দুপুরে সামান্য খাওয়া দাওয়া সেরে আপাতত আমরা ঘর বন্দি হয়েই রইলাম। শুভ যেন বিছানায় বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইল। ওর এই গাম্ভীর্যকে আমার খুব ভয় লাগে। এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ লক্ষ্য করার পর আমি জিজ্ঞাসা করলাম
– কি শুভ, কি এত ভাবছ? এই এক্সিডেন্টেও তুমি আবার রহস্যের গন্ধ পাচ্ছো না কি?
– না, ঠিক তা নয়। তবে গন্ধের আভাস পাওয়া স্বাভাবিক নয় কি বন্ধু! তাছাড়া আমাদের জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে তো রহস্য লুকিয়ে আছে। তাই এটাও অস্বাভাবিক কিছু নয় অপু। গোয়েন্দার মন, বুঝতেই পারছো। সবকিছুতেই রহস্য খুঁজে বেড়াই। অপু চলো আজ বিকেলে একবার এক্সিডেন্টের জায়গাটা ঘুরে আসা যাক।
কথাগুলো ও খুব গম্ভীরতা নিয়েই বলল। আমিও অগত্যা রাজি হয়ে গেলাম।
অত:পর বিকেলে বেরিয়ে পরলাম আমারা। ক্যামেরা শুভ’র নিত্যসঙ্গী। যা দেখে ভয়ংকর, সন্দেহজনক এমনকি সৌন্দর্যও ও ফ্রেমবন্দি করে রাখে ও। জায়গাটা আমাদের হোটেল থেকে প্রায় মিনিট ত্রিশেক পথ। চকবাজার পেরিয়ে ওই অভিশপ্ত স্থান। আমরা একটা ট্যাক্সি নিলাম ও কিছুক্ষণ পর সেই দুর্ঘটনার স্থানটিতে এসে উপস্থিত হলাম। জায়গাটা এমনিতে খুব শুনশান। লোকজন তেমন একটা নেই, কাছাকাছি জনবসতি বললে তা মিনিট দশেক পথের পর। গাড়িটা আসলে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে কোথায় পড়েছিল তা খুব সহজেই ড্রাইভার আমাদের দেখাল। তার কথা অনুসারে গাড়িটা প্রায় ২০০ ফুট নীচে বিনয়বাবু সমেত পরেছিল। এক্ষেত্রে তাই বাঁচার কোনো সম্ভাবনাই থাকেনা। তবে ড্রাইভার যে আরো একটা ব্যাপার বলল তা বেশ খানিকটা আশ্চর্যজনক। ড্রাইভার বলল
– বাবু একটা কথা আছে, গাড়িটা যেদিকে পড়েছিল তার ড্রাইভার কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে তার প্রায় ৩০ ফুট বাঁ দিকে ও মাত্র ৫০ ফুট নীচে পড়েছিল।
– সেকি! এবার তো সত্যিই একটা রহস্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে মিস্টার অর্পন। ব্যাপারটা লক্ষ্য করলেতো? বিনয়বাবু যেখানে গাড়ি সমেত প্রায় ২০০ ফুট নীচে পড়েছেন, ড্রাইভার সেখানে কিছুটা পাশে এবং বেশ অনেকটাই উপরে। তবে এটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। হয়তো আমাদের মনে শুধুশুধু সন্দেহ দানা বাঁধছে। ড্রাইভার হয়তো এক্সিডেন্টের আন্দাজ করেই আগেভাগে ঝাঁপ দিয়েছে, কিন্তু তবুও বেচারার শেষরক্ষা হয়নি। গুরুতর চোট পেয়ে সেও মারা গেছে। এটাও সম্ভব কিন্তু অপু কারণ সবক্ষেত্রে সন্দেহটা বোধহয় চলেনা। একবার পুলিশ স্টেশন যেতে হবে। কালই যাব। তার আগে এই জায়গাটা একটু অবজারভেশনের দরকার। একটু অপেক্ষা করো।
এইবলে শুভ একটু এগিয়ে একটু নেমে জায়গাটা খোঁজাখুঁজি করতে লাগলো। আমি কেবলমাত্র তখন দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। শুভ এদিকওদিক কিসব ফোটো তুলছে কিছু ক্লু যদি পাওয়া যায় সেই আশায়। কিন্তু তেমন বিশেষ কিছু পাওয়া গেলনা কেবলমাত্র একটি সোনার আংটি আর একটা চুরুটের অবশিষ্টাংশ ছাড়া। এগুলো সম্ভবত বিনয়বাবুরই হবে। পুলিশ এগুলো কেন যে পায়নি কে জানে! হয়তো সার্চই করেনি সেভাবে। এদিকে আকাশটা বেশ কালো হয়ে এসেছে দেখে আর বিলম্ব না করে চটপট হোটেলের দিকে রওনা দিলাম।
সন্ধেবেলা আমরা বসে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনায় মত্ত ঠিক এমনসময় অনুপবাবু আমাদের রুমে এলেন। শুভ পাশে একটা চেয়ার টেনে ওনাকে বসতে দিল।
– আসুন অনুপবাবু, এখানে বসুন। তা কি ব্যাপার মশাই এইসময় আমার রুমে কি মনে করে!
– মনটা বড্ড বিষণ্ণ মশাই! বড্ড খারাপ লাগছে। শেষ দেখাটা খুব মনে পড়ছে। সবই তো জানেন। তাই একা একা বসে থাকতে না পেরে আপনাদের কাছে চলে এলাম যদি একটু শান্তি মেলে। একটু গল্পগুজব করব আরকি।
এই বলে অনুপবাবু পকেট থেকে সিগারেট বের করে আমাদের অফার করলেন। আমরা নিলাম। এই রাহস্যিক পরিস্থিতির মাঝে আমাদের সিগারেটের কুণ্ডলায়িত উড়ে যাওয়া ধোঁয়া যেন আরো রঙ সঞ্চার করছে।

দার্জিলিং-এর আংটি রহস্য (তৃতীয় পর্ব)
  • 2.00 / 5 5
1 vote, 2.00 avg. rating (61% score)

Comments

comments