আপনাকে খুব বেশী বেগ পেতে হবে বলে মনে হয় না।

কিন্তু কি আর করা যাবে। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন আর চুল ছিঁড়ে লাভ নেই। আর তাছাড়া ইতিহাসের এইসব আজীব গপ্পো কথা শুনে আমাদের কিইবা হবে? আমরা চলি আমাদের মত বাদুড়ঝোলা ধ্বস্তাধস্তি টালমাটাল, আর ইতিহাস চলে ইতিহাসের মত সাজানো পরিপাটি রূপকথা। তাই এই রূপকথার দুনিয়া থেকে বেড়িয়ে এসে বাস্তবের চৌকাঠে আছাড় খাওয়া ছাড়া আমাদের আর গতি কি বলুন? তৃতীয় বিশ্বের বাদামী জনগণের পক্ষে এসব দুঃখবিলাসিতা মানায় না। তাই আমরা ভাণ করবো যেন আমরা ওদের উন্নতির ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানিনা। ন্যাকা বোকা সেজে মাল্টি-ন্যাশানালের বড়বাবুদের পায়ে তৈল মর্দন করে যাবো সারা জীবন আর ক্রিকেট বিশ্বকাপ ও মিস্‌ ওয়ার্ল্ড কম্পিটিসান দেখে আমাদের উথলে ওঠা দেশপ্রেমের মাছের তেলে মাছ ভাজতে দেবো ওদেরকে। কিন্তু তবু আমরা মুখ ফুটে রা কাড়বো না। আমরা কেবল মনে মনে, চুপিচুপি এই সত্যি টা জানবো যে, ইংল্যান্ডের আজ এই অগাধ প্রতিপত্তিও হতো না, ইউরোপের শিল্পবিপ্লবও হতো না, আর বিজ্ঞানের এই রমরমা আগ্রগতিও হতো না, আমাদের ঘরের ছেলে মুর্শিদাবাদের সিরাজদৌল্লা যদি একটু মাথা খাটিয়ে পলাশীর যুদ্ধে একটা তেরপল নিয়ে যেত।

তথ্যসূত্রঃ

১) “Brief History of Hugli” By Dirom Gray Crawford  [BENGAL SECRETARIAT PRESS, 1903]

২) “A Miscellany Of Mutinies And Massacres In India” By Terence R. Blackburn [APH Pub. Corp., 2007]

৩) “Modern World System and Indian Proto-Industrialization: Bengal 1650-1800, Volume 1  By Abhay Kumar Singh [Northern Book Centre, 2006]

৪) Imperial Gazetteer of India- The Indian Empire Vol 1 Descriptive [Oxford Clarendon Press, 1909]

৫) হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গ সমাজ- সুধীর কুমার মিত্র [মিত্রানী প্রকাশন, কলকাতা, ১৯৬২-৬৩]

৬) www.wikipedia.org

বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার-

দেবজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায় এবং কাইপুল্লাই ভেট্টি      

 

 

 

থার্মোডায়নামিকস্‌, সিরাজদৌল্লা ও একটি তেরপল
  • 4.75 / 5 5
8 votes, 4.75 avg. rating (93% score)

Comments

comments