আমি নাক ডাকিয়ে ঘুমোই আর মাঝ রাতে বিশাল বপু ওল্টাতে গিয়ে খাট কাঁপিয়ে গিন্নির ঘুম ভাঙাই , এটা একটা আপেক্ষিক সত্য ! আপাত দৃষ্টিতে আমার এই নিদ্রাসংক্রান্ত নিশিক্রিয়াটি হাস্যকর হলেও ক্রমশ তা আমাদের সম্বন্ধবিচ্ছেদের কারণ হিসেবে গন্য হলে আশ্চর্য্যের কিছু থাকবেনা।পড়াশোনা করে জানলাম এই সিনড্রোমটাকে স্লীপ এপ্নিয়া না কি জানি বলে। মজার ব্যাপার হলো যে ওই সময়ে নাকি সহস্র গজের শক্তি এসে জোটে আমার দেহে আর তাই গিন্নি ঠেলে গুঁতিয়ে আমাকে নেড়ে সরাতে পারে না। সকালে ঘুম ভাঙলে অবশ্য সে নিয়ম করে ঘেঁটি ধরে আমায় কিলোদর মেপে নাড়িয়ে দিতে ভোলেন না। আমার যদি একটা নাক ডাকিয়ে কত্তা থাকত আর আমি যদি রাতে তার জন্য ঠিক ঠাক ঘুমোতে না পারতাম তাহলে আমিও নিশ্চই সকাল হলেই সেই মিনসের হালুয়া বাম্পার ভাবে টাইট করতে বিন্দুমাত্র লজ্জা বোধ করতাম না।শোনা যায় খোদ আলেকজান্দার নাকি এমন নাক ডাকতেন যে শত্রু পক্ষের শিবির ভাবত যে গ্রিক সৈন্যরা বুঝি মাঝ রাতেই হামলার ফন্দি আঁটছে। আর এও অজানা নয় যে আকবরের নাক ডাকার চোটে জেরবার যোধাবাই সারা রাত বাদশাহী পালঙ্ক ছেড়ে সারা রাত বারান্দায় বসে তানসেনের গলা ভাজা শুনতেন । তা আমি বাপু সেকেন্দার শাহও নই আবার মুঘলে আজম আকবর শাহেনশাও নই, আমার ঘুম গভীর ও অনেক চিন্তা ভাবনার রসদে ভরা। এই যেরকম গিন্নি ঘুমোবার আগেই একটা রিমাইন্ডার দিল যে ” উল্টো করে শো , মাঝরাতে আমি ওল্টাতে পারবনা বলে দিচ্ছি কিন্ত। ” আমিও হাই তুলতে তুলতে উল্টে শুয়ে পড়লাম ও কানের ভেতর কোথাও রোজকার চেনা কিছু শব্দ গুলো ক্যাসেটের মত উল্টে পাল্টে বাজতে থাকলো। নাহ জন্মাষ্টমীর দোহাই দিয়ে অতগুলো তালের বড়া একসাথে খাওয়াটা ঠিক হয়নি ! হুঁশ ফিরলো যখন টের পেলাম যে নিজের অজান্তেই নাক ডাকতে ডাকতে আমিই কিরকম উল্টো-পাল্টা একটা দেশ-স্পেস-সময়ে পৌঁছে গেছি। অতি পরিচিত বাজারের আবহাওয়াটা হুট করে মরুভূমির মত ঠেকলো। কিন্ত রাস্তার ধারে নিল রঙের প্লাস্টিকে পেতে ইয়া পেল্লায় সাইজের তাল বিক্রি হচ্ছে দেখেই যা লোভ লাগলো যে আর কি বলব , জিগ্গেস করলাম, ” তা তাল কত করে দিচ্ছ হে?” বিজাতীয় ভাষায় উত্তর এলো , ” হুজুর, ইয়াহা তাল কহাঁ ? ইয়েহ তো অরব মুল্ক কে খজুর হায় , লিজিয়ে না , ৫ রুপিয়া পিস লগা দেঙ্গে !” যাহ শালা, মধ্য প্রাচ্যেও ইহুদিরাও এরকম তালের সাইজের খেজুর ফলাতে পারেনি আর এখানে বলছে ৫ টাকা পিস! এটা সত্যি হলে আমি সিওর কাল রাত্রে নাক ডাকতে ডাকতে মরে ফরে গেছি ও এই তামাম মানব জীবনে কুড়িয়ে বাড়িয়ে জমানো কিঞ্চিত পুণ্যটুকুও ওই ৫ টাকার তাল রুপি খেজুর খেতেই খরচ হয়ে যাবে। আমি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বললাম, ” নাহ নাহ বড্ড বেশি দাম চাইছ , ১০ টাকায় তিনটে হবে?” বৃদ্ধ বিহারী বিক্রেতা ভ্রু কুঁচকে মাথার গামছা খুলে ঘাড় মুছতে মুছতে বলল , ” আচ্ছা, লে যাইয়ে , কলকত্তা মে আইসা তাল আপকো কৌনো জগহ মে নাহি মিলেগা !” ঠিক শুনলাম তো, তাল বলল না? এবার একটু গলা চড়িয়েই বললাম ,” মস্করা মারতা? একবার খেজুর বোলেগা আবার খরিদ করনে কে বাদ তাল বোলেগা , সকাল সকাল জোচ্চুরি করতা ?” বুড়ো আবার মাথায় গামছা বাঁধতে বাঁধতে উত্তর দিল , ” সাহাব পেয়াঁজ ৬০ রুপিয়া কেজি, সবসে সস্তা দাল ১২০ রুপিয়া। টমাটর অর বৈগন খায়ে বহুত দিন হো গয়ে, আরব দেশ সে বদতর মাহৌল হায় বাবুজি। তভী তো দেশী তাল কো অরবি খজুর বোলকে ৫ রুপয়ে মে বেচ রাহে হায়, আপ ১০ রুপয়ে মে তিন মাঙ্গে তো উ বড়কা খজুর ফিরসে তাল বনিয়ে না যায়েগা …. লন্ডন নগরী বান রহা হায় বাবু , হাঃ হাঃ হাঃ। ….” মাথাটা কিরকম ঝিম ঝিম করছিল , সবজি ও মাছ কেনা বাকি ! নাহ একটা চা সিগারেট খাওয়া দরকার। বাজারের শেষে চায়ের দোকান , এমনি দিনে বেদম ভিড় থাকে তবে আজকে দেখছি বেজায় ফাঁকা ! একটা ফাইফর্মাসী ছোকরাকে সাথে নিয়ে দোকানটা চালায় হরেণ। সে আদপে ৭০-এর উদ্বাস্তু এক কাঠ বাঙাল যার ডিএনএতে ওপরওয়ালা তিলেখচ্চরী তিল তিল করে ভরে দিয়েছে। যেই না ভেবেছি একটু ঠেস দিয়ে ব্যাটাকে জিগ্গেস করব যে , ‘দোকান এত খালি খালি লাগছে কেন?’ …তো সেটা হওয়ার আগেই সে আমাকে দেখে একগাল হেসে উল্টো প্রশ্ন করলো , ” ছার্ , খবর পাইলাম আফনে নাকি তিন টুকরা কালা আঙ্গুর ব্যাবাক দাম দিয়া কিনসেন ? আর আফনের এই তাজা বুরবাকপানা কিচ্ছা শুইন্যা আমার কাস্টমাররা অন্য দুকানে গিয়ে ভিড়সে গা, কয় রেগুলার ভাবে আমার দুকানে চা খাইলে নাকি হেরাও আফনেরমত তাল খাজুর কিনতে গিয়া বেকুব বৈনা যাইবো ! কন তো দেখি ছার্, কি বেম্মক্কা বিফদ করলেন আফনে সকাল সকাল ?” এবার সত্যি খারাপ লাগলো , আমি হরেনকে সত্তর ওই তালের ট্রিপলেটটা ব্যাগ থেকে বার করে দেখালাম ও তখন সে খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে বলল , “এইগুলান আঙ্গুর কই ? তাল না হোক…..তবে এগুলান ইয়ে খাজুরও না !” আমি বললাম, ” তবে এগুলো কি?” হরেণের হাজিরজবাব , ” কাছ থিক্যা দ্যাখলে এগুলা একেব্বারে দেশী ডাসা সুপারির মত লাগে, না ছার্ আফনে ঠকেন নাই, তা কি দিব, গ্রীন টি না ছিঙ্গেল মল্ট ? রথ্মানস টানতে টানতে ট্যারও পাইবেন যে কখন সুমুকে সুমুকে আফনে বেবাগ বোতল উড়াইয়া দিলেন… লন্ডন শহর হইতাসে দাদা… হাঃ হাঃ হাঃ …” আবার ঝটকা !নাহ আমি শিওর পটল তুলেছি, ফ্লেক আর ৫ টাকার জোলো দুধ চা ছাড়া যে কিছু বেচতো না সেই হরেণ নাকি দোকানের কাঠের তাকে গ্লেনফিদিচ আর ইমপোর্টেড সিগারেট রাখছে। দেখেছ, এখনো সবজি ও মাছ কেনা বাকি আর ওদিকে বেলা বাড়লে সেই পচা মাছ কিনে বাড়ি ফিরলে আর দেখতে হবে না। যাঃ মোবাইলটাও ফেলে এসেছি , হুমম pco বুথ থেকে একটা ফোন করে দিয়ে বাড়িতে জানিয়ে দি যে মাছ কাটাতে দেরী হচ্ছে কেননা সবাই এখানে এখন লন্ডন-এর দোহাই দিয়ে এই ঝিমিয়ে থাকা পাড়ার বাজারটাকে একেবারে এন্টনি ফিরিঙ্গি করে ছেড়ে দিয়েছে। ওমাঃ , ফোন বুথ তো এখন ফুলের বাজার! কাঁচের খোপের মাঝে দেখতে পেলাম ওপরের দিক থেকে রজনীগন্ধার মালা ঝোলানো। মেঝেতে টিউলিপ ,গোলাপ কিম্বা গ্ল্যাদীয়লাস আনাচে কানাচে জড়ো করে রাখা, বুকে তৈরী হবে বোধহয়। নাহ , আর কোনো সন্দেহ নেই যে আমি একেবারে গ্যারান্টেড অক্কাই পেয়েছি আর এখান থেকে কোনো ফোনকল কেন কোনো কমিউনিকেশনই করা যাবে না কেননা হিসেব বুঝে ছক কষে এই এখান থেকেই সোজাসুজি মরণোত্তর ফুলের সজ্জা তৈরী হচ্ছে আমার জন্যে। মাছ আর তরকারীর তবে কি হবে? মরার আগে অন্তত এগুলো এই বিলিতি মার্কেট থেকে কিনে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারলে কিছু আরো পুণ্য অর্জন করতাম। লন্ডনে ভালো ইলিশ পাওয়া যায়, খুঁজলে মেলে ভালো কচুর লতিও। দম বন্ধ করা এক হাঁক-পাঁকানো ভাব নিয়ে উল্টো দিকের রাস্তায় মাছের বাজারে সেই শেষমেশ ইলিশ খুজতে ছুটলাম , ভালো কচুর লতি পেলে আরো কিছু পুণ্য পয়েন্টও কমিয়ে নেওয়া যাবে ! পৌছে গিয়ে দেখলাম মাছের দোকান গুলো ল্যাপটপ, ট্যাব ও স্মার্টফোন বিক্রি করছে ও খবরকাগজ বেচতো যে ছোকরাটা সে কয়েকটা খয়রা মাছ ও কিলবিল করা কয়েকটা সবুজ রঙের সাঁপ গলায় জড়িয়ে বলছে টাটকা মিনি ইলিশের মাথা দিয়ে কচুর শাক খান…..হরেক মাল পঞ্চাশ টাকা ..লুট লুট…লুটে নিন ! হটাত কচুর শাকের জায়গায় লাউডগা সাঁপগুলো আমার দিকে এগিয়ে আসতেই ছোকরাটা চোখ মারতে মারতে নির্লজ্জের মতন বলতে লাগলো , ” কিরকম তাজা কারবার দেখুন দেখি , মরা ইলিশও হিলছে আর জ্যান্ত শাকও নড়ছে …স্যার লন্ডন হচ্ছে তো, শাক দিয়ে আর মাছ ঢাকা যাচ্ছে না ..হাঃ হাঃ হাঃ ….”

এর পরে কি করব সেটা বুঝে ওঠার আগেই আধোঘুমে আবার সেই গিন্নির ওয়ার্নিং শুনতে পেলাম , ” উফফ নাক ডাকিস না ! ঘুরে শো না , কাল কিন্তু সকালে বাজার যেতে হবে….. ”

দে যাঃ ভুসস
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments