সবাই পড়েছেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর লেখা শিশুপাঠ্য গল্প ‘নরহরি দাস।’ কিভাবে একটি ছাগল ছানা নিজেকে সিংহের মামা পরিচয় দিয়ে বাঘ আর শেয়ালকে নাকাল করেছিল সবারই মনে আছে সে কথা। কিন্তু কি হয়েছিল তার পরে? সেই কথা আজকে এই শনিবারের বারবেলায়

 

(আগের টুকরো)

মহামহিম রাজামশাই হন্তদন্ত হয়ে একান্ত আলাপচারিতা কক্ষে ঢুকলেন। ওখানে আগে থেকেই প্রাসাদের বিশেষ নির্দেশ পেয়ে অত্যন্ত আস্থাভাজন দুই মন্ত্রী বার্তা এবং রক্ষা উপস্থিত হয়েছেন

রাজা – বার্তা, তুমি জঙ্গলে গিয়েছিলে?

বার্তা – হ্যাঁ মহারাজ

রাজা – তারপর কি হয়েছে? জানানোর দরকার মনে করোনি নাকি

বার্তা – কি বলব মহারাজ, আপনি বলেছিলেন বাঘ আর শেয়ালকে নিয়ে এসে যেন আপনার অভয়ারণ্যে রাখা হয়, কিন্তু ওরা রাজি হল না। আমি জঙ্গলে ঢোকার আগেই ওই বুনো জন্তুগুলো আমাকে আটকে আমার পালকি ভেঙে দিয়েছে। কোনও রকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি

রাজা – ওখানে ঠিক কি হয়েছে একবার আমায় খুলে বল তো

বার্তা – মহারাজ, সে রকম কিছু নয়। ওই যে আমাদের সভাশিল্পীর যে ছাগলটা আছে, ওর একটা ছোট্ট ছানা একটু ভুল করে ফেলেছে। ছানাটার পীড়াপীড়িতে ষাঁড় ওকে নিয়ে গিয়েছিল বড় ঘাস খাওয়াতে, প্রচুর খেয়ে দেয়ে নড়তে পারছিল না তাই পাশেই শেয়ালের গর্তে গিয়ে ঢোকে। এখন জঙ্গলের পশুরা দাবি তুলেছে ওদের শাস্তি চাই

রাজা – একটা ছোট্ট ছাগল ছানার ওপর এত রাগ তো ঠিক না, সে রকম কিছু তো করেনি

বার্তা – ওদের আসল কথা হচ্ছে যখন শেয়াল ওকে বাইরে থেকে জিজ্ঞেস করেছিল যে গর্তের ভেতর কে আছে তখন নাকি ও নিজেকে সিংহের মামা বলে পরিচয় দেয়। তারপর শেয়াল যখন বাঘকে সঙ্গে নিয়ে আবার যায় তখনও একই কথা বলে। এতে নাকি ওদের মোড়লের মানসম্মান খোয়া গেছে। এর আগেও নাকি বাঘকে একটা মানুষ টাগের ভয় দেখিয়ে ধরে রেখেছিল।

রাজা – এগুলো কোনও কথা হল? অপদার্থ অশিক্ষিত জানোয়ারের দল যতসব।

রক্ষা ও বার্তা একসঙ্গে – না তো কি?

রাজা – কিন্তু শুনছি বাঘ আর শেয়াল আহত হয়েছে

বার্তা – এমন কিছু হাতিঘোড়া ব্যাপার নয় ওটা। ছাগল ছানাটার কথা শুনে বাঘ ভয়ের চোটে দৌড়ে পালিয়েছিল তখন শেয়ালটা নাকি ওর ল্যাজের সাথে বাঁধা ছিল। তাতেই যা হয়েছে

রাজা – আমার মনে হয় এগুলো সবই আসলে সাজানো। ছাগল ছানা এই রকম করতেই পারে না। এর পেছনে দাদা নেই তো? যাকগে, এখন ওদের কি বক্তব্য?

বার্তা – ওদের দাবি আপনাকে একবার যেতে হবে। আপনি বলেছিলেন জঙ্গল হাসছে, সে হাসি যে কান্না হয়ে গেছে সেটা আপনাকে গিয়ে দেখতে হবে

রাজা – মগের মুলুক নাকি? কে কোথায় কি বলে দিল আর আমায় যেতে হবে? আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেছে। শেয়াল বা বাঘ যদি ওদের মোড়লের মামার নাম না জানে আমি কি করব? আর ওদের ল্যাজ বাঁধাবাঁধি করতেই বা কে বলেছিল?

বার্তা – বেশি বুদ্ধি তো

রাজা –কেউ ধরা পড়েছে?

রক্ষা – মহারাজ, দুটোই ধরা পড়েছে

রাজা – কেন? ছোট্ট ছাগল ছানা, শুধু ষাঁড়টাকে ধরলেই তো হত

রক্ষা – আর বলবেন না। ওই বেপথু সাংবাদিকগুলো বড্ড হল্লা শুরু করেছিল। তবে আপনি চিন্তা করবেন না মহারাজ। ছাগলকে আপনার অভয়ারণ্যের যেখানে বড় বড় ঘাস আছে সেখানে আলাদা করে রাখা হয়েছে যাতে কেউ দেখতে না পায়। এমনকি নিরাপত্তারক্ষীরাও জানে না কে ওখানে রয়েছে। আমি সভাশিল্পীকে বলে দিয়েছি। ষাঁড়টাকে অবশ্য চিড়িয়াখানার খাঁচাতে রাখা হয়েছে

রাজা – ঠিক আছে। শোন, আমি যাব। কেউ যেন না জানতে পারে। কাল একটু সকাল সকাল দরবার ছুটি করে দিয়ে আমরা তিনজন বেরিয়ে পড়ব। আমার পালকি বড় আছে, ওতেই তিনজন ধরে যাবে। বুঝতে পেরেছি ওই বেপথুগুলোই ওদের তাতিয়েছে

 

(পরের টুকরো)

পরদিন তাড়াতাড়ি দরবার ছুটি হয়ে গেল। বার্তামন্ত্রী আর রক্ষামন্ত্রী সামনে দিয়ে বেরিয়ে গিয়েই আবার পেছন দিক দিয়ে প্রাসাদে ঢুকে একান্ত আলাপচারিতা কক্ষে অপেক্ষা করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত একটা নয়, দুটি পালকি রওনা হল। জানা ছিল না, তাই পালকি বাহকরা প্রমোদ ভবনের রাস্তা ধরতেই রাজামশাইয়ের ধমকানি খেয়ে ঠিক রাস্তা ধরল। পেছনে বার্তা আর রক্ষা।

জঙ্গলে আগেরদিন প্রচন্ড বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তা কাদায় মাখামাখি। একজন পালকি বাহকের পা আচমকা ওই কাদায় পড়তেই সাড়ে সব্বোনাশ। রাজামশাই নামলেন। বার্তা আর রক্ষাও ছুটে এলেন। পালকি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত। পেছনেই ছিল আরেকটা পালকি, কিন্তু রাজামশাই ঝুঁকি নিলেন না। একটু দূরে একটা গাধা চরে বেড়াছিল, উনি তাতেই উঠে বসলেন। গাধা গৃহপালিত পশু হলেও বাঘের বাড়ি চেনে না এখন এ তল্লাটে কেউ নেই। মাঠ পেরিয়েই জঙ্গল। রাজামশাই ঢুকেই সোজা চলে গেলেন বাঘের বাড়িতে। ওই ঘটনার পর থেকে শেয়াল মামার বাড়িতেই আছে। অসুস্থ শরীরে উঠে কোনরকমে প্রণাম করেই আবার শুয়ে পড়ল।

রাজা – বাঘ কোথায়?

বাঘ – এই যে রাজামশাই

রাজা – ভাগ্নেকে ওষুধ পথ্য কিছু দিয়েছিস?

বাঘ – ওই আমাদের এখানে যা পাওয়া যায় আর কি। আপনি যদি একটু সদয় হন

রাজা – ঠিক আছে। চিন্তা করতে হবে না। আমি আছি। অসুবিধে হলে বলবি। আর শোন ফের যদি শুনেছি তোরা ল্যাজ বাঁধাবাঁধি করেছিস…আর একটা কথা। শেয়ালকেও বলে দিবি। গর্ত খালি রেখে যেন দূরে কোথাও না যায়। ঠিক আছে?

বাঘ আরও কি বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় বার্তা ঘরে ঢুকে পালকি ঠিক হয়ে আসার খবর দিল। ‘সব দেখে নিলাম। আমি এখন আসি’ বলে বেরিয়ে এসেই চক্ষু চড়কগাছ। বনের পশুরা সব জড়ো হয়েছে। সিংহ মোড়ল। তাই সে সবার আগে রাজামশাইয়ের পায়ে হাত দিয়ে মুখ খুলল

সিংহ – রাজামশাই, গৃহপালিত পশুগুলো…

রাজা – সব শুনে নিয়েছি। ষাঁড় আর ছাগল ছানাকে তো ধরা হয়েছে। আবার কি?

সিংহ – তবু যদি…

রাজা – তুমি কি বেশি বোঝো নাকি হে? বললাম না সব শুনে নিয়েছি। আমি সব জানি। একদম বাড়াবাড়ি করার চেষ্টা করবে না

একে হেনস্থা, তার ওপর মোড়লমশাইয়ের আবার অপমান। রাজামশাইয়ের এই কথা এক মহা উত্তেজনা সৃষ্টি করল। সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল। পালকিতে উঠতে গিয়েও উঠলেন না রাজামশাই, ঘুরে দাঁড়ালেন। সব আওয়াজ ছাপিয়ে শোনা গেল তাঁর কন্ঠ -

“চোওপ, লজ্জা করে না? আমি আগেই জানতাম এই সব দাদার পরিকল্পনা। এই জন্যে আমাকে এখানে আসতে বলা হয়েছিল? দেখেই বুঝেছি এখানে কয়েকটা টুনিবাদী এসে জুটেছে। সঙ্গে কতগুলি বেপথু সাংবাদিক। আমি না এলে তো কেউ জানতেই পারত না ব্যাপারটা। অ্যাই রক্ষা, এখনই খোঁজ খবর নিতে শুরু কর আর ক’টা টুনিবাদী এখানে ঘাঁটি গেড়েছে। বলতে বাধ্য হচ্ছি, দাদার কোনও লজ্জা নেই। নির্লজ্জ বেহায়া কোথাকার। ওই ষাঁড় আর ছাগল তো দাদার খামারের। সব খবর আছে আমার কাছে। জঙ্গল হাসছে সহ্য হচ্ছে না। এখন টুনটুনির সাথে হাত মিলিয়েছে।”

দরবারী কাড়া-নাকাড়া – ২
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments