ব্যাগটা জানলার সামনে রেখে খাটে বসলাম।আজ বাড়াবাড়ি রকমের ধকল গেছে।ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে একফোঁটা রেস্ট পাইনি। দুটো ব্যাচের পরপর টিউশন ছিল।ক্লাস এইট আর উচ্চ মাধ্যমিক।বাবা রেডিওটা নিয়ে বসে আছে।আমার দিকে তাকাল না।মা একটা গ্লাসে জল নিয়ে এল,”চায়ে পিয়েগা য়া খানা লাগাদু?”
-”খাবার কি আছে?”
মা বিরক্ত চোখে একবার আমায় দেখল।আমার ঔদরিকতা ব্যাপারটা কেউই ভাল চোখে দেখে না।বিশেষ করে এরকম একটা পরিস্হিতিতে খাবার নিয়ে বিচার করা থাবড়া খাওয়ার মত কাজ।
-”রুটি আছে।চিনি দিয়ে খেতে হবে।ডাল খতম হয়ে গেছে।”
-”আচার?”
-”তু ইনসান হ্যায় য়া…”আমার ধৃষ্টতায় স্তম্ভিত হয়েই সম্ভবত কথা শেষ করতে পারল না।উঠে গেল।বাড়ীর লোকেদের আচার দিতে মা বড় একটা পছন্দ করে না।বিশেষ করে বহ্নি চলে যাবার পর থেকে।বহ্নি আচার ছাড়া রুটি,পরোটা বা ভাত এমনকি টোস্ট পর্যন্ত খেত না।
মা খাবার বেড়ে দিচ্ছে দেখে উঠে এসে বারান্দায় বসলাম।বাহ্ অনেকটা কাশ্মীরি লঙ্কার আচার দিয়েছে।কিন্তু খেতে বসে আর কিছুতেই খাবারটা গলা দিয়ে নামল না।মা সামনে বসে ছিল,গম্ভীর গলায় বলল,”আচারটা কিন্তু বিক্রির জন্য করা হয়।পাতে নিয়ে নষ্ট করবি না।”
আমি কিছু না বলে খাওয়ার চেষ্টা করলাম।
-”তুঝসে কুছ বাত করনি থি।
আমি মার দিকে না তাকিয়ে থালায় খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করায় মা রেগে গেল।
-”আমি যখন কথা বলছি তখন আমার দিকে তাকাবি।উঁচু নাকটা ঘরের বাইরে দেখাস।”
-”শুনছি তো।”
আমার নির্লিপ্ত গলা শুনে মা আরো রেগে গেল,”তুই শুনছিস কিনা আমি জানতে চাইনি,আমি বলেছি আমি যখন কথা বলব আমার দিকে তাকাবি,ব্যস।”
আমার যে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে না তা নয়,কিন্তু মার সাথে চালিয়ে যাবার মত এনার্জি আর সত্যিই এখন অবশিষ্ট নেই।মা একটু তর্ক করলেই মারাত্মক চ্যাঁচাবে,আর মার গলাটা খুব একটা শ্রুতিমধুর নয়।
আমি সারেন্ডার করলাম,মার দিকে তাকিয়ে বললাম,”বলো।”
-”আমাকে পার্টির কাজে কাল ধানবাদ যেতে হবে।বাবা কা খেয়াল রাখনা।আর কয়েকটা আচারের ডেলিভারি দিতে হবে,আমার নোটবুকে লেখা আছে।বাবাকে একটু বুঝিয়ে দিস।তুই তো সারাদিন বাড়ী থাকবি না।”
-”আর কিছু?”
-”হ্যাঁ,তোমার জন্য ছোট কৌটোয় বাঁশের তেল আচার তোলা আছে।আর বাবার জন্য আমসত্ত্ব খেজুরের মিষ্টি আচার।বিক্রির জন্য যে বোয়ামগুলো রাখা আছে তাতে হাত দিও না।”
আমি কিছু না বলে খাওয়ার দিকে মন দিলাম।মা এখন আমাকে অদ্ভুত চোখে দেখছে।একসময় জিজ্ঞেস করল,”বুনুর কোনো খোঁজ পেলি না?”
-”পেলে তো বলতাম।”
মা ছলছলে হলুদ চোখে কিছুক্ষণ মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর বলল,”একবার সমীরণ বাবুর বাড়ীতে খোঁজ নিতে পারিস তো?”
-”তুমিই নাও না।”
-”তুই কি মনে করিস নিজেকে?এতটা লাপরওয়া মানুষ হতে পারে?সারাক্ষণ গেলা ছাড়া আর কিছু মাথায় থাকে?”
আমি আবার কোনো উত্তর দিলাম না।মা স্বগতোক্তি করল,”এই বয়সী একটা মেয়ে,তার ওপর ওরকম একটা রূপ নিয়ে….”
মাথাটা দুহাত দিয়ে চেপে ধরল মা,”তং আগয়ী হু ম্যায় তুম সবসে।”

মা শিফনের নীল শাড়ি ও কাচের চুড়িতে সজারুর মত শব্দ তুলে উঠে চলে গেল।আমি একবার সেদিকে দেখে আবার খাওয়ায় মন দিলাম।রাগ,আনন্দ,কান্না-সব সময়েই মাকে খুব সুন্দর দেখতে লাগে।আমার মামাবাড়ি জয়পুরে।ওদের প্রত্যেকেরই একটা নাৎসী স্ট্যান্ডার্ডে কোয়ালিফাই করার মত আর্য চেহারা আছে।দাদু দাবী করে তারা নাকি রাণা প্রতাপের বংশধর।দাবীর ক্রেডিবিলিটি কতদূর জানি না তবে ওদের চেহারা গুলোয় বেশ বর্ণাশ্রম রক্ষার ছাপ আছে।
বাড়ীর মেয়েদের পর্যন্ত কারো হাইট পাঁচ সাতের কম নয়।গায়ের রঙটা হচ্ছে যাকে বলে ‘তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ’ বা দুধে আলতা।যেমন মারটা দুধে আলতা।আরেকটা চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে এদের সবার চোখের রঙ কটা।এরা নাকি ছেলেদের জন্য পাত্রীও আনে চোখের কটা রঙ দেখে।বহ্নিও ঐ ধাঁচটা পেয়েছে।ধূসর চোখ।এত ফর্সা যে চুলের রঙ লাল।

সব কিছু অন্যরকম হতে পারত। গত মাসেও বোঝা যায়নি এরকম পরিস্হিতি তৈরী হতে চলেছে। অবশ্য বহ্নি না থাকাতেও যে আমাদের রোজকার বাঁধা গথে তেমন কিছু বদল এসেছে তা নয়।এখনও সবাই আচার নিয়ে একই রকম চিন্তিত।ঐ মনের মধ্যে একটা ম্যাজমেজে ভাব,দুশ্চিন্তা, একটা বিষাদগ্রস্ত শূন্যতা,মাঝে মাঝে বাবার নীরব ও মার সরব কান্নাকাটি – এটুকুই।

বহ্নির ছাত্র রাজনীতি করার ব্যাপারটা আমাদের কাছে গোপন ছিল না।শুধু উচ্চমাধ্যমিকের স্ট্যান্ডার্ডটা যাতে ধরে রাখে সেটুকুই তাকে বাড়ী থেকে বলা হয়েছিল।বহ্নি উচ্চমাধ্যমিকে থার্ড হয়েছিল।আর জয়েন্ট এন্ট্রান্সে ফার্স্ট।
থার্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়াশোনা নিয়ে অন্তত অভিযোগের কোনো সুযোগ ছিল না।মানে পড়াশোনা আর স্পোর্টস ছাড়া আর কিছু চিনতই না মেয়েটা।
তার বানানো বুলেট প্রুফ কারের মডেল নিয়ে দিল্লীর বিখ্যাত দুটো সায়েন্স ম্যাগাজিনে লেখালেখি হয়েছিল।জাতীয় স্তরের ম্যাগাজিনগুলোতে তিন বার তার লেখা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে।প্রোফেসররাও খুব আশা করেছিলেন ওকে নিয়ে।ও হ্যাঁ,ওর পড়াশোনা নিয়ে ইদানীং খবরের কাগজগুলো লিখলেও একটা বিষয় অনেকেই জানে না।ও বক্সিং এ আন্ডার নাইন্টিনে স্টেট লেভেল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

ওদের পার্টির লিফলেটসগুলো আমি পাওয়ার পর অম্লান মুখে বলেছিল তার ব্যাপারটা লুকোনোর কোনো উদ্দেশ্যই ছিল না।আজ বাদে কাল ব্যাপারটা জানাতেই হত।যদি সে লুকোতে চাইত তাহলে আমরা নাকি কোনোদিন জানতেই পারতাম না।
কিছু অশান্তির পর বহ্নিকে এক সপ্তাহ বাড়ী থেকে বেরোতে দেওয়া হয়নি।কলেজ কামাই করার ব্যাপারে আমার বা বাবার সায় ছিল না।কিন্তু মার যুক্তি ছিল কলেজে গেলেও কতদূর ক্লাস করে সন্দেহ আছে।
আটদিনের দিন সেই ছেলেটা এসেছিল।রোগা,ছ ফিটের কাছাকাছি লম্বা আর নরম চোখের সেই ছেলেটা।রক্তিম মজুমদার।বাঙালী কোন ছেলেকে যে এতটা সুন্দর দেখতে হতে পারে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
সে নিজের পরিচয় দিয়েছিল বহ্নির কলেজের অধ্যাপক হিসাবে।বয়স কত হবে,সাতাশ আঠাশ।
বহ্নি বাইরের লোকের গলা শুনে তাকে দেখে থমকে গিয়েছিল।
সে ভরিক্কি গলায় বলেছিল,”এতদিন ধরে কলেজ কামাই করছ কেন?ইরেসপন্সিবিলিটির একটা সীমা আছে।”
বহ্নি বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়েছিল।কোন উত্তর দেয়নি।
ছেলেটা বলেছিল,”আমাকে দেখে তুমি হয়ত অবাক হয়েছ।আমাকে আসতে হয়েছে প্রোফেসর লায়াপুনভের জন্য।তুমি তাঁকে অ্যাসিস্ট করতে করতে মাঝপথে হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেলে।ওঁর কাছে আমাদের কতটা ছোট হয়ে যেতে হল,শুধু তোমার জন্য।”
বহ্নিকে ছেলেটা একতরফা ধমক দিয়ে যাচ্ছিল।আমার ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক লাগছিল,কারণ বহ্নি কারো ধমকই মাথা নীচু করে শোনার মেয়ে নয়।
একটু পজ নিয়ে বলেছিল,”তুমি আমার সাথে যাবে।”
এতক্ষণ আমরা কিছুটা পাজলড হয়ে দেখছিলাম,এভাবে মাস্টারমশাইরা বাড়ী চলে আসে না সাধারণত।বুড়ো টুড়ো পাগলাটে ছাত্রদরদী হলে আলাদা।তবে এক্ষেত্রে ছেলেটার কথায় যুক্তি ছিল।
বহ্নি মস্কোর প্রোফেসর লায়াপুনভকে গত বছর থেকে অ্যাসিস্ট করছে।ভদ্রলোক যাদবপুরে গবেষণা করছেন গত দুবছর ধরে।কিছুদিন আগেও এই রাশিয়ান ভদ্রলোকের গল্প করে মাথা ধরিয়ে দিত।
কিন্তু শেষের কথায় একটু খটকা লাগল।মারও বোধহয় লেগেছে,বলল,”আপনার সঙ্গে করে নিয়ে যাবার জরুরত আছে কি?ও একাই যেতে পারবে।”
ছেলেটা এবার একটু অপ্রতিভ হয়ে বলল,”না আসলে আমি গাড়ী নিয়ে এসেছি।”
-”কোথায়?”
-”এখানে তো পার্ক করার জায়গা নেই তাই ড্রাইভারকে একটু ঘুরে আসতে বললাম।মেন রোডে থাকবে।”
বহ্নি ভুরু কুঁচকে বলল,”আপনি বললেই আমি যাব এটা ধরে নিচ্ছেন কি করে?”
-”মুখে মুখে তর্ক কোরো না।যা বলছি তোমায় শুনতে হবে।”
-”ফ্যাকাল্টি সিস্টেমের দালাল ছাড়া কিছু নয়।আমরা একসময় অজ্ঞ ছিলাম, আপনাদের শ্রদ্ধা করেছি যা আপনারা ডিজার্ভ করেন না।পেশার কারণে কোনো বাড়তি ভক্তি আশা করবেন না।শ্রদ্ধাটা অর্জন করতে জানতে হয়,আপনারা ওতে ব্যর্থ হয়েছেন।”
-”হাউ ডেয়ার ইউ?”
বহ্নি খুবই বিরক্ত হয়ে আমাকে বলল,”দাদা এটাকে বের করে দিচ্ছিস না কেন?”
এরকম অসভ্যতা করার জন্য মা বহ্নিকে বকল।তারপর রক্তিমের কাছে দুঃখপ্রকাশ করে তাকে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিতে বলা হল।
বহ্নি স্নান করল না।তবু তৈরী হতে মানে ব্যাগ গোছাতে প্রচুর সময় নিল।
সেই অবকাশে বহ্নি কতটা অসভ্য হয়ে গেছে সেই নিয়ে মার সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলল।ছেলেটাকে দেখে মনে হল যেন নালিশ করতেই এসেছে।
এরমধ্যে মা উঠে গিয়ে ছেলেটাকে চায়ের সাথে একটা থালায় ছোট বাটিতে কিছুটা চানাচুর আর একপাশে অনেকটা আমের মিষ্টি আচার এনে দিল।
খেতে খেতে বহ্নির পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া, উগ্র রাজনীতি, থ্রেট দিয়ে ক্লাস বন্ধ করিয়ে দেওয়া ইত্যাদি আলোচনা চলছিল।আমার ব্যাপারটা বেশ বিরক্তিকর লাগছিল। ছেলেটা এক মিনিটে চানাচুর শেষ করে ঠিক ক্ষুধার্ত কুকুরের মত করুণ চোখে মার দিকে দেখছিল,যেন আরো পেলে ভাল হয়।মা বহ্নির কুকীর্তি নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে লক্ষ করল না।
হঠাৎ বহ্নি নিঃশব্দে একটা বড় বাটিভর্তি মুড়ি চানাচুর ও একটা মর্তমান কলা ছেলেটার সামনে রেখে দিয়ে আবার ঘরে ঢুকে গেছিল।আমার ব্যাপারটা ভাল লাগল না।কেউ কোনদিন দেখেছে বাড়ীতে নালিশরত মাস্টারমশাইকে অযাচিত ভাবে খাবার এনে দিতে?ছেলেটাই বা এরকম দুর্ভিক্ষপীড়িতের মত ভঙ্গীতে খাচ্ছে কেন?দেখলে মনে হয় কাল রাত থেকে যেন খাওয়া জোটেনি।
ছেলেটা এক মুহূর্তের জন্য মুখ থেকে অধ্যাপকের গাম্ভীর্যের মুখোশ খুলে কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়েছিল বহ্নির দিকে।তারপর দ্বিতীয় বাটিটাও শেষ হতে বেশী সময় লাগল না।
ওরা বেরিয়ে যাবার সময় বহ্নির ব্যাগটা অস্বাভাবিক ভারী লাগছিল।তাতেও কিরকম খটকা লাগল।গিটারটা নিয়ে সন্দেহের কিছু নেই,বহ্নি কলেজে গেলে ওটা নিয়েই যায়।
ওরা বেরিয়ে যাবার আধঘন্টা পর বিশু আমাদের বাড়ীতে এসেছিল।আমাকে আলাদা করে ডেকে চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করছিল,”বহ্নিকে দেখলাম ট্যাক্সি করে একটা ছেলের সাথে বেরিয়ে গেল।দুজনের হাতেই সিগারেট ছিল।সব ঠিক আছে তো বস?”
আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেছিল।বলেছিলাম,”আর কি দেখলি?”
-”একঝলক দেখলাম,ট্রাফিকে গাড়ী দাঁড়িয়েছিল,তারপর ছেড়ে দিল।দুজন খুব হেসে হেসে গল্প করছিল।”
তারপর থেকে ওর আর খোঁজ পাইনি।তবে ওর বিভিন্ন কৃতিত্বের কথা কানে আসছিল।বরানগরের ত্রাস শানুগুন্ডাকে নাকি সদলবলে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে পিটিয়েছে বহ্নি। চব্বিশ পরগণার সব কুখ্যাত সমাজবিরোধীরা নাকি তার ভয়ে তটস্হ।সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যে খবরটা কানে এল তা হচ্ছে ওর নামে এগারোটা মার্ডার কেস রয়েছে।তার মধ্যে প্রথম দশটার ব্লু প্রিন্ট ছকে দেওয়া ও এগারো নম্বরটা নিজের হাতে।এই এগারো নম্বরটা এসআই শ্যামল ভৌমিকের,ব্রড ডে লাইটে থানায় ঢুকে কমরেড ইএসজির তাকে ঝেড়ে দেওয়া এবং বেরিয়েও আসা।ইএসজি বা এক্সপ্লোসিভ সেনগুপ্ত(এত সুন্দর পিতৃদত্ত ‘বহ্নি’ নামটার কি দশা করেছে ঐ হেঁপোরুগীর পার্টি!) নামটা এক্সট্রিমিস্টদের মধ্যে এখন একটা রূপকথার চরিত্র এবং পুলিশের কাছে একটা নাইটমেয়ারে পরিণত।

(ক্রমশ)

দ্রোহকাল ১
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments