আগের পর্বঃ দ্বিতীয় পর্ব

 

কোলকাতার রাস্তায় গাড়ী চালানোটা দিনকে দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে। একে তো হকারদের জ্বালায় পথচারীরা ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তাটাকেই হাঁটার জন্যে ব্যবহার করছে। তার ওপর গাড়ীর সংখ্যাও ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সবথেকে বেপরোয়া হল অটো চালকেরা। তাদের অটো চালানোর ধরণ দেখলে মিশন ইম্পসিবলের টম ক্রুজও বোধহয় লজ্জা পেয়ে যাবে। কোলকাতার তুলনায় দিল্লীতে গাড়ী চালানো অনেক সহজ ছিল।

নিজের আই টোয়েন্টিটা গ্যারেজে ঢোকাতে ঢোকাতে ভাবছিলেন অনিকেত। দময়ন্তী আর তিনি আজ গিয়েছিলেন তাঁর এক প্রাক্তন কলিগের ছেলের বিয়ের রিসেপশনে। কিন্তু সারাদিন ধরে তাঁর মাথায় অচিন্ত্য সরকারের মৃত্যুরহস্যটাই ঘুরপাক খাচ্ছে। গৌতম চেয়েছিল আজকেই তাঁকে নিয়ে একবার অচিন্ত্যর বাড়িতে গিয়ে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। কিন্তু সন্ধেবেলা নিমন্ত্রণ ছিল বলে তিনি আজকে যাননি। কথা দিয়েছেন কাল যাবেন। গৌতম সাথে করে প্রত্যেকের জবানবন্দীর কপি, আর অন্যান্য কিছু ডকুমেন্টস নিয়ে এসেছিল। সেগুলো দিয়ে গেছে তাঁকে পড়বার জন্যে। কিন্তু তিনি সময় পাননি চোখ বোলানোর। ঠিক করেছেন রাতে শোবার আগে ওগুলো নিয়ে বসবেন।

দময়ন্তী ঘরে ঢুকে গেছেন। তার মেজাজটা আজ একটু চড়া। হওয়ারই কথা। একে একে তাদের পরিচিত সবার ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বাবলুর বন্ধু বান্ধবরাও সবাই আস্তে আস্তে বিয়ে করে সংসারী হয়ে যাচ্ছে। শুধু তার স্বামী আর পুত্রেরই টনক নড়ছে না। বহুদিন ধরে বলতে বলতে তিনি ক্লান্ত। যতগুলো সম্বন্ধ তিনি খুঁজে নিয়ে আসেন হয় অনিকেত তাতে কোনও খুঁত বের করেন। আর অনিকেত কোনওভাবে রাজী হলে বাবলুর সেগুলো পছন্দ হয় না। আর এই করতে করতে ছেলের বয়স বেড়ে বেড়ে ত্রিশে এসে দাঁড়িয়েছে। আজ বাড়ি ফেরার পথে সারা রাস্তা এই নিয়ে তিনি গজ গজ করতে করতে এসেছেন। অনিকেত পাল্টা কোনও কথা বলেননি। কথা বললেই আগুনে ঘি পড়বে। তাই চুপ করে থাকাটাকেই বেছে নিয়েছেন। আসলে বাইরে অনিকেত যতই দোর্দণ্ডপ্রতাপ অফিসার হন না কেন, হোমফ্রন্টে সবসময় শেষ কথাটা দময়ন্তীই বলেন। মাঝে মাঝে তিনি অবাক হয়ে ভাবেন তাঁর স্ত্রী দুনিয়ার সবকিছুকে ভয় পেলেও তাঁকে একেবারেই ভয় পায় না। আর তিনি, পৃথিবীতে কাউকে ভয় পান না, কিন্তু নিজের স্ত্রীকে একটু সমঝে চলেন।

ঘরে ঢুকে দেখলেন দময়ন্তীর মেজাজ কিছুটা ঠাণ্ডা হয়েছে। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে দময়ন্তী চলে গেল শুতে। তিনি বসলেন গৌতমের রেখে যাওয়া জবানবন্দীর ফাইলটা নিয়ে।

একঘন্টা লাগল সবার জবানবন্দী পড়ে ফেলতে। যা যা গৌতম বলে গেছে তার থেকে নতুন কিছুই পেলেন না। সাথে রেখে যাওয়া অন্যান্য কাগজপত্রগুলো পরীক্ষা করে দেখলেন। তন্ময়ের ট্রেনের টিকিট, হোটেলের কাগজপত্রের ফটোকপি আরও কিছু ডকুমেন্টস। তৎকালের টিকিট। হোটেল রিজার্ভেশনের কাগজগুলো দেখে দেখলেন সবই ঠিকঠাক। কোথাও কোনও গণ্ডগোল নেই। কিন্তু তাও তাঁর মনে একটা খটকা থেকে গেল। কি খটকা সেটা বুঝতে পারলেন না। কিছু একটা তাঁর মনে এসেও আসছে না। বয়স থাবা ফেলেছে তাঁর মনে। মাথাটা আগের মত শার্প নেই আর, এই ভেবে মনে মনে একটা আক্ষেপ হতে লাগল তাঁর।

হঠাৎ কি মনে হওয়ায় ল্যাপটপটা টেনে নিয়ে গুগলে নন্দিতার নামে সার্চ করলেন। অনেকগুলো লিঙ্ক এলো। উইকিপিডিয়ায় গিয়ে পড়লেন তার সম্বন্ধে। গতানুগতিক লেখা, কবে জন্ম, কি কি ফিল্মে অভিনয় ইত্যাদি ইত্যাদি। আরও কিছু এদিক ওদিক ব্রাউজ করার পরে হঠাৎ নিউজ সেকশনে একটা খবর তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। আড়াই বছর আগেকার একটা খবর। নন্দিতা তখন লাগাতার তৃতীয় সুপারহিট ছবিটা করে আলোচনার তুঙ্গে। এইরকম সময় নন্দিতার তন্ময়ের সাথে ডিভোর্স আর অচিন্ত্যর সাথে সম্পর্কের মুখরোচক খবর নিয়ে মিডিয়া উত্তাল। সেই সময় কোর্টে ডিভোর্সের মামলা চলাকালীন উত্তেজিত হয়ে তন্ময় মিডিয়ার সামনে নন্দিতাকে মারবে বলে তেড়ে আসে। মুখে খুন করে ফেলবে বলে হুমকিও দেয়। ডিভোর্স পাওয়ার জন্যে নন্দিতা তন্ময়ের বিরুদ্ধে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের অভিযোগ এনেছিল। হয়ত অভিযোগটা সর্বৈব মিথ্যে ছিল। কিন্তু এই ঘটনার পরে নন্দিতার পক্ষে রায় দিতে বিচারকরা আর কোনও সময় নষ্ট করেননি।     

মানুষের মন কি বিচিত্র। সে আড়াই বছর আগে সর্বসমক্ষে যাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়, সময়ের সাথে সাথে তার সাথেই আবার মিটমাট করে নিতে বিন্দুমাত্র সময় নেয় না। অবাক হয়ে ভাবলেন অনিকেত।

এবার অচিন্ত্য সম্বন্ধে গুগল করলেন অনিকেত। তার সম্বন্ধে বিভিন্ন আর্টিকেল পড়লেন নেটে। নামকরা প্রোডিউসারের ছেলে। বাবার নাম ভাঙ্গিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ। কয়েকটা ভালো সিনেমা বানালেও বাবার মত সাফল্য পাননি। তাছাড়া অল্প বয়স থেকেই প্রচুর পয়সা হাতে আসায় তুমুল বোহেমিয়ান জীবনযাপন করেছেন। বিয়ে করা সত্ত্বেও বিভিন্ন অভিনেত্রীদের সাথে বারবার স্ক্যান্ডালে জড়িয়েছেন। অন্যান্য প্রোডিউসারদের সাথেও যে খুব ভালো সম্পর্ক, তা নয়। রাজনৈতিক পালাবদলের পরে তড়িঘড়ি নিজের ভোল পাল্টে ক্ষমতাসীন দলের সুনজরে চলে আসেন। ইদানীং হাঁটুর একটা সমস্যায় ভুগছিলেন। ট্রিটমেন্টের জন্যে লন্ডন গিয়েছিলেন মাস তিনেক আগে। সেখানেই প্রায় দুমাস থেকে হাঁটুতে সার্জারি করিয়ে দিন পনের কুড়ি হল দেশে ফিরেছিলেন।

ল্যাপটপটা বন্ধ করে একটা সিগারেট ধরালেন অনিকেত। আপাতদৃষ্টিতে খুব সহজ মনে হলেও আসলে কেসটা বেশ জটিল। তাঁরও মনে মনে বিশ্বাস সৈকত খুনটা করেনি। সে এসেছিল বাবার সাথে কথা বলতে। রাগের মাথায় খুন করলে সে ক্লোরোফর্ম পেল কোথায়? সে ছাড়া আর কেই বা খুনটা করতে পারে? কেশব? তাঁর মোটিভ কি? যার কাছে চাকরী করে, তাঁকে খুন কেন করবে সে? গণেশ, রাখালের মা? তারা তো অনেকদিন ধরে আছে এই বাড়িতে। অত্যন্ত বিশ্বাসী। তাহলে কি বাইরের কেউ? জগন্নাথ হলপ করে বলছে যে আর কেউই বাড়িতে ঢোকেনি বা বেরয়নি।         

অনিকেত উঠে গিয়ে ডেস্ক থেকে একটা খালি ডাইরি নিয়ে এলেন। কর্মজীবনে তিনি যখনই কোনও কেসের অনুসন্ধান করতেন, যে সব তথ্য বা নোটস উল্লেখযোগ্য বলে মনে হত, সেগুলো লিখে রাখতেন ডাইরিতে। এভাবে লিখে রাখলে পরে অনেক জট ছাড়াতে সুবিধে হয়। ডাইরিটা খুলে তিনি এখনও পর্যন্ত এই কেসে জড়িত প্রত্যেকের সম্বন্ধে যা যা জেনেছেন বা বুঝেছেন সব লিখতে শুরু করলেন।

অনেকক্ষণ ধরে ভেবেচিন্তে সবটা লেখার পরে প্রথম থেকে একবার পড়তে শুরু করলেন। লেখাটা এইরকম।

অচিন্ত্য সরকার – বয়স একান্ন বছর। প্রচুর সম্পত্তি। লোক হিসেবে সুবিধের নয়। মৃত্যুর দিন কোনও কারণে উত্তেজিত ছিল (কি কারণ?)। ছেলে টাকা চাইতে এলে রেগে মেগে বের করে দেয়। সাড়ে আটটায় শেষ বার জীবিত দেখা যায় তাঁকে। দশটার সময় তাঁর ডেডবডি আবিষ্কার করে রাখালের মা। ক্লোরোফর্মড, গলার নলি কাটা। ক্লিন সিঙ্গল কাট। মার্ডার ওয়েপন পাওয়া যায়নি। আলমারি থেকে টাকা ও গয়না মিসিং (এটাই কি মোটিভ?)।

নন্দিতা সরকার – অচিন্ত্যর বর্তমান স্ত্রী। বয়স একত্রিশ বছর। ঘটনার সময় তাজ বেঙ্গলে পার্টিতে ছিল। স্ট্রং অ্যালিবাই । খুনের সুযোগ নেই। কিন্তু মোটিভ আছে। স্বামীর মৃত্যুতে সমস্ত সম্পত্তির মালিক।

সৈকত সরকার – অচিন্ত্যর ছেলে (প্রথম পক্ষের)। বয়স বাইশ বছর। মেধাবী ছাত্র, কবিতা লেখে। খুনের দিন বাবার কাছে টাকা চাইতে এসেছিল। সাড়ে আটটা থেকে নটা পর্যন্ত কোথায় ছিল বা কি করছিল তা পরিষ্কার নয়। খুনের মোটিভ টাকাও হতে পারে। আবার রাগের মাথায় খুনও হতে পারে। ঘটনাস্থল থেকে হাতের ছাপ সমেত লাইটার পাওয়া গেছে। তার মানে বাবার শোবার ঘরে সে ঢুকেছিল। যদিও মুখে অস্বীকার করছে। অ্যালিবাই নেই।   

অরুণিমা সরকার – অচিন্ত্যর সৎ বোন। বয়স তেত্রিশ। অবিবাহিত, ডাক্তার। ঘটনার সময় বাড়িতে ছিল না। খুনের মোটিভ নেই। সুযোগও নেই। অ্যালিবাই পাক্কা।

কেশব দেবনাথ – অচিন্ত্যর ম্যানেজার কাম সেক্রেটারি। বয়স ছেচল্লিশ। অচিন্ত্যর বাড়িতেই থাকত। ঘটনার দিন অচিন্ত্য কোনও কারণে বকাঝকা করে। খুনের সময় বাড়িতেই ছিল, কিন্তু কোনও অ্যালিবাই নেই। খুনের সুযোগ আছে। মোটিভ তদন্ত সাপেক্ষ।   

সুরমা সরকার – অচিন্ত্যর প্রথম স্ত্রী। বয়স সাতচল্লিশ। খুনের সময় গড়িয়ায় নিজের ফ্ল্যাটে ছিল। কোনও অ্যালিবাই নেই। মোটিভ স্বামীর প্রতি পুরনো রাগ হতে পারে। কিন্তু খুনের সুযোগ নেই।

তন্ময় ঘোষ – নন্দিতার প্রথম পক্ষের হাসব্যান্ড। বয়স চৌত্রিশ। নন্দিতাকে খুনের হুমকি দিয়েছিল। আবার এখন তার সাথেই বন্ধুত্ব। মাসে তেইশটা কল (?)। অ্যালিবাই পাক্কা। মোটিভ নেই। সুযোগ নেই।

রাখালের মা ও গণেশ – বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ড আর কুক। বয়স যথাক্রমে আটান্ন আর একচল্লিশ। খুনের সময় বাড়িতেই ছিল। কিন্তু মোটিভ নেই। একে অপরের অ্যালিবাই।   

সবটা পড়ে ফেলার পর হঠাৎ অনিকেত খেয়াল করলেন রাত দেড়টা বেজে গেছে। কাল আবার সকাল সাড়ে নটায় গৌতম চলে আসবে। অচিন্ত্যর বাড়িতে নিয়ে যাবে। বেশী রাত করলে সকালে উঠতে দেরী হয়ে যাবে। তাই আর দেরী না করে অনিকেত শুয়ে পড়লেন। গরমটাও পড়েছে প্রচণ্ড। এসির ঠাণ্ডায় আর সারাদিনের ক্লান্তিতে শুতে না শুতেই ঘুম এসে গেল।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলেন ঠিক নেই। অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখে ভোর রাতের দিকে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল। স্বপ্নে তিনি দেখলেন কোনও একটা মস্ত বড় হলে সিনেমা দেখছেন তিনি। একজন সাদা পোশাক পড়া লোক এসে তার কাছে টিকিট দেখতে চাইল। তিনি তাঁর প্রত্যেকটা পকেটে মরিয়া হয়ে খুঁজছেন টিকিটটা। কিন্তু কোথাও পাচ্ছেন না। সারা জীবন নিয়ম মেনে  চলে এসেছেন তিনি। টিকিটটা না পেয়ে লজ্জায় তাঁর মাথা কাটা যাচ্ছে। আশেপাশের লোকেরা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। এমন সময় তিনি খেয়াল করলেন যারা যারা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে তাদের প্রত্যেকের গলায় একটা মস্ত কাটা দাগ। রক্ত চুইয়ে পড়ছে সেখান থেকে।

ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় উঠে ঢক ঢক করে এক গ্লাস জল খেলেন তিনি। পাশে দময়ন্তী তখনও গভীর ঘুমে। মোবাইলটাতে দেখলেন সবে পাঁচটা একুশ বাজে। কাল রাতে এত ভারী খাওয়া দাওয়া হয়েছে। নির্ঘাত পেট গরম হয়ে গেছে। তার ওপর সারাদিন অচিন্ত্যর মৃত্যু মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে। সবকিছুর যোগফল এই বিদঘুটে স্বপ্নটা।

এসিটা একটু কমিয়ে দিয়ে আবার একবার ঘুমনোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু চেষ্টাটাই সার হল। বাকী সময়টা খালি বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করেই কেটে গেল। ঘুম আর এল না।

(ক্রমশ)

পরের পর্বঃ চতুর্থ পর্ব

দায়।। (তৃতীয় পর্ব)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments