সৌরভদার পাঁচ দশের চেহারাটা গুটিয়ে,শুকিয়ে ও কালো হয়ে একরকম কাকতাড়ুয়া গড়ন নিয়েছে।ফর্সা রঙের উপর একটা কালসিটে, কিরকম কুঁজো কুঁজো ভাব,আর গা থেকে ইঁদুর পচা জঘন্য গন্ধ।গায়ের শার্টটা,সম্ভবত কোনোকালে অফ হোয়াইট ছিল এখন খুবই নোংরা হওয়ায় আসল রঙ বোঝা যাচ্ছিল না।কিরকম একটা চোর চোর ভঙ্গিতে বলছিল,”আসলে তোদের পাড়াটা তো মাকুদের দখলে।”
কিরকম খচ্চর দেখ!শেল্টার চাইছে তাও বদামি ছেড়ে কথা বলতে পারবে না।আমি গম্ভীর হয়ে বললাম,”মাকু মাকু কোরো না,আসতে হলে এস।আমি শেল্টার দেব,কেউ কিছু বলবে না।”
সৌরভদা এর আগেও অনেকবার আমাদের বাড়ীতে রাত কাটিয়েছে।শুধু ছাত্র রাজনীতির কারণে নয়,চাইনিজ বক্সিং শিখতে যখন আমি বরানগরে একটা ক্লাবে যেতাম তখন থেকেই পরিচয়(যদিও আমার বস্তুটা তেমন ভাল করে শেখা হয়ে ওঠেনি)।তবে এখন আর সেই সময়টার মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক।তাও ওকে আসতে বললাম।জানি ও সোজাসাপটা ছেলে,পলিটিকস ছড়াবে না।প্রকৃতপক্ষে ওকে আসতে না বলার কোনো শক্তপোক্ত কারণ ছিল না।বরং উল্টোটাই।

সৌরভদা আসারও বেশ কিছুদিন আগে একদিন জেঠুর বাড়ী গিয়েছিলাম নৈনানপাড়ায়।ঐ পাড়াটা এখনও আমাদের পার্টির মানে সৌরভদার ভাষায় ‘মাকু’দের দখলে।ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেছিল। সাড়ে দশটা নাগাদ সিঁথি বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি,এমন সময় পিছন থেকে আসা কারো সঙ্গে ধাক্কা লাগল।লোকটার হাইট মাঝারি,চোখের রঙ ঘোলাটে।চিনতে একটুও দেরী হল না।কটা গোবিন্দ(চোখের রঙের কারণে সম্ভবত নামটা এরকম)।বরানগরের ত্রাস।রীতিমত ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।একসময় আমি যেখানে চাইনিজ বক্সিং শিখতে আসতাম,সেই ক্লাবেই ওর টিম ফুটবল খেলত।
আমাকে দেখে নার্ভাস ভাবে বলল,”অনল না?”
আমি সাবধানী গলায় বললাম,”কি হয়েছে?”
-”ভাই ই এস জিকে বোলো না।এই নদীয়া চলে যাচ্ছি,কালী কীর্তন ছাড়া আর কিছুই করব না।”
মায়াপুরে ইস্কনের মন্দির আছে জানতাম, কিন্তু কালী কীর্তন! কে জানে! সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়।যেটা বিবেচ্য সেটা হচ্ছে এলাকার ‘ত্রাসেরা’ আমার বিদুষী বোনের ভয়ে পাড়া ছেড়ে পালাচ্ছে।অনেক বড় বড় মাস্তানই তখন চোদ্দ পনেরো থেকে পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের ছেলেদের ভয়ে গঙ্গাজলে হাত ধুয়ে রিটায়ার করছিল।কানু গুণ্ডা,কমল ব্যানার্জী প্রতি সন্ধ্যেয় ঠনঠনের কালীবাড়িতে কীর্তন করতে যেতে লাগল।রাতারাতি কিছু ‘ত্রাস’ পাঠবাড়ির নামাবলী পরা কীর্তনিয়া হয়ে গেল।একটা ফোর্থ ইয়ারের মেকানিকাল স্টুডেন্ট, এই পাপী দুনিয়ায় যার জেন্ডার ফেমিনিন,তার ভয়ে যদি বরানগর এলাকার ‘ত্রাসেরা’ এবং পুলিশের লোকেরা পাড়াছাড়া হতে বাধ্য হয় তাহলে তার বাড়ীর লোকের অবস্হাটা অনুমান করা বোধহয় খুব কঠিন কাজ নয়।

খাটের উপর বসে সৌরভদা একটা সিগারেট ধরাল,আমিও একটা ধরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,”বহ্নির ব্যাপারে কিছু জান?”
সৌরভদা একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল,”যদ্দুর জানি এখনও কলকাতাতেই আছে।সার্টেনলি কিছু বলতে পারব না,কারণ ওর সাথে অনেকদিন কথা হয়নি।তবে শুনেছি পার্টির টপ লেভেল থেকে অর্ডার আছে,খুব তাড়াতাড়িই বোধহয় কলকাতা ছাড়তে হবে।”
আমি জড়বুদ্ধির মত কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম,তারপর অস্ফুটে বললাম,”ওর অনেক উঁচু লেভেলে যোগাযোগ আছে না?”
সৌরভদার বোধহয় আমার মুখ দেখে মায়া হল,বলল,”ও সেন্ট্রাল কমিটির মেম্বার, অনল।”
বাবা এর মধ্যে জিজ্ঞেস করে গেছে সৌরভদা রাত্রে থাকবে কিনা।তাহলে খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়।মা পার্টির কাজে অন্ধ্রে।
-”বহ্নিকে আমার ফেরত চাই সৌরভদা, অ্যাট এনি কস্ট।”বললাম আমি।
সৌরভদা খুবই অস্বস্তিতে পড়ে গেল।আমাদের পার্টির মধ্যেকার তিক্ততাটা আমাদের ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে আসা কাম্য নয়,আমাদের দুজনের তরফেই।যদি বন্ধুত্বের ব্যাপারটা বিবেচনা নাও করি,স্বার্থের খাতিরেই।সৌরভদা এখন আমার আশ্রয়ে আছে।আর আমার বোন সৌরভদা যে পার্টি করে তার উচ্চনেতৃত্বের একজন আন্ডারগ্রাউন্ড সদস্য।তাত্ত্বিক তর্কে বহ্নির বিপ্লব,আত্মত্যাগ ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা সৌরভদার পক্ষে আর যাই হোক এখানে বসে সম্ভব নয়,বিষয়টায় যতই নৈতিকতার জোর থাক ওর তরফ থেকে।মধ্যবিত্তের কাছে এ ঘটনা কোথায় গিয়ে লাগে সেটা বোঝার বুদ্ধি বহ্নির না থাক,সৌরভদার আছে।
সৌরভদা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,”দেখ সেন্টিমেন্টাল হয়ে লাভ নেই,শ্যামল ভৌমিকের কেসটার পর থেকে যা পরিস্হিতি তৈরী হয়েছে,ও কলকাতায় থাকলে অ্যারেস্ট হয়ে যাবে।তাছাড়া…”
-”তাছাড়া কি?আচ্ছা সমীরণ স্যরের সাথে আরেকবার দেখা করব?লাভ আছে?গতবার তো ভদ্রলোক আমাকে জাস্ট ঠাণ্ডা জল ছেটালেন।”
-”শুনেছি।ঠাণ্ডা জল ছেটাননি,যা বলেছেন সত্যিই বলেছেন।এখন আর ওঁর হাতে কিছু নেই।পার্টির মুখপত্রের এডিটোরিয়াল বোর্ড থেকে আগেই ওঁকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে।আর…”
একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে সৌরভদা বলল,”এখন জি এস সরাসরি ওকে নির্দেশ দেন।চিঠি বা কুরিয়রের মারফত।”
কথাটা এতই ভয়ানক যে আরেকটু হলে আমি হাতের সিগারেটটা সৌরভদার হাঁটুতে গুঁজে দিচ্ছিলাম, কোনোমতে সামলে নিলাম।
-”আচ্ছা চন্দ্রিলবাবুর সাথে দেখা করা যায় না?”
-”দেখা করে কি বলবি?”সন্ত্রস্ত গলায় বলল সৌরভদা।
-”তুমি দেখা করিয়ে দিতে পারবে?”
-”ভাই তোর আমার পিছনটাই পছন্দ হল?”
-”এতে অসুবিধা কোথায় আমি বুঝতে পারছি না।”
-”অসুবিধা একটাই যে এটা বলিউডের সিনেমা চলছে না।মা শয্যাশায়ী,বাবা মৃতপ্রায়, বৌদি পলাতকা- এসব যুক্তিগুলো ঘ্যানঘ্যানে হলেও উনি সহ্য করে নেবেন।মানে এরকম কথা বার্তা লিখে অামার ধারণা অনেকের বাবাই ওঁকে চিঠি লিখছেন,সেগুলো উনি এককান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিতে পারেন।কিন্তু তুই ভিলেন বাবাদের মত যদি “কত টাকা চাই আমার বোনের বদলে” বা ব্ল্যাঙ্ক চেক দেওয়া গোছের সিন ক্রিয়েট করতে যাস তাহলে পরের দিন জাস্ট তোর আর আমার দুজনের লাশই তিস্তার ধারে পড়ে থাকবে,গলার নলিটা কাটা অবস্হায়।”
-”আমি আজ পর্যন্ত তোমাদের পার্টির একটা ছেলের গায়েও হাত দিইনি।বরানগরে ওরা বিনা দোষে বুবলাকে মেরেছে,তারপরও না।আমি জাস্ট নিজের বোনকে ফেরত চাই।তুমি যদি হেল্প নাও কর…”
-”আমি বলেছি হেল্প করব না?দেখ তবে একটা কথাও ভেবে দেখতে হবে।বহ্নি এখন অ্যাডাল্ট,তো ওর ও তো একটা মতামত আছে।”
-”সৌরভদা তোমাকে কি করে কনভিন্স করব জানি না,কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে ওর বিপ্লব টিপ্লব জাস্ট একটা অজুহাত।ও বাড়ী থেকে দূরে যাওয়ার একটা কারণ খুঁজছিল,সেটা পেয়ে গেছে ব্যস।আসল কথা হচ্ছে ও বাবা মাকে পছন্দ করে না বলে এখানে থাকতে চায় না।এরকম অরাজনৈতিক চরিত্রের একটা ক্যাডারকে নিয়ে তোমাদের পার্টিরই অসুবিধা হবে।”
-”এটা তুই মনে করিস।পার্টির মত এটা নয়।তাছাড়া ও অনেকদিন ধরে ছাত্র রাজনীতি করছে।”
-”ওকে পার্টি আমার থেকে ভাল নিশ্চয়ই চিনবে না।”
-”সে তো বটেই,কিন্তু ও এরকম বাড়ী থেকে পালাতে চাইবে কেন?ওকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়?”
-”নাহ সেটা কেন হবে?আমরা তো চাই ওকে মাস্টার্সের জন্য বিদেশে পাঠিয়ে দিতে।এত ভাল পড়াশোনায়!”
-”তাহলে?”
-”এসব কথা ছাড়ো না,বলছি তোমাদের পার্টির আর কারো সাথে কথা বলা যায় যে ওর কথা জানে?যেমন রক্তিম মজুমদার? “
-”রক্তিমদা জানলেই যে তোকে বলবে তার কোনো মানে নেই।মাঝখান থেকে আমি কেস খেয়ে যাব তোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।পার্টির ছেলেদের কথা ছাড়।একজন আছে যে তোকে হেল্প করতে পারে।সংঘমিত্রা ভটচায।সুবিমল ভট্টাচার্যের মেয়ে।”
-”কোন সুবিমল?বাগবাজারের?মানে হনুমান সুবিমল?”
-”হনুমান সুবিমল আবার কি?”সৌরভদা ঘাবড়ানো গলায় বলল।
-”আরে ঐ হনুমান এবং গোমাতা রক্ষা সমিতির প্রেসিডেন্ট। অঙ্কের প্রোফেসর।”
-”হ্যাঁ,ঐ।”
-”ওর মেয়ের সাথে বহ্নির কি সম্পর্ক?”আমি সত্যিই অবাক না হয়ে পারলাম না।
-”আরে দৈত্যকূলে প্রহ্লাদ।ওর মেয়ে আমাদের গোপন সমর্থক।”
-”আরিব্বাস!”
-”আসলে এর কৃতিত্বটা বহ্নিকে দিতে হয়।নইলে মেয়েটা শুনেছি মারাত্মক নাকউঁচু।টপাররা মেয়ে হলে যেমন হয় আর কি!কারোর সাথেই প্রায় কথা বলে না,ছেলেদের সাথে তো আরোই না।তাও বহ্নির দৌলতে আজকাল একটু আধটু হেল্প পাওয়া যাচ্ছে।আমি অবশ্য ওকে ততটা চিনি না।সুভাষ,রক্তিমদা,দেবাঞ্জনা – ওদের সাথে কিছুটা তাও কথাবার্তা বলে আর কি!”
-”তাকে পাব কোথায়?আমাদের ইউনিভার্সিটির হলে তাও একটা কথা ছিল, ও তো যাদবপুরের।”
-”এটা একটা সমস্যা বটে।আগেই বলছি মেয়েটা কিন্তু মারাত্মক নাকউঁচু।বহ্নির মত হলে তো চাপ ছিল না।দেখ কোনোদিন ইউনিভার্সিটি থেকে বেরোনোর পর যদি ধরতে পারিস।তুই বহ্নির দাদা জানলে নিশ্চয়ই কথা বলবে।ওর সাথে বহ্নির খুব ভাব ছিল।”
আমার ব্যাপারটা ভাল লাগছিল না।একটা অহংকারী মেয়ের পিছনে ভিলেনের মত আমি ধাওয়া করছি,আর আমার চেহারাটাও সত্যি কথা বলতে বেশ…. মানে অন্তত রাজেশ খান্নার মত কোনোভাবেই না।দৃশ্যটা ভেবেই আমার একরকম আতঙ্ক বোধ হল।শেষমেষ মারধোর খাব না তো!

(ক্রমশ)

দ্রোহকাল ১০
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments