সংঘমিত্রা বইগুলো নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেশ ঘেমে ও হাঁপিয়ে যাচ্ছিল।এখন আবার গরমটা বাড়ছে।কলকাতায় আসলে তিনটে ঋতু হয়।গরমকাল,যে সময়টাকে শীতকাল বলে ডাকা হয়।প্রচণ্ড গরমকাল আর অসহ্য গরমকাল।এখন মাঝের পর্বটা চলছে,মানে প্রচণ্ড গরমকাল।
-”এত ভার টানিস না,হাতে তোর বহ্নিদির মত মাসল বেরিয়ে আসবে।”
সংঘমিত্রা তাকিয়ে দেখল রক্তিমদা কোথা থেকে এসে তার পাশে পাশে হাঁটছে।গায়ে একটা গেরুয়া পাঞ্জাবি,হাতা গোটানো।অত্যুজ্জল শ্যামলা মুখটা রোদ পড়ে লালচে লাগছে।মুখে হালকা দাড়ি,আর চোখে সরু মেটাল ফ্রেমের চশমা।চোখ ফেরানো যায় না,ফেরাতে গেলে বুকের ভিতর কিরকম অক্সিজেন কমে আসার মত কষ্ট হয়।তাও দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল সংঘমিত্রা।
-”দে ধরছি,কোথায় পৌঁছে দিতে হবে বল।বাস ধরবি?”
-”না, ঠিক আছে।”অস্ফুটে বলল সংঘমিত্রা।
-”বহ্নি যাওয়ার পর থেকে তো তুই ইদের চাঁদ হয়ে গেছিস।আরে দে দে,ফর্মালিটি করতে হবে না।”জোর করে বইগুলো টেনে নিল রক্তিমদা।
-”তুমি এভাবে ঘুরছ,পুলিশ কিছু বলছে না?”
-”নাহ পুলিশ অঞ্জনবাবুর কেসটায় সন্দেহ করলেও কিছু শক্ত প্রুফ জোগাড় করতে পারেনি।অদূর ভবিষ্যতে পারারও কোনো চান্স নেই।”
-”ওহ্,কলেজ যাচ্ছ?”
-”নাহ্,চাকরিটা ছেড়ে দিলাম।”
-”কেন?তুমি গ্রামে চলে যাবে?”আশঙ্কা মেশানো উদ্বেগের গলায় বলল সংঘমিত্রা।
রক্তিমদা একটু অবাক হয়ে একটু বেশী সময় ধরে যেন সংঘমিত্রাকে খুঁটিয়ে দেখল।
কথাটা বলার সময় কি চোখটা ছলছল করে উঠেছিল,নাকি ব্লাশ করেছিল সংঘমিত্রা?সংঘমিত্রা আড়ষ্ট হয়ে ভাবল।এবং তখন করে থাকুক না থাকুক,এখন,কান ও গালের ভিতর থেকে গরম হওয়া তাকে বুঝিয়ে দিল যে সে ব্লাশ করছে,একেবারে যাচ্ছেতাই ভাবে।রক্তিমদাটা কেন যে উদয় হল কে জানে!ওকে দেখলেই সব ঝামেলা শুরু হয়।
-”দেখি পার্টি যেমন বলবে।”রক্তিমদা একটা সিগারেট ধরাল,”কোথায় যাবি তুই?”
-”ভাবছি বসন্ত কেবিনে ঢুকব।খিদেও পেয়েছে,আর বইগুলো রেখে একটু বসা যাবে।”
-”ভালই হল,আমিও ওদিকে যাচ্ছি।চল।”
-”তুমিও ওদিকে যাচ্ছ?”আতঙ্কিত গলায় সংঘমিত্রা বলল।
-”আরে একজন দেখা করতে আসবে।একি তুই এত ঘামছিস কেন?”
সংঘমিত্রা কোনো উত্তর না দিয়ে এগিয়ে গেল।আজকের দিনটাই খারাপ।
একতলায় কোনো জায়গা ফাঁকা পাওয়া গেল না।ওয়েটার দোতলাটা দেখিয়ে দিল।দোতলাতেও মাঝের ঘরগুলো ভর্তি।
-”পর্দাওলা ঘরে তো ওকে নিয়ে বসা যাবে না।”ওয়েটার একটা ঘরের পর্দা তুলে ধরতেই রক্তিমদা বলল।
ওয়েটার বলল,”তাহলে একটু ওয়েট করুন।সামনের টেবিলটা ফাঁকা হবে।”
রক্তিমদা সংঘমিত্রা কিছু বলার আগেই দুটো টোস্ট আর দুটো চায়ের অর্ডার দিয়ে একপাশে দাঁড়াল।সংঘমিত্রা বলল,”আমি বরং বেরিয়ে পড়ি।”
-”খিদে পেয়েছে বলছিলি,খেয়ে যা।”
-”এখানে চেনা কেউ দেখলে একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড হবে,তাছাড়া টেবিলও ফাঁকা নেই।”
-”আচ্ছা টাটা।”
কথা শেষ করার আগেই খাবার চলে আসায় রক্তিমদা একাই একটা পর্দাওলা ঘরে ঢুকে গেল।
-”এই নে,খাবি একটু?বাকিটা যে ছেলেটা আসছে ও খেয়ে নেবে।”
রক্তিমদা বাটিসুদ্ধু একটা হাত কেবিনের মধ্যে থেকে বাড়িয়ে দিল।
-”নাহ, ঠিক আছে।”
এরা এক প্লেট থেকে মাঝে মধ্যেই চার পাঁচটা ছেলেমেয়ে মিলে খায়।সংঘমিত্রার ব্যাপারটা ঠিক ভাল লাগে না।
রক্তিমদা মুখটা একটু ব্যাজার করে হাতটা গুটিয়ে নিল।তারপর বলল,”এক থালায় না খেলে কমরেড হওয়া যায় না।বুঝলি?”
সংঘমিত্রা কোনো উত্তর দিল না।একঝলক বহ্নিদিকে মনে পড়ল।বহ্নিদি থাকলে কখনও খাবে কিনা জিজ্ঞেস করে না।সোজা আদেশের গলায় বলে,”এই এটা খা।”
-”আচ্ছা আসছি।” বলে সংঘমিত্রা পা বাড়িয়েছিল,হঠাৎ সাদা ইউনিফর্ম পড়া দুটো লোক ঢুকে এল।একটা কালো কুচকুচে দৈত্যাকার,অন্যটাও লম্বা,অপেক্ষাকৃত কম কালো,সিড়িঙ্গে গোছের চেহারা।লোকগুলো ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
-”কি ব্যাপার রক্তিমবাবু?রোজ একটা নতুন মেয়ে, হ্যাঁ?”
রক্তিমদা কোনো উত্তর না দিয়ে নিষ্পলক লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
সংঘমিত্রার মুখ লাল হয়ে গেল,”ভদ্রভাবে কথা বলুন।”
-”ভদ্রভাবে ভদ্র ঘরের মেয়েদের সাথে কথা বলা যায়।আর ভদ্র ঘরের মেয়েরা পর্দাওলা কেবিনে এসে ঢোকে না।”বক্তব্যটা সিড়িঙ্গের।
-”আপনারা যা খুশি তাই…”রাগে, অপমানে সংঘমিত্রার গলা রুদ্ধ হয়ে এল।কালো মুশকোটা ওর দিকে তেড়ে আসছিল চোখ লাল করে,রক্তিমদা উঠে ওকে আড়াল করে দাঁড়াল।
-”ও আমার কলিগের মেয়ে,জাস্ট পরিচিত-এইটুকুই।রিল্যাক্স।”হালকা গলায় বলল রক্তিমদা।
-”মেয়ে মেয়েই হয়,সেটা যারই হোক রক্তিমবাবু।তা মাস ছয়েক আগে তো বহ্নি সেনগুপ্তকে নিয়ে এরকম একটা জায়গায় বসেছিলেন।এখন কোথায় সে?”
-”আমরা গণতন্ত্রী রাজনীতি করি।ওসব অ্যান্টিসোশাল কাজকর্মে সমর্থন নেই।আমাদের পথ অনেকদিন আগেই আলাদা হয়ে গেছে। ও কোথায় খুন করে লুকিয়ে আছে তার দায় তো..”
-”থামুন থামুন বড্ড বেশী কথা বলছেন।ওসব গল্প সাংবাদিকদের শোনাবেন।অঞ্জন গুঁইয়ের মার্ডার কেসটা থেকে যদি বেঁচেও যান,শ্যামল বাবুর কেসটায় আমরা ছেড়ে কথা বলব না।কোথায় বহ্নি?”ধমকের সুরে বলল সিড়িঙ্গে।
সংঘমিত্রার বুকের মধ্যে আবার একটা লোহার বাড়ি খাওয়া যন্ত্রণা জমাট বাঁধছিল।রক্তিমদা বহ্নিকে নিয়ে পর্দাওলা কেবিনে বসেছিল?তবে যে বহ্নিদি বলেছিল ওদের মধ্যে কোনো সেরকম সম্পর্ক নেই!সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিমান আপদগুলোর আতঙ্কের চেয়েও এই অনুভূতিটা তীব্রতর হয়ে চেপে বসছিল।তার মধ্যেই দেখল রক্তিমদা হাতের ইশারায় ওকে বেরিয়ে যেতে বলছে।পা বাড়াতেই মুশকো ধমকে উঠল,”কোথায় যাচ্ছেন?”
-”আরে ও সুবিমলদার মেয়ে,মানে আমার যে মাননীয় সিনিয়র কোলিগ আপনাদের কনভিন্স করছেন যে আমি অঞ্জনবাবুকে খুন করিয়েছি সেই ভদ্রলোক।”হাসি হাসি মুখে বলল রক্তিমদা।
-”ও আচ্ছা,আপনি ইনভলভড নন?”
-”আমার সাথে সেদিন দুপুরে অঞ্জনদার তর্কাতর্কি হয়েছিল।তার মানেই এই নয় যে আমি ওঁকে খুন করিয়েছি।এই তো আপনাদের সাথেও তর্ক হচ্ছে এর মানে তো আর এই নয় যে….” কথার মাঝখানেই সিড়িঙ্গে অফিসার বিপজ্জনক ভাবে রক্তিমদার এত কাছে এগিয়ে এলেন যে প্রায় কোলে উঠে যাবেন।তারপর ওর মুখের খুব কাছে মুখ এনে হিসহিসে গলায় বললেন,”রক্তিমবাবু আপনি বড়লোকের ছেলে,প্রোফেসর।পুলিশের সাথে ইয়ার্কি মারার চেষ্টা করতে যাবেন না।কারণ এর রিট্যালিয়েটরি এফেক্টটা সামলাতে পারবেন না।বহ্নি সেনগুপ্তর মত পাকিস্তান থেকে তাড়া খাওয়া রিফিউজির সমান আপনি কোনোদিন হতে পারবেন না।ওরা কুত্তার মত মার খেতে পারে,আপনার এই লালটুস বডিতে, জাস্ট সহ্য হবে না।মনে রাখবেন,বাঘে ছুঁলে….”
এই তর্জন গর্জনের মধ্যেই সংঘমিত্রা বেরিয়ে এল।সুবিমল ভট্টাচার্যের মেয়ে শোনার পর থেকেই ওরা আর বাধা দেয়নি।
বেরোবার পর পরই যে ফুটপাথ ধরে একজন পিছু নিয়েছে সেটা বুঝতে পারছিল সংঘমিত্রা।বাসস্টপের কাছে এসে ছেলেটা মিহি গলায় ডাকল,”সংঘমিত্রাদি শুনছেন?”
সংঘমিত্রা ফিরে তাকাল,একটা ছোটখাট চেহারার ফর্সা ছেলে।তবে বয়সে ওর থেকে বড়ই হবে।
-”রক্তিমদা আপনার বন্ধু?”
-”আপনি কে?আমার নাম জানলেন কি করে?”
-”না আসলে রক্তিমদাকে একটা কাগজ দেওয়ার ছিল,পুলিশ ঢুকেছে দেখলাম তাই….”
-”আমার বন্ধু নয়।”
-”তাহলে যে আপনারা কথা বলতে বলতে ঢুকলেন…”বিগলিত ভঙ্গিতে ছেলেটা বলল।
সংঘমিত্রার বিরক্তি জাগছিল।সেটা লুকোবার কোনো চেষ্টা না করেই বলল,”কি দরকার সেটা তাড়াতাড়ি বলুন।আমার তাড়া আছে।”
ছেলেটা বলল,”বহ্নিদি আপনার কথা খুব বলতেন আর কি!তাই আপনাকে চিনি।যাই হোক এই কাগজটা রক্তিমদাকে দিয়ে দেবেন?”
-”কি আছে এতে?”
ছেলেটা উত্তরে ঠোঁট উলটাল।
সংঘমিত্রা একটা বইয়ের মধ্যে কাগজটা ঢুকিয়ে নিয়ে হাঁটা দিল।সর্বনাশ! বাসস্টপে পুলিশের ভ্যান।অবশ্য ওদিক দিয়ে একটা ধর্মীয় মিছিল আসছে,সে কারণেও হতে পারে।তাও রিস্ক নিয়ে কাজ নেই।পুলিশ এত সহজে রক্তিমদার কথায় তাকে ছেড়ে দিল এব্যাপারটায় একরকম বিপদের গন্ধ আছে।যদিও সে পার্টির কাজে তেমন কিছুই ইনভলভড নয়,তাও।পুলিশকে বিশ্বাস নেই।
চট করে একটা গলির পথ ধরল সংঘমিত্রা।গলিতে ঢোকার পর থেকেই সে অনুভব করছিল বসন্ত কেবিনের উলটো ফুটে দাঁড়ানো ভয়ঙ্কর চেহারার একটা ছেলে তার পিছু নিয়েছে।ফিরে একবার ছেলেটাকে দেখল সংঘমিত্রা,ছফুটের মত লম্বা,এই চওড়া বুকের ছাতি,ঢিলে শার্টের উপর দিয়ে পেশীর চিহ্ন ফুটে উঠেছে,গায়ের রঙ বেশ ভালরকম চাপা,আর মাথার চুলগুলো ঠিক ভেড়ার লোমের মত।শুধু চোখগুলো মারাত্মক প্রমিনেন্ট,কেন যেন খুব চেনা লাগল চোখগুলো।কোথায় দেখেছে!শুধু মনে হচ্ছে চোখের রঙটা কালো না হয়ে ধূসর হওয়া উচিত ছিল।এত কালো লম্বা চওড়া চেহারা সাধারণত পুলিশের লোকের হয়।
দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল সংঘমিত্রা।আজ রক্তিমদা থেকে শুরু করে সবাই মিলে তার পিছু নিচ্ছে কেন কে জানে!ছেলেটা হঠাৎ ডাকল,”এই যে শুনছেন?”
সংঘমিত্রা শুনেই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল,রাস্তাটা পুরো শুনশান।এখানেই কাছাকাছি কোথায় সুভাষদারা ডেরা বানিয়েছিল যাদবপুর ছাড়ার পর।ছেলেটা পিছনে প্রায় দৌড়াচ্ছে,ফলে সংঘমিত্রাকেও গতি বাড়াতে হল।ছেলেটা চেঁচিয়ে বলল,”একটু দাঁড়ান প্লিজ,সেই সকালে আপনি বাড়ি থেকে বেরোনোর পর থেকে ফলো করছি।খুব দরকারি কথা…”
হঠাৎ একটা বাড়ির ভিতর থেকে সুভাষদা বেরিয়ে এল,”কিরে তুই?দৌড়াচ্ছিস কেন?”
-”দেখো না ঐ ছেলেটা আমায় ফলো করছে, আবার বলছে সকালে আমি বাড়ি থেকে বেরোনোর পর থেকেই নাকি ফলো করছে।”
-”কি ব্যাপার দাদা,চেহারা দেখলে তো ভদ্রলোকের ছেলে বলেই মনে হয়।”সুভাষদা ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল।
সুভাষদার একে ভদ্রলোক মনে হচ্ছে!সংঘমিত্রা বেশ অবাক হল।ঐ বাড়িটা থেকে অরিন্দমদাকেও বেরিয়ে আসতে দেখা গেল,সে ছেলেটাকে দেখে অবাক হয়ে বলল,”আরে এটা তো বহ্নির দাদা।”
সুভাষদা বিস্মিত চোখে ছেলেটাকে দেখল,তারপর বলল,”বাবা এসব দোষও আছে নাকি?”
অরিন্দমদা জিজ্ঞেস করল,”দোষ মানে?”
-”কিসব বলছে,সংঘমিত্রা বাড়ি থেকে বেরোনোর পর থেকেই নাকি ফলো করছে!”
-”ধুর হাতে খাবার টাবারের প্যাকেট দেখেছে বলে বোধহয়।একে আমি খুব ভাল করে চিনি।নাম্বার ওয়ান পেটুক আর গাম্বাট।গাম্বাট না হলে কেউ নিজেই ফলো করার কথা বলে?”
-”কি ব্যাপারটা কি?”সুভাষদা ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটা সম্ভবত গাম্বাট বলায় রেগে গেছিল,কিন্তু ওদের আস্তানা বলে বেশী কিছু বলতেও পারছিল না।
-”ছাড়,বহ্নির দাদা হয়।”বলে অরিন্দম ছেলেটার উদ্দেশ্যে বলল,”যান বাড়ি চলে যান,ফালতু ঝামেলা চাই না আমরা।”
ছেলেটা কিছু বলতে যাচ্ছিল,হঠাৎ সংঘমিত্রা যেদিক দিয়ে ঢুকেছিল তার উল্টো দিক দিয়ে একটা ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে বলল,”খুব বাজে খবর আছে অরিন্দম।স্বাতীকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে।”
(ক্রমশ)

দ্রোহকাল ১১
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments