আগের পর্বঃ তৃতীয় পর্ব

 

আলিপুর কম্যান্ড হসপিটালটা থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে প্রায় পঁচিশ কাঠা আয়তাকার জমির ওপরে তৈরি অচিন্ত্যর বাড়িটাকে বাড়ি না বলে বাংলো বা ভিলা বলাটাই বেশী উচিত হবে। তাঁকে নামিয়ে দিয়ে গৌতম যখন গাড়ীটা গ্যারেজে পার্ক করছে, অনিকেত তখন সেই সুযোগে চারপাশটা ভালো ভাবে জরিপ করে নিচ্ছিলেন। মস্ত বড় লোহার গেট পেরিয়ে ঢুকতে হয় কম্পাউন্ডটাতে। গেটের পরে বাঁদিকে সিকিউরিটি রুম রেখে পাশাপাশি দুটো গাড়ী যেতে পারে এমন চওড়া একটা রাস্তা চলে গেছে। সেই রাস্তার ওপর সাহেবি ডিজাইনের একটা পোর্টিকো। তারপরেও রাস্তাটা আরও কিছুদূর এগিয়ে ডানদিকে বাঁক নিয়ে আরও ত্রিশ মিটার মত গিয়ে গ্যারেজে এসে শেষ হয়েছে। গ্যারেজটা বেশ বড়। প্রায় চার পাঁচটা গাড়ী অনায়াসে রাখা যায়। অনিকেত দেখলেন সেখানে তাঁদের গাড়ীটা ছাড়াও আরও দুটো গাড়ী পার্ক করা। একটা কালো রঙের মার্সিডিজ বেঞ্জ আর একটা লাল রঙের মারুতি এইট হান্ড্রেড। কোলকাতার রাস্তায় মার্সিডিজের দেখা খুব বেশী পাওয়া যায় না। অচিন্ত্যর বিত্তের যে কোনও অভাব ছিল না, তার গ্যারেজে পার্ক করা এই মার্সিডিজটাই সেটার প্রমাণ। গ্যারেজের লাগোয়া আরও দুতিনটে ঘর। সেগুলোর দরজা বন্ধ। পুরো রাস্তাটার দুধারে নানা ধরণের ফুল আর পাতাবাহার গাছের বাগান। দেখলেই বোঝা যায় নিয়মিত বাগানটার যত্ন নেওয়া হয়। গেট দিয়ে ঢোকার পরেই ডানদিকে সবুজ মখমলের মত ঘাসে ঢাকা একটা লন। সেখানে একটা শেডের তলায় দু তিনটে সাদা শৌখিন চেয়ার আর একটা সেন্টার টেবিল। শীতকালে মিঠেকড়া রোদে বাগানে বসে চা খাবার জন্যে। পাশে একটা কাঠের বেঞ্চ আর একটা দুজন বসার মত শৌখিন সুইং চেয়ারও চোখে পড়ল। লনের পিছনের দিকটাতে বড় গাছের সারি। আম, পেয়ারা, কাঁঠাল, লিচু ছাড়াও আরও নানা ধরণের গাছ। পুরো কম্পাউন্ডটা প্রায় সাত ফিট উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। পাঁচিলের ওপরে রয়েছে কাঁটাতারের ফেন্সিং। পাঁচিলের ধার ঘেঁষে রয়েছে বড় ছোট নানা ধরণের গাছগাছালি। সব মিলিয়ে এই বাড়িতে থাকলে অক্সিজেনের অভাব কোনদিনই যে হবে না একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

পোর্টিকোটার একদিকে দুই ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে মূল বাড়িতে ঢোকার সদর দরজা। দরজাটা খোলাই রয়েছে। গৌতমের সাথে ঘরে ঢুকতেই অনিকেত দেখলেন ডানদিকে একটা ঘর থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসে ঘরে তালা লাগাচ্ছে। ছিপছিপে চেহারা। মধ্যবয়স্ক। মাথায় কোঁকড়ান কাঁচা পাকা চুল। ফর্মাল শার্ট প্যান্ট পরনে। পিঠে ব্যাকপ্যাক। পায়ে একটা চামড়ার চপ্পল। লোকটা তাঁদের লক্ষ্য না করে তালা লাগাতেই ব্যস্ত। অনিকেত আড়চোখে গৌতমের দিকে তাকাতে গৌতম অস্ফুট স্বরে বলল, – কেশব দেবনাথ।

কেশব তালাটা লাগিয়ে দুএকবার টেনে টেনে পরীক্ষা করে দেখল ঠিকঠাক লাগান হয়েছে কিনা। তারপরে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাঁদের দেখে যেন প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে একগাল হেসে তাঁদের দিকে এগিয়ে এসে বলল, – গুড মর্নিং স্যার! সকাল সকাল এখানে, কোনও বিশেষ দরকার ছিল নাকি?

– গুড মর্নিং কেশববাবু। গৌতম প্রত্যুত্তরে বলল। তারপর অনিকেতকে দেখিয়ে বলল, – এনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি হলেন মিঃ অনিকেত স্যান্যাল। দিল্লীতে সিবিআই এর ডিরেক্টর ছিলেন। সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন। উনি এই কেসটার তদন্তে লালবাজারকে সাহায্য করছেন। তাই এঁকে একবার নিয়ে এলাম ঘটনাস্থলটা দেখাতে।

– অ্যাঁ সিবিআই! চোখ কপালে উঠে গেল কেশবের। – স্যারের কেসটা কি এখন সিবিআই হ্যান্ডল করছে?

– আরে না না! একটু বিরক্তই হল গৌতম। – আসলে উনি আমার পরিচিত। তাই একবার সবকিছু বুঝেশুনে, সবার সাথে কথাবার্তা বলে একটা এক্সপার্ট ওপিনিয়ন দেবেন বলেই উনি এসেছেন।

– আমি জানি এই সময়টা আপনাদের ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এতক্ষণে মুখ খুললেন অনিকেত। – আসলে খুনের তদন্ত তো। বুঝতেই পারছেন। একটু কষ্ট করতে হবে।

– না না! ছি ছি। লজ্জায় যেন মাটিতে মিশে গেল কেশব। – একশ বার কথা বলবেন। কষ্ট কেন হবে? আমরা সবাই তো চাই স্যারের খুনি যেন উপযুক্ত শাস্তি পায়। কিন্তু মুশকিল হল সবার সাথে তো কথা বলতে পারবেন না, কারণ নন্দিতা ম্যাডাম তো কিছুক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেলেন। আউটডোর শুটিং আছে বোধহয়। ফিরতে রাত হয়ে যাবে।

– কি আর করা যাবে! যারা বাড়িতে আছেন তাঁদের সাথেই পরিচয়টা সেরে নেই তাহলে। অনিকেত বললেন। – তা আপনি কোথাও বেরচ্ছিলেন মনে হয়। আপনার সাথেই কথা বলে নেই প্রথমে?

–  হেঁ হেঁ! ঠিকই ধরেছেন। আসলে এখানকার পাট তো চুকল। যিনি দানা যোগাতেন তিনিই আর রইলেন না। কিন্তু পেট তো আর মশাই সেকথা বুঝবে না। খোলসা করে বলল কেশব। – দেখি অন্য কোথাও কিছু অন্নসংস্থান করা যায় কিনা। মানে একটা ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি।

– হুমম! বেশ বেশ! তো আপনি কি বরাবরই কোথাও বেরোলে দরজায় তালা লাগিয়ে যান? আচমকা প্রশ্ন ছুঁড়লেন অনিকেত।

–  অ্যা! না… মানে হ্যাঁ। থতমত খেয়ে গেল কেশব। – আসলে কি জানেন তো এই কদিনে এত লোক আসছে তো বাড়িতে। কার মনে কি আছে কে বলতে পারে। তাই আর কি।

– হ্যাঁ, তা তো বটেই। চলুন সোফায় বসে কথা বলা যাক। বলে অনিকেত এগিয়ে গেলেন ঘরের মাঝে রাখা সোফাসেটটার দিকে।

সোফায় বসে একটা সিগারেট ধরিয়ে অনিকেত প্রশ্ন করলেন, – তা কেশববাবু, কতদিন হল অচিন্ত্যবাবুর এখানে কাজ করছিলেন?

– তা হয়ে গেল বেশ কদিন স্যার! কেশব যেন বিনয়ের অবতার। – এই তো সামনের জুলাই মাসে দুবছর পুরো হত!  

– আপনার বাড়ি তো আসানসোলে। তাই না? কে কে থাকে ওখানে?

– আমার স্ত্রী আর ছেলে। সংক্ষিপ্ত জবাব কেশবের।

– তা ওদের নিয়ে আসেন না কেন কোলকাতায়?

– কি করে নিয়ে আসব বলুন স্যার। এমন কি আর কাজ করি যে বউ ছেলেকে নিয়ে কোলকাতায় বাড়িভাড়া করে থাকব? নেহাত স্যার থাকতে দিতেন তাই থাকা খাওয়ার খরচটা লাগত না। নাহলে এই সামান্য বার হাজার টাকা মাস মাইনের চাকরীতে নিজের হাত খরচাটুকু বাদ দিয়ে প্রতিমাসে পাঁচ ছয় হাজার টাকাও হয়ত বাড়িতে পাঠাতে পারতাম না। কেশবের গলার স্বর ভারী হয়ে উঠল।

– আচ্ছা অচিন্ত্যবাবু লোক হিসেবে কেমন ছিলেন। মানে ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর কোনও শত্রু টত্রু ছিল কি? সামনে রাখা অ্যাশট্রেতে ছাইটা ঝেড়ে বললেন অনিকেত।

– কেমন করে বলি বলুন, তিনি ছিলেন আমার অন্নদাতা। তিনি কেমন লোক ছিলেন এটা বিচার করা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা হবে। তবে এটা বলতে পারি ইন্ডাস্ট্রিতে কেউই কারোর বন্ধু হয় না। সবাই সবাইকে বাঁশ দেবার জন্যে সবসময় রেডি। বলে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে একটা অশ্লীল ইঙ্গিত করল কেশব।

– তার মানে বলতে চাইছেন বাইরের কেউও এই খুনটা করতে পারে। ভুরু কুঁচকলেন অনিকেত।

– এমা ছি ছি! জিভ কাটল কেশব। – সে কথা কখন বললাম? তাছাড়া পুলিশ যখন ওঁর ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে, তখন বুঝেই করেছে নিশ্চয়ই। তবে…

– তবে?

– না মানে, ছেলেটাকে দেখে মনে তো হয় না যে সে এই কাজ করতে পারে। কিন্তু বলা যায় না, আজকালকার ছেলে তো। আবেগের বশে চলে সবসময়। তাছাড়া স্যার সেদিন এত রেগে ছিলেন, দিয়েছিলেন দুচার কথা শুনিয়ে। তাই পাল্টা রেগে গিয়ে ঝোঁকের মাথায় হয়ত…। কথাটা শেষ করল না কেশব।

– অচিন্ত্যবাবু সেদিন এত রেগে ছিলেন কেন কারণটা জানেন?

একটু ভেবে উত্তর দিল কেশব, – দেখুন, স্যারের এত বড় বড় লোকের সাথে মেলামেশা, কথাবার্তা। আমি সামান্য মানুষ। আমি কি করে জানব? আদার কারবারি কি আর জাহাজের খবর রাখে? তবে ছোট মুখে একটা বড় কথা বলি? মনে হয় রাগটার পিছনে কোনও পারিবারিক কারণ জড়িত।

– এরকম মনে হবার কারণ? তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন অনিকেত।

– বিষ্যুদবার বিকেলে স্যার আমাকে কয়েকটা চিঠি টাইপ করার জন্যে ডিকটেশন দিচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর কাছে একটা ফোন আসে। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে গলার স্বরটাকে একদম খাদে নামিয়ে বলল কেশব, – ফোনে কথা বলতে বলতে স্যার বেশ কয়েকবার নন্দিতা ম্যাডামের নামটা উচ্চারন করেন। ফোনটা রেখে দেবার পর থেকেই দেখি তাঁর মেজাজ খারাপ। অকারণে চেঁচামেচি করছেন। যাকে তাকে ঝাড়ছেন। ডিকটেশনটাও শেষ করলেন না। বললেন এক্ষুনি বাড়ি যাবেন। তাই মনে হল আরকি।

– এই কথাগুলো আপনি আগে বলেননি তো? আকাশ থেকে পড়ল গৌতম।

বিন্দুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে বলল কেশব, – আগে তো জিজ্ঞেস করেননি স্যার!

আবার রেগে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল গৌতম। কিন্তু তাকে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললেন অনিকেত, – সেদিন সন্ধেবেলা বাড়ি ফেরার পর ঠিক কি কি হয়েছিল একবার ডিটেলে বলুন তো।

একটু সময় নিয়ে চিন্তা করে জবাব দিল কেশব, – সেদিন বাড়ি ফেরার পর স্যার আমাকে চিঠিগুলো মেল করে দিতে বলেন। গাদাগুচ্ছের মেল। আরও বেশ কিছু কাজও দিলেন। আসলে বহুদিন তো স্যার দেশে ছিলেন না। অনেক কাজ পেন্ডিং হয়ে ছিল। তো যাই হোক একমনে কাজগুলো করছিলাম, এদিক ওদিক তাকানোর ফুরসৎ ছিল না আমার। হঠাৎ চেঁচামেচি শুনে বাইরে এসে দেখি, স্যার চিৎকার করতে করতে তাঁর ছেলেকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছেন।

– কি বলছিলেন তিনি।

– এই যেমন, 'তোমরা মা ছেলে মিলে অনেক টাকা শুষেছ', 'আর এক পয়সাও দেব না', 'রাস্তায় ভিক্ষে কর গিয়ে', এইসব আর কি।

অচিন্ত্যর স্বভাবচরিত্রটা একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছিল অনিকেতের কাছে। জানতে চাইলেন, – আর সৈকত, সে কি বলছিল?

– সত্যি বলতে কি, ছেলেটাকে দেখে আমার কষ্ট হচ্ছিল স্যার। এত মিষ্টি মুখটা। দুঃখে অপমানে লাল হয়ে গেছিল। মনে হচ্ছিল কেঁদেই ফেলবে। মুখটা করুণ হয়ে এল কেশবের। – বেচারা, মন খারাপ করে চুপ করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

– তারপর?   

– তারপর আর কি? সৈকত বেরিয়ে যাবার পরে দাপাদাপি করতে করতে স্যার উঠে গেলেন দোতলায়। আমি ঘরে ফিরে আবার কাজগুলো নিয়ে বসলাম। সৈকত কখন আবার ঘরে ঢুকেছে বা বেরিয়েছে টের পাইনি। একদম দশটার সময় রাখালের মার চিৎকারে ওপরে উঠে দেখি এই কাণ্ড।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অনিকেত বললেন, – ঠিক আছে কেশববাবু আপনাকে আর আটকে রাখব না। আপনার হয়ত দেরী হয়ে যাচ্ছে। আপনার কাছ থেকে যা জানার ছিল জেনে নিয়েছি। আপনি এবার আসতে পারেন।

গদগদ ভাবে উঠে দাঁড়াল কেশব। বলল, – ঠিক আছে স্যার। আমি যাই একবার গণেশকে বলে দিই অরুণিমা ম্যাডামকে খবর দিতে। উনিও হয়ত বেরিয়ে যাবেন ডিউটিতে।

অনেকক্ষণ ধরেই একটা লোক দূর থেকে উঁকিঝুঁকি মারছিল। কেশব তার কাছে গিয়ে তাকে কিছু নির্দেশ দিতে শুরু করল। সেই দিকে তাকিয়ে গৌতম রাগত স্বরে বলল, – আচ্ছা ধড়িবাজ লোক তো! দিব্যি ডাহা মিথ্যে কথা বলে চলে গেল। বিশ্বাস করুন জ্যেঠু আমি নিজে ওকে এই প্রশ্নটা আগে করেছি। তখন ও বলেছে যে ও এব্যাপারে কিছুই জানে না। আর এখন বলছে ওকে নাকি আগে জিজ্ঞেসই করা হয়নি। কোলকাতা পুলিশ যে এতটা অকর্মণ্য নয় এটা প্রমাণ করতে যেন বদ্ধপরিকর গৌতম।

– রিল্যাক্স গৌতম! আই ট্রাস্ট ইউ! আশ্বস্ত করলেন অনিকেত। – শোন! কেশব হল গভীর জলের মাছ। আমি শিয়োর ও আগে ইচ্ছে করেই তোমাদের এই কথাগুলো বলেনি। কেন বলতো? আমার মনে হয় ও এই কথাগুলো গিয়ে নন্দিতাকে বলেছিল। ওর ইচ্ছে ছিল নন্দিতাকে ভয় দেখিয়ে কিছু টাকা হাসিল করা। সিম্পল ব্ল্যাকমেলিং আর কি! কিন্তু নন্দিতা মনে হয় পাত্তা দেয়নি। তাই রেগে মেগে এখন আমাদের কাছে সবকথা উগড়ে দিল। দেখলে না কেমন কায়দা করে নিজে থেকে প্রসঙ্গটা তুলল। হাসতে হাসতে বললেন অনিকেত।  

গৌতম চোখ দিয়ে তাঁকে থামতে ইশারা করল। কেশব ফিরে আসছে। অরুণিমাকে খবর দিতে গণেশ উঠে গেছে দোতলায়। । কেশব এগিয়ে এসে তাঁদের বলল, – তাহলে আমি আসি স্যার! গণেশকে বলে দিয়েছি। ও ম্যাডামকে ডেকে দেবে। বলে হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

গৌতম সামনের সেন্টার টেবিলে রাখা একটা ফিল্মি ম্যাগাজিন তুলে পাতা ওলটাতে শুরু করল। তিনি এই অবসরে উঠে দাঁড়িয়ে সারা ঘরটাতে একবার চোখ বোলালেন। ঘরে ঢুকেই প্রথমেই একটা বিশাল লিভিং রুম। এত বড় যে অনায়াসে ফুটবল খেলা যাবে। সামনে থেকেই বড় ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। ডানদিকে একটা বড় ঘর। খোলা দরজা দিয়ে ভিতরটা যতটুকু দেখা যাচ্ছে মনে হয় সেটা স্টাডিরুম কাম লাইব্রেরী। বড় একটা মেহগনি কাঠের টেবিল আর কয়েকটা চেয়ার দেখা যাচ্ছে। পুরো ঘরের দেওয়াল জুড়ে বইয়ের র‍্যাক। তাতে সারি সারি বই সাজানো। পাশে আরও দুএকটা ঘর। এরমধ্যেই একটা ঘর কেশবের, যেটায় এখন তালা ঝুলছে। লিভিং রুমের সামনের দিকটায় রয়েছে একটা সুদৃশ্য সোফাসেট যেখানে তাঁরা এখন বসে আছেন। সোফাসেটের সামনে একটা সেন্টার টেবিল। নীচে লাল রঙের টার্কিশ কার্পেট। মাথার ওপরে বিশাল একটা ঝাড়লণ্ঠন। তার সামনে একটা ওয়াল ইউনিটে অত্যাধুনিক এলইডি টিভি আর হোম থিয়েটার। পাশে একটা শোকেসে অনেকগুলো ট্রফি, পদক ইত্যাদি সাজানো। সোফাসেটের পিছনের দিকে আবার দুধাপ সিঁড়ির পরে ডাইনিং স্পেস। সেখানে একটা মস্ত কাঠের তৈরি ডাইনিং টেবিল। তারও পিছনে ওপেন মডিউলার কিচেন। ঘরের সব দেওয়ালেই ঝুলছে বিভিন্ন বাংলা ছবির বড় বড় পোস্টার। অধিকাংশই ‘সরকার ফিল্মস’ এর প্রযোজিত সিনেমা। ঘরের সবকিছুতেই বৈভবের ছাপ সুস্পষ্ট।

একটু বাদেই গণেশ নীচে নেমে এসে খবর দিল যে অরুণিমা তাঁদের ওপরে নিজের ঘরে ডাকছেন। অনিকেত গণেশকে ডেকে বললেন, – তুমি গণেশ, তাই তো। চল ম্যাডামের সাথে কথা বলার আগে তোমার সাথে আলাপটা সেরে নিই।

গণেশের মুখেচোখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। আতঙ্কিত স্বরে বলল, – আমি কিছুই জানি না বাবু!

কিন্তু কিছু লাভই হল না গণেশকে প্রশ্ন করে। যাই প্রশ্ন করা হয় গণেশের বাঁধাধরা একটাই জবাব। সে কিছুই জানে না। নতুন কিছুই জানা গেল না তার কাছ থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাল ছেড়ে দিয়ে অনিকেত বললেন গৌতমকে, – চল অরুণিমার সাথে দেখাটা সেরে আসি। 

সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে ডানদিকে একটা করিডোর। করিডোরটার একপাশে সারিবদ্ধ কয়েকটা ঘর। তারই মধ্যে একটা ঘর অরুণিমার। অরুণিমা রেডি হয়ে ছিল কোথাও বেরোবে বলে। খাটের ওপরে একটা ল্যাপটপ খুলে কাজ করছিল। তাঁদেরকে দেখে ল্যাপটপটা লক করে ঘুরে বসে দেওয়ালের ধারে রাখা ছোট বেতের সোফাসেটটায় তাঁদের বসতে বলে বলল, – আমি খুবই দুঃখিত, আপনাদের বেশীক্ষণ সময় হয়ত দিতে পারব না। আমার ডিউটির সময় হয়ে গেছে। আমি আসলে আমার ড্রাইভারের জন্যে ওয়েট করছি। সে যে কোনও সময় এসে গেলে আমাকে কিন্তু বেরিয়ে যেতে হবে।

অনিকেত ভালো করে লক্ষ করলেন অরুণিমাকে। মাঝবয়সী। খুব সুন্দরী হয়ত নয়, কিন্তু চেহারায় একটা চটক রয়েছে। ধীর স্থির। প্রসাধনহীন মুখে বুদ্ধিমত্তার ছাপ। কাঁধ পর্যন্ত স্টেপ কাট চুলে হালকা রঙের আভাস। শাড়ির ওপর একটা ডাক্তারদের সাদা অ্যাপ্রন পড়া। গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলছে। দাদার মৃত্যুতে খুব একটা শোকাতুর বলে মনে হল না।

প্রাথমিক পরিচয়পর্ব শেষ হলে অনিকেত প্রশ্ন করলেন, – আপনার কি মনে হয় মিস সরকার। আপনার দাদাকে কে হত্যা করেছে?

মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে উত্তর করল অরুণিমা, – দেখুন সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স অনুযায়ী তো মনে হয় বাপ্পা মানে সৈকতই কাজটা করেছে। কিন্তু তাও জানেন মন থেকে মেনে নিতে পারছি না। আসলে বাপ্পাকে তো ছোটবেলা থেকেই দেখছি। বাবাকে অসম্ভব ভালবাসত। দাদা যখন বৌদির সাথে মানে ওর মার সাথে ডিভোর্স করল, ভিতর ভিতর ভীষণ মুষড়ে পড়েছিল ছেলেটা। হাসব্যান্ড বা বাবা হিসেবে দাদা তো কোনওকালেই খুব একটা আদর্শবান ছিল না। হয়ত এইসব ব্যাপারগুলো থেকে ওর মনে একটা চাপা ক্ষোভ বহুদিন ধরেই জমে ছিল। হঠাৎ করে সেটা আউটবার্স্ট করেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অরুণিমা।

– অচিন্ত্যবাবুর বর্তমান স্ত্রী মানে নন্দিতার সাথে কেমন সম্পর্ক ছিল? অনিকেত জিজ্ঞাসা করলেন।

উত্তর দেবার আগে আবার সময় নিল অরুণিমা, – সাধারণত কারোর পার্সোনাল ব্যাপারে আমি নাক গলাই না, তাও বলছি, দাদা মানুষটাই এমন ছিল যে ওর সাথে সুখে সংসার করাটা যে কোনও মহিলার পক্ষেই বেশ কঠিন ব্যাপার। বৌদি মানে বাপ্পার মা, তাঁর মত ধৈর্যশীল মহিলাও যেখানে পারেননি সেখানে নন্দিতা এত কম বয়সে কি করে সব সহ্য করবে। আমি নন্দিতাকে দোষ দিচ্ছি না। তবে আমার মনে হয় তারও আর একটু ম্যাচিওরিটি দেখানো উচিত ছিল।

– ঠিক কি বলতে চাইছেন একটু পরিষ্কার করে বলবেন কি?

– স্যাঙ্গুইন না হয়ে কিছু বলাটা আমার প্রফেশনাল এথিক্সের বিরুদ্ধে। একটু কেটে কেটে বলল অরুণিমা, – তাও এইটুকু বলতে পারি আমি ডাক্তার। আমার চোখে অনেক কিছুই ধরা পরে যা সাধারণ মানুষের পক্ষে চট করে বোঝা সম্ভব নয়। আয়্যাম সরি। এর থেকে বেশী আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।

এমন সময় খাটের ওপর রাখা অরুণিমার মোবাইলটা বেজে উঠল। সেটার কলার আইডিটার দিকে এক ঝলক দেখে নিয়ে অরুণিমা বলল, – আমার ড্রাইভার। মনে হচ্ছে এসে গেছে। আমাকে এবার উঠতে হবে। আয়্যাম অলরেডি রানিং লেট। সো ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড…

অরুণিমার ঘর থেকে বেরিয়ে অনিকেত গৌতমকে কাছে ডেকে কিছু একটা নির্দেশ দিলেন। গৌতম ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপরে অনিকেত প্রস্তাব দিলেন, – দোতলায় উঠেই যখন পড়েছি, চল একসাথে অকুস্থলটাও ঘুরে আসা যাক।

অরুনিমার ঘরের দুটো ঘর পরেই অচিন্ত্যর বেডরুম। সেটা লালবাজার সিজ করে রেখেছিল। গৌতম চাবি এনেছিল সাথে। চাবি খুলে তাঁরা ভিতরে ঢুকলেন। ঘরে ঢুকে দেখা গেল বেশ সাজানো গোছানো একটা ঘর। একটা কিং সাইজের ডাবল বেড ঘরের মাঝখানে। দুপাশে বেডসাইড টেবিলে নাইটল্যাম্প। দরজার পাশেই একটা টেবিল। টেবিলে একটা ডেস্কটপ। একটা রাইটিং প্যাড। একটা পেনস্ট্যান্ডে কয়েকটা কলম রাখা। টেবিলের সাথে রিভলভিং চেয়ার। একদিকের দেওয়াল জুড়ে একটা মস্ত হালফ্যাশনের এমডিএফ ওয়ার্ডরোব। অন্যদিকের দেওয়ালে ছোট একটা এলসিডি। ঘরের একপাশে কাঁচের স্লাইডিং ডোরের পরে একটা ইস্ট ফেসিং ব্যালকনি। সূর্যের আলোয় গোটা ঘরটা উদ্ভাসিত।

অনিকেত তীক্ষ্ণ চোখে পুরো ঘরটায় চোখ বোলাচ্ছিলেন। হঠাৎ ঘরে ঢোকার মুখে রাখা পাপোশটার দিকে এগিয়ে গেলেন। উবু হয়ে বসে একদৃষ্টিতে কিছু একটা দেখতে শুরু করলেন। তাঁকে দেখে গৌতমও কৌতূহলী হয়ে একবার উঁকি মেরে দেখল। সাধারণ একটা পাপোশ। সবার ঘরেই যেরকম থাকে। উজ্জ্বল হলুদ রং। তার ওপরে কালো রঙে লেখা ‘ওয়েলকাম’। গৌতম অনিকেতের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল পাপোশের ওপরে একটা সরু লম্বাটে দাগ। কালচে মেরুন রঙের। খুব খেয়াল করে না দেখলে চোখে পড়ে না। দাগটার থেকে চোখ না সরিয়েই অনিকেত প্রশ্ন করলেন, – আচ্ছা গৌতম, অচিন্ত্যর পায়ে কি কোনও কাটা দাগ টাগ ছিল?

গৌতম একটু চিন্তা করে বলল, – না জ্যেঠু। আমার যতদূর মনে পড়ছে, ছিল না। তাছাড়া অটপ্সি রিপোর্টে পরিষ্কার বলা আছে যে একমাত্র গলার কাটা দাগটা ছাড়া অচিন্ত্যের শরীরে আর কোনও নতুন বা টাটকা ক্ষতচিহ্ন ছিল না।

অনিকেত মন দিয়ে শুনলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। যেন কিছু একটা খুঁজছেন। একবার টেবিল আর খাটের তলাটাতেও উঁকি মেরে দেখলেন। কিছু খুঁজে না পেয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে পেয়ে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। করিডোরে একটা ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট রাখা দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি সেটার কাছে গিয়ে উল্টে দিলেন সেটাকে। বেশ কিছু পুরনো কাগজ বেরিয়ে মাটিতে পড়ল। অধিকাংশই বিল জাতীয়। ইলেকট্রিক, পেপার বা রেস্ট্যুর‍্যান্টের বিল। এছাড়াও কিছু খালি হয়ে যাওয়া সিগারেটের প্যাকেট, একটা জেমস ক্লিপ, আরও কিছু জিনিস বেরিয়ে এল। সেগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে অনিকেত কিছু একটা দুই আঙ্গুলে ধরে বের করে আনলেন। মুখে একটা হারিয়ে যাওয়া অমূল্য রত্ন খুঁজে পাওয়ার হাসি। গৌতম অবাক হয়ে দেখল একটা চৌকোণ পাতলা কাঁচের টুকরো। ইঞ্চি খানেক লম্বা, আধ ইঞ্চি মত চওড়া। এবার পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে কাঁচের টুকরোটাকে রুমালে সাবধানে পেঁচিয়ে আবার রেখে দিলেন পকেটে।

অবাক হয়ে গৌতম জিজ্ঞেস করল, – ওটা কি পেলেন, জ্যেঠু?

অনিকেত উত্তর করলেন, – বলছি, দাঁড়াও! আগে সবটা দেখে নিই। বলে আবার ঘরে ঢুকে সোজা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন। গ্রিলের ঠিক ওপারেই একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। থোকা থোকা লাল ফুলে ভরে আছে। অনিকেত হাত বাড়িয়ে একটা ডাল ধরে তার ছোট ছোট পাতাগুলো ছিঁড়লেন। তারপরে হাতের তালুতে পাতাগুলো রেখে গ্রিলের বাইরে ফুঁ দিয়ে পাতাগুলো উড়িয়ে দিলেন। তাঁর মুখে ফুটে উঠল শিশুদের মত অকৃত্রিম এক হাসি। গৌতমকে ডেকে বললেন, – জান গৌতম। ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির কাছেই এরকম একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। সেটার পাতাগুলো নিয়ে এরকম ফুঁ দিয়ে ওড়াতে আমার খুব ভালো লাগত। সেই থেকেই কৃষ্ণচূড়া গাছ আমার খুব প্রিয়। ফুলসমেত এই গাছটা দেখলেই আমার গীতা দত্তের ওই গানটা মনে পড়ে যায়। ওই যে ‘কৃষ্ণচূড়া আগুন তুমি’। তুমি শুনেছ গানটা, গৌতম?

কয়েকদিন আগে যে ঘরে একটা নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়ে গেছে সেই ঘরে দাঁড়িয়ে এরকম কাব্য করতে দেখে গৌতম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অনিকেতের দিকে।

(ক্রমশ)

পরের পর্বঃ পঞ্চম পর্ব

দায়।। (চতুর্থ পর্ব)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments