শিশুপালন নিয়ে কেটি দেব বলে আগেই জানিয়েছিলাম, কিন্তু কি বিষয় নিয়ে আগে লেখা উচিত, এটা নিয়ে মাঝে মাঝেই ধাঁদিয়ে যাই আর কি। তারপর মনে হল, যে সমস্ত বিষয় আমি নিজে সবথেকে বেশি ইন্টারনেটএর শরনাপন্ন হয়েছিলাম, সেগুলি আগে লেখা যাক। তাই আজকের পোস্টটির অবতারণা। পুঁচকে ছানা নিয়ে আকাশে ওড়া। যদিও এই বিষয় হাজার একুশ টা লেখা পাওয়া যায় একটু গুগল করলেই, তবু বাংলায় হয়ত এরকম লেখা আর নেই, তাই আমি লিখতে বসলাম। মাঝে মাঝে ভাবি, আমার target reader কারা? বঙ্গভাষী মানে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের সেই সমস্ত মায়েরা, যাদের পাশে পাশে জ্ঞান দেওয়ার সঠিক লোকের নিতান্ত অভাব, আর যারা হয়ত ইংরিজিতে অতটা স্বছন্দ বোধ করে না। তারপর ভাবলাম, যারা ইংরিজিতে স্বছন্দ বোধ করে না, তারা কি বিমানযাত্রা করে? বা অন্যভাবে যদি দেখা যায়, যারা ৩/৪ মাসের শিশু নিয়ে বিমানযাত্রা করে, তারা কি আদৌ আমার মত অনামী কারোর বাংলা ব্লগ পড়বে? যাকগে, না পড়ে, না পড়ুক। আমি তো আমার মত লিখে যাই… হয়ত কোন একদিন, কেউ একজন পড়ে ফেলল, তাই বা কম কি।

কত ছোট বয়সে ওড়া সম্ভবঃ
এই পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু হয় না, তবু ডাক্তারি ভাষায় বলা হয়, ডোমেস্টিক বা কম দূরত্বের জন্যে অন্তত তিন মাস এবং আন্তর্জাতিক বা লম্বা দূরত্বের জন্যে অন্তত ৬ মাস বয়সী হলে ভালো হয়। আড়াই মাসে লখনৌ থেকে মুম্বাই উড়েছে, এরকম শিশুও আমি দেখেছি অবিশ্যি। যত ছোট থাকে তত সামলানো সহজ, যত বড় হয়, চলতে ফিরতে শেখে, তত মুস্কিল হয় সামলানো। নিউট্রন কে যখন কলকাতা থেকে পুনে নিয়ে আসি, অ তখন ছিল ৯ মাসের এবং হামাগুড়ি দিতে ও ধরে ধরে দাঁড়িয়ে পড়তে পারত আর আমি একাই ছিলাম নিউট্রনের সাথে, তাই বেশ মুশকিল হয়েছিল।

কিভাবে ফ্লাইট পছন্দ করা উচিত?
সাধারণত সপ্তাহের মাঝখানে যেদিন ভিড় তুলনামূলক কম থাকে (এবং দামও!!) সেদিনের একটু ভোরের বা রাত্রের দিকের ফ্লাইট পছন্দ করা উচিৎ। কারণ ভিড় কম থাকলে, এয়ারপোর্টএর বসার জায়গা পেতে অসুবিধা হবে না এবং হয়ত ফ্লাইটেও এক-দুটো সিট খালি পাওয়া যেতে পারে, এবং বিমানসেবিকার সাহায্যে কখনো উঠে সিট পরিবর্তন করা সম্ভব।
আর ভোর বা রাত্রের ফ্লাইট হলে, অর্থাৎ পুচকের ঘুমের সময়ের হলে, তুলনামূলক সুবিধা হয়। প্রথমবার আমরা দুপ্পুর বেলার প্লেনে চড়ে খুব বুঝেছি গপ্পটা। তবে এগুলো সবই স্বল্প দূরত্বের কথা মাথায় রেখে বললাম, ১২ ঘন্টার উড়ান হলে, যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন।

কিভাবে সীট পছন্দ করা উচিতঃ
আজকাল তো অনেক জায়গাতেই ই-চেকইন এর সুবিধা রয়েছে, করে নিতে পারলে ভালোই হয়। তবে লাইনে দাঁড়িয়ে করালেও বাচ্চাসমেত মায়েদের আগেই ছেড়ে দেওয়া হয়; অত অসুবিধা হয়না। লাগেজের ওজন আগেই দেখে নেওয়া উচিত, কারণ বাচ্চা নিয়ে ব্যাগ খুলে কেবিন লাগেজ, হ্যান্ড লাগেজ পরিবর্তন করা অসুবিধাজনক।
সীট পছন্দ করার জন্যে, টিকিট কাটার সময়েই জেনে নেওয়া যায়, ব্যাসিনেট পাওয়া যাবে কিনা, তবে বেশিরভাগ সস্তার বিমানেই ব্যাসিনেট পাওয়া যায় না; তবে বিমানে একটি বিশেষ শিশু সিটবেল্ট দিয়ে যায় বাচ্চাকে বেন্ধে রাখার জন্যে। ব্যাসিনেট সিট না পাওয়া গেলে দেখা উচিত বেশি লেগপ্লেস ওয়ালা সিট পাওয়া সম্ভব কিনা। কিছুই না পাওয়া গেলে সাধারণ সিট-ই চলবে। বেশিরভাগ বিমানেই সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেওয়া যায়, এরম স্ট্রলার নিয়ে উঠতে দেয়, তবে আগেই জেনে নেওয়া উচিত।
বাচ্চা সম্পূর্ণ মাতৃদুগ্ধপোষ্য হলে, জানলার সীট নেওয়া ভালো, প্রিভেসি থাকে আর জানলার দিকে হেলান দেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু বাচ্চা কান্নাকাটি করলে, বা কোন কারণে বাইরে ঘুরে বেড়াতে চাইলে একটু অসুবিধা তো হয়। তবে দরকারে কারোর সাথে পরিবর্তন করা যেতেই পারে, কারণ জানলার পাশের সীট অনেকেই পছন্দ করেন। আর বোতলের দুধ খেলে তো আইল সীট চলতে পারে, দরকার মত উঠে হাঁটা চলা করা যেতে পারে।

এয়ারপোর্টে কি করা উচিতঃ
সাধারনতঃ শিশুকে একদম খালি পেটে বা খুব ভরতি পেটে বিমানে ওঠানো ঠিক নয়, বমির সম্ভাবনা থাকে। তাই ফ্লাইটএর অন্ততঃ আধঘন্টা আগে খাইয়ে নেওয়া উচিত। যদি শিশুর ঘুমের সময় না হয়, তাহলে খাওানর পরে আরাম করে খেলতে দেওয়া উচিৎ, যত ক্লান্ত থাকবে, তত বিমানে উঠে ঘুমিয়ে পড়ার বেশি সম্ভাবনা। সম্ভব হলে মায়েরও কিছু খেয়ে নেওয়া উচিৎ, কারণ বিমানে খাওয়াটা বেশ অসুবিধাজনক। আর ঠিক মত খাওয়া না হলে, মেজাজ ঠিক রাখাও মুস্কিল।

কিরকম পোশাক পড়া উচিতঃ
শিশু এবং মা দুজনের জন্যেই একদম সাদামাটা অর্থাৎ সিকুইন বা জরি-চুমকি কাজ ছাড়া সুতির জামাকাপড় পরা উচিত কারণ শিশুকে কোলে শোয়ান অসুবিধেজনক তাই, সারাক্ষন কোলে নিয়ে থাকতে হয়, তাই জরি/সিকুইন ওয়ালা জামাকাপড় হলে শিশুর অস্বস্তি হবে। যেহেতু বিমানে ঠান্ডা থাকে, শিশু যদি এসি তে অভ্যস্ত না হয়, তাহলে বিমানে ওঠার আগে, এক প্রস্থ গরম জামা পড়িয়ে দেওয়া দরকার, এবং হ্যান্ড ব্যাগে অন্ততঃ আরও একসেট সাধারন জামা এবং একসেট গরমের জামা রাখা উচিত। এমনকি মায়ের জন্যেও একটা অতিরিক্ত জামা রাখা উচিত, কারণ বমি করে ভিজিয়ে দিলে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

বিমানে কি করা উচিৎঃ
১। বিমানে ওঠার সময়েই বিমানসেবিকাদের সাথে ভাব করা উচিত; শিশুকে দিয়ে হ্যালো-হাই করানো উচিত, মায়েরও একটু হাসি হাসি মুখ করে নম্রভাবে হ্যালো করা উচিত, কারণ পরে বিমানসেবিকার থেকে সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। আর কে না জানে রামগড়ুরের ছানা অপেক্ষা আহ্লাদী ছানাদের দেখলে মানুষ বেশি খুশি হয় আর সহায়তা করে!
২। নিজেকে এবং শিশুকে আলাদা আলাদা ভাবে সীটবেল্ট দিয়ে বেন্ধে রাখা দরকার। খুব প্রয়োজন ছাড়া সীটবেল্ট না খোলাই ভালো, এমনকি সীটবেল্টের সঙ্কেত অফ হবার পরেও।
৩। কানের চাপ যাতে কষ্ট দিতে না পারে, সে জন্যে টেক অফ এবং ল্যান্ডিঙের সময় শিশুকে ফীড করানো উচিত। ব্রেস্টফীড অবশ্যই প্রথম পছন্দ। যদি বোতলের দুধ খায়, সেক্ষেত্রে একটি বোতল একদম তৈরি করে নিয়েই ওঠা উচিত। যদি একটু বড় হয়, এবং দুধ খেতে না চায়, সেক্ষেত্রে বিস্কুট বা নোনতা কিছু চিবোতে দেওয়া উচিৎ। এছাড়াও কানে তুলো দিয়ে রাখা উচিত। আর যদি চিবোনোর উপযুক্ত না হয়, এবং দুধ না খেতে চায়, তাহলে অন্ততঃ প্যাসিফায়ার বা চুষি দেওয়া দরকার, কারন সাকিং বা মাঞ্চিং সাহায্য করে কানের চাপের তারতম্য কে বুঝতে না দিতে।

শিশুর ব্যাগএর চেকলিস্টঃ
১। ৩/৪ টি ডায়াপার (দূরত্ব বেশি হলে বেশি লাগবে) + ব্যবহৃত ডায়াপার ফেলার জন্যে কালো প্লাস্টিক
২। পর্যাপ্ত বেবি ওয়াইপ + রুমাল + তোয়ালে + অল্প পাউডার (বমি করলে কাজে দেয়)
৩। গরম জলের ফ্লাস্ক + ফরমূলা পাউডার //তৈরি করা দুধ (সাধারনতঃ শিশুখাদ্যের জন্যে ১২০ম্ল লিকুইড নিয়মের ব্যাতিক্রম হয়;)/ সাধারন তাপমাত্রার জল
৪। আপতকালীন ওষুধ (সম্ভব হলে প্রেসক্রিপশন সমেত), বিশেষত হোমিওপ্যাথি ওষুধ নিয়ে আমি চোখের সামনে গণ্ডগোল হতে দেখেছি।
৫। শিশুর জন্যে ২সেট (১ সেট এমনি, ১ সেট ঠাণ্ডার) পোশাক+ মায়ের জন্যে একসেট উপরের টপ
৬। শুকনো স্ন্যাক্স + পরিজ জাতীয় খাবার +দুসেট অতিরিক্ত চামচ + প্লাস্টিক(একবার ব্যবহৃত বাসন রাখার জন্যে) +ফাঁকা সিপার
৭। শব্দ করে না, এমন কিছু খেলনা। নতুন কিছু নিয়ে গেলে ভালো হয়, কারণ শিশুরা নতুনত্ব পছন্দ করে।

উপসংহারঃ
নিউট্রনের প্রথম বিমানযাত্রার আগে আমি অনেক নেট ঘেঁটে ভয়ে ভয়ে ছিলাম, মনে হয়েছিল, হয়ত কঠিন হবে ব্যাপারটা, কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি।বিমান চলতে শুরু করার ১০ মিনিটের মধ্যেই সে আরাম করে ঘুমিয়ে গেছিল, আর চোখ খুলেছিল একদম ল্যান্ড করার পরে। না কান্নাকাটি, না হাঁটাহাঁটি। যাকগে এত কিছুর পরে একটা কথা দিয়েই ইতি টানব। সমস্ত প্রস্তুতির পরেও কিছু না কিছু গন্ডগোল হতেই পারে, তখন শুধু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করা উচিত সেই সমস্যা থেকে কিভাবে রক্ষা পাওয়া যাবে, আর জীবনের সমস্ত মজার মুহূর্ত উপভোগ করা উচিত। আপনার যাত্রা শুভ হোক…

দে উড়ান, দে উড়ান…
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments