ভূমিকা


ক্ষমতার নাম স্হান, কাল, পাত্র ভেদে ভিন্নতর হয়।হয়ত তার চরিত্রও এক থাকে না।কিন্তু একটা জায়গায় সে তার মৌলিকতা বজায় রাখে।তা হল কার্টেজিয় দ্বৈত গঠন।যা আসলে নামে দ্বৈত  হলেও আখেরে এককেন্দ্রিক।যেখানে জনৈক সুপিরিয়রের চশমার কাচে অপরকে দেখা হয় এক অপেক্ষাকৃত নিম্নতর,ইতরতর দ্বিতীয় শ্রেণীর সত্ত্বা হিসাবে।কখনও এর নাম মেল গেজ কখনও ব্রাহ্মণ্যবাদী ইতিহাসের দলিল,কখনও পুঁজিবাদ আবার কখনও বা নিছক এলিটিজম অথবা ব্যক্তিগত পর্যায়ে যা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর-সেই ম্যাল-অ্যাডাপটিভ নার্সিসিজম।

 

পর্ব ১

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দ্রুত পদে হেঁটে চলেছেন দ্বিজশ্রেষ্ঠ দ্রোণ।শ্বেতাম্বর প্রৌঢ়ের শরীরের গড়ন অস্বাভাবিক শীর্ণ ও মধ্যভাগে ঈষৎ বঙ্কিম।অক্ষিদ্বয় বৃহৎ ও গোলাকার।অচ্ছৎপটলে গঞ্জিকাসক্তসুলভ কিঞ্চিৎ রক্তিমাভা।চলার ভঙ্গিমা ঋজু নয়।কিন্তু শরীরের তপ্তকাঞ্চন বর্ণ তাঁর আর্যত্বের সাক্ষর বহন করছে।দর্পিত মুখে ব্রহ্মতেজের দীপ্তি বর্তমান।
আজ কিন্তু ব্রাহ্মণের মন কিঞ্চিত বিক্ষিপ্ত।আজ প্রিয় শিষ্য অর্জুন তাঁকে অভিযোগ করেছে তিনি তাকে শব্দভেদী বাণের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রেখে কোনো এক শূদ্রকে সেই শিক্ষায় সমৃদ্ধ করছেন।ধৃতরাষ্ট্রের উপর দুর্যোধনকে নিয়ে যে স্নেহান্ধ পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আকছার ওঠে,সেটা দ্রোণের ক্ষেত্রেও অর্জুনের বিষয়ে খুবই সত্য।কিন্তু দ্রোণ তাঁর সুমিষ্ট ও ভদ্র মুখোশের আড়ালে অনেক কিছু সহজে গোপন রাখতে পারেন,যা নৃপতি হয়েও ধৃতরাষ্ট্র পারেন না।কে এই শূদ্র তরুণ যে অর্জুনের অহং এ আঘাত দিয়েছে!দ্রোণ ছাড়া যে বিদ্যা ক্ষত্রিয়কূলেও কারও নাগালে আসে না,এই শূদ্র তরুণ তা রপ্ত করল কিভাবে!
একটা সারমেয় অনেকক্ষণ ধরে চিৎকার করছে।আচার্যের চিন্তাজাল মাঝে মাঝেই ছিন্ন হচ্ছিল এই শব্দদূষণে।একটা সময় খুব বিরক্ত হয়ে কুকুরটার দিকে তাকালেন আচার্য।তখনই আচমকা তাঁর নিজেকে জীবাশ্ম মনে হল।সাতটি শর নিঃশব্দে কোথা থেকে ছুটে এসে চতুষ্পদ প্রাণীটির কণ্ঠরুদ্ধ করল।সামনে তাকিয়ে দেখতে পেলেন এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণকে।যে বাণ নিক্ষেপ করার সময় লক্ষ্যের দিকে না তাকিয়েই লক্ষ্য ভেদ করেছে। 
একবিংশ শতকের এক মিলেনিয়াল বিস্ময়বিমূঢ় চোখে এই মহাকাব্যীয় দৃশ্যপট অবলোকন করছে।মহাকাব্যের চরিত্ররা কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছেন না।কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের মুখের যৌবনের দীপ্তি,গৌরবর্ণ বৃদ্ধের মুখে ফুটে ওঠা ব্রহ্মতেজ – সবকিছু কি মহাকাব্যীয় ভাবে দৃষ্টিনন্দক।
একলব্য দ্বিজশ্রেষ্ঠকে দেখে আপ্লুত হয়ে এসে তাঁর পদধূলি গ্রহণ করলেন।আচার্যের ললাটে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।তাঁর মুখের অভিব্যক্তি দুর্বোধ্য। গম্ভীর স্বরে বললেন,"কার কাছে শিখলে এই বিদ্যা?তোমার অস্ত্রগুরু কে?"
একলব্য ধন্য অনুভব করলেন।আজ পর্যন্ত যাঁকে ধ্যান করেছেন দেবমূর্তির মত,সেই আচার্য আজ সামনে।তাঁকে সম্বোধন করে কথা বলছেন,তাঁর চোখে চোখ রেখে।কৃতার্থ গলায় একলব্য বললেন,"হে আচার্য,আপনি আমার অনুপ্রেরণা।আপনার মূর্তিকে সামনে রেখেই অভ্যাস করেছি।"
দ্রোণর আয়তচোখে শীতল কুটিলতার ছাপ পড়েই মিলিয়ে গেল।তিনি নিজের মনের ছাপ মুখে পড়তে দেন না।ওষ্ঠাধরে স্মিত হাসি ফুটিয়ে বললেন,"তাহলে তো আমার একটা গুরুদক্ষিণা প্রাপ্য হয় বৎস্য।"
-"আদেশ করুন আচার্য। "নতমুখে বললেন একলব্য।

দ্রোণাচার্য কিছুক্ষণ পর তাঁর গুরুদক্ষিণা গ্রহণ করে স্হানত্যাগ করলেন।পিছনে পড়ে থাকা শারীরিক ও মানসিক ভাবে রক্তাক্ত তরুণের দিকে ফিরেও দেখলেন না।এই তরুণটি কিন্তু অশ্বথ্বামার সমবয়স্ক,যে অশ্বথ্বামাকে রাজপুত্ররা সামান্য বিদ্রূপ করায় তিনি ক্রোধাগ্নি সংবরণ করতে পারেননি।তবে ব্রাহ্মণসন্তানের সাথে কি আর মানবেতর শূদ্রসন্তানের তুলনা হয়!
ঠিক তখন ২০১৬ র সেই নীরব দর্শক তরুণী মহাকাব্যে উপেক্ষিত একলব্যের কাছে এগিয়ে এল।তারপর একলব্যকে বুকে টেনে নিল।পৃথিবীর উষ্ণতম বন্ধুত্বের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বলল,"কমরেড।"
এই আলিঙ্গন নারীপুরুষের প্রেমস্পর্শ বা যৌনগন্ধী আলিঙ্গন নয়।এই আলিঙ্গন কমরেডশিপের আলিঙ্গন,এই আলিঙ্গন ভাইকে ভগিনীর সমানুভূতি জানানোর আলিঙ্গন।তরুণীটি একলব্যকে বলল,"ক্ষমতার অলিন্দের মানুষরা সাব অল্টার্নের আপন হয় না কমরেড।নিজের রক্ত যদি ঝরাতেই হয় ওদের হয়ে নয়,ওদের সিংহাসন থেকে টেনে নামানোর প্রতিরোধ গড়ে তুলে ঝরাও।আজ তোমার রক্তের নামে শপথ রইল,দ্রোণাচার্যকে তোমার প্রতিটা রক্তবিন্দুর মূল্য শোধ করতেই হবে।"

 

পর্ব ২

কাজল ভট্টাচার্যের কথা

বিষয়টা পুরোটাই একটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল।মানে আমার জীবনশৈলী বা সামাজিক অবস্হান যা তাতে এটা কোনো ভাবেই হবার ছিল না।তবে এই ধরণের ঘটনা কবেই বা নিয়ম মেনে ঘটে।
ওকে প্রথম কবে দেখেছি আমার মনে নেই।সেকেন্ড সেমেস্টার পর্যন্ত ক্লাসে প্রায় দুশো'র কাছাকাছি স্টুডেন্ট থাকায় আলাদা করে কাউকে লক্ষ করা কঠিন।একদিন গ্যালারি থেকে একটা সুন্দরী মেয়ে আমাকে র‍্যাশনাল এক্সপেকটেশন নিয়ে একটা প্রশ্ন করেছিল।উঠে দাঁড়ানোর সময় তাকে দেখেছিলাম,কালো জামা,সবুজ স্কার্ট আর ঈষৎ লালচে খোলা চুলের একটা ফর্সা সুন্দর মেয়ে।ওটা কি ও ছিল!হতে পারে।মোট কথা সেভাবে দাগ কাটার মত কিছু ঘটেনি।ওকে কাছ থেকে প্রথম দেখি পলিটিকাল ইকোনমির ক্লাসের দিন।চোখে পড়তেই হত কারণ মাত্র তিনটে স্টুডেন্ট ছিল,অপর্ণা, ও আর একটা ছেলে,বোধহয় বিষ্ণু নাম।খুব ব্রিলিয়ান্ট না হলে বা উল্লেখযোগ্য গোলমাল না করলে ছেলেদের কথা আমার বড় একটা মনে থাকে না।ওকে দেখতে ছিল অনেকটা স্কুলের মেয়েদের মত। মিজেট।ছোটখাট চেহারা,হাইট পাঁচ দুই এর বেশী কোনভাবেই হবে না।গায়ের রঙ উজ্জ্বল হলুদ।মুখটা মাঝে মাঝে বেশ গোলাপি দেখাত।মানে কোন কারণে ও এমব্যারাসড বা অপমানিত বোধ করলে।আর এটা দেখার জন্যই আমার ওকে অস্বস্তিতে ফেলতে বেশ ভাল লাগত।
রূপের নানারকম উপমা ব্যবহার করা হয়।চোখ ধাঁধানো,চুম্বক,চোখ ফেরানো যায় না-ইত্যাদি ইত্যাদি।যাই হোক একই রূপকে কে কিভাবে দেখবে এটা সাবজেক্টিভ।আমার মতটা বলি।ওর ক্ষেত্রে ওর রূপটা ছিল ঠিক ওর নামের বিপরীত।একটা মানুষ যে শুধু চেরাপুঞ্জির হাজার বছরের বর্ষার সমষ্টিতে তৈরী হয়েছে।বা প্রাচীন ভারতের অজানা কোনো গহন মন্দিরের সবচেয়ে বিষাদগ্রস্তা দেবদাসীর চোখের জল দিয়ে।ওর নাম ছিল তৃষ্ণা,তৃষ্ণা চ্যাটার্জী।পৃথিবীর বুকের স্নিগ্ধতম আগুন।শুধু কি পৃথিবীর বুকেরই!
কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা হবার কথা ছিল না।ঐ মেয়েটা,চিরাচরিত বাংলা মাধ্যমের মেয়েগুলো যেমন হয় আর কি!ইংরাজীর উচ্চারণ ক্ষেত্রবিশেষে বেশ পূর্ববঙ্গীয়দের মত,এমনকি দু একবার বানান পর্যন্ত ভুল করতে দেখা গেছে।যেমন এম ফিল বানানে দুটো এল ব্যবহার করা!তারপর ভদ্রতাবোধের চূড়ান্ত অভাব।মাঝে মাঝে ওর স্বরটা রীতিমত কন্ডেসেন্ডিং শোনাত।
ততোধিক খারাপ ড্রেস সেন্স(একটা সুন্দরী মেয়ের পোশাক দেখে যদি হাড়গিলে মূর্খ খুনী চারু মজুমদারকে মনে পড়ে তাহলে নান্দনিকতার প্রতি এর চেয়ে বড় অবিচার হয় না)এবং নিহিলিস্ট পলিটিকস তথা ফাটকা মস্তানির প্রতি বিচিত্র আকর্ষণ।ওকে ওর গুরুদেব চারু মজুমদারের মত একটা ডগম্যাটিক লেফটিস্ট ছাড়া আমার কিছুই মনে হত না।মানে খুবই গণ্ডগোলের আপ ব্রিঙ্গিং এর ফল।ওকে যারা কাছ থেকে দেখেছে তাদের একটা বিষয় ফোরকাস্ট করতে অসুবিধা হবার কথা নয়।এ মেয়ে হয় কোনো জঙ্গলে কুত্তার মত গুলি খেয়ে মারা পড়বে অথবা শেষ জীবনটা জেলে পচবে।ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।পুরোপুরি হোপলেস কেস।আসলে চ্যালারা তো গুরুর পথেই হাঁটবে।তবে ও যখন প্রথম আমার মানসিক অশান্তির কারণ হয়,তখন এত সব জানা ছিল না।
ব্যাপারটা কবে থেকে শুরু হয়েছিল ঠিক মনে নেই।এটা একটা দুর্ঘটনা।একটা ডেলিশাসলি অ্যাট্রাকটিভ দুর্ঘটনা।ও ক্লাসে রোজ একটা ট্যাব বা কিন্ডল গোছের কিছু নিয়ে আসত।তাতে সিলেবাস এবং রেফারেন্স বইয়ের সফট কপি থাকত।ঐ ট্যাব থেকে আমাকে একটা বই দেখাচ্ছিল।এত দ্রুত পাতাগুলো সরিয়ে দিচ্ছিল যে ভারি পাওয়ারের চশমায় আমার দেখতে অসুবিধা হচ্ছিল।আমাকে চশমাটা খুলে ওর কাঁধের উপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখতে হচ্ছিল।ও বসে ছিল বেঞ্চে,আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।হঠাৎ করে একটা মেয়ের বয়সী ছাত্রীর সাথে এতটা নৈকট্য অস্বস্তিকর।তার উপর আমাকে ঝুঁকে থাকতে দেখেই বোধহয় ও একটু গুটিয়ে সরে যাচ্ছিল।এটা নিয়ে আমার দীর্ঘদিন অস্বস্তি ছিল।ও কি মনে করে আমাকে?আমি একটা পারভার্ট?ইচ্ছা করে ওর শরীর ছোঁয়ার চেষ্টা করছি?আমার অাভিজাত্যের সঙ্গে হয়ত চিন্তাটা মানানসই নয়,তাও আমি জানি ডিপার্টমেন্টের প্রচুর ছাত্রী আমার একটু প্রশ্রয় পেলে ধন্য হয়ে যায়।সেখানে ও?পড়াশোনায় এমন কিছু নয়।তেমন আহামরি সুন্দরীও নয়।আমার টেস্ট এত নিম্মস্তরের নয়।ওকেও তাই প্রতিদিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিই অপর্ণাকে আমি সবচেয়ে বেশী পছন্দ করি।একই প্রশ্নের উত্তর অপর্ণার থেকে পেলে প্রশংসা আর ওর ক্ষেত্রে না শোনার ভান।তাছাড়া পলিটিকাল ইকোনমির ক্লাসে অন্তত গোটা থার্ড সেমিস্টারটা আমি ওর অস্তিত্বটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করতাম।কে না জানে অবজ্ঞাও একটা বার্তা।তার জন্য আলাদা করে রূঢ় হবার দরকার হয় না।কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওর প্রতি আমার এই নিষ্পৃহতাটার বিষয়ে আবার ও চরম নিষ্পৃহ ছিল।অবশ্য জানি না ওটা অভিনয় ছিল কিনা!
পড়াশোনার কথা বলতে গেলে অ্যাকাডেমিক রেকর্ড তৃষ্ণার সবচেয়ে ভাল,তবে এই ক্লাসে তিনজনেই ভাল পড়াশোনা করে।যাই হোক,বিষ্ণু কি করল সেটা প্রাসঙ্গিক নয়।
কোথায় যেন একটা চাপা উন্নাসিকতা রয়েছে তৃষ্ণার মধ্যে।আমার কেবিনে কখনও এলে আমাকে একটা বাড়তি কথা বলতে দেয় না।যান্ত্রিক ভাবে কাজের কথাটুকু বলেই একটা যাই যাই ভাব।যেন কত ব্যস্ত।ঠিক আছে,কুকুরের ঘি সহ্য হয় না।আমার হাতে দুটো পেপারের মার্কস আছে,আর এটা একটা বোকাও জানে যে মাস্টার্সের সময় নাইনথ পেপার বলে একটা জিনিস থাকে।শুধু পড়াশোনা করেই কেউ ভাল রেজাল্ট করে না। 
ও আমাকে সবচেয়ে বেশী অফেন্ড করে বসল থার্ড সেমেস্টারের শেষ ক্লাসটার দিন।ওটা ছিল মার্কসিয়ান ইকোনমির ক্লাস।এই ক্লাসে মোট আঠেরো জন ছাত্র ছাত্রী আছে,পলিটিকাল ইকোনমি ক্লাসের মত জনশূন্য নয়।
ডিসেম্বরের ঠান্ডার মধ্যেও ও একটা পাতলা লুজ ল্যাভেন্ডার টি শার্ট পরে বসেছিল।কোন শীতবস্ত্র নেই।রোজকার মতই এলোমেলো খোলা চুল,চেহারায় ন্যূনতম মেক আপ বা জুয়েলারির চিহ্ন মাত্র নেই।একটুকরো গোলাপি আলোর মত স্বপ্নালু দেখাচ্ছিল ওর ঢলঢলে মুখটা।ঐ ঠান্ডার মধ্যে ক্লাসের কিছু ছেলেমেয়ের প্রবল আপত্তি অগ্রাহ্য করে ও এসির টেম্পারেচারটা কমানোর চেষ্টা করছিল।ব্যাপারটা আমার চোখে পড়ায় আমি প্রশ্রয়ের হাসি হেসে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।ও আমাকে পাত্তা না দিয়ে এসি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
বাইরের কেউ শুনলে ভাববে এটা সামান্য ব্যাপার।অন্তত আমার মত বয়স্ক লোকের মাথা ঘামানোর মত কিছু নয়।কিন্তু ওর এই নীরব উন্নাসিকতাটা আমায় কাঁটা ফোটাচ্ছিল অনেকদিন ধরে।সেদিন ওটা চরমে পৌঁছে গেছিল।এত স্পর্ধা হয় কি করে!কি মনে করে আমাকে!আমি ওর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি?আমি ঠিক করেছিলাম ওর যোগ্যতা আমি ওকে মার্কশিটে দেখিয়ে দেব।

পর্ব ৩

তৃষ্ণার কথা

Deification একটা অস্বাস্থ্যকর ঘটনা।যেই মুহূর্তে একটা মানুষের দেবত্ব সামাজিক ভাবে তৈরী হয়,ধূপের ধোঁয়ার আড়ালে চাপা পড়ে যায় একটা অপ্রেশনের ইতিহাস।এই ইতিহাস শুধু চাবুক হাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তৈরী করে না,বা রাষ্ট্রশক্তি তৈরী করে না।এই ইতিহাস তৈরী হতে পারে যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে,যে কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে।এমনকি যদি ঐ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চলতি সিস্টেমের বিরুদ্ধে সরবে বিদ্রোহী হয়,তাও।
প্রায় একবছর হতে চলল,ঘটনাটার কথা আমি দু একজন বিশেষ কারোর সাথে শেয়ার করে উঠতে পারিনি।এ প্রসঙ্গে নাৎসি চিকিৎসক ডাঃ মেঙ্গেলের একটা কথা খুব প্রাসঙ্গিক, "The more we do to you,the less you seem to believe we are doing it."

খুব স্নেহপ্রবণ ফাদারলি একজন অধ্যাপকের মুখোশের আড়ালে একজন নার্সিসিস্ট লুকিয়ে থাকতে পারে।তারা ভদ্রতা ও আভিজাত্যের মূর্ত প্রতীক হতে পারে,তারা জ্ঞানী ও প্রতিভাবান হতে পারে।কোনো প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেয়েরা তার পায়ের নীচে নিজের হৃদয় বন্ধক দিয়ে বসে থাকতে পারে।কিন্তু তাতেও তার ভিতরের জম্বিটা মরে যায় না।একজন নার্সিসিস্ট আসলে একটা মুখোশ,এবং এই মুখোশের আড়ালে কারোরই অস্তিত্ব নেই।একটা মানুষ চোখের সামনে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে,কিন্তু আসলে সে নেই।যেটা আমরা দেখছি সেটা একটা মরীচিকা মাত্র।এই চিন্তাটাই কিরকম মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে বরফের স্রোত নামিয়ে দেবার মত নয়?

আবার ভয়টা উলটো দিকেও কাজ করে।ওদের এই নেতিবাচক উপস্হিতিকে কেউ পড়ে ফেলল কিনা এটা নিয়ে ওরা সবসময় সন্ত্রস্ত থাকে।শেষের দিকে কাজলবাবুকে হয়ত এই কারণেই আমার চোখের দিকে সোজা তাকাতে বেশ পরিশ্রম করতে হত।

কে বিশ্বাস করবে আমার কথা?যখন হাওয়ার মত ঘটনাপ্রবাহে ভেসে যাচ্ছিলাম,তখন আমি নিজেও কি বিশ্বাস করতে পারছিলাম এটা হতে পারে!বারবার এটা মনের ভুল ভেবে নিজেকে স্তোক দেবার চেষ্টা করেছি,পরমুহূর্তেই ঐ লোকটা আবার একটা ধূমকেতুর মত আমার রাস্তা আড়াল করে দাঁড়িয়েছে।
পরিচিতি,খ্যাতি,ক্ষমতা সব ঐ লোকটার হাতে।এমনকি আমার বন্ধুদের থেকেও আমি সমর্থন পাওয়ার বিশেষ আশা রাখি না।পেয়ে গেলে সেটা বাড়তি পাওনা।একজন সুপ্রতিষ্ঠিত,অভিজাত,বিদেশী ডিগ্রীধারী অধ্যাপক।ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয়।আমাদের মত ছেলেমেয়েদের চোখে প্রায় দেবত্বপ্রাপ্ত একটা ফিগার।ক্রাসাস কি কখনও হাওয়ার্ড ফার্স্টের ভেরিনিয়াদের নিয়ে ভাবার অবকাশ পেতে পারেন!
লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে কেন মুচকি মুচকি হাসছিল আমি তখন বুঝতে পারিনি।লোকটার কি সত্যিই মাথায় ছিট আছে।আমি ভাবলাম বোধহয় আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে না।ও আমার সাথে তখনও পর্যন্ত কোনদিন অভদ্র ব্যবহার করেছে বললে মিথ্যে বলা হবে,তবে কাজের বাইরে কখনই কথা বলত না।যদিও মার্ক্সিয়ান ইকোনমি বা পল ইকোর অন্য ছাত্রছাত্রীদের বেশ ছোটখাট ইয়ার্কি করার মত সদ্ভাব ছিল।আমি সেটা লক্ষ করলেও তখন পর্যন্ত তেমন তলিয়ে ভাবিনি।তাই ভেবেছিলাম বোধহয় কোনো কারণে পিছনের বেঞ্চের কাউকে দেখে হাসছে।মোট কথা হাসিটা রেসিপ্রোকেট করার কোনো কারণ দেখিনি।অনেক পরে বুঝেছিলাম লোকটা আমার একটু অ্যাটেনশনের জন্য পাগল ছিল।
সত্যি কথা বলতে কুত্তাঞ্জনকে প্রথম থেকে আমি বিশেষ পছন্দ করতাম না ঠিকই,তবে এতটা ঘেন্নাও করতাম না যতটা এখন করি।বরং আগে অপছন্দ করলেও থার্ড সেমের সময় বেশ পছন্দই করতাম।কুত্তাঞ্জন নামটাও অনেক পরে দেওয়া।নামটা ওকে একবার জানানো গেলে চমৎকার হত।
ওকে প্রথমদিকে অপছন্দ করার কারণ ছিল ওর ফিউডাল মানসিকতা। এবং কিছু ন্যাকামো।যেমন একদিন ক্লাসে একটা অঙ্ক দেওয়ার পর সবাই কথা বলতে থাকায় রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে আসা এবং তারপর ক্লাস রেপ্রেজেন্টেটিভরা 'মান ভাঙাতে' ওর কেবিনে গেলে "আমি কোনদিন তোমাদের সাথে কথা বলব না।" বলে ওদের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া।কিরকম সুয়োরানীর গোঁসাঘরে খিল দেওয়ার মত ব্যাপার না?
তারপর একদিন ক্লাসে একটা বাল্ব খারাপ হয়ে যাওয়ায় একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীকে ডেকে বলা,"এইচ ও ডি কে এখানে আসতে বল।বলবে আমি ডেকেছি।"যদিও শেষ পর্যন্ত এইচ ও ডি স্যর আসেননি।দৈর্ঘ্যে ও প্রস্হে তাঁর অর্ধেক একজন ইলেকট্রিশিয়ানকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।কুত্তাঞ্জন বেশ বিব্রত হয়ে পড়েছিল আমাদের সামনে।অথচ এই লোকটাই আবার থার্ড ও ফোর্থ সেমে মার্ক্সবাদ পড়ায়।নিজের চা'টা পর্যন্ত আনায় ছাত্রদের দিয়ে,এঁটো ফাঁকা গ্লাসটাও তাদের হাতে করে নীচে পৌঁছে দিতে হয়।এই দ্বিচারিতাগুলোর কারণেই লোকটাকে ভাল লাগত না।আসলে মানুষকে ছোট করে কিছু লোক একটা বিচিত্র আনন্দ পায়।সম্মানবোধটা কি এতটাই ঠুনকো যে সেটা অন্যকে খাটো করার উপর দাঁড়িয়ে থাকে!

একজন কোভার্ট ম্যাল-অ্যাডাপটিভ নার্সিসিস্টের যা যা লক্ষণ দেখা যায় তার অন্তত পঁচাশি ভাগ তাঁর মধ্যে উপস্হিত ছিল।এই ক্যাটিগরির একজন নার্সিসিস্টের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল ছদ্মবেশ।কাজলবাবুর ইন্টেলেক্ট,উইট,আপাত নিশ্ছিদ্র আত্মবিশ্বাস, নিজের অ্যাপিয়ারেন্সের বিষয়ে অতিরিক্ত সচেতনতা যেটা ডাঃ মেঙ্গেলেকে মনে করায়…..অতুলনীয় মানে সত্যিই অতুলনীয় পড়ানো-মানে পুরোটা মিলিয়ে একটা আপাত সৌম্য এবং চার্মিং ব্যক্তিত্বের মুখোশ যা সামনের মানুষটার মনে সম্ভ্রম তৈরী করবে।
আবার সেই সাথে আত্মকেন্দ্রিকতা, অতিরিক্ত মাত্রায় ভাবমূর্তির ব্যাপারে সচেতনতা,অন্যদের নিজের অধস্তন ভাবার প্রবণতা(সে কোলিগ হোক বা ছাত্রছাত্রী), কর্তৃত্বপরায়ণতা-যেগুলো একরকম সাম্যবাদী পরিবেশে বড় হবার কারণে আমার খুব দৃষ্টিকটূ ভাবে চোখে পড়ত।তবে দাড়িবুড়ো আর বাহাত্তরে খুন হওয়া সেই প্রশ্ন করতে শেখানো হেঁপো রুগীকে যদি মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে পেনিট্রেট করতে না দেওয়া হয় তবে এই ব্যাপারগুলো চার্মের আড়ালে ঢাকা থাকবে।অবশ্য ততক্ষণই যতক্ষণ না সামনের মানুষটা ওঁর চোখে পড়ছে এবং মাথায় গেঁথে যাচ্ছে।যদি সেটা না হয় তবে ভদ্রলোক আপনার চোখে মাস্টারদা সূর্য সেন হয়ে থেকে যাবেন সারাজীবন। কিন্তু সবসময় ভাগ্য এতটা সদয় হয় না।কেউ কেউ ওঁর মস্তিষ্কে গেঁথেও যেতে পারে।আমার চোখেও একদিন উনি সূর্য সেন ছিলেন।
ঐ কারনেই একজন কোভার্ট নার্সিসিস্ট তার ওভার্ট কাউন্টারপার্টের তুলনায় বেশী বিপজ্জনক।দুপ্রকারই মারাত্মক এক্সপ্লয়টেটিভ,কিন্তু একজন কোভার্ট নার্সিসিস্টকে চেনা যায় না।এরা খুব সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর ভাবে তোমার মানসিক স্বাস্হ্যের ক্ষতি করবে।আপাতদৃষ্টিতে একজন কোভার্ট নার্সিসিস্ট অত্যন্ত ভদ্র ও সংবেদনশীল মানুষ হিসাবে প্রতিভাত হবে,কিন্তু তার সরীসৃপের মত শীতল সত্ত্বাটা একমাত্র ভিক্টিম উপলব্ধি করবে।এরা পছন্দের ভিক্টিমকে নিয়ন্ত্রণ করতে দরকার মত স্নেহ ও আবেগের মিসাইল প্রয়োগ করবে।কাজলবাবু কোভার্ট নার্সিসিস্ট ছিলেন,খুব সুন্দর শান্ত গ্রীনারির আড়ালে লুকোনো বিষধর সাপের মত।

পর্ব ৪

কাজল ভট্টাচার্যের কথা

পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিন মার্ক্স ও পল ইকোর ছাত্রছাত্রীদের ইন্টারনালের পেপার জমা দিতে আসার কথা ছিল।এই দিনটা আমি ইচ্ছা করে ওদের আসতে বলেও গেলাম না।ওরা জমা দিতে এসে ফিরে যাবে।কাউকে ফিরিয়ে দেবার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ আছে।এতে হুট করে কেউ তোমায় সহজলভ্য ভেবে বসবে না।আমার এই ইমেজটা একদিনে তৈরী হয়নি।এটা বিজ্ঞাপনের যুগ,লোকে তাই দেখবে তুমি যা তাদের দেখাবে।আমি কি সব্যসাচীবাবুর মত নাকি?বেশী ছাত্রদরদী হবার চেষ্টা করতে ভদ্রলোককে নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা হাসাহাসি করে।
আচ্ছা তৃষ্ণাও নিশ্চয়ই আমার খোঁজে এসে ফিরে গেছে।তখন কি ওর একবারের জন্যও মনে হয়নি স্যর আজ এলেন না কেন!
পরদিন দুপুরে আমি কেবিনের দরজা বন্ধ করে বসে একটা পর্ন দেখছিলাম।বাড়ীতে মেয়ের সামনে এগুলো দেখা যায় না।এটা একটা রেপ পর্ন,একটা বছর কুড়ির শ্বেতাঙ্গী মেয়েকে একটা পঞ্চাশোর্ধ প্রৌঢ় জান্তবভাবে অধিকার করছে।মেয়েটা যন্ত্রণায় ছটফট করছে,চোখ থেকে নিঃশব্দে জল পড়ছে।অথচ একফোঁটা বাধা দিচ্ছে না।দাঁতে দাঁত চেপে ওর বাহুবন্ধনে থেকে নিঃসাড়ে সহ্য করছে যৌনপ্রহার।লোকটার অবশ্য একটুও মায়া হচ্ছে না।
মেয়েটার চুলের রঙ লালচে বাদামী,ভীষণ সুন্দর ক্রিস্টালের মত কৃষ্ণোজ্জ্বল চোখ।আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল ভাল লাগায়,একটা পাগল করা উত্তেজনায়।অস্ফুটে আমার নিজেরও অজান্তে আমি বলে উঠলাম,"তৃষ্ণা।"
উফ একবার ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার।আর কতদিন এভাবে চলবে!আমার এই মেঘটা কি কোনোদিন তৃষ্ণার মধ্যে বৃষ্টি নামাতে পারবে না!
হঠাৎ আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল।দরজার বাইরে তৃষ্ণার গলা।ও দরজাটা ধরে বাইরে থেকে টানাটানি করছে।
আমি দ্রুত ব্রাউসার ক্লোজ করে ট্রাউজারের জিপার বন্ধ করলাম।নিজেকে সামলাতে একটু সময় লাগল।তখনই আবার ওর গলা কানে এল,কাউকে একটা বলছে,"দরজাটা খুলছে না কেন বলতো!"
দরজায় নক করার সেন্স অফ ডিসেন্সিটুকুও নেই।আমি উঠে দরজা খুলে দিলাম।
-"স্যর আমরা প্রোজেক্ট জমা দিতে এসেছি।"
ওকে দেখে আমার মুখ থেকে কোনো কথা বেরোল না।ইঙ্গিতে টেবিলটা দেখিয়ে তার উপর রাখতে বললাম।ওর পিছনে বিষ্ণুও ঘরে ঢুকল।আমি বিষ্ণুকে মধুর গলায় বললাম,"তোমার যেন কি টপিক ছিল?"
কিছুক্ষণ বিষ্ণুর সাথে কথা বললাম তারপর।তৃষ্ণা আশা নিয়ে তাকিয়েছিল ওকেও কিছু বলব।বললাম না দেখে বেরিয়ে গেল।আমার ওকে ঝুল দিয়ে একটা পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছিল।আগের দিনের নখরাটার আংশিক শোধ নেওয়া গেছে।তবে একটু হতাশও হলাম,ভেবেছিলাম ও আরেকটু বেশী সময় দাঁড়াবে।যাক গে,এখনও অনেক কিছু বাকি আছে সুইটি।জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ।

পর্ব ৫

তৃষ্ণার কথা

কাজলকে শুদ্ধ ভাষায় বলা হয় অঞ্জন।আর একজন ডগ লাভার হিসাবে বলছি আমি কুকুরকে কুত্তা মনে করি না।কুকুর মানুষের থেকে অনেক ভাল।কুত্তা হচ্ছে অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের চরিত্রহীন দুর্নীতিপরায়ণ একজন মানুষ।সেখান থেকে কুত্তা আর কাজলের জায়গায় অঞ্জন – মিলে হচ্ছে কুত্তাঞ্জন।অাচ্ছা আমাকে কেউ অপছন্দ করলে কি নাম দেবে?কুত্তৃষ্ণা?
অপর্ণার সাথে কুত্তাঞ্জনের কিছু একটা আছে।আমার সঙ্গে অপর্ণার একটা রেষারেষির সম্পর্ক তৈরী করতে কুত্তাঞ্জন ওকে নিয়ে যে আদিখ্যেতা করে আমি সেটার কথা বলছি না।ব্যাপারটা আরো গভীর কিছু।এবং সম্ভবত আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত। 
থার্ড সেমের পরীক্ষা শুরু হবার পর থেকেই কুত্তাঞ্জন আমাকে দেখলে উদ্ভট আচরণ করছে।ঐ সময়ের কথা যখন হচ্ছে কুত্তাঞ্জন না বলে কেবিএইচ বলি।কিংবা কাজলবাবু।কারণ তখন আমি ওকে কুত্তাঞ্জন নামে ডাকতাম না।
কাজলবাবু কোনো কারণে আমার উপর অফেন্ডেড হয়েছেন বুঝতে পারছিলাম।লাস্ট ক্লাসের দিন লেকচার চলাকালীন আমার দিকে চোখ পড়লেই কিরকম সমমেরুর চুম্বকের মত লাফ দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিলেন।মানে আলাদা করে ঘাড়টায় একটা লম্ফ তরঙ্গ দেখা যাচ্ছিল।কারণটা পরে নিজেই অনুমান করলাম।ওঁর হাসিটা দাঁত কেলিয়ে রেসিপ্রোকেট না করার জন্য।আচ্ছা ঝামেলা তো!বুড়োর এ কি ভীমরতি!
কাজলবাবু গোটা থার্ড সেমের ছ মাস বেশ ভদ্র হয়ে ছিলেন।মানে ভীষণ ফ্রেন্ডলি এবং ফাদারলি একজন মাস্টারমশাই। কোনো প্রশ্নেই বিরক্ত হন না।একেবারে মাটির মানুষ।এই লোকটাই ফার্স্ট সেমিস্টারের সময় অত ঘ্যাম নিয়ে চলত!দেখলে বিশ্বাসই হয় না।যে কোনো সমস্যা হলে ওঁকে গিয়ে বলা যেত।যদিও অপর্ণার প্রতি একটা পক্ষপাতিত্ব ছিল,কিন্তু সেটা কখনও দৃষ্টিকটূ হয়ে ওঠেনি।এক একজন শিক্ষক কোনো বিশেষ ছাত্রকে পছন্দ করতেই পারেন।তাই বলে আমাদের সাথে তো আর কোনো বৈষম্য করছেন না।মোটকথা পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর আগে অব্দি আমার এটা নিয়ে কোনো ক্ষোভ ছিল না।
যেদিন আমি আর বিষ্ণু টার্ম পেপার জমা দিতে গেলাম,উনি খুবই অদ্ভুত আচরণ করলেন।আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বিষ্ণুর সাথে গল্প করলেন।বছর তিনেক আগে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকা এরকম করলে আমার অভিমান হত।কিন্তু এই মুহূর্তে কেন জানি না হল না।বরং একটা বিচিত্র আতঙ্ক হল।আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কোর্স পড়ার সময় স্যররা বারবার বলতেন,"এম এসসি পড়ার সময় কোনো ফ্যাকাল্টিকে চটাবি না।"
কারণটা নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করার দরকার নেই।আমার মেনস্ট্রিম ইকোনোমিকস পড়তে ভাল লাগে না,ফার্স্ট সেমের রেজাল্ট খুবই খারাপ হয়েছিল।যাই হোক প্রত্যাশিত ভাবে রেজাল্ট খারাপ হওয়া একটা জিনিস।এখানে মার্ক্স আর পল ইকো যথেষ্ট লেবার দিয়ে পড়ছি।সত্যিই যদি লোকটা খাতায় মার গেঁড়ে** দেয়,আমার মাওবাদী হওয়া ছাড়া গতি থাকবে না।এমনিতে বাড়ীতে কলেজে পড়ার সময় থেকেই মা ভয়ে ভয়ে থাকে আমি যে কোনো মুহূর্তে বানপ্রস্থে গিয়ে বিপ্লবী হয়ে যাব।আমার চারু মজুমদার,চে,মারিগেল্লা আর নবারুণ ভট্টাচার্যের বইগুলোকে মা সহ্য করতে পারে না।
পরের পরীক্ষার দিনগুলোও কাজলবাবুর ন্যাকামি অব্যাহত রইল।প্রতিদিন আমাদের ঘরে গার্ড নিয়ে আমি ফার্স্ট বেঞ্চে বসা সত্ত্বেও আমাকে সবার শেষে কোয়েশ্চেন পেপার দেওয়া ও সবশেষে খাতা সই করা।একটা প্রশ্ন নিয়ে আমার ডাউট ছিল, সেটা জিজ্ঞেস করায় সবার সামনে বাধ্য হল বলে দিতে।কিন্তু এবার কিছু একটা করতেই হবে,তাই অপর্ণার কাছে গিয়েও নিজে থেকেই ওটা বলে এল।যদিও ও জানতে চায়নি,তাও।
লোকটা কিছু একটা গন্ডগোল করছে অনুমান করতে পারছিলাম।পরীক্ষার দিনগুলো রোজ আমাদের ঘরে গার্ড নিলেও আমার সাথে সরাসরি কথা বলছে না অথচ চোখ তুললেই দেখছি আমার দিকে তাকিয়ে আছে।অথচ একদিন হলে ঢোকার আগে অন্তত দুবার এরকম হল যে আমার সাথে আরেকটু হলে ধাক্কা লাগত।খুবই বিব্রত মুখে কেমন একটা চোর চোর ভঙ্গিতে সরে গেল।
ওর আসল শয়তানিটা আমি অনেক পরে বুঝেছিলাম।অবশ্য তখন আমার হারাবার কিছু ছিল না বলেই অতটা ডেসপ্যারেট হওয়া সম্ভব হয়েছিল।লোকটা ফোর্থ সেমের প্রথম ক্লাসের দিন এসেই জিজ্ঞেস করেছিল গান্ধী আর মার্কসের ডিসএনচ্যান্টমেন্ট ও এলিয়েনেশনের উপর লেখা আর্টিকলটা আমরা পড়েছি কিনা।এবং খুবই মধু ঢালা গলায়।কিছুদিন আগে যে পাগলামি করছিল তার চিহ্ন মাত্র ছিল না।এটার উপর পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল।অপর্ণা ওটা পড়ে যায়নি আমাকে জানিয়েছিল।আমিও শেষ মুহূর্তে একবার চোখ বুলিয়ে গেছিলাম।ক্লাস নোটসের সাথে মিলিয়ে উত্তর লিখতে তেমন অসুবিধা হয়নি।পল ইকোর ইন্টারনালের নম্বরটা আগেই কায়দা করে শম্পা ম্যাডামের হাত থেকে নিয়ে পুরোটা নিজের হাতে রেখেছিল।ওর চালাকিগুলো তখন একটাও বুঝিনি।
তুলনামূলক আর্টিকেলের প্রশ্নটায় আমি বলেছিলাম মোটামুটি পড়ে লিখেছি,এর একটা কারণ হচ্ছে আমি নিজের পড়াশোনা নিয়ে সবসময়ই বেশ খুঁতখুঁতে ছিলাম।আমার দুর্বলতাটা কায়দা করে কুত্তাঞ্জনের জেনে নেওয়া-এর সঙ্গে সঙ্গেই নির্ধারিত হয়ে গেছিল অপর্ণা পল ইকোর পেপারে হায়েস্ট পেতে চলেছে।পরীক্ষার পারফর্মেন্সের এখানে কোনো ভূমিকা নেই।অপর্ণা একটা ভুল করে ফেলেছিল, আমায় জানিয়ে দিয়ে যে ও পাঁচ নম্বর পুরো ভুল লিখেছে।তাতে কিছুই যায় আসে নি,শুধু কুত্তাঞ্জন যে ঘাপলাটা করেছে খাতা বেরোনোর পর সেটা আমি বুঝতে পেরে গেছিলাম।নার্সিসিস্টের বৈশিষ্ট্য হল তারা এতটাই ভদ্রভাবে আপনাকে প্রশ্ন করবে যাতে আপনি সরল মনে নিজের বিষয়ে অনেক কিছু জানিয়ে দেবেন।তারা সেই তথ্যটা সঞ্চয় করে রাখবে ও পরে আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে।ঠিক এটাই কাজলবাবু থার্ড সেমিস্টারের পরীক্ষার সময় আমার সাথে করেছিলেন।

পর্ব ৬

কাজল ভট্টাচার্যের কথা

একটা ভালো রেপ পর্ন খুঁজে বের করা যৌনসঙ্গমের থেকেও বেশী পরিশ্রমের কাজ।পর্নহাব, ব্রেজারস আরও প্রায় গোটা তিরিশেক ওয়েবসাইট ঘেঁটে আমি পছন্দ মত মাত্র দুটো পর্ন পেলাম।একটা সেদিনের ঐ তৃষ্ণার মত দেখতে মেয়েটাকে নিয়ে,অন্যটা একটা এগারো বছরের মেয়ে এবং একটা মধ্য চল্লিশের শ্বেতাঙ্গ লোকের।আমার সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিতে দশ বছর আগের তৃষ্ণা এবং আমি।দ্বিতীয় পর্ন ছবির যে ব্যাপারটা আমাকে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করছিল তা হল ব্লাড।একটা মেয়ের কৌমার্য ভাঙার গল্প। জেনিটাল এবং অ্যানাল ব্লিডিং এ বিপর্যস্ত মেয়েটা যখন সঙ্গম শেষে নেতিয়ে পড়েছে তখন লোকটা তার চুলের মুঠি ধরে নিজের উরুসন্ধিতে ওর মুখটা চেপে ধরে পুরো সাবস্ট্যান্সটা গিলতে বাধ্য করল।আমি তৃষ্ণাকে এই পজিশনে দেখতে চাই,আমার উরুসন্ধির সামনে নতজানু হয়ে বসা।ওর মত মেয়েদের এভাবেই ট্রিট করা উচিত।সামান্যতম অনুকম্পা পাওয়ারও এরা যোগ্য নয়।তৃষ্ণাকে আমি একটা সুযোগ দিয়েছিলাম।তাতে আমার যেচে কাদা মাখা ছাড়া কিছু লাভ হয়নি।ও যে বইটা খুঁজছিল তার পিডিএফ আমি কমন মেল আইডিতে পাঠিয়েছিলাম।এবং যা আমি কখনই করি না,অর্থাৎ ওর পার্সোনাল ইমেল আইডিতেও মেল করে দিই।একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি।মানে কোনো উত্তরই দেয়নি।শুধু ওর খাতা নষ্ট করা যথেষ্ট নয়,আমি আস্ত তৃষ্ণাকে ধ্বংস করতে চাই।ওর উপর শারীরিক বলপ্রয়োগ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।ওকে এমন জায়গায় নিয়ে আসতে হবে যাতে আমার কোনো কাজেই ও বাধা দেবার অবস্হায় না থাকে।এমনকি চরমতম নোংরা কোনো কাজেও না।ইস আজ থেকে দশ বছর আগে কেন আমার সাথে ওর দেখা হল না!অন্তত একটা ইনোসেন্স থাকত,এখনকার মত আমাকে প্রতি পদক্ষেপে এত বেশী সাবধানতা অবলম্বন করতে হত না।

-"আই হ্যাভ বট ইউ ফ্রম দ্য মার্কেট,নাউ ইউ আর মাইন।আয়াম ইওর মাস্টার,ইউ আর মাই স্লেভ।তোমার শরীরের উপর আমার একচ্ছত্র অধিকার,তুমি কি খাবে,কি করবে,বিয়ে করবে কিনা,সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স করবে কিনা,তোমার বাচ্চা হবে কিনা,তোমায় যৌন প্রয়োজনে ব্যবহার করব না অন্য কোন কাজে-এগুলো আমি ঠিক করব।"
কথা শেষ করে আমি পূর্ণদৃষ্টিতে তৃষ্ণার দিকে তাকালাম।আমি বসে আছি একটা বড় টেবিলে চড়ে,ও আমার সামনে একটা চেয়ারে।মুখের রঙ ক্রিমসন লাল,চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।আমি লুব্ধ দৃষ্টিতে ওকে ভাল করে দেখলাম।এই মুহূর্তে ওর লাল হয়ে ওঠা ফর্সা মুখের চেয়ে লোভনীয় ও সুস্বাদু আমার ওর শরীরের কোনো অঙ্গ – প্রত্যঙ্গকে মনে হচ্ছে না।এত সুন্দর দেখতে হলেও মেয়েটার ড্রেস সেন্স খুব খারাপ।জঘন্য লুজ ফিটিং ও কোঁচকানো লিনেনের শার্ট পরে আসে।শরীরের গঠন ভালো বোঝা যায় না।ওর ফ্যাশন আইকন সম্ভবত কোনো বুড়ো টিবি আক্রান্ত অতি বামপন্থী নেতা।আমি জানি ও ব্যাগে চারু মজুমদার নিয়ে ঘোরে।একবার চারুবাবুর একটা থিওরির ব্যাখ্যা আমার কাছে জানতেও চেয়েছিল।
আমি এই লেচারাস ডিসকাশনের সুযোগটা বেশ ভাল মত কাজে লাগালাম।বেশ অনেকক্ষণ আলোচনা চালালাম বিষয়টা নিয়ে।আলোচনা হচ্ছিল স্লেভারি এবং ফিউডাল সিস্টেম নিয়ে। গৃহস্হালীতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ফিউডাল সম্পর্ক গড়ে ওঠে এটা ছিল বিষয়।এবং আমার ডিবচারির উন্মুক্ত ক্ষেত্রও।যদিও আমি ইতিমধ্যেই উপলব্ধি করেছি যে প্রগলভতাটা একটু বেশী মাত্রায় হয়ে গেছে,তাই অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম।সম্প্রদানের সময় যে মন্ত্রটা স্বামী স্ত্রীকে বলতে হয়,সেটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হলেও ওকে বলতে বাধ্য করলাম।ঐ "যদিদং হৃদয়ং তব,ততস্তু হৃদয়ং মম।যদিদং হৃদয়ং মম,ততস্তু হৃদয়ং তব।"
পলিটিকাল ইকোনমির ক্লাসের সেদিনের মজাটা একস্ট্যাটিক ছিল।খুব ভাল হত যদি সময় ওখানেই থেমে যেত।বেরিয়ে এসে মনে হচ্ছিল এতটা বাড়াবাড়ি করা কি ঠিক হল!অবশ্য ক্লাসে মাত্র তিনজন স্টুডেন্ট। বিষ্ণু একদমই চুপচাপ আর অপর্ণার দরকার পল ইকোর খাতায় মলমূত্রাদি ত্যাগ করে এসেও হায়েস্ট মার্ক্স।ওর দাদা আমাকে বলেছে ওর ফার্স্ট ক্লাসটা তুলে দিতেই হবে।আগের সেমগুলোর মার্ক্স একদমই সুবিধার নয়।তাই যতই ক্লাসে মার্ক্সবাদ আর নারীবাদের তত্ত্ব পড়ানো হোক,এখানে তার যাপন সম্ভব নয়।একটা মেয়ে হিসাবে ও কখনই তৃষ্ণাকে সমর্থন করবে না।ক্লাসের মধ্যে যদি আমি তৃষ্ণাকে মোলেস্টও করি,অপর্ণা বাইরে গিয়ে একটা কথাও বলবে না।বরং তৃষ্ণা আমার দুর্নাম করার চেষ্টা করলে ও চিৎকার করে সেটা অস্বীকার করবে।ওর মোটা গলায় সিন ক্রিয়েট করার ও নিজের দিকে পুরো মনোযোগ টেনে নেওয়ার একটা চমৎকার ক্ষমতা আছে।তৃষ্ণার মত মৃদুভাষী মেয়ে আমার বিরুদ্ধে একটা কথাও দাঁড় করাতে পারবে না।অন্তত অপর্ণা থাকতে তো নয়ই।যদিও আমি ক্লাসের মধ্যে তৃষ্ণাকে মোলেস্ট করার কোনো পরিকল্পনা করছি না।এত বড় রিস্ক লাভার আমি নই।লোকাল মেয়ে,কাছাকাছি বাড়ী-সরাসরি ঝামেলায় যাওয়া ঠিক হবে না।আজকাল এমনিও যত্র তত্র অধ্যাপকদের ধরে পিটিয়ে দিচ্ছে বলে খবরে আসে।

 

পর্ব ৭

তৃষ্ণার কথা

কোনো ঘটনা একদিন ঘটলে সেটা কাকতালীয় বলা যায়।হয়ত এমনিই বলেছেন,আমারই বিষয়টা স্পোর্টিংলি নেওয়া উচিত।সেদিন পল ইকোর ক্লাসে কুত্তাঞ্জন আমার মৌখিক শ্লীলতাহানি করার পর আমি এটাই ভাবছিলাম।কিন্তু ঘটনাটা কাকতালীয় ছিল না।পরদিন হাউজহোল্ড ডোমেনের ফিউডালিজমের টপিকটা আবার মার্ক্সের ক্লাসে আলোচিত হয়েছিল।সেখানে কিন্তু কাজলবাবু একটুও ডিবচারি করেননি।একদম ক্লাস লেকচার যেমন হওয়া উচিত সেভাবেই বিষয়টা আলোচনা করেছেন।অতটা বাড়াবাড়ি মাত্রার এবং আপত্তিকর ভাষার প্র্যাকটিকাল উদাহরণ টানার দরকার পড়েনি।একটা সময় হঠাৎ আমাকে বললেন,"আচ্ছা কালকের ক্লাসে তুমি যেন কি একটা শ্লোক বলেছিলে?ওটা আবার বল।"
আমি চমকে উঠলেও সেটা প্রকাশ করলাম না।গ্যাসলাইটিং বলে ইংরাজীতে একটা কথা আছে।আমি সেটা তখন নিজের উপর প্রয়োগ করছিলাম অবচেতন ভাবেই।শ্লোকটা বললাম।"যদিদং হৃদয়ং তব…." চিরাচরিত বিয়ের মন্ত্র।
ভদ্রলোক পূর্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।আমার কেন জানি না চোখের দৃষ্টিটা ভাল লাগছিল না।
আমার বলা শেষ হলে বললেন,"এটা বাংলায় বলে দাও।"
আমি যথা সম্ভব সপ্রতিভ ভাবে বললাম,"যাহা তোমার হৃদয়,তাহা আমার হৃদয়।যাহা আমার হৃদয়, তাহা তোমার হৃদয়।"
ভদ্রলোকের মুখের অভিব্যক্তি দুর্বোধ্য, তবে দেখে মনে হল আমার হেনস্হাটা বেশ উপভোগ করছেন।আমি বিশ্বাস করি না দুদিন পরপর ঘটে চলা এই ঘটনাগুলো কাকতালীয় ছিল।যদিও নিজের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে ভোকাল হবার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি আমি জানি।ট্রিভিয়ালাইজেশন এবং গ্যাসলাইটিং।যেমন রায়ট ভিক্টিম বিলকিসকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা চলে আসলে কোনোদিন তার কোলের সন্তানকে খুন করা হয়নি।ধর্ষণের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।যেমন হলোকস্ট পরবর্তী যুগে নিও নাৎসীরা এসে হলোকস্টের ঘটনাকেই অস্বীকার করে।
বিষয়টা এই দুদিনে সীমাবদ্ধ ছিল না।আমার হাত থেকে একটা মার্কার পেন নিতে গেলেও আমার আঙুলগুলো না খিমচে ভদ্রলোক নিতে পারতেন না।আমাকে এমন কিছু বই পাঠাতেন যাতে আবশ্যিক ভাবে কিছু ভিনিরিয়েল কন্টেন্ট থাকত।আর আমি নিজেকে বোকার মত স্তোক দিয়ে যেতাম যা ঘটছে সব আমার মনের ভুল।বাবা মাকেও তখন জানিয়ে উঠতে পারিনি।কয়েকজন বন্ধুকে বলেছিলাম অবশ্য।
আমি ওঁর এই আচরণের কোনো ব্যাখ্যা পেতাম না।কি চাইছেন ভদ্রলোক!খুব সামান্য কারণেও আমার উপর অফেন্ডেড হতে দেখেছি।অনেক সময় কারণটা পর্যন্ত বোঝা যেত না।
একদিন সোমবারের ক্লাসে যেমন তাঁর নিজের লেখা একটা বই রেফার করলেন,সেটা লাইব্রেরিতে পাওয়া যাচ্ছে না জানানোয় বেশ উদ্ধত ভাবে বললেন,"কিছু করার নেই।"
এভাবে আগে কখনও কথা বলেননি।
সেদিন মার্ক্সিয়ান ইকোনমির ইন্টারনালের পেপারটার বিষয়ে একটা প্রশ্ন করার ছিল।ক্লাসে তার সুযোগ পাওয়া গেল না।তিনটে নাগাদ আমি ওঁর কেবিনে গেছিলাম।একটা বেশ অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
আমাকে দেখা মাত্র কাজলবাবু ঘাড় গোঁজ মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।আমি বার বার ডাকছি কোনো উত্তর নেই।ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটছিল।একটা উদ্গত চার অক্ষরের স্ল্যাঙকে জোর করে বেরিয়ে আসা থেকে নিরস্ত করলাম।
তখনই কাজলবাবু ঠান্ডা গলায় বললেন,"দিস ইজ নট আ গুড টাইম টু কাম।"
আমি পুরো ঘটনাতেই বেশ অবাক হচ্ছিলাম।কাজলবাবু আগে কখনও কোনো নির্দিষ্ট সময় বলে দেননি দেখা করার জন্য।যে কোনো সময়ে গেলেই কথা বলতেন।বললাম,"আচ্ছা ঠিক আছে,আমি বৃহস্পতিবার আসব।"
চলে যাচ্ছিলাম,কাজলবাবু আটকালেন।
-"কি বলছিলে বলে যাও।"
আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম এবার ভদ্রলোকের গলায় একটা অনুনয়ের সুর আছে।লোকটার কি সত্যিই মাথায় ছিট!
আমি প্রয়োজনটা জানালাম।
-"আজকে তো হবে না।তুমি কাল আসতে পারবে?"
-"না কাল আমার হবে না।"
-"কাল হবে না মানে?"অসন্তুষ্ট গলায় বললেন কাজলবাবু।
-"মানে কাল ক্লাসের পর সময় হবে না।"
-"তাহলে বুধবার?"ভদ্রলোকের গলা রীতিমত কাতর শোনাল।
-"না ঐদিনও সম্ভব নয়।আমি বৃহস্পতিবার আসতে পারব।"
-"আচ্ছা ঠিক আছে।"
এর মধ্যে আরো কিছু মজার ঘটনা ঘটল।বিষ্ণু তাঁর কেবিনে যাওয়ায় তার সাথেও খুব উদ্ভট ব্যবহার করেছেন।একবার মৃদুভাবে খেঁকিয়েছেন পর্যন্ত।বিষ্ণু আমাকে বলল,"স্যরের বোধহয় মুড খারাপ ছিল।"
অথচ মঙ্গলবার মার্ক্সিয়ান ইকোনমির ক্লাসে এসে খুব স্বাভাবিক ব্যবহার করলেন।কিছু প্রশ্ন করলেও খুব অমায়িক গলায় উত্তর দিলেন।একসময় লক্ষ করলাম হাসি হাসি মুখে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে পড়িয়ে যাচ্ছেন।
একবার আমাকে আদেশের গলায় বললেন,"হাউজহোল্ড লেবারের বইটা তোমার কাছে আছে।তুমি ওটা আপলোড করে দেবে।"
"না হাড়গিলে বুড়ো,কাল তুমি যা অসভ্যতা করেছ আমি তারপর তুমি যা বলবে সেটা করব না।বরং পারলে তার উল্টোটা করব।"আমি মনে মনে বললাম।এটাই সেই বই যেটা কাজলবাবু একবার কমন মেল আইডিতে পাঠিয়েও,আবার করে আমার পার্সোনাল আইডিতে মেল করেছিলেন।তারপর কিছুদিন কোনো কারণ ছাড়াই আমার উপর ক্ষেপে ছিলেন।সম্ভবত ধন্যবাদ না জানানোয়।কিন্তু ওঁকে কিছু পাঠালে উনিও তো ধন্যবাদ জানান না।তাই আমার মাথাতেই আসেনি যে আদৌ ধন্যবাদ জানানো উচিত।
বুড়োটা আবার বাঁদরামি শুরু করেছে।অভদ্রের মত আঙুল তুলে আমার সাথে কথা বলল।প্রায় আমার নাকটা ধরে ফেলেছিল।আমি কোনো উত্তর না দিয়ে ভুরু কুঁচকে কঠিন চোখে ওর দিকে তাকালাম।লোকটা কেমন একটা মুখ লুকিয়ে লাফ দিয়ে ঘরের অন্যপ্রান্তে চলে গেল।লেকচার চলাকালীন বাঁদরের মত লাফালাফি করে।একদিন অপর্ণার খাতা ফেলে দিয়েছিল।একদিন আমার পায়ে লাথি মেরেছিল।অথচ দুঃখপ্রকাশ করার ভদ্রতাটাও দেখায়নি।
অপর্ণা সোমবার আসেনি।অতঃপর ওর কোটাটা বাকি ছিল।
বৃহস্পতিবার আমাদের ক্লাসরুমে এসির সার্ভিসিং চলছিল।অপর্ণা সেটা কাজলবাবুকে জানাতে গিয়েছিল।ফিরে এল রেগে বেগুনী হয়ে।ওকে নাকি দেখা মাত্র দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছেন।এম ফিলের সৌম্যদা বলল,"এখন কেউ দোতলায় যাস না।স্যর গালাগাল করছে।"
বোঝো কান্ড।স্যর কি কুমড়োপটাশ যে ভয় পেতে হবে!আমি ঠিকই করে নিলাম আজ যদি ক্লাসে এসে ঝামেলা করে সোজা ওয়াক আউট করব।তারপর যা হয় দেখা যাবে।
কিন্তু সেরকম কিছু ঘটল না।কাজলবাবু ক্লাসে এসে অত্যন্ত বিগলিত কণ্ঠে সবার সাথে খেজুর শুরু করলেন।আমি দু একবার বেশ উদ্ধত গলায় কথা বললাম,তাও ওঁর বৈষ্ণবীয় বিনীত ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন হল না।আগের দিনের প্রশ্নটা করায় প্রথমে "কি বলছ?"
বলে আমার উপর এতটা ঝুঁকে পড়লেন যে আমাকে পিছিয়ে যেতে হল।তারপর আমি প্রশ্নটা রিপিট করায় বিনয়ের অবতার হয়ে কেবিনে যেতে বললেন। আমাকে দরজা নকও করতে হল না।আমার বিশ্রী নোংরা ডেনিমের জুতোটা দেখেই চিনতে পেরে আমাকে ভিতরে ডেকে নিলেন।এমনকি একটা ফোন আসায় আমার সঙ্গে কথা বলবার জন্য পরে ফোন করতে বললেন।

কাজলবাবুর মধ্যে কয়েকটা এমন অস্বাভাবিত্ব ছিল যেগুলো ঠিক সুস্হ মানুষের লক্ষণ নয়।যেমন আমাদের প্রতি ওঁর প্রত্যেকটা ফেভারে অ্যাপ্রুভাল আশা করে যাওয়া এবং না পেলে অস্বাভাবিক চাপা ক্ষোভ (যেমন আমার অনুরোধে উনি ক্লাসের সময় দু ঘন্টা পিছোনোর পর ধন্যবাদ না জানানোয় রেগে গিয়ে আবার ক্লাসটা একঘন্টা এগিয়ে দেন),
আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে এক মুহূর্তের জন্য সরলেই রীতিমত অসুস্হ বোধ করা।ক্লাসে কিছু ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলায়(হয়ত অঙ্কটা নিয়েই আলোচনা করছিল) ওঁর অদ্ভুত ভাবে অফেন্ডেড হয়ে বেরিয়ে যাওয়াটা ফার্স্ট সেমিস্টারের ক্লাসে বেশ দৃষ্টিকটূ মনে হয়েছিল।তাও এটা ততটা অস্বাভাবিকতার নজির নয়।থার্ড সেমিস্টারে পলিটিকাল ইকোনমির ক্লাসে আমি আর বিষ্ণু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম,মানে পড়ারই বিষয় তাই ভদ্রলোক সরাসরি কিছু বলতে পারছিলেন না,কিন্তু অদ্ভুত ভাবে ছটফট করছিলেন।মানে তাঁর ঐ মুহূর্তের শারীরিক মুভমেন্টের মধ্যে এমন একটা অস্হিরতা ছিল যেটা একমাত্র মানসিক রোগীদের মধ্যে দেখা যায়।আমি একদিন বিষ্ণুর কানে কানে একটা কথা বলায় সেটা জানা নিয়ে ওঁর আগ্রহটা রীতিমতো প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভনেসের পর্যায়ে পৌঁছে গেছিল।আমাদের যখন কোনো ইমেল পাঠাতেন,তার নীচে নিজের নাম না লিখে লিখতেন 'স্যর'।ক্লাসের শেষে কোনোদিন বোর্ডটা পর্যন্ত নিজে মুছতেন না,আমাদের মুছতে বলে বেরিয়ে যেতেন।যেহেতু উনি জানতেন আমি ওঁর কথা শুনব না,তাই একদিন নিজেকে দরজা বন্ধ করতে হওয়ায় সাংঘাতিক রেগে গিয়েছিলেন(যদিও মৌখিক ভাবে প্রকাশ করেননি,কারণ আমার সামনে সেটা করা অনেকটা পাথরে মাথা ঠোকার সমর্থক হত।)।রীতিমতো নিরাপত্তাহীনতায় না ভুগলে কারোর মধ্যে এই মাত্রায় সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স দেখা যায় না।যে কোনো একটা ঘটনা দিয়ে বিচার করলে হয়ত ব্যাপারটা এতটা অস্বাভাবিক লাগত না,কিন্তু যেহেতু ভদ্রলোককে খুব কাছ থেকে দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে তাই একটার পর একটা ঘটনা স্টাডি করে ওঁর মানসিক অসুস্থতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়েছে।
ওঁর আমার প্রতি আকৃষ্ট হবার কারণও সম্ভবত এই মনস্তত্ত্বই।যেখানে গোটা ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রী বিশেষ করে মেয়েরা ওঁকে বন্দনা করছে সেখানে একজনের নিষ্পৃহ থাকা উনি মেনে নিতে পারছিলেন না।উনি ঝামেলা শুরু করার আগে পর্যন্ত আমি কোনোদিন একবারের জন্যও ওঁকে অসম্মান করিনি।কিন্তু উনি তো শুধু গুরু শিষ্যা সম্পর্কে সন্তুষ্ট থাকতে চাননি!
আমার অনেক বান্ধবীই হয়ত আমার জায়গায় থাকলে প্রথম দিকে বেশ গর্বিত বোধ করত।ওঁর কাছ থেকে এই ধরনের অ্যাটেনশন পাওয়ার কারণে।কিন্তু টানা সাত আট মাস আমার এই মনোযোগটা পাওয়ার দুর্ভাগ্য হয়েছে বলেই ভুক্তভোগী হিসাবে বলতে পারি,এই ধরনের মনোযোগ যাতে কোনো মেয়েকে কোনো প্রতিষ্ঠানে না পেতে হয়।একজন নার্সিসিস্ট একটা প্রতিষ্ঠানকে তার হারেম বানিয়ে ফেলতে পারে,সে সেলিব্রিটি হতে পারে,তার ছবি জাতীয় বা অান্তর্জাতিক পর্যায়ের পত্রিকায় থাকতে পারে,কিন্তু তারপরেও সে বা তার মনোযোগ একজন ভিক্টিমের মানসিক স্বাস্হ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক।"রেসপেক্ট ইওর বেটার্স" প্রবাদে আমি বিশ্বাস করি না।কেউ যত উঁচু সিংহাসনেই বসে থাকুক তৃণমূলস্তরে থাকা একটা মানুষেরও ক্ষতি করার অধিকার তার নেই।দুঃখের ব্যাপার হল এই মার্ক্সবাদী শিক্ষাগুলো হাতে ধরে, যত্ন করে যে মানুষটা শিখিয়েছেন সেই মানুষটার নামই ডঃ কাজল ভট্টাচার্য।

 

পর্ব ৮

কাজল ভট্টাচার্যের কথা

প্রিয় তৃষ্ণা,আমাকে এতটা তৃষ্ণার্ত করে তুলে তুমি কি আনন্দ পাও ?তুমি কি বুঝতে পারছ না এটা করে তুমি নিজের বিপদ ডেকে আনছ?ছুরি আপেলে পড়ুক বা আপেল ছুরিতে,আখেরে কিন্তু ছুরিটাই আস্ত থাকে।আপেলটা টুকরো হয়ে যায়।
আমার অবস্হা যে ক্রমশ একটা ভ্যাম্পায়ারের মত হয়ে যাচ্ছে সেটা আমি বুঝতে পারছি।অসহ্য বুক ফাটানো, দম বন্ধ করা একটা তৃষ্ণা।এই তৃষ্ণাটা যে তোমার উরুসন্ধি বেয়ে নেমে আসা রক্ত ছাড়া কিছুতেই মেটার নয় তা কি তুমি জান?কিছুতেই তোমার সাথে ভদ্র ব্যবহার করার সুযোগ দেবে না,তাই না প্রিয়তমা?
শি ইজ সাচ আ বিচ।আ ডেলিশাসলি টেন্ডার,চার্মিং,ডিলেকটেবল বিচ।ওভারডিটারমিনেশন ওয়ার্ক্স ওনলি অন পেপার।দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ অ্যাকচুয়ালি ফ্যালোসেন্ট্রিক।আখেরে পুরুষাঙ্গের সামনে সমাজ এবং নারীকে ঝুঁকতে হয়।আর কোথাও না হোক,অন্তত মন্দিরে এসে।আমরা ভারতীয়রা শিবলিঙ্গের পূজারী।এখানেই ফ্যালোসেন্ট্রিজমের জয়।আমি মুখে যাই বলি না কেন আমি হৃদয়ের অন্তঃস্হল থেকে ফ্যালোসেন্ট্রিজমে বিশ্বাসী।কি বলা উচিত আমায়?ভণ্ড?ভণ্ড আমরা প্রত্যেকেই।তুমি যাদের আইডলাইজ কর সেই স্ট্যালিন বা চারু মজুমদারও।
গত চারদিন ধরে আমার তোমার সাথে কি করতে ইচ্ছা করছিল জান?জাস্ট থাবড়ে তোমার পশ্চাদ্দেশ এবং গালদুটো লাল করে দিতে।তোমার ঐ মাওবাদী শিটের জন্যও আমি নিজের সময় খরচা করতে প্রস্তুত ছিলাম।তুমি তার বদলে কি করলে?আবার ঐ অসহ্য,পশ্চাদ্দেশে আগুন লাগিয়ে দেওয়া উপেক্ষা।আমি টানা চার দিন রাতে ঘুমোতে পারিনি।বারবার উঠে মেল চেক করেছি।তারপর চারদিন পর তুমি রিপ্লাই করলে।কি মনে কর আমাকে? রাস্তার নেড়ি কুকুর?তোমার বাসি রুটি ছুঁড়ে দেবার অপেক্ষায় বসে ল্যাজ নাড়বে?ঐ কুকুরটাই কামড়ালে কিন্তু জলাতঙ্ক হতে পারে।তার অবশ্যম্ভাবী ফল-মৃত্যু।
কিন্তু পুরো পর্বটাই এতটা তিক্ত ছিল না।খুব কম সময়,কয়েকটা মাত্র ঘন্টা হলেও এমন সময়ও ছিল যা আমাদের প্রতিকূল ছিল না।ঐ সময়গুলো এখন আমার কাছে মলমের কাজ করে।আমার আহত ভঙ্গুর পৌরুষের মলম অথবা হয়ত আমার ক্ষত তৈরী হওয়া বুকের।
তৃষ্ণার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম।সৌম্য কয়েকটা বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আমার কেবিনে এসেছিল।মন দিতে পারছিলাম না।ওহ ঐ মুহূর্তগুলো!এক একটা সেকেণ্ড এক একটা শতাব্দীর মত দীর্ঘ মনে হচ্ছিল।আমি বার বার দরজার নীচ দিয়ে বাইরের দিকে দেখছিলাম ও এল কিনা।তারপরেই ওর নোংরা ডেনিমের জুতো আর উপর দিয়ে কাদা মাখা ছেঁড়া ট্রাউজার্স দেখা গেছিল।ও দরজা নক করার আগেই আমি উচ্ছাসের ফলে ওকে ডেকে ফেলি।হয়ত সংযত থাকা উচিত ছিল।এতটা আগ্রহ দেখিয়ে ফেলা ঠিক হয়নি।যাই হোক পরে পরীক্ষার খাতায় সেটা পুষিয়ে দিয়েছিলাম।তৃষ্ণা ঘূর্ণাক্ষরেও আর কোনদিন ভাবতে পারবে না যে আমি কয়েক দিনের জন্যও……
আমি একজন ফিলোফোবিক মানুষ।সে প্রেম বা যৌনতা নিয়ে লিখিত ভাবে যতই বক্তৃতা করি না কেন!চিরাচরিত বাঙালী পুরুষ যেমন হয়।শ্রেণীযুদ্ধ আমার চোখে শুধু মাত্র একটা দর্শন,বিস্তৃততর কিছু নয়।আমার কাছে প্র্যাক্সিস হল শুধুমাত্র নিজের মস্তিষ্কের পুলিশটাকে হত্যা করা।কার্টেজীয় দ্বিপাক্ষিক গঠনে শ্রেণীশত্রুচিহ্নিতকরণের ক্লাসিকাল মার্ক্সবাদী ধারণাকে আমি ডগমার অভিধা দিয়ে ডিসকার্ড করেছি।কারণ অ্যাকটিভিজমের পথ কণ্টকময়,প্রতিঘাত নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।তাই আরামকেদারার বিপ্লব।তাই তত্ত্বকেই যাপনের মুখোশে ঢেকে দেখানো।আমার কাছে প্রেম বা বিপ্লবের সাহসিকতা ক্লাসরুম আর ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ।প্রেমকে বিপ্লবে এবং বিপ্লবকে প্রেমে বদলাবার মত মেরুদণ্ডের জোর আমার নেই।আমি চে গ্যেভারা বা সিরাজ শিকদার নই যে পরকীয়ায় জড়িয়েও বুক চিতিয়ে দয়িতার হাত ধরে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব নিয়ে প্রেমকে স্বীকৃতি দেব।আমি চারু মজুমদারও নই যে সারাজীবন একনিষ্ঠ প্রেমে নিজের স্ত্রীর কাছে হৃদয় বন্ধক দিয়ে রাখব।আমি পছন্দ করি দায়িত্বহীন প্রেম,ক্যাজুয়াল যৌনতা।কেউ কমিটমেন্টের কথা বলতে গেলে থার্ড ওয়েভ ফেমিনিজমের ভাষায় তাকে কিঙ্ক শেমিং এর জন্য ধিক্কার দিই।না আমি যে আদর্শ বেছেছি তাতে কমিটমেন্ট বা আত্মবলিদানের কোনো জায়গা নেই।না প্রেমে না রাজনীতিতে।স্ট্যালিন বা চারু মজুমদারের প্রতি আমার এই বিচিত্র বিদ্বেষের কারণ আসলে লুকিয়ে থাকা একটা হীনমন্যতা।যে কারণে ধ্বনিকে প্রতিধ্বনি ব্যঙ্গ করে।আমি আদর্শের জন্য আত্মনিগ্রহ করার কথা ভাবতেও পারি না,প্রেমের জন্যও না।ঐ লোকগুলোর মত মহাপুরুষ আমি কোনদিন হতে পারব না।যে পথে হাঁটলে সফলতা দেখে যাওয়ার আসা কম,সমাজে লোকনিন্দা, পরিবার,বন্ধুবান্ধব সবার দূরে সরে যাওয়া,স্বীকৃতি নেই,স্তুতি নেই,বন্দনা নেই,আছে শুধু আত্মত্যাগ -সেই পথে হেঁটে লাভ কি!চারু মজুমদার বা স্ট্যালিন আজকের যুগে ইতিহাসে খলনায়ক নামে পরিচিত।কিন্তু তাদের থেকে অনেক বেশী মানুষকে স্রেফ না খাইয়ে মারা চরম অসংবেদনশীল বর্ণবিদ্বেষী চার্চিল শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদের তকমা পেয়েছে।মুখের কোনো স্বীকৃতি নেই,স্বীকৃতি আছে শুধু মুখোশের।ঐ জন্য আমি এবং আমার মত অনেক বাঙালী ইন্টেলেকচুয়াল আরামকেদারার বিপ্লবী এবং সমালোচক। ছাত্রছাত্রীরা আমাকে দেবতার আসনে বসিয়েছে।সত্যি সত্যি কুরবতের পথে হাঁটলে আমাকে মাটিতে নেমে আসতে হত।ধূলো এমনকি রক্তঘাম মাখতে হত।আমি আমার সিংহাসন থেকে নামতে প্রস্তুত ছিলাম না কোনদিনই।মার্ক্সবাদ পড়ার কারণে আমি জানি পেটি বুর্জোয়া মানসিকতার উৎস মেনস্ট্রিম ইকোনোমিকসের সবচেয়ে অপটিমাল বিনিয়োগে ম্যাক্সিমাম পে অফের ধারণা।মধ্যবিত্ত মানসিকতার ইন্টেলেকচুয়াল বিপ্লবে নামলেও সফল হওয়া নিশ্চিত জেনে তবেই নামে।অস্বীকৃতির অন্ধকারে সে কাজ করতে চায় না।ন্যূনতম আত্মনিগ্রহের বিনিময়ে সে সর্বোচ্চ খ্যাতি ও স্বীকৃতি চায়।আমি নিজেও এই মানসিকতা থেকে মুক্ত নই।ফলাফলের চেয়ে আত্মরতিটা আমাদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়ায়।আমি বিপ্লব কোনদিনই চাইনি,বিপ্লবের নামাবলী পড়ে সম্ভ্রম আদায় করতে চেয়েছিলাম।যে কোনো বাঙালী এই সেন্টিমেন্টটার সাথে রিলেট করতে পারবে।আর ঠিক এই কারণেই ভারতে কালচারাল রেভলিউশনের কাণ্ডারী সরোজ দত্তকে আমি অপছন্দ করি।বদ্ধোন্মাদ!লেখাপড়া শিখেও যে এরকম নির্বোধ কি করে হয়!বাঙালী মধ্যবিত্তের হিপোক্রিসিটাই দেখতে পায়নি।মধ্যবিত্ত এবং সামন্ততান্ত্রিক হেজিমনি ভেঙে প্রলেতারিয়ান হেজিমনি তৈরী করতে চেয়েছিল।তার মূল্য দিতে হয়েছে নিজের জীবন দিয়ে।তৃষ্ণাও ওটাই ভুল করেছিল।আমাকে মাটিতে টেনে নামাতে চেষ্টা করেছিল।তার শাস্তি ও নিজের মার্কশিটে পেয়েছে।
থাক এসব অপ্রিয় প্রসঙ্গ। কয়েক মুহূর্তের জন্য বরং আবার ঐ ইউফোরিক স্মৃতিতে ফিরে যাই।তৃষ্ণা আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল চোখে একরাশ অভিমান মেখে।আমি মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখছিলাম।অভিমানের ছাপ একটা মানুষের মুখকে এতটা সুন্দর করে!কোমর পর্যন্ত খোলা চুল,মলিন পোশাক আর ওর উজ্জ্বল নরম অপাপবিদ্ধ মুখ।আচ্ছা ঐ মুহূর্তে যদি ওকে বুকে টেনে নিতাম ও কি আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিত?নাকি বালির ভিতের মত আমার বাহুবন্ধনে চূর্ণ হয়ে ভেঙে পড়ত?যাই হোক প্রথম আশঙ্কাটা তো ছিলই,তাছাড়া আরও বহু সঙ্গত কারণেই সেটা করার অপচেষ্টা করিনি।
আগের দিন ওকে আমার কেবিনে আসার অনুমতি দিইনি।ও আজ আমার থেকে অনেকটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়েছিল।আমার প্রথম অরগ্যাজমের সময়েও এতটা আনন্দ হয়নি।ও আমার উপর অভিমান করেছে।মানে ও আমার প্রতি বরফশীতল নয়।আমি ওকে হাতের ইঙ্গিতে কাছে এসে দাঁড়াতে বললাম।ওফ এই মুহূর্তটা সত্যিই স্বর্গীয়। আমার এতদিনের বিনিদ্র রাত্রির ঋণ যার কাছে,আমার চোখের কালির ঋণ যার কাছে-সে আমার উপর অভিমান না করলে জীবনের মানে কি হয়!ও অভিমান করবে,আমি ওর মান ভাঙাব।বার বার।কয়েক শতাব্দী ধরে,জন্মজন্মান্তর ধরে।বিছানায় রক্তঘামের সঙ্গমের চেয়েও এটা কত বড় সুখানুভূতি কেউ বুঝবে না।অথবা একমাত্র সেই বুঝবে যে এই ব্যাপারটার মধ্যে দিয়ে গেছে,এই মুহূর্তগুলো যাপন করেছে।
ওকে যাবার সময় খুবই মধুর গলায় অনুরোধ করলাম যদি ও একবার বাড়ী যাবার সময় ক্যান্টিনে আমার জন্য চা বলে যায়!(মানে এটা আমি নিজেও ক্যান্টিনে ফোন করে বলতে পারতাম কিন্তু তৃষ্ণার আনুগত্যের প্রমাণটাও দরকার ছিল।)ও সম্মতি জানিয়ে চলে গেল।
আমি এই তৃষ্ণাকে চেয়েছিলাম।নম্র,ভদ্র, অনুগত।যার সাথে হালকা চালে একটু আধটু ফ্লার্টিং করা যায় বা শরীর ছোঁয়া যায়।ও তখন নিশ্চয়ই লজ্জায় লাল হয়ে উঠবে।কিন্তু তৃষ্ণা সেটা ছিল না।তৃষ্ণা সেই আগুন ছিল না যে পতঙ্গকে নিজের মধ্যে টানে।তৃষ্ণা সেই বিপ্লববহ্নি ছিল যা হোমাগ্নির মত পবিত্র।মানুষকে শুদ্ধ করে এবং বিপ্লবের রক্তিম আত্মত্যাগের পথে টেনে নিয়ে যায়।
তৃষ্ণা সেই শঙ্খিনী নারী ছিল না যাকে স্বাভাবিক ভাবে আমরা পুরুষরা চাইলেও মনে মনে ভয় পাই।কিন্তু তাও আমি ওকে ভয় পেতাম।ওর পবিত্রতাকে,ওর মধ্যে থাকা অদ্ভুত একটা অবসেশনকে।এই অবসেশন আমাদের পশ্চিমবাংলার অজস্র ছেলেমেয়েকে একদিন অকথ্য অত্যাচার ও মৃত্যুর পথে নিয়ে গেছে।আমি অ্যাটাচমেন্টকে ভয় পেতাম।আমি ভয় পেতাম কোনো দুর্বল মুহূর্তে ওর প্রেমে না পড়ে যাই।

সাদা পরী দেখেছেন কোনো পাঠক?আমি দেখেছিলাম।এসির হাওয়ায় ওর খোলা চুল সারা মুখে অবাধ্য ভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল।একবার তো পেনের ঢাকনাও চুলে আটকে গেল।সাদা সালোয়ার কামিজে পৃথিবীর সবচেয়ে নরম কাদামাটির মূর্তি,অবাধ্য চুল ওড়না নিয়ে বিপর্যস্ত(সালোয়ারকামিজে মেয়েটা একদম স্বচ্ছন্দ বোধ করত না)।আর ঐ চুলের মধ্যে ফুটে থাকা সদ্যস্ফুট গোলাপের মত ওর মুখ।সেদিন গোটা পৃথিবীর কেন্দ্রটা ঐ দুঘন্টার জন্য এসির পাশের লাল চেয়ারটায় উঠে এসেছিল।বার বার ডিসট্র্যাকশন ঘটছিল।অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা বিরক্ত হচ্ছিল।তৃষ্ণা পর্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছিল।অপর্ণা সম্ভবত রেগে যাচ্ছিল।কিন্তু আমার মস্তিষ্ক ঐ দুঘন্টার জন্য তৃষ্ণার পায়ের নীচে পড়েছিল।শালীনতা অশালীনতার বা ন্যায় অন্যায়ের বোধ কিছুই কাজ করছিল না।
কিন্তু ঐ মুহূর্তগুলো কালবৈশাখীর মত হয়।একরাশ ঝড় বৃষ্টি এনে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।ভেজার সময়টা আমরা একরকম ডিলিরিয়ামের মধ্যে থাকি।মস্তিষ্ক অবশ হয়ে থাকে।পরে ড্যামেজটা উপলব্ধি করা যায়।তখন ঝড় থাকে না,ঝড়ের কারণও আমাদের ছেড়ে নিজের জীবনে অনেকদূর এগিয়ে চলে যায়।শুধু আমরা পড়ে থাকি শ্মশানের ধূসর নিস্তব্ধতার মধ্যে।প্রচণ্ড ভিড়েও একা হয়ে।তৃষ্ণা তখন রূপকথার চরিত্র হয়ে আমার জীবনে ছিল,এখন নেই।কিন্তু আবার আছেও।আমার মধ্যে একটা জম্বি হয়ে।প্রেতাত্মা হয়ে।এই তৃষ্ণা কিন্তু বাস্তবের তৃষ্ণার চেয়ে আলাদা।এই তৃষ্ণা কোন মানুষ নয়।এই তৃষ্ণা শুধুই অপূ্র্ণ থাকা বুক ফাটা একটা তৃষ্ণা।যা আমার ভঙ্গুর পৌরুষে প্রতিনিয়ত চিড় ধরায়।
 

পর্ব ৯

তৃষ্ণার কথা

প্রশ্ন উঠবে।কুৎসা,অপ্রাপ্তির হাহাকার,ব্যর্থতার পক্ষে সাফাই গাওয়া,দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা ইত্যাদি নানা বিশেষণে এই লেখাটা অলংকৃত হবে।এমনকি আমার ব্যক্তিগত জীবনের দিকে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি হওয়াও অসম্ভব নয়।আরেকটাও চমৎকার পন্হা আছে।অভিযোগকারীর মানসিক সুস্হতা নিয়ে প্রশ্ন তোল।ক্ষমতাশালীরা বিরুদ্ধবাদীর উপর অন্যতম যে অস্ত্রটা প্রয়োগ করে থাকে।
গড্ডালিকাপ্রবাহের প্রতিকূলের পথ বন্ধুরতম।সবাই যখন বাহুতে স্বস্তিকা এঁকে হাঁটে তখন সোফি স্কোলদের গন্তব্য হয় গিলোটিন।সহনাগরিক,এক্ষেত্রে সহপাঠী- কারোর কাছ থেকেই আমি কমরেডলি অনুভূতি আশা করছি না।আমার কাজ সিদ্ধান্ত জানানো নয়,শুধু ঘটনাবলী তুলে ধরা।বিচার এবং সিদ্ধান্তের দায়িত্ব পাঠকের।
হিউমিলিয়েশন,বিদ্রূপ,প্রতিকূলতা, এমনকি শারীরিক আঘাতের বিষয়ে একটা সুফিসুলভ নিষ্পৃহতা আনতে এতদিনে সক্ষম হয়েছি বলেই হয়ত কলম ধরতে পেরেছি। একজন অ্যাকটিভিস্টের কর্তব্য শুধু ক্রিয়া নয়,সেই ক্রিয়ার ফলস্বরূপ যে পরিণতিটা আসছে তার ধাক্কাটাও সামলানো।হ্যাঁ সেই ধাক্কাটা নেবার মেরুদন্ড আমি গড়ে তুলেছি,এই একবছর ধরে তিলে তিলে।
আপনার আসল চেহারাটা তুলে ধরার কনসিকোয়েন্স কি হতে পারে?আপনি যে ক্ষমতার জায়গায় রয়েছেন তার নানারকম অপপ্রয়োগ!যেমন মিডিয়ার সামনে আমার চরিত্রহনন, আইনি পথে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা।অথবা যাদের মস্তিষ্কে আপনি প্রায় প্রফেটের স্হান অর্জন করেছেন,আপনার প্ররোচনায় তাদের অ্যাসিড অ্যাটাক,কিংবা তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ।ক্ষমতাবানের পক্ষে ক্ষুদ্রকে শিক্ষা দেওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়।বিশেষ করে মেয়ে হলে কথাই নেই।আমার উপর যদি একটাও শারীরিক আক্রমণ রাস্তায় ঘটে তার জন্য আমি আপনাকে দায়ী মনে করব।একটা আপাত সৌম্য, ভদ্র চেহারার পিছনে আপনার চরিত্রের নোংরা দিকটা আমার চোখে আপনি লুকোতে পারেননি।জাহান্নামে যাক অন্যদের মতামত,এই লেখাটা পড়ে আপনি একবার তাকাতে পারবেন আয়নার দিকে?নিজেকে প্রশ্ন করুন ডঃ ভট্টাচার্য, আমার বক্তব্যে কতটা মিথ্যে আছে।অস্বীকার করতে পারবেন করিডর দিয়ে হেঁটে যাবার সময় আড়চোখে আমাকে দেখতেন?আমাকে ফলো করে প্রেজেন্টেশনের দিন পর্যন্ত চলে এসেছিলেন?আপনার গ্রুপের প্রেজেন্টেশনের টাইম স্লট আমাদের ঠিক পরপর হওয়ার ঘটনাও কাকতালীয়? আমি অন্তত সেটা মনে করি না।
কন্যাসমা একজন ছাত্রীকে কি চোখে দেখেছিলেন আপনি?আপনার নিজের আমার বয়সী একটা মেয়ে আছে,আপনার বয়সী কোনো অধ্যাপক তার দিকে ঐ চোখে তাকালে এবং পরে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মার্কশিটে শোধ তুললে ক্ষমা করতে পারতেন তাকে?আপনার নিজের ছেলেমেয়েরা শুধু মানুষ,অন্যরা রাস্তার কুকুরবিড়াল বলুন?আপনি অসাধারণ লেকচারার,দারুণ স্পিকার কিন্তু একজন মাস্টারমশাই হয়ে উঠতে পারেননি।একজন শিক্ষকের চরিত্র কিরকম হওয়া উচিত এটা যদি সব্যসাচী স্যরকে দেখে শিখতে পারতেন!আপনার কেবিনের মুখোমুখি কেবিনেই বসেন ভদ্রলোক।
উন্নাসিকতা আপনি বাইরে দেখাতে পারেন,আমাকে বিদ্রূপ করতে পারেন,ইউনিভার্সিটি আপনার জায়গা,আপনার পক্ষে দাঁড়ানো লোকজনের অভাব নেই,সেখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুললে আপনি চিৎকার চেঁচামেচি করে একটা সিন ক্রিয়েট করলেও বিস্মিত হব না।প্রশ্নের উত্তর এড়ানোর ওটাই তো চমৎকার উপায়।
কিন্তু একান্তে আমার মুখোমুখি দাঁড়াবার সাহস আপনি কোনোদিন অর্জন করে উঠতে পারবেন না।সত্যি বলতে সামনাসামনি আমাদের কখনও দেখা হোক এটা আমি চাইও না।আমার জীবনে আপনি একটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু নন।আপনার চোখের দৃষ্টিটুকুও আমার উপর পড়লে আমার মনে হত আমার সারা শরীর জুড়ে অজস্র আরশোলা হাঁটছে।মলয়া দেবীর চোখে রুণু নিয়োগী যা,আমার কাছেও আপনার ঠিক সেই অবস্হান।কোনোদিন আপনার মুখ দেখতে চাই না।এতটা ঘেন্না কেন করি জানেন আপনাকে?কারণ একসময় শ্রদ্ধা করতাম।কারণ আমি যে দর্শনটাকে আমার জীবনের উপজীব্য মনে করি আপনি সেটা আমাদের পড়াতেন।এবং প্রত্যেক পলে পলে যাপনের ক্ষেত্রে আপনি সেই দর্শনের বিপরীত পথে হেঁটেছেন।আপনার মত ভন্ডের চেয়ে আমি একজন স্পষ্টবাদী ধর্মান্ধকে বেশী শ্রদ্ধা করি।
শিক্ষক তো দূরের কথা,আমি আপনাকে মানুষ বলেও মনে করি না।অন্তত যদি মেরুদণ্ডী প্রাণী হন,আমাকে confront করুন।আমার এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন।

থার্ড সেমে শম্পা ম্যাডামের হাত থেকে কায়দা করে ইন্টারনালের নম্বরটা সরিয়ে নেওয়া হল কেন?
অপর্ণা এলিয়েনেশনের প্রশ্নটা বই থেকে না লিখে ও অন্য একটা প্রশ্ন ভুল লিখেও কি করে পল ইকোয় হায়েস্ট পেল থার্ড সেমে?ফোর্থ সেমে শম্পা ম্যাডামকে আপনি শুধু এপ্রিলের শেষ দু সপ্তাহের ক্লাস ছেড়েছেন,এবং পঞ্চাশের মধ্যে পুরো চল্লিশ নিজের হাতে রাখলেন।তাঁর হাতে মাত্র দশ নম্বর রইল।এবং তাঁকে মিথ্যে বললেন যে সারা মে মাসটা উনি ক্লাস পাচ্ছেন।অথচ আপনি খুব ভাল করে জানতেন যে মে মাসের মাঝামাঝি আমাদের পরীক্ষা।এবং এপ্রিলের পর থেকে ইউনিভার্সিটি ছুটি পড়ে যাচ্ছে।পল ইকোর নম্বরের অস্বাভাবিক ডিস্ট্রিবিউশন এবং তারপর সারা সেমিস্টার বেশীরভাগ ক্লাস না করেও অপর্ণার ৪১ তথা হায়েস্ট পাওয়া-এরকম মিরাকল বোধহয় আপনি খাতা দেখলেই একমাত্র সম্ভব।আমি না হয় আপনার মেল ইগোকে অ্যাপিজ না করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছি।সায়ন্তনী তো সেটা করেনি।সব সময় নিজের মাথা আপনার সামনে নীচু রেখেছে।নম্র,ভদ্র, পলিশড এবং মেধাবী।যে মেয়েটা মাস্টার্সে প্রায় ৭২% নম্বর নিয়ে বেরোল সে এম ফিলের রিটন পরীক্ষায় চান্স পেল না।বিশেষ করে অপর্ণা তার উপর ক্ষেপে ওঠার পরপরই এটা ঘটে।কিসের দায় ছিল আপনার অপর্ণাকে এত তোষণ করবার?যে প্রশ্নগুলো ক্লাসে বা ইমেলে আলোচনা করা যায়,সেগুলোর জন্য আমাকে বার বার ঘরে ডাকতেন কেন?পলিটিকাল ইকোনমি পেপারটা পড়ানো এক বছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হল কেন?বা বন্ধ করতে বাধ্য হলেন কেন?এম ফিলে মার্ক্সিয়ান ইকোনোমিকসের বিষয়ে পাঁচ ছটা ছেলেমেয়ে এস ও পি দেওয়ার পরও ইন্টারভিউ বোর্ডে আপনার বিচিত্র ও রহস্যময় অনুপস্হিতি।কেন কাজলবাবু?ইন্টারভিউতে অপর্ণাকে সিলেক্ট করতেই হত আর আমার মুখোমুখি হবার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেননি?নাকি আপনার ধারণা ছিল যদি আপনার হস্তক্ষেপ ছাড়াও অপর্ণা সিলেক্টেড হয় তাহলে আমি আপনাকে ছেড়ে কথা বলব না?একটা সামান্য ছাত্রীকে এত কিসের ভয় কাজলবাবু?কত জনপ্রিয়,ক্ষমতাবান, বিখ্যাত মানুষ আপনি!আচ্ছা আপনাকে হঠাৎ অভিযোগ করতে যাব কেন বলুন তো!
অপর্ণার আপনার উপর একটা বিচিত্র অধিকারবোধ ছিল।দৃষ্টিকটূ ভাবে বিচিত্র। আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রচুর আগ্রহ ছিল তার।ওর এই অপ্রাসঙ্গিক ভাবে আপনার প্রসঙ্গ সব কিছুতে টেনে আনা একটা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার পক্ষে।যেমন একদিন আমি ক্যাজুয়াল মিস্যান্ড্রিস্ট একটা জোক ক্র্যাক করছিলাম,"ধূর ছেলেরা আবার সচ্চরিত্র হয় নাকি?"
অপর্ণা ওর স্বভাবসিদ্ধ পদ্ধতিতে ঘোঁতঘোঁতিয়ে উঠল,"মানে কেবি দুশ্চরিত্র? "
তারপর গ্রুপ প্রোজেক্টের ব্যাপারে ও একরকম নিশ্চিত ছিল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর আপনি হবেন।সেটা না হওয়ায় এবং সায়ন্তনীদের গ্রুপের দায়িত্ব নেওয়ায় ও রীতিমত অফেন্ডেড হয়েছিল সায়ন্তনীর উপর।তারপর আপনি প্রেজেন্টেশনে ওদের নাকি খুব সাহায্য করেছিলেন।এটা অপর্ণা নিতে পারেনি।অথচ একজন মেন্টরের পক্ষে নিজের গ্রুপকে সাহায্য করাই স্বাভাবিক নয় কি?এরপরই ও সায়ন্তনীর উপর ক্ষেপে যায় এবং কাকতালীয় ভাবে সায়ন্তনীকে এম ফিলের রিটন টেস্ট থেকে বাদ পড়তে হয়।
ছাত্রছাত্রীদের কনভার্সেশনে শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গটা উঠে আসার কথা নয়।যদিও অপর্ণা সেটা প্রায়ই অপ্রাসঙ্গিক ভাবে টেনে আনত।সায়ন্তনীকে ও যেমন পছন্দ করত না,তেমনি আপনার স্ত্রীকেও করত না।ওর একটা উদ্ধৃতি তুলে দিই।
"কেবির ওয়াইফকে কি জঘন্য দেখতে।কালো বিচ্ছিরি।"
আমি বলেছিলাম,"এভাবে কারোর ব্যাপারে বলতে নেই।"
আসলে কাজলবাবু আমি একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।তাই বডি শেমিং এর কালচারে অভ্যস্ত নই।আসলে আমার তো আপনার বা অপর্ণার মত অভিজাত ব্যাকগ্রাউন্ডে আপ ব্রিঙ্গিং হয়নি।ইউরোপিয়ান কনস্ট্রাক্ট অফ বিউটিকে স্ট্যান্ডার্ডাইজ করা আপনাদের মত অভিজাত মানুষদের পক্ষে স্বাভাবিক।বডি শেমিং এর সংস্কৃতি আপনার বা অপর্ণার মত লোকেদের পরিবারে তৈরী হয়। অথচ ক্লাসে ইউরোসেন্ট্রিজম বা ওরিন্টালিজম নিয়ে কত বড় বড় বক্তৃতা দিতেন আপনি।ফেমিনিজমের বিভিন্ন স্কুলগুলোর প্রথম ধারণা আপনার কাছেই পাওয়া আমাদের।অথচ…

ভাবছেন আপনাকে কেন অভিযোগ করছি?
এই কথাগুলো ওর মাথায় এল কোথা থেকে কাজলবাবু?ওর তো আপনার স্ত্রীকে চেনার কথা নয়।আপনার কাছ থেকে শুনেছে বিশেষণগুলো?যদি এটা সত্যি হয় তাহলে আপনার এই বোধটাও নেই ছাত্রীর কাছে নিজের স্ত্রীর নিন্দে করলে নিজেরও সম্ভ্রমহানি হয়?আর কত নীচে নামবেন আপনি?ভালো কথা আপনার পিএইচডির বিষয় ইন্টারসেকশনাল ফেমিনিজম ছিল না?

পর্ব ১০

কাজল ভট্টাচার্যের কথা

অপর্ণার উরুসন্ধির মধ্যে আমার অসম্ভব বিবমিষা হচ্ছিল।এই দুর্গন্ধময় দম আটকানো অভিজ্ঞতার জন্যই আজকাল আমি ক্লসট্রোফোবিক হয়ে যাচ্ছি।ও আমার মাথাটা চেপে ধরে রেখেছে,কোনমতে নিজেকে ওর হাত থেকে ছাড়িয়ে আমি বেসিনে গিয়ে ঝুঁকে পড়লাম।হড়হড় করে খানিকটা বমি হল।এই ওরাল সেক্স জিনিসটা আমার একদম পোষায় না।গা ঘিনঘিন করে।অন্তত অপর্ণার সাথে।কিন্তু আজ ওকে শান্ত করার এটাই একমাত্র উপায় ছিল।যা সাংঘাতিক ক্ষেপে গেছে!
আমি ওর পুরো সাবস্ট্যান্সটা বমি করে ফেলায় ও ফিউরিয়াস হয়ে উঠে এসে আমার উন্মুক্ত নিতম্বে সপাটে লাথি কষাল।আমি টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম।
ও আমার চুলের মুঠি ধরে আমার মাথাটা উঁচু করে তুলে ধরল।তারপর হিসহিসে গলায় বলল,"এখন আর আমাকে পছন্দ হচ্ছে না,তাই না?"
বলে একটা অত্যন্ত অশ্লীল গালি দিল।
আমি ওর হাত থেকে নিজেকে ছাড়ালাম না।কাতর গলায় বললাম,"তোমাকে অদেয় আমার কিছুই নেই অপর্ণা।"
ও আমার চুল ছেড়ে দিল ঠিকই,তবে শান্ত হল না।একইরকম জিঘাংসা পূর্ণ গলায় বলল,"সায়ন্তনীর বুকে কনুই ঠেকাতে খুব মজা লাগে বলো?আমি সব খুলে দিচ্ছি তাতেও হচ্ছে না।"
-"আমি কিছু করিনি।তুমি ভুল বুঝছ।"
-"আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলিনা শুওরের বাচ্চা," চিৎকার করে উঠল অপর্ণা,"কি ভেবেছ কিছু দেখতে পাব না?ঐ মাখো মাখো করে ছবি তোলা,সারাক্ষণ লেপ্টে থাকা…"
-"ও আমার পিছনে এলে আমি কি করব?"অসহায় ভাবে বললাম আমি।
-"সায়ন্তনী যেন এম ফিলের রিটনেই ছাঁটা হয়ে যায়।নইলে তোমার ন্যাংটো ভিডিওগুলো ফেসবুকে তোমার বউ,বাচ্চা, ছাত্রছাত্রী,কোলিগস সবাই দেখবে।সেটা কি খুব ভাল হবে?"
-"প্লিজ অপর্ণা"
-"শাট দ্য ফাক আপ।কি পেয়েছ আমাকে?প্রস্টিটিউট?"
-"মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ, প্লিজ।"আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,"তুমি যা চাইছ তাই হবে।আমাকে এখন একটু একা থাকতে দাও।"
অপর্ণা আমার পাশে বসে হেঁচকি তুলে কাঁদছিল,"ভালবাসি তোমাকে কাজল,ভালবাসা।তোমার মত শরীর সর্বস্ব একটা পশু কথাটার মানে বোঝে?"
-"আমি তো তোমার কোনো কথারই অবাধ্য হচ্ছি না অপর্ণা।"
-"তাহলে তৃষ্ণার দিকে ঐভাবে কেন দেখ?আমাকে সাথে সবচেয়ে ইন্টিমেট মুহূর্তগুলোয় ওর নাম কেন বলছিলে কাজল?"ভেঙে পড়া গলায় বলল অপর্ণা।আমি ওকে বুকে টেনে নিতে পারলাম না।একটা ঠান্ডা স্রোত আমার শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে গেল।কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে রইলাম আমি।কখন ওর নাম করেছি সেটা মনেও নেই।তবে এই ঘটনাটা বোধহয় বাড়ীতেও একবার ঘটেছে।শর্মিষ্ঠা ইদানীং আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে।একদিন ও ও আমাকে জিজ্ঞেস করছিল "তৃষ্ণা কে?"কোনোমতে কাটিয়েছি।বাড়ীর কথা মনে পড়তেই ভয়টা আরো বেশী করে আমাকে চেপে ধরল।
অপর্ণা আমার মুখটা দুহাতে তুলে ধরল যাতে ওর চোখের দিকে আমি তাকাতে বাধ্য হই।তারপর বলল,"তুমি তৃষ্ণাকে ভালবাস কাজল?"
আমি ফসিল হয়ে বসে রইলাম।এবারও কোনো উত্তর দিলাম না।ও বলল, "তৃষ্ণা আসলে মাওবাদীদের গোপন সমর্থক।শি ইজ আ পিউরিস্ট বিচ।তোমাকে ও ঘেন্না করে।অশ্রদ্ধা করে।কোনোদিন শরীর দেবে না।ওর পিছনে ঘোরা বন্ধ কর।"
আমার পক্ষে আর ওকে সহ্য করা সম্ভব হল না।ওকে সরিয়ে দিয়ে জামাকাপড়গুলো তুলে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম।অপর্ণাদের বয়সে এই 'ভালবাসা' জাতীয় শব্দগুলোর প্রাসঙ্গিকতা থাকে।ও জানে না আমার অভিধানে এরকম কোনো শব্দ নেই।মানে অন্য কোন মেয়ের জন্য।ভালবাসা শব্দটার ব্যাপ্তি অনেক গভীর।এটা শুধু শরীরী টান নয়।এটা এমন একটা অনুভূতি যা নিজেকে দয়িতের কাছে তুচ্ছ করে তোলে।ভালবাসার পাত্রীর জন্য আত্মনিগ্রহ করতে, এমনকি নিজেকে ধ্বংস করতেও এতটুকু দ্বিধা থাকে না।এটা সারা পৃথিবীতে একজনের জন্যই তোলা আছে।সে আমার রক্তের অংশ,আমার আত্মজা,শ্রেয়সী।
হ্যাঁ,ভালবাসি বলেই শরীরী ভাবে ওকে চেয়েও আমি আজ পর্যন্ত ওর দিকে হাত বাড়াইনি। ও অন্য একটা ছেলেকে ভালবাসে।এই বিষয়টা আমাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করলেও ওর আনন্দের জন্য মেনে নিয়েছি।সমাজের,এমনকি প্রগতিশীল বামপন্থিদের পর্যন্ত প্রেম বা যৌনতা নিয়ে এই ছুঁতমার্গগুলো আমার পোষায় না।প্রেমের কোন বাধ্যবাধকতা থাকতে আছে নাকি!প্রেম হবে মুক্ত।ইনসেস্ট প্রেম বা বিয়ে কেন নিষিদ্ধ হবে!এই যৌনতা সংক্রান্ত ছুঁতমার্গের জন্যই আমার লেনিন বা স্ট্যালিনকে পছন্দ হয় না।স্ট্যালিনটা আবার মার্ক্সবাদের কিছু জানত নাকি?প্রকৃত মার্ক্সবাদী যদি কেউ থেকে থাকে সে হচ্ছে আলথুজার।আর তার একমাত্র উত্তরাধিকারী হচ্ছি আমি।অবশ্য ট্রটস্কি বা টিটোকেও আমার মার্ক্সবাদী বলতে তেমন আপত্তি নেই।স্ট্যালিনকে ওরাই উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছিল।তারপর বরফ পরিষ্কার করার কুঠারটাই সব গন্ডগোল করে দিল।
তাত্ত্বিক আলোচনা থাক।কিন্তু অপর্ণা আমার একটা দুঃস্বপ্নকে এক্সপ্লোর করে দিয়েছে।বিষয়টা আর খেলায় সীমাবদ্ধ নেই।আমি তৃষ্ণার প্রতি অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়ছি।কোন কিছু আর আগের মত নেই।আমার কাজ কর্ম,গবেষণা – সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।একদিন ক্লাসে গিয়ে লেনিনের স্ত্রীর নাম ভুল বললাম।বাড়ীতেও নানারকম গন্ডগোল করে ফেলছি।
আমি এটা চাইনি।আমি চেয়েছিলাম ওর বালিশ ভেজার কারণ হতে,ওর রাত জাগার কারণ হতে।ও এভাবে আমার সর্বস্ব জুড়ে বসবে কল্পনাও করতে পারিনি।ওকে এমন জায়গায় নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম যে ও আমার প্রেমে হাবুডুবু খাবে,এভাবে ওকে ভালনারেবল করে তুলে ওকে নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করব।কখনও আদর,কখনও ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া।আজ আমি এমন একটা মানসিক অবস্হায় পৌঁছেছি যে ও একটু ভাল করে কথা বললেই সারাটা দিন অবশ হয়ে থাকে।বিশ্বাস কর তৃষ্ণা,আজ তোমাকে একবার চোখে দেখতে পেলে,তুমি একটু ভাল ভাবে আমার সাথে কথা বললে আর কিছু চাই না।তোমার শরীরটাও না।অপর্ণা আমাকে বলছে তৃষ্ণার ফার্স্ট ক্লাসটা আটকাতে।কিন্তু সেটা করলে ও আমার সাথে কোনদিন যোগাযোগ রাখবে না।কেমন হবে আমার তৃষ্ণাবিহীন জীবন!মস্তিষ্ক আর হৃদপিন্ডে আমি তৃষ্ণার থেকে কোনোদিন আদৌ কি মুক্ত হতে পারব?এমনকি ওর থেকে দূরে গিয়েও?জানি না।সবাই জানে মস্তিষ্ক আর হৃদয় সবসময় বিপরীত পথে হাঁটে।আমি জানি তৃষ্ণার প্রতি আমার যা কিছু ব্যাখ্যাতীত তৈরী হচ্ছে সেটা আমার পক্ষে ভাল হবে না।এই নেশাটা কাটা দরকার।খুব দরকার।আর হৃদয় বলছে ওকে ধরে রাখতে।এই প্রথমবার খুব অসহায় লাগল আমার।শাওয়ারটা খুলে দিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম।
এই বাথরুম জায়গাটা আমার সমস্ত অনুভূতির সাক্ষী।মেঘ বুকের ভিতর জমুক বা আকাশে,সবসময় পরিষ্কার হতে একটা বৃষ্টিপাত দরকার।এতদিন ঐ বৃষ্টিটা সিমেন হয়ে ঝরেছে।আজ প্রথমবার চোখ থেকে নামল।তৃষ্ণা আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।আগে যেটুকু অভিমান বা রাগ করতে দেখেছি সেটাও আস্তে আস্তে অবশিষ্ট থাকছে না।তিন চারদিন ধরে আক্ষরিক অর্থে ওর পিছনে ঘুরছি,একবার মুখ তুলেও দেখছে না।এর আগে কয়েকবার ঘরে ডেকেছিলাম,আসেনি।এমনকি যেদিন বাকি ছাত্রছাত্রীরা আমার সাথে শেষবার দেখা করতে এল সেদিনও না।
আমিই একবার বাধ্য হয়ে ডেকে কথা বললাম,একটা দায়সারা গোছের উত্তর দিল।ওর ঘৃণা আমি সহ্য করতে পারি,কিন্তু এই নিষ্পৃহতা?
টেলিপ্যাথি বলে সত্যিই কি কিছু হয়?দেখ তৃষ্ণা,এই ভাদুরে কুত্তা চরিত্রহীন কাজল ভট্টাচার্য তোমার জন্য কাঁদছে।পাথরে মাথা ঠুকলেও পাথর ভাঙতে পারে,তুমি একটু ভাঙবে না!
 

পর্ব ১১

তৃষ্ণার কথা

নার্সিসিস্টদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আপনি এদের সাথে যে সম্পর্কেই যুক্ত থাকুন,এরা আপনার মধ্যে নার্সিসিস্টিক সাপ্লাই খুঁজবে।মানে এদের কোনোকিছু বলেই কোনো লাভ নেই।এমনকি তাদের পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার সম্পর্কে সচেতন করে দিয়েও না।রেকর্ডিং বা নকল করায় এদের দক্ষতা নব্বইয়ের দশকের দামী টেপ রেকর্ডারের মত।কাজলবাবু মুখে মাঝে মাঝেই বলতেন বটে তাঁর ভুলে যাওয়ার একটা প্রবণতা আছে,কিন্তু আমি নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি আমি কবে কি বলেছি এই কথাগুলোও ভদ্রলোক(!) পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মাথায় রাখতেন।তারপর কবে কে ক্লাসে এল বা এল না -এই বিষয়গুলোও।এই বিষয়গুলোয় নিষ্পৃহতা দেখানো ওঁর একটা অভিনয় ছিল।অনেকেই (বিশেষত ফেমিনিন জেন্ডারের কেউ) নিজের প্রতি ওঁর মনোযোগ দেখে খুশী হয়ে উঠতে পারে।কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে ওঁর নিষ্পৃহতা বা মনোযোগ,শীতলতা বা উষ্ণতা – সবটাই অভিনয়।নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত মানুষরা প্রতি মুহূর্তে নিজের প্রত্যেকটা কথা,অভিব্যক্তি,মুখের ভাব,দেহের ভাষা- সব কিছু রিহার্স করে এবং সেটা পারফেকশনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সচেতন থাকে।এদের মানসিক গঠন এমন হয় যে এরা কোনরকম ইমোশন উপলব্ধি করতে অক্ষম হয়।সেটা এদের মানসিক সুস্হতার পক্ষেও খারাপ কারণ আমরা মানুষরা পৃথিবীতে অন্তত একটা জায়গায় নিজেকে মানসিক ভাবে উন্মুক্ত করতে চাই,আশ্রয় খুঁজি।সেই আশ্রয়স্থল বাবা মা,স্পাউস, সন্তান,বন্ধু,প্রেমিক-প্রেমিকা-যে কেউ হতে পারে।এরা নিজেদের চারিত্রিক গঠনের কারণেই ইমোশনালি ডিপ্রাইভড থেকে যায়।কারণ নিজেকে উন্মুক্ত করা বা মানসিক বন্ধন তৈরী করা এদের চোখে ঘৃণিত দুর্বলতার সামিল।ফলে এরা ফিলোফোবিক হয়।এরা পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই শান্তি খুঁজে পায় না।কারণ প্রথমত, এরা নিজেকে নিয়ে তৃপ্ত হতে পারে না,প্রতি মুহূর্তে সামনের লোকটার থেকে অ্যাপ্রুভালের প্রয়োজন হয়।সেটা সবসময় নাও পাওয়া যেতে পারে।দ্বিতীয়ত, এরা আবেগের অভিনয় জানলেও আবেগকে উপলব্ধি করতে পারে না।এরা এদের নার্সিসিস্টিক সাপ্লাই এর উৎসকে খুব মনোযোগ সহকারে স্টাডি করে।ঠিক কোন আচরণ,কোন অভিব্যক্তি বা কোন শব্দটা ব্যবহার করলে সামনের লোকটার থেকে এমপ্যাথিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে,তাকে প্রভাবিত করা সম্ভব হবে,সেটা বুঝে নিয়ে এরা সেই মত আচরণ করে(যেমন,আমার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি,আমি বাংলা শব্দচয়ন ইংরাজীর তুলনায় বেশী পছন্দ করতাম বা নকশাল আন্দোলনের প্রতি দুর্বলতা ছিল লক্ষ করে উনি ক্লাসে মাঝে মাঝে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে নকশালবাড়ী বা মাও এর প্রসঙ্গ টেনে আনতেন বা বাংলায় তেমন স্বচ্ছন্দ না হয়েও আমার সাথে কথা বলার সময় বেশী বেশী বাংলা শব্দ ব্যবহার করতেন)।এটা খারাপ, ভাল দুরকম আচরণের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
 

কাজলবাবু পেন,বই বা ট্যাব নেবার অজুহাতে আমার আঙুল খামচানো ছাড়া কখনও আমাকে স্পর্শ করেননি।কিছু অশ্লীল দৃষ্টি,কিছু অস্বস্তিতে ফেলা কথা ও ব্যবহার-কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে না।খাতায় নম্বরের কিছু কারচুপিও না।কত প্রভাবশালী, কত দেবত্বপ্রাপ্ত, কত……অ্যাটোমিক এজেন্টের মূল্য কি তার সামনে!ফুলের মালা, ধূপের ধোঁয়া আর "লোকে কি বলবে" এর আড়ালে কত অপর ফোরক্লোজড হয়ে যায়।অভিধান এবং ইতিহাস বই থেকে বাদ পড়ে। অশোক,আলেকজান্ডার, আকবররা কত মৃতদেহের স্তূপ এবং ধর্ষিতার ছিন্নবস্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তরে ক্রমশ সিংহাসন উঁচুতর করেন।তারপরও ইতিহাস বইতে তাঁরা মহান সম্রাট হিসাবে খ্যাতি পান।হিটলারের দুর্নাম হয়েছে ইউরোপের মত জায়গায় প্রতিষ্ঠিত ইহুদী ও জেন্টাইলদের গায়ে হাত দেওয়ায়।চার্চিল কিন্তু ভারতের অজস্র মানুষের কঙ্কালসার মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়েও ঘৃণিত নন।সিপাহী বিদ্রোহের ভারত,বা ভিক্টোরিয়ার ভারত কিংবা আফ্রিকা,আমেরিকায় কত হলকস্ট ঘটে গেছে।আমরা জানি না।কারণ প্রায়োরিটি। তৃণের নিয়তিই পদদলিত হওয়া।আমরা এই বিষয়টাকে স্বাভাবিক করে নিয়েছি।তৃণমূলস্তরে কোনো ইতিহাস লেখা হয় না যে।
আমি অপর্ণা নই,আমার দাদা ইকোনোমিস্ট নয়।আমি খুব মডেস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছি।এই কথাগুলো অপর্ণা আমাকে ঠাট্টার ছলে প্রায়ই বলত।যেমন একদিন বলল আমি কোনোদিন নাকি আসল সিল্ক দেখিনি।ওদের আর্থিক অবস্হা খুবই ভাল,তাই ওর সিল্কের বিষয়ে জ্ঞান বেশী।তখন ও নিয়মিত দুটো সিল্কের ওড়না নিয়ে আসত।তারপরদিনই ওদের বাড়ীতে চুরি হয়ে যায়।টিভি,রেফ্রিজারেটর সহ জামাকাপড় পর্যন্ত।
অপর্ণার এই অন্তঃসারশূন্য আত্মম্ভরিতার পিছনে একটা অসহায়ত্ব দেখতে পেতাম।ওকে দেখে করুণা হত।প্রতিমুহূর্তে প্রাসঙ্গিক এবং অপ্রাসঙ্গিক ভাবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে চলেছে।এর পিছনে ছিল একটা গভীর হীনমন্যতা।আমাকে চারটে অপমানজনক কথা বললেও ও কাজল ভট্টাচার্যকে পুরোপুরি ধরে রাখতে পারছিল না।ওর বশংবদ হয়েও কাজলবাবু আমার প্রতি নির্লিপ্ত থাকতে পারছিলেন না।সেটাই ও সহ্য করতে পারছিল না।অথচ কাজলবাবু ওর সামনে প্রায় অনুগত সারমেয়র মত আচরণ করতেন।কিন্তু আসল জায়গায় সব বাঁধ ভেঙে পড়ছিল।সেটা ওদের দুজনের পক্ষেই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।কাজলবাবুর প্রতিও আমার সত্যিই করুণা হত।
কাজলবাবুকে আমি ডেভেলপমেন্টের মাওবাদী ধারণা নিয়ে একটা প্রশ্ন করেছিলাম ক্লাসে।তিনি যথারীতি ক্লাসে সেটা আলোচনা না করে একটু নার্ভাস ভাবে ওঁর ঘরে দেখা করতে বললেন।আমার বিষয়টা নিয়ে সঙ্গত কারণেই অস্বস্তি ছিল।মাসতিনেক আগে আমি বইমেলা থেকে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের কি বই কেনা যায় সে ব্যাপারে সাজেশন চাওয়ায় আমাকে ইমেলে কিছু বইয়ের কথা বলেছিলেন।পরদিন মারাত্মক প্রসন্ন ছিলেন আমার উপর।পরে বুঝেছিলাম ওটা সম্ভবত নিজে থেকে মেল করা ও ধন্যবাদ জানানোর কারণে।আমার বই কেনা হয়ে গেছিল।আর বইমেলায় যাবার কথা নেই শুনেও প্রায় জোর করে দুটো বইয়ের নাম লিখে দিলেন।তার একটা ছিল অ্যালেন বাদিউর ইন প্রেইজ অফ লাভ।বইটায় রাজনীতি ও বিপ্লবের সাথে প্রেমের সম্পর্কে আলোচনা আছে বলে কাজলবাবু আমাকে কিনিয়েছিলেন।হতে পারে প্রকাশকের থেকে ওঁর কিছু কমিশন প্রাপ্য ছিল। অথবা….সেই গরুর রচনা।ভদ্রলোক জানতেন আমাকে বিপ্লবের কথা বলে দরকার হলে দণ্ডকারণ্যেও পাঠিয়ে দেওয়া যায়।মানে আমাকে উত্তেজিত করতে ঐ একটা শব্দই যথেষ্ট।

-“লাভ মানে?হাউজহোল্ড লেবারের ব্যাপারে?”

-“নো ,নট অ্যাট অল।লাভ, নারীপুরুষের চিরন্তন প্রেম।“হাসিমুখে বলেছিলেন কাজলবাবু।

-“এটা তাহলে আমরা …মানে কি কাজে লাগবে?”

-“আরে বিপ্লব আর প্রেম নিয়ে এটা একটা অসাধারণ বিশ্লেষণ।পড়ে দেখোই না।“

বইটা আমি গত সপ্তাহে পড়ার সময় পেয়েছি।এবং যা দেখলাম বিষয়টা মোটেই রাজনীতির ব্যাপারে সীমাবদ্ধ নয়।ওটা একটা অংশ মাত্র।বইটা সবরকম বাধা অস্বীকার করা প্রেমের।মানে বিবাহবন্ধন, রাষ্ট্র,পরিবার সব প্রেমের কাছে তুচ্ছ।ঐ বাঁধভাঙা ঝোড়ো প্রেমকেই বিপ্লবের সাথে তুলনা করা হয়েছে।যদিও বইটা অপর্ণার জন্য বলেননি,তাও সে চরম উৎসাহে আমার আগেই ওটা কিনে ফেলেছিল।
বয়স্ক একজন অধ্যাপকের কাছ থেকে নানাবিধ অস্বস্তিকর ব্যবহার এবং তারপর এরকম একটা বইয়ের অযাচিত রেফারেন্স।আমার মনে হয় না কোনো ছাত্রীই এত কিছুর পর একান্তে তার মাস্টারমশাই এর সাথে দেখা করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করবে।তাই গেলাম না।পরদিন আবার প্রশ্নটা ইমেলে লিখে পাঠালাম যদি বলে দেন এই আশায়।সেখানেও রিপ্লাই করলেন ক্লাসের পর কেবিনে এসে দেখা করতে বলে।
একটুও পছন্দ হল না প্রস্তাবটা।রিপ্লাই করতেও ইচ্ছা করছিল না।যাক গে সেদিনের মিসবিহেভিয়ারের বদলা নেবার সুযোগ হিসাবে ব্যাপারটা মন্দ নয়।আমি আজকাল সচেতনভাবে ওকে উপেক্ষা করি। জানি আমার উপেক্ষাটাই ওকে সবচেয়ে বেশী কাঁটা ফোঁটায়।থার্ড সেমের খাতায় পল ইকো,মার্ক্স দুটো পেপারেই অপর্ণা আমার থেকে দু নম্বর করে বেশী পেয়েছে।অথচ সাত্যকী স্যরের পার্টে,মার্ক্সের খাতায় যে কুড়ি নম্বর ছিল,ওটা ও প্রায় ছেড়ে এসেছে।আর পল ইকোয় একটা চার নম্বরের প্রশ্ন ভুল,গান্ধিজীকে নিয়ে পাঁচ নম্বরের প্রশ্নটা বইটা না পড়ে শুধু নোটভিত্তিক লেখা।তাও কোন যাদুমন্ত্রবলে যথাক্রমে পঁয়ত্রিশ ও সাঁইত্রিশ। পেতেই পারে।কাজল বাবু সবসময় গর্ব করে বলেন, "আমার হাতে একদম নম্বর ওঠে না।" বাক্যটায় সম্ভবত কিছু কথা উহ্য থেকে যায়।
এভাবে ভাবা উচিত নয়।হতেই পারে ও আমাদের অনেকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী মেধাবী।যদিও ও গ্র্যাজুয়েশনে ফার্স্ট ক্লাসও পায়নি।এমনকি আগের দুটো সেমিস্টার মিলেও ফার্স্ট ক্লাস নেই।যাই হোক থার্ড সেম থেকে কাজলবাবুর সংস্পৃষ্ট হয়েই বোধহয় ওর মেধাটা বেড়ে গেছে।সত্য,দ্বাপর বা ত্রেতা যুগে তো এরকম আকছার হত।ও থার্ড সেমের রেজাল্ট বেরোনোর পর থেকে পড়াশোনায় আমার থেকে কত ভাল,আর কেবি ওর প্রতি কতটা ইমপ্রেসড-এইদুটো কথা নিয়ম করে প্রতিদিন একবার করে জানিয়ে যাচ্ছে।
আমার ক্ষোভটা ঐ বিষয়টা নিয়ে পুরোটা ছিল না।ছিল কম্প্রিহেনসিভ নিয়ে।এম সি কিউ প্রশ্ন।জানা উত্তর। ভুল হবার কোনো জায়গা নেই।পঞ্চাশের মধ্যে ম্যাক্রো ইকোনোমিকসে কাজলবাবুর হাতে থাকা দশ নম্বর সম্ভবত নির্বিচারে কেটে নিয়েছিলেন।ওখানেই আমার টোটালটা মারাত্মকভাবে কমে যায়।অপর্ণা বেশ খুশী ছিল বিষয়টায়।যে ফার্স্ট ক্লাস ও আজ অব্দি তুলতে পারেনি,ওটা কাজলবাবুর 'ইনভিজিবল হ্যান্ড' এর দরাজ আশীর্বাদে বেশ উঠে যাচ্ছিল।ও এতটাই নিশ্চিন্ত ছিল নিজের রেজাল্টের ব্যাপারে, যে ফোর্থ সেমের মার্ক্স ও পল ইকোর বেশীর ভাগ ক্লাস করত না।আমার থেকে নোট নিয়ে নিত।মার্ক্সে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশী,ওখানে কাজলবাবু সুবিধা করতে পারবেন না।তাছাড়া ফোর্থ সেমে রাজর্ষি স্যরের হাতে কুড়ি নম্বর আছে।কিন্তু পল ইকোয় কে হায়েস্ট পাবে এটা পরীক্ষা হবারও অনেক আগে থেকে নির্ধারিত হয়ে আছে।গতবারের সাথে একটাই ফারাক যে এবার সব কিছু আমি বুঝতে পারছিলাম।কিন্তু অসহায় ভাবে দেখে যেতে হচ্ছিল। কিছু করার ছিল না।কাজলবাবুকে সরাসরি চার্জ করাও সম্ভব ছিল না।রিভিউ করতে দিলে নম্বর আরো কমিয়ে দিতে পারে।তাছাড়া ফোর্থ সেমে মার্ক্সিয়ান ইকোনমির পঞ্চাশের মধ্যে তিরিশ আর পলিটিকাল ইকোনমির পঞ্চাশের মধ্যে চল্লিশ ঐ লোকটার হাতে।কাজলবাবু নিয়ন্ত্রণ জিনিসটা নিজের হাতে রাখতে খুব পছন্দ করেন।শম্পা ম্যাডামকে মিথ্যে বলে এপ্রিলের শেষ দু সপ্তাহের আগে ক্লাস ছাড়েননি।আগের সেমে ইন্টারনালের দশ নম্বরের পাঁচ ওঁর হাতে ছিল।বিষ্ণু আর অপর্ণার সাথে কথা বলে উনি পুরো দশ নিজের হাতে রাখেন।বিষয়টা জানতাম না বলে আমি বা বিষ্ণু কেউই আপত্তি করিনি।
আমি লোকটাকে দেখা করব জানিয়ে রিপ্লাই দিলাম চারদিন বাদে।মঙ্গলবার ওঁর ক্লাস ছিল।সেদিন ক্লাসে আরেকবার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালেন ভদ্রলোক।আমার উপর ক্ষেপে গেছেন বুঝতে পারছিলাম।একসময় আমি ফ্যাসিজম নিয়ে একটা প্রশ্ন করায় বোঝাতে গিয়ে সেল্ফ আদারের সম্পর্কে চলে গেলেন।ফ্যাসিজমের ক্ষেত্রে এই আদারিং ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। তারপর সেখান থেকে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক ভাবে চলে গেলেন নারী পুরুষের সম্পর্কে।আমি তখন খাতায় নোট নিচ্ছিলাম।ওঁর দিকে দেখিনি।হঠাৎ বললেন,"নারীপুরুষের সম্পর্ক কি একরকম হয় সবসময়?নারীপুরুষের সম্পর্ক তো কতরকম হয়!"
আমি চমকে উঠে ওঁর দিকে তাকালাম।কথাগুলো আবার বেসুরো মনে হচ্ছিল।উনি অপ্রস্তুত মুখে চোখ নামিয়ে ক্লাসের অন্য প্রান্তে চলে গেলেন।আমি একটা কোণার দিকে,এসির ঠিক পাশটায় বসে ছিলাম।
সেদিন ক্লাসের পর দেখা করতে বলেছিলেন।আমি ওঁর কেবিনে যেতেই খুব ঠাণ্ডা গলায় একটা মাত্র শব্দ বললেন,"কালকে।"
-"আচ্ছা ঠিক আছে।" বলে আমি চলে এলাম।হয় মালটা প্রশ্নের উত্তর জানে না,নইলে আবার কলির কেষ্টপানা শুরু করেছে।শালা বুড়ো ভাম!পড়াশোনার সময় ন্যাকামো পোষায় না।ধূর শম্পা ম্যাডামের থেকেই ব্যাপারটা জানতে হবে।

লোকটা বুধবার দিন,মানে ঠিক পরের দিনই ক্লাসে এসে কোন কথা না বলে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল।আমি সেটা বুঝতে পারছিলাম।কিন্তু ওর দিকে তাকাচ্ছিলাম না।ওর নানারকম করা দেখে বেশ মজা লাগছিল।
কাজলবাবু একবার গলা খাঁকারি দিয়ে আমাকে বললেন,"এই যে…"
প্রসঙ্গত বলে রাখি কাজলবাবু কখনও আমাকে নাম ধরে ডাকেন না।সবসময় এটাই সম্বোধন করেন,"এই যে"।
আমি তাকালাম ওঁর দিকে।উনি খুব গম্ভীর গলায় বললেন,"আমার কিন্তু আজ একদম সময় হবে না।আই'ল বি বিজি।কখন কোথায় থাকব ঠিক নেই।ইউ হ্যাভ টু ফাইন্ড মি।"
আস্তে আস্তে ওঁর মুখের কঠিন ভাব সরে একটা নার্ভাসনেসের ছাপ পড়ছিল,"আজকে মানে ক্লাস আছে?আসতে পারবে না?"
লোকটার অবস্হা দেখে,পাকিস্তানের দিব্যি দিয়ে বলছি আমার মায়া হচ্ছিল।এদিকে নাকটা নীচু করা চলবে না,আর ওদিকে আমাকে একমুহূর্তের জন্য লোকটা মাথা থেকে সরাতে পারছে না।আমি শিওর কাল সারাদিন এবং আজ ঘুম থেকে উঠে এই কথাগুলো বলবে বলে মনে মনে রিহার্স করেছে।
আমি বললাম,"নাহ আজ হবে না।আজ এইচ ও ডির সাথে দেখা করার কথা আছে।"
(কোনও ব্যাপার না বুড়ো,নম্বর তো দেবে না।একটু ছটফট কর বরং।আমার কিচ্ছু নেই,কিন্তু তোমাকে আঘাত করার ক্ষমতা আছে।তোমার মানসিক শান্তি নষ্ট করার ক্ষমতা আছে।)
-"আজকে দেখা করতে হবে?ওহ্।" মলিন মুখে বললেন কাজলবাবু।গলার হতাশাটা চেয়েও লুকোতে পারলেন না।
-"নেক্স্ট উইক আপনার সাথে কথা বলে নেব।কেমন?আমার আরো কয়েকটা কোয়েশ্চেনস আছে,পাঠিয়ে দেব আপনাকে।"
-"ঠিক আছে।"বলে মুখে আবার গাম্ভীর্য ফিরিয়ে এনে পড়াতে শুরু করলেন কাজল বাবু।

হুম বদমাশ বুড়ো, অপেক্ষা কর।দেখ জ্বলুনির ৫০% কিরকম হয়।আমারও মার্কশিট দেখে এইরকম রাগ হয়েছিল।এই ফোর্থ সেমটা জ্বর,উঠতে পারছি না এরকম পিঠেব্যথা,আক্কেল দাঁতের বীভৎস ব্যথা-ইত্যাদি ইত্যাদি হলেও আমি প্যারাসিটামল খেয়ে ক্লাস করেছি।আর একজন কখনও চুরি হওয়া,কখনও ঘুম থেকে উঠতে না পারা ইত্যাদি খঞ্জ অজুহাতে ক্লাস না করেও হায়েস্ট পেয়ে যাবে।আর আমি ব্যাঙের মত ড্যাবডেবে চোখে সেটা ব্রহ্মজ্ঞানীর মত দেখে যাব।একটু যন্ত্রণা যে তোমারও পাওনা হয় প্রিয় পার্ভার্ট জেঠু।তুমি আমাকে নম্বর দেবে না।আমি তোমাকে দেখা দেব না।উফ নিজেকে কিরকম ছিন্নমস্তা ছিন্নমস্তা লাগছে।লোকটা আমার জন্য সামনের সপ্তাহে অপেক্ষা করবে আর আমি যাব না।কিরকম একটা হাড়মুড়মুড়ে পৈশাচিক উল্লাস হচ্ছে ভাবলেই।

পর্ব ১২

কাজল ভট্টাচার্যের কথা

সেদিন ফোর্থ সেমের কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষা ছিল।ঐদিন আমার সাথে মার্ক্সিয়ান ইকোনোমিকসের ছেলেমেয়েদের শেষ বারের মত দেখা করতে আসার কথা ছিল।সঙ্গত কারণেই আমি অডিটোরিয়ামে গার্ড নিইনি।কারণ ওখানে তুমি ছিলে।আমি ডাকা সত্ত্বেও সেই মাওবাদী প্রশ্নটা নিয়ে তুমি আমার কাছে আসোনি।এমনকি গ্রুপ ফোটো তোলার দিনেও ক্লাস করে ফোটো সেশনের ঠিক আগের মুহূর্তে কেটে পড়লে।কেন?অনুপস্হিতি দিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলে?নাকি আমার সাথে এক ফ্রেমে থাকতেও ঘেন্না হচ্ছিল তোমার?কারণটা আমার পক্ষে টেলিপ্যাথিতে বোঝা সম্ভব নয়।তোমায় কোনোদিনই পড়তে পারিনি।একেকসময় এই ভ্রমও হয়েছে তোমার চোখ দেখে যে তুমি আমাকে ভালবাস।যাই হোক নিজের উপর আস্হাটা প্রয়োজনাতিরিক্ত বেশী থাকার কারণে আমার প্রথমটাই মনে হয়েছিল।মানে তুমি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাও।এটা ভেবে সেদিন দারুণ একটা কৌতুক অনুভব করেছিলাম মনে মনে।এরপর ঠিক বৃহস্পতিবার, শম্পাদির ক্লাসের পরে তুমি নিশ্চয়ই আমার কেবিনে হাজির হবে।এরকম প্রত্যাশা যদিও ভিত্তিহীন,তাও মানুষ তো আশাকে সম্বল করেই সার্ভাইভ করে।
আমার ঐ তুরীয়ানন্দে ভাঁটা পড়ছিল একটু একটু করে।তুমি আসনি।এমনকি পরে হয়ত প্রশ্নটা তুমি মেল করতে পার এরকম একটা আশা ছিল।সেখানেও নিরাশ হতে হল।পলিটিকাল ইকোনমির পরীক্ষার দিন অপর্ণাকে চটাবার রিস্ক নিয়েও ভীরু প্রেমিকের মত দাঁড়িয়েছিলাম তোমার সামনে।আমার হৃদস্পন্দন সেদিন কৈশোরের প্রথম পূর্বরাগের সামনে দাঁড়ানোর মত অস্বাভাবিক দ্রুত ছিল।তুমি আমার প্রশ্নের একটা দায়সারা উত্তর দিয়ে খাতায় মুখ গুঁজলে।সেদিন পরীক্ষার পর কেবিনে তোমার অপেক্ষা করছিলাম। জানতাম তোমাকে আসতেই হবে,কারণ এখানে হৃদ্যতার টানের প্রশ্ন নেই,টার্ম পেপার জমা দিতে হত।তোমার একটা শাস্তি পাওনা ছিল।আমাকে নিরাশ করার জন্য।শাস্তিটা হল আমার নীরবতা।তুমি হিয়ার সাথে ঢুকলে,কিন্তু শাস্তিটা দেবার আমাকে কোনো সুযোগ দিলে না।এই ধরনের শাস্তির মূল্য বুঝতে গেলে একটা রক্ত মাংসের তৈরী হৃদপিণ্ড থাকতে হয়।সেটা কি তোমার ছিল তৃষ্ণা?কোনদিন?আমাকে একটা নম্বর দেবার যন্ত্র ছাড়া কোনকিছু ভেবেছ কখনও?
হিয়া আমাকে বারবার ডাকা সত্ত্বেও আমি উত্তর দিচ্ছিলাম না।ঘাড় নীচু করে বসে রইলাম।শেষে ওর হাত থেকে টার্ম পেপারের ফাইলটা নিয়ে টেবিলে রাখলাম।ভেবেছিলাম তুমি আগের মত প্রত্যাশা করবে তোমার থেকেও ফাইলটা নিজের হাতে নেব।সেখানেই তোমাকে নিরাশ করব ভেবেছিলাম।কিন্তু তুমি বিষয়টাকে আমলই দিলে না।সব যেন খুব স্বাভাবিক এভাবে টেবিলে ফাইলটা নামিয়ে রেখে চলে গেলে।এমনকি আমার সাথে ফর্মালিটি রক্ষার্থেও একটা কথা খরচ করলে না।
পরদিন আবার গিয়েছিলাম তোমাদের পরীক্ষার হলে।কারও কোনও প্রশ্ন নিয়ে অসুবিধা আছে কিনা জিজ্ঞেস করতে।যেহেতু আগে দেখেছি এই সাইলেন্ট ট্রিটমেন্টটা তোমার উপর ফলপ্রসূ হয়,তাই এদিনও প্রত্যাশা ছিল তুমি আমাকে যে কোনো অজুহাতে ডেকে কিছু একটা ঠিক বলবে।তুমি আমার দিকে ফিরেও তাকালে না।আমি নিজেই প্রথমটা এগিয়েছিলাম কিছু একটা বলার অজুহাতে।পরে সামলে নিলাম।আরও ষোলো জন মার্ক্সিয়ান ইকোনোমিকসের ছাত্রছাত্রী রয়েছে।তারা কি ভাববে?আমার এই অতিরিক্ত আগ্রহ কি দৃষ্টিকটূ লাগবে না?তার চেয়েও বড় ভয় ছিল তোমার কাছে যদি ধরা পড়ে যাই!
কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষার দিন কিশোরী মেয়ের অনিশ্চয়তা নিয়ে আমার কেবিনে অপেক্ষা করছিলাম।মার্ক্সিয়ান ইকোনোমিকসের ছাত্রছাত্রীরা আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল।তুমি আসনি।এইদিন কিন্তু ফটো সেশনের দিনের মত আনন্দিত হতে পারিনি।উদ্বেগ বাড়ছিল।আমাদের পথ আলাদা হবার দিন এগিয়ে আসছে।যদি আর কোনোদিনও তোমাকে দেখার সুযোগ না পাই।একবার,মাত্র একবার।শেষবারের মত!
আমি আমার মধ্যের সমস্ত মিষ্টত্ব ঢেলে ওদের বিদায় জানিয়েছিলাম।তুমি নিশ্চয়ই খোঁজ নেবে এদিনের ব্যাপারে।তোমার কাছে এই বার্তাটা পৌঁছে দেওয়া খুব দরকার ছিল যে তোমার অনুপস্হিতি আমার মধ্যে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি।আমাকে আঘাত করার ক্ষমতা তোমার নেই।
গ্রুপ প্রোজেক্টের মিটিং এর জন্য এর হপ্তাখানেক পর তোমাদের গ্রুপটাকে দেখেছিলাম।সব্যসাচীবাবুর কেবিনে।সব্যসাচীবাবুর পাশের চেয়ার,একটা কালো পোশাক,লালচে পশমি খোলা চুল।চেয়ারের হাতলে উজ্জ্বল ফর্সা মসৃণ হাতের আভাস।মুখ দেখা যাচ্ছিল না।তাও আমার চিনতে দেরী হয়নি।ঐ চেহারার অণুপরমাণু আমার রক্তবিন্দুর চেয়েও বেশী চেনা।একবার এদিকে তাকাবে না তৃষ্ণা?
ওহ ভগবান আর কোনোদিন তোমায় দেখতে পাব না আমি।দুদিন আমার সামনে, হয়ত বাধ্য হয়েই সেই অমোঘ স্তোত্রটা উচ্চারণ করেছিলে তুমি।এত সহজে ভুলে গেলে সব?"যদিদং হৃদয়ং তব,ততস্তু হৃদয়ং মম।যদিদং হৃদয়ং মম,ততস্তু হৃদয়ং তব।"অস্বস্তি আর লজ্জায় গোলাপি হওয়া মুখে আমাকে বাংলা অনুবাদটাও বলতে বাধ্য হয়েছিলে,কম্পিত চোখের পাতা তুলে,"যা তোমার হৃদয়,তাই আমার হৃদয়।যা আমার হৃদয় তাই তোমার হৃদয়।"জান তৃষ্ণা,আজ পর্যন্ত অজস্র মেয়ে ও মহিলার বিছানা গরম করলেও কোনো নারী আমার জন্য এই মন্ত্রটা উচ্চারণ করেনি।এমনকি শর্মিষ্ঠাও না।যেহেতু আমাকে লোকসমাজে নাস্তিক সাজতে হয় তাই আমাদের বিয়েটা মন্ত্র পড়ে হয়নি।তোমার জীবনেও তো কোনো পুরুষের সাথে কখনও এই মন্ত্রটা বলার সুযোগ হয়নি।আমি জানি তুমি শুয়ে বেড়ানোর মেয়ে নও।ঐ উচ্চারিত মন্ত্রের লয়ালটি থেকেই না হয় একবার ফিরে তাকাও।নইলে আমরা তো সমান্তরাল রেখা হয়েই আছি।ঘৃণা বা বড়জোর নিষ্পৃহতা ছাড়া কিচ্ছু থাকার ছিল না আমাদের মধ্যে।শুধু একবার,শেষবারের মত তোমার মুখটা দেখতে চাই।অপর্ণা আমাকে প্রতিদিন রিপোর্ট করে তুমি একজন মানুষ হিসাবেও কতটা নিকৃষ্ট। ওকে একটাও নোট দিচ্ছ না।আমার ব্যাপারে অসংখ্য অশ্রদ্ধাপূর্ণ মন্তব্য কর অপর্ণার কাছে।আমি জানি তোমার মত নিম্নস্তরের মানুষের পক্ষে এটা সম্ভব।এর উত্তরও তোমায় দেব।অপর্ণা মিথ্যে বলতে পারে,তবে কথাগুলো সত্যি না হবারও কোনো কারণ নেই।আগের দিন তুমি ইচ্ছাকৃত ভাবে পা এগিয়ে দিয়ে আমাকে ফেলে দেবার চেষ্টা করেছিলে।অনেকদিন ধরে অধ্যাপনা করছি,মাথার চুলগুলো রোদে পাকেনি,এগুলো বুঝতে পারি।তাও ঘৃণা ঘৃণার জায়গায়,একটা কোথাও তো অন্তত ঐ স্তোত্রটা তোমায় বেঁধে রেখেছে,ওটার নামেই একবার ফিরে তাকাও।শেষ পর্যন্ত আমি দরজায় তোমার দৃষ্টি টানার জন্য খুব জোর দড়াম করে লাথি মারলাম তাও তুমি তাকালে না।যেন জেদ করেই সামনে ফিরে বসে রইলে।অথচ শব্দটা এত জোরে হয়েছিল যে সব্যসাচীবাবু ও তোমার গ্রুপের অন্য ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত ফিরে তাকিয়েছিল আমার দিকে।আর কত হাস্যস্পদ করব নিজেকে তোমার জন্য?তোমার মত একটা হৃদয়হীন অনুভূতিবিহীন মরীচিকার জন্য?
আমি ক্রমশই ডেসপ্যারেট হয়ে উঠছিলাম।প্রেজেন্টেশনের দিন তোমাদের ঠিক পরের স্লটটা বাছলাম।ঐ একটাই সুযোগ অবশিষ্ট ছিল।তারপর হাজার শতক কালাহারি পার হয়ে মরুদ্যান,তোমাকে দেখতে পেলাম।তোমার শরীরের রঙের সাথে প্রায় মিশে যাওয়া মাখন মাখন একটা সালোয়ার কামিজ,আর নববধূর মত লাল তোমার ওড়না।তোমাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।নরম শরীর,চট করে ক্লান্তির ছাপ পড়ে যায়।আমি তোমার ঐ মুখটা ঘরভর্তি লোকের মধ্যেও কল্পনা করছিলাম রতিক্লান্ত হয়ে আমার বুকে পড়ে আছে।ওহ ভগবান এসব কি ভাবছি,আমি তোমার প্রেমে পড়তে চাই না।
সেদিন যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছিলে না।সবার চোখ যখন প্রোজেক্টরের দিকে তখন আমি তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ঘরের পিছনে,যেখানে ছাত্রছাত্রী বা কোলিগরা আমাকে দেখলে চরম অপ্রস্তুত হতে হবে জেনেও আমি এত বড় রিস্কটা নিয়েছিলাম।তুমি যাতে একবার তাকাও তার জন্য দেওয়ালে টিকটিকির মত শরীর লাগিয়ে হাত পা নাড়াচ্ছিলাম।তুমি আমার দিকে তাকালে না।তোমার বেরিয়ে যাবার সময় তোমার পথে একবার চলে এলাম,তুমি থেমে গেলেও আমাকে দেখলে না।অগত্যা আমাকে নিজের জায়গায় আবার ফিরে যেতে হল।তুমি নিষ্পৃহভাবে চলে গেলে।
আমি কিন্তু হাল ছাড়ার লোক নই।পরেরদিন আমার লেখা একটা আর্টিকেল মেল করেছিলাম পল ইকোর মেল আইডিতে।জানতাম ওটা তুমি অপারেট কর।যদিও সাবধানতা রক্ষার্থে ঐ মেলটা আরও অনেকগুলো অ্যাড্রেসে পাঠিয়েছিলাম।আমাকে তোমার ক্ষেত্রে প্রতিমুহূর্তে সাবধানতা অবলম্বন করতে হত।যাতে তুমি ছাড়া কেউ না বোঝে আমি কত বড় শুওরের বাচ্চা।যাতে তুমি কোনদিন কাউকে কনভিন্স করতে সক্ষম না হও যে ডঃ কাজল ভট্টাচার্য প্রকৃতপক্ষেই একটা শুওরের বাচ্চা।যাই হোক যথারীতি ঐ মেলটারও কোনো উত্তর পেলাম না।তোমার জন্য খুব ভয়ঙ্কর একটা শাস্তির পরিকল্পনা করছিলাম।স্বঘোষিত মার্ক্সবাদী আমি,প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছিলাম তোমার তরফ থেকে একটা কিছু প্রতিক্রিয়ার।
এরকম একটা দিনেই তোমার সেই মেলটা আমার কাছে এসেছিল।এস ও পি দেখে দেবার অনুরোধ করে।আমার আহত পৌরুষের মলম হয়ে।আমার কাছে ওটাই তোমার সমর্পণ ছিল।নাহ আর হয়ত তোমাকে প্রয়োজন হবে না।কেন অত বিনীত ভাষায় মেলটা লিখেছিলে তৃষ্ণা?আমি বিহ্বল হয়ে গেলেও আগের মত অসংযমের পরিচয় দিইনি।তোমার তরফে কতটা তৃষ্ণা আছে পরীক্ষা করছিলাম।মেলটার কোনো উত্তর দিইনি।ঘণ্টাখানেক বাদে আবার তোমার একটা মেল এসেছিল যাতে তুমি লিখেছিলে তুমি শম্পাদির আন্ডারে রিসার্চ করতে চাও,তাই এম ফিলের নিয়মের ব্যাপারটা জানতে চেয়ে।এম ফিল বানানটা ভুল ছিল,দুটো এল।টাইপের ভুল অথবা তোমার অজ্ঞতা।আমি সারারাত সেদিন ঘুমোতে পারিনি।এতদিনে একটা সুযোগ পেয়েছি।তোমার এস ও পি আমি দেখে দেব না।আমি এমন কোনো সুবিধা তোমায় দেব না যা অপর্ণা পাচ্ছে না।অপর্ণা অবশ্য আমাকে এস ও পি নিয়ে কোনো অনুরোধই করেনি,তাও তোমার একটা কথা জেনে রাখা দরকার যে অপর্ণা আমার প্রায়োরিটি তালিকায় সবসময় তোমার আগে আসবে।তোমার অত মধুমিশ্রিত শব্দচয়নের কারণটা অনুমান করতে পারছিলাম।পরীক্ষার খাতাটা যাতে আগের সেমের মত নির্মম হাতে না দেখি।আর এস ও পি টাও দেখিয়ে নেওয়া যাবে।আমি তোমার চোখে তো একজন পরীক্ষক আর শিক্ষকের বেশী কিছুই নই।তাই যে কর্তব্যটা তুমি বিনয়ের অবতার সেজে আশা করছ সেটাও আমি পালন করব না।তবে কি জান তো তৃষ্ণা, তুমি একবার সবটুকু সমর্পণ করে ডাকলে হয়ত সব ভাসিয়ে দিয়ে চলে…… ধূর কিসব অকিঞ্চিৎকর চিন্তা করছি।তোমাকে একটা লেবুর মত নিংড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত।
আমি যেহেতু তোমাকে আরও অনেক বেশী হেনস্হা করার সুযোগ হাতে রাখতে রাখতে চাই,তাই মেলটার উত্তর দেওয়াই শ্রেয় মনে করলাম।সত্যি বলতে তর সইছিল না।খুব সকাল সকাল উঠেই তোমার মেলটার উত্তর দিলাম।
আমিও তোমার মত আবেগ বোমা ফাটালাম যাতে ভবিষ্যতেও তুমি ধ্বংস হতে আমার কাছে ফেরো।যদিও তোমার এস ও পিটা শহরের বাইরে থাকার খঞ্জ অজুহাতে দেখে দিলাম না।বললাম বাড়ী ফিরলে এম ফিলের নিয়মটা তোমায় জানাতে পারব, যাতে তুমি পরে আবার আমাকে মেল কর।
"প্রিয় তৃষ্ণা"
হ্যাঁ ইচ্ছাকৃত ভাবে এই সম্বোধনটাই লিখেছিলাম।একমাত্র বিশেষ উদ্দেশ্য না থাকলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য আমি 'প্রিয়' শব্দটা ব্যবহার করি না।কিন্তু ঈশ্বর জানেন তোমায় কত শতাব্দী ধরে এটা সম্বোধন করতে চেয়েছি।প্রিয়,প্রিয়া,প্রিয়তমা।

 

পর্ব ১৩

তৃষ্ণার কথা

অপর্ণার বাড়ী ছিল দক্ষিণ কলকাতায়।ফোর্থ সেমিস্টারটা অপর্ণা পরিশ্রম করে এত দূরে ক্লাস করতে আসাটাই প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল।কি দরকার!যখন জানাই আছে পল ইকোয় হায়েস্ট নম্বরটা বাঁধা।সময়মত কোয়েশ্চেন পেপারও হাতে এসে যাবে।আর আমি, সব জেনেও ওকে প্রত্যেক ক্লাসের নোট যোগান দিয়ে গেছি।সন্দেহ নেই আমার এই বোকামিগুলো দীর্ঘদিন কুত্তাঞ্জন আর অপর্ণাকে হাসির রসদ যুগিয়েছে।হয়ত আমার নির্বুদ্ধিতা আজ ওদের কাছে একটা প্রবাদে পরিণত।মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে কুত্তাঞ্জনকে একটা ইমেল পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করি,"আচ্ছা মাস্টারমশাই, আপনার নিজের মেয়েটা যদি কারোর হাস্যরসের উপাদান হয়?এইভাবে?"
প্রশ্নটা অর্থহীন।নিজের মেয়ে আর অন্যের মেয়ে এক নয়।কুত্তাঞ্জন স্ট্যালিনকে মার্ক্সবাদী বলে স্বীকার করত না।গুলাগ,হলোডোমোর ইত্যাদি রটনা বা ঘটনা সত্ত্বেও ঐ লোকটাকে আমি শ্রদ্ধা করি।স্ট্যালিন নিজের ছেলেকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে মরার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন।সুযোগ পেয়েও একজন যুদ্ধবন্দীর বিনিময়ে তার মুক্তিপণ মেটাননি।তাঁর যুক্তি ছিল "আমার দেশের আর যে হাজার হাজার ছেলে যুদ্ধবন্দী হয়ে রয়েছে তারাও তো আমারই ছেলে।নিজেরটাকে ছাড়িয়ে নিলে তাদের মায়ের কাছে কি কৈফিয়ত দেব?"
আর কে না জানে ধ্বনিকে প্রতিধ্বনি ব্যঙ্গ করে!
একটা জায়গায় ওদের কাছে ইনফর্মেশনটা পুরোপুরি আপডেটেড ছিল না।ওরা জানত না যে যা ঘটছে সেটা আমি জানতাম,তাও অপর্ণাকে নোট দিতে কোনদিন আপত্তি করিনি।শেষের দিকে ও এতটাই গা ছাড়া হয়ে গেছিল যে কয়েকটা ক্লাসের ডেট পর্যন্ত মনে ছিল না।ভটচায ওর জন্য প্রতিটা ক্লাসের ডেট আমার আর বিষ্ণুর কাছে চেয়েছিল।অবশ্য তখন জানতাম না অপর্ণার জন্য চাইছে।শুধু কাজলবাবুকে ডিফাই করব বলেই দিইনি।পরীক্ষার মাত্র কয়েকদিন আগে বিষ্ণু ভটচাযকে ডেটগুলো পাঠায়।তার পরপরই অপর্ণা আমার কাছে ডেটগুলো পাঠিয়ে সেই দিনের নোট চায়।তখন আর ঐটুকু সময়ে ওর জন্য খুঁজে দেখার মত ধৈর্য অবশিষ্ট ছিল না।এতদিনেও কি আমি অপর্ণার মন জয় করতে পেরেছি?এত কিছু করেও?অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে আমি সব জেনেও কেন ওকে নোটের যোগান দিচ্ছিলাম?
দিচ্ছিলাম আদর্শগত কারণে।দুটো মেয়ের মধ্যে বিভেদ তৈরী করার যে চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিক নোংরামিটা কাজল ভট্টাচার্য করছিল তার বিরুদ্ধে এটা আমার বিপ্লব ছিল।যদি অপর্ণা নিজের ভুল বোঝে।যদি বোঝে আমি ওর প্রতিদ্বন্দ্বী নই,কমরেড।
কিন্তু সেটা হয়নি।তবে আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি।কমরেডশিপ আজকের আত্মরতির যুগে মূল্যহীন।বিপ্লবের মূল্যবোধ সত্তরের দশকের সাথে ইতিহাসে প্রবেশ করেছে।শুধু আমি,আজও সত্তরের দশক আঁকড়ে অ্যানা ফ্র্যাঙ্কের বিশ্বাস ধরে বসে আছি।যে বিশ্বাস বলে মানুষ আসলে খারাপ নয়।অপর্ণা আমাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া কিছুই মনে করেনি।আমার আর্থিক অবস্হা থেকে শুরু করে যে কোনো বিষয়ে আমাকে প্রতি পদক্ষেপে হেয় করেছে।সেটাকেও আমি সহানুভূতির চোখে দেখতাম।কারণ জানতাম ঐ মানুষের চেহারার দৈত্যটাকে ও ভালবাসে।আমি এখানে নিমিত্তমাত্র, যে বিষয়টা ওকে দগ্ধ করত তা হল কাজল ভটচাযের আমার প্রতি অযাচিত মনোযোগ।
একটা কথা ভাবলে খারাপ লাগে, আমি নিজেও শেষ মুহূর্তে নির্লিপ্ত থাকতে পারিনি।রেজাল্ট আউট হবার পর সারা সেমিস্টার ক্লাস না করেও যখন দেখি অপর্ণা পঞ্চাশে ৪১ পেয়েছে,আর আমার নম্বর অস্বাভাবিক ভাবে কমে ৩৯,আমি একটা পুরোনো অভিজ্ঞতার শোধ তুলতে চেয়েছিলাম।থার্ড সেমিস্টারের পরে আমাকে নম্বর নিয়ে বিদ্রূপ করার ঘটনাটার।আমি ওকে বলেছিলাম আমি ৪৩ পেয়েছি।ভীষণ শকড হয়েছিল।পরে ওর হাতে নির্ঘাৎ কাজলবাবু দু চারটে থাবড়া খেয়ে গেছেন।তারপর হয়ত ধীরে ধীরে ওকে কনভিন্স করতে সক্ষম হয়েছেন যে তৃষ্ণা সত্যি বলেনি।


পর্ব ১৪

কাজল ভট্টাচার্যের কথা

"কোনো প্রাপ্তিই পূর্ণ প্রাপ্তি নয়
কোনো প্রাপ্তি দেয় না পূর্ণ তৃপ্তি
সব প্রাপ্তি ও তৃপ্তি লালন করে
গোপনে গহীনে তৃষ্ণা তৃষ্ণা তৃষ্ণা।"

ইদানীং আমার কেমন যেন মনে হয় আমরা নরকের পঙ্কিলতম স্তরে ডুবে থাকা দুটো প্রেতাত্মা।আমি আর অপর্ণা।হাবিয়া দোজখের সম্রাজ্ঞী অপর্ণা।আর আমি ওর পদানত দাসানুদাস। এই দুনিয়ায় তৃষ্ণা নামের কোনো দেবীর অস্তিত্ব নেই। শুধু ধূমকেতুর মত আমার স্মৃতিতে বা স্বপ্নে ওর একটা গোলাপি কুয়াশা হয়ে জেগে ওঠা ছাড়া।একটা প্রশ্ন এত মাস পরেও আমাকে হন্ট করে।আমি কি ওকে কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও ভালবেসেছিলাম?
উত্তরটা হচ্ছে 'না'।উত্তরটা যে নঞর্থক,সেটা প্রমাণ করার দায় আমার শুধু অপর্ণার কাছে নয়,নিজের কাছেও ছিল।আমি তৃষ্ণাকে ভালবাসিনা,কোনদিন বাসতামও না।ভালবাসলে কেউ কারোর ক্ষতি করতে পারে না।আমি ওর ক্ষতি করেছি।ওদের থার্ড সেমে কম্প্রিহেনসিভের পেপারে আমার হাতে থাকা ম্যাক্রোইকোনোমিকসের পার্টে পুরো দশ নম্বর কেটে নিয়েছিলাম।মার্ক্স আর পলিটিকাল ইকোনোমির খাতাও যতটা সম্ভব চেপে দেখেছি।কিন্তু থার্ড সেমের সময়ই আমি বুঝেছিলাম অপর্ণার বিদ্যাবুদ্ধির যা দৌড়,শম্পাদির হাতে কুড়ি নম্বরও ছাড়লে ও তাতে শূন্য পাবে।গ্র্যাজুয়েশনে ইকোনোমিকসের মত সাবজেক্টে ফিফটি ফাইভ পার্সেন্ট পাওয়া মেয়েকে আর যাই হোক পলিটিকাল ইকোনমিতে এইট্টি পার্সেন্ট পাওয়ানো যায় না।তাই শম্পাদিকে মিথ্যে বলে আমি এপ্রিলের শেষের আগে ক্লাস ছাড়িনি।
ফোর্থ সেমে কি মার্ক্স,কি পলিটিকাল ইকোনমি-তৃষ্ণার খাতায় একটা দাগ দেবারও জায়গা ছিল না।তৃষ্ণা দারুণ কিছু ছাত্রী নয়,তাও একটা ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া মেয়ে।তবে ও মেনস্ট্রিম ইকোনোমিকসে খুব ভাল না হলেও মার্ক্সবাদে ওর জ্ঞানের গভীরতা আছে।ওর পড়াশোনার অভ্যাস আছে।এবং ও এমন অনেক বিষয় বিশদে জানে যা সবসময় আমারও জানা থাকে না।
রাজর্ষির হাতে মার্ক্সের পেপারে কুড়ি নম্বর ছিল।আমি আগেই জানতাম অপর্ণা ওখানটা ঝোলাবে।আমার পার্টে থাকা তিরিশ,পেপারে কুড়ি আর ইন্টারনালে দশ।খাতা ঠিকমত চেক না করেই ওকে প্রায় ফুলমার্ক্স বসিয়ে দিলাম।তৃষ্ণার খাতায় যতটা সম্ভব চাপতে হল।বেশ অন্যায্য ভাবে কিছু জায়গা কাটাকুটি করলাম।কারণ আমি জানি ও রাজর্ষির পার্টে নিশ্চয়ই ভাল নম্বর তুলবে।ও কোনোভাবে চল্লিশের উপর পেয়ে গেলে অপর্ণা আমাকে ছাড়ত না।আমার এত চেষ্টা সত্ত্বেও অপর্ণা মাত্র একতিরিশ পেল মার্ক্সের পেপারে।তৃষ্ণা ওর থেকে অনেকটা বেশী পাওয়ায় আমাকে অপর্ণার কাছে বেশ কিছু অশ্লীল কথা শুনতে হয়েছে।ওর বক্তব্য আমি আমার পার্টে আরও কেন কমিয়ে দিলাম না।অপর্ণা যেটা বোঝে না সেটা হল তৃষ্ণা আর টি আই এ খাতা দেখতে চাইলে আমি ঝামেলায় পড়ে যাব।আমাকে এমন সূক্ষ্মভাবে কাজটা করতে হবে যাতে তৃষ্ণা সব বুঝেও আমার বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপে না যেতে পারে।তৃষ্ণার সাথে সরাসরি শত্রুতায় আমি যেতে চাই নি।সেটা শুধু আমার নিজের দুর্বলতার কারণে নয়।কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়তে পারে।আমি যে পলিটিকাল ইকোনমির কোয়েশ্চেন পেপার পরীক্ষার আগেই অপর্ণাকে দিয়ে দিয়েছিলাম এটা জানাজানি হলে আমার চাকরি চলে যাবে।যদিও তারপরও অপর্ণা খাতায় বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি।
কোনো খাতা ইভ্যালুয়েট করার সময় যদি ছাত্রছাত্রীদের মুখ চেনা থাকে,তাহলে পারফর্মেন্স ছাড়াও অনেকগুলো বিষয় মাথায় রাখতে হয়।যেমন কেউ যাতে আমাকে বায়াসড না ভাবে।বিশেষ করে আমি যেখানে নিজে জানি আমি কতটা চরম মাত্রায় বায়াসড।যেমন গত বছর সায়ন্তনী মার্ক্সের পেপারে হায়েস্ট পেয়েছিল।তাই এবছর ও যাতে হায়েস্ট না পায় সেদিকে দৃষ্টি রাখা।তাছাড়া ও হায়েস্ট পেলে অপর্ণা আমাকে মেরে ফেলত।আরেকটা জিনিস হচ্ছে পলিটিকাল ইকোনোমির ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা মাত্র তিনজন।ওদের সাথে সপ্তাহে মার্ক্স আর পল ইকোর ক্লাস মিলিয়ে আমার চারদিন দেখা হচ্ছে।তাই কেউ যাতে না ভাবে আমি ওদের বেশী ঘনিষ্ঠ,তাই ওদের মার্ক্সের খাতার নম্বরটা চেপে দেওয়া।অপর্ণাকে পল ইকোয় হায়েস্ট পেয়েই তাই খুশী থাকতে হচ্ছে।আসলে ওরও তো কয়েকটা বাধ্যতা আছে।শি কান্ট এফোর্ড টু লুজ মি।ওর মত একটা ব্রেনলেস ক্রিচারের অ্যাকাডেমিয়ায় আমি না থাকলে কোনো ভবিষ্যৎ নেই।আরেকটা বিষয়,যা ওতোপ্রোতভাবে ওকে আমার সাথে জড়িয়ে রেখেছে তা হল আমাদের একই জাতীয় যৌন পছন্দ।যেটা স্বাভাবিক মানুষরা অনেকেই বিকৃত বলে ভাববে।এমনকি আঁতকে উঠবে।
আমরা দুজনেই স্ক্যাটোফাইল।মানুষের যে রেচন বা বর্জ্য পদার্থ দেখলে সাধারণত লোকে নাক সিঁটকায় সেগুলো আমরা দুজনেই পছন্দ করি।আমার ডার্কেস্ট ফ্যান্টাসিগুলো একমাত্র ওর কাছে আমি ডিসক্লোজ করতে পারি।ব্রথেলগুলোতে আমার স্ট্যান্ডার্ডের মেয়ে পাওয়া কঠিন,পাওয়া গেলেও তাদের এক রাতের রেট দেড় থেকে দু লাখের কম হয় না।অবশ্য আমার এটুকু খরচ করার মত সঙ্গতি আছে,তবে নিয়মিত না হলেই ভাল।আমি একটা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ও একটা নেপালী মেয়ের কাছে গেছি।প্রচুর খরচা করেই গেছি।কিন্তু ওরা আমার প্রয়োজনগুলো পূর্ণ করতে চায়নি।ওগুলোর জন্য আমাকে যে স্তরের মেয়েদের কাছে যেতে হবে,সেটা আবার আমার রুচিতে পোষাবে না।তাই অপর্ণা।সর্বোপরি,তৃষ্ণাকে নিয়ন্ত্রণের আমার হাতের সব চেয়ে বড় অস্ত্র ছিল অপর্ণা।একটা ট্রায়াঙ্গেল তৈরী রাখা,তৃষ্ণাকে সবসময় একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা ওর প্রতি আমার যা কিছু সেই বিষয়ে-যাতে প্রতি মুহূর্তে আমার মনোযোগের জন্য তৃষ্ণাকে আরেকজনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিয়োজিত থাকতে হয়।ওটাই যে কোনো সম্পর্কে নিয়ন্ত্রণের রাশ।যে কোনো নারীকে, কিছুদিনের জন্য হলেও দারুণ ফলপ্রসূভাবে ওটা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।যদিও তৃষ্ণার ক্ষেত্রে এই বিষয়টার প্রয়োগ আমাদের মধ্যে দিনের পর দিন ক্রমশ দূরত্ব বাড়িয়েছে। তৃষ্ণা ঐ ত্রিভুজটাকেই প্রত্যাখ্যান করেছে।একটা কটূ শব্দ,একফোঁটা স্যাভেজারি এড়িয়েও কিভাবে বিদ্রোহ করা যায়,তার জ্বলন্ত দলিল আমার মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়ে নিষ্পৃহভাবে বিপ্রতীপে হেঁটে চলে গেছে তৃষ্ণা।

এই ডিবচারিগুলো আমাকে শর্মিষ্ঠার থেকে লুকিয়ে করতে হয়।তাও কয়েকবার ধরা পড়ে গেছি।যদি কখনও ও সত্যিই ফেড আপ হয়ে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেয় তাহলে আমি অপর্ণাকে বিয়ে করতে পারি।কিন্তু তাতে সমস্যা আছে।শুধু যৌন প্রয়োজনে বিয়েটা আমার মত লোকের পক্ষে হেলদি নয়।শর্মিষ্ঠার আত্মসমর্পণ, বিশ্বস্ততা, ভালবাসা বা আণুগত্যের ছিঁটেফোঁটাও কি আমি অপর্ণার কাছে পাব!অবশ্য আমার মত নোংরা লোকের কাছে ওসবের মূল্য খুব বেশী নয়,তাও একটা জায়গায় দরকার আছে।অপর্ণা যা প্রতিহিংসাপরায়ণ মেয়ে,কোনো কারণে আমার উপর অফেন্ডেড হলে ৪৯৮ ঠুকে আমাকে জেল খাটিয়ে দিতে পারে।সত্যি বলতে আরো অনেক কিছুই করতে পারে যা আমার পক্ষে খুব একটা ভালো নয়।শর্মিষ্ঠা শুধু ভালবাসে বলেই আমার মত একটা সাক্ষাৎ বরাহনন্দনকে এতবছর সহ্য করছে।কিন্তু আমি আমার পছন্দগুলো শর্মিষ্ঠা বা আমার অন্যান্য যৌনসঙ্গীদের বলতে পারব না।তাতে প্রথমে জুতো খাবার ও পরে সমাজে দানব হিসাবে পরিচিতি লাভের সম্ভাবনা আছে।আমি যে কোনো চিরাচরিত মধ্যবিত্ত মানসিকতার বাঙালী আঁতেলের মতই নিজের ইমেজ সম্পর্কে সচেতন।আমার চরিত্র যেমনই হোক ইমেজে একটুও কালি লাগাতে আমি পছন্দ করি না।সত্যি কথা বলতে অতটা দম নেই।ক্লাসে বা ফেসবুকে বিপ্লবী সাজা যায়,সমাজে থাকতে গেলে তো সমাজের নর্মস মেনেই চলতে হবে রে বাবা।তাতে কেউ আমাকে ভণ্ড ভাবলে আমার কিচ্ছু যায় আসে না।সারাজীবনে অনেক বড় বড় আগুনখেকো বিপ্লবী তো দেখলাম।ভিতর থেকে প্রত্যেকটা লোক তিনপেয়ে।এবং শুওরের বাচ্চা।

পর্ব ১৫

তৃষ্ণার কথা

সময় তখন বিয়াসের স্রোতের গতিতে এগোচ্ছিল।পরপর অনেকগুলো ঘটনা,বাইরের কারো কাছে হয়ত আপাতদৃশ্যে কিছুই উল্লেখযোগ্য নয়।আমারও কি সব মনে আছে!অামিও তো ঐ দিনগুলো মনে রাখতে চাইনি।তখন এগুলো লেখার কথা সেভাবে মনে হয়নি!মানে একেবারে যে হয়নি তা নয়,কিন্তু এই উদ্দেশ্যে ঐ স্মৃতিগুলো ধরে রেখে মানসিক ক্ষয় করতে চাইনি।
ডঃ কাজল ভট্টাচার্য আমার নিষ্পৃহতা নিতে পারতেন না।আমার চিন্তাক্ষেত্রের একচ্ছত্র দখল চেয়েছিলেন।একজন নার্সিসিস্টের যা যা বৈশিষ্ট্য থাকে তার প্রত্যেকটাই ওঁর মধ্যে উপস্হিত ছিল।আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু না হতে পারলে চরম ফ্রাস্ট্রেশনে ভোগা,নিজেকে আকর্ষণের কেন্দ্রস্হলে রাখবার জন্য নিজের একটা রহস্যময় অথচ চার্মিং ভাবমূর্তি তৈরী করা,নিজেকে অন্তর্মুখী দেখানোর চেষ্টা,আশেপাশের মানুষদের থেকে আশা করা যে তারা ওঁর নার্সিসিজমকে প্রশ্রয় দেবে,নিজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রয়োজন বা ইগোকে প্রায়োরিটি লিস্টে সবচেয়ে উপরে রাখা এবং আশা করা যে অন্যরাও সেটা করবে,এবং ম্যানিপুলেশনে দক্ষতা অর্জন করা।নার্সিসিজম একপ্রকার পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার।এরা সবচেয়ে বেশী যেটা ঘৃণা করে তা হল বাউন্ডারি।যেটা টেনে রাখার ফলে আমাকে ওঁর অস্বাভাবিক বিদ্বেষের স্বীকার হতে হয়েছে।কিন্তু এটা টেনে রাখার ফলে আমি একটা বিশাল বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছি।বিপর্যয়টার নাম প্রেম।উনি যেটা করছিলেন সেটা মনঃস্তত্ত্ব পড়ে আসা কোনো মানুষ একটাই উদ্দেশ্যে করে।কখনও অনাদর,ক্ষেত্রবিশেষে রীতিমত অভদ্রতা কখনও আবার আবেগের মিসাইল নিক্ষেপ।যেন ঐ মুহূ্র্তে ওঁর পৃথিবীতে আমি ছাড়া কিছুর অস্তিত্বই নেই। উনি চেয়েছিলেন আমি ওঁর প্রেমে পড়ি।কেন চেয়েছিলেন তার উত্তরটা আজও আমার কাছে ধোঁয়াশা।শুধু আমাকে খাদের ধারে ঠেলে মজা দেখতে?নাকি প্রত্যাখ্যানের সুযোগ পেয়ে নিজের আহত পৌরুষে মলম লাগানো!অথবা,যেটা আমার বিশ্বাস করতে বেশ কষ্ট হয় অর্থাৎ আমাকে বিছানায় টানা।হয়ত সুপ্ত তিয়াসা সেটাই ছিল,তবে অতটা ওঁর সাহসে কুলোত না।পৃথিবীর সবচেয়ে ট্র্যাজিক কেস হল ইমেজের দায়ে হাত পা এবং পুরুষাঙ্গ বাঁধা পড়া কামুক বাঙালী ইন্টেলেকচুয়াল।তার উপর অধ্যাপক হলে তো কথাই নেই।কারণটা যাই হোক,আমাকে মানসিক ভাবে পুরোপুরি ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিলেন ভদ্রলোক।কাউকে নিজের কারণে কষ্ট পেতে দেখলে (সে প্রেমঘটিত হোক আর না হোক) এদের একটা বিচিত্র আনন্দ হয়।অতঃপর নিজের মানসিক স্বাস্হ্যের জন্য যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হল এদের সঙ্গে সমস্তরকম সংশ্রব বর্জন করা।
উনি বিবাহিত,ওঁর আমার বয়সী একটা মেয়ে আছে,ওঁর চেহারাটা মিশরের লোমহীন বেড়ালের মত,ভদ্রলোক অস্বাভাবিক রোগা,বাঁদরের মত লাফালাফি করতেন,ভদ্রলোককে দেখলে কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে ছাল ছাড়ানো মুরগীর কথা মনে পড়ে।ইত্যাদি বিভিন্ন কারণ থাকলেও সেগুলো আমার ওঁর প্রেমে না পড়ার মত কিছু শক্তপোক্ত কারণ ছিল না।আমাদের বয়সী মেয়েরা অনেকেই সাধারণত বুদ্ধির গোড়ায় এবং চোখের উপর পর্দা ফেলে রাখে।ওঁর সামনে,আরও স্পষ্ট করে বললে ওঁর নিয়ন্ত্রণে থাকার অর্থ মস্তিষ্ককে স্টেরয়েডে রাখা।কারণ উনি কখন কি করবেন এটা নিয়ে ওঁকে যারা নতুন চিনছে তাদের মধ্যে একরকম ধোঁয়াশা কাজ করে।এই ধোঁয়াশাটাই মেয়েটির উপর ওঁর নিয়ন্ত্রণের উৎস।সত্যি বলতে গেলে একরকম বিপুল নাটকীয় ও প্রায় অ্যাডভেঞ্চারাস পরিস্হিতি তৈরী করতেন ভদ্রলোক যেখানে উনি ওঁর টার্গেট মেয়েটিকে একবার খাদের ধারে ঠেলবেন,তার সহ্যের সীমার শেষ প্রান্তে নিয়ে আসবেন।তারপর দিনই আবার সে যে মাটির উপর দিয়ে হাঁটে সেটাকে পুজো করবেন,তার পায়ের নীচে নিজের পৃথিবী নামিয়ে রাখার অভিনয় করবেন।আর আমাদের বয়সী মেয়েরা কীর্তিমান পুরুষের কাছে বন্দিত হতে ভালবাসে।এই বন্দনাটা কিন্তু সহজলভ্য হবে না,ওঁকে কোনো একটা নার্সিসিস্টিক খাদ্য জুগিয়ে ওঁর থেকে পুরস্কার হিসাবে পাওয়া যাবে।এই আপাত দুর্লভ বন্দনাই একটা ছাত্রীকে ওঁর দিকে টানবে।মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় এটাকে বলা হয়  হার্ট  অ্যান্ড রেস্কিউ প্রিন্সিপল।শিক্ষক-ছাত্রী,বস-এমপ্লয়ী বা চরম ক্ষেত্রে মানে জেলার-বন্দী এরকম সম্পর্কে দ্বিতীয়জনকে মানসিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার এটা একটা বৈজ্ঞানিক পন্হা।এটাই ট্রমা বন্ডিং এর উৎস।স্টকহোম সিন্ড্রোমও কিন্তু এরকমই একটা নিয়ন্ত্রণের ফল।স্টকহোমে ঘটা ব্যাঙ্ক ডাকাতির সময়ে যারা হোস্টেজ ছিল তাদের মনে পরবর্তী সময়ে ডাকাতদের প্রতি একরকম মানসিক আনুগত্য তৈরী হয় যার ফলে তারা ডাকাতদের গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে পুলিশের সাথে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে। আর আলথুজারের আইডিওলজিকাল স্টেট অ্যাপারেটাসকে যিনি ক্ষমতার সবচেয়ে বড় স্তম্ভ মনে করেন,সেই কাজলবাবুর কাছে বলাই বাহুল্য নিয়ন্ত্রণের এই পদ্ধতিটা খুবই পছন্দের হবে।“রাষ্ট্র-নাগরিকের সম্পর্ক হোক বা একটা সামন্ততান্ত্রিক পরিবারে স্বামী- স্ত্রীর সম্পর্ক,শাসিতের সম্মতিই শাসকের ক্ষমতার ভিত।তাই মানসিক নিয়ন্ত্রণ যে কোনো ক্ষমতা ধরে রাখায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ”- কাজলবাবু পড়িয়েছিলেন আমাদের।

আমার ক্ষেত্রে ওখানেই একটা সমস্যা হয়ে গেছিল।মানে ঐ চার্মটা ভেঙে যাওয়া।নিজেকে ভদ্রলোক প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশী মাত্রায় প্রকাশ করে ফেলেছিলেন আমার কাছে।মানসিক নিয়ন্ত্রকের পক্ষে যে ধূপের ধোঁয়ার আড়ালের রহস্যময়তাটা দরকার সেটা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন কাজলবাবু।আমার মত নাস্তিকের উপর পরওয়রবিগারের আশীর্বাদ কিনা জানি না,ওঁর উদ্দেশ্য সবটা না বুঝলেও আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ইঙ্গিত দিচ্ছিল লোকটা ভাল নয়।আমার চারপাশের লোহার দুর্গটা একটুও শিথিল করলে তার ফল আমার পক্ষে ভাল হবে না।
 

লোকটা ভীতু ছিল,কিন্তু একটা চিরাচরিত নার্সিসিস্টের মতই মেগ্যালোম্যানিয়াক ছিল।আসলে কি ঘটছিল এটা মার্ক্সের ক্লাসের ছেলেমেয়েরা আঁচ করতে পারত না।পলিটিকাল ইকোনমির ছেলেমেয়েরা কিছুটা হয়ত পারত,কিন্তু ওর আন্ডারে থাকা রিসার্চ ফেলো সৌম্যদা বা অপর্ণা কেনই বা আমার জন্য ওর বিরুদ্ধে যাবে!লোকটা সূক্ষ্মভাবে আমাকে অপমান করার সুযোগ বড় একটা ছাড়ত না।অবশ্য আমার ক্ষেত্রেও কথাটা সত্যি,আমিও ঠাণ্ডা বিদ্রোহ চালিয়ে গেছি বরাবর।লোকটার সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল আমাকে প্রতিমুহূর্তে অস্বস্তিতে ফেলা বা হিউমিলিয়েট করার চেষ্টার পরও,এমনকি থার্ড সেমে সরাসরি আমার ক্ষতি করার পরও আশা করত আমার আচরণ ওর প্রতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে।এখানেই মেঙ্গেলের সাথে ওর মিল খুঁজে পেতাম।কিন্তু একটা জায়গায় আমার জয় হয়েছিল।লোকটা মেঙ্গেলের মত নিষ্পৃহ থাকতে পারেনি।আমাকে লোকটা যখন চোখ দিয়ে লেহন করত,তখন ওর চোখে লালসা আর ঘেন্নার সাথে একরকম অসহায়ত্বও দেখেছি।শেষের দিকটায় পুরোপুরি আত্মসংযম হারিয়ে লোকটা দৃষ্টিকটূভাবে উদ্ভট কিছু আচরণ করছিল।
আগের সেমিস্টারের পরীক্ষার সময় কাজলবাবু প্রায় প্রতিদিন আমাদের ঘরে গার্ডের দায়িত্ব নিচ্ছিলেন।এবং আমি সামনে থাকলেও বেশ দৃষ্টিকটূভাবে পিছিয়ে গিয়ে আগে অপর্ণাকে কোয়েশ্চেন পেপার দিচ্ছিলেন,তারপর বিষ্ণুকে,তারপর অন্যদের, সবশেষে আমাকে।উলটোটা করা কোনো অজ্ঞাত কারণে তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল।তাই বোধ হয় ভয়ে এবার আমাদের ঘরে গার্ড নেননি।আমাকে বা অপর্ণাকে কাউকেই তিনি চটাতে চাইছিলেন না।এমনকি আমি শেষদিনের ক্লাসে তাঁকে পা এগিয়ে দিয়ে ফেলে দেবার চেষ্টা সত্ত্বেও না।তাঁর ইগোর মলম পাবার ডেসপ্যারেসি এতটাই বেশী ছিল যে ঐ ঘটনার পরও আমাকে পরিতোষণ করার চেষ্টা করছিলেন।এত ধূর্ত মানুষ,এটা কি আর বোঝেননি যে ঘটনাটা ইচ্ছাকৃত ছিল!
কাজলবাবু আমাদের মত অল্পবয়সী মেয়েদের মস্তিষ্ক নিয়ে খেলতে খুব ভালবাসতেন।সফট টার্গেট ছিল ছাত্রীরা।কারণ কোলিগদের ক্ষেত্রে এগোতে গেলে জুতো খাবার সম্ভাবনা প্রবল।জায়গামত উনি ভদ্রতার প্রতিমূর্তি সাজতে পারতেন।যে অভিজ্ঞতাটা আমার হয়েছে জানিনা আমাদের ব্যাচের আরও কোনো মেয়ের হয়েছে কিনা!এটা নিয়ে নিজেদের আলোচনা করা সম্ভব ছিল না।পরবর্তী সময়ে নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি মেয়েরা নিজেদের মধ্যে খোলাখুলি আলোচনায় বসতে পারলে,পরস্পরের সমর্থনে থাকতে পারলে কাজলবাবুর মত অজস্র পারভার্ট বেত্রাহত সারমেয়র মত দৌড়ে পালায়।আমার লোকটার প্রতি মাঝে মাঝে করুণাও হত।এত সফল একজন মানুষ ভিতর থেকে কি মাত্রায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।চিরাচরিত নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার।তখন মনে হয় বিশ্বচরাচরের সব মেয়েই বোধহয় আমার প্রেমে পড়ছে।একজনের কাছ থেকে একটু কম গুরুত্ব পেলে এদের কাছে সেটা জীবনমরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।ফলস্বরূপ এরা গভীর ডিপ্রেশনে চলে যেতে পারে,আবার চরম ফ্রাস্ট্রেশনের ফলে হিংস্র হয়ে উঠে অন্যদের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে।নীতিবোধ ব্যাপারটা এই জাতীয় মানসিক রোগীদের কাছে আশা করা বাহুল্য।কাজলবাবুর দ্বিতীয় অবস্হাটা হয়েছিল।পলিটিকাল ইকোনমির ক্লাসটাকে ভদ্রলোক নিজের হারেম ভাবতে শুরু করেছিলেন।আর নিজেকে সম্রাট গোছের কিছু একটা।এই সময় তাঁর উচিত ছিল মনোবিদের সাথে যোগাযোগ করা।কিন্তু তা না করে তিনি এদিক ওদিক গুঁতিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।মাথাটা শেষের দিকে তিনি পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো আর গুঁতোনো ছাড়া কোনোকাজেই ব্যবহার করতেন না।কোনো প্রশ্ন করলে ঠিকঠাক উত্তর পর্যন্ত দিতে পারতেন না।শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়,অনেকের ক্ষেত্রেই।যেমন একটা ছেলে হলোকাস্ট নিয়ে প্রশ্ন করায় এড়িয়ে গেলেন।ক্লাসে এসে একটা বইয়ের চ্যাপ্টারের নাম রোজ ভুল বলতেন,লেনিনের স্ত্রীয়ের নামটা পর্যন্ত ভয়ঙ্কর ভাবে ভুল বলেছিলেন।ম্যাডাম কোল্লনতাইকে তাঁর স্ত্রী বলে দিলেন।
শেষদিন আমার সিজিওর অফ পাওয়ার নিয়ে ভায়োলেন্ট মতকে পর্যন্ত সমর্থন করে মেনে নিলেন প্রতিরোধ দরকার।সম্ভবত চাইছিলেন যাতে মাওবাদীর প্রশ্নটা নিয়ে আমি আবার ওঁর কেবিনে যাই।আগের সপ্তাহে কয়েকবার ডেকেছেন,এড়িয়ে গেছি।যাই হোক তা সত্ত্বেও যাইনি।উত্তরটা শম্পা ম্যাডামের সাথে আলোচনা করে নিয়েছিলাম।
আমাদের পলিটিকাল ইকোনমি পরীক্ষার দিন ভদ্রলোক যখন হলে এসেছিলেন আমি তাঁকে লক্ষ করিনি।মানে খাতার দিকে মনোযোগ ছিল।হঠাৎ উপলব্ধি করলাম অপর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে কিরকম চোর চোর ভঙ্গিতে ওকে জিজ্ঞেস করছেন,"কোয়েশ্চেন ঠিক আছে তো?"
অপর্ণা আমার সামনের বেঞ্চে বসেছিল।
আমি যেহেতু কাজলবাবুর নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব দেখে অভ্যস্ত তাই ওদিকে তাকানোর প্রয়োজনবোধ করলাম না।প্রশ্নটা অপর্ণাকে করে বেরিয়ে যাবেন,এটাই স্বাভাবিক।কখনও আমি আর অপর্ণা একসাথে থাকলে এরকম ঘটনা বেশ কয়েকবার হয়েছে যে ভদ্রলোক আমাকে চিনতেই পারলেন না,ওর সাথে কথা বলে গেলেন।একসময় যে সেগুলো খারাপ লাগত না তা নয়, তবে এখন লাগে না।কারণ এই চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো উপেক্ষাগুলোর কারণটা উপলব্ধি করতে পারি।আমি লিখছিলাম,হঠাৎ ফিল করলাম কাজলবাবু তাঁর সাদা কঙ্কালসার হাতটা আমার সামনে এসে অদ্ভুত ভাবে নাড়ছেন।আমি একটু অবাক হয়ে তাকালাম।(ভদ্রলোক কেন যে আমায় নাম ধরে সরাসরি সম্বোধন করেন না!)উনি অপ্রতিভ ভাবে বললেন,"কোয়েশ্চেন ইজি আছে?"
"হুম।"প্রায় অস্ফুটে কথাটা বলে আমি আবার লিখতে শুরু করলাম।পরে লক্ষ করছিলাম ভদ্রলোক মাঝে মাঝেই ঘরটার সামনে দিয়ে যাতায়াত করছেন।যেতে যেতে বারবার আমাকে দেখছেন।
সেদিন টার্ম পেপার জমা দেওয়ার সময় ওঁর কেবিনে যেতেই হল।আমি একা ঢুকব না বলে কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম,হিয়াকে আসতে দেখে ওর সঙ্গে ঢুকলাম।"স্যর আসব?" "থ্যাঙ্ক ইউ স্যর" গোছের ফর্মালিটিগুলো যাতে হিয়ার দায়িত্বে মিটে যায়।আমার কাজলবাবুর সাথে একটা বাক্যবিনিময় করারও প্রবৃত্তি হচ্ছিল না।লোকটা নির্ঘাত কোয়েশ্চেন পেপার অপর্ণাকে পরীক্ষার আগেই দিয়ে দিয়েছে।আজ সেই কারণেই খোঁজ নিতে এসেছিল অপর্ণার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা!নইলে অত কাণ্ড করে ডেকে কথা বলবার লোক কাজলবাবু নন।একটা মিথ্যেকে চাপা দিতে মানুষকে কতরকম আত্মনিগ্রহ করতে হয়!
কেবিনে আবার ওঁর পুরোনো নাটকটা শুরু করলেন।হিয়া বারবার ডাকছে,"স্যর এটা কোথায় জমা দেব?"ভদ্রলোক কোনো উত্তর না দিয়ে ঘাড় শক্ত করে সাইকোপ্যাথদের মত বসে।একসময় ফাইলটা ওর হাত থেকে নিয়ে নিজের টেবিলে রাখলেন।আমি সশব্দে আমারটাও টেবিলে রেখে বেরিয়ে এলাম।হিয়া "থ্যাঙ্ক ইউ স্যর" বলে আমাকে অনুসরণ করল।(কিসের জন্য ধন্যবাদ দিল কে জানে!)
তার একদিন পর মার্ক্সের পেপার।সেদিন অসম্ভব ব্যথা হয়েছিল ডান হাতে। কিভাবে পরীক্ষা দিয়েছি আমিই জানি।তবে পেপারটা বেশ ভাল হয়েছিল।পলিটিকাল ইকোনোমির পেপারটার মত অতটা ভাল না হলেও।যদিও জানি কোনো লাভ নেই। একরকম হতাশা কাজ করছিল।খাতাটা ঐ দুর্নীতিপরায়ণ পারভার্টটা দেখবে।আবার আগের সেমিস্টারের মত…..পড়াশোনা করার কোনো মূল্য নেই!মার্ক্সের পেপারে অবশ্য কুড়ি নম্বর রাজর্ষি স্যরের হাতে।
মার্ক্সে প্রায় সতেরো জন পরীক্ষার্থী।কাজলবাবুকে ঘরে আসতে দেখে আমি আড়চোখে তাঁকে লক্ষ করছিলাম।সরাসরি তাকানো যাবে না,আনন্দিত হয়ে উঠবেন।আর ওঁকে আনন্দিত হতে দেখলে,অন্তত আমার কারণে-আমার একটুও ভাল লাগবে না।ভদ্রলোক কোনোদিকে না তাকিয়ে হঠাৎ আমার সিটের দিকে এগিয়ে আসছিলেন,তারপর কি ভেবে সরে গেলেন।গার্ডে থাকা সব্যসাচী স্যরের সাথে কুশল বিনিময় করলেন,কারো কোথাও অসুবিধা আছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন।(আগের দিনের মত আলাদা আলাদা করে নয়,সামনে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে সবার উদ্দেশ্য প্রশ্ন করে)।তারপর বার বার আমার দিকে পিছন ফিরে দেখতে দেখতে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।দরজায় দাঁড়িয়ে শেষবারের মত যেন কিছুর প্রত্যাশায় আরও একবার ঘুরে দেখলেন।তারপর বেরিয়ে গেলেন।
কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষার দিন ছাত্রছাত্রীদের ওঁর সাথে শেষবারের মত দেখা করে গিফট দেবার কথা ছিল।ওঁর র‍্যাডিকাল ফলোয়ার আলি আগেই গিফট কিনে ফেলেছিল।পরে আমাদের কিছু কন্ট্রিবিউট করার অনুরোধ করে।আমি ঠিকই করেছিলাম লোকটার উপর একটা পয়সাও নষ্ট করব না।তাই সেদিন পরীক্ষার পর ওঁর কেবিনে যাইনি।অবশ্য এটাই একমাত্র কারণ নয়।ওঁর প্রতি আমার নীরব বিদ্রোহের অন্যতম কর্মসূচি ছিল ওঁর কেবিন বয়কট করা।ব্যাপারটা যে কোনো কারোর কাছে হাস্যোদ্দীপক হতে পারে।কিন্তু ঐ মুহূর্তে শীতলতা ছাড়া আমার আর কোনো অস্ত্র ছিল না।
রিটন পরীক্ষা হয়ে যাবার পরও আমাদের গ্রুপ প্রোজেক্টের প্রেজেন্টেশন বাকি ছিল।গ্রুপে একটি বদ ছেলের জন্য বেশ ঝামেলা হচ্ছিল।আমাদের মেন্টর সব্যসাচী স্যরের কারণে তাকে সংযত হতে হয়।যাই হোক,সেদিন আমরা সব্যসাচী স্যরের কেবিনে বসে ছিলাম,কাজলবাবুর কেবিনটা তাঁর ঠিক মুখোমুখিই।হঠাৎ কাজলবাবুর কেবিনের থেকে খুব জোরে জোরে শব্দ আসা শুরু হল।সব্যসাচী স্যর এবং আমাদের গ্রুপের অন্যান্য ছেলেমেয়েরা অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়েছিলেন।আমি চোখ বন্ধ করে আমার চেয়ারে বসে রইলাম।আমার আশঙ্কা হচ্ছিল কাজলবাবু আমাকে দেখতে পেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কিছু করছেন কিনা!
এরপরের ঘটনাটা প্রেজেন্টেশনের দিনের।কাজলবাবুর গ্রুপের প্রেজেন্টেশনের স্লট আমাদের ঠিক পরপরই।জানিনা এটা কাকতালীয় না ইচ্ছাকৃত।আমি শুধু জানতাম যা হচ্ছে সেটা আমার পক্ষে ভাল না।অসম্ভব দুশ্চিন্তায় কেটেছে সেই সময়গুলো।ঐ অভিজ্ঞতাগুলো স্মরণ করে লেখা অনেকটা পুরোনো ঘা খুঁড়ে তাজা রক্ত বের করার মত।
আমাদের প্রেজেন্টেশনের শেষের দিকটায়,মানে শেষ হবার বেশ কিছক্ষণ আগে থেকেই হলে ঢুকে বসে ছিলেন।আমরা যখন বেরিয়ে যাচ্ছি উনি হঠাৎ উঠে দেওয়ালের গায়ে কিরকম টিকটিকির মত করতে শুরু করলেন।মানে যেন চার হাত পা দিয়ে হেঁটে দেওয়ালে উঠে যাবেন।একসময় আমাদের সাথে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেন।আবার কি মনে করে ভিতরের দিকে চলে গেলেন।
এর পরের ঘটনাটা এম ফিলের পরীক্ষার পর।পরীক্ষাটা খুব একটা সিরিয়াসলি দিইনি।নেহাত পাঁচশ টাকা দিয়ে ফর্ম ফিল আপ করা বলেই দিতে যেতে হয়েছিল।রিটনে অপর্ণা এমনকি অপর্ণার চেয়েও কম নম্বর পাওয়া একটি ছেলে কোয়ালিফাই করলেও খুব বিস্ময়কর ভাবে সায়ন্তনী চান্স পেল না।প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য প্রেজেন্টেশনে কাজলবাবু তাঁর গ্রুপকে খুবই সাহায্য করায় সায়ন্তনীর উপর অপর্ণা রীতিমত ক্ষেপে ছিল।সায়ন্তনী ওদের গ্রুপ লিডার ছিল।
যারা রিটনে কোয়ালিফাই করেছে তাদের এস ও পি টা ইন্টারভিউয়ের আগে জমা দিতে হত।ওটা লিখতে সমস্যা হচ্ছিল।গুগল করেও কিছু উদ্ধার করতে পারছিলাম না।শম্পা ম্যাডামকে দেখাতে চাওয়ায় বলেছিলে, "কাজলকে দেখিয়ে নিলে বোধহয় ভাল হত।"
আমি ওঁর আন্ডারে কাজ করতে চাই জানানোতেও বেশ সংকুচিত হয়ে বললেন ডিপার্টমেন্টের অন্য অধ্যাপকরা হয়ত রাজী হবেন না।বললেন,"কাজলকে বরং নিয়মটা একবার জিজ্ঞেস করে নাও।"
যাই বলি ম্যাডাম কাজল ভট্টাচার্যের কোর্টে বল ঠেলেন।আচ্ছা ঝামেলা!ঐ লোকটাকে মেল করতে হবে! তাও নিজে থেকে!চিন্তাটাই কিরকম শরীর খারাপ লাগার মত!আবার কি করবে কে জানে!আমার এই অনিশ্চয়তায় ভোগা,মানসিক অস্হিরতা এই প্রত্যেকটা টানাপোড়েন ভদ্রলোক আমন গোয়েথের সমান সেডিজমে উপভোগ করেন।ম্যাডাম এমনিতে খুবই সাপোর্টিভ এবং ফ্রেন্ডলি,সবসময়ে সাহায্য করেন।কখনও বিরক্ত হতে দেখিনি,এত প্রতিষ্ঠিত ও সিনিয়র হয়েও অদ্ভুত নিরহঙ্কার, কিন্তু ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হবার কারণে সম্ভবত ওঁর মধ্যে একরকম দ্বিধা কাজ করছিল।
অতঃপর বাধ্য হয়ে কাজলবাবুকে ইমেল করে জিজ্ঞেস করলাম এস ও পি টা যদি দেখে দেন।ভদ্রলোক দীর্ঘ সময় পরেও কোনো উত্তর দিলেন না।হলটা কি!আমি নিজে থেকে মেল করায় আনন্দের চোটে বুড়োর হার্ট ফেল করে যায়নি তো!অথবা হতে পারে ওকে উপেক্ষা করার বদলা নিচ্ছে।আমি কাজলবাবুকে এম ফিলের নিয়মের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে আরেকটা ইমেল করে দিলাম।মানে যেটা ম্যাডাম আমাকে ওঁর থেকে জানতে বলেছিলেন সেই বিষয়ে।আমি নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম ভদ্রলোক উত্তর দেবেন না।সেটাই না হয় ম্যাডামকে জানাব।পরদিন সকালে ম্যাডামকে এস ও পি টা মেল করার জন্য জিমেইল খুলে দেখলাম কাজলবাবু আমার মেলটার উত্তর দিয়েছেন।ভদ্রলোক আমাকে বিস্মিত করার একটা সুযোগও ছাড়বেন না।

"প্রিয় তৃষ্ণা,

আমি এম ফিলের নিয়মটা জানি না।আমি এখন ছুটিতে আছি কিন্তু ফিরে এলে খোঁজ নিয়ে নিশ্চয়ই জানতে পারব।তোমার এস ও পি তে যে এরিয়াটা তুমি স্টাডি করতে চাও সেটা দেবে এবং কোন ডিরেকশনে এগোতে চাও সেটাও লিখবে।যে রেফারেন্সগুলো কনসাল্ট করেছ সেগুলোও অবশ্যই উল্লেখ করবে।

স্যর।"

এটাই আমাদের শেষ কথোপথন।এস ও পিটা শেষ পর্যন্ত ম্যাডামই দেখে দিয়েছিলেন।এম ফিলের ইন্টারভিউয়ের দিন খুব বিস্ময়কর ভাবে কাজলবাবু অনুপস্হিত ছিলেন।অপর্ণা ঘোঁৎ ঘোঁৎ করছিল, "আজ কেবি এলেন না কেন বলত?"আমার ওর প্রতি বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছিল।জানি না সব জেনে ন্যাকামি করছিল কিনা!আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল কাজলবাবু পরীক্ষায় টানা কারচুপি করে আসায় এখানে আর আমার মুখোমুখি হতে সাহস পাচ্ছেন না।মানে ভয় পাবার কিছুই নেই,তাও….হয়ত অপরাধবোধ!হয়ত এই আশঙ্কা যে অপর্ণা সিলেক্টেড হল আর আমি হলাম না সেক্ষেত্রে ওঁকে অভিযুক্ত করতে পারি!

 

পর্ব ১৬

কাজল ভট্টাচার্যের কথা

"বিদ্যত্বং চ নৃপত্বং চ নৈবতুল্য কদাচন।
স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে।"

ফুকো বলেছিলেন,"নলেজ ইজ পাওয়ার।"আধুনিক যুগের ক্ষমতাকে যদি বুঝতে চাও আগে রাজাদের মাথাগুলো কেটে ফেল।হ্যাঁ এখানেই একবিংশ শতাব্দীতে ইডিওলজিকাল স্টেট অ্যাপারেটাসের সার্থকতা।রিপ্রেসিভ স্টেট অ্যাপারেটাসের দরকারটা সেকেণ্ডারি।তবে শুধুই আধুনিক যুগ কেন?চাণক্য শ্লোক পড়েছেন আপনি পাঠক?পড়েছেন মুদ্রারাক্ষস?দুই সহস্রাব্দী আগের এক পলিটিকাল ইকোনমির অধ্যাপক,শ্রী বিষ্ণুগুপ্ত।তিনিও আমার মতই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন,বিষয়টাও এক।ক্ষমতার প্রতিমূর্তি। ওহ সে কি দাপট।যাঁর মেধা ছিল তাঁর ক্ষমতার উৎস।প্রজ্ঞাই ক্ষমতা,ক্ষমতাই প্রজ্ঞা। কে না জানে মণিভূষিত সর্প তথা বিদ্বান শয়তান অশিক্ষিত শয়তানের চেয়ে অনেকগুণ বেশী বিষাক্ত।খোদ সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত লোকটার ক্ষমতার খিদেয় অতীষ্ঠ হয়ে বানপ্রস্থে পালালেন।ওখানেই মেধাস্বরূপ ক্ষমতার জয়।চাণক্যের প্রভাব মুক্ত হওয়া বা তাঁকে অপসারিত করা সম্ভব নয় বুঝে একবুক বিতৃষ্ণা নিয়ে চন্দ্রগুপ্ত নিজেই সরে গেলেন।আজ দু হাজার বছর পরে বসে আমি ঐ লোকটার সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারি।আমিই ক্ষমতা।হৃদয়হীন, অনুভূতিহীন ক্ষমতা।যা শুধু হেজিমনি চেনে।আমার সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রত্যেকটা মানুষের নিয়তিই হচ্ছে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করা।যেমন শর্মিষ্ঠা।আমার বিশ্বাসঘাতকতা,পরস্ত্রীর প্রতি অত্যধিক আসক্তি- এগুলো ওকে দিনের পর দিন ক্ষতবিক্ষত করতে পারে,চোখের নীচে গাঢ় অন্ধকার তৈরী করতে পারে।এর জন্য ও ঈর্ষিত হয়,রাগ করে কিন্তু সব একটা সীমার মধ্যে থেকে।আমি ঐ সীমাটা কাউকে ছাড়ানোর অনুমতি দিই না।দিনের শেষে নারীত্বের সম্পূর্ণ অপমানটুকু গিলে ফেলে ওকে অভিমানী মুখে এসে আমার বুকেই আশ্রয় নিতে হয়।একই কথা অপর্ণার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।আমাদের বিডিএসএম সম্পর্কের কারণে আমি ওকে অনেকটা ছড়ি ঘোরাতে অ্যালাউ করলেও আখেরে ওকে আমার কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হয়।শর্মিষ্ঠা তৃষ্ণা নয়,আমার ঐ একচ্ছত্র ক্ষমতার জায়গাটা ধরে ও কোনোদিন টানার চেষ্টা করবে না।বরং অন্য মেয়েদের নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে আদরে,বিশ্বস্ততায় আমাকে বাঁধবার চেষ্টা করবে।আমি বাঁধা পড়বার লোক নই জেনেও নিজেকে স্তোক দেবে।প্রতিদিন আশায় বুক বাঁধবে।অপর্ণার ক্ষেত্রে রাগের বহিঃপ্রকাশটা অনেকটা উগ্র,বন্য।কিন্তু আখেরে ওরও নিয়তি তাই।আমাকে নিজের সবটুকু দিয়ে বেঁধে রাখবার চেষ্টা করা।যদিও ও জনসমক্ষে এটা কোনদিন স্বীকার করবে না।আমি ওর দাসানুদাস – এই পরিচয়টাই ও পছন্দ করে।উলটোটা নয়।যদিও সম্পর্কে আমি সাবমিসিভ,তাও আখেরে সম্পর্কের ছড়িটা কিন্তু আমার হাতেই।অপর্ণাও তৃষ্ণা নয়।সায়ন্তনীকে আমি চেখে দেখার ততটা সুযোগ পাইনি।চেষ্টা করেছিলাম,অপর্ণার কারণে বেশীদূর এগোনো সম্ভব হয়নি।কিন্তু ওরও ওটাই নিয়তি হত,সায়ন্তনীও তৃষ্ণা নয়।এই কারণেই অপর্ণা বা শর্মিষ্ঠা এখনও আমার সঙ্গে আছে।তৃষ্ণা নেই। ওর কোনো চিহ্নও আমি থাকতে দিইনি।সায়ন্তনীকে অবশ্য দুর্নাম এবং অপর্ণার ভয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ছেঁটে ফেলতে হয়েছে।ক্ষমতার এটাই বৈশিষ্ট্য।যখন যাকে প্রয়োজন ছেঁটে ফেল।এই কারণেই শ্রীরামচন্দ্র আমার প্রিয়তম পৌরাণিক চরিত্র।রাম আসলে ক্ষমতার প্রতীক।যে রাম অনুগতা শবরীর এঁটো ফল গ্রহণ করেন,সেই রামই মোক্ষপিপাসী শুদ্রকে হত্যা করেন।সীতাকে উদ্ধারের পরপরই জানিয়ে দেন হৃদয়বৃত্তি নয়,ক্ষমতায় লাগা দাগটা তুলতেই তাকে রাবণের থেকে ছিনিয়ে এনেছেন।এত মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়ে স্ত্রীকে উদ্ধার করেও তাকে ত্যাগ করতে একমুহূর্ত দ্বিধা করেন না রাম।এর নামই ক্ষমতা।যার কাছে নারী,যৌবন সবকিছু সমর্পিত। এখানে মানবিকতা,ভালবাসা এমনকি ব্যক্তিগত রাগ,বিদ্বেষ শব্দগুলো মিথ।এই ক্ষমতাকেই তৃষ্ণা অস্বীকার করার সাহস দেখিয়েছিল।আমার সামনে দ্য নেকেড কিং এর ঐ শিশু হয়ে দাঁড়িয়ে।
আমি থার্ড সেমিস্টারে যা করার করেছি,সেটা ওর প্রাপ্যও ছিল।কিন্তু এরপর ওকে অজস্র সুযোগ দিয়েছি আমার সামনে মাথা নোয়াবার।ও সেগুলো বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।ওর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এক এক সময় এমন কিছু পাগলামি করেছি যা ভাবলে নিজেরই এখন অস্বস্তি হয়।তাই ওকে সবদিক দিয়ে আটকেছি।হেজিমনি আর কাউন্টার হেজিমনি পাশাপাশি থাকতে পারে না।সিদ্ধার্থ রায় আর চারু মজুমদার এক জায়গায় থাকতে পারে না।এটাই প্রকৃতির নিয়ম।তৃষ্ণা নারী হয়ে কোনোদিন আমার জীবনে আসেনি,এসেছিল বিপ্লবের মূর্ত প্রতীক হয়ে।যে কোনো একজনকে সরে যেতেই হত।ওকেও হয়েছে।তৃষ্ণা কোথাও নেই।
তৃষ্ণা কোথাও নেই?ওহ ভগবান!আমার শিরায়,ধমনীতে, অবচেতনে এভাবে কে সর্বগ্রাসী হয়ে ছেয়ে আছে!থিসিস অ্যান্টিথিসিসের সংঘাতে আমার অবস্হান কি সিন্হেসিসের?হৃদয় বা মস্তিষ্ক নিয়ে কিছু বলতে চাই না।আমার শরীরে ঐ দুটো জিনিসের ভূমিকা আমার শিশ্নই পালন করে।
আজ যদি ও বেরিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে যায় ওকে আইনি এবং বেআইনি পথে আমি বিপর্যস্ত করতে পারি।আমার হাতে এরকম অজস্র ছেলেমেয়ে আছে যারা আমার একটা অঙ্গুলীহেলনে ওকে সোশাল মিডিয়ায় ডিজিটাল ধর্ষণ করে চুপ করিয়ে দেবে।এমন ছেলেও আছে যে আমার একটা কথায় ওর মুখে অ্যাসিড ঢেলে আসবে।(পৃথিবীর সেরা মুহূর্ত হবে সেটা,ঐ রূপ নিয়েই তো এত গর্ব!)যদিও তারপর আমি ছেলেটির সাথে সম্পর্ক অস্বীকার করব।কাজের পরিণতির দায় তাকেই ভুগতে হবে।তাই তৃষ্ণাকে শরীরে লাগা বিষ্ঠার মত এই অভিজ্ঞতাটা বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে।ওর এত চেষ্টা সত্ত্বেও আমি ওকে হায়েস্ট তো দুরস্ত,চল্লিশের ওপরও পেতে দিইনি।অপর্ণার সামনে ও কিচ্ছু না,অন্তত যতক্ষণ জাজমেন্টের পাল্লাটা আমার হাতে।যেভাবে আমি অশ্বথ্বামা হয়ে ঘুরছি ঠিক সেই ভাবে ওকেও ঘুরতে হবে।অতৃপ্তি নিয়ে।
একজন পুরুষের জীবনে সফল এবং সুখী হতে গেলে যা যা প্রয়োজন তার সবটুকুই আমার কাছে আছে।সামাজিক প্রতিপত্তি, অর্থ,সম্মান,অঢেল যৌনতা।সতীসাধ্বী স্ত্রী।তৃষ্ণা পর্বটা আমাকে অসহ্য মানসিক টানাপোড়েন আর যন্ত্রণা ছাড়া কিছুই দেয়নি।ওর মাস্টার্স শেষ করে বেরিয়ে যাওয়া,আমার চোখের সামনে থেকে বিদায় হওয়া একটা মুক্তি আমার কাছে।এম ফিল নিয়ে ও এমনিতেই সিরিয়াস ছিল না।পার্শিয়ালিটির অভিযোগের ভয়েই আমি ইন্টারভিউ বোর্ডে অনুপস্হিত ছিলাম।পরে অপর্ণার কাছে শুনলাম ও ওখানে বিপ্লব নিয়ে প্রচুর ভাঁট বকে এসেছে।বলেছে মেনস্ট্রিম বা বুর্জোয়া ইকোনোমিকসকে ও নাকি আদর্শগত ভাবে ডিসকার্ড করেছে।তাই সেই সংক্রান্ত একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে রাজী হয়নি।অতঃপর ওকে এম ফিল থেকে বাদ দেবার জন্য আমাকে বিশেষ পরিশ্রমও করতে হয়নি।মানে প্রায় নিজের দোষেই বাদ পড়েছে।
এখন সব ঠিক হয়ে গেছে।আমার পর্নোগ্রাফির প্রতি অত্যধিক আসক্তি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।শর্মিষ্ঠাও আমাকে আর সন্দেহ করছে না।আমার পড়াশোনা, গবেষণা, অপর্ণা এবং আমার অন্যান্য আহার্যদের নিয়ে বেশ আছি।
আমি তৃষ্ণাকে ভালবাসিনি।কিন্তু ওর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে চেয়েছিলাম।চেয়েছিলাম ও আমার প্রেমে পড়ুক।সেটা ঐ অনুভূতিটা রেসিপ্রোকেট করার জন্য নয়।আস্তাবলের একমাত্র তেজী ঘোড়াকে বশে আনার পৌরুষগর্বে।কিন্তু আখেরে বিষয়টা ঘেঁটে একটা অত্যন্ত বিশ্রী পরিস্হিতি তৈরী হয়েছে।তৃষ্ণাও সম্ভবত আমাকে একটা দুর্নীতিপরায়ণ সেক্সুয়াল প্রিডেটর ছাড়া কিছুই মনে করে না।ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আমার আশা ছিল ওর সাথে কোনো ভাবে যোগাযোগ হবে।ও আমি অ্যাকাউন্ট খোলার কিছুদিনের মধ্যে, সম্ভবত আমার অ্যাকাউন্টটা দেখতে পেয়ে আমাকে ব্লক করে দেয়।একদিকে ভালোই।একরকম মুক্তি।আমি চাই না কোনোদিন ও আমার সামনে আয়না হয়ে এসে দাঁড়াক।যে কারণে জোসেফ মেঙ্গেলে তার ঔশউইতজের পূর্বতন স্পেসিমেনদের মুখোমুখি হতে চাইত না সেই কারণেই।আমার কোনো কলঙ্ক আমার দেবতুল্য ভাবমূর্তির উপর কয়েক সেকেণ্ডের জন্যও ছায়া ফেলুক আমি চাই না।ও যে নিজেই ঘেন্নায় আমার থেকে দূরে সরে গেছে এটা একটা রিলিফ।
তাও মাঝে মাঝে হঠাৎ একটা পিঙ্ক ফ্লয়েডের গান,রাতের বৃষ্টি বা কলকাতার রৌদ্রদগ্ধ রাস্তায় কোনো কোমর অব্দি লম্বা খোলা চুলের মেয়ের হেঁটে যাওয়া দেখলে এই মুক্তিটা আমাকে কাঁটা ফোঁটায়।আর অন্তত পরবর্তী বাহাত্তর ঘন্টার জন্য একটা বিষণ্ণতা আমাকে গ্রাস করে।পৃথিবীর কোনো প্রান্তে গিয়েই এই মুক্তির শূন্যতা থেকে আমার মুক্তি নেই।

পর্ব ১৭

তৃষ্ণার কথা

এই ধরনের সম্পর্ক,যা পরকীয়ার দিকে ঘুরতে পারে,তার মূল প্রথমেই উপড়ে ফেলা উচিত।আমি ভবিষ্যৎ না ভেবে একটা পা'ও ফেলতে পারি না।যদি পারতাম তাহলে এতদিনে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যোগ দিয়ে সরকারী সম্পত্তি জ্বালিয়ে বেড়াতাম।একটা লোক,যাকে আমার সাথে কথা বলতে গেলেও অপর্ণার থেকে আড়াল খুঁজতে হয় তার থেকে একটা আচরণই প্রত্যাশিত।লোকটা শরীর খুঁজতে বেরিয়েছে,এবং সহধর্মীনি দড়ি ধরে টানলেই বাধ্য বৃষের মত আবার গোয়ালে গিয়ে ঢুকবে।অপর্ণাকে,এমনকি আমাকে পর্যন্ত লোকটা ভয় পেত,সেখানে নিজের স্ত্রীকে রুদ্রমূর্তিতে দেখলে নির্ঘাত পাবলিক প্লেসে মলমূত্র ত্যাগ করে বসবে।

ভদ্রলোক সম্ভবত প্রত্যেক ব্যাচেই বেছে কিছু ছাত্রী ও রিসার্চ স্কলারকে উত্যক্ত করেন।ওঁর দেবতুল্য ইমেজের কারণে তারা নিঃশব্দে চলে যেতে বাধ্য হয়।এই জায়গায় স্বর চড়িয়েও কোনো লাভ হয় না।আমি জানি যদি সেটা করতে যেতাম,ওঁর ঘোষিত বামপন্থি ও নারীবাদী মহিলা কোলিগরাই হয়ত ওঁর সমর্থনে দাঁড়িয়ে পড়ে আমার দিকে কাদা ছুঁড়তেন।ম্যানিপুলেশনে ভদ্রলোক অত্যন্ত দক্ষ এবং সম্মোহনের কাজে প্রায় স্বর্গীয় উৎকর্ষ অর্জন করেছেন।

আমাদের ডিপার্টমেন্টে এরকম একজন অধ্যাপক ছিলেন(কাজলবাবু নন),যিনি নিয়ম করে ছাত্রীদের উদ্দেশ্য অশালীন মন্তব্য করতেন।এমনকি গার্লস টয়লেটে জল না দেওয়া নিয়েও কুরুচিপূর্ণ কথা বলেছিলেন।তাঁর ডিবচারিগুলো বেশ চলত।যদিও তাঁকে কেউ পছন্দ করত না।এখান থেকেই একটা ধারণা পাওয়া যায় কাজলবাবুর মত জনপ্রিয় অধ্যাপকের বিরুদ্ধে মুখ খোলার কি পরিণতি হতে পারে।তাইআমি সেরকম কিছু করিনি।শুধু ওঁর হাঁটার সময় পা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।ক্লাস চলাকালীন। উনি আরেকটু হলে মুখ থুবড়ে পড়তেন।কোনোমতে সামলে নেন।তারপর খুবই দুঃখিত মুখে প্রণামের চুক্কি,উনিই হাত দেখিয়ে আমাকে প্রণাম করতে বারণ করেন।আমার পক্ষে নিঃশব্দে যতটুকু প্রতিবাদ সম্ভব করতে ছাড়িনি।যেমন,ওঁর সাথে সব ছাত্রছাত্রীদের ছবি তোলার দিন ক্লাস করে ঠিক ছবি তোলার সময়ের আগে কেটে পড়া।যেমন উনি বার বার ডাকা সত্ত্বেও ওঁর কেবিনটাকে বয়কট করা,যেমন শেষবারের মত যেদিন আমাদের ক্লাসমেটরা ওঁর সাথে দেখা করতে যায় সেদিন অনুপস্হিত থাকা।ওঁর জন্য কেনা গিফটের চাঁদায় কন্ট্রিবিউট না করা।পলিটিকাল ইকোনমি ক্লাসের তরফ থেকে শুধু শম্পা ম্যাডামকে আলাদা করে উপহার দেওয়া।অবশ্য আমার আগে অপর্ণাই কাজলবাবুকে গিফট দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি তোলায় আমার পক্ষে কাজটা সহজ হয়ে যায়।তবে একটা বার্তা দেওয়ার ইচ্ছা ছিল।ক্লাসরুমে, করিডরে এমনকি খাতা দেখার সময় পর্যন্ত কাজলবাবু যদি ছাত্রদের মধ্যে বিভেদ করেন আমি আমার সীমিত ক্ষমতা দিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে সাধ্যমত সেটা করব না কেন!
কাজলবাবু চেয়েছিলেন আমার নিষ্পৃহতাকে ভাঙতে, কাজলবাবু চেয়েছিলেন কোথাও একটা অন্তত আমার প্রথম হতে।একদিক দিয়ে দেখতে গেলে কিন্তু ভদ্রলোক সফল হয়েছেন।আমি ওঁর প্রতি এখন নিষ্পৃহ নই।ওঁকে ঘৃণা করি,এবং সেই দিক দিয়ে দেখলে আপাতত আমার অপছন্দের তালিকায় প্রথম নামটাই ওঁর। ইন প্রেইজ অফ লাভ,পরপর দুদিন বাংলা ও সংস্কৃতে ওঁর আমাকে দিয়ে উচ্চারণ করানো বিয়ের শপথ,গৃহস্হালীর ফিউডাল গঠন বোঝাতে গিয়ে আমাকে নিজের স্ত্রী ধরে নিয়ে উদাহরণ দেওয়া-এত কিছুর পরেও প্রেমটা আমার কাছে অবাস্তব একটা বিবর্ণ শব্দ ছিল।আমাকে হাউজহোল্ড নিয়ে কাজলবাবু যে টার্ম পেপারটা করতে দিয়েছিলেন,তাতে প্রেমের ব্যাখ্যা লেখার সময় আমি পরোক্ষভাবে আমার প্রত্যাখ্যান জানিয়ে দিই।ফোর্থ সেমিস্টারের ঐ দিনগুলো থেকে শুরু করে আজকের কলম ধরার দিন-ডঃ ভট্টাচার্যের ছবিটা আমার কাছে একরকম থেকে গেছে।ঔশউইতজের বাচ্চাদের ব্যারাক,তাদের 'মেইনে কিন্ডে' সম্বোধন করা নম্রভাষী ডাঃ মেঙ্গেলে।বেশীর ভাগ বাচ্চার চোখে তিনি দেবদূত,ফাদার ফিগার।কিন্তু ইভা নামের দশ বছরের বাচ্চা মেয়েটা ঐ দিনেও দেবদূতের ছদ্মবেশে লুকোনো বিকৃতমস্তিষ্ক দানবটাকে চিনতে পেরেছিল।ঐটুকু বয়সেও সে বুঝতে পারছিল লোকটা খারাপ লোক।এবং ক্ষতিকারক।হাত পা বাঁধা অসহায় অবস্হাতেও সে ঘেন্না করত জোসেফ মেঙ্গেলেকে।ঠিক যেভাবে আমি ডঃ ভট্টাচার্যকে।
কিন্তু মেঙ্গেলে তার বেছে নেওয়া আদর্শের পথে চলছিল।সেটা ন্যায়সঙ্গত হোক বা না হোক।ডঃ ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রটা তো ঠিক সেরকম নয়।যে লোকটা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর থিওরি পড়াচ্ছে-স্কুল,কলেজ,আদালত, ক্লাসরুম সবজায়গায় ডেমোক্রেসির অভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে;পিতৃতন্ত্র,সামন্ততন্ত্র, ধনতন্ত্র-যে সমস্ত সিস্টেম কোনো এক অপরকে শোষণ করে বেঁচে রয়েছে সেই সিস্টেমের সেন্ট্রিস্ট কাঠামোটা ভাঙতে শেখাচ্ছে সে কি করে…..আমি অবাক হয়ে ভাবতাম একটা মানুষের পক্ষে কিভাবে এতটা দ্বিচারিতা সম্ভব!যে আমাদের বারবার বলত আর্মচেয়ার বিপ্লবী বলে কিছু হয় না,যাপনেই মতাদর্শ – সে কিভাবে নিজে এইভাবে তত্ত্বের নব্বই ডিগ্রী বিপরীতে আচরণ করতে পারে!
আমি কাজল ভট্টাচার্যকে ঘৃণা করি।ওকে মানে প্রাণে পথে বসাতে চাই।আমার হৃদপিণ্ডের অন্তঃস্হল থেকে চাই ওর সর্বনাশ হোক।চাই আমি একদিন টেবিলের এপারে থাকি ক্ষমতার কুর্সিতে,আর ও সম্ভ্রমভরে নতমুখে আমার সামনে টেবিলের উলটো দিকে দাঁড়াতে বাধ্য হোক।হয়ত সবই জলের আলপনা,তাও কাজলবাবুর বয়স্ক মানুষ,অস্তাচলের সূর্য-আর আমার সারাটা জীবন পড়ে।পৃথিবীর কোনো অংশে একজন তোমার জন্য পূর্ণ বিষের থলি গচ্ছিত রেখে বসে রয়েছে।খেলার ও ক্ষমতার নেশায় আকছার মানুষ সেটা ভুলে যায়।সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাণ্ডারী এস ডি বলেছিলেন।বিষয়টা আমার কাছে শুধু ব্যক্তিগত প্রতিশোধের নয়,বিষয়টা আদর্শেরও।কাজলবাবুই তো আমাদের অ্যান্টোনিও গ্রামশির পথে চলতে শিখিয়েছেন।
যদি সব কিছু অপরিবর্তিত থাকত,তারপরেও কাজলবাবু এরকম নিকৃষ্ট চরিত্রের মানুষ না হতেন,এমনকি যদি সত্যিই আমার প্রেমেও পড়তেন তাহলে আমি তাঁকে ঘেন্না করতাম না।রেসিপ্রোকেট করার প্রশ্নই ওঠে না,কিন্তু তাঁকে বা তাঁর প্রেমকে শ্রদ্ধা করতাম।দূর থেকেই।কিন্তু নার্সিসিস্টরা প্রেমে পড়ে না।তিনি আমাকে মাংসপিণ্ড ছাড়া কিছুই ভাবেননি।তাই তাঁকে তাঁর জায়গাটা দেখিয়ে দেওয়া খুব প্রয়োজন ছিল।সব মেয়ে অপর্ণা হয় না।

একজন নার্সিসিস্ট আপনাকে কখনও হারাতে চাইবে না।কাজলবাবু আমাকে বিভিন্ন উৎপাত করলেও আমার প্রতি তাঁর বিদ্বেষটা সাধারণভাবে আমরা বিদ্বেষ বলতে যা বুঝি তার থেকে আলাদা ছিল।বিদ্বেষ সাধারণ ভাবে বিকর্ষণ তৈরী করে,ওঁর বিদ্বেষটা আকর্ষণমূলক ছিল।উনি চাননি আমি ওঁর থেকে দূরে সরে যাই।কিন্তু চিরাচরিত একজন নার্সিসিস্টের মতই উনি আমার সাথে কোনোরকম বন্ডিং তৈরী হওয়ার ব্যাপারে ভীত ছিলেন।আমি লিখে দিতে পারি এত দিন বাদেও উনি মাঝে মাঝে আমাকে মিস করেন।কিন্তু সেটা ব্যক্তি আমাকে নয়।আমার উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণকে, তাঁর কারণে তৈরী হওয়া আমার মানসিক অস্হিরতাকে-যেটা তাঁকে সেডিস্টিক আনন্দ দিত।যে কোনো নার্সিসিস্টের মতই উনি চেয়েছিলেন আমার সাথে ওঁর যোগাযোগ থাকুক।ওঁর শেষ ইমেলেও সেই ইঙ্গিত ছিল,যাতে আমি পরে একবার মেল করি।এই যোগাযোগটা ধরে রাখার জন্য একজন নার্সিসিস্ট প্রচুর ধৈর্যের পরিচয় দিতে পারে।আপনি তাকে যেভাবে দেখতে চান সে সেভাবেই আপনার সামনে নিজেকে প্রকাশ করবে।দরকার মত পিতৃসুলভ স্নেহের প্রতিমূর্তি বা নিবেদিতপ্রাণ প্রেমিক।তারপর কোনোভাবে একবার আপনাকে হাতের মধ্যে নেওয়ার অপেক্ষা।ওরা চায় যখন ওরা আপনাকে ছেড়ে যাবে তখন আপনি মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ুন।ওরা চায় সারাজীবন ওদের দেওয়া আঘাতের মাধ্যমে আপনি ওদের মনে রাখুন।ওরা বিস্মৃত হতে চায় না।
প্রেমের বিপরীত অনুভূতি আর যাই হোক ঘৃণা নয়।নিষ্পৃহতা।আমার এখানেই নিজের অক্ষমতার উপর রাগ হয়।কাজলবাবুকে ঘৃণা করার জন্য।আমার প্রতি তাঁর অকারণ ঘৃণায় বিনিময়ে আমিও তাঁকে ঘৃণা ফিরিয়ে দিয়েছি।এখনও ঘৃণা করে যাচ্ছি।এই জাতীয় অনুভূতি নিজের পক্ষেই ক্ষতিকারক।বিদ্বেষ নিজের চেয়ে বেশী আর কাকে দগ্ধ করে!তাছাড়া ঘৃণা মানেও তো একরকম সম্পর্ক স্হাপন,একরকম সাড়া দেওয়া।সেটুকুও কি কাজলবাবুর বরাদ্দ হয়?
কাজলবাবু একসময় আমার প্রতি অকারণ বিদ্বেষে নিজের মানসিক স্বাস্হ্যের ক্ষতি করেছেন,হাতে ক্ষমতা ছিল বলে আমারও ক্ষতি করতে পেরেছেন।কিন্তু এখন বেশ আছেন।এখন হয়ত নতুন কোনো শিকারকে অনুসরণ করছেন,নেকড়ের মত, নিস্তব্ধ পায়ে।যা মস্তিষ্ক ক্ষয় হবার আমার হচ্ছে।ইভা মোজেস কর যদি ক্ষমা করতে পেরে থাকেন আমি কেন পারব না?তাঁর ক্ষমা করা বা না করায় মেঙ্গেলের কিছু আসে যায় নি,আমার ক্ষেত্রেও কাজলবাবুর কিছু যায় আসবে না।কিন্তু ক্ষমাটা করা দরকার নিজের মানসিক শান্তির জন্য।কিন্তু নিজের মানসিক শান্তির জন্য যদি আমি ঐ দুর্নীতিগ্রস্ত সেক্সুয়াল প্রিডেটরটাকে ক্ষমা করি,মানবিকতা আমাকে ক্ষমা করবে না।নারীবাদ এবং চারু মজুমদারের কাছে থাকা আমার দায়বদ্ধতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হবে আমার ক্ষমাশীলতা।কাজলবাবু তো আর নিজের নখ দাঁত ভেঙে ফেলবেন না।পরবর্তী প্রজন্মের নিগৃহীতা মেয়েদের কাছে পূর্বসূরি হিসাবে আমি কি কৈফিয়ত দেব!
আমি একা থাকতে চাই।আমি নিজেকে সেই পুরুষে পরিণত করেছি যাকে কৈশোরে আমি কামনা করতাম।তাও যদি কোনোদিন কারো সাথে সম্পর্কে জড়াই,আমার পুরুষসঙ্গীর কাছে আমার অর্থনৈতিক নির্ভরতার চাহিদা থাকবে না।আমি চাইব তার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল,হৃদয়,মস্তিষ্ক থেকে যৌনানুভূতি-সবটুকুর মালিকানা একা আমার হোক।আমি চাইব আমাদের দাম্পত্যে সে আমার সবচেয়ে কাছের কমরেড হোক। অসমতা,ঝড়,ধূমকেতু বর্জিত সম্পর্ক।একনিষ্ঠতার সম্পর্ক।আত্মরতি নয় আত্মত্যাগের প্রতিশব্দ হোক তার প্রেম।কোনো অসতর্ক ছত্রেও তার কবিতায় যেন আমি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে স্হান না পায়।আমি আইনস্টাইন বা বোধিসত্ত্বকে চাইনা।আমি মিলস অ্যান্ড বুন রোমান্সে বিশ্বাসী নই।আমি দানব বা দেবতার বক্ষলগ্না হবার স্বপ্ন দেখি না।আমি একজন মানুষকে চাই।নারীবাদী, সাম্যবাদী হৃদয়বান একজন মানুষ।হাওয়ার্ড ফাস্টের স্পার্টাকাসের মত।আমি সেই পুরুষকে চাই না যে আমার বিনিদ্র রাত্রির কারণ হোক,আমি তাকে চাই যে বিছানায় মায়ের মত আমাকে ঘুম পাড়াবে।আমি যা যা চাই,কাজলবাবু তার বিপরীত ছিলেন।কারো চোখে দেবতা,আমার চোখে দানব।আর অতিমানব বা মহাপুরুষদের প্রতি আমার অ্যালার্জি আছে।

 

উপসংহার

"আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর -
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!"

শ্রীরামচন্দ্র হাতে শুদ্রের রক্ত মাখার পরও তাঁর দেবত্বের ভাবমূর্তিতে একফোঁটা চিড় ধরে না।বরং শুদ্রের বিধবার উপর এক শ্রেণীর লোক থুতু ফেলে যায়,কারণ হাহাকারের শব্দে সে তাদের বিব্রত করার স্পর্ধা দেখিয়েছে।অযোধ্যাবাসীরা রাজতন্ত্রের ভয়ে, ভক্তিতে অথবা স্রেফ শুদ্রবিদ্বেষের কারণে শুদ্রসাধকের চিতার ধারেকাছেও ঘেঁষে না।রামচন্দ্র যুগ যুগ ধরে বিনাপ্রশ্নে পূজিত হয়ে আসেন।
অর্জুনের মান রাখতে একলব্যের বুড়ো আঙুল ছিনিয়ে নিয়েও দ্রোণকে একলব্যের প্রেতাত্মা হন্ট করে না।কারণ দ্রোণরা মানুষ নন,এবং আখেরে কৌরবের পাশেই গিয়ে দাঁড়াবেন।
তাই দ্রোণর মুখোমুখি হতে একলব্য নয়,আম্বেদকরও নন বরং প্রস্তুত হোক একটা 'হুল'।তাতে অর্জুন,দুর্যোধন সহ পান্ডব,কৌরব সব পক্ষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক।দ্রোণের মাংসের কোর্মা রান্না করে দ্রোণাশ্রু মেশানো সুরার সাথে তা একলব্যের কমরেডদের মধ্যে পরিবেশিত হোক।তখনই একলব্যের আত্মা শান্তি পাবে।
প্রত্যেকটা অফিসে, স্টুডিওয়,কারখানায়,চাষের জমিতে,ঠিকাদারের চুক্তির কর্মক্ষেত্রে,জেলখানায়,ব্রথেলে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৃষ্ণারা একলব্যের শাহাদাতের নামে হুলের সূচনা করুক।অপর্ণার মত রেনিগেডদের জন্যও দরজা খোলা রইল।কারণ তৃষ্ণারা কমরেডশিপে বিশ্বাস রাখে।তৃষ্ণারা বিশ্বাস করে যে মার্শাল চুতে একদিন প্রতিক্রিয়াশীলদের দালাল থেকে বিপ্লবীতে পরিণত হবেন।

*পুনশ্চ:এটা একটা কাল্পনিক ঘটনা।মার্ক্সবাদ, আলথুজার, হলোকাস্ট আর চারু মজুমদার বাদে আর সব কিছু কাল্পনিক। তৃষ্ণা কাল্পনিক,কাজলবাবুর চরিত্র এতটাই দেবত্বপ্রাপ্ত যে তাঁকে দেখলেও কাল্পনিক বলেই ভ্রম হয়।তৃষ্ণার অভিযোগগুলোও কাল্পনিক।শুধু একটাই কথা,কাজলবাবুর মেয়ের সাথেও এই কাল্পনিক ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি হোক।কাজলবাবু তৃষ্ণার সাথে যা করেছেন সেটা অন্য কোন ক্ষমতাশালী বৃদ্ধের কাছ থেকে তাঁর মেয়েরও পাওনা হোক।সেদিন সেই বৃদ্ধের মূর্তিপুজোর ধুপের ধোঁয়ার আড়ালে শ্রেয়সীর ভোলাটাইল চোখের জল আবছা হয়ে ঢাকা পড়ে যাক।সেদিন স্বামীর চিতায় ওঠা অলকামণি রায়ের মত শ্রেয়সীর আর্তনাদও চাপা পড়ে যাক মূর্তিপুজোর ঢাকের কর্কশ আওয়াজে।একদিন শ্রেয়সীও কারো তৃষ্ণা হোক।যদি তৃষ্ণার অভিযোগগুলো মিথ্যে হয়,তাহলে তো মিটেই গেল।যদি মিথ্যে না হয় তাহলে কাজলবাবু বুঝুন নারীমাংস খাদ্য নয়।এক্স এক্স ক্রোমোজোমের মানুষের চোখের জল মানেই পানীয় নয়।

 

(সমাপ্ত)

***সব চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক।কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হেয় করার উদ্দেশ্যে গল্পটি লেখা হয়নি।যদি কোনো জীবিত বা মৃত ব্যাক্তির সাথে মিল পাওয়া যায় তা নেহাতই কাকতালীয়।

***লেখায় কবি হেলাল হাফিজের 'তৃষ্ণা', কবি নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' এবং চাণক্য শ্লোকের অংশ উদ্ধৃত করা হয়েছে।

এর আগে চর্যাপদে প্রকাশিত হয়েছিল তিনটি কিস্তিতে,২০১৭,সেপ্টেম্বরের এর ১১,১২ ও ১৩ তারিখে।

 

দ্রোণাচার্য(এডিটেড)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments