আগের পর্বঃ প্রথম পর্ব

 

লুচি আর আলুর দম দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে সোফায় ফিরে একটা ক্লাসিক আলট্রা মাইল্ডস ধরিয়ে অনিকেত বললেন, – নাও গৌতম। এবার শুরু কর তোমার কাহিনী।

একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে গৌতম শুরু করল, – ফিল্ম প্রোডিউসার অচিন্ত্য সরকারের নাম হয়ত আপনি শুনেছেন। টলিউডের অন্যতম বিখ্যাত প্রোডাকশন হাউস ‘সরকার ফিল্মস’ এর কর্ণধার অচিন্ত্য সরকার। ইদানীং কালের বেশ কিছু বিগ বাজেটের সুপারহিট সিনেমা ইনি প্রোডিউস করেছেন। এই অচিন্ত্য সরকারকে কেউ বা কারা পঁচিশে এপ্রিল মানে গত বৃহস্পতিবার তার আলিপুরের বাসভবনে হত্যা করেছে। রাত দশটা নাগাদ মৃতদেহ প্রথম আবিষ্কার করে তার বাড়ির মেড সারভেন্ট রাখালের মা। তার আগে সন্ধ্যে সাতটায় অচিন্ত্য যখন অফিস থেকে বাড়ি ফেরে তখন সে খুবই উত্তেজিত ছিল। বাড়ি ফিরেই অহেতুক সবাইকে বকাবকি করে। তারপরে মদ্যপান করতে শুরু করে। আটটা নাগাদ তার সাথে দেখা করতে আসে তার ছেলে সৈকত। সৈকত অচিন্ত্যর প্রথম পক্ষের সন্তান। সৈকতের সাথে অচিন্ত্যর তুমুল বাদানুবাদ হয়। অচিন্ত্য রেগে ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তারপরে সে দোতলায় নিজের শোবার ঘরে ফিরে যায়। দশটা নাগাদ রাখালের মা তাকে ডিনারের জন্যে ডাকতে গিয়ে দেখে অচিন্ত্যকে কেউ গলার নলি কেটে খুন করে গেছে।

এতটুকু বলে গৌতম একটু থামল। অনিকেত একমনে শুনছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, – বাড়িতে তখন কে কে ছিল?

– বাড়িতে ছিল রাখালের মা, বাড়ির কুক গণেশ আর অচিন্ত্যর সেক্রেটারি কাম ম্যানেজার কেশব দেবনাথ। রাখালের মা আর গণেশ মণ্ডল অনেক পুরনো লোক। অত্যন্ত বিশ্বাসী। তারা এক অপরের সাথেই ছিল আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত। ঘরের কাজকর্ম রান্নাবান্না এইসব করছিল। কেশব দেবনাথের বাড়ি আসানসোলে। কোলকাতায় অচিন্ত্যর বাড়িতেই থাকে। খাওয়া দাওয়াও এখানেই। ঘটনার দিন কেশব অচিন্ত্যর সাথেই ফেরে অফিস থেকে। বাড়ি ফেরার পরে অচিন্ত্যর মেজাজ খারাপ ছিল। তাই কোনও কারণে কেশবকে খুব বকাঝকা করে। তারপর তাকে কিছু ইম্পরট্যান্ট ডকুমেন্ট বানানোর কাজ দেয়। সেই সব কাজই করছিল সে দশটা পর্যন্ত। রাখালের মার চিৎকারে ওপরে গিয়ে দেখে অচিন্ত্য মরে পড়ে আছে। সারা সন্ধ্যে সে বাড়িতেই ছিল। কিন্তু তার কোনও সাক্ষী নেই।     

ধোঁয়ার একটা রিং ছেড়ে অনিকেত প্রশ্ন করলেন, – আর কে কে থাকে বাড়িতে?

একটু দম নিয়ে গৌতম বলল, – এরা ছাড়া অচিন্ত্যর সাথে থাকে তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী নন্দিতা আর তার সৎ বোন অরুণিমা। নন্দিতাও ফিল্ম লাইনেই আছে। বয়স তার নিজের বয়ান অনুযায়ী থার্টি ওয়ান। বেশ কয়েকটা ফিল্মে হিরোইনের রোলে অভিনয় করেছে। আগে মধ্যবিত্ত পরিবারের বউ ছিল। থিয়েটারের সখ ছিল। থিয়েটার করতে করতে এক মেগা সিরিয়ালের ডিরেক্টরের চোখে পড়ে। সেই সূত্রে একটা মেগা সিরিয়ালে অভিনয়ের সুযোগ পায়। সৌন্দর্য আর অভিনয় ক্ষমতার জোরে কিছুদিনের মধ্যেই ফিল্মে চান্স পেয়ে যায়। প্রথম দুতিনটে সিনেমা হিট করে যেতে অল্প সময়ের মধ্যেই ছোট পর্দা এবং বড় পর্দার খুবই পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে। এরকম সময়ে অচিন্ত্যর সাথে পরিচয়। অচিন্ত্য তখন প্রথম স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স করে সিঙ্গল ছিল। তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারপরে নন্দিতা তার প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স করে দুই বছর আগে অচিন্ত্যকে বিয়ে করে। গত বৃহস্পতিবার সকালে নন্দিতা বেরিয়ে যান শুটিং-এ। ফেরেন বিকেল সাড়ে ছটায়। তারপরে সাতটায় অচিন্ত্য ফেরার একটু আগে আবার বেরিয়ে যান একটা পার্টি অ্যাটেন্ড করতে। তাজ বেঙ্গলে। সেখান থেকে ফেরেন সাড়ে দশটায়। স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে।

অনিকেত চোখ বন্ধ করে শুনছিলেন। চোখ না খুলেই বললেন, – আর অরুণিমা?

– অরুণিমা পেশায় ডাক্তার। গাইনোকলজিস্ট। কোলকাতায় বেশ কয়েকটা নার্সিংহোমের সাথে যুক্ত। বয়স তেত্রিশ, অবিবাহিত। অচিন্ত্যর সাথেই থাকে। আসলে অচিন্ত্যর ফিল্ম প্রোডাকশনের ব্যবসা তার বাবার আমলে শুরু। অচিন্ত্যর বাবা অমূল্য সরকারও ছিল বাংলা ছবির নামকরা প্রোডিউসার। বাড়িটা তাঁরই তৈরি। অরুণিমা অমূল্যবাবুর দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। অমূল্যবাবু মারা যাবার সময় তাঁর সমস্ত সম্পত্তি অচিন্ত্যকে দিয়ে যান এই শর্তে যে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত অরুণিমার সব দায়িত্বভার অচিন্ত্য নেবে। সে জন্যেই অরুণিমা এখন দাদার সাথে আলিপুরের বাড়িতেই থাকে। যাই হোক, ঘটনার সময় তিনিও বাড়িতে ছিলেন না। নাইটিংগেল হসপিটালে ডিউটিতে ছিলেন। তার আগে দুপুর বেলা ডিউটিতে ছিলেন রুবি হসপিটালে। সেখান থেকে সাড়ে সাতটা নাগাদ বাড়ি ফেরেন। আবার আটটায় বেরিয়ে যান নাইটিংগেলে। বাড়ি ফেরেন দাদার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে।

অনিকেতের চোখ এখনও বন্ধ। ঘুমচ্ছেন না বোঝা যাচ্ছে কারণ মাঝে মাঝে সিগারেটটা টেনে ছাই ফেলছেন অ্যাশট্রেতে। গৌতম সামনে রাখা বোতলটা থেকে একটু জল খেয়ে আবার শুরু করল, – রাত আটটায় সৈকত আসে অচিন্ত্যর সাথে দেখা করতে। একতলায় স্টাডি-রুমে কথা বলতে বলতে বাপ ছেলেতে তুমুল ঝগড়া হয়। অচিন্ত্য অলরেডি নেশার ঘরে ছিল। ধাক্কা দিয়ে ছেলেকে বের করে দেয় ঘর থেকে। সৈকতও রেগেমেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। ঘড়িতে তখন বাজে সাড়ে আটটা। ঝগড়ার পর অচিন্ত্য চলে যায় দোতলায় শোবার ঘরে। তখনই অচিন্ত্যকে শেষ বারের মত জীবিত দেখা গেছে। সৈকত সাড়ে আটটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেও, মেনগেটে সিকিউরিটি জগন্নাথ পাল জানায় যে সৈকত তখনই গেট থেকে বেরয়নি। সে কম্পাউন্ডের ভিতরেই কোথাও একটা ছিল। তারপরে হঠাৎ নটা বাজার কয়েক মিনিট আগে পুরো বাড়ির পাওয়ার কাট হয়ে যায়। কিন্তু পাড়ায় বাকী সব বাড়ি বা দোকানপাটে কারেন্ট আছে দেখে জগন্নাথের সন্দেহ হয়। সে জেনারেটর কাম মিটার রুমে গিয়ে দেখে মেন ইলেকট্রিক লাইনের সার্কিট ব্রেকারটা ট্রিপ করে গেছে। লাইন সারাই করে সিকিউরিটি রুমে ফেরার পথে জগন্নাথ দেখে সৈকত খুব তাড়াহড়ো করে গেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। শুধু জগন্নাথই নয়, রাখালের মা আর গণেশও কারেন্ট আসার পরে সৈকতকে সিঁড়ি দিয়ে দোতলা থেকে নামতে দেখেছে।

এবার অনিকেত চোখ খুলে জিজ্ঞেস করলেন, – সৈকত এ ব্যাপারে কি বলছে?

– সৈকতের বক্তব্য সে বাবার কাছে এসেছিল কিছু টাকা চাইতে। সে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে এবছর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। মাস্টার্সের জন্যে বিদেশে পড়তে যেতে চায়। খুবই মেধাবী ছাত্র সে। কিন্তু বিদেশে পড়তে গেলে যে পরিমাণ খরচ সেটা বহন করা তার মায়ের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সে বাবার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিল। কিন্তু তার বাবা মায়ের ডিভোর্সের সময় যে রকম তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল এবং সৈকত যে সে সময় মায়ের পক্ষ নিয়েছিল সেটা অচিন্ত্য ভোলেননি। ছেলেকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। অপমানিত হয়ে সৈকতও বেরিয়ে আসে বাড়ি থেকে। তারপরে বাইরে এসে বাগানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খায় কিছুক্ষণ। তার মাথা একটু ঠাণ্ডা হলে সে আবার বাবার সাথে কথা বলতে বাড়ির ভিতরে ঢোকে। এমন সময় পাওয়ার কাট হয়ে যায়। সে এই বাড়িতে অনেক বছর ছিল। তাই স্টাডিরুমে বাবাকে না পেয়ে দোতলায় ওঠে বাবাকে খুঁজতে। কিন্তু দোতলায় উঠে আবার তার মত পরিবর্তন হয়। সে বাবার সাথে দেখা না করেই আবার ফিরে যায়।

– লাইটারটা অচিন্ত্যর ঘরে কি করে পাওয়া গেল এই ব্যাপারে সে কি বলছে? অ্যাশট্রেতে শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটটা গুঁজে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন অনিকেত। – সে কি ঘরে ঢুকেছিল?

– না। সৈকত বলছে ওটা প্ল্যান্টেড। সে নাকি দোতলার করিডোর থেকেই ফিরে গিয়েছিল। ঘরে ঢোকেনি। লাইটারটা সিগারেট ধরানোর সময় হয়ত বাগানে তার পকেট থেকে পড়ে গিয়েছিল। কেউ সেটা তুলে নিয়ে তাকে ফাঁসানোর জন্যে ওই ঘরে রেখে এসেছে।

– হুমম, ইন্টারেস্টিং। আচ্ছা এই অচিন্ত্য লোকটা কেমন ছিল? মানে প্রথম স্ত্রী বা ছেলের সাথে কেমন সম্পর্ক ছিল? প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন অনিকেত।

– ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে লোকেরা যেমন হয়, সেরকমই। বাবা প্রোডিউসার ছিলেন। প্রচুর সম্পত্তি রেখে গেছিলেন। অল্প বয়সে প্রথম বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী সুরমা মধ্যবিত্ত ভালো পরিবারের মেয়ে কিন্তু খুব দৃঢ়চেতা। ফিল্ম লাইনের স্বামীর বেহিসাবি জীবনযাপন, রাতবিরেতে পার্টি, নিত্যনতুন মহিলাসঙ্গ এইসব সহ্য করতে পারেননি। তা সত্ত্বেও ছেলের কথা ভেবে প্রায় পনের বছর বিয়েটা টিকিয়ে রেখেছিলেন। লাগামছাড়া হয়ে যাওয়ায় আট বছর আগে ডিভোর্সের জন্যে মামলা করেন। অচিন্ত্যও কন্টেস্ট করে। ভীষণ তিক্ততার মধ্যে দিয়ে বিয়েটা শেষ হয়। এককালীন একটা মোটাসোটা অ্যালাম্নি দিতে হয় অচিন্ত্যকে। সেই থেকে স্ত্রী আর ছেলের সাথে তিনি কোনও সম্পর্ক রাখতেন না।

– এখন সুরমা কোথায় থাকেন?

– সুরমা ছেলেকে নিয়ে গড়িয়ায় একটা ছোট ফ্ল্যাটে থাকেন। কাছাকাছি একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ান।

– বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলা কোথায় ছিলেন, কি করছিলেন খোঁজ নিয়েছ?

– হ্যাঁ! ওইদিন সারা সন্ধ্যে তিনি বাড়িতেই ছিলেন। তবে তার কোনও উইটনেস নেই। তিনি জানতেনই না যে সৈকত বাবার সাথে দেখা করতে গেছে।

অনিকেতের ভুরুতে চিন্তার ছাপ। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। নীরবতা ভেঙ্গে অনিকেত বললেন, – এনি ওয়ে! তোমরা ইনিশিয়াল ইনভেস্টিগেট করে কি কি পেলে বল।

– হ্যাঁ বলছি। দশটার কিছুক্ষণ পরে কেশববাবু লোকাল থানায় ফোন করে প্রথম খবরটা জানায়। পুলিশ এসে দেখে দোতলায় নিজের বেডরুমের বিছানায় অচিন্ত্যর বডিটা পড়ে আছে। কোনও প্রচণ্ড ধারাল অস্ত্র দিয়ে গলার নলিটা কাটা। ক্লিন সিঙ্গল কাট। দেখে মনে হয় কোনও পেশাদার হাতের কাজ। ও হ্যাঁ! মারার আগে অচিন্ত্যকে ক্লোরোফর্ম করা হয়েছিল। পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও এটা কনফার্মড হয়েছে।

এবার অনিকেত একটু নড়েচড়ে বসলেন, – ক্লোরোফর্ম! স্ট্রেঞ্জ! তোমরা সৈকতকে সন্দেহ করছ। কিন্তু একবারও ভেবে দেখছ না যে সে ক্লোরোফর্ম পাবে কোথায়?

– জ্যেঠু। সৈকত কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর স্টুডেন্ট। যে কোনও কেমিস্ট্রি ল্যাবেই ক্লোরোফর্ম পাওয়া যায়। তাই না?

– হ্যাঁ তা যায়। কিন্তু কেউ বাবার কাছে টাকা চাইতে আসার সময় ক্লোরোফর্ম নিয়ে আসে না। অনিকেতের গলায় শ্লেষ।

গৌতম শ্লেষটা গায়ে মাখল না। বলল, – কারেক্ট! আর ঠিক এই জন্যেই আমি মানতে পারছি না যে সৈকত খুনটা করেছে। কিন্তু কি জানেন, অচিন্ত্য সেলিব্রিটি। তাছাড়া বিভিন্ন সরকারী আমলা বা মন্ত্রীর সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। তাই সরকারের তরফ থেকে তাড়াতাড়ি অচিন্ত্যর খুনিকে ধরার জন্যে প্রচুর চাপ আসছে। এরকম পরিস্থিতিতে তদন্ত প্রভাবিত হতে বাধ্য। সবাই এখন তাড়াতাড়ি করে একজনকে ধরে তাকে খুনি সাব্যস্ত করে দিয়ে হাত পা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। তাই বলির পাঁঠা করা হচ্ছে সৈকতকে।

– হুমম! বাই দ্য ওয়ে! মার্ডার ওয়েপনটা পাওয়া গেছে?

– না। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেটা পাওয়া যায় নি।

এতক্ষণে অনিকেতকে দেখে মনে হচ্ছে যে তিনি কিছুটা উৎসাহ পেয়েছেন। বললেন, – যাই হোক। তারপরে বল।

– হ্যাঁ! তো পুলিশ এসে ডেডবডি পোস্টমর্টেমের জন্যে পাঠায়। পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও জানা যায় যে অচিন্ত্যর মৃত্যু হয়েছে রাত আটটা থেকে দশটার মধ্যে। ঘরের ভিতর ধস্তাধস্তির তেমন কোনও চিহ্ন ছিল না। খালি অচিন্ত্যের গ্লাসটা ঘরের মেঝেতে ভাঙ্গা অবস্থায় পরে ছিল। ঘরের লাগোয়া ব্যালকনি গ্রিল দেওয়া। সেই গ্রিলে ফায়ার এস্কেপের জন্যে যে প্রভিশনটা আছে, সেটাও ভিতরের দিক থেকে তালা দেওয়া। চাবি ঘরের ড্রয়ারে পাওয়া গেছে। তারমানে খুনি সামনের দরজা দিয়েই ঘরে ঢুকেছে। ঘরে একটা হুইস্কির বোতল আর বরফের ট্রে পাওয়া গেছে। সেগুলোতে অচিন্ত্য ছাড়া আর কারোর হাতের ছাপ নেই। আগেই বলেছি সৈকতের লাইটারটা ঘরের ভিতরে পাওয়া গেছে। সেটা পড়ে ছিল মেঝেতে ওয়ার্ডরোবের সামনে।

– ওয়ার্ডরোবটা কি লক করা ছিল?

– হ্যাঁ। ওয়ার্ডরোবটা লক করা ছিল। চাবিটা ছিল সেম ড্রয়ারে। কিন্তু পরে নন্দিতা কনফার্ম করে যে ওয়ার্ডরোবে আশি হাজার মত ক্যাশ ছিল। আর ছিল কিছু সোনার গয়না। এক দেড় লাখের হবে। সেগুলো মিসিং।

– আশি হাজার টাকা ক্যাশ বাড়িতে ছিল?

– হ্যাঁ! ইন্ডাস্ট্রিতে সব লেনদেন তো আর সাদা টাকায় হয় না। প্রচুর কালো টাকা ওড়ে। এটা হয়ত সেরকমই কোনও কারণে রাখা ছিল।

– হুমম। কোয়াইট ন্যাচারাল। মাথা নাড়লেন অনিকেত, – এটা একটা মোটিভ হতে পারে। সৈকতের বাড়ি সার্চ করা হয়েছে?

– হ্যাঁ! কিন্তু কিছু পাওয়া যায়নি। না টাকা না গয়না!

– এক্সপেক্টেড! কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কি জানি ভাবলেন অনিকেত। তারপরে বললেন, – নন্দিতা আর অরুণিমার অ্যালিবাই ক্রসচেক করেছ?

– হ্যাঁ! দুজনেরই অ্যালিবাই ফুলপ্রুফ। তাছাড়া দুজনেই বাড়ি থেকে যখন বেরিয়ে যায় তখন অচিন্ত্য জীবিত। আর বাড়ি ফেরে অচিন্ত্যর মৃত্যুর পরে। আর মেন গেটে ডিউটিতে থাকা জগন্নাথ নিশ্চিত ভাবে জানিয়েছে যে আপনাকে যা যা বললাম এরা ছাড়া ওইদিন বাড়িতে আর কেউ ঢোকেনি বা বেরয়নি। জগন্নাথের চোখ এড়িয়ে বাড়িতে ঢোকা বা বেরনো অসম্ভব কারণ পুরো বাড়িটা সাত ফিট উঁচু দেওয়াল আর দেওয়ালের ওপরে কাঁটাতারের জাল দিয়ে ঘেরা। অতএব কোনও আউটসাইডার যে এই কাজ করেনি সে ব্যাপারে আমরা শিয়োর।

– আর কোনও উল্লেখযোগ্য ক্ল্যু?

কিছুক্ষণ চিন্তা করল গৌতম। তারপরে বলল, – ক্ল্যু বলতেও পারেন আবার নাও বলতে পারেন। তবে ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট একটা আছে। আমরা প্রত্যেকের মোবাইল কললিস্ট চেক করেছিলাম। সবারই মোর অর লেস নর্মাল। তবে নন্দিতার কললিস্টে দেখা গেছে নন্দিতা একটা নাম্বারে গত ত্রিশ দিনে তেইশটা কল করেছে। সেটা ওর এক্স-হাসব্যান্ড তন্ময় ঘোষের নাম্বার। নন্দিতাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে বলছে তার এক্স-হাসব্যান্ডের সাথে আবার তার লাস্ট পাঁচ ছয় মাস হল যোগাযোগ শুরু হয়েছিল। নন্দিতার সাথে অচিন্ত্যর বিয়েটা সাকসেসফুল হয়নি। দে ওয়্যার নট অ্যা হ্যাপি কাপল। এই ক্রাইসিসের মধ্যে তার আগের স্বামী তন্ময়ের সাথে তার যোগাযোগ হয়। তারা প্যাচ-আপ করে নেয়। দুজনে আবার বন্ধুর মত একে অপরের সাথে মিশতে থাকে।     

– বাঃ বেশ ভালো! তো এই তন্ময় করে কি?

– তন্ময় বজবজে একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্যান ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির সেলস ম্যানেজার। থাকে শ্যামবাজারের কাছে। সে ঘটনার দিন সরাইঘাট এক্সপ্রেসে করে গৌহাটি যাচ্ছিল। ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং ছিল সেখানে। বৃহস্পতিবার বিকেল চারটেয় ট্রেনে ওঠে। পরের দিন সকাল সাড়ে নটায় গৌহাটি পৌঁছয়। শুক্রবার মিটিং সেরে শনিবার ফেরার ট্রেনে উঠে রোববার মানে গতকাল কোলকাতা ব্যাক করে। গৌহাটিতে থাকাকালীন পেপারে সে অচিন্ত্যর মৃত্যুর খবরটা শোনে। গতকাল ফেরার পরেই আমরা তার সাথে কথা বলেছি।  

– তার অ্যালিবাই ভেরিফাই করা হয়েছে। অনিকেত একটু সন্দিহান।

– হ্যাঁ। সে বৃহস্পতিবার অফিসে না গিয়ে সরাসরি বাড়ি থেকে হাওড়া স্টেশন যায়। সেখানে তাকে কিছু ডকুমেন্টস দেবার জন্যে তার অফিসের এক কলিগ গিয়েছিল। আমরা সেই কলিগকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে তন্ময়কে ট্রেনে সি-অফ করে তারপরে বাড়ি ফেরে। গৌহাটিতে ক্লায়েন্টের তরফ থেকে তন্ময়কে স্টেশন থেকে পিক-আপ করতে লোক গেছিল। সেও তন্ময়কে গাড়ী থেকে নামতে দেখে। তাছাড়া আমরা তন্ময়ের আশেপাশের যাত্রীদের সাথে যোগাযোগ করে তাদেরকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাদের মধ্যে একটা ফ্যামিলি ছিল। স্বামী স্ত্রী আর একটা বাচ্চা। সেই ভদ্রলোকও আইডেন্টিফাই করেছেন তন্ময়কে।

– তারমানে অকাট্য অ্যালিবাই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন অনিকেত। – কোনও উইল করে গেছে কি অচিন্ত্য?   

– না। এখনও পর্যন্ত কোনও উইলের সন্ধান আমরা পাইনি। সম্ভবত তিনি কোনও উইল করে যাননি।

– হুমম! সেক্ষেত্রে তার সমস্ত সম্পত্তি পাচ্ছে তার বর্তমান স্ত্রী নন্দিতা। শ্রাগ করলেন অনিকেত।

গৌতম নীরবে সম্মতি জানাল। কিছুক্ষণ দুজনে চুপ করে বসে রইল। ওয়ালক্লকটার টিক টিক ছাড়া ঘরে আর কোনও শব্দ নেই। গৌতম অপেক্ষা করতে লাগল অনিকেত কি বলেন সেটার জন্যে। উনি তার প্রস্তাবে রাজী হবেন এই আশা নিয়ে সে এত সকালে ছুটে এসেছে। একমাত্র উনিই পারেন সৈকতকে ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচাতে। তার নিজের হাত পা বাঁধা। পুলিশের চাকরী করা মানে একরকম নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে ওপরওয়ালার হাতের পুতুলের মত তাদের হুকুম তালিম করা। ইচ্ছে থাকলেও সিস্টেমের বাইরে বেরতে পারবে না সে।

তানিয়াকে কথা দিয়েছে সে। সৈকতকে যেভাবেই হোক এই বিপদ থেকে উদ্ধার করবে। তানিয়া গৌতমের স্ত্রী। তিনমাসও হয়নি বিয়ে হয়েছে তাদের। অনিকেতকে সব কথা সে বলতে পারেনি। সৈকত যে তানিয়ার মাসতুতো ভাই এই তথ্যটা সে চেপে গেছে। তানিয়ার মত সেও অবাক হয়ে গেছে সৈকত এব্যাপারে জড়িয়ে পড়ায়। এই কদিনের পরিচয়ে সেও বুঝে গেছে মানুষ খুন করা তো দূরের কথা সৈকতের মত এত নরম স্বভাবের ছেলে একটা মশা মারার আগেও দশবার ভাববে। অথচ এত অভিমানী ছেলেটা যে প্রিয় গৌতমদার কাছেও সব কথা খুলে বলছে না। মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।

– ওকে! আয়্যাম গেম। শেষ পর্যন্ত নীরবতা ভঙ্গ করে অনিকেত বললেন, – মনে হচ্ছে কেসটায় কিছু ম্যাটার রয়েছে। আমি দেখি তদন্ত করে সত্যিটা বের করতে পারি নাকি।

মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠল গৌতমের মুখ। জ্যেঠুর ওপর তার অনেক ভরসা। ছোটবেলা থেকে অনিকেতের সুনাম, তাঁর সাফল্য, তাঁর বুদ্ধির প্রশংসা শুনে এসেছে সে। সে নিশ্চিত এবার সৈকতের আর কোনও ভয় নেই। অনিকেত নিশ্চয়ই আসল হত্যাকারীকে খুঁজে বের করবেন। স্ত্রীর কাছে দেওয়া কথাটা রাখতে পারবে সে।

(ক্রমশ)

পরের পর্বঃ তৃতীয় পর্ব

দায়।। (দ্বিতীয় পর্ব)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments