সড়াত্ করে আওয়াজটার পরেই অনুভব করলাম পিঠের একদিক দিয়ে একটা বড় সূঁচের মত কি একটা ঢুকে গেল, এত গরম সব যেন পুড়িয়ে দিল, তারপর বুঝলাম জিনিসটা গরম লোহার রড, না না, তারও পরে বুঝলাম, আমায় গুলি করা হল। মুখ থুবড়ে পড়লাম যখন, বুঝলাম তখন বাঁচতে হলে দূরের ওই কাঁটাতারের তলা দিয়ে ঢুকতে হবে। যা মেদ জমেছে পেটে, পারবো কি? সেদিকে ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছে, ভারত, আমার দেশ।

কবে কিভাবে এরকম অবস্থায় পড়েছিলাম তা বুঝতে পারি নি। আজই তো, হ্যাঁ, আজ ভোরে ঘুম ভাঙার পর দেখি আমি ওই ঘুপচি কুঠুরিতে। পাশের লোকটাকে জিগ্যেস করে জানলাম আজ কোর্টে নিয়ে যাবে আমাকে। কিসের নেশার দ্রব্য পাচারে আমি নাকি অভিযুক্ত। আমি তো অবাক। দেশের এম পি আমি, জানিস, হাঃ হাঃ, তোরা তো এম পি মানেই বুঝিস না, মেম্বার অফ পার্লামেন্ট। পার্লামেন্ট মানে হল গণতন্ত্রের মূল জায়গা। গণ মানে মানুষের তন্ত্র। আর আমি তার এক গুরুত্বপূর্ণ তান্ত্রিক। হুঁ হুঁ বাবা, তোরা কি বুঝিস বলতো। ভারতের পতাকা দেখেছিস? সেদিকে ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছে, ভারত, আমার দেশ।

লোকটা হাসে। হাসতে হাসতে জানায়, সাহিব, দেশটা ভারত নয়, তুমি ভারতে নেই। দূর শালা, আমি বললাম, ভারতে নেই কি রে? আজ দশটায় পূজোর প্যান্ডেলের ফিতে কাটতে হবে, মিস ইন্ডিয়া আসবেন। মস্করা পেয়েছিস, এই, এটা সেই নতুন সিনেমার সেটটা নয় তো! হাঃ হাঃ, সেই খান ব্রাদার্সওলা সিনেমা? সেলুলার ইন সেলুলয়েড? সেলুলার জেলের সেট না এটা?

হঠাত্ সেলের দরজা খুলে যায়, রক্ষী নিয়ে যাবে বলে এসেছে, আমাকে? আরে দ্যাখ, আমি জানি তো, আমায় ভয় দেখানো, অ্যাই, ডিরেক্টর কই, অনেক ঝামেলা করে ওকে সেন্সর উতরিয়েছি! চল চল, সেলুলার জেলের কারেন্ট অবস্থা দেখি কেমন বানিয়েছিস তোরা। বাইরে বেরিয়ে এলাম ওর হাতে হাত রেখে। হাঃ হাঃ, ওই দ্যাখ, যেখানে ইউনিয়ন জ্যাক উড়তো, সেখানে ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছে, ভারত, আমার দেশ।

কথাটা বলেই জবরদস্ত বিষম খেলাম, এ কি! ব্যাটারা করেছে কি! অন্য দেশের পতাকা!! আমি চ্যাঁচালাম, হোয়ার ইজ ডিরেক্টর? মাখনের মতো মোলায়েম গলা নিয়ে এক অফিসার জানালেন, জি, ইয়ে আপকা ইন্ডিয়া নেহি স্যার। ইউ আর ইন—–. কান্ট ইউ রিমেম্বার? নাও লেটস গো, লটস অফ প্রোটোকলস টু বি ডান বিফোর উই কিল ইউ। ইউ ট্রায়েড টু এন্টার হিয়ার উইথ ড্রাগস্। তারপর সাথের অন্য অফিসারটিকে বললেন, হ্যালুসিনেটিং ড্রাগ, দিস ম্যান ইজ সিভিয়ারলি অ্যাডিকটেড!
অন্য অফিসারটি মাথা নাড়ছেন, আই থিংক পাওয়ার, ইটস পাওয়ার উইদাউট রেসপন্সেবিলিটি, হোয়াট ডু ইউ থিংক?

আমায় ওরা নিয়ে যাচ্ছে বধ্যভূমিতে! বাট, এটা ওরা করতে পারে না, আরে আমায় উকিল তো নিয়োগ করতে দাও। মামলা চালাও, আমার সত্যি কিছু মনে নেই দেখুন, আমি ভারতের একজন এম পি, আমার দেশকে জানান আগে, বিদেশমন্ত্রককে জানান, ভারতীয় দূতাবাস? ভারতীয় দূতাবাসকে ফোন করবো, প্লিজ হেল্প মি। প্লিজ। আপনাদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। আমার সেলফোন টোন কিচ্ছু নেই। আমার সেক্রেটারিকে একটা কল করবো, প্লিজ স্যার, প্লিজ। আমি ভারতের লোক, ভারতের পার্লামেন্টের মেম্বার হয়ে কি করে ড্রাগ সাপ্লাই করবো সীমান্ত পেরিয়ে আপনাদের দেশে? আজ, আজ কত তারিখ স্যার, বলুন না স্যার, আমায় ফাঁসানো হয়েছে, বিরোধীরা এইভাবে আমায় দমাতে পারবে না, আমার পার্টি মানুষের সেবার পার্টি স্যার, আমাদের হেড আপিসের মাথায় ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছে, ভারত, আমার দেশ, আমার দেশ, স্যার।

ওরা শুনলো না, আর নাকি সময় নেই, আমি কি কারো দেহের মধ্যে ঢুকে পড়েছি? কার দেহ এটা, কুলদীপের? সরবজিতের? না না, এইতো আমারই চুল, আমারই চামড়া, আরে ভুল কি করে হবে! তবে কি আমি বেশ কয়েক বছর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম? শুনলাম আমায় নিয়ে ভারত সরকার এ ক বছর অনেক দরকষাকষি করেছে! আমি মরে যাবো তাহলে? নির্নিমেষ নয়নে দেখে যাবো যে আমার মতো একটা গণ্যমান্য ভি আই পি, যে ভারতের এম পি একজন, তাকে মেরে দেওয়া হবে! ওফ্, ভুলটা কে করছে, আমার দেশ? ঝট করে মনে পড়ে গেল, কে যেন বলেছিল, দেশ না পেরোলে দেশীয় বলে পরিচয় সৃষ্টি হয় না! কতবার তো দেশ পেরিয়েছি, এরকম মনে হয় নি। একজন নির্বাচিত নেতাকে এভাবে মরতে দিতে পারে ভারত, যেখানে, ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছে, আমার দেশ?

আমাকে ডায়রেক্ট মারলে প্রবলেম হবে শুনলাম, তাই মারা হবে কায়দায়। ভ্যানের ভেতর দেখি বন্দুকের নল আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, তার থেকে বেরনো ক্ষমতার জন্যে কাতারে কাতারে মরেছে যে সব আদর্শ সমাজের স্বপ্ন দেখা আদর্শবান যুবকবৃন্দ, দশকের ওপার থেকে, তাদের প্রতিনিধি হয়ে ত্রিশের ভগত সিং আর সত্তরের এক বিখ্যাত কৃষকনেতা আমার দিকে করুণা বর্ষে দিলেন। ভ্যানের সেই খুব দমবন্ধ গরমে, সেই বৃষ্টি আমার চোখে এসে নিল আশ্রয়। তার মধ্যেই আমি দেখলাম ফসলের দাম না পেয়ে আত্মহত্যা করা কৃষক আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে, ক্ষমতার উত্স হয়ে! গলায় তার প্যাঁচানো ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা, পতপত করে উড়ছে, ভারত, আমার দেশ।

একসময় ওরা আমায় ভ্যান থেকে নামায়। গোধূলিবেলা। নীলিমার কথা মনে পড়লো ঠিক তখন, পুষ্পল আর বিদিশার কথাও। আমি মরে যাব, ওরা কি ভারতে বসে জানবে? আর আমার ওই মরদেহ, রাষ্ট্রীয় সম্মান তো পাবে না, পতাকা দিয়ে মোড়া হবে না, সবথেকে বড় কথা, কেউ জানবে না ওরা শহীদের বউ, ছেলে, মেয়ে। অবশ্য, ভবিষ্যত ওদের সুরক্ষিত রাখতে যা যা করা দরকার তা করেই দিয়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে, দলের যুবনেতার পদে পুষ্পলকে বসানোর ছক কেটে এসেছি। আমি শহীদ হলে সুবিধা হত আরো। আর বেশী সময় নেই, নখ উপড়ানো সূর্য সেন আর মাথা ফাটা লাজপত রায় আমায় নির্দেশ দিলেন, ছোট। থামবি না। পেছনে তাকাবি না। আমার সময়কার আমার কলেজের হিস্ট্রি অনার্সের প্রফেসর রাঘবন এতদিন বেঁচে আছেন জানতাম না, মাথার মধ্যে খালি চেঁচাচ্ছেন, গাইজ, হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেল্ফ! পুরো দুদিন ওষুধ আর জলছাড়া অবস্থায় পার্টির মদতে ঘেরাও করে রেখেছিলাম আমার যৌবনে। আন্দোলন সফল করে নেতা হয়ে আর পেছনে তাকাতে হয় নি আমায়। আমি সেই দেশের মন্ত্রী, এম পি, যেখানে ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছে, ভারত, আমার দেশ।

যেখানে এসে দাঁড়িয়েছিলাম, সেটা দুদেশের কাঁটাতারের মাঝের জায়গা, আমি এখনো বিদেশের বালিতে পা দিয়ে আছি। ভাবলাম বুলেটপ্রুফটা হলে ভালো হত, সেদিন শয়ে শয়ে জড়ো ছাত্রের উপর গুলি চালাতে নির্দেশ দিয়েছিলাম। তার থেকে একটা গুলি বাঁচিয়ে রেখেছে কি ওরা? প্রফুল্ল চাকী বললেন, নন্দলাল টারগেট সেট করেছে, আমি তো গেছি, তুইও কি বাঁচবি? আর তারপরে গুলিটা করলো ওরা। আমাকে অবৈধভাবে সীমান্তপারকারী দেখালে ঝামেলা চুকে যাবে, বুঝলাম। মাটিতে পড়ে গেছি, সামনে দুটো পা ঝুলছিলো, মাথায় লাগতেই দেখি ক্ষুদিরাম, বলছেন, আঃ, দড়িটায় তাও মোম মাখানো ছিল, আর তোর জন্য শেষে কি না পাচারকারী থামানোর বুলেট? আমি কাতরাতে কাতরাতে কাঁটাতার পেরিয়ে দৃষ্টি মেললাম, সেদিকে ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছে, ভারত, আমার দেশ।

দেশের জন্য কী করি নি! দেশের মানুষকে কত প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যেটুকু বাড়তি রক্ত আছে ওদের গায়ে, চুষেছি, সে তো ওদের ভালোর জন্য! ওদের ভালোর জন্য শিক্ষা আর স্বাস্থ্যের দিকটায় নজর দিয়েছি, বিষ নজর! কেন আমার মাসিক ভাতার টাকা দেশের লোকের শুকনো জমাট রক্ত দিয়ে তৈরী হল, আমার সুবিধার জন্যে ট্রেন-প্লেন-টেলিফোন সব কেন খরচাহীন হল, জিগ্যেস করো কেন? আরে দেশকে দেখবো আর নিজেকে দেখবো না? দেখেছি দেখেছি সব দেখেছি, নইলে আমি যখন পিটিয়ে মারলাম বিধর্মীদের, আমি যখন পুড়িয়ে মারলাম বিরোধীদের, আমি যখন সশস্ত্র সেনা পাঠিয়ে ছারখার করলাম বিদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেওয়া ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত দেশবাসীকে, কই, কোন মেরুদন্ডী প্রাণী তো আমার বিপক্ষে ভোট দেয় নি! আসলে পীড়িত না হলে আমার ঠিক পিরিত জমে না, বুঝলেন চার্লস টেগার্ট। টেগার্ট ফিসফিসিয়ে বললেন, আমি পেপারওয়েট হিসেবে বোমা ইউজ করতাম দেখেও যে দেশের লোক আমায় ডরায় নি, সে দেশের লোক এমন হতে পারে? আমি বললাম পারে, এখন আমায় বলুন দেখি, আমার ভুঁড়ি সমেত কতক্ষণে এই কাঁটাতার ছুঁতে পারবো? হাওয়ায় ভেসে এল সেই অভয়ার আশ্বাস, পারবেন মন্ত্রীমশায়, ঠিক পারবেন, এতদূর পেরেছেন যখন, নিশ্চয় পারবেন, তাই না রে লতিফা? নারীকন্ঠের কলধ্বনিতে কানে প্লাবন আসছিল, প্রীতিলতা এসে বললেন, এগো এগো, ওইদ্যাখ, আর একটু, ওইদিকে দ্যাখ, ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছে, ভারত, আমার দেশ।

সত্তর বছরের বুড়ীর দেমাক কদ্দূর তাই ভাবছিলাম! ঘষটে ঘষটে এগোচ্ছিলাম ভারতের দিকে, আমার দেশ, আঃ! আর একটু পেরোলেই…পতাকার তলায় এতো শান্তি এতো আশ্বাস আছে জানতাম না। দেশ তো নয়, এখন মনে হচ্ছে যেন মায়ের হাতে গড়িয়ে খাওয়া, কাঁসার গেলাসে, কুঁজোর জল! অসহ্য অসিহষ্ণুতার গরমে যেন ঢকঢক করে খেতে প্রাণ চায়। সে যেন পতপতিয়ে বলছিল, আয় আয়, একসাথে থাকি আয়, কেউ টিকি ছুঁতে পারবে না, আয় না, দ্যাখ, টিকে থাক এক সাথে, যত মত হোক তত পথ হোক, কিন্তু বাইরে বেরোলে সাবধান, পথগুলো যেন এক হয়ে ফিরে আসে। আর একটু এগোলেই আমি দেশের সীমানায়, আর গুলি চালাতে গেলে নিয়ন্ত্রণরেখা ক্রস করে আসতে হবে ওদের। কোনমতে দেহটাকে দেশের মাটিতে এনে ফেলি, ডানদিকে তাকাই, সেদিকে ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছে, ভারত, আমার দেশ।

এবার দেখলাম, পতাকার স্ট্যান্ডের নীচের মাটিখুঁড়ে কালো কালো কাঁকড়ার দল বেরিয়ে আসছে পিল পিল করে, বেরিয়ে আসছে কি? না না, শালারা বেরোতেই পারছে না, এ ওর ঠ্যাঙ ধরে খালি টানাটানি করছে, সবাই গর্ত থেকে একসাথে বেরোতে চায়! আগুন হবে একটু, আগুন? রবীন্দ্রনাথ আর সুভাষ বসু বললেন, কেন ফর্মুলা তো জানোই। আমি বললাম হ্যাঁ হ্যাঁ, ভুলে গেছিলাম, আফিমের আগুন তো পকেটেই আছে। আগুন দিতেই কাঁকড়ার দল মরছে, আমি ভাবলাম, আরো ভাঙাভাঙি করলে কেমন হয়? রঙ দিয়ে, জন্ম দিয়ে, কূল দিয়ে, ভেঙে দিই দাঁড়াগুলো! ঠিক তখন দ্বিতীয় গুলিটা এসে লাগলো বুকে আমার, তাকিয়ে দেখি অহিংসার জনক হাতে পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে, বললেন, “তোমার বুঝি খুব লেগেছে? জানো মন্ত্রী, সেদিনো আকাশ জুড়ে তেরঙ্গা আলোর মধ্যে কি সুন্দর ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছিল, ভারত, আমার দেশ, তোমার দেশ।”

******
আজ সকালে ঘুমের মধ্যে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে দেশের বিশিষ্ট এম পি, প্রাক্তন মন্ত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হচ্ছে, আমরা দেখে নেবো অনুষ্ঠানের এক ঝলক, আচ্ছা ইমন, তুমি কি শুনতে পাচ্ছো, শুনতে পাচ্ছো আমি স্টুডিও থেকে মধুমিতা বলছি, প্রিয় দর্শকবৃন্দ, আরেকবার বলছি, আজ সকালে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে দেশের বিশিষ্ট এম পি, প্রাক্তন মন্ত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হচ্ছে….আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, নিউজ হিন্দুস্তান….ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকায় ঢাকা হল মহামানবের মরদেহ, ভারত, আমাদের দেশ।

দেশ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments