পর্ব ১৫
তৃষ্ণার কথা


সময় তখন বিয়াসের স্রোতের গতিতে এগোচ্ছিল।পরপর অনেকগুলো ঘটনা,বাইরের কারো কাছে হয়ত আপাতদৃশ্যে কিছুই উল্লেখযোগ্য নয়।আমারও কি সব মনে আছে!অামিও তো ঐ দিনগুলো মনে রাখতে চাইনি।তখন এগুলো লেখার কথা সেভাবে মনে হয়নি!মানে একেবারে যে হয়নি তা নয়,কিন্তু এই উদ্দেশ্য ঐ স্মৃতিগুলো ধরে রেখে মানসিক ক্ষয় করতে চাইনি।


ডঃ কাজল ভট্টাচার্য আমার নিষ্পৃহতা নিতে পারতেন না।আমার চিন্তাক্ষেত্রের একচ্ছত্র দখল চেয়েছিলেন।একজন নার্সিসিস্টের যা যা বৈশিষ্ট্য থাকে তার প্রত্যেকটাই ওঁর মধ্যে উপস্হিত ছিল।আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু না হতে পারলে চরম ফ্রাস্ট্রেশনে ভোগা,নিজেকে আকর্ষণের কেন্দ্রস্হলে রাখবার জন্য নিজের একটা রহস্যময় অথচ চার্মিং ভাবমূর্তি তৈরী করা,নিজেকে অন্তর্মুখী দেখানোর চেষ্টা,আশেপাশের মানুষদের থেকে আশা করা যে তারা ওঁর নার্সিসিজমকে প্রশ্রয় দেবে,নিজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রয়োজন বা ইগোকে প্রায়োরিটি লিস্টে সবচেয়ে উপরে রাখা এবং আশা করা যে অন্যরাও সেটা করবে,এবং ম্যানিপুলেশনে দক্ষতা অর্জন করা।নার্সিসিজম একপ্রকার পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার।এরা সবচেয়ে বেশী যেটা ঘৃণা করে তা হল বাউন্ডারি।যেটা টেনে রাখার ফলে আমাকে ওঁর অস্বাভাবিক বিদ্বেষের স্বীকার হতে হয়েছে।কিন্তু এটা টেনে রাখার ফলে আমি একটা বিশাল বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছি।বিপর্যয়টার নাম প্রেম।উনি যেটা করছিলেন সেটা মনঃস্তত্ত্ব পড়ে আসা কোনো মানুষ একটাই উদ্দেশ্যে করে।কখনও অনাদর,ক্ষেত্রবিশেষে রীতিমত অভদ্রতা কখনও আবার আবেগের মিসাইল নিক্ষেপ।যেন ঐ মুহূ্র্তে ওঁর পৃথিবীতে আমি ছাড়া কিছুর অস্তিত্বই নেই। উনি চেয়েছিলেন আমি ওঁর প্রেমে পড়ি।কেন চেয়েছিলেন তার উত্তরটা আজও আমার কাছে ধোঁয়াশা।শুধু আমাকে খাদের ধারে ঠেলে মজা দেখতে?নাকি প্রত্যাখ্যানের সুযোগ পেয়ে নিজের আহত পৌরুষে মলম লাগানো!অথবা,যেটা আমার বিশ্বাস করতে বেশ কষ্ট হয় অর্থাৎ আমাকে বিছানায় টানা।হয়ত সুপ্ত তিয়াসা সেটাই ছিল,তবে অতটা ওঁর সাহসে কুলোত না।পৃথিবীর সবচেয়ে ট্র্যাজিক কেস হল ইমেজের দায়ে হাত পা এবং পুরুষাঙ্গ বাঁধা পড়া কামুক বাঙালী ইন্টেলেকচুয়াল।তার উপর অধ্যাপক হলে তো কথাই নেই।কারণটা যাই হোক,আমাকে মানসিক ভাবে পুরোপুরি ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিলেন ভদ্রলোক।কাউকে নিজের কারণে কষ্ট পেতে দেখলে (সে প্রেমঘটিত হোক আর না হোক) এদের একটা বিচিত্র আনন্দ হয়।অতঃপর নিজের মানসিক স্বাস্হ্যের জন্য যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হল এদের সঙ্গে সমস্তরকম সংশ্রব বর্জন করা।


উনি বিবাহিত,ওঁর আমার বয়সী একটা মেয়ে আছে,ওঁর চেহারাটা মিশরের লোমহীন বেড়ালের মত।ভদ্রলোক অস্বাভাবিক রোগা,বাঁদরের মত লাফালাফি করতেন।ভদ্রলোককে দেখলে কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে ছাল ছাড়ানো মুরগীর কথা মনে পড়ে।ইত্যাদি বিভিন্ন কারণ থাকলেও সেগুলো আমার ওঁর প্রেমে না পড়ার মত কিছু শক্তপোক্ত কারণ ছিল না।আমাদের বয়সী মেয়েরা সাধারণত বুদ্ধির গোড়ায় এবং চোখের উপর পর্দা ফেলে রাখে।ব্রিটিশদের মত গায়ের রঙ আর ব্যক্তিত্ব দেখলেই তাদের মাথার ঠিক থাকে না।আমার ক্ষেত্রে ওখানেই একটা সমস্যা হয়ে গেছিল।মানে ঐ চার্মটা ভেঙে যাওয়া।নিজেকে ভদ্রলোক প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশী মাত্রায় প্রকাশ করে ফেলেছিলেন আমার কাছে।আমার মত নাস্তিকের উপর পরওয়রবিগারের আশীর্বাদ কিনা জানি না,ওঁর উদ্দেশ্য সবটা না বুঝলেও আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ইঙ্গিত দিচ্ছিল লোকটা ভাল নয়।আমার চারপাশের লোহার দুর্গটা একটুও শিথিল করলে তার ফল আমার পক্ষে ভাল হবে না।


লোকটা ভীতু ছিল,কিন্তু একটা চিরাচরিত নার্সিসিস্টের মতই মেগ্যালোম্যানিয়াক ছিল।আসলে কি ঘটছিল এটা মার্ক্সের ক্লাসের ছেলেমেয়েরা আঁচ করতে পারত না।পলিটিকাল ইকোনমির ছেলেমেয়েরা কিছুটা হয়ত পারত,কিন্তু ওর আন্ডারে থাকা রিসার্চ ফেলো সৌম্যদা বা অপর্ণা কেনই বা আমার জন্য ওর বিরুদ্ধে যাবে!লোকটা সূক্ষ্মভাবে আমাকে অপমান করার সুযোগ বড় একটা ছাড়ত না।অবশ্য আমার ক্ষেত্রেও কথাটা সত্যি,আমিও ঠাণ্ডা বিদ্রোহ চালিয়ে গেছি বরাবর।লোকটার সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল আমাকে প্রতিমুহূর্তে অস্বস্তিতে ফেলা বা হিউমিলিয়েট করার চেষ্টার পরও,এমনকি থার্ড সেমে সরাসরি আমার ক্ষতি করার পরও আশা করত আমার আচরণ ওর প্রতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে।এখানেই মেঙ্গেলের সাথে ওর মিল খুঁজে পেতাম।কিন্তু একটা জায়গায় আমার জয় হয়েছিল।লোকটা মেঙ্গেলের মত নিষ্পৃহ থাকতে পারেনি।আমাকে লোকটা যখন চোখ দিয়ে লেহন করত,তখন ওর চোখে লালসা আর ঘেন্নার সাথে একরকম অসহায়ত্বও দেখেছি।শেষের দিকটায় পুরোপুরি আত্মসংযম হারিয়ে লোকটা দৃষ্টিকটূভাবে উদ্ভট কিছু আচরণ করছিল।


আগের সেমিস্টারের পরীক্ষার সময় কাজলবাবু প্রায় প্রতিদিন আমাদের ঘরে গার্ডের দায়িত্ব নিচ্ছিলেন।এবং আমি সামনে থাকলেও বেশ দৃষ্টিকটূভাবে পিছিয়ে গিয়ে আগে অপর্ণাকে কোয়েশ্চেন পেপার দিচ্ছিলেন,তারপর বিষ্ণুকে,তারপর অন্যদের, সবশেষে আমাকে।উলটোটা করা কোনো অজ্ঞাত কারণে তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল।তাই বোধ হয় ভয়ে এবার আমাদের ঘরে গার্ড নেননি।আমাকে বা অপর্ণাকে কাউকেই তিনি চটাতে চাইছিলেন না।এমনকি আমি শেষদিনের ক্লাসে তাঁকে পা এগিয়ে দিয়ে ফেলে দেবার চেষ্টা সত্ত্বেও না।তাঁর ইগোর মলম পাবার ডেসপ্যারেসি এতটাই বেশী ছিল যে ঐ ঘটনার পরও আমাকে পরিতোষণ করার চেষ্টা করছিলেন।এত ধূর্ত মানুষ,এটা কি আর বোঝেননি যে ঘটনাটা ইচ্ছাকৃত ছিল!


কাজলবাবু আমাদের মত অল্পবয়সী মেয়েদের মস্তিষ্ক নিয়ে খেলতে খুব ভালবাসতেন।সফট টার্গেট ছিল ছাত্রীরা।কারণ কোলিগদের ক্ষেত্রে এগোতে গেলে জুতো খাবার সম্ভাবনা প্রবল।জায়গামত উনি ভদ্রতার প্রতিমূর্তি সাজতে পারতেন।যে অভিজ্ঞতাটা আমার হয়েছে জানিনা আমাদের ব্যাচের আরও কোনো মেয়ের হয়েছে কিনা!এটা নিয়ে নিজেদের আলোচনা করা সম্ভব ছিল না।পরবর্তী সময়ে নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি মেয়েরা নিজেদের মধ্যে খোলাখুলি আলোচনায় বসতে পারলে,পরস্পরের সমর্থনে থাকতে পারলে কাজলবাবুর মত অজস্র পারভার্ট বেত্রাহত সারমেয়র মত দৌড়ে পালায়।আমার লোকটার প্রতি মাঝে মাঝে করুণাও হত।এত সফল একজন মানুষ,কিরকম মিডল এজ ক্রাইসিসে ভুগছে।চিরাচরিত নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার।তখন মনে হয় বিশ্বচরাচরের সব মেয়েই বোধহয় আমার প্রেমে পড়ছে।একজনের কাছ থেকে একটু কম গুরুত্ব পেলে এদের কাছে সেটা জীবনমরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।ফলস্বরূপ এরা গভীর ডিপ্রেশনে চলে যেতে পারে,আবার চরম ফ্রাস্ট্রেশনের ফলে হিংস্র হয়ে উঠে অন্যদের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে।নীতিবোধ ব্যাপারটা এই জাতীয় মানসিক রোগীদের কাছে আশা করা বাহুল্য।কাজলবাবুর দ্বিতীয় অবস্হাটা হয়েছিল।পলিটিকাল ইকোনমির ক্লাসটাকে ভদ্রলোক নিজের হারেম ভাবতে শুরু করেছিলেন।আর নিজেকে সম্রাট গোছের কিছু একটা।এই সময় তাঁর উচিত ছিল মনোবিদের সাথে যোগাযোগ করা।কিন্তু তা না করে তিনি এদিক ওদিক গুঁতিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।মাথাটা শেষের দিকে তিনি পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো আর গুঁতোনো ছাড়া কোনোকাজেই ব্যবহার করতেন না।কোনো প্রশ্ন করলে ঠিকঠাক উত্তর পর্যন্ত দিতে পারতেন না।শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়,অনেকের ক্ষেত্রেই।যেমন একটা ছেলে হলোকাস্ট নিয়ে প্রশ্ন করায় এড়িয়ে গেলেন।ক্লাসে এসে একটা বইয়ের চ্যাপ্টারের নাম রোজ ভুল বলতেন,লেনিনের স্ত্রীয়ের নামটা পর্যন্ত ভয়ঙ্কর ভাবে ভুল বলেছিলেন।ম্যাডাম কোল্লনতাইকে তাঁর স্ত্রী বলে দিলেন।


শেষদিন আমার সিজিওর অফ পাওয়ার নিয়ে ভায়োলেন্ট মতকে পর্যন্ত সমর্থন করে মেনে নিলেন প্রতিরোধ দরকার।সম্ভবত চাইছিলেন যাতে মাওবাদীর প্রশ্নটা নিয়ে আমি আবার ওঁর কেবিনে যাই।আগের সপ্তাহে কয়েকবার ডেকেছেন,এড়িয়ে গেছি।যাই হোক তা সত্ত্বেও যাইনি।উত্তরটা শম্পা ম্যাডামের সাথে আলোচনা করে নিয়েছিলাম।
আমাদের পলিটিকাল ইকোনমি পরীক্ষার দিন ভদ্রলোক যখন হলে এসেছিলেন আমি তাঁকে লক্ষ করিনি।মানে খাতার দিকে মনোযোগ ছিল।হঠাৎ উপলব্ধি করলাম অপর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে কিরকম চোর চোর ভঙ্গিতে ওকে জিজ্ঞেস করছেন,"কোয়েশ্চেন ঠিক আছে তো?"
অপর্ণা আমার সামনের বেঞ্চে বসেছিল।
আমি যেহেতু কাজলবাবুর নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব দেখে অভ্যস্ত তাই ওদিকে তাকানোর প্রয়োজনবোধ করলাম না।প্রশ্নটা অপর্ণাকে করে বেরিয়ে যাবেন,এটাই স্বাভাবিক।কখনও আমি আর অপর্ণা একসাথে থাকলে এরকম ঘটনা বেশ কয়েকবার হয়েছে যে ভদ্রলোক আমাকে চিনতেই পারলেন না,ওর সাথে কথা বলে গেলেন।একসময় যে সেগুলো খারাপ লাগত না তা নয়, তবে এখন লাগে না।কারণ এই চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো উপেক্ষাগুলোর কারণটা উপলব্ধি করতে পারি।আমি লিখছিলাম,হঠাৎ ফিল করলাম কাজলবাবু তাঁর সাদা কঙ্কালসার হাতটা আমার সামনে এসে অদ্ভুত ভাবে নাড়ছেন।আমি একটু অবাক হয়ে তাকালাম।(ভদ্রলোক কেন যে আমায় নাম ধরে সরাসরি সম্বোধন করেন না!)উনি অপ্রতিভ ভাবে বললেন,"কোয়েশ্চেন ইজি আছে?"
"হুম।"প্রায় অস্ফুটে কথাটা বলে আমি আবার লিখতে শুরু করলাম।পরে লক্ষ করছিলাম ভদ্রলোক মাঝে মাঝেই ঘরটার সামনে দিয়ে যাতায়াত করছেন।যেতে যেতে বারবার আমাকে দেখছেন।
সেদিন টার্ম পেপার জমা দেওয়ার সময় ওঁর কেবিনে যেতেই হল।আমি একা ঢুকব না বলে কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম,হিয়াকে আসতে দেখে ওর সঙ্গে ঢুকলাম।"স্যর আসব?" "থ্যাঙ্ক ইউ স্যর" গোছের ফর্মালিটিগুলো যাতে হিয়ার দায়িত্বে মিটে যায়।আমার কাজলবাবুর সাথে একটা বাক্যবিনিময় করারও প্রবৃত্তি হচ্ছিল না।লোকটা নির্ঘাত কোয়েশ্চেন পেপার অপর্ণাকে পরীক্ষার আগেই দিয়ে দিয়েছে।আজ সেই কারণেই খোঁজ নিতে এসেছিল অপর্ণার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা!নইলে অত কাণ্ড করে ডেকে কথা বলবার লোক কাজলবাবু নন।একটা মিথ্যেকে চাপা দিতে মানুষকে কতরকম আত্মনিগ্রহ করতে হয়!
কেবিনে আবার ওঁর পুরোনো নাটকটা শুরু করলেন।হিয়া বারবার ডাকছে,"স্যর এটা কোথায় জমা দেব?"ভদ্রলোক কোনো উত্তর না দিয়ে ঘাড় শক্ত করে সাইকোপ্যাথদের মত বসে।একসময় ফাইলটা ওর হাত থেকে নিয়ে নিজের টেবিলে রাখলেন।আমি সশব্দে আমারটাও টেবিলে রেখে বেরিয়ে এলাম।হিয়া "থ্যাঙ্ক ইউ স্যর" বলে আমাকে অনুসরণ করল।(কিসের জন্য ধন্যবাদ দিল কে জানে!)
তার একদিন পর মার্ক্সের পেপার।সেদিন অসম্ভব ব্যথা হয়েছিল ডান হাতে। কিভাবে পরীক্ষা দিয়েছি আমিই জানি।তবে পেপারটা বেশ ভাল হয়েছিল।পলিটিকাল ইকোনোমির পেপারটার মত অতটা ভাল না হলেও।যদিও জানি কোনো লাভ নেই। একরকম হতাশা কাজ করছিল।খাতাটা ঐ দুর্নীতিপরায়ণ পারভার্টটা দেখবে।আবার আগের সেমিস্টারের মত…..পড়াশোনা করার কোনো মূল্য নেই!মার্ক্সের পেপারে অবশ্য কুড়ি নম্বর রাজর্ষি স্যরের হাতে।


মার্ক্সে প্রায় সতেরো জন পরীক্ষার্থী।কাজলবাবুকে ঘরে আসতে দেখে আমি আড়চোখে তাঁকে লক্ষ করছিলাম।সরাসরি তাকানো যাবে না,আনন্দিত হয়ে উঠবেন।আর ওঁকে আনন্দিত হতে দেখলে,অন্তত আমার কারণে-আমার একটুও ভাল লাগবে না।ভদ্রলোক কোনোদিকে না তাকিয়ে হঠাৎ আমার সিটের দিকে এগিয়ে আসছিলেন,তারপর কি ভেবে সরে গেলেন।গার্ডে থাকা সব্যসাচী স্যরের সাথে কুশল বিনিময় করলেন,কারো কোথাও অসুবিধা আছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন।(আগের দিনের মত আলাদা আলাদা করে নয়,সামনে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে সবার উদ্দেশ্য প্রশ্ন করে)।তারপর বার বার আমার দিকে পিছন ফিরে দেখতে দেখতে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।দরজায় দাঁড়িয়ে শেষবারের মত যেন কিছুর প্রত্যাশায় আরও একবার ঘুরে দেখলেন।তারপর বেরিয়ে গেলেন।
কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষার দিন ছাত্রছাত্রীদের ওঁর সাথে শেষবারের মত দেখা করে গিফট দেবার কথা ছিল।ওঁর র্যাডিকাল ফলোয়ার আলি আগেই গিফট কিনে ফেলেছিল।পরে আমাদের কিছু কন্ট্রিবিউট করার অনুরোধ করে।আমি ঠিকই করেছিলাম লোকটার উপর একটা পয়সাও নষ্ট করব না।তাই সেদিন পরীক্ষার পর ওঁর কেবিনে যাইনি।অবশ্য এটাই একমাত্র কারণ নয়।ওঁর প্রতি আমার নীরব বিদ্রোহের অন্যতম কর্মসূচি ছিল ওঁর কেবিন বয়কট করা।ব্যাপারটা যে কোনো কারোর কাছে হাস্যোদ্দীপক হতে পারে।কিন্তু ঐ মুহূর্তে শীতলতা ছাড়া আমার আর কোনো অস্ত্র ছিল না।


রিটন পরীক্ষা হয়ে যাবার পরও আমাদের গ্রুপ প্রোজেক্টের প্রেজেন্টেশন বাকি ছিল।গ্রুপে একটি বদ ছেলের জন্য বেশ ঝামেলা হচ্ছিল।আমাদের মেন্টর সব্যসাচী স্যরের কারণে তাকে সংযত হতে হয়।যাই হোক,সেদিন আমরা সব্যসাচী স্যরের কেবিনে বসে ছিলাম,কাজলবাবুর কেবিনটা তাঁর ঠিক মুখোমুখিই।হঠাৎ কাজলবাবুর কেবিনের থেকে খুব জোরে জোরে শব্দ আসা শুরু হল।সব্যসাচী স্যর এবং আমাদের গ্রুপের অন্যান্য ছেলেমেয়েরা অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়েছিলেন।আমি চোখ বন্ধ করে আমার চেয়ারে বসে রইলাম।আমার আশঙ্কা হচ্ছিল কাজলবাবু আমাকে দেখতে পেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কিছু করছেন কিনা!
এরপরের ঘটনাটা প্রেজেন্টেশনের দিনের।কাজলবাবুর গ্রুপের প্রেজেন্টেশনের স্লট আমাদের ঠিক পরপরই।জানিনা এটা কাকতালীয় না ইচ্ছাকৃত।আমি শুধু জানতাম যা হচ্ছে সেটা আমার পক্ষে ভাল না।অসম্ভব দুশ্চিন্তায় কেটেছে সেই সময়গুলো।ঐ অভিজ্ঞতাগুলো স্মরণ করে লেখা অনেকটা পুরোনো ঘা খুঁড়ে তাজা রক্ত বের করার মত।
আমাদের প্রেজেন্টেশনের শেষের দিকটায়,মানে শেষ হবার বেশ কিছক্ষণ আগে থেকেই হলে ঢুকে বসে ছিলেন।আমরা যখন বেরিয়ে যাচ্ছি উনি হঠাৎ উঠে দেওয়ালের গায়ে কিরকম টিকটিকির মত করতে শুরু করলেন।মানে যেন চার হাত পা দিয়ে হেঁটে দেওয়ালে উঠে যাবেন।একসময় আমাদের সাথে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেন।আবার কি মনে করে ভিতরের দিকে চলে গেলেন।
এর পরের ঘটনাটা এম ফিলের পরীক্ষার পর।পরীক্ষাটা খুব একটা সিরিয়াসলি দিইনি।নেহাত পাঁচশ টাকা দিয়ে ফর্ম ফিল আপ করা বলেই দিতে যেতে হয়েছিল।রিটনে অপর্ণা এমনকি অপর্ণার চেয়েও কম নম্বর পাওয়া একটি ছেলে কোয়ালিফাই করলেও খুব বিস্ময়কর ভাবে সায়ন্তনী চান্স পেল না।প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য প্রেজেন্টেশনে কাজলবাবু তাঁর গ্রুপকে খুবই সাহায্য করায় সায়ন্তনীর উপর অপর্ণা রীতিমত ক্ষেপে ছিল।সায়ন্তনী ওদের গ্রুপ লিডার ছিল।


যারা রিটনে কোয়ালিফাই করেছে তাদের এস ও পি টা ইন্টারভিউয়ের আগে জমা দিতে হত।ওটা লিখতে সমস্যা হচ্ছিল।গুগল করেও কিছু উদ্ধার করতে পারছিলাম না।শম্পা ম্যাডামকে দেখাতে চাওয়ায় বলেছিলে, "কাজলকে দেখিয়ে নিলে বোধহয় ভাল হত।"
আমি ওঁর আন্ডারে কাজ করতে চাই জানানোতেও বেশ সংকুচিত হয়ে বললেন ডিপার্টমেন্টের অন্য অধ্যাপকরা হয়ত রাজী হবেন না।বললেন,"কাজলকে বরং নিয়মটা একবার জিজ্ঞেস করে নাও।"
যাই বলি ম্যাডাম কাজল ভট্টাচার্যের কোর্টে বল ঠেলেন।আচ্ছা ঝামেলা!ঐ লোকটাকে মেল করতে হবে! তাও নিজে থেকে!চিন্তাটাই কিরকম শরীর খারাপ লাগার মত!আবার কি করবে কে জানে!আমার এই অনিশ্চয়তায় ভোগা,মানসিক অস্হিরতা এই প্রত্যেকটা টানাপোড়েন ভদ্রলোক আমন গোয়েথের সমান সেডিজমে উপভোগ করেন।ম্যাডাম এমনিতে খুবই সাপোর্টিভ এবং ফ্রেন্ডলি,সবসময়ে সাহায্য করেন।কখনও বিরক্ত হতে দেখিনি,এত প্রতিষ্ঠিত ও সিনিয়র হয়েও অদ্ভুত নিরহঙ্কার, কিন্তু ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হবার কারণে সম্ভবত ওঁর মধ্যে একরকম দ্বিধা কাজ করছিল।
অতঃপর বাধ্য হয়ে কাজলবাবুকে ইমেল করে জিজ্ঞেস করলাম এস ও পি টা যদি দেখে দেন।ভদ্রলোক দীর্ঘ সময় পরেও কোনো উত্তর দিলেন না।হলটা কি!আমি নিজে থেকে মেল করায় আনন্দের চোটে বুড়োর হার্ট ফেল করে যায়নি তো!অথবা হতে পারে ওকে উপেক্ষা করার বদলা নিচ্ছে।আমি কাজলবাবুকে এম ফিলের নিয়মের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে আরেকটা ইমেল করে দিলাম।মানে যেটা ম্যাডাম আমাকে ওঁর থেকে জানতে বলেছিলেন সেই বিষয়ে।আমি নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম ভদ্রলোক উত্তর দেবেন না।সেটাই না হয় ম্যাডামকে জানাব।পরদিন সকালে ম্যাডামকে এস ও পি টা মেল করার জন্য জিমেইল খুলে দেখলাম কাজলবাবু আমার মেলটার উত্তর দিয়েছেন।ভদ্রলোক আমাকে বিস্মিত করার একটা সুযোগও ছাড়বেন না।


"প্রিয় তৃষ্ণা,
আমি এম ফিলের নিয়মটা জানি না।আমি এখন ছুটিতে আছি কিন্তু ফিরে এলে খোঁজ নিয়ে নিশ্চয়ই জানতে পারব।তোমার এস ও পি তে যে এরিয়াটা তুমি স্টাডি করতে চাও সেটা দেবে এবং কোন ডিরেকশনে এগোতে চাও সেটাও লিখবে।যে রেফারেন্সগুলো কনসাল্ট করেছ সেগুলোও অবশ্যই উল্লেখ করবে।
স্যর।"
এটাই আমাদের শেষ কথোপথন।এস ও পিটা শেষ পর্যন্ত ম্যাডামই দেখে দিয়েছিলেন।এম ফিলের ইন্টারভিউয়ের দিন খুব বিস্ময়কর ভাবে কাজলবাবু অনুপস্হিত ছিলেন।অপর্ণা ঘোঁৎ ঘোঁৎ করছিল, "আজ কেবিএইচ এলেন না কেন বলত?"আমার ওর প্রতি বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছিল।জানি না সব জেনে ন্যাকামি করছিল কিনা!আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল কাজলবাবু পরীক্ষায় টানা কারচুপি করে আসায় এখানে আর আমার মুখোমুখি হতে সাহস পাচ্ছেন না।মানে ভয় পাবার কিছুই নেই,তাও….হয়ত অপরাধবোধ!হয়ত এই আশঙ্কা যে অপর্ণা সিলেক্টেড হল আর আমি হলাম না সেক্ষেত্রে ওঁকে অভিযুক্ত করতে পারি!

 


পর্ব ১৬
কাজল ভট্টাচার্যের কথা


"বিদ্যত্বং চ নৃপত্বং চ নৈবতুল্য কদাচন।
স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে।"
ফুকো বলেছিলেন,"নলেজ ইজ পাওয়ার।"আধুনিক যুগের ক্ষমতাকে যদি বুঝতে চাও আগে রাজাদের মাথাগুলো কেটে ফেল।হ্যাঁ এখানেই একবিংশ শতাব্দীতে ইডিওলজিকাল স্টেট অ্যাপারেটাসের সার্থকতা।রিপ্রেসিভ স্টেট অ্যাপারেটাসের দরকারটা সেকেণ্ডারি।তবে শুধুই আধুনিক যুগ কেন?চাণক্য শ্লোক পড়েছেন আপনি পাঠক?পড়েছেন মুদ্রারাক্ষস?দুই সহস্রাব্দী আগের এক পলিটিকাল ইকোনমির অধ্যাপক,শ্রী বিষ্ণুগুপ্ত।তিনিও আমার মতই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন,বিষয়টাও এক।ক্ষমতার প্রতিমূর্তি। ওহ সে কি দাপট।যাঁর মেধা ছিল তাঁর ক্ষমতার উৎস।প্রজ্ঞাই ক্ষমতা,ক্ষমতাই প্রজ্ঞা। কে না জানে মণিভূষিত সর্প তথা বিদ্বান শয়তান অশিক্ষিত শয়তানের চেয়ে অনেকগুণ বেশী বিষাক্ত।খোদ সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত লোকটার ক্ষমতার খিদেয় অতীষ্ঠ হয়ে বানপ্রস্থে পালালেন।ওখানেই মেধাস্বরূপ ক্ষমতার জয়।চাণক্যের প্রভাব মুক্ত হওয়া বা তাঁকে অপসারিত করা সম্ভব নয় বুঝে একবুক বিতৃষ্ণা নিয়ে চন্দ্রগুপ্ত নিজেই সরে গেলেন।আজ দু হাজার বছর পরে বসে আমি ঐ লোকটার সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারি।আমিই ক্ষমতা।হৃদয়হীন, অনুভূতিহীন ক্ষমতা।যা শুধু হেজিমনি চেনে।আমার সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রত্যেকটা মানুষের নিয়তিই হচ্ছে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করা।যেমন শর্মিষ্ঠা।আমার বিশ্বাসঘাতকতা,পরস্ত্রীর প্রতি অত্যধিক আসক্তি- এগুলো ওকে দিনের পর দিন ক্ষতবিক্ষত করতে পারে,চোখের নীচে গাঢ় অন্ধকার তৈরী করতে পারে।এর জন্য ও ঈর্ষিত হয়,রাগ করে কিন্তু সব একটা সীমার মধ্যে থেকে।আমি ঐ সীমাটা কাউকে ছাড়ানোর অনুমতি দিই না।দিনের শেষে নারীত্বের সম্পূর্ণ অপমানটুকু গিলে ফেলে ওকে অভিমানী মুখে এসে আমার বুকেই আশ্রয় নিতে হয়।একই কথা অপর্ণার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।আমাদের বিডিএসএম সম্পর্কের কারণে আমি ওকে অনেকটা ছড়ি ঘোরাতে অ্যালাউ করলেও আখেরে ওকে আমার কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হয়।শর্মিষ্ঠা তৃষ্ণা নয়,আমার ঐ একচ্ছত্র ক্ষমতার জায়গাটা ধরে ও কোনোদিন টানার চেষ্টা করবে না।বরং অন্য মেয়েদের নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে আদরে,বিশ্বস্ততায় আমাকে বাঁধবার চেষ্টা করবে।আমি বাঁধা পড়বার লোক নই জেনেও নিজেকে স্তোক দেবে।প্রতিদিন আশায় বুক বাঁধবে।অপর্ণার ক্ষেত্রে রাগের বহিঃপ্রকাশটা অনেকটা উগ্র,বন্য।কিন্তু আখেরে ওরও নিয়তি তাই।আমাকে নিজের সবটুকু দিয়ে বেঁধে রাখবার চেষ্টা করা।যদিও ও জনসমক্ষে এটা কোনদিন স্বীকার করবে না।আমি ওর দাসানুদাস – এই পরিচয়টাই ও পছন্দ করে।উলটোটা নয়।যদিও সম্পর্কে আমি সাবমিসিভ,তাও আখেরে সম্পর্কের ছড়িটা কিন্তু আমার হাতেই।অপর্ণাও তৃষ্ণা নয়।সায়ন্তনীকে আমি চেখে দেখার ততটা সুযোগ পাইনি।চেষ্টা করেছিলাম,অপর্ণার কারণে বেশীদূর এগোনো সম্ভব হয়নি।কিন্তু ওরও ওটাই নিয়তি হত,সায়ন্তনীও তৃষ্ণা নয়।এই কারণেই অপর্ণা বা শর্মিষ্ঠা এখনও আমার সঙ্গে আছে।তৃষ্ণা নেই। ওর কোনো চিহ্নও আমি থাকতে দিইনি।সায়ন্তনীকে অবশ্য দুর্নাম এবং অপর্ণার ভয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ছেঁটে ফেলতে হয়েছে।ক্ষমতার এটাই বৈশিষ্ট্য।যখন যাকে প্রয়োজন ছেঁটে ফেল।এই কারণেই শ্রীরামচন্দ্র আমার প্রিয়তম পৌরাণিক চরিত্র।রাম আসলে ক্ষমতার প্রতীক।যে রাম অনুগতা শবরীর এঁটো ফল গ্রহণ করেন,সেই রামই মোক্ষপিপাসী শুদ্রকে হত্যা করেন।সীতাকে উদ্ধারের পরপরই জানিয়ে দেন হৃদয়বৃত্তি নয়,ক্ষমতায় লাগা দাগটা তুলতেই তাকে রাবণের থেকে ছিনিয়ে এনেছেন।এত মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়ে স্ত্রীকে উদ্ধার করেও তাকে ত্যাগ করতে একমুহূর্ত দ্বিধা করেন না রাম।এর নামই ক্ষমতা।যার কাছে নারী,যৌবন সবকিছু সমর্পিত। এখানে মানবিকতা,ভালবাসা এমনকি ব্যক্তিগত রাগ,বিদ্বেষ শব্দগুলো মিথ।এই ক্ষমতাকেই তৃষ্ণা অস্বীকার করার সাহস দেখিয়েছিল।আমার সামনে দ্য নেকেড কিং এর ঐ শিশু হয়ে দাঁড়িয়ে।


আমি থার্ড সেমিস্টারে যা করার করেছি,সেটা ওর প্রাপ্যও ছিল।কিন্তু এরপর ওকে অজস্র সুযোগ দিয়েছি আমার সামনে মাথা নোয়াবার।ও সেগুলো বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।ওর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এক এক সময় এমন কিছু পাগলামি করেছি যা ভাবলে নিজেরই এখন অস্বস্তি হয়।তাই ওকে সবদিক দিয়ে আটকেছি।ওর অ্যাকাডেমিয়ায় আসার পথটাও।কাউন্টার হেজিমনি আর হেজিমনি পাশাপাশি থাকতে পারে না।সিদ্ধার্থ রায় আর চারু মজুমদার এক জায়গায় থাকতে পারে না।এটাই প্রকৃতির নিয়ম।তৃষ্ণা নারী হয়ে কোনোদিন আমার জীবনে আসেনি,এসেছিল বিপ্লবের মূর্ত প্রতীক হয়ে।যে কোনো একজনকে সরে যেতেই হত।ওকেও হয়েছে।তৃষ্ণা কোথাও নেই।
তৃষ্ণা কোথাও নেই?ওহ ভগবান!আমার শিরায়,ধমনীতে, অবচেতনে এভাবে কে সর্বগ্রাসী হয়ে ছেয়ে আছে!থিসিস অ্যান্টিথিসিসের সংঘাতে আমার অবস্হান কি সিন্হেসিসের?হৃদয় বা মস্তিষ্ক নিয়ে কিছু বলতে চাই না।আমার শরীরে ঐ দুটো জিনিসের ভূমিকা আমার শিশ্নই পালন করে।


আজ যদি ও বেরিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে যায় ওকে আইনি এবং বেআইনি পথে আমি বিপর্যস্ত করতে পারি।আমার হাতে এরকম অজস্র ছেলেমেয়ে আছে যারা আমার একটা অঙ্গুলীহেলনে ওকে সোশাল মিডিয়ায় ডিজিটাল ধর্ষণ করে চুপ করিয়ে দেবে।এমন ছেলেও আছে যে আমার একটা কথায় ওর মুখে অ্যাসিড ঢেলে আসবে।(পৃথিবীর সেরা মুহূর্ত হবে সেটা,ঐ রূপ নিয়েই তো এত গর্ব!)যদিও তারপর আমি ছেলেটির সাথে সম্পর্ক অস্বীকার করব।কাজের পরিণতির দায় তাকেই ভুগতে হবে।তাই তৃষ্ণাকে শরীরে লাগা বিষ্ঠার মত এই অভিজ্ঞতাটা বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে।ওর এত চেষ্টা সত্ত্বেও আমি ওকে হায়েস্ট তো দুরস্ত,চল্লিশের ওপরও পেতে দিইনি।অপর্ণার সামনে ও কিচ্ছু না,অন্তত যতক্ষণ জাজমেন্টের পাল্লাটা আমার হাতে।যেভাবে আমি অশ্বথ্বামা হয়ে ঘুরছি ঠিক সেই ভাবে ওকেও ঘুরতে হবে।অতৃপ্তি নিয়ে।


একজন পুরুষের জীবনে সফল এবং সুখী হতে গেলে যা যা প্রয়োজন তার সবটুকুই আমার কাছে আছে।সামাজিক প্রতিপত্তি, অর্থ,সম্মান,অঢেল যৌনতা।সতীসাধ্বী স্ত্রী।তৃষ্ণা পর্বটা আমাকে অসহ্য মানসিক টানাপোড়েন আর যন্ত্রণা ছাড়া কিছুই দেয়নি।ওর মাস্টার্স শেষ করে বেরিয়ে যাওয়া,আমার চোখের সামনে থেকে বিদায় হওয়া একটা মুক্তি আমার কাছে।এম ফিল নিয়ে ও এমনিতেই সিরিয়াস ছিল না।পার্শিয়ালিটির অভিযোগের ভয়েই আমি ইন্টারভিউ বোর্ডে অনুপস্হিত ছিলাম।পরে অপর্ণার কাছে শুনলাম ও ওখানে বিপ্লব নিয়ে প্রচুর ভাঁট বকে এসেছে।বলেছে মেনস্ট্রিম বা বুর্জোয়া ইকোনোমিকসকে ও নাকি আদর্শগত ভাবে ডিসকার্ড করেছে।তাই সেই সংক্রান্ত একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে রাজী হয়নি।অতঃপর ওকে এম ফিল থেকে বাদ দেবার জন্য আমাকে বিশেষ পরিশ্রমও করতে হয়নি।মানে প্রায় নিজের দোষেই বাদ পড়েছে।
এখন সব ঠিক হয়ে গেছে।আমার পর্নোগ্রাফির প্রতি অত্যধিক আসক্তি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।শর্মিষ্ঠাও আমাকে আর সন্দেহ করছে না।আমার পড়াশোনা, গবেষণা, অপর্ণা এবং আমার অন্যান্য আহার্যদের নিয়ে বেশ আছি।
আমি তৃষ্ণাকে ভালবাসিনি।কিন্তু ওর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে চেয়েছিলাম।চেয়েছিলাম ও আমার প্রেমে পড়ুক।সেটা ঐ অনুভূতিটা রেসিপ্রোকেট করার জন্য নয়।আস্তাবলের একমাত্র তেজী ঘোড়াকে বশে আনার পৌরুষগর্বে।কিন্তু আখেরে বিষয়টা ঘেঁটে একটা অত্যন্ত বিশ্রী পরিস্হিতি তৈরী হয়েছে।তৃষ্ণাও সম্ভবত আমাকে একটা দুর্নীতিপরায়ণ সেক্সুয়াল প্রিডেটর ছাড়া কিছুই মনে করে না।ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আমার আশা ছিল ওর সাথে কোনো ভাবে যোগাযোগ হবে।ও আমি অ্যাকাউন্ট খোলার কিছুদিনের মধ্যে, সম্ভবত আমার অ্যাকাউন্টটা দেখতে পেয়ে আমাকে ব্লক করে দেয়।একদিকে ভালোই।একরকম মুক্তি।আমি চাই না কোনোদিন ও আমার সামনে আয়না হয়ে এসে দাঁড়াক।যে কারণে জোসেফ মেঙ্গেলে তার ঔশউইতজের পূর্বতন স্পেসিমেনদের মুখোমুখি হতে চাইত না সেই কারণেই।আমার কোনো কলঙ্ক আমার দেবতুল্য ভাবমূর্তির উপর কয়েক সেকেণ্ডের জন্যও ছায়া ফেলুক আমি চাই না।ও যে নিজেই ঘেন্নায় আমার থেকে দূরে সরে গেছে এটা একটা রিলিফ।
তাও মাঝে মাঝে হঠাৎ একটা পিঙ্ক ফ্লয়েডের গান,রাতের বৃষ্টি বা কলকাতার রৌদ্রদগ্ধ রাস্তায় কোনো কোমর অব্দি লম্বা খোলা চুলের মেয়ের হেঁটে যাওয়া দেখলে এই মুক্তিটা আমাকে কাঁটা ফোঁটায়।আর অন্তত পরবর্তী বাহাত্তর ঘন্টার জন্য একটা বিষণ্ণতা আমাকে গ্রাস করে।পৃথিবীর কোনো প্রান্তে গিয়েই এই মুক্তির শূন্যতা থেকে আমার মুক্তি নেই।

 

পর্ব ১৭
তৃষ্ণার কথা


এই ধরনের সম্পর্ক,যা পরকীয়ার দিকে ঘুরতে পারে,তার মূল প্রথমেই উপড়ে ফেলা উচিত।আমি ভবিষ্যৎ না ভেবে একটা পা'ও ফেলতে পারি না।যদি পারতাম তাহলে এতদিনে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যোগ দিয়ে সরকারী সম্পত্তি জ্বালিয়ে বেড়াতাম।একটা লোক,যাকে আমার সাথে কথা বলতে গেলেও অপর্ণার আড়াল খুঁজতে হয় তার থেকে একটা আচরণই প্রত্যাশিত।লোকটা শরীর খুঁজতে বেরিয়েছে,এবং সহধর্মীনি দড়ি ধরে টানলেই বাধ্য বৃষের মত আবার গোয়ালে গিয়ে ঢুকবে।অপর্ণাকে,এমনকি আমাকে পর্যন্ত লোকটা ভয় পেত,সেখানে নিজের স্ত্রীকে রুদ্রমূর্তিতে দেখলে নির্ঘাত পাবলিক প্লেসে মলমূত্র ত্যাগ করে বসবে।
ভদ্রলোক সম্ভবত প্রত্যেক ব্যাচেই বেছে কিছু ছাত্রী ও রিসার্চ স্কলারকে উত্যক্ত করেন।ওঁর দেবতুল্য ইমেজের কারণে তারা নিঃশব্দে চলে যেতে বাধ্য হয়।এই জায়গায় স্বর চড়িয়েও কোনো লাভ হয় না।আমি জানি যদি সেটা করতে যেতাম,ওঁর ঘোষিত বামপন্থি ও নারীবাদী মহিলা কোলিগরাই হয়ত ওঁর সমর্থনে দাঁড়িয়ে পড়ে আমার দিকে কাদা ছুঁড়তেন।ম্যানিপুলেশনে ভদ্রলোক অত্যন্ত দক্ষ এবং সম্মোহনের কাজে প্রায় স্বর্গীয় উৎকর্ষ অর্জন করেছেন।
আমাদের ডিপার্টমেন্টে এরকম একজন অধ্যাপক ছিলেন(কাজলবাবু নন),যিনি নিয়ম করে ছাত্রীদের উদ্দেশ্য অশালীন মন্তব্য করতেন।এমনকি গার্লস টয়লেটে জল না দেওয়া নিয়েও কুরুচিপূর্ণ কথা বলেছিলেন।তাঁর ডিবচারিগুলো বেশ চলত।যদিও তাঁকে কেউ পছন্দ করত না।এখান থেকেই একটা ধারণা পাওয়া যায় কাজলবাবুর মত জনপ্রিয় অধ্যাপকের বিরুদ্ধে মুখ খোলার কি পরিণতি হতে পারে।তাইআমি সেরকম কিছু করিনি।শুধু ওঁর হাঁটার সময় পা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।ক্লাস চলাকালীন। উনি আরেকটু হলে মুখ থুবড়ে পড়তেন।কোনোমতে সামলে নেন।তারপর খুবই দুঃখিত মুখে প্রণামের চুক্কি,উনিই হাত দেখিয়ে আমাকে প্রণাম করতে বারণ করেন।আমার পক্ষে নিঃশব্দে যতটুকু প্রতিবাদ সম্ভব করতে ছাড়িনি।যেমন,ওর সাথে সব ছাত্রছাত্রীদের ছবি তোলার দিন ক্লাস করে ঠিক ছবি তোলার সময়ের আগে কেটে পড়া।যেমন উনি বার বার ডাকা সত্ত্বেও ওঁর কেবিনটাকে বয়কট করা,যেমন শেষবারের মত যেদিন আমাদের ক্লাসমেটরা ওঁর সাথে দেখা করতে যায় সেদিন অনুপস্হিত থাকা।ওঁর জন্য কেনা গিফটের চাঁদায় কন্ট্রিবিউট না করা।পলিটিকাল ইকোনমি ক্লাসের তরফ থেকে শুধু শম্পা ম্যাডামকে আলাদা করে উপহার দেওয়া।অবশ্য আমার আগে অপর্ণাই কাজলবাবুকে গিফট দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি তোলায় আমার পক্ষে কাজটা সহজ হয়ে যায়।তবে একটা বার্তা দেওয়ার ইচ্ছা ছিল।ক্লাসরুমে, করিডরে এমনকি খাতা দেখার সময় পর্যন্ত কাজলবাবু যদি ছাত্রদের মধ্যে বিভেদ করেন আমি আমার সীমিত ক্ষমতা দিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে সাধ্যমত সেটা করব না কেন!


কাজলবাবু চেয়েছিলেন আমার নিষ্পৃহতাকে ভাঙতে, কাজলবাবু চেয়েছিলেন কোথাও একটা অন্তত আমার প্রথম হতে।একদিক দিয়ে দেখতে গেলে কিন্তু ভদ্রলোক সফল হয়েছেন।আমি ওঁর প্রতি এখন নিষ্পৃহ নই।ওঁকে ঘৃণা করি,এবং সেই দিক দিয়ে দেখলে আপাতত আমার অপছন্দের তালিকায় প্রথম নামটাই ওঁর। ইন প্রেইজ অফ লাভ,পরপর দুদিন বাংলা ও সংস্কৃতে ওঁর আমাকে দিয়ে উচ্চারণ করানো বিয়ের শপথ,গৃহস্হালীর ফিউডাল গঠন বোঝাতে গিয়ে আমাকে নিজের স্ত্রী ধরে নিয়ে উদাহরণ দেওয়া-এত কিছুর পরেও প্রেমটা আমার কাছে অবাস্তব একটা বিবর্ণ শব্দ ছিল।আমাকে হাউজহোল্ড নিয়ে কাজলবাবু যে টার্ম পেপারটা করতে দিয়েছিলেন,তাতে প্রেমের ব্যাখ্যা লেখার সময় আমি পরোক্ষভাবে আমার প্রত্যাখ্যান জানিয়ে দিই।ফোর্থ সেমিস্টারের ঐ দিনগুলো থেকে শুরু করে আজকের কলম ধরার দিন-ডঃ ভট্টাচার্যের ছবিটা আমার কাছে একরকম থেকে গেছে।ঔশউইতজের বাচ্চাদের ব্যারাক,তাদের 'মেইনে কিন্ডে' সম্বোধন করা নম্রভাষী ডাঃ মেঙ্গেলে।বেশীর ভাগ বাচ্চার চোখে তিনি দেবদূত,ফাদার ফিগার।কিন্তু ইভা নামের দশ বছরের বাচ্চা মেয়েটা ঐ দিনেও দেবদূতের ছদ্মবেশে লুকোনো বিকৃতমস্তিষ্ক দানবটাকে চিনতে পেরেছিল।ঐটুকু বয়সেও সে বুঝতে পারছিল লোকটা খারাপ লোক।এবং ক্ষতিকারক।হাত পা বাঁধা অসহায় অবস্হাতেও সে ঘেন্না করত জোসেফ মেঙ্গেলেকে।ঠিক যেভাবে আমি ডঃ ভট্টাচার্যকে।
কিন্তু মেঙ্গেলে তার বেছে নেওয়া আদর্শের পথে চলছিল।সেটা ন্যায়সঙ্গত হোক বা না হোক।ডঃ ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রটা তো ঠিক সেরকম নয়।যে লোকটা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর থিওরি পড়াচ্ছে-স্কুল,কলেজ,আদালত, ক্লাসরুম সবজায়গায় ডেমোক্রেসির অভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে;পিতৃতন্ত্র,সামন্ততন্ত্র, ধনতন্ত্র-যে সমস্ত সিস্টেম কোনো এক অপরকে শোষণ করে বেঁচে রয়েছে সেই সিস্টেমের সেন্ট্রিস্ট কাঠামোটা ভাঙতে শেখাচ্ছে সে কি করে…..আমি অবাক হয়ে ভাবতাম একটা মানুষের পক্ষে কিভাবে এতটা দ্বিচারিতা সম্ভব!যে আমাদের বারবার বলত আর্মচেয়ার বিপ্লবী বলে কিছু হয় না,যাপনেই মতাদর্শ – সে কিভাবে নিজে এইভাবে তত্ত্বের নব্বই ডিগ্রী বিপরীতে আচরণ করতে পারে!
আমি কাজল ভট্টাচার্যকে ঘৃণা করি।ওকে মানে প্রাণে পথে বসাতে চাই।আমার হৃদপিণ্ডের অন্তঃস্হল থেকে চাই ওর সর্বনাশ হোক।চাই আমি একদিন টেবিলের এপারে থাকি ক্ষমতার কুর্সিতে,আর ও সম্ভ্রমভরে নতমুখে আমার সামনে টেবিলের উলটো দিকে দাঁড়াতে বাধ্য হোক।হয়ত সবই জলের আলপনা,তাও কাজলবাবুর বয়স্ক মানুষ,অস্তাচলের সূর্য-আর আমার সারাটা জীবন পড়ে।পৃথিবীর কোনো অংশে একজন তোমার জন্য পূর্ণ বিষের থলি গচ্ছিত রেখে বসে রয়েছে।খেলার ও ক্ষমতার নেশায় আকছার মানুষ সেটা ভুলে যায়।সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাণ্ডারী এস ডি বলেছিলেন।বিষয়টা আমার কাছে শুধু ব্যক্তিগত প্রতিশোধের নয়,বিষয়টা আদর্শেরও।কাজলবাবুই তো আমাদের অ্যান্টোনিও গ্রামশির পথে চলতে শিখিয়েছেন।


যদি সব কিছু অপরিবর্তিত থাকত,তারপরেও কাজলবাবু এরকম নিকৃষ্ট চরিত্রের মানুষ না হতেন,এমনকি যদি সত্যিই আমার প্রেমেও পড়তেন তাহলে আমি তাঁকে ঘেন্না করতাম না।রেসিপ্রোকেট করার প্রশ্নই ওঠে না,কিন্তু তাঁকে বা তাঁর প্রেমকে শ্রদ্ধা করতাম।দূর থেকেই।কিন্তু নার্সিসিস্টরা প্রেমে পড়ে না।তিনি আমাকে মাংসপিণ্ড ছাড়া কিছুই ভাবেননি।তাই তাঁকে তাঁর জায়গাটা দেখিয়ে দেওয়া খুব প্রয়োজন ছিল।সব মেয়ে অপর্ণা হয় না।
একজন নার্সিসিস্ট আপনাকে কখনও হারাতে চাইবে না।কাজলবাবু আমাকে বিভিন্ন উৎপাত করলেও আমার প্রতি তাঁর বিদ্বেষটা সাধারণভাবে আমরা বিদ্বেষ বলতে যা বুঝি তার থেকে আলাদা ছিল।বিদ্বেষ সাধারণ ভাবে বিকর্ষণ তৈরী করে,ওঁর বিদ্বেষটা আকর্ষণমূলক ছিল।উনি চাননি আমি ওঁর থেকে দূরে সরে যাই।কিন্তু চিরাচরিত একজন নার্সিসিস্টের মতই উনি আমার সাথে কোনোরকম বন্ডিং তৈরী হওয়ার ব্যাপারে ভীত ছিলেন।আমি লিখে দিতে পারি এত দিন বাদেও উনি মাঝে মাঝে আমাকে মিস করেন।কিন্তু সেটা ব্যক্তি আমাকে নয়।আমার উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণকে, তাঁর কারণে তৈরী হওয়া আমার মানসিক অস্হিরতাকে-যেটা তাঁকে সেডিস্ট আনন্দ দিত।যে কোনো নার্সিসিস্টের মতই উনি চেয়েছিলেন আমার সাথে ওঁর যোগাযোগ থাকুক।ওঁর শেষ ইমেলেও সেই ইঙ্গিত ছিল,যাতে আমি পরে একবার মেল করি।এই যোগাযোগটা ধরে রাখার জন্য একজন নার্সিসিস্ট প্রচুর ধৈর্যের পরিচয় দিতে পারে।আপনি তাকে যেভাবে দেখতে চান সে সেভাবেই আপনার সামনে নিজেকে প্রেজেন্ট করবে।দরকার মত পিতৃসুলভ স্নেহের প্রতিমূর্তি বা নিবেদিতপ্রাণ প্রেমিক।তারপর কোনোভাবে একবার আপনাকে হাতের মধ্যে নেওয়ার অপেক্ষা।ওরা চায় যখন ওরা আপনাকে ছেড়ে যাবে তখন আপনি মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ুন।ওরা চায় সারাজীবন ওদের দেওয়া আঘাতের মাধ্যমে আপনি ওদের মনে রাখুন।ওরা বিস্মৃত হতে চায় না।
প্রেমের বিপরীত অনুভূতি আর যাই হোক ঘৃণা নয়।নিষ্পৃহতা।আমার এখানেই নিজের অক্ষমতার উপর রাগ হয়।কাজলবাবুকে ঘৃণা করার জন্য।আমার প্রতি তাঁর অকারণ ঘৃণায় বিনিময়ে আমিও তাঁকে ঘৃণা ফিরিয়ে দিয়েছি।এখনও ঘৃণা করে যাচ্ছি।এই জাতীয় অনুভূতি নিজের পক্ষেই ক্ষতিকারক।বিদ্বেষ নিজের চেয়ে বেশী আর কাকে দগ্ধ করে!তাছাড়া ঘৃণা মানেও তো একরকম সম্পর্ক স্হাপন,একরকম সাড়া দেওয়া।সেটুকুও কি কাজলবাবুর বরাদ্দ হয়?
কাজলবাবু একসময় আমার প্রতি অকারণ বিদ্বেষে নিজের মানসিক স্বাস্হ্যের ক্ষতি করেছেন,হাতে ক্ষমতা ছিল বলে আমারও ক্ষতি করতে পেরেছেন।কিন্তু এখন বেশ আছেন।এখন হয়ত নতুন কোনো শিকারকে অনুসরণ করছেন,নেকড়ের মত, নিস্তব্ধ পায়ে।যা মস্তিষ্ক ক্ষয় হবার আমার হচ্ছে।ইভা মোজেস কর যদি ক্ষমা করতে পেরে থাকেন আমি কেন পারব না?তাঁর ক্ষমা করা বা না করায় মেঙ্গেলের কিছু আসে যায় নি,আমার ক্ষেত্রেও কাজলবাবুর কিছু যায় আসবে না।কিন্তু ক্ষমাটা করা দরকার নিজের মানসিক শান্তির জন্য।কিন্তু রামকৃষ্ণ বটগাছ হতে বলেছিলেন।নিজের শান্তির জন্য মোক্ষলাভের চেষ্টাকে স্বার্থপরতা বলেছিলেন।নিজের মানসিক শান্তির জন্য যদি আমি ঐ দুর্নীতিগ্রস্ত সেক্সুয়াল প্রিডেটরটাকে ক্ষমা করি,মানবিকতা আমাকে ক্ষমা করবে না।নারীবাদ এবং চারু মজুমদারের কাছে থাকা আমার দায়বদ্ধতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হবে আমার ক্ষমাশীলতা।কাজলবাবু তো আর নিজের নখ দাঁত ভেঙে ফেলবেন না।পরবর্তী প্রজন্মের নিগৃহীতা মেয়েদের কাছে পূর্বসূরি হিসাবে আমি কি কৈফিয়ত দেব!


আমি একা থাকতে চাই।আমি নিজেকে সেই পুরুষে পরিণত করেছি যাকে কৈশোরে আমি কামনা করতাম।তাও যদি কোনোদিন কারো সাথে সম্পর্কে জড়াই,আমার পুরুষসঙ্গীর কাছে আমার অর্থনৈতিক নির্ভরতার চাহিদা থাকবে না।আমি চাইব তার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল,হৃদয়,মস্তিষ্ক থেকে যৌনানুভূতি-সবটুকুর মালিকানা একা আমার হোক।আমি চাইব আমাদের দাম্পত্যে সে আমার সবচেয়ে কাছের কমরেড হোক। অসমতা,ঝড়,ধূমকেতু বর্জিত সম্পর্ক।একনিষ্ঠতার সম্পর্ক।আত্মরতি নয় আত্মত্যাগের প্রতিশব্দ হোক তার প্রেম।কোনো অসতর্ক ছত্রেও তার কবিতায় যেন আমি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে স্হান না পায়।আমি আইনস্টাইন বা বোধিসত্ত্বকে চাইনা।আমি মিলস অ্যান্ড বুনস রোমান্সে বিশ্বাসী নই।আমি দানব বা দেবতার বক্ষলগ্না হবার স্বপ্ন দেখি না।আমি একজন মানুষকে চাই।নারীবাদী, সাম্যবাদী হৃদয়বান একজন মানুষ।হাওয়ার্ড ফাস্টের স্পার্টাকাসের মত।অথবা অনুরাধার কোবাড ঘান্ডী।কিংবা বেলা দত্তের সরোজ।আমি সেই পুরুষকে চাই না যে আমার বিনিদ্র রাত্রির কারণ হোক,আমি তাকে চাই বিছানায় মায়ের মত আমাকে ঘুম পাড়াবে।আমি যা যা চাই,কাজলবাবু তার বিপরীত ছিলেন।কারো চোখে দেবতা,আমার চোখে দানব।আর অতিমানব বা মহাপুরুষদের প্রতি আমার অ্যালার্জি আছে।

 


উপসংহার

"আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর -
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!"
শ্রীরামচন্দ্র হাতে শুদ্রের রক্ত মাখার পরও তাঁর দেবত্বের ভাবমূর্তিতে একফোঁটা চিড় ধরে না।বরং শুদ্রের বিধবার উপর এক শ্রেণীর লোক থুতু ফেলে যায়,কারণ হাহাকারের শব্দে সে তাদের বিব্রত করার স্পর্ধা দেখিয়েছে।অযোধ্যাবাসীরা রাজতন্ত্রের ভয়ে, ভক্তিতে অথবা স্রেফ শুদ্রবিদ্বেষের কারণে শুদ্রসাধকের চিতার ধারেকাছেও ঘেঁষে না।রামচন্দ্র যুগ যুগ ধরে বিনাপ্রশ্নে পূজিত হয়ে আসেন।
অর্জুনের মান রাখতে একলব্যের বুড়ো আঙুল ছিনিয়ে নিয়েও দ্রোণকে একলব্যের প্রেতাত্মা হন্ট করে না।কারণ দ্রোণরা মানুষ নন,এবং আখেরে কৌরবের পাশেই গিয়ে দাঁড়াবেন।
তাই দ্রোণর মুখোমুখি হতে একলব্য নয়,আম্বেদকরও নন বরং প্রস্তুত হোক একটা 'হুল'।তাতে অর্জুন,দুর্যোধন সহ পান্ডব,কৌরব সব পক্ষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক(ভীম ছাড়া)।দ্রোণের মাংসের কোর্মা রান্না করে দ্রোণাশ্রু মেশানো সুরার সাথে তা একলব্যের কমরেডদের মধ্যে পরিবেশিত হোক।তখনই একলব্যের আত্মা শান্তি পাবে।
প্রত্যেকটা অফিসে, স্টুডিওয়,কারখানায়,চাষের জমিতে,ঠিকাদারের চুক্তির কর্মক্ষেত্রে,জেলখানায়,ব্রথেলে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৃষ্ণারা একলব্যের শাহাদাতের নামে হুলের সূচনা করুক।অপর্ণার মত রেনিগেডদের জন্যও দরজা খোলা রইল।কারণ তৃষ্ণারা কমরেডশিপে বিশ্বাস রাখে।তৃষ্ণারা বিশ্বাস করে যে মার্শাল চুতে একদিন প্রতিক্রিয়াশীলদের দালাল থেকে বিপ্লবীতে পরিণত হবেন।
*পুনশ্চ:এটা একটা কাল্পনিক ঘটনা।মার্ক্সবাদ, আলথুজার, হলোকাস্ট আর চারু মজুমদার বাদে আর সব কিছু কাল্পনিক। তৃষ্ণা কাল্পনিক,কাজলবাবুর চরিত্র এতটাই দেবত্বপ্রাপ্ত যে তাঁকে দেখলেও কাল্পনিক বলেই ভ্রম হয়।তৃষ্ণার অভিযোগগুলোও কাল্পনিক।শুধু একটাই কথা,কাজলবাবুর মেয়ের সাথেও এই কাল্পনিক ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি হোক।কাজলবাবু তৃষ্ণার সাথে যা করেছেন সেটা অন্য কোন ক্ষমতাশালী বৃদ্ধের কাছ থেকে তাঁর মেয়েরও পাওনা হোক।যদি তৃষ্ণার অভিযোগগুলো মিথ্যে হয়,তাহলে তো মিটেই গেল।যদি মিথ্যে না হয় তাহলে কাজলবাবু বুঝুন নারীমাংস খাদ্য নয়।এক্স এক্স ক্রোমোজোমের মানুষের চোখের জল মানেই পানীয় নয়।

(সমাপ্ত)

 

****সব চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক।কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হেয় করার উদ্দেশ্যে গল্পটি লেখা হয়নি।যদি কোনো জীবিত বা মৃত ব্যাক্তির সাথে মিল পাওয়া যায় তা নেহাতই কাকতালীয়।

দ্রোণাচার্য্য ৩
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments