আর বেশি কথা হলনা। আমি গাড়ির কাঁচটা নামিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। চোখ স্থির হয়ে রইল। কি অপরূপ দৃশ্য! প্রকৃতির এত সৌন্দর্য আগে কখনো দেখিনি। বিকেলের পড়ন্ত রোদ এসে পড়েছে পর্বতের গায়ে। যেন হঠাৎ এই প্রকৃতি কোন অজানা আনন্দে আবিরখেলায় মত্ত। এরপর সবুজ চাবাগান, বরফাবৃত পর্বতচূড়া, পাহাড়ের গায়ে ছোট্টছোট্ট গ্রাম দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম নেহেরু রোড আর গান্ধী রোডের জংশন এ। এখান থেকে আর গাড়ি যায়না, যাওয়া নিষিদ্ধ। হোটেলে হেঁটে যেতে হবে। তাই নেমে শেয়ারের ভাড়া দিয়ে কুলি ধরতে হল। মিনিট দশেক হাঁটার পরই হোটেল। হোটেলে পৌঁছাতে আমাদের সন্ধ্যা ৬ টা বাজল। আমরা দোতলায় ঘর নিলাম। শরীর আর বয় না। এই ক্লান্ত শরীর নিয়ে এখন বাইরে বেরোনোর কোনো মানেই হয়না। তাই ঘরে ঢুকেই হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় লম্বা ঘুম। শুভ রাত ৮ টায় আমাকে ডাকল
– চলো অপু খাবে চলো।
আজ খাসির মাংস আর ভাত। কবজি ডুবিয়ে খেলাম। শুতে আমাদের রাত ৯ টা বেজে গেল।শুভ শার্লক হোমস নিয়ে বসল। আকাশে বিদ্যুৎচমক, সাথে বৃষ্টি…এরকমই হয় এখানে। মেঘের গর্জন শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গেলাম যে কখন, খেয়াল নেই।
সকালে শুভই ডেকে তুলল আমাকে। তখন সকাল ৬টা। শুভ বলল ও ৫টায় উঠেছে। চা টা খেয়ে ব্রেকফাস্ট সেরেই দুজনে একটু বেরোলাম। খুব কাছেই মিনিট ১৫ হেঁটে গেলেই একটা বাজার পড়ে। নাম চকবাজার। এমনিতে খুব জমজমাট ওখানটা। কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে হবে দুজনেরই। হঠাৎ যাওয়ার পথে অনুপবাবুর সাথে দেখা। তিনি এগিয়ে এসে হাত নেড়ে বললেন
– মিস্টার শুভময়বাবু….দাঁড়ান….। গুড মর্নিং মশাই। তা এত সকালে চললেন কোথায়?
– এই একটু কেনাকাটার দরকার তাই এদিকে এলাম। আর তাছাড়া বেড়াতেই যখন এসেছি তখন চারপাশটা ঘুরেফিরে দেখতেও তো হবে না কি।
– হ্যাঁ অবশ্যই মশাই। আমিও তো তাই ভোরেই বেরিয়েছি। ঘুরে দেখুন মশাই অপরূপ জায়গা, দারুণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। মুগ্ধ হয়ে যাবেন নিশ্চিত।
আমরা কথা বলছি ঠিক সেইসময় বছর ৪০ এর এক ভদ্রলোক আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। তিনি অবশ্য আমাদের পরিচিত নন। যা বোঝা গেল অনুপবাবু উনাকে চেনেন বেশ ভালোমতোই। অনুপবাবুই আমাদের সাথে ভদ্রলোকের পরিচয় করিয়ে দিলেন। ভদ্রলোকটির নাম বিনয় মুখার্জী, কলকাতার যাদবপুরে থাকেন। আমাদের সাথে একটু বাকবিনিময় করে তিনি চলে গেলেন। অনুপবাবুও বললেন
– শুভময়বাবু আপনারা একটু এদিক ওদিক ঘুরে দেখুন মশাই। আমি সেই ভোর থেকে অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়িয়েছি আর পা চলছেনা। এখন আমি আসি।
এই বলে উনিও চলে গেলেন। আমরাও বাধা দিলাম না। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বেশকিছু জিনিস কেনাকাটার পর হোটেলে ফিরলাম। ফিরেই একটা দুসংবাদ শুনতে হল…বিনয়বাবু, মানে যার সাথে কয়েক মিনিট আগে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল, আর নেই। হোটেল ফেরার পথে এক্সিডেন্ট…সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু। বিষণ্ণ চিত্তে খবরটা আমাদের অনুপবাবুই দিলেন। উনি হোটেলে ধোকার পরই খবরটা পান। খুব মনমরা হয়ে ভেঙ্গে পড়েছেন উনি। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক বইকি। এই কিছুক্ষণ আগে যার সাথে দেখা হল, কথা হল, সে আর নেই ভাবতেও কেমন আশ্চর্য লাগে, অজান্তেই বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে নিমেষে। স্বভাবতই আমাদেরও অত্যন্ত খারাপ লাগছে। অনুপবাবুকে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম আমরা।

দার্জিলিং-এর আংটি রহস্য (দ্বিতীয় পর্ব)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments