ডঃ সুবিমল ভট্টাচার্য কলকাতার হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের পরিচিত মুখ।গোমাতা ও হনুমান রক্ষা সমিতির প্রেসিডেন্ট।চিরাচরিত হিন্দুত্ববাদী নেতাদের যেমন দেখা যায় তার থেকে অনেকটাই আলাদা।শিক্ষিত,ইন্টেলেকচুয়াল,চার্মিং,পলিশড।একটা বয়েজ কলেজে অঙ্কের অধ্যাপনা করেন।দলের অবাঙালী নেতারা কেউ বাঙালী বলে তাঁকে খাটো চোখে দেখার সুযোগ পাননি।জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন,গোলাগুলি বোমাবাজির মধ্যেও নিষ্পৃহভাবে হেঁটে চলে যান আর অসাধারণ সংগঠক।আদর্শ গৈরিক বীরের চরিত্র যেমন হওয়া উচিত ঠিক তেমন।
লোকে সুবিমল বাবুকে যতটা গৈরিক মনে করে তিনি কিন্তু আসলে ততটা নন।মাঝে মধ্যেই এই শাস্ত্রী,দুবের মত আনকালচারড খোট্টাগুলোর ভীড়ে তাঁর দমবন্ধ লাগে।কিন্তু সমমনোস্ক লোকগুলো সব ডিপিআই,মানে কেন্দ্রীয় শাসক দলের সমর্থক, আর নতুনরা কমিউনিস্ট।সেটা আরও অসহ্য।সুবিমলবাবু জানেন এই কমিউনিস্টরা তাঁকে আড়ালে ‘হনুমান সুবিমল’ বলে।তিনি হনুমান।আর ঐ ফেবিয়ান সমাজতন্ত্রী ব্যারিস্টার কি?
কোথাও ছিল সেই ফেবিয়ান সোশালিস্ট প্রধানমন্ত্রী যখন তাঁদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসে নিঃস্ব হয়ে এসে ক্যাম্পে উঠতে হয়?অথচ পশ্চিম পাকিস্তানের রিফিউজিদের ক্ষেত্রে এই লোকটাই রাষ্ট্রীয় লঙ্গরের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল।
নতুন ছেলেগুলোর অধোগতি দেখে খারাপ লাগে,যেমন রক্তিম।তাঁদের কলেজে ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের টপার,দারুণ ব্রিলিয়ান্ট ছেলে,যাদবপুর থেকে এম এস সি ও পি এইচ ডি শেষ করে তাঁদের কলেজেই লেকচারার হয়ে ঢুকেছিল।সেই ছেলেটা পুরো সমাজবিরোধীতে পরিণত হয়েছে।সবার চোখের সামনে অঞ্জনবাবুর যা পরিণতি হল,ভাবতেও ভয় লাগে।
একটা বাইরের ছেলে এসে তাঁর ক্লাসে বসেছিল।সম্ভবত স্কুলে পড়া কোনো ছেলে,চোদ্দো পনেরোর বেশী বয়স হবে না।লোকাল থানা থেকে তখনই কিছু পুলিশ ঢুকছিল কলেজে।অঞ্জনবাবু তাঁর ক্লাসে কখনই বাইরের কাউকে অ্যালাউ করেন না।ছেলেটা নাকি বার বার কাকুতি মিনতি করছিল,তাকে বের করে দিলেই কারা যেন মেরে ফেলবে।অঞ্জনবাবু শোনেননি।সত্যি কথা বলতে সুবিমলবাবু হলেও একই আচরণ করতেন।ক্লাসটা কি চায়ের দোকান নাকি?পড়ানোর সময় এসব নুইসেন্স দেখলে খুবই মাথা গরম হয়ে যায়।তর্কাতর্কির শব্দে পুলিশ ক্লাসের সামনে চলে আসে ও ছেলেটাকে তুলে নিয়ে যায়।এরপরের ঘটনাক্রমগুলোই মর্মান্তিক।
ওকে নাকি খোলা রাস্তার উপর জাস্ট পাঁচ হাতি ঠান্ডা পেটা করে পুলিশ একটা মাংসপিন্ডে পরিণত করেছিল।খবরটা সেদিনই সোমাদি স্টাফরুমে এসে সেকেন্ড হাফে দিলেন।বীভৎস দৃশ্যটার সাক্ষী হবার দুর্ভাগ্য হয়েছিল তাঁর।খুবই ভেঙে পড়েছিলেন।সেকেন্ড হাফে কলেজে এসে পুলিশ আসা ও ছেলেটার গ্রেপ্তারের বিবরণ শুনে স্তম্ভিত অঞ্জনবাবুকে বলেছিলেন,”আপনি চাইলে ছেলেটা বেঁচে যেত।”
-”দ্যাটস নান অফ মাই বিজনেস।”বলেছিলেন অঞ্জনবাবু,”তাছাড়া আমি তো জানি না এরকম হবে।”
অধ্যাপকরা বেশীর ভাগ অঞ্জনবাবুর পাশেই দাঁড়ালেন।মানুষটাকে এভাবে কোণঠাসা করে ভিলিফাই করার জন্য দেবব্রতবাবু সোমাদিকে মৃদু ভৎসর্নাও করলেন।শুধু রক্তিম চুপ করে বসেছিল।তারও সেকেন্ড হাফেই ক্লাস,সেও সকালে কলেজে ছিল না।ওর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল।হাতের মুঠো ও চোয়াল শক্ত, ঘাড় গোঁজ করে বসে আছে ছেলেটা।চোখ লাল এবং ভেজা।
সুবিমলবাবু গিয়ে ওর কাঁধে হাত রেখেছিলেন অনেকদিন বাদে,ও উগ্র বামপন্থী রাজনীতি করে জেনেও।
-”রক্তিম”
-”আপনি তো সকালে কলেজে ছিলেন তাই না?”একরাশ ঘেন্নার সাথে চাপা স্বরে কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে রক্তিম উঠে গেছিল তাঁর হাতটা সরিয়ে।

তার সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই একদিন সকালে অঞ্জনবাবু….

রক্তিম তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে,পকেটে হাত,ঘাড় নীচু- পায়চারি করছিল করিডরে।অঞ্জনবাবু কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।তাঁর গোলাপি মুখটা চুনের মত সাদা লাগছিল।
-”নাহ অঞ্জনদা,কাজটা ভাল করেননি।”
-”রক্তিম প্লিজ দেখো…”
-”দেখাদেখির আর কিছু বাকি নেই দাদা,আর কত লোককে আপনাদের এলিটিজমের বলি হতে হবে বলুন তো?”
-”আমি কি জানতাম ও এরকম বিপদে পড়বে”
-”ও আপনাকে বলেছিল ওকে বের করে দিলে ও মরে যাবে।ওর মায়ের কথাটা ভেবে দেখেছেন একবার?আপনারও তো ওরকম একটা মেয়ে আছে।আপনার নিজের বাচ্চারাই মানুষ?অন্যের বাচ্চারা কুকুর বেড়াল বলুন?”
সুবিমল বুঝতে পারছিলেন যে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে।নইলে অঞ্জনবাবু একতরফা কারো কথা শোনার লোক নন।
-”কি হয়েছে?”এগিয়ে এসেছিলেন সুবিমল।
রক্তিম কড়া চোখে চশমার মধ্যে দিয়ে তাঁকে দেখল,তারপর বলল,”ঐদিন যখন নির্লিপ্ত হয়ে মজা দেখছিলেন,আজও সেটা করলেই পারতেন।ওহ না আজ তো আপনার কলিগ বিপন্ন…”
-”কি চাও বলতো তুমি?বলেছিলেন সুবিমলবাবু।
-”আপনাদের দেখলেও ঘেন্না হয়।”
রক্তিম আর দাঁড়ায়নি।
সেদিন কলেজ থেকে বেরোবার পাঁচ মিনিটের মধ্যে চারটে ছেলে অঞ্জনবাবুকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল।ঠিক দাড়ি কামানোর ভঙ্গিতে একজন মুখটা তুলে ধরল,অন্যজন নিপুণ হাতে চালিয়ে দিল ব্লেডটা।তখনও দিনের আলো ফুরোয়নি।

অঞ্জনবাবু মারা যাবার কিছুদিনের মধ্যেই রক্তিম আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে যায়।
শহরটাকে কয়েক বছরে একটা নরককুণ্ডে পরিণত করেছে এরা।তাও ঐ ভয়ে ভয়ে হাঁটাচলা করা,কারফিউর ভয়ে কলেজ কামাই করা- এসব ঠিক পোষায় না সুবিমলবাবুর।তাঁর সব জায়গাতেই সাহসী বলে খ্যাতি আছে।কিছুদিন আগে এই হুলিগানগুলো তাঁকে হুমকি দিয়েছে দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা করলে গলার নলি কেটে নেওয়া হবে।সংঘমিত্রার মা খুব ভয় পেয়েছিল।সুবিমলবাবু ব্যাপারটা তেমন পাত্তা দেননি।তবে অঞ্জনবাবুর ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর থেকে বিষয়টা অতটা হাল্কাভাবে নেওয়া যাচ্ছে না।আসলে ঘর পোড়া গোরু সিঁদূরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়।ভয়টা শুধু মরে যাবার নয়।ভয়টা শিকড় ছেঁড়ার,বউ মেয়ে নিয়ে যদি আবার পথে দাঁড়াতে হয়!ক্যালাইডোস্কোপের মত বদলে যাওয়া পৃথিবীটা দেখলে এই ভয়টাই জাগে সুবিমলবাবুর মনে।

বাবা আজ খেতে বসেও রক্তিমদার একপ্রস্হ নিন্দে করল।ছেলেটাকে কিন্তু এমনিতে খারাপ লাগে না সংঘমিত্রার।রক্তিমদা পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চের জন্য মাঝে মাঝেই যাদবপুর ক্যাম্পাসে আসত।এমনিতে ডিপার্টমেন্ট আলাদা, সংঘমিত্রার সাথে ওর আলাপ থাকার কথা নয়,আলাপটা হয়েছিল বহ্নিদির সূত্রে।ও আর বহ্নিদি সবার সাথেই কথা বলত।দেখা হলে টুকটাক কথা বলে যেত।মাঝে মাঝে বাবার কথাও জিজ্ঞেস করত।এত নরম আর ভদ্র স্বভাবের ছেলে খুব কম দেখা যায়।আসলে রক্তিমদাকে অপছন্দ করা যে কোনো কারোর পক্ষেই কঠিন।এই রকম ছেলেরা সাধারণত ওয়োম্যানাইজার হয়।কিন্তু রক্তিমদা একেবারেই ওরকম ছিল না।তার সমস্তটুকুই সবসময় একজনকে ঘিরে থাকত।সেই একজনের ঔদাসীন্যে মাঝে মাঝে রক্তিমদাকে মন খারাপ করতেও দেখেছে সংঘমিত্রা।অথচ ঐ একজনের জন্য সংঘমিত্রাকে এখন যা ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে!

বাইরে আচমকা খুব জোর একটা বোম ফাটার শব্দ শোনা গেল।তারপর সমানে গুলির আওয়াজ।বাবা বিরক্ত হয়ে বলল,”এই আবার শুরু হল।”
জানলার ঠিক পাশেই গদাম করে একটা বোমা ফাটল।ঠাম্মা ভয়ে ভয়ে বলল,”জানলাটা বন্ধ কইর‍্যা দাও না বাবু।”
বাবা উঠতে যাচ্ছিল,হঠাৎ জানলা দিয়ে ঝুপ করে লাফিয়ে একটা মেয়ে পড়ল।
সংঘমিত্রা মেয়েটার দিকে তাকিয়েই জমে গেল।মেয়েটা তখনও সংঘমিত্রাকে দেখতে পায়নি।খাবার টেবিলটা কোণার দিকে,জানলার কাছ থেকে হুট করে চোখে পড়বে না।
সুবিমল ভট্টাচার্য অবাক চোখে মেয়েটাকে দেখলেন,সারা গায়ে কাদা মাখা,কাঁধের কাছটা থেকে রক্ত পড়ছে।মাথায় নোংরা ব্যান্ডেজ বাঁধা।বয়স কুড়ি একুশ হবে।মেয়েটার চোখের রঙ ধূসর,চুল লালচে বাদামি।আর এত নোংরা অবস্হাতেও বোঝা যায় মেয়েটা শ্বেতাঙ্গী।লম্বায় সুবিমলবাবুর সমান হবে,চেহারায় পাশ্চাত্য ছাপ স্পষ্ট।রাত এগারোটার সময় এই উত্তর কলকাতায় শাড়ী পরা মেমসাহেব?কিন্তু মুখটা যেন চেনা লাগছে,কোথায় দেখা!খবরের কাগজের কোনো ছবিতে কি……
সুবিমল বাবু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন,অবশ্যই ইংরাজীতে।মেয়েটা হাতজোড় করল,তারপর ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলল।
মিনিট খানেক পর বোধহয় বহিঃশত্রুদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে মাটির উপর বসে পড়ল।তারপর পরিষ্কার বাংলায় বলল,”আমাকে প্লিজ রাতটা এখানে থাকতে দিন।বেরোলে ওরা মেরে ফেলবে।”
স্পষ্ট বাঙালী উচ্চারণ।গলাটা একটু ভারী,মোটার দিকে,কিন্তু গলার স্বরটা অদ্ভুত সুরেলা,সুন্দর।
-”কিন্তু আপনি কে, কি বৃত্তান্ত বলবেন তো।”
-”ওরা বিরোধী পার্টির লোক,আমায় খুঁজছে ধরলে মেরে ফেলবে।”
-”আপনি কে তার উত্তরটা এখনও পাই নি।”
-”কি জানতে চান স্পেসিফিকালি বলুন,নাম বলতে পারব না।আমাদের পূর্বাশ্রমের নাম বলা বারণ।”
মেয়েটার ধৃষ্টতায় সুবিমলবাবু স্তম্ভিত হয়ে বললেন,”আমাদের বাড়ীটা সরাইখানা নয়।প্লিজ বেরিয়ে যান।”
-”আপনি কেন বুঝতে পারছেন না?” মেয়েটা অসহায় ভাবে বলল,”ওরা ধরতে পারলে আমাকে রেপ করবে,তারপর মেরে ফেলবে।নিজের মেয়ে থাকলে তাকে এভাবে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিত পারতেন?”
মেয়েটা রক্তিমের ভাষায় কথা বলছে দেখেই একপ্রস্হ বিতৃষ্ণা গ্রাস করল সুবিমলবাবুকে।বললেন,”আমি ফ্যামিলি নিয়ে বাস করি,আপনার জন্য তাদের বিপদে ফেলা সম্ভব নয়।আপনি যদি ভদ্র কথায় না যান,পুলিশ ডাকতে বাধ্য হব।”
-”আমি এটা সাধারণত করতে চাই না কিন্তু আপনি যখন বাধ্য করছেন” মেয়েটা পিঠের নীচে,শাড়ির পিছনে গোঁজা একটা আগ্নেয়াস্ত্র খুলে এনে সুবিমলবাবুর দিকে তুলে ধরল,”আশা করছি এবার আর থাকতে দিতে আপত্তি নেই।”

(ক্রমশ)
(প্রতি সপ্তাহে একবার আসবে)

দ্রোহকাল ২
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments