ভূমিকা

ক্ষমতার নাম স্হান, কাল, পাত্র ভেদে ভিন্নতর হয়।হয়ত তার চরিত্রও এক থাকে না।কিন্তু একটা জায়গায় সে তার মৌলিকতা বজায় রাখে।তা হল কার্টেজিয় ডুয়ালিস্ট গঠন।যা আসলে নামে ডুয়ালিস্ট হলেও আখেরে মনিস্ট।যেখানে সেল্ফের চশমার কাচে আদারকে দেখা হয় এক অপেক্ষাকৃত নিম্নতর,ইতরতর দ্বিতীয় শ্রেণীর সত্ত্বা হিসাবে।এই ক্ষমতার নাম কখনও ব্রাহ্মণ্যবাদ,কখনও পুঁজিবাদ,কখনও পিতৃতন্ত্র আবার কখনও বা নিছক এলিটিজম অথবা ব্যক্তিগত পর্যায়ে যা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর-সেই ম্যাল-অ্যাডাপটিভ নার্সিসিজম।

 

পর্ব ১

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দ্রুত পদে হেঁটে চলেছেন দ্বিজশ্রেষ্ঠ দ্রোণ।শ্বেতাম্বর প্রৌঢ়ের শরীরের গড়ন অস্বাভাবিক শীর্ণ ও মধ্যভাগে ঈষৎ বঙ্কিম।অক্ষিদ্বয় বৃহৎ ও গোলাকার।অচ্ছৎপটলে গঞ্জিকাসক্তসুলভ কিঞ্চিৎ রক্তিমাভা।চলার ভঙ্গিমা ঋজু নয়।কিন্তু শরীরের তপ্তকাঞ্চন বর্ণ তাঁর আর্যত্বের সাক্ষর বহন করছে।দর্পিত মুখে ব্রহ্মতেজের দীপ্তি বর্তমান।
       আজ কিন্তু ব্রাহ্মণের মন কিঞ্চিত বিক্ষিপ্ত।আজ প্রিয় শিষ্য অর্জুন তাঁকে অভিযোগ করেছে তিনি তাকে শব্দভেদী বাণের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রেখে কোনো এক শূদ্রকে সেই শিক্ষায় সমৃদ্ধ করছেন।ধৃতরাষ্ট্রের উপর দুর্যোধনকে নিয়ে যে স্নেহান্ধ পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আকছার ওঠে,সেটা দ্রোণের ক্ষেত্রেও অর্জুনের বিষয়ে খুবই সত্য।কিন্তু দ্রোণ তাঁর সুমিষ্ট ও ভদ্র মুখোশের আড়ালে অনেক কিছু সহজে গোপন রাখতে পারেন,যা নৃপতি হয়েও ধৃতরাষ্ট্র পারেন না।কে এই শূদ্র তরুণ যে অর্জুনের অহং এ আঘাত দিয়েছে!দ্রোণ ছাড়া যে বিদ্যা ক্ষত্রিয়কূলেও কারও নাগালে আসে না,এই শূদ্র তরুণ তা রপ্ত করল কিভাবে!
       একটা সারমেয় অনেকক্ষণ ধরে চিৎকার করছে।আচার্যের চিন্তাজাল মাঝে মাঝেই ছিন্ন হচ্ছিল এই শব্দদূষণে।একটা সময় খুব বিরক্ত হয়ে কুকুরটার দিকে তাকালেন আচার্য।তখনই আচমকা তাঁর নিজেকে জীবাশ্ম মনে হল।সাতটি শর নিঃশব্দে কোথা থেকে ছুটে এসে চতুষ্পদ প্রাণীটির কণ্ঠরুদ্ধ করল।সামনে তাকিয়ে দেখতে পেলেন এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণকে।যে বাণ নিক্ষেপ করার সময় লক্ষ্যের দিকে না তাকিয়েই লক্ষ্য ভেদ করেছে। 
         একবিংশ শতকের এক মিলেনিয়াল বিস্ময়বিমূঢ় চোখে এই মহাকাব্যীয় দৃশ্যপট অবলোকন করছে।মহাকাব্যের চরিত্ররা কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছেন না।কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের মুখের যৌবনের দীপ্তি,গৌরবর্ণ বৃদ্ধের মুখে ফুটে ওঠা ব্রহ্মতেজ – সবকিছু কি মহাকাব্যীয় ভাবে দৃষ্টিনন্দক।
          একলব্য দ্বিজশ্রেষ্ঠকে দেখে আপ্লুত হয়ে এসে তাঁর পদধূলি গ্রহণ করলেন।আচার্যের ললাটে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।তাঁর মুখের অভিব্যক্তি দুর্বোধ্য। গম্ভীর স্বরে বললেন,"কার কাছে শিখলে এই বিদ্যা?তোমার অস্ত্রগুরু কে?"
একলব্য ধন্য অনুভব করলেন।আজ পর্যন্ত যাঁকে ধ্যান করেছেন দেবমূর্তির মত,সেই আচার্য আজ সামনে।তাঁকে সম্বোধন করে কথা বলছেন,তাঁর চোখে চোখ রেখে।কৃতার্থ গলায় একলব্য বললেন,"হে আচার্য,আপনি আমার অনুপ্রেরণা।আপনার মূর্তিকে সামনে রেখেই অভ্যাস করেছি।"
দ্রোণর আয়তচোখে শীতল কুটিলতার ছাপ পড়েই মিলিয়ে গেল।তিনি নিজের মনের ছাপ মুখে পড়তে দেন না।ওষ্ঠাধরে স্মিত হাসি ফুটিয়ে বললেন,"তাহলে তো আমার একটা গুরুদক্ষিণা প্রাপ্য হয় বৎস্য।"
-"আদেশ করুন আচার্য। "নতমুখে বললেন একলব্য।

দ্রোণাচার্য কিছুক্ষণ পর তাঁর গুরুদক্ষিণা গ্রহণ করে স্হানত্যাগ করলেন।পিছনে পড়ে থাকা শারীরিক ও মানসিক ভাবে রক্তাক্ত তরুণের দিকে ফিরেও দেখলেন না।এই তরুণটি কিন্তু অশ্বথ্বামার সমবয়স্ক,যে অশ্বথ্বামাকে রাজপুত্ররা সামান্য বিদ্রূপ করায় তিনি ক্রোধাগ্নি সংবরণ করতে পারেননি।তবে ব্রাহ্মণসন্তানের সাথে কি আর মানবেতর শূদ্রসন্তানের তুলনা হয়!
       ঠিক তখন ২০১৬ র সেই নীরব দর্শক তরুণী মহাকাব্যে উপেক্ষিত একলব্যের কাছে এগিয়ে এল।তারপর একলব্যকে বুকে টেনে নিল।পৃথিবীর উষ্ণতম বন্ধুত্বের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বলল,"কমরেড।"
        এই আলিঙ্গন নারীপুরুষের প্রেমস্পর্শ বা যৌনগন্ধী আলিঙ্গন নয়।এই আলিঙ্গন কমরেডশিপের আলিঙ্গন,এই আলিঙ্গন ভাইকে ভগিনীর সমানুভূতি জানানোর আলিঙ্গন।তরুণীটি একলব্যকে বলল,"ক্ষমতার অলিন্দের মানুষরা সাব অল্টার্নের আপন হয় না কমরেড।নিজের রক্ত যদি ঝরাতেই হয় ওদের হয়ে নয়,ওদের সিংহাসন থেকে টেনে নামানোর প্রতিরোধ গড়ে তুলে ঝরাও।আজ তোমার রক্তের নামে শপথ রইল,দ্রোণাচার্যকে তোমার প্রতিটা রক্তবিন্দুর মূল্য শোধ করতেই হবে।"

 

 

পর্ব ২
কাজল ভট্টাচার্যের কথা

বিষয়টা পুরোটাই একটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল।মানে আমার জীবনশৈলী বা সামাজিক অবস্হান যা তাতে এটা কোনো ভাবেই হবার ছিল না।তবে এই ধরণের ঘটনা কবেই বা নিয়ম মেনে ঘটে।
     ওকে প্রথম কবে দেখেছি আমার মনে নেই।সেকেন্ড সেমেস্টার পর্যন্ত ক্লাসে প্রায় দুশো'র কাছাকাছি স্টুডেন্ট থাকায় আলাদা করে কাউকে লক্ষ করা কঠিন।একদিন গ্যালারি থেকে একটা সুন্দরী মেয়ে আমাকে র‍্যাশনাল এক্সপেকটেশন নিয়ে একটা প্রশ্ন করেছিল।উঠে দাঁড়ানোর সময় তাকে দেখেছিলাম,কালো জামা,সবুজ স্কার্ট আর ঈষৎ লালচে খোলা চুলের একটা গমরঙা সুন্দর মেয়ে।ওটা কি ও ছিল!হতে পারে।মোট কথা সেভাবে দাগ কাটার মত কিছু ঘটেনি।ওকে কাছ থেকে প্রথম দেখি পলিটিকাল ইকোনমির ক্লাসের দিন।চোখে পড়তেই হত কারণ মাত্র তিনটে স্টুডেন্ট ছিল,অপর্ণা, ও আর একটা ছেলে,বোধহয় বিষ্ণু নাম।খুব ব্রিলিয়ান্ট না হলে বা উল্লেখযোগ্য গোলমাল না করলে ছেলেদের কথা আমার বড় একটা মনে থাকে না।ওকে দেখতে ছিল অনেকটা স্কুলের মেয়েদের মত। মিজেট।ছোটখাট চেহারা,হাইট পাঁচ দুই এর বেশী কোনভাবেই হবে না।গায়ের রঙ উজ্জ্বল গমের মত।মুখটা মাঝে মাঝে বেশ গোলাপি দেখাত।মানে কোন কারণে ও এমব্যারাসড বা অপমানিত বোধ করলে।আর এটা দেখার জন্যই আমার ওকে অস্বস্তিতে ফেলতে বেশ ভাল লাগত।
        রূপের নানারকম উপমা ব্যবহার করা হয়।চোখ ধাঁধানো,চুম্বক,চোখ ফেরানো যায় না-ইত্যাদি ইত্যাদি।যাই হোক একই রূপকে কে কিভাবে দেখবে এটা সাবজেক্টিভ।আমার মতটা বলি।ওর ক্ষেত্রে ওর রূপটা ছিল ঠিক ওর নামের বিপরীত।একটা মানুষ যে শুধু চেরাপুঞ্জির হাজার বছরের বর্ষার সমষ্টিতে তৈরী হয়েছে।বা প্রাচীন ভারতের অজানা কোনো গহন মন্দিরের সবচেয়ে বিষাদগ্রস্তা দেবদাসীর চোখের জল দিয়ে।ওর নাম ছিল তৃষ্ণা,তৃষ্ণা চ্যাটার্জী।পৃথিবীর বুকের স্নিগ্ধতম আগুন।শুধু কি পৃথিবীর বুকেরই!
      কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা হবার কথা ছিল না।ঐ মেয়েটা,চিরাচরিত বাংলা মাধ্যমের মেয়েগুলো যেমন হয় আর কি!ইংরাজীর উচ্চারণ ক্ষেত্রবিশেষে বেশ পূর্ববঙ্গীয়দের মত,এমনকি দু একবার বানান পর্যন্ত ভুল করতে দেখা গেছে।যেমন এম ফিল বানানে দুটো এল ব্যবহার করা!তারপর ভদ্রতাবোধের চূড়ান্ত অভাব।মাঝে মাঝে ওর স্বরটা রীতিমত কন্ডেসেন্ডিং শোনাত।
ততোধিক খারাপ ড্রেস সেন্স(একটা সুন্দরী মেয়ের পোশাক দেখে যদি হাড়গিলে মূর্খ খুনী চারু মজুমদারকে মনে পড়ে তাহলে নান্দনিকতার প্রতি এর চেয়ে বড় অবিচার হয় না)এবং নিহিলিস্ট পলিটিকস তথা ফাটকা মস্তানির প্রতি বিচিত্র আকর্ষণ।ওকে ওর গুরুদেব চারু মজুমদারের মত একটা ডগম্যাটিক লেফটিস্ট ছাড়া আমার কিছুই মনে হত না।মানে খুবই গণ্ডগোলের আপ ব্রিঙ্গিং এর ফল।ওকে যারা কাছ থেকে দেখেছে তাদের একটা বিষয় ফোরকাস্ট করতে অসুবিধা হবার কথা নয়।এ মেয়ে হয় কোনো জঙ্গলে কুত্তার মত গুলি খেয়ে মারা পড়বে অথবা শেষ জীবনটা জেলে পচবে।ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।পুরোপুরি হোপলেস কেস।আসলে চ্যালারা তো গুরুর পথেই হাঁটবে।তবে ও যখন প্রথম আমার মানসিক অশান্তির কারণ হয়,তখন এত সব জানা ছিল না।


ব্যাপারটা কবে থেকে শুরু হয়েছিল ঠিক মনে নেই।এটা একটা দুর্ঘটনা।একটা ডেলিশাসলি অ্যাট্রাকটিভ দুর্ঘটনা।ও ক্লাসে রোজ একটা ট্যাব বা কিন্ডল গোছের কিছু নিয়ে আসত।তাতে সিলেবাস এবং রেফারেন্স বইয়ের সফট কপি থাকত।ঐ ট্যাব থেকে আমাকে একটা বই দেখাচ্ছিল।এত দ্রুত পাতাগুলো সরিয়ে দিচ্ছিল যে ভারি পাওয়ারের চশমায় আমার দেখতে অসুবিধা হচ্ছিল।আমাকে চশমাটা খুলে ওর কাঁধের উপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখতে হচ্ছিল।ও বসে ছিল বেঞ্চে,আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।হঠাৎ করে একটা মেয়ের বয়সী ছাত্রীর সাথে এতটা নৈকট্য অস্বস্তিকর।তার উপর আমাকে ঝুঁকে থাকতে দেখেই বোধহয় ও একটু গুটিয়ে সরে যাচ্ছিল।এটা নিয়ে আমার দীর্ঘদিন অস্বস্তি ছিল।ও কি মনে করে আমাকে?আমি একটা পারভার্ট?ইচ্ছা করে ওর শরীর ছোঁয়ার চেষ্টা করছি?আমার অাভিজাত্যের সঙ্গে হয়ত চিন্তাটা মানানসই নয়,তাও আমি জানি ডিপার্টমেন্টের প্রচুর ছাত্রী আমার একটু প্রশ্রয় পেলে ধন্য হয়ে যায়।সেখানে ও?পড়াশোনায় এমন কিছু নয়।তেমন আহামরি সুন্দরীও নয়।আমার টেস্ট এত নিম্মস্তরের নয়।ওকেও তাই প্রতিদিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিই অপর্ণাকে আমি সবচেয়ে বেশী পছন্দ করি।একই প্রশ্নের উত্তর অপর্ণার থেকে পেলে প্রশংসা আর ওর ক্ষেত্রে না শোনার ভান।তাছাড়া পলিটিকাল ইকোনমির ক্লাসে অন্তত গোটা থার্ড সেমিস্টারটা আমি ওর অস্তিত্বটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করতাম।কে না জানে অবজ্ঞাও একটা বার্তা।তার জন্য আলাদা করে রূঢ় হবার দরকার হয় না।কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওর প্রতি আমার এই নিষ্পৃহতাটার বিষয়ে আবার ও চরম নিষ্পৃহ ছিল।অবশ্য জানি না ওটা অভিনয় ছিল কিনা!
     পড়াশোনার কথা বলতে গেলে অ্যাকাডেমিক রেকর্ড তৃষ্ণার সবচেয়ে ভাল,তবে এই ক্লাসে তিনজনেই ভাল পড়াশোনা করে।যাই হোক,বিষ্ণু কি করল সেটা প্রাসঙ্গিক নয়।
কোথায় যেন একটা চাপা উন্নাসিকতা রয়েছে তৃষ্ণার মধ্যে।আমার কেবিনে কখনও এলে আমাকে একটা বাড়তি কথা বলতে দেয় না।যান্ত্রিক ভাবে কাজের কথাটুকু বলেই একটা যাই যাই ভাব।যেন কত ব্যস্ত।ঠিক আছে,কুকুরের ঘি সহ্য হয় না।আমার হাতে দুটো পেপারের মার্কস আছে,আর এটা একটা বোকাও জানে যে মাস্টার্সের সময় নাইনথ পেপার বলে একটা জিনিস থাকে।শুধু পড়াশোনা করেই কেউ ভাল রেজাল্ট করে না।   
       ও আমাকে সবচেয়ে বেশী অফেন্ড করে বসল থার্ড সেমেস্টারের শেষ ক্লাসটার দিন।ওটা ছিল মার্কসিয়ান ইকোনমির ক্লাস।এই ক্লাসে মোট আঠেরো জন ছাত্র ছাত্রী আছে,পলিটিকাল ইকোনমি ক্লাসের মত জনশূন্য নয়।
ডিসেম্বরের ঠান্ডার মধ্যেও ও একটা পাতলা লুজ ল্যাভেন্ডার টি শার্ট পরে বসেছিল।কোন শীতবস্ত্র  নেই।রোজকার মতই এলোমেলো খোলা চুল,চেহারায় ন্যূনতম মেক আপ বা জুয়েলারির চিহ্ন মাত্র নেই।একটুকরো গোলাপি আলোর মত স্বপ্নালু দেখাচ্ছিল ওর ঢলঢলে মুখটা।ঐ ঠান্ডার মধ্যে ক্লাসের কিছু ছেলেমেয়ের প্রবল আপত্তি অগ্রাহ্য করে ও এসির টেম্পারেচারটা কমানোর চেষ্টা করছিল।ব্যাপারটা আমার চোখে পড়ায় আমি প্রশ্রয়ের হাসি হেসে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।ও আমাকে পাত্তা না দিয়ে এসি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
বাইরের কেউ শুনলে ভাববে এটা সামান্য ব্যাপার।অন্তত আমার মত বয়স্ক লোকের মাথা ঘামানোর মত কিছু নয়।কিন্তু ওর এই নীরব উন্নাসিকতাটা আমায় কাঁটা ফোটাচ্ছিল অনেকদিন ধরে।সেদিন ওটা চরমে পৌঁছে গেছিল।এত স্পর্ধা হয় কি করে!কি মনে করে আমাকে!আমি ওর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি?আমি ঠিক করেছিলাম ওর যোগ্যতা আমি ওকে মার্কশিটে দেখিয়ে দেব।

 

 

পর্ব ৩
তৃষ্ণার কথা

Deification একটা অস্বাস্থ্যকর ঘটনা।যেই মুহূর্তে একটা মানুষের দেবত্ব সামাজিক ভাবে তৈরী হয়,ধূপের ধোঁয়ার আড়ালে চাপা পড়ে যায় একটা অপ্রেশনের ইতিহাস।এই ইতিহাস শুধু চাবুক হাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তৈরী করে না,বা রাষ্ট্রশক্তি তৈরী করে না।এই ইতিহাস তৈরী হতে পারে যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে,যে কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে।এমনকি যদি ঐ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চলতি সিস্টেমের বিরুদ্ধে সরবে বিদ্রোহী হয়,তাও।
প্রায় একবছর হতে চলল,ঘটনাটার কথা আমি দু একজন বিশেষ কারোর সাথে শেয়ার করে উঠতে পারিনি।এ প্রসঙ্গে নাৎসি চিকিৎসক ডাঃ মেঙ্গেলের একটা কথা খুব প্রাসঙ্গিক, "The more we do to you,the less you seem to believe we are doing it."

খুব স্নেহপ্রবণ ফাদারলি একজন অধ্যাপকের মুখোশের আড়ালে একজন নার্সিসিস্ট লুকিয়ে থাকতে পারে।তারা ভদ্রতা ও আভিজাত্যের মূর্ত প্রতীক হতে পারে,তারা জ্ঞানী ও প্রতিভাবান হতে পারে।কোনো প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেয়েরা তার পায়ের নীচে নিজের হৃদয় বন্ধক দিয়ে বসে থাকতে পারে।কিন্তু তাতেও তার ভিতরের জম্বিটা মরে যায় না।একজন নার্সিসিস্ট আসলে একটা মুখোশ,এবং এই মুখোশের আড়ালে কারোরই অস্তিত্ব নেই।একটা মানুষ চোখের সামনে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে,কিন্তু আসলে সে নেই।যেটা আমরা দেখছি সেটা একটা মরীচিকা মাত্র।এই চিন্তাটাই কিরকম মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে বরফের স্রোত নামিয়ে দেবার মত নয়?

আবার ভয়টা উলটো দিকেও কাজ করে।ওদের এই নেতিবাচক উপস্হিতিকে কেউ পড়ে ফেলল কিনা এটা নিয়ে ওরা সবসময় সন্ত্রস্ত থাকে।শেষের দিকে কাজলবাবুকে হয়ত এই কারণেই আমার চোখের দিকে সোজা তাকাতে বেশ পরিশ্রম করতে হত।

     কে বিশ্বাস করবে আমার কথা?যখন হাওয়ার মত ঘটনাপ্রবাহে ভেসে যাচ্ছিলাম,তখন আমি নিজেও কি বিশ্বাস করতে পারছিলাম এটা হতে পারে!বারবার এটা মনের ভুল ভেবে নিজেকে স্তোক দেবার চেষ্টা করেছি,পরমুহূর্তেই ঐ লোকটা আবার একটা ধূমকেতুর মত আমার রাস্তা আড়াল করে দাঁড়িয়েছে।
পরিচিতি,খ্যাতি,ক্ষমতা সব ঐ লোকটার হাতে।এমনকি আমার বন্ধুদের থেকেও আমি সমর্থন পাওয়ার বিশেষ আশা রাখি না।পেয়ে গেলে সেটা বাড়তি পাওনা।একজন সুপ্রতিষ্ঠিত,অভিজাত,বিদেশী ডিগ্রীধারী অধ্যাপক।ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয়।আমাদের মত ছেলেমেয়েদের চোখে প্রায় দেবত্বপ্রাপ্ত একটা ফিগার।ক্রাসাস কি কখনও হাওয়ার্ড ফার্স্টের ভেরিনিয়াদের নিয়ে ভাবার অবকাশ পেতে পারেন!
লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে কেন মুচকি মুচকি হাসছিল আমি তখন বুঝতে পারিনি।লোকটার কি সত্যিই মাথায় ছিট আছে।আমি ভাবলাম বোধহয় আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে না।ও আমার সাথে তখনও পর্যন্ত কোনদিন অভদ্র ব্যবহার করেছে বললে মিথ্যে বলা হবে,তবে কাজের বাইরে কখনই কথা বলত না।যদিও মার্ক্সিয়ান ইকোনমি বা পল ইকোর অন্য ছাত্রছাত্রীদের বেশ ছোটখাট ইয়ার্কি করার মত সদ্ভাব ছিল।আমি সেটা লক্ষ করলেও তখন পর্যন্ত তেমন তলিয়ে ভাবিনি।তাই ভেবেছিলাম বোধহয় কোনো কারণে পিছনের বেঞ্চের কাউকে দেখে হাসছে।মোট কথা হাসিটা রেসিপ্রোকেট করার কোনো কারণ দেখিনি।অনেক পরে বুঝেছিলাম লোকটা আমার একটু অ্যাটেনশনের জন্য পাগল ছিল।
      সত্যি কথা বলতে কুত্তাঞ্জনকে প্রথম থেকে আমি বিশেষ পছন্দ করতাম না ঠিকই,তবে এতটা ঘেন্নাও করতাম না যতটা এখন করি।বরং আগে অপছন্দ করলেও থার্ড সেমের সময় বেশ পছন্দই করতাম।কুত্তাঞ্জন নামটাও অনেক পরে দেওয়া।নামটা ওকে একবার জানানো গেলে চমৎকার হত।
     ওকে প্রথমদিকে অপছন্দ করার কারণ ছিল ওর ফিউডাল মানসিকতা। এবং কিছু ন্যাকামো।যেমন একদিন ক্লাসে একটা অঙ্ক দেওয়ার পর সবাই কথা বলতে থাকায় রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে আসা এবং তারপর ক্লাস রেপ্রেজেন্টেটিভরা 'মান ভাঙাতে' ওর কেবিনে গেলে "আমি কোনদিন তোমাদের সাথে কথা বলব না।" বলে ওদের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া।কিরকম সুয়োরানীর গোঁসাঘরে খিল দেওয়ার মত ব্যাপার না?
      তারপর একদিন ক্লাসে একটা বাল্ব খারাপ হয়ে যাওয়ায় একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীকে ডেকে বলা,"এইচ ও ডি কে এখানে আসতে বল।বলবে আমি ডেকেছি।"যদিও শেষ পর্যন্ত এইচ ও ডি স্যর আসেননি।দৈর্ঘ্যে ও প্রস্হে তাঁর অর্ধেক একজন ইলেকট্রিশিয়ানকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।কুত্তাঞ্জন বেশ বিব্রত হয়ে পড়েছিল আমাদের সামনে।অথচ এই লোকটাই আবার থার্ড ও ফোর্থ সেমে মার্ক্সবাদ পড়ায়।নিজের চা'টা পর্যন্ত আনায় ছাত্রদের দিয়ে,এঁটো ফাঁকা গ্লাসটাও তাদের হাতে করে নীচে পৌঁছে দিতে হয়।এই দ্বিচারিতাগুলোর কারণেই লোকটাকে ভাল লাগত না।আসলে মানুষকে ছোট করে কিছু লোক একটা বিচিত্র আনন্দ পায়।সম্মানবোধটা কি এতটাই ঠুনকো যে সেটা অন্যকে খাটো করার উপর দাঁড়িয়ে থাকে!

একজন কোভার্ট ম্যাল-অ্যাডাপটিভ নার্সিসিস্টের যা যা লক্ষণ দেখা যায় তার অন্তত পঁচাশি ভাগ তাঁর মধ্যে উপস্হিত ছিল।এই ক্যাটিগরির একজন নার্সিসিস্টের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল ছদ্মবেশ।কাজলবাবুর ইন্টেলেক্ট,উইট,আপাত নিশ্ছিদ্র আত্মবিশ্বাস, নিজের অ্যাপিয়ারেন্সের বিষয়ে অতিরিক্ত সচেতনতা যেটা ডাঃ মেঙ্গেলেকে মনে করায়…..অতুলনীয় মানে সত্যিই অতুলনীয় পড়ানো-মানে পুরোটা মিলিয়ে একটা আপাত সৌম্য এবং চার্মিং ব্যক্তিত্বের মুখোশ যা সামনের মানুষটার মনে সম্ভ্রম তৈরী করবে।
আবার সেই সাথে আত্মকেন্দ্রিকতা, অতিরিক্ত মাত্রায় ভাবমূর্তির ব্যাপারে সচেতনতা,অন্যদের নিজের অধস্তন ভাবার প্রবণতা(সে কোলিগ হোক বা ছাত্রছাত্রী), কর্তৃত্বপরায়ণতা-যেগুলো একরকম সাম্যবাদী পরিবেশে বড় হবার কারণে আমার খুব দৃষ্টিকটূ ভাবে চোখে পড়ত।তবে দাড়িবুড়ো আর বাহাত্তরে খুন হওয়া সেই প্রশ্ন করতে শেখানো হেঁপো রুগীকে যদি মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে পেনিট্রেট করতে না দেওয়া হয় তবে এই ব্যাপারগুলো চার্মের আড়ালে ঢাকা থাকবে।অবশ্য ততক্ষণই যতক্ষণ না সামনের মানুষটা ওঁর চোখে পড়ছে এবং মাথায় গেঁথে যাচ্ছে।যদি সেটা না হয় তবে ভদ্রলোক আপনার চোখে মাস্টারদা সূর্য সেন হয়ে থেকে যাবেন সারাজীবন। কিন্তু সবসময় ভাগ্য এতটা সদয় হয় না।কেউ কেউ ওঁর মস্তিষ্কে গেঁথেও যেতে পারে।আমার চোখেও একদিন উনি সূর্য সেন ছিলেন।
       ঐ কারনেই একজন কোভার্ট নার্সিসিস্ট তার ওভার্ট কাউন্টারপার্টের তুলনায় বেশী বিপজ্জনক।দুপ্রকারই মারাত্মক এক্সপ্লয়টেটিভ,কিন্তু একজন কোভার্ট নার্সিসিস্টকে চেনা যায় না।এরা খুব সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর ভাবে তোমার মানসিক স্বাস্হ্যের ক্ষতি করবে।আপাতদৃষ্টিতে একজন কোভার্ট নার্সিসিস্ট অত্যন্ত ভদ্র ও সংবেদনশীল মানুষ হিসাবে প্রতিভাত হবে,কিন্তু তার সরীসৃপের মত শীতল সত্ত্বাটা একমাত্র ভিক্টিম উপলব্ধি করবে।এরা পছন্দের ভিক্টিমকে নিয়ন্ত্রণ করতে দরকার মত স্নেহ ও আবেগের মিসাইল প্রয়োগ করবে।কাজলবাবু কোভার্ট নার্সিসিস্ট ছিলেন,খুব সুন্দর শান্ত গ্রীনারির আড়ালে লুকোনো বিষধর সাপের মত।

 

 

পর্ব ৪
কাজল ভট্টাচার্যের কথা

পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিন মার্ক্স ও পল ইকোর  ছাত্রছাত্রীদের ইন্টারনালের পেপার জমা দিতে আসার কথা ছিল।এই দিনটা আমি ইচ্ছা করে ওদের আসতে বলেও গেলাম না।ওরা জমা দিতে এসে ফিরে যাবে।কাউকে ফিরিয়ে দেবার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ আছে।এতে হুট করে কেউ তোমায় সহজলভ্য ভেবে বসবে না।আমার এই ইমেজটা একদিনে তৈরী হয়নি।এটা বিজ্ঞাপনের যুগ,লোকে তাই দেখবে তুমি যা তাদের দেখাবে।আমি কি সব্যসাচীবাবুর মত নাকি?বেশী ছাত্রদরদী হবার চেষ্টা করতে ভদ্রলোককে নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা হাসাহাসি করে।
     আচ্ছা তৃষ্ণাও নিশ্চয়ই আমার খোঁজে এসে ফিরে গেছে।তখন কি ওর একবারের জন্যও মনে হয়নি স্যর আজ এলেন না কেন!
      পরদিন দুপুরে আমি কেবিনের দরজা বন্ধ করে বসে একটা পর্ন দেখছিলাম।বাড়ীতে মেয়ের সামনে এগুলো দেখা যায় না।এটা একটা রেপ পর্ন,একটা বছর কুড়ির শ্বেতাঙ্গী মেয়েকে একটা পঞ্চাশোর্ধ প্রৌঢ় জান্তবভাবে অধিকার করছে।মেয়েটা যন্ত্রণায় ছটফট করছে,চোখ থেকে নিঃশব্দে জল পড়ছে।অথচ একফোঁটা বাধা দিচ্ছে না।দাঁতে দাঁত চেপে ওর বাহুবন্ধনে থেকে নিঃসাড়ে সহ্য করছে যৌনপ্রহার।লোকটার অবশ্য একটুও মায়া হচ্ছে না।
        মেয়েটার চুলের রঙ লালচে বাদামী,ভীষণ সুন্দর ক্রিস্টালের মত কৃষ্ণোজ্জ্বল চোখ।আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল ভাল লাগায়,একটা পাগল করা উত্তেজনায়।অস্ফুটে আমার নিজেরও অজান্তে আমি বলে উঠলাম,"তৃষ্ণা।"
উফ একবার ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার।আর কতদিন এভাবে চলবে!আমার এই মেঘটা কি কোনোদিন তৃষ্ণার মধ্যে বৃষ্টি নামাতে পারবে না!
         হঠাৎ আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল।দরজার বাইরে তৃষ্ণার গলা।ও দরজাটা ধরে বাইরে থেকে টানাটানি করছে।
আমি দ্রুত ব্রাউসার ক্লোজ করে ট্রাউজারের জিপার বন্ধ করলাম।নিজেকে সামলাতে একটু সময় লাগল।তখনই আবার ওর গলা কানে এল,কাউকে একটা বলছে,"দরজাটা খুলছে না কেন বলতো!"
দরজায় নক করার সেন্স অফ ডিসেন্সিটুকুও নেই।আমি উঠে দরজা খুলে দিলাম।
-"স্যর আমরা প্রোজেক্ট জমা দিতে এসেছি।"
ওকে দেখে আমার মুখ থেকে কোনো কথা বেরোল না।ইঙ্গিতে টেবিলটা দেখিয়ে তার উপর রাখতে বললাম।ওর পিছনে বিষ্ণুও ঘরে ঢুকল।আমি বিষ্ণুকে মধুর গলায় বললাম,"তোমার যেন কি টপিক ছিল?"
কিছুক্ষণ বিষ্ণুর সাথে কথা বললাম তারপর।তৃষ্ণা আশা নিয়ে তাকিয়েছিল ওকেও কিছু বলব।বললাম না দেখে বেরিয়ে গেল।আমার ওকে ঝুল দিয়ে একটা পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছিল।আগের দিনের নখরাটার আংশিক শোধ নেওয়া গেছে।তবে একটু হতাশও হলাম,ভেবেছিলাম ও আরেকটু বেশী সময় দাঁড়াবে।যাক গে,এখনও অনেক কিছু বাকি আছে সুইটি।জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ।

 

 

পর্ব ৫
তৃষ্ণার কথা

কাজলকে শুদ্ধ ভাষায় বলা হয় অঞ্জন।আর একজন ডগ লাভার হিসাবে বলছি আমি কুকুরকে কুত্তা মনে করি না।কুকুর মানুষের থেকে অনেক ভাল।কুত্তা হচ্ছে অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের চরিত্রহীন দুর্নীতিপরায়ণ একজন মানুষ।সেখান থেকে কুত্তা আর কাজলের জায়গায় অঞ্জন – মিলে হচ্ছে কুত্তাঞ্জন।অাচ্ছা আমাকে কেউ অপছন্দ করলে কি নাম দেবে?কুত্তৃষ্ণা?
অপর্ণার সাথে কুত্তাঞ্জনের কিছু একটা আছে।আমার সঙ্গে অপর্ণার একটা রেষারেষির সম্পর্ক তৈরী করতে কুত্তাঞ্জন ওকে নিয়ে যে আদিখ্যেতা করে আমি সেটার কথা বলছি না।ব্যাপারটা আরো গভীর কিছু।এবং সম্ভবত আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত। 
      থার্ড সেমের পরীক্ষা শুরু হবার পর থেকেই কুত্তাঞ্জন আমাকে দেখলে উদ্ভট আচরণ করছে।ঐ সময়ের কথা যখন হচ্ছে কুত্তাঞ্জন না বলে কেবিএইচ বলি।কিংবা কাজলবাবু।কারণ তখন আমি ওকে কুত্তাঞ্জন নামে ডাকতাম না।
        কাজলবাবু কোনো কারণে আমার উপর অফেন্ডেড হয়েছেন বুঝতে পারছিলাম।লাস্ট ক্লাসের দিন লেকচার চলাকালীন আমার দিকে চোখ পড়লেই কিরকম সমমেরুর চুম্বকের মত লাফ দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিলেন।মানে আলাদা করে ঘাড়টায় একটা লম্ফ তরঙ্গ দেখা যাচ্ছিল।কারণটা পরে নিজেই অনুমান করলাম।ওঁর হাসিটা দাঁত কেলিয়ে রেসিপ্রোকেট না করার জন্য।আচ্ছা ঝামেলা তো!বুড়োর এ কি ভীমরতি!
         কাজলবাবু গোটা থার্ড সেমের ছ মাস বেশ ভদ্র হয়ে ছিলেন।মানে ভীষণ ফ্রেন্ডলি এবং ফাদারলি একজন মাস্টারমশাই। কোনো প্রশ্নেই বিরক্ত হন না।একেবারে মাটির মানুষ।এই লোকটাই ফার্স্ট সেমিস্টারের সময় অত ঘ্যাম নিয়ে চলত!দেখলে বিশ্বাসই হয় না।যে কোনো সমস্যা হলে ওঁকে গিয়ে বলা যেত।যদিও অপর্ণার প্রতি একটা পক্ষপাতিত্ব ছিল,কিন্তু সেটা কখনও দৃষ্টিকটূ হয়ে ওঠেনি।এক একজন শিক্ষক কোনো বিশেষ ছাত্রকে পছন্দ করতেই পারেন।তাই বলে আমাদের সাথে তো আর কোনো বৈষম্য করছেন না।মোটকথা পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর আগে অব্দি আমার এটা নিয়ে কোনো ক্ষোভ ছিল না।
        যেদিন আমি আর বিষ্ণু টার্ম পেপার জমা দিতে গেলাম,উনি খুবই অদ্ভুত আচরণ করলেন।আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বিষ্ণুর সাথে গল্প করলেন।বছর তিনেক আগে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকা এরকম করলে আমার অভিমান হত।কিন্তু এই মুহূর্তে কেন জানি না হল না।বরং একটা বিচিত্র আতঙ্ক হল।আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কোর্স পড়ার সময় স্যররা বারবার বলতেন,"এম এসসি পড়ার সময় কোনো ফ্যাকাল্টিকে চটাবি না।"
কারণটা নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করার দরকার নেই।আমার মেনস্ট্রিম ইকোনোমিকস পড়তে ভাল লাগে না,ফার্স্ট সেমের রেজাল্ট খুবই খারাপ হয়েছিল।যাই হোক প্রত্যাশিত ভাবে রেজাল্ট খারাপ হওয়া একটা জিনিস।এখানে মার্ক্স আর পল ইকো যথেষ্ট লেবার দিয়ে পড়ছি।সত্যিই যদি লোকটা খাতায় মার গেঁড়ে** দেয়,আমার মাওবাদী হওয়া ছাড়া গতি থাকবে না।এমনিতে বাড়ীতে কলেজে পড়ার সময় থেকেই মা ভয়ে ভয়ে থাকে আমি যে কোনো মুহূর্তে বানপ্রস্থে গিয়ে বিপ্লবী হয়ে যাব।আমার চারু মজুমদার,চে,মারিগেল্লা আর নবারুণ ভট্টাচার্যের বইগুলোকে মা সহ্য করতে পারে না।
পরের পরীক্ষার দিনগুলোও কাজলবাবুর ন্যাকামি অব্যাহত রইল।প্রতিদিন আমাদের ঘরে গার্ড নিয়ে আমি ফার্স্ট বেঞ্চে বসা সত্ত্বেও আমাকে সবার শেষে কোয়েশ্চেন পেপার দেওয়া ও সবশেষে খাতা সই করা।একটা প্রশ্ন নিয়ে আমার ডাউট ছিল, সেটা জিজ্ঞেস করায় সবার সামনে বাধ্য হল বলে দিতে।কিন্তু এবার কিছু একটা করতেই হবে,তাই অপর্ণার কাছে গিয়েও নিজে থেকেই ওটা বলে এল।যদিও ও জানতে চায়নি,তাও।
    লোকটা কিছু একটা গন্ডগোল করছে অনুমান করতে পারছিলাম।পরীক্ষার দিনগুলো রোজ আমাদের ঘরে গার্ড নিলেও আমার সাথে সরাসরি কথা বলছে না অথচ চোখ তুললেই দেখছি আমার দিকে তাকিয়ে আছে।অথচ একদিন হলে ঢোকার আগে অন্তত দুবার এরকম হল যে আমার সাথে আরেকটু হলে ধাক্কা লাগত।খুবই বিব্রত মুখে কেমন একটা চোর চোর ভঙ্গিতে সরে গেল।
      ওর আসল শয়তানিটা আমি অনেক পরে বুঝেছিলাম।অবশ্য তখন আমার হারাবার কিছু ছিল না বলেই অতটা ডেসপ্যারেট হওয়া সম্ভব হয়েছিল।লোকটা ফোর্থ সেমের প্রথম ক্লাসের দিন এসেই জিজ্ঞেস করেছিল গান্ধী আর মার্কসের ডিসএনচ্যান্টমেন্ট ও এলিয়েনেশনের উপর লেখা আর্টিকলটা আমরা পড়েছি কিনা।এবং খুবই মধু ঢালা গলায়।কিছুদিন আগে যে পাগলামি করছিল তার চিহ্ন মাত্র ছিল না।এটার উপর পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল।অপর্ণা ওটা পড়ে যায়নি আমাকে জানিয়েছিল।আমিও শেষ মুহূর্তে একবার চোখ বুলিয়ে গেছিলাম।ক্লাস নোটসের সাথে মিলিয়ে উত্তর লিখতে তেমন অসুবিধা হয়নি।পল ইকোর ইন্টারনালের নম্বরটা আগেই কায়দা করে শম্পা ম্যাডামের হাত থেকে নিয়ে পুরোটা নিজের হাতে রেখেছিল।ওর চালাকিগুলো তখন একটাও বুঝিনি।
তুলনামূলক আর্টিকেলের প্রশ্নটায় আমি বলেছিলাম মোটামুটি পড়ে লিখেছি,এর একটা কারণ হচ্ছে আমি নিজের পড়াশোনা নিয়ে সবসময়ই বেশ খুঁতখুঁতে ছিলাম।আমার দুর্বলতাটা কায়দা করে কুত্তাঞ্জনের জেনে নেওয়া-এর সঙ্গে সঙ্গেই নির্ধারিত হয়ে গেছিল অপর্ণা পল ইকোর পেপারে হায়েস্ট পেতে চলেছে।পরীক্ষার পারফর্মেন্সের এখানে কোনো ভূমিকা নেই।অপর্ণা একটা ভুল করে ফেলেছিল, আমায় জানিয়ে দিয়ে যে ও পাঁচ নম্বর পুরো ভুল লিখেছে।তাতে কিছুই যায় আসে নি,শুধু কুত্তাঞ্জন যে ঘাপলাটা করেছে খাতা বেরোনোর পর সেটা আমি বুঝতে পেরে গেছিলাম।নার্সিসিস্টের বৈশিষ্ট্য হল তারা এতটাই ভদ্রভাবে আপনাকে প্রশ্ন করবে যাতে আপনি সরল মনে নিজের বিষয়ে অনেক কিছু জানিয়ে দেবেন।তারা সেই তথ্যটা সঞ্চয় করে রাখবে ও পরে আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে।ঠিক এটাই কাজলবাবু থার্ড সেমিস্টারের পরীক্ষার সময় আমার সাথে করেছিলেন।

 

 

পর্ব ৬
কাজল ভট্টাচার্যের কথা

একটা ভালো রেপ পর্ন খুঁজে বের করা যৌনসঙ্গমের থেকেও বেশী পরিশ্রমের কাজ।পর্নহাব, ব্রেজারস আরও প্রায় গোটা তিরিশেক ওয়েবসাইট ঘেঁটে আমি পছন্দ মত মাত্র দুটো পর্ন পেলাম।একটা সেদিনের ঐ তৃষ্ণার মত দেখতে মেয়েটাকে নিয়ে,অন্যটা একটা এগারো বছরের মেয়ে এবং একটা মধ্য চল্লিশের শ্বেতাঙ্গ লোকের।আমার সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিতে দশ বছর আগের তৃষ্ণা এবং আমি।দ্বিতীয় পর্ন ছবির যে ব্যাপারটা আমাকে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করছিল তা হল ব্লাড।একটা মেয়ের কৌমার্য ভাঙার গল্প। জেনিটাল এবং অ্যানাল ব্লিডিং এ বিপর্যস্ত মেয়েটা যখন সঙ্গম শেষে নেতিয়ে পড়েছে তখন লোকটা তার চুলের মুঠি ধরে নিজের উরুসন্ধিতে ওর মুখটা চেপে ধরে পুরো সাবস্ট্যান্সটা গিলতে বাধ্য করল।আমি তৃষ্ণাকে এই পজিশনে দেখতে চাই,আমার উরুসন্ধির সামনে নতজানু হয়ে বসা।ওর মত মেয়েদের এভাবেই ট্রিট করা উচিত।সামান্যতম অনুকম্পা পাওয়ারও এরা যোগ্য নয়।তৃষ্ণাকে আমি একটা সুযোগ দিয়েছিলাম।তাতে আমার যেচে কাদা মাখা ছাড়া কিছু লাভ হয়নি।ও যে বইটা খুঁজছিল তার পিডিএফ আমি কমন মেল আইডিতে পাঠিয়েছিলাম।এবং যা আমি কখনই করি না,অর্থাৎ ওর পার্সোনাল ইমেল আইডিতেও মেল করে দিই।একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি।মানে কোনো উত্তরই দেয়নি।শুধু ওর খাতা নষ্ট করা যথেষ্ট নয়,আমি আস্ত তৃষ্ণাকে ধ্বংস করতে চাই।ওর উপর শারীরিক বলপ্রয়োগ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।ওকে এমন জায়গায় নিয়ে আসতে হবে যাতে আমার কোনো কাজেই ও বাধা দেবার অবস্হায় না থাকে।এমনকি চরমতম নোংরা কোনো কাজেও না।ইস আজ থেকে দশ বছর আগে কেন আমার সাথে ওর দেখা হল না!অন্তত একটা ইনোসেন্স থাকত,এখনকার মত আমাকে প্রতি পদক্ষেপে এত বেশী সাবধানতা অবলম্বন করতে হত না।

-"আই হ্যাভ বট ইউ ফ্রম দ্য মার্কেট,নাউ ইউ আর মাইন।আয়াম ইওর মাস্টার,ইউ আর মাই স্লেভ।তোমার শরীরের উপর আমার একচ্ছত্র অধিকার,তুমি কি খাবে,কি করবে,বিয়ে করবে কিনা,সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স করবে কিনা,তোমার বাচ্চা হবে কিনা,তোমায় যৌন প্রয়োজনে ব্যবহার করব না অন্য কোন কাজে-এগুলো আমি ঠিক করব।"
কথা শেষ করে আমি পূর্ণদৃষ্টিতে তৃষ্ণার দিকে তাকালাম।আমি বসে আছি একটা বড় টেবিলে চড়ে,ও আমার সামনে একটা চেয়ারে।মুখের রঙ ক্রিমসন লাল,চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।আমি লুব্ধ দৃষ্টিতে ওকে ভাল করে দেখলাম।এই মুহূর্তে ওর লাল হয়ে ওঠা ফর্সা মুখের চেয়ে লোভনীয় ও সুস্বাদু আমার ওর শরীরের কোনো অঙ্গ – প্রত্যঙ্গকে মনে হচ্ছে না।এত সুন্দর দেখতে হলেও মেয়েটার ড্রেস সেন্স খুব খারাপ।জঘন্য লুজ ফিটিং ও কোঁচকানো লিনেনের শার্ট পরে আসে।শরীরের গঠন ভালো বোঝা যায় না।ওর ফ্যাশন আইকন সম্ভবত কোনো বুড়ো টিবি আক্রান্ত অতি বামপন্থী নেতা।আমি জানি ও ব্যাগে চারু মজুমদার নিয়ে ঘোরে।একবার চারুবাবুর একটা থিওরির ব্যাখ্যা আমার কাছে জানতেও চেয়েছিল।
আমি এই লেচারাস ডিসকাশনের সুযোগটা বেশ ভাল মত কাজে লাগালাম।বেশ অনেকক্ষণ আলোচনা চালালাম বিষয়টা নিয়ে।আলোচনা হচ্ছিল স্লেভারি এবং ফিউডাল সিস্টেম নিয়ে। গৃহস্হালীতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ফিউডাল সম্পর্ক গড়ে ওঠে এটা ছিল বিষয়।এবং আমার ডিবচারির উন্মুক্ত ক্ষেত্রও।যদিও আমি ইতিমধ্যেই উপলব্ধি করেছি যে প্রগলভতাটা একটু বেশী মাত্রায় হয়ে গেছে,তাই অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম।সম্প্রদানের সময় যে মন্ত্রটা স্বামী স্ত্রীকে বলতে হয়,সেটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হলেও ওকে বলতে বাধ্য করলাম।ঐ "যদিদং হৃদয়ং তব,ততস্তু হৃদয়ং মম।যদিদং হৃদয়ং মম,ততস্তু হৃদয়ং তব।"
পলিটিকাল ইকোনমির ক্লাসের সেদিনের মজাটা একল্যাস্টিক ছিল।খুব ভাল হত যদি সময় ওখানেই থেমে যেত।বেরিয়ে এসে মনে হচ্ছিল এতটা বাড়াবাড়ি করা কি ঠিক হল!অবশ্য ক্লাসে মাত্র তিনজন স্টুডেন্ট। বিষ্ণু একদমই চুপচাপ আর অপর্ণার দরকার পল ইকোর খাতায় মলমূত্রাদি ত্যাগ করে এসেও হায়েস্ট মার্ক্স।ওর দাদা আমাকে বলেছে ওর ফার্স্ট ক্লাসটা তুলে দিতেই হবে।আগের সেমগুলোর মার্ক্স একদমই সুবিধার নয়।তাই যতই ক্লাসে মার্ক্সবাদ আর নারীবাদের তত্ত্ব পড়ানো হোক,এখানে তার যাপন সম্ভব নয়।একটা মেয়ে হিসাবে ও কখনই তৃষ্ণাকে সমর্থন করবে না।ক্লাসের মধ্যে যদি আমি তৃষ্ণাকে মোলেস্টও করি,অপর্ণা বাইরে গিয়ে একটা কথাও বলবে না।বরং তৃষ্ণা আমার দুর্নাম করার চেষ্টা করলে ও চিৎকার করে সেটা অস্বীকার করবে।ওর মোটা গলায় সিন ক্রিয়েট করার ও নিজের দিকে পুরো মনোযোগ টেনে নেওয়ার একটা চমৎকার ক্ষমতা আছে।তৃষ্ণার মত মৃদুভাষী মেয়ে আমার বিরুদ্ধে একটা কথাও দাঁড় করাতে পারবে না।অন্তত অপর্ণা থাকতে তো নয়ই।যদিও আমি ক্লাসের মধ্যে তৃষ্ণাকে মোলেস্ট করার কোনো পরিকল্পনা করছি না।এত বড় রিস্ক লাভার আমি নই।লোকাল মেয়ে,কাছাকাছি বাড়ী-সরাসরি ঝামেলায় যাওয়া ঠিক হবে না।আজকাল এমনিও যত্র তত্র অধ্যাপকদের ধরে পিটিয়ে দিচ্ছে বলে খবরে আসে।

 

 

পর্ব ৭
তৃষ্ণার কথা

কোনো ঘটনা একদিন ঘটলে সেটা কাকতালীয় বলা যায়।হয়ত এমনিই বলেছেন,আমারই বিষয়টা স্পোর্টিংলি নেওয়া উচিত।সেদিন পল ইকোর ক্লাসে কুত্তাঞ্জন আমার মৌখিক শ্লীলতাহানি করার পর আমি এটাই ভাবছিলাম।কিন্তু ঘটনাটা কাকতালীয় ছিল না।পরদিন হাউজহোল্ড ডোমেনের ফিউডালিজমের টপিকটা আবার মার্ক্সের ক্লাসে আলোচিত হয়েছিল।সেখানে কিন্তু কাজলবাবু একটুও ডিবচারি করেননি।একদম ক্লাস লেকচার যেমন হওয়া উচিত সেভাবেই বিষয়টা আলোচনা করেছেন।অতটা বাড়াবাড়ি মাত্রার এবং আপত্তিকর ভাষার প্র্যাকটিকাল উদাহরণ টানার দরকার পড়েনি।একটা সময় হঠাৎ আমাকে বললেন,"আচ্ছা কালকের ক্লাসে তুমি যেন কি একটা শ্লোক বলেছিলে?ওটা আবার বল।"
আমি চমকে উঠলেও সেটা প্রকাশ করলাম না।গ্যাসলাইটিং বলে ইংরাজীতে একটা কথা আছে।আমি সেটা তখন নিজের উপর প্রয়োগ করছিলাম অবচেতন ভাবেই।
ভদ্রলোক শ্লোক আর স্তোত্রর ফারাকটাও জানেন না।আমি সেটা নিয়ে কোনো কথা না বলে স্তোত্রটা বললাম।"যদিদং হৃদয়ং তব…." চিরাচরিত বিয়ের মন্ত্র।
ভদ্রলোক পূর্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।আমার কেন জানি না চোখের দৃষ্টিটা ভাল লাগছিল না।
আমার বলা শেষ হলে বললেন,"এটা বাংলায় বলে দাও।"
আমি যথা সম্ভব সপ্রতিভ ভাবে বললাম,"যাহা তোমার হৃদয়,তাহা আমার হৃদয়।যাহা আমার হৃদয়, তাহা তোমার হৃদয়।"
ভদ্রলোকের মুখের অভিব্যক্তি দুর্বোধ্য, তবে দেখে মনে হল আমার হেনস্হাটা বেশ উপভোগ করছেন।আমি বিশ্বাস করি না দুদিন পরপর ঘটে চলা এই ঘটনাগুলো কাকতালীয় ছিল।যদিও নিজের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে ভোকাল হবার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি আমি জানি।ট্রিভিয়ালাইজেশন এবং গ্যাসলাইটিং।যেমন রায়ট ভিক্টিম বিলকিসকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা চলে আসলে কোনোদিন তার কোলের সন্তানকে খুন করা হয়নি।ধর্ষণের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।যেমন হলোকস্ট পরবর্তী যুগে নিও নাৎসীরা এসে হলোকস্টের ঘটনাকেই অস্বীকার করে।


বিষয়টা এই দুদিনে সীমাবদ্ধ ছিল না।আমার হাত থেকে একটা মার্কার পেন নিতে গেলেও আমার আঙুলগুলো না খিমচে ভদ্রলোক নিতে পারতেন না।আমাকে এমন কিছু বই পাঠাতেন যাতে আবশ্যিক ভাবে কিছু ভিনিরিয়েল কন্টেন্ট থাকত।আর আমি নিজেকে বোকার মত স্তোক দিয়ে যেতাম যা ঘটছে সব আমার মনের ভুল।বাবা মাকেও তখন জানিয়ে উঠতে পারিনি।কয়েকজন বন্ধুকে বলেছিলাম অবশ্য।
আমি ওঁর এই আচরণের কোনো ব্যাখ্যা পেতাম না।কি চাইছেন ভদ্রলোক!খুব সামান্য কারণেও আমার উপর অফেন্ডেড হতে দেখেছি।অনেক সময় কারণটা পর্যন্ত বোঝা যেত না।
একদিন সোমবারের ক্লাসে যেমন তাঁর নিজের লেখা একটা বই রেফার করলেন,সেটা লাইব্রেরিতে পাওয়া যাচ্ছে না জানানোয় বেশ উদ্ধত ভাবে বললেন,"কিছু করার নেই।"
এভাবে আগে কখনও কথা বলেননি।
সেদিন মার্ক্সিয়ান ইকোনমির ইন্টারনালের পেপারটার বিষয়ে একটা প্রশ্ন করার ছিল।ক্লাসে তার সুযোগ পাওয়া গেল না।তিনটে নাগাদ আমি ওঁর কেবিনে গেছিলাম।একটা বেশ অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
আমাকে দেখা মাত্র কাজলবাবু ঘাড় গোঁজ মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।আমি বার বার ডাকছি কোনো উত্তর নেই।ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটছিল।একটা উদ্গত চার অক্ষরের স্ল্যাঙকে জোর করে বেরিয়ে আসা থেকে নিরস্ত করলাম।
তখনই কাজলবাবু ঠান্ডা গলায় বললেন,"দিস ইজ নট আ গুড টাইম টু কাম।"
আমি পুরো ঘটনাতেই বেশ অবাক হচ্ছিলাম।কাজলবাবু আগে কখনও কোনো নির্দিষ্ট সময় বলে দেননি দেখা করার জন্য।যে কোনো সময়ে গেলেই কথা বলতেন।বললাম,"আচ্ছা ঠিক আছে,আমি বৃহস্পতিবার আসব।"
চলে যাচ্ছিলাম,কাজলবাবু আটকালেন।
-"কি বলছিলে বলে যাও।"
আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম এবার ভদ্রলোকের গলায় একটা অনুনয়ের সুর আছে।লোকটার কি সত্যিই মাথায় ছিট!
আমি প্রয়োজনটা জানালাম।
-"আজকে তো হবে না।তুমি কাল আসতে পারবে?"
-"না কাল আমার হবে না।"
-"কাল হবে না মানে?"অসন্তুষ্ট গলায় বললেন কাজলবাবু।
-"মানে কাল ক্লাসের পর সময় হবে না।"
-"তাহলে বুধবার?"ভদ্রলোকের গলা রীতিমত কাতর শোনাল।
-"না ঐদিনও সম্ভব নয়।আমি বৃহস্পতিবার আসতে পারব।"
-"আচ্ছা ঠিক আছে।"
এর মধ্যে আরো কিছু মজার ঘটনা ঘটল।বিষ্ণু তাঁর কেবিনে যাওয়ায় তার সাথেও খুব উদ্ভট ব্যবহার করেছেন।একবার মৃদুভাবে খেঁকিয়েছেন পর্যন্ত।বিষ্ণু আমাকে বলল,"স্যরের বোধহয় মুড খারাপ ছিল।"
অথচ মঙ্গলবার মার্ক্সিয়ান ইকোনমির ক্লাসে এসে খুব স্বাভাবিক ব্যবহার করলেন।কিছু প্রশ্ন করলেও খুব অমায়িক গলায় উত্তর দিলেন।একসময় লক্ষ করলাম হাসি হাসি মুখে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে পড়িয়ে যাচ্ছেন।
একবার আমাকে আদেশের গলায় বললেন,"হাউজহোল্ড লেবারের বইটা তোমার কাছে আছে।তুমি ওটা আপলোড করে দেবে।"
"না হাড়গিলে বুড়ো,কাল তুমি যা অসভ্যতা করেছ আমি তারপর তুমি যা বলবে সেটা করব না।বরং পারলে তার উল্টোটা করব।"আমি মনে মনে বললাম।এটাই সেই বই যেটা কাজলবাবু একবার কমন মেল আইডিতে পাঠিয়েও,আবার করে আমার পার্সোনাল আইডিতে মেল করেছিলেন।তারপর কিছুদিন কোনো কারণ ছাড়াই আমার উপর ক্ষেপে ছিলেন।সম্ভবত ধন্যবাদ না জানানোয়।কিন্তু ওঁকে কিছু পাঠালে উনিও তো ধন্যবাদ জানান না।তাই আমার মাথাতেই আসেনি যে আদৌ ধন্যবাদ জানানো উচিত।
বুড়োটা আবার বাঁদরামি শুরু করেছে।অভদ্রের মত আঙুল তুলে আমার সাথে কথা বলল।প্রায় আমার নাকটা ধরে ফেলেছিল।আমি কোনো উত্তর না দিয়ে ভুরু কুঁচকে কঠিন চোখে ওর দিকে তাকালাম।লোকটা কেমন একটা মুখ লুকিয়ে লাফ দিয়ে ঘরের অন্যপ্রান্তে চলে গেল।লেকচার চলাকালীন বাঁদরের মত লাফালাফি করে।একদিন অপর্ণার খাতা ফেলে দিয়েছিল।একদিন আমার পায়ে লাথি মেরেছিল।অথচ দুঃখপ্রকাশ করার ভদ্রতাটাও দেখায়নি।
অপর্ণা সোমবার আসেনি।অতঃপর ওর কোটাটা বাকি ছিল।
বৃহস্পতিবার আমাদের ক্লাসরুমে এসির সার্ভিসিং চলছিল।অপর্ণা সেটা কাজলবাবুকে জানাতে গিয়েছিল।ফিরে এল রেগে বেগুনী হয়ে।ওকে নাকি দেখা মাত্র দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছেন।এম ফিলের সৌম্যদা বলল,"এখন কেউ দোতলায় যাস না।স্যর গালাগাল করছে।"
বোঝো কান্ড।স্যর কি কুমড়োপটাশ যে ভয় পেতে হবে!আমি ঠিকই করে নিলাম আজ যদি ক্লাসে এসে ঝামেলা করে সোজা ওয়াক আউট করব।তারপর যা হয় দেখা যাবে।
কিন্তু সেরকম কিছু ঘটল না।কাজলবাবু ক্লাসে এসে অত্যন্ত বিগলিত কণ্ঠে সবার সাথে খেজুর শুরু করলেন।আমি দু একবার বেশ উদ্ধত গলায় কথা বললাম,তাও ওঁর বৈষ্ণবীয় বিনীত ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন হল না।আগের দিনের প্রশ্নটা করায় প্রথমে "কি বলছ?"
বলে আমার উপর এতটা ঝুঁকে পড়লেন যে আমাকে পিছিয়ে যেতে হল।তারপর আমি প্রশ্নটা রিপিট করায় বিনয়ের অবতার হয়ে কেবিনে যেতে বললেন। আমাকে দরজা নকও করতে হল না।আমার বিশ্রী নোংরা ডেনিমের জুতোটা দেখেই চিনতে পেরে আমাকে ভিতরে ডেকে নিলেন।এমনকি একটা ফোন আসায় আমার সঙ্গে কথা বলবার জন্য পরে ফোন করতে বললেন।

কাজলবাবুর মধ্যে কয়েকটা এমন অস্বাভাবিত্ব ছিল যেগুলো ঠিক সুস্হ মানুষের লক্ষণ নয়।যেমন আমাদের প্রতি ওঁর প্রত্যেকটা ফেভারে অ্যাপ্রুভাল আশা করে যাওয়া এবং না পেলে অস্বাভাবিক চাপা ক্ষোভ (যেমন আমার অনুরোধে উনি ক্লাসের সময় দু ঘন্টা পিছোনোর পর ধন্যবাদ না জানানোয় রেগে গিয়ে আবার ক্লাসটা একঘন্টা এগিয়ে দেন),
আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে এক মুহূর্তের জন্য সরলেই রীতিমত অসুস্হ বোধ করা।ক্লাসে কিছু ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলায়(হয়ত অঙ্কটা নিয়েই আলোচনা করছিল) ওঁর অদ্ভুত ভাবে অফেন্ডেড হয়ে বেরিয়ে যাওয়াটা ফার্স্ট সেমিস্টারের ক্লাসে বেশ দৃষ্টিকটূ মনে হয়েছিল।তাও এটা ততটা অস্বাভাবিকতার নজির নয়।থার্ড সেমিস্টারে পলিটিকাল ইকোনমির ক্লাসে আমি আর বিষ্ণু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম,মানে পড়ারই বিষয় তাই ভদ্রলোক সরাসরি কিছু বলতে পারছিলেন না,কিন্তু অদ্ভুত ভাবে ছটফট করছিলেন।মানে তাঁর ঐ মুহূর্তের শারীরিক মুভমেন্টের মধ্যে এমন একটা অস্হিরতা ছিল যেটা একমাত্র মানসিক রোগীদের মধ্যে দেখা যায়।আমি একদিন বিষ্ণুর কানে কানে একটা কথা বলায় সেটা জানা নিয়ে ওঁর আগ্রহটা রীতিমতো প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভনেসের পর্যায়ে পৌঁছে গেছিল।আমাদের যখন কোনো ইমেল পাঠাতেন,তার নীচে নিজের নাম না লিখে লিখতেন 'স্যর'।ক্লাসের শেষে কোনোদিন বোর্ডটা পর্যন্ত নিজে মুছতেন না,আমাদের মুছতে বলে বেরিয়ে যেতেন।যেহেতু উনি জানতেন আমি ওঁর কথা শুনব না,তাই একদিন নিজেকে দরজা বন্ধ করতে হওয়ায় সাংঘাতিক রেগে গিয়েছিলেন(যদিও মৌখিক ভাবে প্রকাশ করেননি,কারণ আমার সামনে সেটা করা অনেকটা পাথরে মাথা ঠোকার সমর্থক হত।)।রীতিমতো নিরাপত্তাহীনতায় না ভুগলে কারোর মধ্যে এই মাত্রায় সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স দেখা যায় না।যে কোনো একটা ঘটনা দিয়ে বিচার করলে হয়ত ব্যাপারটা এতটা অস্বাভাবিক লাগত না,কিন্তু যেহেতু ভদ্রলোককে খুব কাছ থেকে দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে তাই একটার পর একটা ঘটনা স্টাডি করে ওঁর সাইকোপ্যাথ হবার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়েছে।
       ওঁর আমার প্রতি আকৃষ্ট হবার কারণও সম্ভবত এই মনস্তত্ত্বই।যেখানে গোটা ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রী বিশেষ করে মেয়েরা ওঁকে বন্দনা করছে সেখানে একজনের নিষ্পৃহ থাকা উনি মেনে নিতে পারছিলেন না।উনি ঝামেলা শুরু করার আগে পর্যন্ত আমি কোনোদিন একবারের জন্যও ওঁকে অসম্মান করিনি।কিন্তু উনি তো শুধু গুরু শিষ্যা সম্পর্কে সন্তুষ্ট থাকতে চাননি!
         আমার অনেক বান্ধবীই হয়ত আমার জায়গায় থাকলে প্রথম দিকে বেশ গর্বিত বোধ করত।ওঁর কাছ থেকে এই ধরনের অ্যাটেনশন পাওয়ার কারণে।কিন্তু টানা সাত আট মাস আমার এই মনোযোগটা পাওয়ার দুর্ভাগ্য হয়েছে বলেই ভুক্তভোগী হিসাবে বলতে পারি,এই ধরনের মনোযোগ যাতে কোনো মেয়েকে কোনো প্রতিষ্ঠানে না পেতে হয়।একজন নার্সিসিস্ট একটা প্রতিষ্ঠানকে তার হারেম বানিয়ে ফেলতে পারে,সে সেলিব্রিটি হতে পারে,তার ছবি জাতীয় বা অান্তর্জাতিক পর্যায়ের পত্রিকায় থাকতে পারে,কিন্তু তারপরেও সে বা তার মনোযোগ একজন ভিক্টিমের মানসিক স্বাস্হ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক।"রেসপেক্ট ইওর বেটার্স" প্রবাদে আমি বিশ্বাস করি না।কেউ যত উঁচু সিংহাসনেই বসে থাকুক তৃণমূলস্তরে থাকা একটা মানুষেরও ক্ষতি করার অধিকার তার নেই।দুঃখের ব্যাপার হল এই মার্ক্সবাদী শিক্ষাগুলো হাতে ধরে, যত্ন করে যে মানুষটা শিখিয়েছেন সেই মানুষটার নামই ডঃ কাজল ভট্টাচার্য।

(ক্রমশ)

দ্রোণাচার্য্য ১
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments