নানা নিয়মকানুনের জাঁতাকলে পড়ে কি সব কিছু হারিয়ে যাবে? জানা নেই। নিজের বিদ্যালয় জীবনের কথা মনে পড়লে এই কথাগুলি মনে হয়। বোধ হয় প্রত্যেকেই একমত হবেন ছেলেবেলার সেই জীবনে যেমন ছিল মাস্টারমশাই কিংবা দিদিমণির পিতামাতাসম স্নেহ, সেই রকম ছিল নিজেদের দুষ্টুমি। সেই দুষ্টুমির শাস্তি হিসেবে অনেক সময় শারীরিক নিগ্রহ জুটলেও সেটা কখনও আজকের খবরের কাগজের পাতায় স্থান করে নেওয়া নিগ্রহের আশেপাশে আসত না। নিজে আবাসিক ছাত্র ছিলাম, ফলে সারাদিন কাটাতাম মাস্টারমশাইদের সাথে, অজস্র উদাহরণ আছে কি রকম ভাবে দণ্ডদাতাও দণ্ডিতের সাথে একই রেখাতে নিজেকে নিয়ে আসতেন। প্রায়ই এইরকম হত মাস্টারমশাই নিজে হাজির হয়ে যেতেন আমাদের ডাইনিং রুমে, শুধুমাত্র এইটুকু দেখতে যে যাকে তিনি অত্যন্ত ন্যায্য ভাবে শাস্তি দিয়েছেন একটু আগে, সে মন খারাপ করে ঘরে বসে নেই তো। সকালে উঠতে হত অনেক সকালে, তারপর সারাদিন নাররকম ঝক্কি, রাত আটটা বেজে গেলে অনেকেরই চোখ জুড়িয়ে আসত ঘুমে, স্টাডি শেষ হতে ঘণ্টাখানেক আরও দেরি, অগত্যা ডেস্কের ওপর মাথা রেখেই…। মাস্টারমশাই এসে মাথায় হাত বুলিয়ে ডেকে দিতেন, পাঠাতেন চোখে জল দিয়ে আসার জন্য। স্কুলে একজন প্রধানশিক্ষককে পেয়েছিলাম যিনি যদি কোনও কারনে কোনও ছাত্রের গায়ে হাত তুলতে বাধ্য হতেন তাহলে অন্যান্যরা তাকে বেশ হিংসেই করত। জানা ছিল ছুটির পর আবার তার ডাক পড়বে ঘরে। আর তখন শাস্তি নয়, তার জন্য অপেক্ষা করছে সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য। যাই হোক, আজকের লেখার মূল বিষয় শাস্তি হলেও, সেটা হল মজার শাস্তি। কাজেই অনেক দূরে চলে এসেছি, এবার ফিরি-

ক্লাসে পড়া না পারার জন্য আমরা কেউ কোনদিন শাস্তি পাইনি। কারন আমাদের কোনও মাস্টারমশাই বিষয়টাকে শাস্তি যোগ্য অপরাধ মনে করতেন না। আমরা শাস্তি পেতাম মূলত রকমারি বাঁদরামির জন্য। এই বাঁদরামিগুলির মধ্যে ছিল – ক্লাসে বন্ধুর সাথে গল্প করা, ক্লাস চলাকালীন বুকক্রিকেট খেলা, গল্পের বই পড়া, অসময়ে খেলাধুলার ব্যবস্থা করা এই সব। শেষটা অবশ্য স্কুলে হত না, ওটা ছাত্রাবাসের ছাত্রদের একচেটিয়া ছিল। কত যে ক্যাম্বিস, রবার ডিউস বল আমাদের ছাত্রাবাসের সহাধ্যক্ষের ঘরে জমা হত, তার হিসেব ছিল না। এই সমস্ত বল জমা হয়েছিল সকালের স্টাডি শেষ হবার পর স্নান না করে খেলার জন্য, এবং অবশ্যই ছুটির দিনে দুপুরে ডর্মিটরিতে ক্রিকেট খেলার কারনে। মনে আছে, আমরা কোনও কোনও সময় সহাধ্যক্ষের ঘরে অকারনে অনেকে মিলে জড়ো হতাম, যার ভেতরে একজনের কাজ ছিল, জমায়েতের মধ্যে থেকে সময়মত সরে গিয়ে ব্যস্ততার সুযোগে বল সরিয়ে নেওয়া। কিন্তু তা বলে কি আর পাঁচটা ছাত্রছাত্রীকে যে সব শাস্তির সামনাসামনি হতে হত তার সম্মুক্ষীণ আমরা হই নি? হ্যাঁ হয়েছি। তার মধ্যে কিছু শাস্তির বৈচিত্র্য, শাস্তির বিচিত্র কারন বাকি অংশে।

আমাদের ছাত্রাবাসে জীবনবিজ্ঞান পড়াতে আসতেন ভদ্রলোক। মোটেই পছন্দ করতেন না, তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় কেউ উঠে দাঁড়াক। কয়েকবার সতর্ক করার পরেও যখন একজন উঠল, তাকে তিনি আর বসতে দিলেন না। সামনে জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। তবু আজন্মলালিত অভ্যেস ত্যাগ না করতে পেরে আবার একজন একই ভুল করল। না, পুরো করতে পারল না। তার আগেই বাধা পড়ল। শিক্ষক মহাশয়ের নির্দেশে তাকে ওই আধা দাঁড়ান অবস্থাতেই কাটাতে হল মিনিট কয়েক। তারপর? না আর কেউ ভুল করেনি।

আমাদের ইংরিজির শিক্ষক। যদিও কারও বহিরঙ্গ নিয়ে লেখা কুরুচিকর, তবু এক্ষেত্রে উল্লেখ না করে পারা যাচ্ছে না। গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। পাটভাঙা ধবধবে সাদা ধুতিপাঞ্জাবি ছাড়া অন্য কোনও পোশাকে তাঁকে দেখা যেত না। ঠোঁট এবং দাঁত সর্বদা তাম্বুলচর্চিত রক্তবর্ণ। দেখলেই শরীরে শিহরণ খেলে যেত। উনি খুব ভাল করেই জানতেন ব্যাপারটা এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজেও লাগাতেন। পড়াচ্ছেন। ওনার ঠিক পাশে একটি ছেলে ডেস্কে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত নিদ্রায় মগ্ন। ছেলেটির মাথার কাছের জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে উনি প্রকৃতি দেখছেন পড়াতে পড়াতেই। কিন্তু ছেলেটি তাঁর দৃষ্টির বাইরে। এমন সময় হঠাৎ স্যর থামলেন। ক্লাসে পিন ড্রপ সাইলেন্স। চোখ পেছনের দিকে। গলা নেমে এল একদম খাদে। ‘আমি কিন্তু সব দেখতে পাচ্ছি’ বলেই ‘থ্যাপ’ বলে পিলে কাঁপানো এক চিৎকার। আবার শুরু হয়ে গেল পড়ানো যেন কোনও কিছুই ঘটেনি। বছরের পর বছর ধরে স্যর যে মাঝে মাঝেই এরকম কি দেখতে পেতেন সেই রহস্যের উদ্ঘাটন কেউ করতে পারেনি।

পেছনে বসে সামনের এক ছাত্রকে ডাকার জন্য একজনের ডাক পড়ল। ‘এখানে দুইবার’ স্যর ব্ল্যাকবোর্ডের সামনের জায়গাটার দিকে আঙুল দেখালেন। ‘স্যর দুইবার?’ বুঝতে না পেরে নিরীহ প্রশ্ন। ‘তিনবার’ শুধু নির্দেশ ভেসে এল। তিন চার হয়ে ওঠার আগেই ছাত্রের মূর্খতা অপগত হল। কান ধরে ওঠবস করে আবার জায়গায় ফিরে গিয়ে নিজের কাজে মন দিল আরেকটু বেশি সাবধানতা অবলম্বন করে।

থার্ড বেঞ্চের চতুর্থ ছাত্রটি প্রায় মিনিট তিনেক পার করে দিয়েছে প্রশ্নের উত্তর দিতে। সেকেন্ড বেঞ্চের প্রথম ছাত্রটি নিছক কৌতূহলবশে কোণাকুণি পেছন দিকে তাকিয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত উত্তর এল। কিন্তু ভুল। খুব সামান্য ভুল। হবে হাইপো, বলেছে হাইড্রো। ছেলেটিকে বসতে বলেই নির্দেশ ‘সামনের বেন্স, বেন্সের উপর’

- কি করেছি স্যর

- তাইলে ক, কে কইসে

- জানি না

- তাইলে তুমি বেন্সের উপ্রে

বেশিক্ষণ নয়। সামান্য সময়।

স্যর অন্য একটি শাস্তির ভয় প্রায়ই দেখাতেন কিন্তু সেই শাস্তি কেউ পেয়েছিল কিনা জানা নেই। স্কুল ছুটির পর টেস্ট পেপার দেখে একপাতা উর্দু লেখা।

কিন্তু এই স্যরই একবার অসম্ভব রেগে গিয়ে একজনকে ক্লাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শাস্তি দিয়েছিলেন। তখন ক্লাস নাইন। স্যর আমাদের তিনটে বিষয় পড়ান। রসায়ন, পাটিগণিত এবং ঐচ্ছিক পদার্থবিদ্যা। আমাদের স্কুলে সবে একটা কম্পিউটার এসেছে। একমাত্র ট্রেনিংপ্রাপ্ত আমাদের স্যর। সপ্তাহে দু’তিনদিন ওনার দুটো করে ক্লাস থাকত। কোনও কোনও দিন উনি আমাদের কম্পিউটারের ঘরে নিয়ে যেতেন। কি হত কিছুই বুঝতাম না, সম্ভবও ছিল না। একটাই কম্পিউটার, সেটাকে ক’জন মিলে আর ঘিরে ধরতে পারে। ফলে অনেকের কাছেই ব্যাপারটা ছিল খানিকক্ষণ ঠাণ্ডা ঘরে গুলতানি করা। একদিন সকালে আমাদের দেখাতে দেখাতেই যন্ত্রটা বিগড়াল। ক্লাস শেষ হওয়া পর্যন্ত বহু চেষ্টাতেও তাকে বাগে আনতে পারা গেল না। আমরা ফিরে এলাম। বিকেল বেলা আবার স্যরের ক্লাস। স্যর ঢুকলেন। আমরা দাঁড়িয়েছি। স্যর তখনও বসেননি। এমন সময় একজনের প্রশ্ন – ‘স্যর কম্পিউটার ঠিক হয়েছে?’ সটান আদেশ –‘বেন্সের উপর।’ তারপর আমরা বসলাম। চল্লিশ মিনিট পরে ক্লাস শেষ হল। ছেলেটিও বেঞ্চে বসার সুযোগ পেল।

এবারে শেষ কাহিনি। এটি কোনও শাস্তি নয়, দায়বদ্ধতার কাহিনি।

আমাদের স্কুলে গরমের ছুটি এবং পুজোর ছুটি পড়ত প্রায় পরীক্ষা শেষ হওয়ার গায়ে গায়েই। পরীক্ষার কয়েকদিনের ভেতরে ফলপ্রকাশ, তার কিছুদিনের মধ্যেই ছুটি। আমাদের ছাত্রাবাসে সন্ধ্যেবেলা পড়াতে আসতেন একজন শিক্ষক। একটানা প্রায় দু’আড়াই ঘণ্টা পড়ানোর ফাঁকে উনি একবার বেরিয়ে যেতেন মিনিট দশ-পনেরর জন্য। সবাই জানত উনি ধূমপায়ী আর সে কারনেই ওনাকে বেরোতে হয়। কিন্তু উনি যে কোথায় যান সে সম্বন্ধে আমরা ছিলাম অন্ধকারে। ওই পরীক্ষা শেষ এবং ছুটির মাঝে পড়াশোনার বাইরে বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটির জন্য আমাদের কয়েকজনের স্টাডি আগেই শেষ হয়ে যেত। এই রকমই একদিন, আমরা তিনজন বন্ধু ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ স্যরকে আবিষ্কার করলাম এমন জায়গায় যেখানে সেই মুহূর্তে কোনও ছাত্রের আসার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। আমাদের দেখেই উনি আড়াল করে নিলেন ওনার সিগারেট। এক ধমক লাগালেন আমাদের – ‘কি করছিস এখানে বুনোর দল? স্টাডি নেই?’ আমরা আমাদের কথা বললাম। আবার বললেন –‘এদিকে কেন? যাও, যেখানে যাওয়ার’। কোনদিন কোনও ছাত্র ছাত্রাবস্থায় তাঁকে কোথাও ধূমপান করতে দেখেনি।

 

দু-একটি শাস্তি ও একটি অন্যান্য
  • 3.67 / 5 5
3 votes, 3.67 avg. rating (75% score)

Comments

comments