আগের দিনই বলেছিলাম, শিশুপালন নিয়ে কেটি দেওয়ার জন্যে উৎসুক হয়ে উঠেছি। যদিও যথেষ্ট সন্দেহ আছে চর্যাপদে এ বিষয় পড়ার এবং মন্তব্য করার লোক পাওয়া যাবে কিনা। “এইইইইই… তুমি কি আমায় কমেন্ট দেবে? যদি না দাও, পরোয়া করি না, আমি নেট ঘেঁটে ঘেঁটে ইনফো খুঁজে, করব পোষ্ট সেই জ্ঞান নিয়ে, যতক্ষণ না অ্যাডমিন এসে ঘাড়টি ধরে দেয় বের করে”… যাকগে লিখব ভেবেছি, কিন্তু কি লিখব সেটাই মনস্থির করতে পারছিলাম না। এই ৪২৫ দিনে অন্তত ৯৫০ রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেগুলো অন্যদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। কি লিখব, এটা ভাবতে ভাবতে এক বন্ধুর সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম কালকে। হঠাত বন্ধুটির একটি অমৃতভাষণ শুনে পুরো ‘দিমাগ কি বাত্তি জ্বল গ্যায়া’ টাইপ আনন্দ হল আর পেয়ে গেলাম আমার দ্বিতীয় পোষ্টটির বিষয়। ঠিক-ই ধরেছেন, দান্ত-ক্যালানো বা দন্ত বিকাশ। দাঁত না থাকলে কি আর এমন দাঁত বের করে হাসতে পারতেন নাকি পারতেন দাঁত- খিঁচোতে!!
দাঁত কবে বেরয়?
দাঁত তৈরি হয়ে যায় আমাদের জন্মের আগেই, তবে মাড়ি কেটে বাইরে বেরতে কটা দিন সময় লাগে বৈকি। সাধারণ ভাবে বলা যায়, ৩ থেকে ১০ মাসের মধ্যে প্রথম দাঁত বাইরে আসে, আর একটু একটু করে ২০ টি দুধের দাঁতের সবকটাই বাইরে আসে ৩ বছর বয়সের মধ্যেই। কোন কোন ক্ষেত্রে ১ বছরের পরেই দাঁত বের হয়। আর খুব কম কিছু ক্ষেত্রে জন্মের সময়েই শিশু দাঁত নিয়ে জন্মায়। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন যে অনেক সময় বাবা-মায়েদের দেরীতে দাঁত ওঠার ইতিহাস থাকলেও শিশুর দাঁত উঠতে দেরি হয়। এই মোটামুটি টাইমলাইন নিয়ে ডাক্তারবাবুর সাথে আলোচনা হয়েছিল যখন ১০ মাস হয়ে যাওয়ার পরেও আমার ছানার নিদন্ত হাসি দেখেই আমাদের শান্ত থাকতে হচ্ছিলো। অবশেষে সমস্ত চিন্তাভাবনার অবসান ঘটিয়ে ঠিক ১০ মাস ২১ দিনে ছানার আমার দাঁত বের হল। আপনাদের ছানার সুবিধার্থে নীচে টাইমলাইনটা দিয়ে দিলাম।
৪ থেকে ৭ মাস – নীচের পাটির মাঝখানের দুটো দাঁত
৮ থেকে ১২ মাস – উপরের পাটির মাঝখানের দুটো দাঁত (সাধারনতঃ দাঁত জোড়ায় জোড়ায় বের হয়; ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের একটু তাড়াতাড়ি বের হয়; কারোর কারোর ক্ষেত্রে উপরের পাটির দাঁত আগে বের হয়)
৯ থেকে ১৬ মাস – মাঝখানের দুটো দাঁতের দু পাশের (উপর + নীচ)
১২ থেকে ১৯ মাস – উপর এবং নীচের প্রথম মোলার দাঁত
১৬ থেকে ২৩ মাস – উপর এবং নীচের ক্যানাইন দাঁত … নীচের দ্বিতীয় মোলার
২৫ থেকে ৩৩ মাস – উপরের দ্বিতীয় মোলার।
৩৬ মাস – পুরো ২০টা দাঁত তৈরি…
যদি না বের হয়ঃ
চাপ কি! দাঁত বিহীন বাচ্ছার মা/বাবা হিসেবে আপনার নাম-ও গিনেস বুকে উঠে যাবে। ১৮ মাসেও যদি দাঁত বেরনোর কোন লক্ষন দেখা না যায়, ডাক্তারের সাথে কথা বলতে হবে। সাধারনত এক্স-রে করে দেখা হয় মাড়ির ভিতরে দাঁত রয়েছে কিনা।
কতগুলি মিথঃ
১। দান্তে-ভাত খেতে নেই। অন্নপ্রাশনের আগেই দাঁত বেরোলে শিশুকে ঘোড়ায় চড়াতে হয়! আমার নিজস্ব মতামত হল, আসলে সামনে বক রাক্ষসের মত খাবার ধরে দিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে মামার কোলে বসিয়ে ফটোসেশন সেরে যেই না ছানার মুখে একরত্তি খাবার ঢুকেছে অমনি “এই হয়ে গেছে, হয়ে গেছে কুচুমুচু বাবালে” বলে তাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফাঁকে রাগের চোটে সে যাতে কোনভাবেই কাউকে কামড়াতে না পারে, তাই এই বিধান।
২। দাঁত ওঠার সময় পেট খারাপ হয়- এ বিষয়ে ডাক্তারি শাস্ত্রে কোন সমর্থন মেলে না, অথচ ভারতবর্ষের সমস্ত প্রান্তে মা-ঠাকুমা-দিদিমারা একযোগে কথাটি স্বীকার করে থাকেন। আসলে এই সময় সর্বদাই দাঁত সুড়সুড় করতে থাকে, বাচ্ছারা যা ইচ্ছে তাই এবং হাতের কাছে যা পায় তাই মুখে দেয়, পেট খারাপ অবশ্যম্ভাবী। দৃষ্টি রাখা উচিৎ যেন অখাদ্য কোন জিনিষ মুখে না দেয়।
৩। দাঁত ওঠার সময় জ্বর হয় – পেট খারাপ হলে জ্বর অনেক সময়েই সাথে আসে; বন্ধু বলা যায় (যেমন পটির বন্ধু সুসু :পি)
এই সময়ের কিছু অসুবিধা এবং তার প্রতিকারঃ
১। দাঁত সুড়সুড় করে, কামড়াতে ইচ্ছা হয় – মায়ের আঙুল দিয়ে শিশুর মাড়ি ভালো করে মালিশ করে দিলে আরাম পায়, মায়ের আঙুল কামড়াতে দিলে আরও মজা পায় (আমি নিজে এটি অনুসরণ করেছি)। এছাড়া টীদিং বিস্কুট পাওয়া যায় কিনতে, ৬ মাসের পরে হলে দেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও টীদিং খেলনা কিনতে পারা যায়। সাধারনত পাড়ার ওষুধের দোকানেই ঐ বিশেষ প্লাস্টিকের কলা, আঙ্গুর ইত্যাদি কিনতে পারা যায়। (আমি একটু স্বাস্থ্য সচেতন এবং সন্দেহবাতিক হওয়ার কারণে এসমস্ত কিছু দি নি। )
২। গাল এবং মাড়ি লাল হয়ে ফুলে যাওয়া – সাধারণত দাঁত বেরনোর ৩ থেকে ৫ দিন আগে থেকে শুরু হয়, আর মাড়ি কেটে দাঁত বেরনোর পরেই সেরে যায়। এর জন্যে সেরকম ভাবে কিছু প্রতিকার নেই, খুব বেশি ব্যথা হলে, হাল্কা বেদনা নাশক ওষুধ দিতে হয়।
৩। অতিরিক্ত লালা পড়া – প্রধান লক্ষণ দাঁত বেরনোর, কিছু করার নেই; বিব পড়িয়ে রাখা উচিৎ, যাতে ক্রমাগত লালা পড়ে জামার বুকের অংশ ভিজে গিয়ে ঠাণ্ডা না লাগে।
উপসংহারঃ
দাঁত বেরনো মানেই শক্ত খাবার খাওয়ার দিকে আর এক পা এগিয়ে যাওয়া। আমি নিজে মা হয়ে বুঝেছি যে চোখের সামনে নিজের ছানাটিকে বাড়তে দেখলে, এক একটা মাইলস্টোন ছুঁতে দেখলে যেমন একটা আনন্দ লাগে, কোথাও যেন একটা বিষাদও ছুঁয়ে থাকে; যত বড়ো হবে, ততই কমবে বাবামার প্রতি নির্ভরতা। তবু এইই তো নিয়ম পৃথিবীর। “যানা তো হ্যায়, লেকিন বিশ সাল বাদ” – এই বিজ্ঞাপনটা হয়ত অনেকেরই মনে আছে, আর বাবামা, নিজের পরিচিত পৃথিবীর থেকে অনেক দূরে থাকতে থাকতে নিজের অনুভব থেকে যেভাবে এই কথাটা বোঝা যায়, অন্যের লেখা পড়ে হয়ত সম্ভব নয়। কাজ কি বাপু অত কথায়, যদি এতখানি পড়েই ফেলেন পাঠক, একবার পরান খুলে দাঁত ক্যালান তো দেখি!!

দাঁত ক্যালানো
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments