আগের পর্বঃ চতুর্থ পর্ব

 

কিছু কিছু লোক আছে যাদের সীতার পাতাল প্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন করলে তারা হরধনু ভঙ্গ থেকে বলতে শুরু করে। জগন্নাথ পাল যে এদেরই মত একজন সেটা একটু দেরীতে বুঝলেন অনিকেত। অচিন্ত্যর বাড়িতে ঢোকার সময়ই গেটের বাইরে বসে থাকা সিকিউরিটি গার্ডটাই যে জগন্নাথ গৌতম সেটা তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিল। তখনই অনিকেত ঠিক করে নিয়েছিলেন ফেরার পথে ওর সাথে একটু কথা বলবেন। তাই গৌতমকে গাড়ীটা বের করতে বলে তিনি নিজে এগিয়ে গিয়েছিলেন জগন্নাথের সাথে আলাপ করতে। বছর ষাট বাষট্টির লোকটা তখন গেটের বাইরে ছায়ায় একটা টুলে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে একমনে খৈনি ডলছিল। বয়সের ভারে একটু দুর্বল হলেও এখনও বেশ টানটান শরীর। মাথার কোঁকড়া চুলে পাক ধরেছে। মুখে একটা বলিষ্ঠ গোঁফ। গৌতম প্লেন ড্রেসে এসেছে বলে চিনতে না পারলেও তাঁদের গাড়ীতে লাল বাতি দেখে সে হয়ত আন্দাজ করে নিয়েছিল এরা বেশ কেউকেটা হবে। তাই তাঁকে হঠাৎ সামনে দেখে সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে একটা স্যালুট ঠুকে হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুলের ফাঁকে খৈনিটা নিয়েই দাঁড়িয়ে রইল। ভাবটা এমন যে খৈনিটা ফেলতেও পারছে না আবার মুখেও ঢোকাতে পারছে না।

দোষের মধ্যে অনিকেত ভুল করে তাকে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন যে বৃহস্পতিবার রাতে সেই ডিউটিতে ছিল কিনা? এই প্রশ্নের উত্তরে সে জানাল যে সে, অশোক আর সজল বলে তিনজন অচিন্ত্যর বাড়ি পাহারা দেয়। দিনে আট ঘণ্টা করে ডিউটি। অশোক তার ভাইপো আর সজল অশোকের বন্ধু। দুই সপ্তাহ আগে সে বাজার থেকে কুড়ি টাকা কিলো দরে হিমসাগর আম পেয়েছিল। সেগুলো লোভে পড়ে বেশী খেয়ে ফেলায় তার পেট খারাপ হয়েছিল। তাই কেশববাবুকে বলে সে একবেলা ছুটি নিয়েছিল। তার জায়গায় সেদিন সজল ডিউটি দিয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার তার ডিউটি ছিল সকাল ছটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যেবেলা সজলের বউকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাবার কথা ছিল। তাই সজল তাকে রিকোয়েস্ট করে সে যেন সেদিন সজলের হয়ে সন্ধ্যের ডিউটিটাও দিয়ে দেয়। ইচ্ছে না থাকলেও বাধ্য হয়ে সেদিন দুপুর দুটো থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ডিউটিটাও তাকেই করতে হয়। একে তো তার নিজের বয়স হয়েছে। তাছাড়া তার শরীরটাও পুরোপুরি সারেনি। কিন্তু আজকালকার ছেলেরা যে এসব বুঝতেই চায় না এই বলে সে যখন তার বক্তব্য শেষ করল ততক্ষণে গৌতম গাড়ী নিয়ে এসে গেছে।

লোকটাকে কথা বলার সুযোগ দিলে সে এক প্রশ্নের উত্তর দিতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল করে দেবে। তাই পরের প্রশ্নটা করার আগে অনিকেত সতর্ক হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, – সেদিন সন্ধ্যেবেলা প্রথমে নন্দিতা ম্যাডাম এসেছিলেন, তাই না?

শেষ পর্যন্ত খৈনিটা ফেলেই দিয়ে জগন্নাথ বলল, – হ! সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টাই তাইনেই প্রথম আইলেন। আমি তো মেলা অবাক হইলাম তাঁরে দেইখ্যা। এমনিতে তো তাইন রোজ রাত নয়টা দশটার আগে আয়েনই না। পরে পল্টু কইল সেইদিন কোনও পার্টি আসিল বোধয়। তাই এত সকাল সকাল…

– এক মিনিট! পল্টু কে? বাক্যস্রোতে আগল দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন অনিকেত।

– পল্টু হইল ম্যাডামের ড্রাইভার। এখানে হক্কলেরই ড্রাইভার আসে। স্যারের গাড়ী চালায় বিকাশ। পল্টুর কথা তো কইলামই। আর অরুণিমা ম্যাডামের গাড়ী চালায় শ্যামল।

– ও আচ্ছা। তা নন্দিতা ম্যাডাম তো কিছুক্ষণ পরেই আবার বেরিয়ে গেলেন, তাই না?

– হ! আধঘণ্টাও হইব না। পল্টু গাড়ী রাইখ্যা আইয়া টিফিন করতে আসিল। সেই টিফিনও তার শেষ হইল না, ম্যাডামের ফোন আইল। আবার বাইর হইতে লাগব। আমি তো কই, এই ফোন থাকনটা হইল মহা সমস্যার ব্যাপার, বুঝলেন না। ইটার জ্বালায় শান্তিতে একমিনিট শ্বাস ফালানো যায় না…

– হুমম! ঠিকই বলেছেন। যাই হোক তারপরে অচিন্ত্যবাবু এলেন, তাই তো? অনিকেত যতটা সম্ভব নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিচ্ছিলেন যাতে জগন্নাথকে দিয়ে কথা কিছু কম বলানো যায়।

– আইজ্ঞা! ম্যাডাম যাইবার লগে লগে তিন মিনিটও হইব না, স্যার আইলেন। আমি পরে ভাবলাম, আহা রে! স্যার যদি পাঁচ মিনিট আগে আইতেন, তাইলেই ম্যাডামের সাথে দেখাটা হইয়া যাইত। কে জানত পরে আর দেখাই হইব না। মুখটা দুঃখী দুঃখী করে লম্বা একটা শ্বাস ছাড়ল জগন্নাথ।

অধৈর্য হয়ে গৌতম নেমে এল গাড়ী থেকে। তাকে আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে অনিকেত পরের প্রশ্ন করলেন, – এরপর অরুণিমা ম্যাডাম কখন এলেন?

– তা ধরেন আরও আধা ঘণ্টা বাদে। আমি তো শ্যামলরে দেইখ্যা প্রথমে চিনছিলামই না। পরে খেয়াল কইর‍্যা দেইখ্যা চিনলাম। তারে কইলাম, কিতা রে ব্যাটা। বেশ তো ছুটি কাটাইলে তিনদিন। কর, ভালা কইর‍্যা মজা কর।

– শ্যামল ছুটিতে ছিল কেন?

– ক্যান আবার? ম্যাডামের গাড়ী গ্যারাজে গেসল না। ছারভিসিং-এ। ব্যাটা তিনদিন মাগনা ছুটি কাটাইল। হেইদিনই কাজে যোগ দিল। দিতে না দিতেই আবার ছুটি।

– আবার ছুটি?

– হ! ম্যাডাম হেইদিন তাড়াতাড়ি ছাইড়্যা দিসলেন তারে। নিজেই গাড়ী চালাইয়া বারইলেন পরে।

– হুমম! তারপর সৈকত কখন এল?

– অরুণিমা ম্যাডাম বাইর হইবার পাঁচ সাত মিনিট পরেই। আহা রে! বড় ভালা আসল পোলাটা। যখন ছোট আসল, আমার কোলে আইয়া বইয়া থাকত। কি যে মাথার দোষ হইল, বাপরেই জানে মাইর‍্যা দিল। আপনারে আগেই কইলাম না, আজকালকার পোলাপানরা কিছুই বুঝতে চায় না। যেটা তারার মাথাত একবার ঢুকে…

– লোডশেডিংটা হল কখন?

– আর কইয়েন না। কয়টা হইব তখন। রাত নয়টাও হয় নাই। সবে রাতের খাবারটা লইয়া বইসি। টিফিন বাক্স খুইল্যা দেখি সেই রুটি আর আলুর তরকারীই দিসে। সাথে দুইটা কাঁচালঙ্কা আর এক টুকরা পেঁয়াজ। মেজাজ গেল গরম হইয়া। কতবার কইসি বৌরে আমার পেট এখন ঠিক হইয়া গেসে। তাও কথা কানে লয় না। কন দেখি রোজ রোজ রুটি খাইতে ভাল্লাগেনি কারুর? তো যাই হউক, সবে এক গ্রাস মুখে দিসি, সব বেবাক অন্ধকার হইয়া গেল। খাওয়া মাথাত উঠল। তার উপরে দেখি কি বাকী হক্কল জায়গায় লাইট জ্বলে। তাই জেনারেটর চালাইতে গিয়া ভাবলাম, দেখি তো একবার কি বিষয়। দেখি, যা ভাবসি তাই, লাইন টিরিপ হইসে।

– তাই নাকি? আচ্ছা জেনারেটর রুমটা কোথায় বলুন তো?

– ওই তো গ্যারেজের পাশেই। এইটা আরেক মুশকিল হইসে এখন। রাতবিরেতে কারেন্ট গেলেই ফোন আয়, ‘জগন্নাথ, জেনারেটর চালাও’। আর আমারে এতটা পথ হাইট্যা যাইতে লাগে। আগে যখন জেনারেটর আসল না, এই ঝামেলাটা…

– আচ্ছা ঠিক আছে জগন্নাথ। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। আজ আসি, কেমন? পরে একদিন এসে তোমার সাথে অনেকক্ষণ গল্প করে যাব। কথাগুলো বলে তড়িঘড়ি পা চালালেন অনিকেত।

গাড়ীতে উঠে গৌতম বলল, – বাপরে বাপ। বকে বকে কানের পোকা বের করে দিল লোকটা। কি করে জানি আপনি সহ্য করছিলেন?

অনিকেত স্মিত হেসে বললেন, – সহ্য করতে হয়, গৌতম। সহ্য করতে হয়। আমাদের অনেক সিনিয়র, একজন কিংবদন্তী বেলজিয়ান ডিটেকটিভ কি বলে গেছেন জান? বলেছেন এইসব অবান্তর কথাবার্তাকে ইগনোর করতে নেই। কারণ এর মধ্যে থেকেই এমন সব সূত্র বেরিয়ে আসে যেগুলো পরে রহস্য সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

– হুমম, তা কি এমন সুত্র বেরোল জগন্নাথের সাথে কথা বলে?

রহস্যময় হাসি হাসলেন অনিকেত, – জানা গেল যে বারবার বারণ করা সত্ত্বেও জগন্নাথের বৌ তাকে রাতের বেলা টিফিনে কেবল রুটি আর আলুর তরকারীই দেয়।

বহুদিন বাদে হা হা করে হেসে উঠল গৌতম। সত্যি পুলিশের চাকরীতে এমন অনাবিল হাসির মুহূর্ত খুব একটা সহজলভ্য নয়।

***

রাতে ভাল ঘুম হয়নি বলে দুপুরে একটা সলিড ঘুম দিয়ে উঠে অনিকেত দেখলেন মোবাইলে গৌতমের দুটো মিসড কল। সাধারণত ঘুমনোর সময় কোনও ব্যাঘাত পছন্দ করেন না বলে শোবার আগে নিজের মোবাইলটা সাইলেন্ট মোডে রাখাটা তাঁর বরাবরের অভ্যাস। এর ফলে গভীর রাতে সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানিগুলোর প্রমোশনাল কলের হাত থেকে রেহাই পেয়ে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোন যায়। এতে অবশ্য কিছু সমস্যাও আছে। অনেক সময়ই কোনও দরকারি ফোন এলে সেটা মিস হয়ে যায়। যেমন এখন গৌতমের কলগুলো ধরতে পারলেন না। সকালে দেখা হবার পরেও যখন দু দুটো মিসড কল, তার মানে নিশ্চয়ই কোনও গুরুত্বপূর্ণ খবর রয়েছে। তাড়াতাড়ি চোখে মুখে একটু জল দিয়ে এসে কলব্যাক করলেন গৌতমকে।

যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই। ফোন ধরেই উত্তেজিত গলায় বলল গৌতম, – জ্যেঠু। এক্ষুনি আমি আবার ফোন করতে যাচ্ছিলাম। নতুন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। খুব ইম্পরট্যান্ট। পুরো ব্যাপারটাই ঘেঁটে গেছে।

শান্ত গলায় বললেন অনিকেত, – তাই নাকি? বল কি কি খবর।

– একটা নয় তিন তিনটে নতুন ক্ল্যু। প্রথমটা হল আপনার কথামত আমি নন্দিতার পার্সোনাল ডক্টরকে খুঁজে বের করে তাঁর কাছে খোঁজ নিয়েছিলাম। তিনি জানিয়েছেন যে নন্দিতা প্রেগন্যান্ট। সেকেন্ড মান্থ চলছে। ব্যাপারটা প্রচণ্ড সিক্রেট। তিনি প্রথমে জানাতে চাননি। কিন্তু মার্ডার কেস বলে শেষ পর্যন্ত পুলিশকে হেল্প করতে সম্মত হয়েছেন।

– হুমম, অরুণিমা তাহলে ঠিকই নোটিশ করেছিল। ওর কথাতে আমি এরকমই কিছু একটা আন্দাজ করেছিলাম। ওকে! নেক্সট ওয়ান!

– পরের খবরটা একটা রিউমার বা গসিপও হতে পারে। সত্যি কি মিথ্যে জানি না। ব্যাপারটা হল বেশ কদিন ধরেই ইন্ডাস্ট্রিতে কানাঘুষোয় একটা খবর শোনা যাচ্ছে। নন্দিতা নাকি রিসেন্টলি শাক্যর সাথে একটা রিলেশনে জড়িয়ে পড়েছে।

– শাক্য! সে আবার কে?

– শাক্য হল বাংলা সিনেমার একজন হিরো। টালিগঞ্জের উদীয়মান তারকা বলতে পারেন। ডেব্যুতেই মারকাটারি হিট দিয়ে সবার নজরে এসেছিল। পরের দুটো ছবি অতটা হিট না হলেও বক্স অফিসে ভালই বিজনেস করেছিল। এরই মধ্যেই প্রচুর ফ্যান ফলোয়িং ছেলেটার। তার কারেন্ট ছবির হিরোইন নন্দিতা। লাস্ট তিন চার মাস ধরেই ওদের মধ্যে বেশ ভাব ভালবাসা চলছিল। প্রথমে ব্যাপারটা গোপনই ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে ওদের নিয়ে লোকমুখে নানারকম চর্চা শুরু হয়েছে। এখন পুরো ব্যাপারটাই ফিল্মের একটা মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিও হতে পারে। তবে যা রটে তার কিছুটা তো বটে। তাই না?

– ইন্টারেস্টিং! তার মানে মঞ্চে নতুন অভিনেতার আগমন। পান ইন্টেন্ডেড। হালকা হেসে বললেন অনিকেত।

– একদম তাই! গৌতমও সায় দিল। – তাছাড়া জ্যেঠু হয়ত সেইদিন এই রিউমারটাই অচিন্ত্যর কানে এসেছিল। তাই সে এত ক্ষেপে ছিল।

– অস্বাভাবিক নয়। অনিকেত সিরিয়াস। – এনি ওয়ে! তৃতীয় খবরটা?

– তিন নম্বর খবরটাই সবচেয়ে হার্ডহিটিং। বিশ্বস্ত সুত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, নন্দিতা গত বৃহস্পতিবার তাজ বেঙ্গলের পার্টিতে গিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সারাক্ষণ সেখানে ছিল না। সে সাতটার একটু পরে পার্টিতে ঢোকে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে সবার অলক্ষ্যে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। আবার আন্দাজ নটা সাড়ে নটার ভিতরে ব্যাক করে। কোথায় গিয়েছিল কেউ জানে না। তার মানে ওইটুকু সময় তার কোনও সুনির্দিষ্ট অ্যালিবাই নেই।

– গ্রেট! কাহানি মে টুইস্ট। এখন পুরো জিনিসটা আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। অনিকেত একটু গম্ভীর। – বাই দ্যা ওয়ে! নন্দিতাকে এ ব্যাপারে ক্রস করেছ?

– না! এখনও করা হয়নি। আজ তো নন্দিতার ফিরতে রাত হয়ে যাবে। ভাবছি কাল একবার কথা বলব।

– ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড ক্যান আই টেক দিস রেস্পন্সিবিলিটি? ও জেনেশুনে আগে পুলিশকে বলেনি কথাগুলো। সেলিব্রিটি তো। হয়ত মিডিয়ার ভয়ে এবারও বলতে চাইবে না। তোমার জায়গায় আমি যদি গিয়ে কথা বলি তাহলে মনে হয় সে অনেক খোলা মনে কথা বলবে।

– ওহ শিয়োর। নো ইস্যুজ অ্যাট অল। গৌতম এককথায় রাজী। – আপনি ঠিক বলেছেন! আমার মনে হয় আপনি কথা বললেই বেটার হবে। আমি এক কাজ করছি। আমি কাল সকালে নটায় নন্দিতার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখছি। সাথে আপনার একটা ইন্ট্রোডাকশনও দিয়ে দিচ্ছি।

– দ্যাটস বেটার! বললেন অনিকেত। – সাথে একবার ওই শাক্য ছোকরাকেও বলে রেখ। দরকার পড়লে ওর সাথেও একবার কথা বলতে হতে পারে।

– নো প্রবলেম। নিশ্চিন্ত করল গৌতম। – তো আজকে সন্ধ্যেবেলা আপনার প্ল্যান কি? দুপুরে বলছিলেন সৈকতের সাথে কথা বলবেন। আসবেন নাকি একবার এদিকে?

– হ্যাঁ আসব। কিন্তু তার আগে একবার যাব গড়িয়ায়। বিশদ করলেন অনিকেত। – সুরমা সরকারের সাথে একবার কথা বলতে চাই। সেখান থেকে ফেরার পথে ঢুঁ মারব তোমার ওখানে।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গৌতম বলল, – ওকে, আমিও আসছি তাহলে। মানে পরিচয় দেবার জন্যে…

– আরে না না! তোমাকে কষ্ট করে আসতে হবে না। বাধা দিয়ে বললেন অনিকেত। – ডোন্ট ওয়রি। আই উইল ম্যানেজ।

– ঠিক আছে! আমি তাহলে এক কাজ করছি, একবার ওঁকে ফোন করে আপনার আসার কথাটা বলে দিচ্ছি। নাছোড়বান্দা হয়ে বলল গৌতম। – ওকে জ্যেঠু! ছাড়ছি তাহলে?

– অ্যাজ ইউ উইশ! চল, সি ইউ লেটার!

অনিকেতের মনে হল ফোনটা যেন একটু তাড়াহুড়ো করেই রেখে দিল গৌতম।

***

তৃপ্তি করে চা টা শেষ করে কাপটা সামনের টেবিলে নামিয়ে রাখলেন অনিকেত। অনেকদিন এরকম ভাল চা খাননি তিনি। সুন্দর একটা ফ্লেভার ছিল সেটাতে। হয়ত এলাচের। কিন্তু শুধু এলাচের জন্যে নয়, বানানোর সময় দুধ, চিনি, চা পাতার সাথে আন্তরিকতা আর যত্নটাও উপযুক্ত পরিমাণে মিশেছে বলেই চায়ের স্বাদটা আরও বেড়ে গেছে।

তাঁর সোফার উল্টো দিকে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছেন সুরমা। মুখে বয়সের ছাপ পড়লেও লাবণ্য এখনও যায়নি। দেখেই বোঝা যায় যে এককালে বেশ সুন্দরী ছিলেন। তাঁকে দেখে অনিকেতের একটু খারাপই লাগল। কোথায় থাকতে পারতেন সাতমহলা রাজপ্রাসাদের রাজরানী হয়ে। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে আজ রয়েছেন গড়িয়ার ছোট্ট দুই বেডরুমের এই ফ্ল্যাটে। তবে ছোট হলেও পরিপাটি করে সাজানো এই ফ্ল্যাটটার সবকিছুতেই রুচির ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়। খুবই ছোট ড্রয়িং কাম ডাইনিং রুমটায় একটা টু সিটার সোফা আর একটা ডাইনিং টেবিল রাখার পর জায়গা আর প্রায় নেই বললেই চলে। ফ্রিজটা একটা বেডরুমে যাবার দরজাকে আধাআধি ব্লক করে রাখা। একটা ছোট টি টেবিল। সেটার ওপর সুন্দর হাতে ফেব্রিক করা একটা টেবিলকভার। একটা র‍্যাকে একটা ফুলদানীর সাথে গীতবিতান, সঞ্চয়িতা আর কিছু অন্যান্য বই সাজিয়ে রাখা। দেওয়ালে ঝোলানো কয়েকটা ফটোফ্রেমে ফ্যামিলি মেম্বারদের কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত বন্দী করে রাখা। দরজার ঠিক ওপরে ঝুলছে একটা মানিপ্ল্যান্ট। সব মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায় এই বাড়ির বাসিন্দাদের স্বাচ্ছন্দ্য খুব বেশী না থাকলেও সুখের কোনও অভাব নেই।

তবে অনিকেত যতটা ভেবেছিলেন, আচমকা বিপদে ততটা ভেঙ্গে পড়েননি সুরমা। আসলে আগজীবনের এত ঝড়ঝাপটাই হয়ত তাঁর চরিত্রে এই বিপদে অটল থাকার মনোভাবটা এনে দিয়েছে। তাঁর স্থির বিশ্বাস আগের মত এই বিপদটাও তাঁরা সামলে নেবেন। এই কথাগুলোই বলছিলেন তিনি অনিকেতকে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস তাঁর ছেলে এমন কাজ করতেই পারে না। এই শিক্ষা তিনি তাঁর সোনার টুকরো ছেলেকে দেননি। আর তাঁর ছেলে যখন এমন কাজ করেইনি, তখন ভগবান নিশ্চয়ই সৈকতকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। তিনি জানালেন সৈকত তাঁকে ছেড়ে বাইরে পড়তে যেতে চায়নি। তিনিই জোর করেন, বলেন এত ভাল সুযোগটা হাতছাড়া করাটা ঠিক হবে না। কিন্তু তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি যে সৈকত মার ওপর যাতে চাপ না পড়ে সে জন্যে বাবার কাছে টাকা চাইতে যাবে। জানলে তিনি এমনটা কখনই হতে দিতেন না।

অনিকেত জিজ্ঞেস করলেন, – অচিন্ত্যের ওপর আপনার রাগ হত না?

– নাহ! আগে খুব রাগ হত। কিন্তু আজকাল আর হত না, বিশ্বাস করুন। ওঁকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুরমা বললেন, – খালি মনে মনে ভাবতাম এই একটা লোকের জন্যে কতগুলো মানুষ কষ্ট পেল। নিজের কথা বলছি না। আমার তো বয়স হয়েছে, আজ আছি কাল নেই। খারাপ লাগে বাপ্পার জন্যে। বাবা ছিল ওর হিরো। ও যে কতটা কষ্ট পেয়েছে সেটা কেবল আমিই জানি। খারাপ লাগে পিঙ্কির মানে অরুণিমার জন্যে। কতটুকুই বা ছিল ও যখন আমি বিয়ে করে এসেছিলাম। নয় কি দশ হবে। সদ্য মা মরা মেয়েটা আমাকে মার মতই দেখত। অচিন্ত্যর সাথে আমার বিচ্ছেদটা মনে মনে মেনে নিতে পারেনি। একটু থেমে আবার যোগ করলেন, – আর খারাপ লাগে তন্ময়ের জন্যে। তন্ময় ঘোষ। নন্দিতার আগের স্বামী। বেচারা। নিজে সাফার করেছি তো, তাই ঘর ভাঙ্গার যন্ত্রণাটা বুঝি। নন্দিতা তো ছিল বোকা। কম বয়স। ওকে দোষ দিই না। আমার মতই কষ্ট পেয়েছিল তন্ময়। এখন অচিন্ত্য নেই। আশা করি এবার ওরা সুখী হবে।

তাঁর গলার স্বরে এমনই একটা বিষণ্ণতা ছিল যে ঘরে যেন একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল।

(ক্রমশ)

পরের পর্বঃ ষষ্ঠ পর্ব

দায়।। (পঞ্চম পর্ব)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments