-”আর ভাত লাগবে?”পায়েসের বাটিটা বহ্নিদির থালার পাশে রেখে জিজ্ঞেস করল সংঘমিত্রা।

-”নাহ্।”

পায়েসটা দেখে বহ্নিদি খুশী হবার বদলে যেন খানিকটা এমব্যারাসড হল,”এটা লাগবে না।”

-”খেয়ে নাও।”নরম গলায় বলল সংঘমিত্রা।

বাবা চশমার মধ্যে দিয়ে কটমট করে সংঘমিত্রাকে দেখছে।নেহাত কলিযুগ বলে তার ব্রহ্মতেজটা কাজ করে না।সংঘমিত্রা বুঝতে পারছিল বহ্নিদি গেলে তার কপালে দুঃখ আছে।

ওকে এত খাতির করে খাওয়ানোর ব্যাপারটা বাবা মোটেই ভাল চোখে দেখছে না।

অথচ ওকে সেরকম কিছু দেওয়াই যায়নি।ও যখন এল সবার খাওয়া হয়ে গেছে,শুধু খানিক ভাত পড়ে আছে,সেটাই মাখন আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে দিতে হল।এর মধ্যে ঠাম্মা আরেক গন্ডগোল পাকাল।সে চোখে কম দেখে দেখে, বন্দুক দেখানোর ব্যাপারটা সম্ভবত বুঝতে পারেনি।বহ্নিদি খাবার চাওয়ায় বলে ফেলেছিল,”ও বৌমা,মাইয়াডারে একডা ডিম ভাইজা দাও।আর তো কিছু নাই।”

তাতে বাবা রেগে গিয়ে চেঁচাতে শুরু করেছিল,বহ্নিদি বাবার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলেছে,”নিজের মার সাথে ঐভাবে কথা বলতে নেই।আর একটাও আওয়াজ যাতে না শুনি।”

তারপর ঠাকুমার দিকে ফিরে বলল,”না দিদা আমার কিছু লাগবে না,শুধু ভাত হলেই হবে।”

সংঘমিত্রা তাও উঠে একটা বাটার পোচ ভেজে আনল।মা এখন করবে না সেটা জানা কথাই।”

বহ্নিদি ঘরে ঢুকেই প্রথমে টেলিফোনের তার কেটে দিয়েছিল।ফোনের পাশে বসে থাকা সংঘমিত্রাকে দেখে অবাক হয়েছিল খুব।তবে সংঘমিত্রা এবাড়ীতে থাকে জানার পর থেকে রিভলভারটা আর বের করেনি।

-”তো তুমি এসব অ্যান্টিসোশাল এলিমেন্টসদের সাথে মিশছ?”উপরে যাওয়ার আগে সংঘমিত্রাকে আগুনঝরা চোখে মেপে গেল বাবা।

সংঘমিত্রার মনে পড়ল বাবা আজ থেকে কয়েক বছর আগে যখন বহ্নিদির ছবি খবরের কাগজে বেরিয়েছিল তখন সংঘমিত্রাকে ঐ মেয়েটার মত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল।বোর্ডের পরীক্ষায় র‍্যাঙ্ক নিয়ে বাঙালীদের হুজুগ এতই বেশী যে তারা বিচিত্র একটা ইংরাজী পরিভাষা আবিষ্কার করেছে তাই নিয়ে- ‘স্ট্যান্ড করা’।সংঘমিত্রার ঐ স্ট্যান্ড করা মেয়েটার মত হওয়ার কথা ছিল।সংঘমিত্রা সেটা হয়নি।নিজের মত হয়েছে,আর কোনো বাবাই এই নিজের মত হওয়া ব্যাপারটা পছন্দ করেন না।যদিও সংঘমিত্রা এই মুহূর্তে বাবাকে নিয়ে তেমন ভাবছিল না।শ্যামলবাবুর কেসটা নিয়ে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।পুলিশ বাড়িতে কিছু খোঁজ করতে এলে মারা পড়তে হবে।হতচ্ছাড়া মাকুগুলো কি আর বহ্নিদির সাথে সংঘমিত্রার সখ্যের ব্যাপারটা পুলিশকে জানায়নি!একদিকে হনুমান,একদিকে মাকু।আর এখন সামনে বহ্নিদি।বেচারা সংঘমিত্রা এরকম চললে সিভিল সার্ভিসের পড়ায় মন দেবে কি করে!

যাই হোক আপাতত বহ্নিদির হাতের চোটটার ব্যবস্হা করা দরকার।ব্লাউজের কাঁধের কাছটা ছিঁড়ে গিয়ে বিশ্রী ভাবে রক্ত জমে আছে।

তুলো আর ডেটলটা নিয়ে এল সংঘমিত্রা।বহ্নিদি দেখে বিরক্ত হল।

-”আবার এগুলো কেন?জল দিয়ে ধুয়ে নিলেই তো হত।”

-”রক্ত পড়ছে বহ্নিদি।”

-”রক্ত বন্ধ হয়ে গেছে।আমি ডেটল লাগাব না, জ্বালা করে।”

-”ওরকম কোরো না।ব্লাউজটা বদলাতে হবে।আর তোমার মাথার ব্যান্ডেজেও কাদা লেগেছে।”

-”ও হ্যাঁ।”বহ্নিদি বেসিন থেকে জল নিয়ে আন্দাজে ব্যান্ডেজের উপর লেগে যাওয়া কাদা হাত দিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করল,”এবার ঠিক আছে?”

-”হ্যাঁ,এসো ডেটলটা লাগিয়ে নাও।”খানিকটা দুরন্ত বাচ্চাকে শান্ত করার মত মনে হচ্ছিল সংঘমিত্রার।

বহ্নিদির ব্লাউজটা কাঁধের উপর থেকে একটু নামিয়েই আঁতকে উঠল সংঘমিত্রা।বাহুর উপরে যেখান থেকে রক্ত পড়ছিল ওটা কোনো ধারাল কিছুর আঘাত নয়।ভোঁতা কিছু দিয়ে খুব জোরে বার বার আঘাত করলে যে চামড়া ফেটে রক্ত পড়ে সেইরকম চোট।”

সংঘমিত্রার মুখের অবস্হা দেখে বহ্নিদির ঠোঁটের কোণায় একটা বিদ্রূপাত্মক হাসির আভাস ফুটে উঠল।

-”ছাড়,ফালতু ভয় পেয়ে যাবি।”

বলে বহ্নিদি সংঘমিত্রার থেকে তুলোটা নিয়ে নিজে জায়গাটা পরিষ্কার করতে লাগল।সংঘমিত্রা বেশ অবাক হয়ে দেখল ওর মুখে তেমন কোনো যন্ত্রণার অভিব্যক্তি নেই।কিন্তু ঠোঁট কামড়ানো বা ছলছলে চোখ দেখে ব্যথাটা বোঝা যাচ্ছিল।এই সময়গুলো কিরকম গা শিরশিরে একটা অনুভূতি হয় সংঘমিত্রার।বলল,”কি করে হল?”

-”হাতেরটা?আরে আগের দিন পুলিশ ক্যাম্পাসে লাঠিচার্জের সময় ওখানটা বার বার মেরেছে,আমি ব্যারিকেডে ছিলাম তো।তারপর আজ বাবলুরা বাঁশ দিয়ে আবার ওখানটাতেই মারল।”

সংঘমিত্রা শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করল।কি নির্লিপ্ত স্বর বহ্নিদির। কোন কুক্ষণে যে জিজ্ঞেস করতে গেল!এগুলো শুনতে মোটেই ভাল লাগে না।

লাঠি চার্জের দিন বহ্নিদি লাঠিটা মূলত খেয়েছিল দেবাঞ্জনাদি আর বি এ ফার্স্ট ইয়ার ইকোনোমিকসকে আড়াল করতে গিয়ে।বহ্নিদির ডিপার্টমেন্ট মেকানিকাল হলেও পুরো ইউনিভার্সিটির সর্বোচ্চ স্তরের ছাত্রনেতা তাকে আর রক্তিমদাকে বলা যায়।আগে প্রদীপদা এই পজিশনে ছিল,বছর দুয়েক হয়ে গেল সে উত্তরবঙ্গে কাজ করছে।

সেদিন একটা বিশ্রী পরিস্হিতি হয়েছিল।বহ্নিদিদের ক্লাসের অরিন্দমদা বমি করছে,বহ্নিদির মাথা ফেটেছে, ইকোনোমিকস ফার্স্ট ইয়ার এম এ এর দেবাঞ্জনাদি চশমা ভেঙে মাথা চেপে ধরে বসে,ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই পুলিশের মারে কোলাপস করে যাচ্ছে।সংঘমিত্রা দোতলায় করিডরে দাঁড়িয়েছিল।এসব গোলমাল থেকে সে সবসময় শতহস্ত দূরে থাকতে পছন্দ করে।

থার্ড ইয়ার ইকোনোমিকসের সুভাষদা প্রায় অচৈতন্য এবং রক্তাক্ত বহ্নিদিকে ধরে নিয়ে আসছিল।বহ্নিদির পাঁচ ন’ফিটের শরীরটা বয়ে আনা খুব সোজা কথা না।বহ্নিদিকে দেখে সংঘমিত্রা বাধ্য হয়ে নেমে এসেছিল।বহ্নিদির মাথাটা কোলে নিয়ে ভেজা রুমালে বার বার মাথা থেকে নেমে আসা রক্তের ধারা মুছে দিচ্ছিল।সংঘমিত্রার হলুদ শাড়ীটা কিছুক্ষণের মধ্যে রক্তে লাল,তারপর বহু পরিশ্রমে ছোটোপিসির বাড়ী গিয়ে শাড়ী বদলে ফেরা।বাবা ওসব দেখলে বোধহয় কলেজ যাওয়াই বন্ধ করে দিত।

-”ঘুমোবে তো?এসো।” সিঁড়ির কাছে গিয়ে বহ্নিদিকে ডাকল সংঘমিত্রা।

-”কোথায়?”

-”আমার ঘর দোতলায়।”

-”আমি উপরে উঠব না।তুইও উঠবি না।আমার কাছে শুবি।”

-”কেন?”

-”রিস্ক আছে।আয় না মাদুরে অসুবিধা হবে না।”

-”কি মুশকিল আমাকে কেন নীচে শুতে হবে?”

-”আয় না,গল্প করব।তোর সাথে তো অনেকদিন ভাল করে কথাও হয় না।”

-”আচ্ছা বালিশটা নিয়ে আসি।”

-”তুই ওপরে যাবি না বললাম না?”

এবার সংঘমিত্রা সত্যিই বিরক্ত হল।বহ্নিদির কতৃত্ব ফলানোটা মাঝে মাঝে সীমা ছাড়িয়ে যায়।

-”আচ্ছা আমিও কি উপরে গেলেই পুলিশকে ফোন করে তোমায় ধরিয়ে দেব বলে তোমার মনে হয়?”

-”আমি সেটা বলেছি?”

-”তাহলে?”

-”তুই না করলেও তোর বাবা বা মা করতে পারেন।আর উপরে টেলিফোন আছে কিনা আমি জানি না।তুই আমার কাছে থাকলে তাঁরা সেটা করবেন না।”

-”মানে আমি তোমার হোস্টেজ তাই তো?”

থমথমে মুখে বলল সংঘমিত্রা।

-”আহা এসব টার্ম ইউজ করছিস কেন?”

-”তুমিই করতে বাধ্য করছ।”

-”ওয়েল,যে ভাবেই হোক,তোর বাড়ীতে প্রথম বার এলাম।বাড়ীতে আসা লোকেদের সাথে এরকম ব্যবহার করিস?”

নরম গলায় বলল বহ্নিদি।

সংঘমিত্রা বিরক্ত হয়ে মাদুরের উপর এসে বসে পড়ল।

-”আশ্চর্য কাপড়টা তো বদলাবে?এত নোংরা হয়ে থাকলে তো চোটগুলোয় ইনফেকশন হয়ে যাবে।”

-”আমার অভ্যাস আছে।ওসবের কোন দরকার নেই।”

-”আচ্ছা তুমিও আমার সাথে ওপরে চল।তাহলে তো আর আপত্তির কারণ থাকছে না।”

অনেক কষ্টে বহ্নিদিকে পোশাক বদলাতে রাজী করানো গেল।তারপরও বলল,”কোনো বাতিল শাড়ী বা ঘরে পড়ার শাড়ী থাকলে দে।”

-”তোমার এই ডিক্লাসমেন্টের ন্যাকামিটা একটু বন্ধ রাখা যায়?”

-”তোর কাছে হয়ত ন্যাকামি,আমার কাছে নয়।”

অসন্তুষ্ট গলায় বলল বহ্নিদি।

-”ডোন্ট টেক ইট দ্য রঙ ওয়ে।আমি ওভাবে বলতে চাইনি।তুমি কি করে ভাবলে আমি তোমায় খারাপ কিছু দেব?”

-”উফ এই ইমোশনাল ড্রামা শুরু করিস না।জিনিসটা কতদূর ফেরত দিতে পারব সন্দেহ আছে।ফেরত দিলেও হয়ত কেচে দিতে পারব না।আমাদের নিজেদের জামাকাপড়ই রেগুলারলি কাচা হয় না!”

-”তুমি একটু চুপ করবে?”

দোতলা থেকে পোশাক বদলে বালিশ চাদর নিয়ে আবার নেমে আসতে হল।বহ্নিদি উপরে থাকতে কিছুতেই রাজী হল না।

মাদুরের উপর বহ্নিদির পাশে শুয়ে পড়ল সংঘমিত্রা।ঘুম আসছিল না।একসময় বহ্নিদি বলল,”পুলিশ তোর কাছে আমার খোঁজ করেছে?”

-”হ্যাঁ।আমি বলেছি আমাকে দলে টানার চেষ্টা করত।ডোনেশন চাইত।স্কুলের মেয়ে বলে কথা বলতে হত।তাছাড়া ওকে সবাই ভয় পায়।বিরোধীরাও চটাতে চায় না।সেখানে আমি তো রাজনীতি করি না।কি করব?”

-”গুড।আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি?”

-”ফায়ার আর্মসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিল।আমি বলেছি আমি কিছু দেখিনি।”

বহ্নিদি আর কিছু বলল না।

একসময় সংঘমিত্রা জিজ্ঞেস করল,”আচ্ছা তুমি কলকাতায় আর থাকছ না?”

-”তোকে কে বলল?”বহ্নিদি তার স্ফটিকোজ্জ্বল বড় চোখগুলো আরো বড় করে তাকাল।

-”সুভাষদা বলছিল।”

-”ও।”

-”রক্তিমদার কি হবে?মানে ও তো কলকাতাতেই থাকছে তাই না?”

বলেই সংঘমিত্রা উপলব্ধি করল বোকামি হয়ে গেছে।

বহ্নিদি অসহিষ্ণু গলায় বলল,”রক্তিমদার কি হবে মানে?আমার যাওয়ার সাথে ওর কি সম্পর্ক?”

সংঘমিত্রা চুপ করে গেল।বহ্নিদিকে চটানো মানেই আধঘন্টার একটা মাথা ধরানো তাত্ত্বিক লেকচার আবাহন করে আনা।

একটা ব্যাপার কিছুতেই পরিষ্কার হয় না।যে বহ্নিদি রাস্তার একটা বিড়াল-কুকুরের জন্যও চিন্তিত হয় সে রক্তিমদার মত একটা ছেলের প্রতি কি করে উদাসীন থাকে।রক্তিমদা সেই ধরনের ছেলে যার সামনে থাকলে নিজের মস্তিষ্ক এবং হৃদপিন্ডকে রীতিমতো কান মুচড়ে কন্ট্রোলে রাখতে হয়।মানে এক একটা এমন ছেলে থাকে যারা সবদিক মিলিয়ে এতটাই দারুণ হয় যে মনে মনে নিজেকেই নিজে ওর অনুপযুক্ত ভেবে রিজেক্ট করে দিতে হয়।

প্রায় ছ’ফিটের কাছাকাছি লম্বা,রক্তাভ উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙ আর ভীষণ সুন্দর স্বভাব।ছেলেটা এতটাই নরম যে অনেকে অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করত ছাত্রদের শাসন করে কি করে।ধমক টমক সে কাউকেই তেমন দিতে পারে না।

রক্তিমদা তার স্বভাবসিদ্ধ মিষ্টি লাজুক হাসিটা ঠোঁটে ফুটিয়ে বলত,”ক্লাসে আমি ফিউডালিস্ট অ্যামবিয়েন্স তৈরী করার কোনো চেষ্টাই করি না।শাসন করা মানেই তো একটা সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক তৈরী হওয়া।”

রক্তিমদার ছাত্ররা কেউ কেউ যারা বিএসসি পাশ করে যাদবপুরে এমএসসি করতে এসেছে তারাও ওর খুব ন্যাওটা ছিল।

রক্তিমদা ক্লাসে কেমন পড়াত সেটা সংঘমিত্রা জানে না,তবে প্র্যাকটিকাল আর ভাইভায় নাকি খুব হাত খুলে নম্বর দিত।সত্যি কথা বলতে ব্যাচমেট, শিক্ষক বা ছাত্রদের মধ্যে সংঘমিত্রা এমন কাউকে দেখেনি যে রক্তিমকে অপছন্দ করে।

-”রক্তিমদা খুব ভাল ছেলে।”অন্যমনস্ক ভাবে বলল সংঘমিত্রা।

-”তো?আমি বলেছি একবারও খারাপ ছেলে?”বহ্নিদি বিরক্ত হয়ে বলল,”I don’t owe him anything.”

ফেমিনিস্টদের এটাই সমস্যা,ভাবল সংঘমিত্রা।সব কিছুই বড্ড তাত্ত্বিক ভাবে চিন্তা করে।বহ্নিদি খুব নিষ্ঠুর বা হৃদয়হীন-একথা তার অতি বড় শত্রুও বলবে না।একদিন যেমন তার কাছে নিজের খাবারটুকু কেনার মতই টাকা ছিল,পাঁউরুটি -ঘুগনি কিনেছিল ক্যান্টিন থেকে।একটা মেয়ে না খেয়ে এসেছে,তাকে খাইয়ে দিয়ে নিজে না খেয়ে রইল।সেদিন দুর্ভাগ্যবশত সংঘমিত্রাও টিফিন নিয়ে যায়নি।তাছাড়াও বহ্নিদি কতটা প্রোটেক্টিভ আর কেয়ারিং এটা ওকে কাছ থেকে যারা দেখেছে সবাই জানে।বাড়ী ঘর ছেড়ে আসা ছেলেমেয়েগুলোকে যতটা সম্ভব ভাল রাখা যায় শেল্টারে-আপ্রাণ চেষ্টা করে তার জন্য।কতবার ওর ব্যক্তিগত দক্ষতায় ক্যাডাররা দলবদ্ধ ভাবে পুলিশ বা বিরোধী দলের গুন্ডাদের থেকে বেঁচে গেছে।লাঠিচার্জের দিনও কিভাবে জুনিয়র কমরেডদের আগলাচ্ছিল।

বহ্নিদি বলে নেতা হতে গেলে এগুলো করতে হয়।এতো আর ডিপিআই নয় যে কর্মীরা খাটবে, বোমাবাজি করে মরবে আর নেতারা নিরাপদ দূরত্বে থাকবে।কমরেড হাফিজ ইসলাম নাকি বলেছেন যুদ্ধে শুধু সেনারাই মরবে না,দু একজন জেনারেলকেও প্রাণ দিতে হবে।

এছাড়াও বলে ওদের সাধারণ সম্পাদক সি এমের কথা।তাঁর লড়াই,তাঁর আত্মত্যাগের কথা বলতে বলতে বহ্নিদি,যে পৃথিবীর কোনো ব্যক্তি বা বিষয়কে প্রশ্ন ছাড়া মানতে রাজী হয় না,সে পর্যন্ত কিরকম রামকৃষ্ণের মত ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে যায়।সি এম নাকি একাধারে ভারতের চে গেভারা এবং মাও সে তুং।খবরের কাগজে ভদ্রলোকের ছবি দেখেছে সংঘমিত্রা,একদমই নড়বড়ে চেহারা,দেখলে মনে হয় এক্ষুণি ভেঙে যাবেন-একটুও ইমপ্রেসিভ নয়।তার উপর কলেজ ড্রপ আউট।মানে জ্ঞান হোক বা মিলিটারি দক্ষতা-কোনোটাই থাকার কথা নয়।কিন্তু এদের সামনে সেটা বলতে যাওয়া পাগলামি হবে।

একবার নাকি সি এম জঙ্গলে লুকিয়ে আছেন এক কমরেডের সাথে(ভদ্রলোক কেন সবসময় লুকিয়ে থাকেন কে জানে,কোনোদিন শোনা যায় না সি এম বাড়ীতে আছেন।সবসময় সবাই বলে লুকিয়ে আছেন।তার উপর ভদ্রলোকের দু একটা লেখা চুপি চুপি পড়েছে সংঘমিত্রা,তাতেও খালি বলা থাকে শস্য লুকিয়ে রাখ,তুমি যেসব ক্যাডারদের রিক্রুট করবে তাদের লুকিয়ে রাখ,আর যা যা চোখে পড়ে পারলে বোধ হয় সবই লুকোতে বলবেন।),দুদিন খাওয়া জোটেনি,তো এক চাষীভাই ভাত খাবার নেমন্তন্ন করেছে।সেখানে গিয়ে দেখেন ভাত রান্নার জায়গায় কয়েকটা কঙ্কালসার বাচ্চা ছেলেমেয়ে জড়ো হয়েছে, লোলুপ দৃষ্টিতে রান্না হতে থাকা ভাত দেখছে তাকিয়ে তাকিয়ে।চাষীভাই তাদের ভাগিয়ে দিতে চাইল,কারণ ওদের দিতে গেলে কমরেডদের ভাত জুটবে না।সি এম তাঁর সঙ্গের কমরেডের হাত ধরে খুব জোর দৌড়ে জঙ্গলে গিয়ে এমন লুকিয়ে পড়লেন যে চাষীভাই তাঁদের খুঁজে পেল না।আসলে খিদে সামলানোও অসম্ভব ছিল আর ওদের অভুক্ত রেখে ভাত খাওয়াও।তাই লুকিয়ে পড়া ছাড়া আর নাকি পথ ছিল না।

এই সি এম লোকটা কেমন সংঘমিত্রা জানে না,ছবি দেখে খুব একটা আহামরি কিছু মনে হয়নি।তবে একটা কথা পরিষ্কার-ভদ্রলোক বললে বহ্নিদি,সুভাষদা,অরিন্দমদা বা দেবাঞ্জনাদির মত ছেলেমেয়েরা ডাবল ডেকারের নীচে বিনা প্রশ্নে শুয়ে পড়বে।

-”তাছাড়া তুই ওর ব্যাপারে কতটুকু জানিস?”

বহ্নিদির কথায় সচেতন হল সংঘমিত্রা।এবং এই কথাটা শুনে কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে বুকের মধ্যে একটা ঢেঁকির পাড় পড়ল।

-”কি হয়েছে?কি করেছে ও?”

অন্য কেউ হলে নির্ঘাত সংঘমিত্রার এই বাড়াবাড়ি রকমের উদ্বিগ্ন গলাটা নিয়ে সন্দেহ করত।কিন্তু বহ্নিদি কিছুটা আত্মমগ্ন ছিল।সে এসব বড় একটা লক্ষ করে না।বলল,”এই কথাটা আমি পার্টির মধ্যে আমার খুব কাছের কোনো বন্ধুর সাথেও আলোচনা করতে পারব না, ডেকোরামে আটকাবে।একটা মেয়ে হিসাবে তোকে বলছি,পার্টির মেয়েরা শেল্টারে খুব একটা ভাল অবস্হায় থাকে না।অনেক সময় ছেলেদের পাশে শুয়ে ঘুমোতে হয়।তার ফলে অনেকে আজকাল বিয়ের বয়স না হতেই বিয়ে করে নিচ্ছে,যাচ্ছেতাই সব ব্যভিচার চলছে।জোরজবরদস্তির ঘটনাও যে একেবারে ঘটে না তা নয়।হাফিজদা এটা নিয়ে অসন্তুষ্টও হয়েছিলেন।যাই হোক যেটা বলছিলাম,একদিন একটা শেল্টারে আমরা কয়েকজন পাশাপাশি শুয়ে আছি।আমার এক দিকে দেবাঞ্জনা, অন্য দিকে রক্তিমদা।আমি চোখ বুজেও ফিল করতে পারছিলাম ও সমানে উসখুস করছে।আমি খুব ইনসিকিওরড ফিল করছিলাম।আত্মরক্ষা করতে জানি, কিন্তু নিজের কমরেডদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তো আর হাতে বন্দুক নিই নি,তাই না?আর কমিউনিস্ট হলেই রাতারাতি কেউ যোগীপুরুষ বনে যায় না।তারপর ও কি করল জানিস?”

-”কি করল?”আতংকিত গলায় বলল সংঘমিত্রা।বালিশ থেকে উঠে বহ্নিদির মুখের উপর ঝুঁকে পড়ায় সে বিরক্ত হল,”তোকে কোনও এরোটিকা শোনাচ্ছি না,ওরকম করিস না তো।”

বহ্নিদি সংঘমিত্রার অবস্হাটা বুঝবে না।সংঘমিত্রা অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করল।

-”হ্যাঁ,ও তারপর বাথরুমে উঠে গেল,তারপর প্রচন্ড একটা আওয়াজ।আমি উঠে গিয়ে দেখি জানলার কাচে দুম দুম করে ঘুঁসি মারছে,কাচ ভেঙে হাতে ঢুকে রক্তারক্তি করে ফেলেছে।আচ্ছা করে বকুনি দিলাম।”

-”ও তোমাকে খুব ভালবাসে।”অস্ফুটে বলল সংঘমিত্রা।বহ্নিদি কোনোদিন বুঝবে না সংঘমিত্রার এই কথাগুলো শুনতে কত কষ্ট হচ্ছে।অথচ শোনার আগ্রহও ছাড়তে পারছে না।একটা অসহ্য বুক ফাটা কান্না সেঁচে আনা যন্ত্রণা, অথচ কোথায় যেন একটা মর্ষকামী সুখ আছে।

-”ভালবাসা টাসা নয়,টক্সিক ম্যাসক্যুলিনিটিকে রোমান্টিসাইজ করাটা এবার বন্ধ কর তো,”ধমকের গলায় বলল বহ্নিদি,”আমি ওকে প্রথম থেকেই স্পষ্ট বলে দিয়েছি আমার পক্ষে এখন সম্পর্কে জড়ানো সম্ভব নয়।সামনে কত কাজ, কত দায়িত্ব – জীবনটা খাওয়া,ঘুম আর মৈথুনের চেয়েও অনেক বৃৃৃৃহত্তর।তারপরেও এগুলো করার কোনো মানে হয়?আমার ভীষণ বিচ্ছিরি লাগে এগুলো।ভালবাসার নামে কোনো মেয়ের মুখে অ্যাসিড মারা যেমন,এই ধরনের masochism ও ঐ এক androcentric psyche থেকে উদ্ভুত হয়।আসলে সহজাত সংস্কার থেকে মুক্ত হওয়া অত সোজা নয়।আর ছেলেরা বেশীর ভাগ মুখে যতই প্রগতিশীলতার কথা বলুক,phallocentrism থেকে মুক্ত হতে পারে না,চায়ও না।”

বহ্নিদির শেষের কথাগুলোর বিন্দুবিসর্গও মাথায় ঢুকল না সংঘমিত্রার।কিন্তু একটা অসহ্য যন্ত্রণা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছিল।বহ্নিদি কি করে ঐ রকম একটা ছেলেকে এত কষ্ট দেয়?বললেই খানিক দুর্বোধ্য তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে দেবে।ওগুলো এড়ানোর জন্যই বাধ্য হয়ে চুপ করে গেল সংঘমিত্রা।

রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ উঠে পড়ল বহ্নি।সংঘমিত্রাকে জাগাল না।মেয়েটা অনেক রাত করে ঘুমিয়েছে।প্রায় দেড়টা বেজে গেছিল গতকাল গল্প করতে করতে।নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এল।লাকটা এমন খারাপ,আজই বন্দুকের গুলি শেষ হয়ে গেল,একটা মাত্র পেটো তাও কাল খরচ হয়ে গেছে।এখনও ছেলেগুলো বাইরে থাকলে নিশ্চিত মৃত্যু অপেক্ষা করছে।

নাহ বাইরে কেউ নেই।হেঁটে হেঁটে গলির মুখটায় আসতেই হ্যালোজেন আলোয় দেখতে পেল ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়ার আশ্রিত দুষ্কৃতি শানু ভটচাজ।হাতে একটা তরমুজ কাটা দা’ এর সাইজের ছুরি।শানু বহ্নিকে দেখে বিস্মিত গলায় বলল,”ই এস জি না?”

(ক্রমশ)

(এর পরের পর্বটা খুবই ছোট তাই একসপ্তাহের আগে দেওয়া হবে।)

দ্রোহকাল ৪
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments