পর্ব ৮
কাজল ভট্টাচার্যের কথা


প্রিয় তৃষ্ণা,আমাকে এতটা তৃষ্ণার্ত করে তুলে তুমি কি আনন্দ পাও ?তুমি কি বুঝতে পারছ না এটা করে তুমি নিজের বিপদ ডেকে আনছ?ছুরি আপেলে পড়ুক বা আপেল ছুরিতে,আখেরে কিন্তু ছুরিটাই আস্ত থাকে।আপেলটা টুকরো হয়ে যায়।
আমার অবস্হা যে ক্রমশ একটা ভ্যাম্পায়ারের মত হয়ে যাচ্ছে সেটা আমি বুঝতে পারছি।অসহ্য বুক ফাটানো, দম বন্ধ করা একটা তৃষ্ণা।এই তৃষ্ণাটা যে তোমার উরুসন্ধি বেয়ে নেমে আসা রক্ত ছাড়া কিছুতেই মেটার নয় তা কি তুমি জান?কিছুতেই তোমার সাথে ভদ্র ব্যবহার করার সুযোগ দেবে না,তাই না প্রিয়তমা?
শি ইজ সাচ আ বিচ।আ ডেলিশাসলি টেন্ডার,চার্মিং,ডিলেকটেবল বিচ।ওভারডিটারমিনেশন ওয়ার্ক্স ওনলি অন পেপার।দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ অ্যাকচুয়ালি ফ্যালোসেন্ট্রিক।আখেরে পুরুষাঙ্গের সামনে সমাজ এবং নারীকে ঝুঁকতে হয়।আর কোথাও না হোক,অন্তত মন্দিরে এসে।আমরা ভারতীয়রা শিবলিঙ্গের পূজারী।এখানেই ফ্যালোসেন্ট্রিজমের জয়।আমি মুখে যাই বলি না কেন আমি হৃদয়ের অন্তঃস্হল থেকে ফ্যালোসেন্ট্রিজমে বিশ্বাসী।কি বলা উচিত আমায়?ভণ্ড?ভণ্ড আমরা প্রত্যেকেই।তুমি যাদের আইডলাইজ কর সেই স্ট্যালিন বা চারু মজুমদারও।
গত চারদিন ধরে আমার তোমার সাথে কি করতে ইচ্ছা করছিল জান?জাস্ট থাবড়ে তোমার পশ্চাদ্দেশ এবং গালদুটো লাল করে দিতে।তোমার ঐ মাওবাদী শিটের জন্যও আমি নিজের সময় খরচা করতে প্রস্তুত ছিলাম।তুমি তার বদলে কি করলে?আবার ঐ অসহ্য,পশ্চাদ্দেশে আগুন লাগিয়ে দেওয়া উপেক্ষা।আমি টানা চার দিন রাতে ঘুমোতে পারিনি।বারবার উঠে মেল চেক করেছি।তারপর চারদিন পর তুমি রিপ্লাই করলে।কি মনে কর আমাকে? রাস্তার নেড়ি কুকুর?তোমার বাসি রুটি ছুঁড়ে দেবার অপেক্ষায় বসে ল্যাজ নাড়বে?ঐ কুকুরটাই কামড়ালে কিন্তু জলাতঙ্ক হতে পারে।তার অবশ্যম্ভাবী ফল-মৃত্যু।
কিন্তু পুরো পর্বটাই এতটা তিক্ত ছিল না।খুব কম সময়,কয়েকটা মাত্র ঘন্টা হলেও এমন সময়ও ছিল যা আমাদের প্রতিকূল ছিল না।ঐ সময়গুলো এখন আমার কাছে মলমের কাজ করে।আমার আহত ভঙ্গুর পৌরুষের মলম অথবা হয়ত আমার ক্ষত তৈরী হওয়া বুকের।


তৃষ্ণার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম।সৌম্য কয়েকটা বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আমার কেবিনে এসেছিল।মন দিতে পারছিলাম না।ওহ ঐ মুহূর্তগুলো!এক একটা সেকেণ্ড এক একটা শতাব্দীর মত দীর্ঘ মনে হচ্ছিল।আমি বার বার দরজার নীচ দিয়ে বাইরের দিকে দেখছিলাম ও এল কিনা।তারপরেই ওর নোংরা ডেনিমের জুতো আর উপর দিয়ে কাদা মাখা ছেঁড়া ট্রাউজার্স দেখা গেছিল।ও দরজা নক করার আগেই আমি উচ্ছাসের ফলে ওকে ডেকে ফেলি।হয়ত সংযত থাকা উচিত ছিল।এতটা আগ্রহ দেখিয়ে ফেলা ঠিক হয়নি।যাই হোক পরে পরীক্ষার খাতায় সেটা পুষিয়ে দিয়েছিলাম।তৃষ্ণা ঘূর্ণাক্ষরেও আর কোনদিন ভাবতে পারবে না যে আমি কয়েক দিনের জন্যও……
আমি একজন ফিলোফোবিক মানুষ।সে প্রেম বা যৌনতা নিয়ে লিখিত ভাবে যতই বক্তৃতা করি না কেন!চিরাচরিত বাঙালী পুরুষ যেমন হয়।শ্রেণীযুদ্ধ আমার চোখে শুধু মাত্র একটা দর্শন,বিস্তৃততর কিছু নয়।আমার কাছে প্র্যাক্সিস হল শুধুমাত্র নিজের মস্তিষ্কের পুলিশটাকে হত্যা করা।কার্টেজীয় দ্বিপাক্ষিক গঠনে শ্রেণীশত্রুচিহ্নিতকরণের ক্লাসিকাল মার্ক্সবাদী ধারণাকে আমি ডগমার অভিধা দিয়ে ডিসকার্ড করেছি।কারণ অ্যাকটিভিজমের পথ কণ্টকময়,প্রতিঘাত নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।তাই আরামকেদারার বিপ্লব।তাই তত্ত্বকেই যাপনের মুখোশে ঢেকে দেখানো।আমার কাছে প্রেম বা বিপ্লবের সাহসিকতা ক্লাসরুম আর ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ।প্রেমকে বিপ্লবে এবং বিপ্লবকে প্রেমে বদলাবার মত মেরুদণ্ডের জোর আমার নেই।আমি চে গ্যেভারা বা সিরাজ শিকদার নই যে পরকীয়ায় জড়িয়েও বুক চিতিয়ে দয়িতার হাত ধরে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব নিয়ে প্রেমকে স্বীকৃতি দেব।আমি চারু মজুমদারও নই যে সারাজীবন একনিষ্ঠ প্রেমে নিজের স্ত্রীর কাছে হৃদয় বন্ধক দিয়ে রাখব।আমি পছন্দ করি দায়িত্বহীন প্রেম,ক্যাজুয়াল যৌনতা।কেউ কমিটমেন্টের কথা বলতে গেলে থার্ড ওয়েভ ফেমিনিজমের ভাষায় তাকে কিঙ্ক শেমিং এর জন্য ধিক্কার দিই।না আমি যে আদর্শ বেছেছি তাতে কমিটমেন্ট বা আত্মবলিদানের কোনো জায়গা নেই।না প্রেমে না রাজনীতিতে।স্ট্যালিন বা চারু মজুমদারের প্রতি আমার এই বিচিত্র বিদ্বেষের কারণ আসলে লুকিয়ে থাকা একটা হীনমন্যতা।যে কারণে ধ্বনিকে প্রতিধ্বনি ব্যঙ্গ করে।আমি আদর্শের জন্য আত্মনিগ্রহ করার কথা ভাবতেও পারি না,প্রেমের জন্যও না।ঐ লোকগুলোর মত মহাপুরুষ আমি কোনদিন হতে পারব না।যে পথে হাঁটলে সফলতা দেখে যাওয়ার আসা কম,সমাজে লোকনিন্দা, পরিবার,বন্ধুবান্ধব সবার দূরে সরে যাওয়া,স্বীকৃতি নেই,স্তুতি নেই,বন্দনা নেই,আছে শুধু আত্মত্যাগ -সেই পথে হেঁটে লাভ কি!চারু মজুমদার বা স্ট্যালিন আজকের যুগে ইতিহাসে খলনায়ক নামে পরিচিত।কিন্তু তাদের থেকে অনেক বেশী মানুষকে স্রেফ না খাইয়ে মারা চরম অসংবেদনশীল বর্ণবিদ্বেষী চার্চিল শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদের তকমা পেয়েছে।মুখের কোনো স্বীকৃতি নেই,স্বীকৃতি আছে শুধু মুখোশের।ঐ জন্য আমি এবং আমার মত অনেক বাঙালী ইন্টেলেকচুয়াল আরামকেদারার বিপ্লবী এবং সমালোচক। ছাত্রছাত্রীরা আমাকে দেবতার আসনে বসিয়েছে।সত্যি সত্যি কুরবতের পথে হাঁটলে আমাকে মাটিতে নেমে আসতে হত।ধূলো এমনকি রক্তঘাম মাখতে হত।আমি আমার সিংহাসন থেকে নামতে প্রস্তুত ছিলাম না কোনদিনই।মার্ক্সবাদ পড়ার কারণে আমি জানি পেটি বুর্জোয়া মানসিকতার উৎস মেনস্ট্রিম ইকোনোমিকসের সবচেয়ে অপটিমাল বিনিয়োগে ম্যাক্সিমাম পে অফের ধারণা।মধ্যবিত্ত মানসিকতার ইন্টেলেকচুয়াল বিপ্লবে নামলেও সফল হওয়া নিশ্চিত জেনে তবেই নামে।অস্বীকৃতির অন্ধকারে সে কাজ করতে চায় না।ন্যূনতম আত্মনিগ্রহের বিনিময়ে সে সর্বোচ্চ খ্যাতি ও স্বীকৃতি চায়।আমি নিজেও এই মানসিকতা থেকে মুক্ত নই।ফলাফলের চেয়ে আত্মরতিটা আমাদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়ায়।আমি বিপ্লব কোনদিনই চাইনি,বিপ্লবের নামাবলী পড়ে সম্ভ্রম আদায় করতে চেয়েছিলাম।যে কোনো বাঙালী এই সেন্টিমেন্টটার সাথে রিলেট করতে পারবে।আর ঠিক এই কারণেই ভারতে কালচারাল রেভলিউশনের কাণ্ডারী সরোজ দত্তকে আমি অপছন্দ করি।বদ্ধোন্মাদ!লেখাপড়া শিখেও যে এরকম নির্বোধ কি করে হয়!বাঙালী মধ্যবিত্তের হিপোক্রিসিটাই দেখতে পায়নি।মধ্যবিত্ত এবং সামন্ততান্ত্রিক হেজিমনি ভেঙে প্রলেতারিয়ান হেজিমনি তৈরী করতে চেয়েছিল।তার মূল্য দিতে হয়েছে নিজের জীবন দিয়ে।তৃষ্ণাও ওটাই ভুল করেছিল।আমাকে মাটিতে টেনে নামাতে চেষ্টা করেছিল।তার শাস্তি ও নিজের মার্কশিটে পেয়েছে।
থাক এসব অপ্রিয় প্রসঙ্গ। কয়েক মুহূর্তের জন্য বরং আবার ঐ ইউফোরিক স্মৃতিতে ফিরে যাই।তৃষ্ণা আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল চোখে একরাশ অভিমান মেখে।আমি মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখছিলাম।অভিমানের ছাপ একটা মানুষের মুখকে এতটা সুন্দর করে!কোমর পর্যন্ত খোলা চুল,মলিন পোশাক আর ওর উজ্জ্বল নরম অপাপবিদ্ধ মুখ।আচ্ছা ঐ মুহূর্তে যদি ওকে বুকে টেনে নিতাম ও কি আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিত?নাকি বালির ভিতের মত আমার বাহুবন্ধনে চূর্ণ হয়ে ভেঙে পড়ত?যাই হোক প্রথম আশঙ্কাটা তো ছিলই,তাছাড়া আরও বহু সঙ্গত কারণেই সেটা করার অপচেষ্টা করিনি।
আগের দিন ওকে আমার কেবিনে আসার অনুমতি দিইনি।ও আজ আমার থেকে অনেকটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়েছিল।আমার প্রথম অরগ্যাজমের সময়েও এতটা আনন্দ হয়নি।ও আমার উপর অভিমান করেছে।মানে ও আমার প্রতি বরফশীতল নয়।আমি ওকে হাতের ইঙ্গিতে কাছে এসে দাঁড়াতে বললাম।ওফ এই মুহূর্তটা সত্যিই স্বর্গীয়। আমার এতদিনের বিনিদ্র রাত্রির ঋণ যার কাছে,আমার চোখের কালির ঋণ যার কাছে-সে আমার উপর অভিমান না করলে জীবনের মানে কি হয়!ও অভিমান করবে,আমি ওর মান ভাঙাব।বার বার।কয়েক শতাব্দী ধরে,জন্মজন্মান্তর ধরে।বিছানায় রক্তঘামের সঙ্গমের চেয়েও এটা কত বড় সুখানুভূতি কেউ বুঝবে না।অথবা একমাত্র সেই বুঝবে যে এই ব্যাপারটার মধ্যে দিয়ে গেছে,এই মুহূর্তগুলো যাপন করেছে।
ওকে যাবার সময় খুবই মধুর গলায় অনুরোধ করলাম যদি ও একবার বাড়ী যাবার সময় ক্যান্টিনে আমার জন্য চা বলে যায়!(মানে এটা আমি নিজেও ক্যান্টিনে ফোন করে বলতে পারতাম কিন্তু তৃষ্ণার আনুগত্যের প্রমাণটাও দরকার ছিল।)ও সম্মতি জানিয়ে চলে গেল।


আমি এই তৃষ্ণাকে চেয়েছিলাম।নম্র,ভদ্র, অনুগত।যার সাথে হালকা চালে একটু আধটু ফ্লার্টিং করা যায় বা শরীর ছোঁয়া যায়।ও তখন নিশ্চয়ই লজ্জায় লাল হয়ে উঠবে।কিন্তু তৃষ্ণা সেটা ছিল না।তৃষ্ণা সেই আগুন ছিল না যে পতঙ্গকে নিজের মধ্যে টানে।তৃষ্ণা সেই বিপ্লববহ্নি ছিল যা হোমাগ্নির মত পবিত্র।মানুষকে শুদ্ধ করে এবং বিপ্লবের রক্তিম আত্মত্যাগের পথে টেনে নিয়ে যায়।
তৃষ্ণা সেই শঙ্খিনী নারী ছিল না যাকে স্বাভাবিক ভাবে আমরা পুরুষরা চাইলেও মনে মনে ভয় পাই।কিন্তু তাও আমি ওকে ভয় পেতাম।ওর পবিত্রতাকে,ওর মধ্যে থাকা অদ্ভুত একটা অবসেশনকে।এই অবসেশন আমাদের পশ্চিমবাংলার অজস্র ছেলেমেয়েকে একদিন অকথ্য অত্যাচার ও মৃত্যুর পথে নিয়ে গেছে।আমি অ্যাটাচমেন্টকে ভয় পেতাম।আমি ভয় পেতাম কোনো দুর্বল মুহূর্তে ওর প্রেমে না পড়ে যাই।
সাদা পরী দেখেছেন কোনো পাঠক?আমি দেখেছিলাম।এসির হাওয়ায় ওর খোলা চুল সারা মুখে অবাধ্য ভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল।একবার তো পেনের ঢাকনাও চুলে আটকে গেল।সাদা সালোয়ার কামিজে পৃথিবীর সবচেয়ে নরম কাদামাটির মূর্তি,অবাধ্য চুল ওড়না নিয়ে বিপর্যস্ত(সালোয়ারকামিজে মেয়েটা একদম স্বচ্ছন্দ বোধ করত না)।আর ঐ চুলের মধ্যে ফুটে থাকা সদ্যস্ফুট গোলাপের মত ওর মুখ।সেদিন গোটা পৃথিবীর কেন্দ্রটা ঐ দুঘন্টার জন্য এসির পাশের লাল চেয়ারটায় উঠে এসেছিল।বার বার ডিসট্র্যাকশন ঘটছিল।অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা বিরক্ত হচ্ছিল।তৃষ্ণা পর্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছিল।অপর্ণা সম্ভবত রেগে যাচ্ছিল।কিন্তু আমার মস্তিষ্ক ঐ দুঘন্টার জন্য তৃষ্ণার পায়ের নীচে পড়েছিল।শালীন অশালীন বোধ,ন্যায় অন্যায় কিছুই কাজ করছিল না।
কিন্তু ঐ মুহূর্তগুলো কালবৈশাখীর মত হয়।একরাশ ঝড় বৃষ্টি এনে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।ভেজার সময়টা আমরা একরকম ডিলিরিয়ামের মধ্যে থাকি।মস্তিষ্ক অবশ হয়ে থাকে।পরে ড্যামেজটা উপলব্ধি করা যায়।তখন ঝড় থাকে না,ঝড়ের কারণও আমাদের ছেড়ে নিজের জীবনে অনেকদূর এগিয়ে চলে যায়।শুধু আমরা পড়ে থাকি শ্মশানের ধূসর নিস্তব্ধতার মধ্যে।প্রচণ্ড ভিড়েও একা হয়ে।তৃষ্ণা তখন রূপকথার চরিত্র হয়ে আমার জীবনে ছিল,এখন নেই।কিন্তু আবার আছেও।আমার মধ্যে একটা জম্বি হয়ে।প্রেতাত্মা হয়ে।এই তৃষ্ণা কিন্তু বাস্তবের তৃষ্ণার চেয়ে আলাদা।এই তৃষ্ণা কোন মানুষ নয়।এই তৃষ্ণা শুধুই অপূ্র্ণ থাকা বুক ফাটা একটা তৃষ্ণা।যা আমার ভঙ্গুর পৌরুষে প্রতিনিয়ত চিড় ধরায়।

 

 

পর্ব ৯
তৃষ্ণার কথা


প্রশ্ন উঠবে।কুৎসা,অপ্রাপ্তির হাহাকার,ব্যর্থতার পক্ষে সাফাই গাওয়া,দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা ইত্যাদি নানা বিশেষণে এই লেখাটা অলংকৃত হবে।এমনকি আমার ব্যক্তিগত জীবনের দিকে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি হওয়াও অসম্ভব নয়।আরেকটাও চমৎকার পন্হা আছে।অভিযোগকারীর মানসিক সুস্হতা নিয়ে প্রশ্ন তোল।ক্ষমতাশালীরা বিরুদ্ধবাদীর উপর অন্যতম যে অস্ত্রটা প্রয়োগ করে থাকে।
গড্ডালিকাপ্রবাহের প্রতিকূলের পথ বন্ধুরতম।সবাই যখন বাহুতে স্বস্তিকা এঁকে হাঁটে তখন সোফি স্কোলদের গন্তব্য হয় গিলোটিন।সহনাগরিক,এক্ষেত্রে সহপাঠী- কারোর কাছ থেকেই আমি কমরেডলি অনুভূতি আশা করছি না।আমার কাজ সিদ্ধান্ত জানানো নয়,শুধু ঘটনাবলী তুলে ধরা।বিচার এবং সিদ্ধান্তের দায়িত্ব পাঠকের।
হিউমিলিয়েশন,বিদ্রূপ,প্রতিকূলতা, এমনকি শারীরিক আঘাতের বিষয়ে একটা সুফিসুলভ নিষ্পৃহতা আনতে এতদিনে সক্ষম হয়েছি বলেই হয়ত কলম ধরতে পেরেছি। একজন অ্যাকটিভিস্টের কর্তব্য শুধু ক্রিয়া নয়,সেই ক্রিয়ার ফলস্বরূপ যে পরিণতিটা আসছে তার ধাক্কাটাও সামলানো।হ্যাঁ সেই ধাক্কাটা নেবার মেরুদন্ড আমি গড়ে তুলেছি,এই একবছর ধরে তিলে তিলে।
আপনার আসল চেহারাটা তুলে ধরার কনসিকোয়েন্স কি হতে পারে?আপনি যে ক্ষমতার জায়গায় রয়েছেন তার নানারকম অপপ্রয়োগ!যেমন মিডিয়ার সামনে আমার চরিত্রহনন, আইনি পথে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা।অথবা যাদের মস্তিষ্কে আপনি প্রায় প্রফেটের স্হান অর্জন করেছেন,আপনার প্ররোচনায় তাদের অ্যাসিড অ্যাটাক,কিংবা তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ।ক্ষমতাবানের পক্ষে ক্ষুদ্রকে শিক্ষা দেওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়।বিশেষ করে মেয়ে হলে কথাই নেই।আমার উপর যদি একটাও শারীরিক আক্রমণ রাস্তায় ঘটে তার জন্য আমি আপনাকে দায়ী মনে করব।একটা আপাত সৌম্য, ভদ্র চেহারার পিছনে আপনার চরিত্রের নোংরা দিকটা আমার চোখে আপনি লুকোতে পারেননি।জাহান্নামে যাক অন্যদের মতামত,এই লেখাটা পড়ে আপনি একবার তাকাতে পারবেন আয়নার দিকে?নিজেকে প্রশ্ন করুন ডঃ ভট্টাচার্য, আমার বক্তব্যে কতটা মিথ্যে আছে।অস্বীকার করতে পারবেন করিডর দিয়ে হেঁটে যাবার সময় আড়চোখে আমাকে দেখতেন?আমাকে ফলো করে প্রেজেন্টেশনের দিন পর্যন্ত চলে এসেছিলেন?আপনার গ্রুপের প্রেজেন্টেশনের টাইম স্লট আমাদের ঠিক পরপর হওয়ার ঘটনাও কাকতালীয়? আমি অন্তত সেটা মনে করি না।
কন্যাসমা একজন ছাত্রীকে কি চোখে দেখেছিলেন আপনি?আপনার নিজের আমার বয়সী একটা মেয়ে আছে,আপনার বয়সী কোনো অধ্যাপক তার দিকে ঐ চোখে তাকালে এবং পরে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মার্কশিটে শোধ তুললে ক্ষমা করতে পারতেন তাকে?আপনার নিজের ছেলেমেয়েরা শুধু মানুষ,অন্যরা রাস্তার কুকুরবিড়াল বলুন?আপনি অসাধারণ লেকচারার,দারুণ স্পিকার কিন্তু একজন মাস্টারমশাই হয়ে উঠতে পারেননি।একজন শিক্ষকের চরিত্র কিরকম হওয়া উচিত এটা যদি সব্যসাচী স্যরকে দেখে শিখতে পারতেন!আপনার কেবিনের মুখোমুখি কেবিনেই বসেন ভদ্রলোক।


উন্নাসিকতা আপনি বাইরে দেখাতে পারেন,আমাকে বিদ্রূপ করতে পারেন,ইউনিভার্সিটি আপনার জায়গা,আপনার পক্ষে দাঁড়ানো লোকজনের অভাব নেই,সেখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুললে আপনি চিৎকার চেঁচামেচি করে একটা সিন ক্রিয়েট করলেও বিস্মিত হব না।প্রশ্নের উত্তর এড়ানোর ওটাই তো চমৎকার উপায়।
কিন্তু একান্তে আমার মুখোমুখি দাঁড়াবার সাহস আপনি কোনোদিন অর্জন করে উঠতে পারবেন না।সত্যি বলতে সামনাসামনি আমাদের কখনও দেখা হোক এটা আমি চাইও না।আমার জীবনে আপনি একটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু নন।আপনার চোখের দৃষ্টিটুকুও আমার উপর পড়লে আমার মনে হত আমার সারা শরীর জুড়ে অজস্র আরশোলা হাঁটছে।মলয়া দেবীর চোখে রুণু নিয়োগী যা,আমার কাছেও আপনার ঠিক সেই অবস্হান।কোনোদিন আপনার মুখ দেখতে চাই না।এতটা ঘেন্না কেন করি জানেন আপনাকে?কারণ একসময় শ্রদ্ধা করতাম।কারণ আমি যে দর্শনটাকে আমার জীবনের উপজীব্য মনে করি আপনি সেটা আমাদের পড়াতেন।এবং প্রত্যেক পলে পলে যাপনের ক্ষেত্রে আপনি সেই দর্শনের বিপরীত পথে হেঁটেছেন।আপনার মত ভন্ডের চেয়ে আমি একজন স্পষ্টবাদী ধর্মান্ধকে বেশী শ্রদ্ধা করি।
শিক্ষক তো দূরের কথা,আমি আপনাকে মানুষ বলেও মনে করি না।অন্তত যদি মেরুদণ্ডী প্রাণী হন,আমাকে confront করুন।আমার এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন।
থার্ড সেমে শম্পা ম্যাডামের হাত থেকে কায়দা করে ইন্টারনালের নম্বরটা সরিয়ে নেওয়া হল কেন?
অপর্ণা এলিয়েনেশনের প্রশ্নটা বই থেকে না লিখে ও অন্য একটা প্রশ্ন ভুল লিখেও কি করে পল ইকোয় হায়েস্ট পেল থার্ড সেমে?ফোর্থ সেমে শম্পা ম্যাডামকে আপনি শুধু এপ্রিলের শেষ দু সপ্তাহের ক্লাস ছেড়েছেন,এবং পঞ্চাশের মধ্যে পুরো চল্লিশ নিজের হাতে রাখলেন।তাঁর হাতে মাত্র দশ নম্বর রইল।এবং তাঁকে মিথ্যে বললেন যে সারা মে মাসটা উনি ক্লাস পাচ্ছেন।অথচ আপনি খুব ভাল করে জানতেন যে মে মাসের মাঝামাঝি আমাদের পরীক্ষা।এবং এপ্রিলের পর থেকে ইউনিভার্সিটি ছুটি পড়ে যাচ্ছে।পল ইকোর নম্বরের অস্বাভাবিক ডিস্ট্রিবিউশন এবং তারপর সারা সেমিস্টার বেশীরভাগ ক্লাস না করেও অপর্ণার ৪১ তথা হায়েস্ট পাওয়া-এরকম মিরাকল বোধহয় আপনি খাতা দেখলেই একমাত্র সম্ভব।আমি না হয় আপনার মেল ইগোকে অ্যাপিজ না করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছি।সায়ন্তনী তো সেটা করেনি।সব সময় নিজের মাথা আপনার সামনে নীচু রেখেছে।নম্র,ভদ্র, পলিশড এবং মেধাবী।যে মেয়েটা মাস্টার্সে প্রায় ৭২% নম্বর নিয়ে বেরোল সে এম ফিলের রিটন পরীক্ষায় চান্স পেল না।বিশেষ করে অপর্ণা তার উপর ক্ষেপে ওঠার পরপরই এটা ঘটে।কিসের দায় ছিল আপনার অপর্ণাকে এত তোষণ করবার?যে প্রশ্নগুলো ক্লাসে বা ইমেলে আলোচনা করা যায়,সেগুলোর জন্য আমাকে বার বার ঘরে ডাকতেন কেন?পলিটিকাল ইকোনমি পেপারটা পড়ানো এক বছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হল কেন?বা বন্ধ করতে বাধ্য হলেন কেন?এম ফিলে মার্ক্সিয়ান ইকোনোমিকসের বিষয়ে পাঁচ ছটা ছেলেমেয়ে এস ও পি দেওয়ার পরও ইন্টারভিউ বোর্ডে আপনার বিচিত্র ও রহস্যময় অনুপস্হিতি।কেন কাজলবাবু?ইন্টারভিউতে অপর্ণাকে সিলেক্ট করতেই হত আর আমার মুখোমুখি হবার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেননি?নাকি আপনার ধারণা ছিল যদি আপনার হস্তক্ষেপ ছাড়াও অপর্ণা সিলেক্টেড হয় তাহলে আমি আপনাকে ছেড়ে কথা বলব না?একটা সামান্য ছাত্রীকে এত কিসের ভয় কাজলবাবু?কত জনপ্রিয়,ক্ষমতাবান, বিখ্যাত মানুষ আপনি!আচ্ছা আপনাকে হঠাৎ অভিযোগ করতে যাব কেন বলুন তো!
অপর্ণার আপনার উপর একটা বিচিত্র অধিকারবোধ ছিল।দৃষ্টিকটূ ভাবে বিচিত্র। আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রচুর আগ্রহ ছিল তার।ওর এই অপ্রাসঙ্গিক ভাবে আপনার প্রসঙ্গ সব কিছুতে টেনে আনা একটা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার পক্ষে।যেমন একদিন আমি ক্যাজুয়াল মিস্যান্ড্রিস্ট একটা জোক ক্র্যাক করছিলাম,"ধূর ছেলেরা আবার সচ্চরিত্র হয় নাকি?"
অপর্ণা ওর স্বভাবসিদ্ধ পদ্ধতিতে ঘোঁতঘোঁতিয়ে উঠল,"মানে কেবিএইচ দুশ্চরিত্র? "
তারপর গ্রুপ প্রোজেক্টের ব্যাপারে ও একরকম নিশ্চিত ছিল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর আপনি হবেন।সেটা না হওয়ায় এবং সায়ন্তনীদের গ্রুপের দায়িত্ব নেওয়ায় ও রীতিমত অফেন্ডেড হয়েছিল সায়ন্তনীর উপর।তারপর আপনি প্রেজেন্টেশনে ওদের নাকি খুব সাহায্য করেছিলেন।এটা অপর্ণা নিতে পারেনি।অথচ একজন মেন্টরের পক্ষে নিজের গ্রুপকে সাহায্য করাই স্বাভাবিক নয় কি?এরপরই ও সায়ন্তনীর উপর ক্ষেপে যায় এবং কাকতালীয় ভাবে সায়ন্তনীকে এম ফিলের রিটন টেস্ট থেকে বাদ পড়তে হয়।
ছাত্রছাত্রীদের কনভার্সেশনে শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গটা উঠে আসার কথা নয়।যদিও অপর্ণা সেটা প্রায়ই অপ্রাসঙ্গিক ভাবে টেনে আনত।সায়ন্তনীকে ও যেমন পছন্দ করত না,তেমনি আপনার স্ত্রীকেও করত না।ওর একটা উদ্ধৃতি তুলে দিই।
"কেবিএইচের ওয়াইফকে কি জঘন্য দেখতে।কালো বিচ্ছিরি।"
আমি বলেছিলাম,"এভাবে কারোর ব্যাপারে বলতে নেই।"
আসলে কাজলবাবু আমি একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।তাই বডি শেমিং এর কালচারে অভ্যস্ত নই।আসলে আমার তো আপনার বা অপর্ণার মত অভিজাত ব্যাকগ্রাউন্ডে আপ ব্রিঙ্গিং হয়নি।ইউরোপিয়ান কনস্ট্রাক্ট অফ বিউটিকে স্ট্যান্ডার্ডাইজ করা আপনাদের মত অভিজাত মানুষদের পক্ষে স্বাভাবিক।বডি শেমিং এর সংস্কৃতি আপনার বা অপর্ণার মত লোকেদের পরিবারে তৈরী হয়। অথচ ক্লাসে ইউরোসেন্ট্রিজম বা ওরিন্টালিজম নিয়ে কত বড় বড় বক্তৃতা দিতেন আপনি।ফেমিনিজমের বিভিন্ন স্কুলগুলোর প্রথম ধারণা আপনার কাছেই পাওয়া আমাদের।অথচ…
ভাবছেন আপনাকে কেন অভিযোগ করছি?
এই কথাগুলো ওর মাথায় এল কোথা থেকে কাজলবাবু?ওর তো আপনার স্ত্রীকে চেনার কথা নয়।আপনার কাছ থেকে শুনেছে বিশেষণগুলো?যদি এটা সত্যি হয় তাহলে আপনার এই বোধটাও নেই ছাত্রীর কাছে নিজের স্ত্রীর নিন্দে করলে নিজেরও সম্ভ্রমহানি হয়?আর কত নীচে নামবেন আপনি?ভালো কথা আপনার পিএইচডির বিষয় ইন্টারসেকশনাল ফেমিনিজম ছিল না?

 

 

পর্ব ১০
কাজল ভট্টাচার্যের কথা


অপর্ণার উরুসন্ধির মধ্যে আমার অসম্ভব বিবমিষা হচ্ছিল।এই দুর্গন্ধময় দম আটকানো অভিজ্ঞতার জন্যই আজকাল আমি ক্লসট্রোফোবিক হয়ে যাচ্ছি।ও আমার মাথাটা চেপে ধরে রেখেছে,কোনমতে নিজেকে ওর হাত থেকে ছাড়িয়ে আমি বেসিনে গিয়ে ঝুঁকে পড়লাম।হড়হড় করে খানিকটা বমি হল।এই ওরাল সেক্স জিনিসটা আমার একদম পোষায় না।গা ঘিনঘিন করে।অন্তত অপর্ণার সাথে।কিন্তু আজ ওকে শান্ত করার এটাই একমাত্র উপায় ছিল।যা সাংঘাতিক ক্ষেপে গেছে!
আমি ওর পুরো সাবস্ট্যান্সটা বমি করে ফেলায় ও ফিউরিয়াস হয়ে উঠে এসে আমার উন্মুক্ত নিতম্বে সপাটে লাথি কষাল।আমি টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম।
ও আমার চুলের মুঠি ধরে আমার মাথাটা উঁচু করে তুলে ধরল।তারপর হিসহিসে গলায় বলল,"এখন আর আমাকে পছন্দ হচ্ছে না,তাই না?"
বলে একটা অত্যন্ত অশ্লীল গালি দিল।
আমি ওর হাত থেকে নিজেকে ছাড়ালাম না।কাতর গলায় বললাম,"তোমাকে অদেয় আমার কিছুই নেই অপর্ণা।"
ও আমার চুল ছেড়ে দিল ঠিকই,তবে শান্ত হল না।একইরকম জিঘাংসা পূর্ণ গলায় বলল,"সায়ন্তনীর বুকে কনুই ঠেকাতে খুব মজা লাগে বলো?আমি সব খুলে দিচ্ছি তাতেও হচ্ছে না।"
-"আমি কিছু করিনি।তুমি ভুল বুঝছ।"
-"আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলিনা শুওরের বাচ্চা," চিৎকার করে উঠল অপর্ণা,"কি ভেবেছ কিছু দেখতে পাব না?ঐ মাখো মাখো করে ছবি তোলা,সারাক্ষণ লেপ্টে থাকা…"
-"ও আমার পিছনে এলে আমি কি করব?"অসহায় ভাবে বললাম আমি।
-"সায়ন্তনী যেন এম ফিলের রিটনেই ছাঁটা হয়ে যায়।নইলে তোমার ন্যাংটো ভিডিওগুলো ফেসবুকে তোমার বউ,বাচ্চা, ছাত্রছাত্রী,কোলিগস সবাই দেখবে।সেটা কি খুব ভাল হবে?"
-"প্লিজ অপর্ণা"
-"শাট দ্য ফাক আপ।কি পেয়েছ আমাকে?প্রস্টিটিউট?"
-"মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ, প্লিজ।"আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,"তুমি যা চাইছ তাই হবে।আমাকে এখন একটু একা থাকতে দাও।"
অপর্ণা আমার পাশে বসে হেঁচকি তুলে কাঁদছিল,"ভালবাসি তোমাকে কাজল,ভালবাসা।তোমার মত শরীর সর্বস্ব একটা পশু কথাটার মানে বোঝে?"
-"আমি তো তোমার কোনো কথারই অবাধ্য হচ্ছি না অপর্ণা।"
-"তাহলে তৃষ্ণার দিকে ঐভাবে কেন দেখ?আমাকে সাথে সবচেয়ে ইন্টিমেট মুহূর্তগুলোয় ওর নাম কেন বলছিলে কাজল?"ভেঙে পড়া গলায় বলল অপর্ণা।আমি ওকে বুকে টেনে নিতে পারলাম না।একটা ঠান্ডা স্রোত আমার শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে গেল।কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে রইলাম আমি।কখন ওর নাম করেছি সেটা মনেও নেই।তবে এই ঘটনাটা বোধহয় বাড়ীতেও একবার ঘটেছে।শর্মিষ্ঠা ইদানীং আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে।একদিন ও ও আমাকে জিজ্ঞেস করছিল "তৃষ্ণা কে?"কোনোমতে কাটিয়েছি।বাড়ীর কথা মনে পড়তেই ভয়টা আরো বেশী করে আমাকে চেপে ধরল।
অপর্ণা আমার মুখটা দুহাতে তুলে ধরল যাতে ওর চোখের দিকে আমি তাকাতে বাধ্য হই।তারপর বলল,"তুমি তৃষ্ণাকে ভালবাস কাজল?"
আমি ফসিল হয়ে বসে রইলাম।এবারও কোনো উত্তর দিলাম না।ও বলল, "তৃষ্ণা আসলে মাওবাদীদের গোপন সমর্থক।ও ইন্দ্র মজুমদার নামে একটা ছেলের সাথে প্রেম করে।শি ইজ আ পিউরিস্ট বিচ।তোমাকে ও ঘেন্না করে।অশ্রদ্ধা করে।কোনোদিন শরীর দেবে না।ওর পিছনে ঘোরা বন্ধ কর।"
আমার পক্ষে আর ওকে সহ্য করা সম্ভব হল না।ওকে সরিয়ে দিয়ে জামাকাপড়গুলো তুলে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম।অপর্ণাদের বয়সে এই 'ভালবাসা' জাতীয় শব্দগুলোর প্রাসঙ্গিকতা থাকে।ও জানে না আমার অভিধানে এরকম কোনো শব্দ নেই।মানে অন্য কোন মেয়ের জন্য।ভালবাসা শব্দটার ব্যাপ্তি অনেক গভীর।এটা শুধু শরীরী টান নয়।এটা এমন একটা অনুভূতি যা নিজেকে দয়িতের কাছে তুচ্ছ করে তোলে।ভালবাসার পাত্রীর জন্য আত্মনিগ্রহ করতে, এমনকি নিজেকে ধ্বংস করতেও এতটুকু দ্বিধা থাকে না।এটা সারা পৃথিবীতে একজনের জন্যই তোলা আছে।সে আমার রক্তের অংশ,আমার আত্মজা,শ্রেয়সী।
হ্যাঁ,ভালবাসি বলেই শরীরী ভাবে ওকে চেয়েও আমি আজ পর্যন্ত ওর দিকে হাত বাড়াইনি। ও অন্য একটা ছেলেকে ভালবাসে।এই বিষয়টা আমাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করলেও ওর আনন্দের জন্য মেনে নিয়েছি।সমাজের,এমনকি প্রগতিশীল বামপন্থিদের পর্যন্ত প্রেম বা যৌনতা নিয়ে এই ছুঁতমার্গগুলো আমার পোষায় না।প্রেমের কোন বাধ্যবাধকতা থাকতে আছে নাকি!প্রেম হবে মুক্ত।ইনসেস্ট প্রেম বা বিয়ে কেন নিষিদ্ধ হবে!এই যৌনতা সংক্রান্ত ছুঁতমার্গের জন্যই আমার লেনিন বা স্ট্যালিনকে পছন্দ হয় না।স্ট্যালিনটা আবার মার্ক্সবাদের কিছু জানত নাকি?প্রকৃত মার্ক্সবাদী যদি কেউ থেকে থাকে সে হচ্ছে আলথুজার।আর তার একমাত্র উত্তরাধিকারী হচ্ছি আমি।অবশ্য ট্রটস্কি বা টিটোকেও আমার মার্ক্সবাদী বলতে তেমন আপত্তি নেই।স্ট্যালিনকে ওরাই উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছিল।তারপর বরফ পরিষ্কার করার কুঠারটাই সব গন্ডগোল করে দিল।
তাত্ত্বিক আলোচনা থাক।কিন্তু অপর্ণা আমার একটা দুঃস্বপ্নকে এক্সপ্লোর করে দিয়েছে।বিষয়টা আর খেলায় সীমাবদ্ধ নেই।আমি তৃষ্ণার প্রতি অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়ছি।কোন কিছু আর আগের মত নেই।আমার কাজ কর্ম,গবেষণা – সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।একদিন ক্লাসে গিয়ে লেনিনের স্ত্রীর নাম ভুল বললাম।বাড়ীতেও নানারকম গন্ডগোল করে ফেলছি।


আমি এটা চাইনি।আমি চেয়েছিলাম ওর বালিশ ভেজার কারণ হতে,ওর রাত জাগার কারণ হতে।ও এভাবে আমার সর্বস্ব জুড়ে বসবে কল্পনাও করতে পারিনি।ওকে এমন জায়গায় নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম যে ও আমার প্রেমে হাবুডুবু খাবে,এভাবে ওকে ভালনারেবল করে তুলে ওকে নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করব।কখনও আদর,কখনও ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া।আজ আমি এমন একটা মানসিক অবস্হায় পৌঁছেছি যে ও একটু ভাল করে কথা বললেই সারাটা দিন অবশ হয়ে থাকে।বিশ্বাস কর তৃষ্ণা,আজ তোমাকে একবার চোখে দেখতে পেলে,তুমি একটু ভাল ভাবে আমার সাথে কথা বললে আর কিছু চাই না।তোমার শরীরটাও না।অপর্ণা আমাকে বলছে তৃষ্ণার ফার্স্ট ক্লাসটা আটকাতে।কিন্তু সেটা করলে ও আমার সাথে কোনদিন যোগাযোগ রাখবে না।কেমন হবে আমার তৃষ্ণাবিহীন জীবন!মস্তিষ্ক আর হৃদপিন্ডে আমি তৃষ্ণার থেকে কোনোদিন আদৌ কি মুক্ত হতে পারব?এমনকি ওর থেকে দূরে গিয়েও?জানি না।সবাই জানে মস্তিষ্ক আর হৃদয় সবসময় বিপরীত পথে হাঁটে।আমি জানি তৃষ্ণার প্রতি আমার যা কিছু ব্যাখ্যাতীত তৈরী হচ্ছে সেটা আমার পক্ষে ভাল হবে না।এই নেশাটা কাটা দরকার।খুব দরকার।আর হৃদয় বলছে ওকে ধরে রাখতে।এই প্রথমবার খুব অসহায় লাগল আমার।শাওয়ারটা খুলে দিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম।
এই বাথরুম জায়গাটা আমার সমস্ত অনুভূতির সাক্ষী।মেঘ বুকের ভিতর জমুক বা আকাশে,সবসময় পরিষ্কার হতে একটা বৃষ্টিপাত দরকার।এতদিন ঐ বৃষ্টিটা সিমেন হয়ে ঝরেছে।আজ প্রথমবার চোখ থেকে নামল।তৃষ্ণা আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।আগে যেটুকু অভিমান বা রাগ করতে দেখেছি সেটাও আস্তে আস্তে অবশিষ্ট থাকছে না।তিন চারদিন ধরে আক্ষরিক অর্থে ওর পিছনে ঘুরছি,একবার মুখ তুলেও দেখছে না।এর আগে কয়েকবার ঘরে ডেকেছিলাম,আসেনি।এমনকি যেদিন বাকি ছাত্রছাত্রীরা আমার সাথে শেষবার দেখা করতে এল সেদিনও না।
আমিই একবার বাধ্য হয়ে ডেকে কথা বললাম,একটা দায়সারা গোছের উত্তর দিল।ওর ঘৃণা আমি সহ্য করতে পারি,কিন্তু এই নিষ্পৃহতা?
টেলিপ্যাথি বলে সত্যিই কি কিছু হয়?দেখ তৃষ্ণা,এই ভাদুরে কুত্তা চরিত্রহীন কাজল ভট্টাচার্য তোমার জন্য কাঁদছে।পাথরে মাথা ঠুকলেও পাথর ভাঙতে পারে,তুমি একটু ভাঙবে না!বেশীটা না হয় তোমার ইন্দ্রের জন্যই রাখলে,আমাকে একটুও কিছু দেবে না?

 


পর্ব ১১
তৃষ্ণার কথা


একদম কোণঠাসা না হয়ে গেলে কেউ মাওবাদী বা নকশালপন্থী রাজনীতিকে বেছে নেয় না।বা রক্তের অশ্রু না ঝরাতে হলে।যদিও আমি নিজের জীবনী লিখতে বসিনি।শুধু মাস্টার্সের সেই পর্বের ঘটনাগুলো।তাও ছোট করে স্মরণজিৎ বাবুকে স্মরণ করে কয়েকটা কথা লিখে ফেলা যায়।
যে লোকটা আমার শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করেছিল ক্লাস টেনে,সে ব্যর্থ হয়ে আমাকে চড় মেরেছিল।আমি তারপর তাকে বাড়ী থেকে বের করে দিই।লোকটা আমাকে ইংরাজী পড়াত।আমার মায়ের কলিগ ছিল।মা ওকে নিজের দাদার মত দেখতেন।ভাইফোঁটাও দিতেন।ঘটনাটায় মা খুব অফেন্ডেড হয়েছিলেন আমার উপর।আমার মা বাবা দুজনেই তার সাথে দীর্ঘদিন সুসম্পর্ক রেখেছেন।যদিও আমি তাকে আর বাড়ীতে আসতে অ্যালাউ করিনি।পরে লোকটা তাদের বাড়ীর ডোমেস্টিক হেল্পের সাথে বলপ্রয়োগ করার সময় ঘটনাটা চাউর হয়ে যায়।ও হ্যাঁ আমাদের কাজের মাসির সাথেও লোকটা আলাপ করার চেষ্টা করত।
এবং তখন আমার মা বাবা আমার অভিজ্ঞতাটাকে লঘু করে দেখা বন্ধ করেন।এটা নয় যে তাঁরা আগে আমাকে অবিশ্বাস করেছিলেন।তাঁদের বক্তব্য ছিল একদিনে দেবুদার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা যায় না।লোকে কি বলবে!
"লোকে কি বলবে!" আমাদের দেশে সবচেয়ে অপব্যবহৃত তিনটে শব্দ।কাজল ভট্টাচার্য, দেবপ্রসাদ ঘোষেরা এই তিনটে শব্দের আড়ালে সুন্দর বেরিয়ে যায়।কাজলবাবু পেন,বই বা ট্যাব নেবার অজুহাতে আমার আঙুল খামচানো ছাড়া কখনও আমাকে স্পর্শ করেননি।কিছু অশ্লীল দৃষ্টি,কিছু অস্বস্তিতে ফেলা কথা ও ব্যবহার-কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে না।খাতায় নম্বরের কিছু কারচুপিও না।কত প্রভাবশালী, কত দেবত্বপ্রাপ্ত, কত……অ্যাটোমিক এজেন্টের মূল্য কি তার সামনে!ফুলের মালা, ধূপের ধোঁয়া আর "লোকে কি বলবে" এর আড়ালে কত অপর ফোরক্লোজড হয়ে যায়।অভিধান এবং ইতিহাস বই থেকে বাদ পড়ে। অশোক,আলেকজান্ডার, আকবররা কত মৃতদেহের স্তূপ এবং ধর্ষিতার ছিন্নবস্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তরে ক্রমশ সিংহাসন উঁচুতর করেন।তারপরও ইতিহাস বইতে তাঁরা মহান সম্রাট হিসাবে খ্যাতি পান।হিটলারের দুর্নাম হয়েছে ইউরোপের মত জায়গায় প্রতিষ্ঠিত ইহুদী ও জেন্টাইলদের গায়ে হাত দেওয়ায়।চার্চিল কিন্তু ভারতের অজস্র মানুষের কঙ্কালসার মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়েও ঘৃণিত নন।সিপাহী বিদ্রোহের ভারত,বা ভিক্টোরিয়ার ভারত কিংবা আফ্রিকা,আমেরিকায় কত হলকস্ট ঘটে গেছে।আমরা জানি না।কারণ প্রায়োরিটি। তৃণের নিয়তিই পদদলিত হওয়া।আমরা এই বিষয়টাকে স্বাভাবিক করে নিয়েছি।তৃণমূলস্তরে কোনো ইতিহাস লেখা হয় না যে।


আমি অপর্ণা নই,আমার দাদা ইকোনোমিস্ট নয়।আমি খুব মডেস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছি।এই কথাগুলো অপর্ণা আমাকে ঠাট্টার ছলে প্রায়ই বলত।যেমন একদিন বলল আমি কোনোদিন নাকি আসল সিল্ক দেখিনি।ওদের আর্থিক অবস্হা খুবই ভাল,তাই ওর সিল্কের বিষয়ে জ্ঞান বেশী।তখন ও নিয়মিত দুটো সিল্কের ওড়না নিয়ে আসত।তারপরদিনই ওদের বাড়ীতে চুরি হয়ে যায়।টিভি,রেফ্রিজারেটর সহ জামাকাপড় পর্যন্ত।
অপর্ণার এই অন্তঃসারশূন্য আত্মম্ভরিতার পিছনে একটা অসহায়ত্ব দেখতে পেতাম।ওকে দেখে করুণা হত।প্রতিমুহূর্তে প্রাসঙ্গিক এবং অপ্রাসঙ্গিক ভাবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে চলেছে।এর পিছনে ছিল একটা গভীর হীনমন্যতা।আমাকে চারটে অপমানজনক কথা বললেও ও কাজল ভট্টাচার্যকে পুরোপুরি ধরে রাখতে পারছিল না।ওর বশংবদ হয়েও কাজলবাবু আমার প্রতি নির্লিপ্ত থাকতে পারছিলেন না।সেটাই ও সহ্য করতে পারছিল না।অথচ কাজলবাবু ওর সামনে প্রায় অনুগত সারমেয়র মত আচরণ করতেন।কিন্তু আসল জায়গায় সব বাঁধ ভেঙে পড়ছিল।সেটা ওদের দুজনের পক্ষেই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।কাজলবাবুর প্রতিও আমার সত্যিই করুণা হত।
কাজলবাবুকে আমি ডেভেলপমেন্টের মাওবাদী ধারণা নিয়ে একটা প্রশ্ন করেছিলাম ক্লাসে।তিনি যথারীতি ক্লাসে সেটা আলোচনা না করে একটু নার্ভাস ভাবে ওঁর ঘরে দেখা করতে বললেন।আমার বিষয়টা নিয়ে সঙ্গত কারণেই অস্বস্তি ছিল।মাসতিনেক আগে আমি বইমেলা থেকে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের কি বই কেনা যায় সে ব্যাপারে সাজেশন চাওয়ায় আমাকে ইমেলে কিছু বইয়ের কথা বলেছিলেন।পরদিন মারাত্মক প্রসন্ন ছিলেন আমার উপর।পরে বুঝেছিলাম ওটা সম্ভবত নিজে থেকে মেল করা ও ধন্যবাদ জানানোর কারণে।আমার বই কেনা হয়ে গেছিল।আর বইমেলায় যাবার কথা নেই শুনেও প্রায় জোর করে দুটো বইয়ের নাম লিখে দিলেন।তার একটা ছিল অ্যালেন বাদিউর ইন প্রেইজ অফ লাভ।বইটায় রাজনীতি ও বিপ্লবের সাথে প্রেমের সম্পর্কে আলোচনা আছে বলে কাজলবাবু আমাকে কিনিয়েছিলেন।হতে পারে প্রকাশকের থেকে ওঁর কিছু কমিশন প্রাপ্য ছিল। অথবা….সেই গরুর রচনা।ভদ্রলোক জানতেন আমাকে বিপ্লবের কথা বলে দরকার হলে দণ্ডকারণ্যেও পাঠিয়ে দেওয়া যায়।মানে আমাকে উত্তেজিত করতে ঐ একটা শব্দই যথেষ্ট।
-“লাভ মানে?হাউজহোল্ড লেবারের ব্যাপারে?”
-“নো ,নট অ্যাট অল।লাভ, নারীপুরুষের চিরন্তন প্রেম।“হাসিমুখে বলেছিলেন কাজলবাবু।
-“এটা তাহলে আমরা …মানে কি কাজে লাগবে?”
-“আরে বিপ্লব আর প্রেম নিয়ে এটা একটা অসাধারণ বিশ্লেষণ।পড়ে দেখোই না।“

বইটা আমি গত সপ্তাহে পড়ার সময় পেয়েছি।এবং যা দেখলাম বিষয়টা মোটেই রাজনীতির ব্যাপারে সীমাবদ্ধ নয়।ওটা একটা অংশ মাত্র।বইটা সবরকম বাধা অস্বীকার করা প্রেমের।মানে বিবাহবন্ধন, রাষ্ট্র,পরিবার সব প্রেমের কাছে তুচ্ছ।ঐ বাঁধভাঙা ঝোড়ো প্রেমকেই বিপ্লবের সাথে তুলনা করা হয়েছে।যদিও বইটা অপর্ণার জন্য বলেননি,তাও সে চরম উৎসাহে আমার আগেই ওটা কিনে ফেলেছিল।
বয়স্ক একজন অধ্যাপকের কাছ থেকে নানাবিধ অস্বস্তিকর ব্যবহার এবং তারপর এরকম একটা বইয়ের অযাচিত রেফারেন্স।আমার মনে হয় না কোনো ছাত্রীই এত কিছুর পর একান্তে তার মাস্টারমশাই এর সাথে দেখা করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করবে।তাই গেলাম না।পরদিন আবার প্রশ্নটা ইমেলে লিখে পাঠালাম যদি বলে দেন এই আশায়।সেখানেও রিপ্লাই করলেন ক্লাসের পর কেবিনে এসে দেখা করতে বলে।
একটুও পছন্দ হল না প্রস্তাবটা।রিপ্লাই করতেও ইচ্ছা করছিল না।যাক গে সেদিনের মিসবিহেভিয়ারের বদলা নেবার সুযোগ হিসাবে ব্যাপারটা মন্দ নয়।আমি আজকাল সচেতনভাবে ওকে উপেক্ষা করি। জানি আমার উপেক্ষাটাই ওকে সবচেয়ে বেশী কাঁটা ফোঁটায়।থার্ড সেমের খাতায় পল ইকো,মার্ক্স দুটো পেপারেই অপর্ণা আমার থেকে দু নম্বর করে বেশী পেয়েছে।অথচ সাত্যকী স্যরের পার্টে,মার্ক্সের খাতায় যে কুড়ি নম্বর ছিল,ওটা ও প্রায় ছেড়ে এসেছে।আর পল ইকোয় একটা চার নম্বরের প্রশ্ন ভুল,গান্ধিজীকে নিয়ে পাঁচ নম্বরের প্রশ্নটা বইটা না পড়ে শুধু নোটভিত্তিক লেখা।তাও কোন যাদুমন্ত্রবলে যথাক্রমে পঁয়ত্রিশ ও সাঁইত্রিশ। পেতেই পারে।কাজল বাবু সবসময় গর্ব করে বলেন, "আমার হাতে একদম নম্বর ওঠে না।" বাক্যটায় সম্ভবত কিছু কথা উহ্য থেকে যায়।
এভাবে ভাবা উচিত নয়।হতেই পারে ও আমাদের অনেকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী মেধাবী।যদিও ও গ্র্যাজুয়েশনে ফার্স্ট ক্লাসও পায়নি।এমনকি আগের দুটো সেমিস্টার মিলেও ফার্স্ট ক্লাস নেই।যাই হোক থার্ড সেম থেকে কাজলবাবুর সংস্পৃষ্ট হয়েই বোধহয় ওর মেধাটা বেড়ে গেছে।সত্য বা দ্বাপর – ত্রেতা যুগে তো এরকম আকছার হত।ও রেজাল্ট বেরোনোর পর থেকে পড়াশোনায় আমার থেকে কত ভাল,আর কেবিএইচ ওর প্রতি কতটা ইমপ্রেসড-এইদুটো কথা নিয়ম করে প্রতিদিন একবার করে জানিয়ে যাচ্ছে।


আমার ক্ষোভটা ঐ বিষয়টা নিয়ে পুরোটা ছিল না।ছিল কম্প্রিহেনসিভ নিয়ে।এম সি কিউ প্রশ্ন।জানা উত্তর। ভুল হবার কোনো জায়গা নেই।পঞ্চাশের মধ্যে ম্যাক্রো ইকোনোমিকসে কাজলবাবুর হাতে থাকা দশ নম্বর সম্ভবত নির্বিচারে কেটে নিয়েছিলেন।ওখানেই আমার টোটালটা মারাত্মকভাবে কমে যায়।অপর্ণা বেশ খুশী ছিল বিষয়টায়।যে ফার্স্ট ক্লাস ও আজ অব্দি তুলতে পারেনি,ওটা কাজলবাবুর 'ইনভিজিবল হ্যান্ড' এর দরাজ আশীর্বাদে বেশ উঠে যাচ্ছিল।ও এতটাই নিশ্চিন্ত ছিল নিজের রেজাল্টের ব্যাপারে, যে ফোর্থ সেমের মার্ক্স ও পল ইকোর বেশীর ভাগ ক্লাস করত না।আমার থেকে নোট নিয়ে নিত।মার্ক্সে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশী,ওখানে কাজলবাবু সুবিধা করতে পারবেন না।তাছাড়া ফোর্থ সেমে রাজর্ষি স্যরের হাতে কুড়ি নম্বর আছে।কিন্তু পল ইকোয় কে হায়েস্ট পাবে এটা পরীক্ষা হবারও অনেক আগে থেকে নির্ধারিত হয়ে আছে।গতবারের সাথে একটাই ফারাক যে এবার সব কিছু আমি বুঝতে পারছিলাম।কিন্তু অসহায় ভাবে দেখে যেতে হচ্ছিল। কিছু করার ছিল না।কাজলবাবুকে সরাসরি চার্জ করাও সম্ভব ছিল না।রিভিউ করতে দিলে নম্বর আরো কমিয়ে দিতে পারে।তাছাড়া ফোর্থ সেমে মার্ক্সিয়ান ইকোনমির পঞ্চাশের মধ্যে তিরিশ আর পলিটিকাল ইকোনমির পঞ্চাশের মধ্যে চল্লিশ ঐ লোকটার হাতে।কাজলবাবু নিয়ন্ত্রণ জিনিসটা নিজের হাতে রাখতে খুব পছন্দ করেন।শম্পা ম্যাডামকে মিথ্যে বলে এপ্রিলের শেষ দু সপ্তাহের আগে ক্লাস ছাড়েননি।আগের সেমে ইন্টারনালের দশ নম্বরের পাঁচ ওঁর হাতে ছিল।বিষ্ণু আর অপর্ণার সাথে কথা বলে উনি পুরো দশ নিজের হাতে রাখেন।বিষয়টা জানতাম না বলে আমি বা বিষ্ণু কেউই আপত্তি করিনি।
আমি লোকটাকে দেখা করব জানিয়ে রিপ্লাই দিলাম চারদিন বাদে।মঙ্গলবার ওঁর ক্লাস ছিল।সেদিন ক্লাসে আরেকবার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালেন ভদ্রলোক।আমার উপর ক্ষেপে গেছেন বুঝতে পারছিলাম।একসময় আমি ফ্যাসিজম নিয়ে একটা প্রশ্ন করায় বোঝাতে গিয়ে সেল্ফ আদারের সম্পর্কে চলে গেলেন।ফ্যাসিজমের ক্ষেত্রে এই আদারিং ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। তারপর সেখান থেকে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক ভাবে চলে গেলেন নারী পুরুষের সম্পর্কে।আমি তখন খাতায় নোট নিচ্ছিলাম।ওঁর দিকে দেখিনি।হঠাৎ বললেন,"নারীপুরুষের সম্পর্ক কি একরকম হয় সবসময়?নারীপুরুষের সম্পর্ক তো কতরকম হয়!"
আমি চমকে উঠে ওঁর দিকে তাকালাম।কথাগুলো আবার বেসুরো মনে হচ্ছিল।উনি অপ্রস্তুত মুখে চোখ নামিয়ে ক্লাসের অন্য প্রান্তে চলে গেলেন।আমি একটা কোণার দিকে,এসির ঠিক পাশটায় বসে ছিলাম।
সেদিন ক্লাসের পর দেখা করতে বলেছিলেন।আমি ওঁর কেবিনে যেতেই খুব ঠাণ্ডা গলায় একটা মাত্র শব্দ বললেন,"কালকে।"
-"আচ্ছা ঠিক আছে।" বলে আমি চলে এলাম।হয় মালটা প্রশ্নের উত্তর জানে না,নইলে আবার কলির কেষ্টপানা শুরু করেছে।শালা বুড়ো ভাম!পড়াশোনার সময় ন্যাকামো পোষায় না।ধূর শম্পা ম্যাডামের থেকেই ব্যাপারটা জানতে হবে।
লোকটা বুধবার দিন,মানে ঠিক পরের দিনই ক্লাসে এসে কোন কথা না বলে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল।আমি সেটা বুঝতে পারছিলাম।কিন্তু ওর দিকে তাকাচ্ছিলাম না।ওর নানারকম করা দেখে বেশ মজা লাগছিল।
কাজলবাবু একবার গলা খাঁকারি দিয়ে আমাকে বললেন,"এই যে…"
প্রসঙ্গত বলে রাখি কাজলবাবু কখনও আমাকে নাম ধরে ডাকেন না।সবসময় এটাই সম্বোধন করেন,"এই যে"।
আমি তাকালাম ওঁর দিকে।উনি খুব গম্ভীর গলায় বললেন,"আমার কিন্তু আজ একদম সময় হবে না।আই'ল বি বিজি।কখন কোথায় থাকব ঠিক নেই।ইউ হ্যাভ টু ফাইন্ড মি।"
আস্তে আস্তে ওঁর মুখের কঠিন ভাব সরে একটা নার্ভাসনেসের ছাপ পড়ছিল,"আজকে মানে ক্লাস আছে?আসতে পারবে না?"
লোকটার অবস্হা দেখে,পাকিস্তানের দিব্যি দিয়ে বলছি আমার মায়া হচ্ছিল।এদিকে নাকটা নীচু করা চলবে না,আর ওদিকে আমাকে একমুহূর্তের জন্য লোকটা মাথা থেকে সরাতে পারছে না।আমি শিওর কাল সারাদিন এবং আজ ঘুম থেকে উঠে এই কথাগুলো বলবে বলে মনে মনে রিহার্স করেছে।
আমি বললাম,"নাহ আজ হবে না।আজ এইচ ও ডির সাথে দেখা করার কথা আছে।"
(কোনও ব্যাপার না বুড়ো,নম্বর তো দেবে না।একটু ছটফট কর বরং।আমার কিচ্ছু নেই,কিন্তু তোমাকে আঘাত করার ক্ষমতা আছে।তোমার মানসিক শান্তি নষ্ট করার ক্ষমতা আছে।)
-"আজকে দেখা করতে হবে?ওহ্।" মলিন মুখে বললেন কাজলবাবু।গলার হতাশাটা চেয়েও লুকোতে পারলেন না।
-"নেক্স্ট উইক আপনার সাথে কথা বলে নেব।কেমন?আমার আরো কয়েকটা কোয়েশ্চেনস আছে,পাঠিয়ে দেব আপনাকে।"
-"ঠিক আছে।"বলে মুখে আবার গাম্ভীর্য ফিরিয়ে এনে পড়াতে শুরু করলেন কাজল বাবু।
হুম বদমাশ বুড়ো, অপেক্ষা কর।দেখ জ্বলুনির ৫০% কিরকম হয়।আমারও মার্কশিট দেখে এইরকম রাগ হয়েছিল।এই ফোর্থ সেমটা জ্বর,উঠতে পারছি না এরকম পিঠেব্যথা,আক্কেল দাঁতের বীভৎস ব্যথা-ইত্যাদি ইত্যাদি হলেও আমি প্যারাসিটামল খেয়ে ক্লাস করেছি।আর একজন কখনও চুরি হওয়া,কখনও ঘুম থেকে উঠতে না পারা ইত্যাদি খঞ্জ অজুহাতে ক্লাস না করেও হায়েস্ট পেয়ে যাবে।আর আমি ব্যাঙের মত ড্যাবডেবে চোখে সেটা ব্রহ্মজ্ঞানীর মত দেখে যাব।একটু যন্ত্রণা যে তোমারও পাওনা হয় প্রিয় পার্ভার্ট জেঠু।তুমি আমাকে নম্বর দেবে না।আমি তোমাকে দেখা দেব না।উফ নিজেকে কিরকম ছিন্নমস্তা ছিন্নমস্তা লাগছে।লোকটা আমার জন্য সামনের সপ্তাহে অপেক্ষা করবে আর আমি যাব না।কিরকম একটা হাড়মুড়মুড়ে পৈশাচিক উল্লাস হচ্ছে ভাবলেই।

 

 

পর্ব ১২
কাজল ভট্টাচার্যের কথা


সেদিন ফোর্থ সেমের কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষা ছিল।ঐদিন আমার সাথে মার্ক্সিয়ান ইকোনোমিকসের ছেলেমেয়েদের শেষ বারের মত দেখা করতে আসার কথা ছিল।সঙ্গত কারণেই আমি অডিটোরিয়ামে গার্ড নিইনি।কারণ ওখানে তুমি ছিলে।আমি ডাকা সত্ত্বেও সেই মাওবাদী প্রশ্নটা নিয়ে তুমি আমার কাছে আসোনি।এমনকি গ্রুপ ফোটো তোলার দিনেও ক্লাস করে ফোটো সেশনের ঠিক আগের মুহূর্তে কেটে পড়লে।কেন?অনুপস্হিতি দিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলে?নাকি আমার সাথে এক ফ্রেমে থাকতেও ঘেন্না হচ্ছিল তোমার?কারণটা আমার পক্ষে টেলিপ্যাথিতে বোঝা সম্ভব নয়।তোমায় কোনোদিনই পড়তে পারিনি।একেকসময় এই ভ্রমও হয়েছে তোমার চোখ দেখে যে তুমি আমাকে ভালবাস।যাই হোক নিজের উপর আস্হাটা প্রয়োজনাতিরিক্ত বেশী থাকার কারণে আমার প্রথমটাই মনে হয়েছিল।মানে তুমি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাও।এটা ভেবে সেদিন দারুণ একটা কৌতুক অনুভব করেছিলাম মনে মনে।এরপর ঠিক বৃহস্পতিবার, শম্পাদির ক্লাসের পরে তুমি নিশ্চয়ই আমার কেবিনে হাজির হবে।এরকম প্রত্যাশা যদিও ভিত্তিহীন,তাও মানুষ তো আশাকে সম্বল করেই সার্ভাইভ করে।
আমার ঐ তুরীয়ানন্দে ভাঁটা পড়ছিল একটু একটু করে।তুমি আসনি।এমনকি পরে হয়ত প্রশ্নটা তুমি মেল করতে পার এরকম একটা আশা ছিল।সেখানেও নিরাশ হতে হল।পলিটিকাল ইকোনমির পরীক্ষার দিন অপর্ণাকে চটাবার রিস্ক নিয়েও ভীরু প্রেমিকের মত দাঁড়িয়েছিলাম তোমার সামনে।আমার হৃদস্পন্দন সেদিন কৈশোরের প্রথম পূর্বরাগের সামনে দাঁড়ানোর মত অস্বাভাবিক দ্রুত ছিল।তুমি আমার প্রশ্নের একটা দায়সারা উত্তর দিয়ে খাতায় মুখ গুঁজলে।সেদিন পরীক্ষার পর কেবিনে তোমার অপেক্ষা করছিলাম। জানতাম তোমাকে আসতেই হবে,কারণ এখানে হৃদ্যতার টানের প্রশ্ন নেই,টার্ম পেপার জমা দিতে হত।তোমার একটা শাস্তি পাওনা ছিল।আমাকে নিরাশ করার জন্য।শাস্তিটা হল আমার নীরবতা।তুমি হিয়ার সাথে ঢুকলে,কিন্তু শাস্তিটা দেবার আমাকে কোনো সুযোগ দিলে না।এই ধরনের শাস্তির মূল্য বুঝতে গেলে একটা রক্ত মাংসের তৈরী হৃদপিণ্ড থাকতে হয়।সেটা কি তোমার ছিল তৃষ্ণা?কোনদিন?আমাকে একটা নম্বর দেবার যন্ত্র ছাড়া কোনকিছু ভেবেছ কখনও?
হিয়া আমাকে বারবার ডাকা সত্ত্বেও আমি উত্তর দিচ্ছিলাম না।ঘাড় নীচু করে বসে রইলাম।শেষে ওর হাত থেকে টার্ম পেপারের ফাইলটা নিয়ে টেবিলে রাখলাম।ভেবেছিলাম তুমি আগের মত প্রত্যাশা করবে তোমার থেকেও ফাইলটা নিজের হাতে নেব।সেখানেই তোমাকে নিরাশ করব ভেবেছিলাম।কিন্তু তুমি বিষয়টাকে আমলই দিলে না।সব যেন খুব স্বাভাবিক এভাবে টেবিলে ফাইলটা নামিয়ে রেখে চলে গেলে।এমনকি আমার সাথে ফর্মালিটি রক্ষার্থেও একটা কথা খরচ করলে না।
পরদিন আবার গিয়েছিলাম তোমাদের পরীক্ষার হলে।কারও কোনও প্রশ্ন নিয়ে অসুবিধা আছে কিনা জিজ্ঞেস করতে।যেহেতু আগে দেখেছি এই সাইলেন্ট ট্রিটমেন্টটা তোমার উপর ফলপ্রসূ হয়,তাই এদিনও প্রত্যাশা ছিল তুমি আমাকে যে কোনো অজুহাতে ডেকে কিছু একটা ঠিক বলবে।তুমি আমার দিকে ফিরেও তাকালে না।আমি নিজেই প্রথমটা এগিয়েছিলাম কিছু একটা বলার অজুহাতে।পরে সামলে নিলাম।আরও ষোলো জন মার্ক্সিয়ান ইকোনোমিকসের ছাত্রছাত্রী রয়েছে।তারা কি ভাববে?আমার এই অতিরিক্ত আগ্রহ কি দৃষ্টিকটূ লাগবে না?তার চেয়েও বড় ভয় ছিল তোমার কাছে যদি ধরা পড়ে যাই!
কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষার দিন কিশোরী মেয়ের অনিশ্চয়তা নিয়ে আমার কেবিনে অপেক্ষা করছিলাম।মার্ক্সিয়ান ইকোনোমিকসের ছাত্রছাত্রীরা আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল।তুমি আসনি।এইদিন কিন্তু ফটো সেশনের দিনের মত আনন্দিত হতে পারিনি।উদ্বেগ বাড়ছিল।আমাদের পথ আলাদা হবার দিন এগিয়ে আসছে।যদি আর কোনোদিনও তোমাকে দেখার সুযোগ না পাই।একবার,মাত্র একবার।শেষবারের মত!
আমি আমার মধ্যের সমস্ত মিষ্টত্ব ঢেলে ওদের বিদায় জানিয়েছিলাম।তুমি নিশ্চয়ই খোঁজ নেবে এদিনের ব্যাপারে।তোমার কাছে এই বার্তাটা পৌঁছে দেওয়া খুব দরকার ছিল যে তোমার অনুপস্হিতি আমার মধ্যে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি।আমাকে আঘাত করার ক্ষমতা তোমার নেই।
গ্রুপ প্রোজেক্টের মিটিং এর জন্য এর হপ্তাখানেক পর তোমাদের গ্রুপটাকে দেখেছিলাম।সব্যসাচীবাবুর কেবিনে।সব্যসাচীবাবুর পাশের চেয়ার,একটা কালো পোশাক,লালচে পশমি খোলা চুল।চেয়ারের হাতলে উজ্জ্বল গমরঙা মসৃণ হাতের আভাস।মুখ দেখা যাচ্ছিল না।তাও আমার চিনতে দেরী হয়নি।ঐ চেহারার অণুপরমাণু আমার রক্তবিন্দুর চেয়েও বেশী চেনা।একবার এদিকে তাকাবে না তৃষ্ণা?
ওহ ভগবান আর কোনোদিন তোমায় দেখতে পাব না আমি।দুদিন আমার সামনে, হয়ত বাধ্য হয়েই সেই অমোঘ স্তোত্রটা উচ্চারণ করেছিলে তুমি।এত সহজে ভুলে গেলে সব?"যদিদং হৃদয়ং তব,ততস্তু হৃদয়ং মম।যদিদং হৃদয়ং মম,ততস্তু হৃদয়ং তব।"অস্বস্তি আর লজ্জায় গোলাপি হওয়া মুখে আমাকে বাংলা অনুবাদটাও বলতে বাধ্য হয়েছিলে,কম্পিত চোখের পাতা তুলে,"যা তোমার হৃদয়,তাই আমার হৃদয়।যা আমার হৃদয় তাই তোমার হৃদয়।"জান তৃষ্ণা,আজ পর্যন্ত অজস্র মেয়ে ও মহিলার বিছানা গরম করলেও কোনো নারী আমার জন্য এই মন্ত্রটা উচ্চারণ করেনি।এমনকি শর্মিষ্ঠাও না।যেহেতু আমাকে লোকসমাজে নাস্তিক সাজতে হয় তাই আমাদের বিয়েটা মন্ত্র পড়ে হয়নি।তোমার জীবনেও তো কোনো পুরুষের সাথে কখনও এই মন্ত্রটা বলার সুযোগ হয়নি।আমি জানি তুমি শুয়ে বেড়ানোর মেয়ে নও।ঐ উচ্চারিত মন্ত্রের লয়ালটি থেকেই না হয় একবার ফিরে তাকাও।নইলে আমরা তো সমান্তরাল রেখা হয়েই আছি।ঘৃণা বা বড়জোর নিষ্পৃহতা ছাড়া কিচ্ছু থাকার ছিল না আমাদের মধ্যে।শুধু একবার,শেষবারের মত তোমার মুখটা দেখতে চাই।অপর্ণা আমাকে প্রতিদিন রিপোর্ট করে তুমি একজন মানুষ হিসাবেও কতটা নিকৃষ্ট। ওকে একটাও নোট দিচ্ছ না।আমার ব্যাপারে অসংখ্য অশ্রদ্ধাপূর্ণ মন্তব্য কর অপর্ণার কাছে।আমি জানি তোমার মত নিম্নস্তরের মানুষের পক্ষে এটা সম্ভব।এর উত্তরও তোমায় দেব।অপর্ণা মিথ্যে বলতে পারে,তবে কথাগুলো সত্যি না হবারও কোনো কারণ নেই।আগের দিন তুমি ইচ্ছাকৃত ভাবে পা এগিয়ে দিয়ে আমাকে ফেলে দেবার চেষ্টা করেছিলে।অনেকদিন ধরে অধ্যাপনা করছি,মাথার চুলগুলো রোদে পাকেনি,এগুলো বুঝতে পারি।তাও ঘৃণা ঘৃণার জায়গায়,একটা কোথাও তো অন্তত ঐ স্তোত্রটা তোমায় বেঁধে রেখেছে,ওটার নামেই একবার ফিরে তাকাও।শেষ পর্যন্ত আমি দরজায় তোমার দৃষ্টি টানার জন্য খুব জোর দড়াম করে লাথি মারলাম তাও তুমি তাকালে না।যেন জেদ করেই সামনে ফিরে বসে রইলে।অথচ শব্দটা এত জোরে হয়েছিল যে সব্যসাচীবাবু ও তোমার গ্রুপের অন্য ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত ফিরে তাকিয়েছিল আমার দিকে।আর কত হাস্যস্পদ করব নিজেকে তোমার জন্য?তোমার মত একটা হৃদয়হীন অনুভূতিবিহীন নার্সিসিস্ট মরীচিকার জন্য?
আমি ক্রমশই ডেসপ্যারেট হয়ে উঠছিলাম।প্রেজেন্টেশনের দিন তোমাদের ঠিক পরের স্লটটা বাছলাম।ঐ একটাই সুযোগ অবশিষ্ট ছিল।তারপর হাজার শতক কালাহারি পার হয়ে মরুদ্যান,তোমাকে দেখতে পেলাম।তোমার শরীরের রঙের সাথে প্রায় মিশে যাওয়া মাখন মাখন একটা সালোয়ার কামিজ,আর নববধূর মত লাল তোমার ওড়না।তোমাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।নরম শরীর,চট করে ক্লান্তির ছাপ পড়ে যায়।আমি তোমার ঐ মুখটা ঘরভর্তি লোকের মধ্যেও কল্পনা করছিলাম রতিক্লান্ত হয়ে আমার বুকে পড়ে আছে।ওহ ভগবান এসব কি ভাবছি,আমি তোমার প্রেমে পড়তে চাই না।
সেদিন যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছিলে না।সবার চোখ যখন প্রোজেক্টরের দিকে তখন আমি তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ঘরের পিছনে,যেখানে ছাত্রছাত্রী বা কোলিগরা আমাকে দেখলে চরম অপ্রস্তুত হতে হবে জেনেও আমি এত বড় রিস্কটা নিয়েছিলাম।তুমি যাতে একবার তাকাও তার জন্য দেওয়ালে টিকটিকির মত শরীর লাগিয়ে হাত পা নাড়াচ্ছিলাম।তুমি আমার দিকে তাকালে না।তোমার বেরিয়ে যাবার সময় তোমার পথে একবার চলে এলাম,তুমি থেমে গেলেও আমাকে দেখলে না।অগত্যা আমাকে নিজের জায়গায় আবার ফিরে যেতে হল।তুমি নিষ্পৃহভাবে চলে গেলে।
আমি কিন্তু হাল ছাড়ার লোক নই।পরেরদিন আমার লেখা একটা আর্টিকেল মেল করেছিলাম পল ইকোর মেল আইডিতে।জানতাম ওটা তুমি অপারেট কর।যদিও সাবধানতা রক্ষার্থে ঐ মেলটা আরও অনেকগুলো অ্যাড্রেসে পাঠিয়েছিলাম।আমাকে তোমার ক্ষেত্রে প্রতিমুহূর্তে সাবধানতা অবলম্বন করতে হত।যাতে তুমি ছাড়া কেউ না বোঝে আমি কত বড় শুওরের বাচ্চা।যাতে তুমি কোনদিন কাউকে কনভিন্স করতে সক্ষম না হও যে ডঃ কাজল ভট্টাচার্য প্রকৃতপক্ষেই একটা শুওরের বাচ্চা।যাই হোক যথারীতি ঐ মেলটারও কোনো উত্তর পেলাম না।তোমার জন্য খুব ভয়ঙ্কর একটা শাস্তির পরিকল্পনা করছিলাম।স্বঘোষিত মার্ক্সবাদী আমি,প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছিলাম তোমার তরফ থেকে একটা কিছু প্রতিক্রিয়ার।
এরকম একটা দিনেই তোমার সেই মেলটা আমার কাছে এসেছিল।এস ও পি দেখে দেবার অনুরোধ করে।আমার আহত পৌরুষের মলম হয়ে।আমার কাছে ওটাই তোমার সমর্পণ ছিল।নাহ আর হয়ত তোমাকে প্রয়োজন হবে না।কেন অত বিনীত ভাষায় মেলটা লিখেছিলে তৃষ্ণা?আমি বিহ্বল হয়ে গেলেও আগের মত অসংযমের পরিচয় দিইনি।তোমার তরফে কতটা তৃষ্ণা আছে পরীক্ষা করছিলাম।মেলটার কোনো উত্তর দিইনি।ঘণ্টাখানেক বাদে আবার তোমার একটা মেল এসেছিল যাতে তুমি লিখেছিলে তুমি শম্পাদির আন্ডারে রিসার্চ করতে চাও,তাই এম ফিলের নিয়মের ব্যাপারটা জানতে চেয়ে।এম ফিল বানানটা ভুল ছিল,দুটো এল।টাইপের ভুল অথবা তোমার অজ্ঞতা।আমি সারারাত সেদিন ঘুমোতে পারিনি।এতদিনে একটা সুযোগ পেয়েছি।তোমার এস ও পি আমি দেখে দেব না।আমি এমন কোনো সুবিধা তোমায় দেব না যা অপর্ণা পাচ্ছে না।অপর্ণা অবশ্য আমাকে এস ও পি নিয়ে কোনো অনুরোধই করেনি,তাও তোমার একটা কথা জেনে রাখা দরকার যে অপর্ণা আমার প্রায়োরিটি তালিকায় সবসময় তোমার আগে আসবে।তোমার অত মধুমিশ্রিত শব্দচয়নের কারণটা অনুমান করতে পারছিলাম।পরীক্ষার খাতাটা যাতে আগের সেমের মত নির্মম হাতে না দেখি।আর এস ও পি টাও দেখিয়ে নেওয়া যাবে।আমি তোমার চোখে তো একজন পরীক্ষক আর শিক্ষকের বেশী কিছুই নই।তাই যে কর্তব্যটা তুমি বিনয়ের অবতার সেজে আশা করছ সেটাও আমি পালন করব না।তবে কি জান তো তৃষ্ণা, তুমি একবার সবটুকু সমর্পণ করে ডাকলে হয়ত সব ভাসিয়ে দিয়ে চলে…… ধূর কিসব অকিঞ্চিৎকর চিন্তা করছি।তোমাকে একটা লেবুর মত নিংড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত।
আমি যেহেতু তোমাকে আরও অনেক বেশী হেনস্হা করার সুযোগ হাতে রাখতে রাখতে চাই,তাই মেলটার উত্তর দেওয়াই শ্রেয় মনে করলাম।সত্যি বলতে তর সইছিল না।খুব সকাল সকাল উঠেই তোমার মেলটার উত্তর দিলাম।
আমিও তোমার মত আবেগ বোমা ফাটালাম যাতে ভবিষ্যতেও তুমি ধ্বংস হতে আমার কাছে ফেরো।যদিও তোমার এস ও পিটা শহরের বাইরে থাকার খঞ্জ অজুহাতে দেখে দিলাম না।বললাম বাড়ী ফিরলে এম ফিলের নিয়মটা তোমায় জানাতে পারব, যাতে তুমি পরে আবার আমাকে মেল কর।
"প্রিয় তৃষ্ণা"
হ্যাঁ ইচ্ছাকৃত ভাবে এই সম্বোধনটাই লিখেছিলাম।একমাত্র বিশেষ উদ্দেশ্য না থাকলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য আমি 'প্রিয়' শব্দটা ব্যবহার করি না।কিন্তু ঈশ্বর জানেন তোমায় কত শতাব্দী ধরে এটা সম্বোধন করতে চেয়েছি।প্রিয়,প্রিয়া,প্রিয়তমা।

 

 

পর্ব ১৩
তৃষ্ণার কথা


অপর্ণার বাড়ী ছিল দক্ষিণ কলকাতায়।ফোর্থ সেমিস্টারটা অপর্ণা পরিশ্রম করে এত দূরে ক্লাস করতে আসাটাই প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল।কি দরকার!যখন জানাই আছে পল ইকোয় হায়েস্ট নম্বরটা বাঁধা।সময়মত কোয়েশ্চেন পেপারও হাতে এসে যাবে।আর আমি, সব জেনেও ওকে প্রত্যেক ক্লাসের নোট যোগান দিয়ে গেছি।সন্দেহ নেই আমার এই বোকামিগুলো দীর্ঘদিন কুত্তাঞ্জন আর অপর্ণাকে হাসির রসদ যুগিয়েছে।হয়ত আমার নির্বুদ্ধিতা আজ ওদের কাছে একটা প্রবাদে পরিণত।মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে কুত্তাঞ্জনকে একটা ইমেল পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করি,"আচ্ছা মাস্টারমশাই, আপনার নিজের মেয়েটা যদি কারোর হাস্যরসের উপাদান হয়?এইভাবে?"
প্রশ্নটা অর্থহীন।নিজের মেয়ে আর অন্যের মেয়ে এক নয়।কুত্তাঞ্জন স্ট্যালিনকে মার্ক্সবাদী বলে স্বীকার করত না।গুলাগ,হলোডোমোর ইত্যাদি রটনা বা ঘটনা সত্ত্বেও ঐ লোকটাকে আমি শ্রদ্ধা করি।স্ট্যালিন নিজের ছেলেকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে মরার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন।সুযোগ পেয়েও একজন যুদ্ধবন্দীর বিনিময়ে তার মুক্তিপণ মেটাননি।তাঁর যুক্তি ছিল "আমার দেশের আর যে হাজার হাজার ছেলে যুদ্ধবন্দী হয়ে রয়েছে তারাও তো আমারই ছেলে।নিজেরটাকে ছাড়িয়ে নিলে তাদের মায়ের কাছে কি কৈফিয়ত দেব?"
আর কে না জানে ধ্বনিকে প্রতিধ্বনি ব্যঙ্গ করে!
একটা জায়গায় ওদের কাছে অ্যাডাপটিভ ইনফর্মেশন ছিল।মানে ইনফর্মেশনটা পুরোপুরি আপডেটেড ছিল না।কি ঘটছে সেটা আমি জানতাম,তাও অপর্ণাকে নোট দিতে কোনদিন আপত্তি করিনি।শেষের দিকে ও এতটাই গা ছাড়া হয়ে গেছিল যে কয়েকটা ক্লাসের ডেট পর্যন্ত মনে ছিল না।কুত্তাঞ্জন ওর জন্য প্রতিটা ক্লাসের ডেট আমার আর বিষ্ণুর কাছে চেয়েছিল।অবশ্য তখন জানতাম না অপর্ণার জন্য চাইছে।শুধু কুত্তাঞ্জনকে ডিফাই করব বলেই দিইনি।পরীক্ষার মাত্র কয়েকদিন আগে বিষ্ণু কুত্তাঞ্জনকে ডেটগুলো পাঠায়।তার পরপরই অপর্ণা আমার কাছে ডেটগুলো পাঠিয়ে সেই দিনের নোট চায়।তখন আর ওর জন্য খুঁজে দেখার মত ধৈর্য অবশিষ্ট ছিল না।এতদিনেও কি আমি অপর্ণার মন জয় করতে পেরেছি?এত কিছু করেও?অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে আমি সব জেনেও কেন ওকে নোটের যোগান দিচ্ছিলাম?
দিচ্ছিলাম আদর্শগত কারণে।দুটো মেয়ের মধ্যে বিভেদ তৈরী করার যে চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিক নোংরামিটা কাজল ভট্টাচার্য করছিল তার বিরুদ্ধে এটা আমার বিপ্লব ছিল।যদি অপর্ণা নিজের ভুল বোঝে।যদি বোঝে আমি ওর প্রতিদ্বন্দ্বী নই,কমরেড।

কিন্তু সেটা হয়নি।তবে আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি।কমরেডশিপ আজকের আত্মরতির যুগে মূল্যহীন।বিপ্লবের মূল্যবোধ সত্তরের দশকের সাথে ইতিহাসে প্রবেশ করেছে।শুধু আমি,আজও সত্তরের দশক আঁকড়ে অ্যানা ফ্র্যাঙ্কের বিশ্বাস ধরে বসে আছি।যে বিশ্বাস বলে মানুষ আসলে খারাপ নয়।অপর্ণা আমাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া কিছুই মনে করেনি।আমার আর্থিক অবস্হা থেকে শুরু করে যে কোনো বিষয়ে আমাকে প্রতি পদক্ষেপে হেয় করেছে।সেটাকেও আমি সহানুভূতির চোখে দেখতাম।কারণ জানতাম ঐ মানুষের চেহারার দৈত্যটাকে ও ভালবাসে।আমি এখানে নিমিত্তমাত্র, যে বিষয়টা ওকে দগ্ধ করত তা হল ডঃ ভট্টাচার্যের আমার প্রতি অযাচিত মনোযোগ।

 

নার্সিসিস্টদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আপনি এদের সাথে যে সম্পর্কেই যুক্ত থাকুন,এরা আপনার মধ্যে নার্সিসিস্টিক সাপ্লাই খুঁজবে।মানে এদের কোনোকিছু বলেই কোনো লাভ নেই।এমনকি তাদের পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার সম্পর্কে সচেতন করে দিয়েও না।রেকর্ডিং বা নকল করায় এদের দক্ষতা নব্বইয়ের দশকের দামী টেপ রেকর্ডারের মত।কাজলবাবু মুখে মাঝে মাঝেই বলতেন বটে তাঁর ভুলে যাওয়ার একটা প্রবণতা আছে,কিন্তু আমি নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি আমি কবে কি বলেছি এই কথাগুলোও ভদ্রলোক(!) পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মাথায় রাখতেন।তারপর কবে কে ক্লাসে এল বা এল না -এই বিষয়গুলোও।এই বিষয়গুলোয় নিষ্পৃহতা দেখানো ওঁর একটা অভিনয় ছিল।অনেকেই (বিশেষত ফেমিনিন জেন্ডারের কেউ) নিজের প্রতি ওঁর মনোযোগ দেখে খুশী হয়ে উঠতে পারে।কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে ওঁর নিষ্পৃহতা বা মনোযোগ,শীতলতা বা উষ্ণতা – সবটাই অভিনয়।নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত মানুষরা প্রতি মুহূর্তে নিজের প্রত্যেকটা কথা,অভিব্যক্তি,মুখের ভাব,দেহের ভাষা- সব কিছু রিহার্স করে এবং সেটা পারফেকশনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সচেতন থাকে।এদের মানসিক গঠন এমন হয় যে এরা কোনরকম ইমোশন উপলব্ধি করতে অক্ষম হয়।সেটা এদের মানসিক সুস্হতার পক্ষেও খারাপ কারণ আমরা মানুষরা পৃথিবীতে অন্তত একটা জায়গায় নিজেকে মানসিক ভাবে উন্মুক্ত করতে চাই,আশ্রয় খুঁজি।সেই আশ্রয়স্থল বাবা মা,স্পাউস, সন্তান,বন্ধু,প্রেমিক-প্রেমিকা-যে কেউ হতে পারে।এরা নিজেদের চারিত্রিক গঠনের কারণেই ইমোশনালি ডিপ্রাইভড থেকে যায়।কারণ নিজেকে উন্মুক্ত করা বা মানসিক বন্ধন তৈরী করা এদের চোখে ঘৃণিত দুর্বলতার সামিল।ফলে এরা ফিলোফোবিক হয়।এরা পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই শান্তি খুঁজে পায় না।কারণ প্রথমত, এরা নিজেকে নিয়ে তৃপ্ত হতে পারে না,প্রতি মুহূর্তে সামনের লোকটার থেকে অ্যাপ্রুভালের প্রয়োজন হয়।সেটা সবসময় নাও পাওয়া যেতে পারে।দ্বিতীয়ত, এরা আবেগের অভিনয় জানলেও আবেগকে উপলব্ধি করতে পারে না।এরা এদের নার্সিসিস্টিক সাপ্লাই এর উৎসকে খুব মনোযোগ সহকারে স্টাডি করে।ঠিক কোন আচরণ,কোন অভিব্যক্তি বা কোন শব্দটা ব্যবহার করলে সামনের লোকটার থেকে এমপ্যাথিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে,তাকে প্রভাবিত করা সম্ভব হবে,সেটা বুঝে নিয়ে এরা সেই মত আচরণ করে(যেমন,আমার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি,আমি বাংলা শব্দচয়ন ইংরাজীর তুলনায় বেশী পছন্দ করতাম বা নকশাল আন্দোলনের প্রতি দুর্বলতা ছিল লক্ষ করে উনি ক্লাসে মাঝে মাঝে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে নকশালবাড়ী বা মাও এর প্রসঙ্গ টেনে আনতেন বা বাংলায় তেমন স্বচ্ছন্দ না হয়েও আমার সাথে কথা বলার সময় বেশী বেশী বাংলা শব্দ ব্যবহার করতেন)।এটা খারাপ, ভাল দুরকম আচরণের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
একটা কথা ভাবলে খারাপ লাগে, আমি নিজেও শেষ মুহূর্তে নির্লিপ্ত থাকতে পারিনি।রেজাল্ট আউট হবার পর সারা সেমিস্টার ক্লাস না করেও যখন দেখি অপর্ণা পঞ্চাশে ৪১ পেয়েছে,আর আমার নম্বর অস্বাভাবিক ভাবে কমে ৩৯,আমি একটা পুরোনো অভিজ্ঞতার শোধ তুলতে চেয়েছিলাম।থার্ড সেমিস্টারের পরে আমাকে নম্বর নিয়ে বিদ্রূপ করার ঘটনাটার।আমি ওকে বলেছিলাম আমি ৪৩ পেয়েছি।ভীষণ শকড হয়েছিল।পরে ওর হাতে নির্ঘাৎ কাজলবাবু দু চারটে থাবড়া খেয়ে গেছে।তারপর হয়ত ধীরে ধীরে ওকে কনভিন্স করতে সক্ষম হয়েছে যে তৃষ্ণা সত্যি বলেনি।

 

 

পর্ব ১৪
কাজল ভট্টাচার্যের কথা

"কোনো প্রাপ্তিই পূর্ণ প্রাপ্তি নয়
কোনো প্রাপ্তিই দেয় না পূর্ণ তৃপ্তি
সব প্রাপ্তি ও তৃপ্তি লালন করে
গোপনে গহীনে তৃষ্ণা তৃষ্ণা তৃষ্ণা।
আমার তো ছিলো কিছু না কিছু যে প্রাপ্য
আমার তো ছিলো কাম্য স্বল্প তৃপ্তি
অথচ এ পোড়া কপালের ক্যানভাসে
আজন্ম শুধু শুন্য শুন্য শুন্য।
তবে বেঁচে আছি একা নিদারুণ সুখে
অনাবিষ্কৃত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বুকে
অবর্ণনীয় শুশ্রূষাহীন কষ্টে
যায় যায় দিন ক্লান্ত ক্লান্ত ক্লান্ত।"


ইদানীং আমার কেমন যেন মনে হয় আমরা নরকের পঙ্কিলতম স্তরে ডুবে থাকা দুটো প্রেতাত্মা।আমি আর অপর্ণা।হাবিয়া দোজখের সম্রাজ্ঞী অপর্ণা।আর আমি ওর পদানত দাসানুদাস। এই দুনিয়ায় তৃষ্ণা নামের কোনো দেবীর অস্তিত্ব নেই। শুধু ধূমকেতুর মত আমার স্মৃতিতে বা স্বপ্নে ওর একটা গোলাপি কুয়াশা হয়ে জেগে ওঠা ছাড়া।একটা প্রশ্ন এত মাস পরেও আমাকে হন্ট করে।আমি কি ওকে কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও ভালবেসেছিলাম?
উত্তরটা হচ্ছে 'না'।উত্তরটা যে নঞর্থক,সেটা প্রমাণ করার দায় আমার শুধু অপর্ণার কাছে নয়,নিজের কাছেও ছিল।আমি তৃষ্ণাকে ভালবাসিনা,কোনদিন বাসতামও না।ভালবাসলে কেউ কারোর ক্ষতি করতে পারে না।আমি ওর ক্ষতি করেছি।ওদের থার্ড সেমে কম্প্রিহেনসিভের পেপারে আমার হাতে থাকা ম্যাক্রোইকোনোমিকসের পার্টে পুরো দশ নম্বর কেটে নিয়েছিলাম।মার্ক্স আর পলিটিকাল ইকোনোমির খাতাও যতটা সম্ভব চেপে দেখেছি।কিন্তু থার্ড সেমের সময়ই আমি বুঝেছিলাম অপর্ণার বিদ্যাবুদ্ধির যা দৌড়,শম্পাদির হাতে কুড়ি নম্বরও ছাড়লে ও তাতে শূন্য পাবে।গ্র্যাজুয়েশনে ইকোনোমিকসের মত সাবজেক্টে ফিফটি ফাইভ পার্সেন্ট পাওয়া মেয়েকে আর যাই হোক পলিটিকাল ইকোনমিতে এইট্টি পার্সেন্ট পাওয়ানো যায় না।তাই শম্পাদিকে মিথ্যে বলে আমি এপ্রিলের শেষের আগে ক্লাস ছাড়িনি।
ফোর্থ সেমে কি মার্ক্স,কি পলিটিকাল ইকোনমি-তৃষ্ণার খাতায় একটা দাগ দেবারও জায়গা ছিল না।তৃষ্ণা দারুণ কিছু ছাত্রী নয়,তাও একটা ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া মেয়ে।তবে ও মেনস্ট্রিম ইকোনোমিকসে খুব ভাল না হলেও মার্ক্সবাদে ওর জ্ঞানের গভীরতা আছে।ওর পড়াশোনার অভ্যাস আছে।এবং ও এমন অনেক বিষয় বিশদে জানে যা সবসময় আমারও জানা থাকে না।
রাজর্ষির হাতে মার্ক্সের পেপারে কুড়ি নম্বর ছিল।আমি আগেই জানতাম অপর্ণা ওখানটা ঝোলাবে।আমার পার্টে থাকা তিরিশ,পেপারে কুড়ি আর ইন্টারনালে দশ।খাতা ঠিকমত চেক না করেই ওকে প্রায় ফুলমার্ক্স বসিয়ে দিলাম।তৃষ্ণার খাতায় যতটা সম্ভব চাপতে হল।বেশ অন্যায্য ভাবে কিছু জায়গা কাটাকুটি করলাম।কারণ আমি জানি ও রাজর্ষির পার্টে নিশ্চয়ই ভাল নম্বর তুলবে।ও কোনোভাবে চল্লিশের উপর পেয়ে গেলে অপর্ণা আমাকে ছাড়ত না।আমার এত চেষ্টা সত্ত্বেও অপর্ণা মাত্র একতিরিশ পেল মার্ক্সের পেপারে।তৃষ্ণা ওর থেকে অনেকটা বেশী পাওয়ায় আমাকে অপর্ণার কাছে বেশ কিছু অশ্লীল কথা শুনতে হয়েছে।ওর বক্তব্য আমি আমার পার্টে আরও কেন কমিয়ে দিলাম না।অপর্ণা যেটা বোঝে না সেটা হল তৃষ্ণা আর টি আই এ খাতা দেখতে চাইলে আমি ঝামেলায় পড়ে যাব।আমাকে এমন সূক্ষ্মভাবে কাজটা করতে হবে যাতে তৃষ্ণা সব বুঝেও আমার বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপে না যেতে পারে।তৃষ্ণার সাথে সরাসরি শত্রুতায় আমি যেতে চাই নি।সেটা শুধু আমার নিজের দুর্বলতার কারণে নয়।কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়তে পারে।আমি যে পলিটিকাল ইকোনমির কোয়েশ্চেন পেপার পরীক্ষার আগেই অপর্ণাকে দিয়ে দিয়েছিলাম এটা জানাজানি হলে আমার চাকরি চলে যাবে।যদিও তারপরও অপর্ণা খাতায় বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি।


কোনো খাতা ইভ্যালুয়েট করার সময় যদি ছাত্রছাত্রীদের মুখ চেনা থাকে,তাহলে পারফর্মেন্স ছাড়াও অনেকগুলো বিষয় মাথায় রাখতে হয়।যেমন কেউ যাতে আমাকে বায়াসড না ভাবে।বিশেষ করে আমি যেখানে নিজে জানি আমি কতটা চরম মাত্রায় বায়াসড।যেমন গত বছর সায়ন্তনী মার্ক্সের পেপারে হায়েস্ট পেয়েছিল।তাই এবছর ও যাতে হায়েস্ট না পায় সেদিকে দৃষ্টি রাখা।তাছাড়া ও হায়েস্ট পেলে অপর্ণা আমাকে মেরে ফেলত।আরেকটা জিনিস হচ্ছে পলিটিকাল ইকোনোমির ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা মাত্র তিনজন।ওদের সাথে সপ্তাহে মার্ক্স আর পল ইকোর ক্লাস মিলিয়ে আমার চারদিন দেখা হচ্ছে।তাই কেউ যাতে না ভাবে আমি ওদের বেশী ঘনিষ্ঠ,তাই ওদের মার্ক্সের খাতার নম্বরটা চেপে দেওয়া।অপর্ণাকে পল ইকোয় হায়েস্ট পেয়েই তাই খুশী থাকতে হচ্ছে।আসলে ওরও তো কয়েকটা বাধ্যতা আছে।শি কান্ট এফোর্ড টু লুজ মি।ওর মত একটা ব্রেনলেস ক্রিচারের অ্যাকাডেমিয়ায় আমি না থাকলে কোনো ভবিষ্যৎ নেই।আরেকটা বিষয়,যা ওতোপ্রোতভাবে ওকে আমার সাথে জড়িয়ে রেখেছে তা হল আমাদের একই জাতীয় যৌন পছন্দ।যেটা স্বাভাবিক মানুষরা অনেকেই বিকৃত বলে ভাববে।এমনকি আঁতকে উঠবে।
আমরা দুজনেই স্ক্যাটোফাইল।মানুষের যে রেচন বা বর্জ্য পদার্থ দেখলে সাধারণত লোকে নাক সিঁটকায় সেগুলো আমরা দুজনেই পছন্দ করি।আমার ডার্কেস্ট ফ্যান্টাসিগুলো একমাত্র ওর কাছে আমি ডিসক্লোজ করতে পারি।ব্রথেলগুলোতে আমার স্ট্যান্ডার্ডের মেয়ে পাওয়া কঠিন,পাওয়া গেলেও তাদের এক রাতের রেট দেড় থেকে দু লাখের কম হয় না।অবশ্য আমার এটুকু খরচ করার মত সঙ্গতি আছে,তবে নিয়মিত না হলেই ভাল।আমি একটা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ও একটা নেপালী মেয়ের কাছে গেছি।প্রচুর খরচা করেই গেছি।কিন্তু ওরা আমার প্রয়োজনগুলো পূর্ণ করতে চায়নি।ওগুলোর জন্য আমাকে যে স্তরের মেয়েদের কাছে যেতে হবে,সেটা আবার আমার রুচিতে পোষাবে না।তাই অপর্ণা।সর্বোপরি,তৃষ্ণাকে নিয়ন্ত্রণের আমার হাতের সব চেয়ে বড় অস্ত্র ছিল অপর্ণা।একটা ট্রায়াঙ্গেল তৈরী রাখা,তৃষ্ণাকে সবসময় একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা ওর প্রতি আমার যা কিছু সেই বিষয়ে-যাতে প্রতি মুহূর্তে আমার মনোযোগের জন্য তৃষ্ণাকে আরেকজনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিয়োজিত থাকতে হয়।ওটাই যে কোনো সম্পর্কে নিয়ন্ত্রণের রাশ।যে কোনো নারীকে, কিছুদিনের জন্য হলেও দারুণ ফলপ্রসূভাবে ওটা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।যদিও তৃষ্ণার ক্ষেত্রে এই বিষয়টার প্রয়োগ আমাদের মধ্যে দিনের পর দিন ক্রমশ দূরত্ব বাড়িয়েছে। তৃষ্ণা ঐ ত্রিভুজটাকেই প্রত্যাখ্যান করেছে।একটা কটূ শব্দ,একফোঁটা স্যাভেজারি এড়িয়েও কিভাবে বিদ্রোহ করা যায়,তার জ্বলন্ত দলিল আমার মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়ে নিষ্পৃহভাবে বিপ্রতীপে হেঁটে চলে গেছে তৃষ্ণা।

এই ডিবচারিগুলো আমাকে শর্মিষ্ঠার থেকে লুকিয়ে করতে হয়।তাও কয়েকবার ধরা পড়ে গেছি।যদি কখনও ও সত্যিই ফেড আপ হয়ে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেয় তাহলে আমি অপর্ণাকে বিয়ে করতে পারি।কিন্তু তাতে সমস্যা আছে।শুধু যৌন প্রয়োজনে বিয়েটা আমার মত লোকের পক্ষে হেলদি নয়।শর্মিষ্ঠার আত্মসমর্পণ, বিশ্বস্ততা, ভালবাসা বা আণুগত্যের ছিঁটেফোঁটাও কি আমি অপর্ণার কাছে পাব!অবশ্য আমার মত নোংরা লোকের কাছে ওসবের মূল্য খুব বেশী নয়,তাও একটা জায়গায় দরকার আছে।অপর্ণা যা প্রতিহিংসাপরায়ণ মেয়ে,কোনো কারণে আমার উপর অফেন্ডেড হলে ৪৯৮ ঠুকে আমাকে জেল খাটিয়ে দিতে পারে।শর্মিষ্ঠা শুধু ভালবাসে বলেই আমার মত একটা সাক্ষাৎ বরাহনন্দনকে এতবছর সহ্য করছে।কিন্তু আমি আমার পছন্দগুলো শর্মিষ্ঠা বা আমার অন্যান্য যৌনসঙ্গীদের বলতে পারব না।তাতে প্রথমে জুতো খাবার ও পরে সমাজে দানব হিসাবে পরিচিতি লাভের সম্ভাবনা আছে।আমি যে কোনো চিরাচরিত মধ্যবিত্ত মানসিকতার বাঙালী আঁতেলের মতই নিজের ইমেজ সম্পর্কে সচেতন।আমার চরিত্র যেমনই হোক ইমেজে একটুও কালি লাগাতে আমি পছন্দ করি না।সত্যি কথা বলতে অতটা দম নেই।ক্লাসে বা ফেসবুকে বিপ্লবী সাজা যায়,সমাজে থাকতে গেলে তো সমাজের নর্মস মেনেই চলতে হবে রে বাবা।তাতে কেউ আমাকে ভণ্ড ভাবলে আমার কিচ্ছু যায় আসে না।সারাজীবনে অনেক বড় বড় আগুনখেকো বিপ্লবী তো দেখলাম।ভিতর থেকে প্রত্যেকটা লোক তিনপেয়ে।এবং শুওরের বাচ্চা।

(ক্রমশ)

দ্রোণাচার্য্য ২
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments